সাক্ষাৎকারঃ মেজর জেনারেল এ কে এম শফিউল্লাহ

Posted on Posted in 10
শিরোনামসূত্রতারিখ
৫। ৩নং সেক্টরের ও ‘এস’ ফোর্সের যুদ্ধ বিবরণসাক্ষাৎকারঃ মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ——–১৯৭১

<১০, ৫, ১৯৯-২১৬>

সাক্ষাৎকারঃ মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ

তেলিয়াপাড়া পতনের পর সিলেটের মনতলা হতে সিংগারবিল পর্যন্ত এলাকা আমাদের নিয়ন্ত্রণধীন ছিল। এ এলাকা থেকে আমরা গেরিলা ট্রেনিংপ্রাপ্ত ছেলেদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কিভাবে ক্ষতি করতে হবে সেভাবে টাস্ক দিয়ে পাঠাতাম।

যখন আমরা এ কাজে ব্যস্ত ছিলাম তখন আমাদের সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওসমানী সমগ্র বাংলাদেশকে ১১ টা সেক্টরে বিভক্ত করে এক নির্দেশ পাঠান। সেই নির্দেশ মোতাবেক আমার সেক্টরের নামকরণ করা হয় ‘তিন নং সেক্টর’। যে এলাকার যুদ্ধ পরিচালনার ভার আমার উপর দেওয়া হয়ছিল, সে এলাকাগুলো ছিল সীমান্ত এলাকা-উত্তরের সিলেটের চূড়ামনকাটি (শ্রীমঙ্গলের কাছে) এবং দক্ষিনে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার সিংগারবিল। অভ্যন্তরীণ যে সকল এলাকার যুদ্ধ পরিচালনার ভার আমার উপর দেওয়া হয়েছিল সেগুলো হল, সিলেটের মৌলভীবাজার সাবডিবিশন এর কিয়দংশ,সম্পূর্ণ হবিগঞ্জ মহকুমা নবিনগর থানার কিছু অংশ বাদে সমস্ত ব্রাক্ষণবাড়িয়া মহকুমার এবং নায়ায়ণগঞ্জ মহকুমার আড়াইহাজার এবং বৈদ্যরবাজার থানা ছাড়া সমস্তটা, ঢাকা শহর ছাড়া ঢাকা নর্থের সমস্তটা, কিশোরগঞ্জ মহকুমা এবং গফরগাঁও এবং ভালুকা থানা। এইগুলি ছিল আমার অভ্যন্তরীণ সেক্টরের এলাকা। এ এলাকা ছাড়াও ঢাকা শহর এবং নারায়ণগঞ্জ শহরের বিভিন্ন গেরিলা তৎপরতায় আমি আমার গেরিলা যোদ্ধাদের পাঠিয়েছিলাম। এভাবে এলাকা ভাগ করে দেওয়ার পর আমরা বাংলাদেশের ভেতর বিভিন্ন স্থানে স্থানে গেরিলা বেইস তৈরি করি। সেখানে কিছুসংখ্যক নিয়মিত বাহিনীর লোক পাঠাই যেন তারা গেরিলা ট্রেনিংপ্রাপ্ত পরিচালনা করতে পারে। আমার এলাকার যে সমস্ত জায়গাতে গেরিলা বেইস তৈরি করেছিলাম, তা ছিল সিলেটের চুনারুঘাট,হবিগঞ্জ ও বানিয়াচংগে। একটাই ছিল সিলেটে। ব্রাক্ষণবাড়িয়া মহকুমার নাসিরনগর,সরাইল,মুকুন্দপুর,ব্রাক্ষণবাড়িয়া এবং নবীনগরে একটি করে বেইস। কিশোরগঞ্জে যেসব বেইস তৈরি করি সেগুলো হল কুলিয়ার চর,বাজিতপুর, কটিয়াদি, পাকুন্দিয়া, হোসেনপুর এবং কিশোরগঞ্জে- প্রত্যেকটি জায়গায় একটি করে বেইস তৈরি করি। ঢাকা জেলাতে যেসব বেইস তৈরি করি তা-রায়পুর, শীতপুর,নরসিংদী,কাপাসিয়া,মনোহরদি,কালিয়াকৈর,জয়দেবপুর এবং কালীগঞ্জ। ময়মনসিংহের গফরগাঁও এবং ভালুকাতে একটি করে গেরিলা বেইস তৈরি করি।

এসব বেইস-এ ট্রেনিং দিয়ে ছেলেদের পাঠাবার জন্য আমরা শরনার্থী ক্যাম্প থেকে ছেলেদেরকে রিক্রুট করতাম। ঢাকা-ময়মনসিংহ এবং কুমিল্লা জেলার অভ্যন্তরে যেসব বেইস তৈরি করেছিলাম যেসব বেইস-এ গেরিলা তৎপরতা চালাতে বিপুলসংখ্যক ছেলে ট্রেনিং এর জন্য আসত। এসব জেলা থেকে যেসব তরুন ছেলেরা ট্রেনিং নেয়ার জন্য আসত তাদের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে, তাদের সবাইকে ট্রেনিং দেয়া আমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ত। তাই তখন রিক্রুটমেন্ট- এ যেতাম। এতে বেশ কিছুসংখ্যক ছেলে সিলেক্ট না হতে পেয়ে নিরাশ হয়ে যেত। কিন্ত সিলেট জেলায় আমাকে বেশি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। যখন এসব বেইসগুলাতে হাজার হাজার ট্রেনিংপ্রাপ্ত গেরিলা পৌঁছে গিয়েছিল, তখনও আমি সিলেট জেলার বেইসগুলাতে গেরিলা পাঠাবার জন্য কোন ছেলেকে রিক্রুট করতে পারিনি। দু’চারজন যারা রিক্রুট হয়েছিল তারাও জেলার অভ্যন্তরে তৎপরতা চালাবার সাহস পায়নি। অবশেষে আমরা বেইস তৈরি করার জন্য অস্ত্রের সাহায্য নিতে বাধ্য হয়েছিলাম। গেরিলা যুদ্ধে সমস্ত নীতির অন্যতম নীতি হল যে,গেরিলা যুদ্ধকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য জনগণের সাহায্য একান্ত প্রয়োজন কিন্ত সিলেটে এ সমর্থনের বিশেষ অভাব ছিল। তাই প্রথম পর্যায়ে আমাদের ট্রেনিংপ্রাপ্ত গেরিলা হয়তবা পাক সেনাবাহিনী কতৃক ধৃত হয়েছে অথবা জনগণ দ্বারা ধৃত হয়েছে। যারা ধরা পড়েছিল তার কখনো ফিরে আসেনি। যেহেতু সিলেটে প্রথম দিকে গেরিলা তৎপরতা কম ছিল, সেহেতু পাকিস্তানী সৈন্যরা সিলেটে এবং নিকটবর্তী অঞ্চলে নির্ভয়ে চলাফেরা করতে পারতো।

একেবারেই যে সাহায্য পায়নি সেটা বললেও ভুল হবে। কিছুসংখ্যক লোক আমাদের যথেষ্ট সাহায্য করেছে এবং যারা সাহায্য করেছে তারা মনেপ্রাণে সাহায্য করেছে, তাই জুলাই মাসের পর থেকে সিলেট জেলার ভেতরে গেরিলা বেইস তৈরি করার জন্য আমরা সাহায্য নেই। তারপর থেকে গেরিলা তৎপরতা কিছুটা প্রকাশ পায়।

আমাদের নিকট অস্ত্রশস্ত্র ছিল খুব অল্প। বন্ধুরাষ্ট্র থেকেও তখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য তেমন কোন অস্ত্র পাওয়া যাচ্ছিল না। তাই যেসব যুবককেই আমরা ভিতরের বেইস-এ কাজ করার জন্য পাঠাতাম তাদেরকে ১০ জনের একটা ব্যাচ করে তাদের হাতে দুটো কি তিনটা হাতিয়ার, একটা করে গ্রেনেড এবং কিছু পরিমাণ বিস্ফোরক দ্রব্য দিয়ে পাঠাতাম। এইসব অস্ত্র এবং বিস্ফোরক দ্রব্যের ব্যবহার আমার নির্দেশ এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী গণবাহিনী এবং নিয়মিত বাহিনীর সমন্বয়ে, যৌথ পরিকল্পনা ও পরামর্শে, নিয়মিত বাহিনীর কমান্ডারের নেতৃত্বে ব্যবহৃত হত।

আগস্ট মাস হতে বন্ধুরাষ্ট্র ভারত থেকে আমরা বেশ কিছুসংখ্যক অস্ত্রশস্ত্র পাই। তখন আমরা দশজনের দলের জন্য আটজনকে অস্ত্র দিতে পেরেছিলাম। তারপর থেকেই গেরিলা তৎপরতা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভীষণভাবে জোরদার হয়ে ওঠে। তখন থেকেই পাকিস্তানীদের একস্থান থেকে অন্যস্থানে চলাফেরার নিরাপত্তা যথেষ্ট বিঘ্নিত হয়।

অক্টোবর- নভেম্বর পর্যন্ত আমরা যেভাবে গেরিলাদের ভেতর ট্রেনিং দিয়ে পাঠিয়েছি, তাতে এমন বাড়ি বাদ ছিল না যেখানে ট্রেনিংপ্রাপ্ত গেরিলা ছিল নাহ।

আমি যে এলাকায় যুদ্ধ পরিচালনা করেছি সে এলাকায় প্রায় ২৫/৩০ হাজার গেরিলা নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত কাজ করছিল। যে অস্ত্র তাদের দিয়েছিলাম সে অস্ত্র ছাড়াও পাকবাহিনী রাজাকার, আলবদর, আলশামস এবং পুলিশ ষ্টেশন থেকে ছিনিয়ে নেয়া অস্ত্রশস্ত্রের সংখ্যা বিশেষভাবে বেড়ে যায় এবং ছেলেদের মনোবলও সাথে সাথে বেড়ে যায়।

এমন কতগুলা জায়গা ছিল, সেগুলো পাকবাহিনী কখনো তাদের নিয়ন্ত্রনে নিতে পারেনি, যেমন- রায়পুরা, শিবপুরে উত্তরাংশ, মনোহরদী, কাপাসিয়া, বাজিতপুর, কুলিয়াচর, ভালুকা, গফরগাঁও এই সমস্ত এলাকায় আমাদের প্রশাসন ব্যাবস্থাও ছিল।

যেহেতু আমরা যুবকদের ট্রেনিং দিয়ে গেরিলা যুদ্ধের জন্য ভেতরে পাঠাচ্ছিলাম এবং আমাদের কনভেশনাল যুদ্ধ প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল, সেহেতু মনতলা থেকে সিংগারবিল পর্যন্ত এলাকায় কনভেশনাল পদ্ধতিতে প্রতিরক্ষা ব্যূহ তৈরী করি-কিন্ত নিয়মিত বাহিনীর সৈনিকদের দ্বারা গেরিলা অপারেশন-এর জন্য ব্রাক্ষণবাড়িয়া-সিলেট মহাসড়ক পাকবাহিনীর জন্য এক মরণফাঁদ ছিল।

তাই পাক-বাহিনী আমাদেরকে এ জায়গা থেকে সরাবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। আমরাও আমাদের ঘাঁটিকে সুরক্ষিত করার চেষ্টা করি। কারণ এটাই ছিল আমাদের সর্বশেষ আশ্রয়ের স্থল। এ জায়গা যদি আমরা হারাই তাহলে আমাদের ভারতে আশ্রয় নেয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিল নাহ। যদিও তখন আমাদের সমস্ত ট্রেনিং ক্যাম্প এবং হেডকোয়ার্টারের কিয়দংশ ছিল ভারতে।

এই ক্ষুদ্র জায়গাটুকু রক্ষা করার জন্য আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করি। কিন্ত পাকবাহিনী ও আমাদের পিছু হঠাবার জন্য বেপারোয়া আক্রমন চালায়। কারণ আমাদের হটিয়ে দিতে না পারলে সিলেট হাইওয়ে তাদের জন্য নিরাপদ ছিল নাহ এবং আখাউড়া-সিলেট ট্রেন চালু করতে পারছিল না। বলা বাহুল্য,পাক বাহিনী ২৫শে মার্চের পর থেকে এই লাইনে আর কখনো গাড়ি চালাতে পারেনি।

আমাদের এই ঘাঁটির উপর প্যাকবাহিনী বার বার আক্রমণ করে এবং এসব আক্রমণে তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। প্রতিদিন তাদের ২০ থেকে ৩০ জন্য সৈনিক হারাতে হোত। অবশেষে জুন মাসের ২১ তারিখে পাকবাহিনী আমাদের এই অবস্থানের উপর মারাত্মকভাবে হামলা চালায়। আমার সৈনিক সংখ্যা ছিল মাত্র তিন কোম্পানি। কিন্ত প্যাকবাহিনীর উপর্যুপরি প্রায় চার ব্যাটালিয়ন সৈন্য নিয়ে আক্রমন চালায়। এক ব্যাটালিয়ন সৈন্য ইটাখোলা, তেলিয়াপাড়ার দক্ষিন দিকে মনতলার দিকে অগ্রসর হয়। এক ব্যাটালিয়ন মাধবপুর থেকে মনতলার দিকে অগ্রসর হয়। এক ব্যাটালিয়ন চানহরা থেকে হরশপুরের দিকে অগ্রসর হয়। আর এক ব্যাটালিয়ন মুকুন্দপুর থেকে হরশপুর-এর দিকে অগ্রসর হয়।

একই সময়ে চারদিক থেকে তারা আমাদের উপর আক্রমণ শুরু করে এবং এ আক্রমণে তারা দূরপাল্লার ভারী অস্ত্র বেপরোয়াভাবে, ব্যাপকভাবে ব্যাবহার করে। যখন তিন দিক থেকে তারা আমাদের উপর আক্রমণ করতে অগ্রসর হচ্ছিল তখন হেলিকপ্টারযোগে তারা পিছনে কিছু সংখ্যক কমান্ডো অবতরন করায়। আমি শেষ পর্যন্ত আমার সৈনিকদের পিছনে হটে যেতে আদেশ দেই। হরশপুরের নিকট আমার যে কোম্পানি ছিল তারা পাকসৈন্যদের প্রায় ঘেরাওয়ের ভিতরে পড়ে যায়। এই কোম্পানিকে ঘেরাও থেকে উদ্ধার করতে আমার বেগ পেতে হয়েছিল। যদিও আমরা আমাদের অবস্থান থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম তবুও শেষ পর্যন্ত প্রায় ৪০ বর্গমাইল এলাকা আমাদের আওত্তাদিন রাখতে সমর্থ হয়েছিলাম। এই এলাকা স্বাধীনতা লাভের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত মুক্ত ছিল।

ঐদিনই ২১শে জুন আমি আমার লোকজনকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত ভারতের ভিতর চলে যেতে বাধ্য হই। ভারতে চলে যাওয়ার পর আমরা পূর্ণোদ্যমে নবাগত তরুণদের ট্রেনিং দিতে শুরু করি, যাতে করে গণবাহিনীর সাথে সাথে নিয়মিত বাহিনীও গড়ে উঠে। ভারতে চলে যাবার আগে থেকেই আমরা গণবাহিনী গড়ে তোলার জন্য ট্রেনিং দেয়া শুরু করি। এবং ভারতে যাবার পর ট্রেনিং আরও জোরদার করি। জুন মাস পর্যন্ত আমরা বেশি কিছু সংখ্যক যুবকদের ট্রেনিং দিয়েছিলাম।

যে সমস্ত টাস্ক দিয়ে দিয়ে গেরিলাদের ভিতরে পাঠাতাম, সে সমস্ত টাস্ক যাতে সুসংহত ও সুপরিকল্পিতভাবে সম্পন্ন হয়, সে ব্যাপারে আলোচনার জন্য জুলাই মাসের ৭/৮ তারিখে সমস্ত সেক্টর কমান্ডারদের মুজিব নগরে এক কনফারেন্স হয়। এই কনফারেন্স-এ প্রথম সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। তিনি আমাদের লক্ষ্য যে ভাষণ দেন তার মর্ম ছিল যে- পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আমাদের উপর যে অত্যাচার অবিচার করছে টার পরিপ্রেক্ষিতে আজ আমরা এখানে।

আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যে লড়াই করছি,টা স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত যেন চালিয়ে যেতে পারি। এতে আমাদের সবাইকে একই লক্ষ্য সামনে রেখে কার্য পরিচালনা করা উচিৎ। এ লক্ষ্যে পৌছাতে বিভিন্ন মহলের প্ররোচনায় আমরা যেন পথভ্রষ্ট না হই। বাংলাদেশ সরকার যথাসাধ্য সর্বপ্রকার সাহায্য করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। অস্ত্রশস্ত্র সমরসম্ভার বন্ধুরাষ্ট্র ভারত যতটুকু দেয় টা আমরা গ্রহণ করব। তাছাড়াও যদি সম্ভব হয় অন্য কোন রাষ্ট্র থেকেও আনার চেষ্টা করব। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে আমরা অনুপ্রাণিত হই।

কিভাবে আমাদের লক্ষ্যে পৌছাতে হবে এ ব্যাপারে পরে কর্নেল ওসমানীর নেতৃত্বে ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করি। কনফারেন্স প্রায় দশদিন পর্যন্ত চলে। এই কনফারেন্সে বাংলাদেশের ভিতরে গেরিলা পদ্ধতিতে কিভাবে লড়াই চালাতে হবে সে পরিকল্পনা নেয়া হয়,যাতে করে সমস্ত সেক্টর একই ধরণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে পারে। যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল তার মাঝে গুরুত্বপূর্ণ গুলো হলো-

১। সেক্টরের সীমানা সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হয়।

২। গেরিলা তৎপরতা সুষ্ঠুভাবে চালাবার জন্য ভেতরে গেরিলা ঘাঁটি তৈরি করা।

৩। গেরিলা ঘাঁটিগুলোতে শুধু গেরিলা থাকবে নাহ। কিছু সংখ্যক নিয়মিত বাহিনীর লোকদেরও ঐ সমস্ত ঘাঁটিতে পাঠানো হবে যাতে গেরিলাদের সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে পারে।

৪। খবরাখবর আনা-নেওয়ার জন্য এক ইন্টেলিজেন্স চেইন তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

৫। প্রত্যেক গেরিলা বেইসে -এ একজন করে রাজনৈতিক উপদেষ্টা থাকবে। যার উপদেশে রাজনৈতিক কার্যকলাপ চালিত হবে।

৬। প্রত্যেক গেরিলা ঘাঁটিতে একটি করে মেডিকেল টিম থাকবে। যারা গেরিলা চিকিৎসায় দায়িত্বভার এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

৭। গেরিলা ওয়েলফেয়ারের সাথে সাথে সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার ও চালিয়ে যেতে হবে যাতে করে পাকিস্তানী সৈন্যদের মনোবল নষ্ট হয়ে যায় এবং আমাদের জনসাধারণের মন অটুট থাকে।

৮। আমাদের সামরিক পরিকল্পনা (প্যাকটিক্যাল প্লান) এ রকম হওয়া উচিৎ যাতে করে পাক সেনাবাহিনী আইসোলেটেড হয়ে পড়ে।

৯। তাদের (পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে) প্রথম আইসোলেটেড করতে হবে এবং পড়ে তাদের এনিহিলেট (নিশ্চিহ্ন) করতে হবে।

১০। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অস্ত্রশস্ত্র,যানবাহন,খাদ্যদ্রব্য ইত্যাদি যাতে চলাফেরা করতে না পারে সেজন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দিতে হবে।

১১। পাকিস্তান যেন বাংলাদেশ থেকে কাঁচামাল বা ফিনিশড প্রোডাক্ট রফতানী করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে না পারে সেজন্য এ দ্রব্য সামগ্রী সরকারী গুদাম ধ্বংস করতে হবে।

১২। কলকারখানা যেন চলতে না পারে সেজন্য বিদ্যুৎ এবং পেট্রোল ইত্যাদির সরবরাহ ব্যবস্থা বিধ্বস্ত করতে হবে।

১৩। গাড়ি ঘোড়া,রেলগাড়ি,বিমান,জলযান যেন ঠিকভাবে চলাচল করতে না পারে সেজন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

১৪। যে সকল মানুষ লোক পাক-সেনাবাহিনীর সহযোগিতা করবে তাদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে হবে এবং চরম ব্যবস্থা নিতে হবে।

১৫। ‘‘বাংলাদেশে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে” –পাকিস্তানী শাসকদের এই প্রচারণাকে মিথ্যা প্রমাণিত করার জন্য ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে অস্বাভাবিক পরিবেশ সৃষ্টি করার পরিকল্পনা নেয়া হয়। কনফারেন্স শেষে আমরা যার যার সেক্টরে চলে যাই এবং সকল পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করার জন্য আমাদের নিজ নিজ সেক্টরে পরিচালনা পরিকল্পনা নেই।

আমি আমার ৩নং সেক্টরকে নিম্নলিখিত দশটি সাবসেক্টরে ভাগ করি। প্রত্যেকটি সাবসেক্টর যেসব সাবসেক্টর কমান্ডারদের অধীনে ছিল তাদের নামও দেওয়া হলঃ

১।আশ্রম বাড়ি, ২। বাঘাই বাড়ি( এ দুটি সাবসেক্টরের কমান্ডার ছিল প্রথমে ক্যাপ্টেন আজিজ তারপর ক্যাপ্টেন এজাজ ), ৩। হাতকাটা-ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান,৪।সীমানা-ক্যাপ্টেন মতিন, ৫। পঞ্চবটি-ক্যাপ্টেন নাসিম, ৬। মনতলা, ৭। বিজয়নগর (এই দুই সাবসেক্টর-এর কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন সুবেদ আলী ভুঁইয়া, ৮। কালাছড়া-লেঃ মজুমদার, ৯। কলকালিয়া, ১০। বামুটিয়া(এ দুটি সাবসেক্টরের কমান্ডার ছিলেন লেঃ মোরশেদ এবং লেঃ সাঈদ)

এই সেক্টরগুলিতে কনভেনশনাল যুদ্ধ ছাড়া গেরিলা যুদ্ধ চালাত। যুদ্ধ পরিচালনা ছাড়াও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে,বিভিন্ন বেইস-এ গেরিলা পাঠাবার দায়িত্ব এই সমস্ত সাবসেক্টর কমান্ডারদের উপর ন্যস্ত ছিল। সাবসেক্টর কমান্ডাররা সীমান্ত অতিক্রম করে ভেতরে পাঠিয়ে দিত। গেরিলাদের পাঠাবার নিশ্চিন্ত করারও সাবসেক্টর কমান্ডারদের দায়িত্ব ছিল। এই নিরাপত্তা নিশ্চিন্ত করতে কখনো তাদেরকে পাকবাহিনীর সাথে যুদ্ধেও লিপ্ত হতে হয়েছিল।

আমাদের প্রধান সেনাপতির নির্দেশ অনুযায়ী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আমরা আমাদের কর্মতৎপরতা জোর দার করি। প্রধান সেনাপতির নির্দেশের পূর্ব থেকেই আমরা বাংলাদেশের ভেতরে গেরিলা তৎপরতা বৃদ্ধির জন্য বেইস নির্মাণ শুরু করেছিলাম। কিন্ত তার এই নির্দেশ মোতাবেক এ বেইসগুলোকে আরও সুসংহত করি। যাতে এক সেক্টরের গেরিলার সাথে অন্য সেক্টরের গেরিলাদের সংঘর্ষ না ঘটে সেজন্য আমাদের বেইসগুলোকে এমনভাবে তৈরি করি যেন বর্ডারিং বেইসগুলো একে অন্যর সাথে সুপরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হতে পারে।

সেপ্টেম্বরের (১৯৭১) প্রথম দিক থেকে ডিসেম্বরের (১৯৭১) মাঝামাঝি পর্যন্ত আমাদের গেরিলা তৎপরতা এমনভাবে বেড়ে যায় যে,পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা বাংলাদেশের ভিতরে ছিলনা বললেই চলে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের ভিতরে নিম্নলিখিত গেরিলা অপারেশনগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য-