সাক্ষাৎকারঃ মেজর মেহেদী আলী ইমাম

Posted on Posted in 10
শিরোনামসূত্রতারিখ
১৮। ৯নং সেক্টরে সংঘটিত যুদ্ধের অন্যান্যের বিবরণবাংলা একাডেমী দলিলপত্র১৯৭১

<১০, ১৮.১, ৪২২-৪২৭>

সাক্ষাৎকারঃ মেজর মেহেদী আলী ইমাম*
১৫-১০-১৯৭৪

 

নয় নম্বর সেক্টর গঠন করা হয় খুলনায় কিছু অংশ, ফরিদপুরের কিছু অংশ এবং পুরো বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলা নিয়ে। এই সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর এম,এ,জলিল। স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথমার্ধে মে মাসের শেষ পর্যন্ত এই সমস্ত এলাকায় আমি, লেঃ নাসির, ক্যাপ্টেন হুদা, লেঃ জিয়া যুদ্ধ পরিচালনা করছিলাম। মে থেকে জুলাই পর্যন্ত বরিশাল ও পটুয়াখালী আর্মি খুলনার সুন্দরবন এলাকায় লেঃ জিয়া এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় ক্যাপ্টেন হুদা ছিলেন। জুলাইয়ের পর থেকে নয় নম্বর সেক্টর পুনরায় সংগঠিত করা হয় এবং বরিশাল জেলার দায়িত্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা ক্যাপ্টেন শাহজাহানকে (ওমর), পটুয়াখালী আমাকে, সুন্দরবন ও খুলনার কিছু অংশ লেঃ জিয়াকে দেয়া হয়। পিরোজপুর ও বাগেরহাট এলাকা সুবেদার তাজুল ইসলামকে এবং ক্যাপ্টেন হুদাকে খুলনার সীমান্তবর্তী অঞ্চলের দায়িত্ব দেয়া হয়। সেক্টর হেডকোয়ার্টার টাকীতে ছিলেন মেজর জলিল। এর এডজুট্যান্ট ছিলেন ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হক ও মফিজ। এদের সাথে ছিল ক্যাপ্টেন আরেফিন। নয় নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান প্রশিক্ষণ শিবিরের প্রধান ছিলেন সুবেদার গোলাম আজম। নয় নম্বর সেক্টরের নৌবাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন চীফ পেটি অফিসার এম, ইউ, আলম। সন্দরবনে লেঃ জিয়ার অধীনে ছিলেন ফুল মিয়া ও মধু।

জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে আমি পটুয়াখালী জেলার ১০টা থানা এলাকার লোকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি এবং প্রশিক্ষণ দিতে থাকি। কিন্তু আমাদের অস্ত্রের খুবই অভাব ছিল। তাই স্থির হল স্থানীয় এলাকার লোকদের যাদের বন্দুক আছে তা যোগাড় করতে হবে। বন্দুক বেশির ভাগ মুসলিম লীগারদের হাতে ছিল, তাই বাধ্য হয়ে রাতে আক্রমণ চালিয়ে বন্দুক ছিনিয়ে নিতে থাকি। অস্ত্রশস্ত্র ছাড়াও আমাদের খাদ্যের অভাব ছিল। তাই বড় বড় মহাজনদের বাধ্য করি খাদ্যশস্য দিতে। মুক্তিযুদ্ধের জন্য লোক ভর্তি করা হতে থাকে। প্রথমে আমাদের কার্যকলাপ তিনটি থানার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। থানা তিনটি ছিল মঠবাড়িয়া, বেতাগী ও বামনা। এসময় আমার বাহিনীর হাতে ১৫/২০টা রাইফেল ও ৩০/৪০টা বন্দুক ছিল। কিন্তু গোলাবারুদের খুবই অভাব ছিল। আমরা এ সময় মাঝেমাঝে থানা আক্রমণ করে গোলাবারুদ ও অস্ত্রশস্ত্র ছিনিয়ে নিতে থাকি।

ইতিমধ্যে এক শ্রেণীর দুস্কৃতকারী মুক্তিযোদ্ধাদের নাম করে গ্রামে গ্রামে ডাকাতি শুরু করে দেয়। ফলে জনমনে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি হয়। জনগণ সে সময় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম শুনলে ভয় পেয়ে যেত। আমি বুঝতে পারলাম জনগণকে দু®কৃতকারীদের হাত থেকে বাঁচাতে না পারলে আমাদের সংগ্রাম ও চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবে। জনসমর্থন ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ চালানো সম্ভব নয়।

পটুয়াখালী জেলার ১০টি থানার প্রতি দুটি থানা মিলিয়ে একটি করে জোন গঠন করি। পটুয়াখালীর যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব খারাপ। এক থানা থেকে আর এক থানার বেশ দূরত্ব ছিল। তাই এই সময় পটুয়াখালী জেলার মোট ৫টা জোন ছিল ও শুধু মঠবাড়িয়া থানার একটা জোন করা হয়। এক-একটা জোনে ১০/১৫টা বন্দুক ও ৪/৫টা রাইফেল দিয়ে বেশ কিছূ মুক্তিযোদ্ধা পাঠিয়ে দেই। তাদের কাজ ছিল কোন এলাকায় ডাকাতি আরম্ব হলে সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ডাকাতদের দমন করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধারা কোন এলাকায় ডাকাতি হবে শুনলে সঙ্গে সঙ্গে অনেক নৌকা নিয়ে সেখানে চলে যেত। ডাকাতদের পিছু ধাওয়া করা হত। এভাবে জনগনের মনোবল ফিরিয়ে আনা হয়। মুক্তিযোদ্ধারা যে এলাকা দিয়ে যেত, সেখানে ‘জয়বাংলা’ বঙ্গবন্ধু ‘জিন্দাবাদ’ ইত্যাদি শ্লোগান দিত। এসব শ্লোগান এবং অনেক নৌকা দেখে জনগনের মনে ধারনা হত এখানে অনেক মুক্তিযোদ্ধা এসে গেছে। এভাবে জনগনের মনে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে শ্রদ্ধার ভাব জাগানো হয়। ইতিমধ্যে থানাতে থানাতে আওয়ামীলীগ ও অন্যান্য স্বাধীনতাকামী জনগণের নিয়ে থানা সংগ্রাম পরিষদ পুনরায় গঠন করা হয়েছে।

ইতিমধ্যে আমি খবর পাই মেজর জলিল প্রাণে বেঁচে আবার পশ্চিম বাংলায় গেছেন এবং সেখানে অস্ত্রশস্ত্র যোগাড়ের চেষ্টায় আছেন। খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুরের কিয়দংশ এবং পটুয়াখালীকে নিয়ে একটা সেক্টর গঠন করা হয়েছে। এই সেক্টর ৯ নম্বর সেক্টর হিসাবে পরিচিত। এবং কমান্ডার হয়েছেন মেজর জলিল। আমি মেজর জলিলের কাছে লোক পাঠাই কিছু অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ পাওয়ার জন্য। কেননা, এ সময়ে আমার হাতে সামান্য কিছু রাইফেল ও বন্দুক ছিল কিছু কিন্তু গোলাবারুদ একেবারেই ছিল না। আমাদের অনেক সময় ৫০০ টাকা দিয়ে অনেক লোকের কাছ থেকে রাইফেল ও বেশকিছু টাকা দিয়ে গোলাবারুদ যোগাড় করতে হয়। তিনি আমাকে খবর পাঠান এ ব্যাপাওে চেষ্টা চালাচ্ছেন। তিনি আরও নির্দেশ দিয়ে পাঠান মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য।

আমি কোন সময়ে ব্যক্তিগতভাবে পটুয়াখালী ও বরিশাল ছেড়ে যাওয়া পছন্দ করিনি। আমার বিশ্বাস ছিল, এলাকার জনগণের সাথে ঠিকমত কাজ করলে এখান থেকেই আমি মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারব। জনগনই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত শক্তি। তাদেরকে নিয়ে সংগঠন গড়ে তুলতে পারলে আমরা শত্রুদের পর্যুতস্ত করতে সক্ষম হব। বার বার শত্রুকে আঘাত করে দুর্বল করে দিতে পারলেই আমাদেও লক্ষ্যে আমরা সহজেই পৌঁছাতে পারব। ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমি এলাকার জনগণকে ছেড়ে ভারতে যাইনি। তাদের মধ্যে থেকেই শত্রুদেও আঘাত করে পর্যুদস্ত করতে সক্ষম হয়েছিলাম।

মেজর জলিলের নির্দেশ পাবার পর আমি সমগ্র পটুয়াখালী জেলাকে ৫টি এলাকায় ভাগ করি এবং ৫ জনকে এর নেতৃত্ব দিই। বামনা-পাথরঘাটা থানার দায়িত্ব দিই আলমগীরের হতে। বেতাগী ও বরগুনা থানার দায়িত্ব থাকে হাবিলদার জলফু মিয়ার কাছে। আমতলী খেপুপাড়ার দায়িত্ব দিই নায়েব সুবেদার হাতেমের হাতে। গলাচিপা ও পটুয়াখালী ভার দিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র হুদার হতে। মির্জাগঞ্জ ও বাউফলের দায়িত্ব দিই আলতাফ হায়দার ও হাবিলদার বাকেরের কাছে। এদেও আমি নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে সমগ্র এলাকায় রেকি কওে ঘাঁটি গড়ে তোলার নির্দেশ দেই। কেননা নিজেদের ঘাঁটি না গড়ে তুলতে পারলে পাকসেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা যাবে না, এটা বুঝেছিলাম। আমার নির্দেশমত তারা নিজ নিজ এলাকায় চলে যায়। তাদের আমি বলি অস্ত্রশস্ত্র পেলেই তাদের পৌছে দিব। মঠবাড়িয়ার ও বামনা থানার কিছু অংশ নিয়ে বুকাবুনিয়াতে সদও দপ্তর স্থাপন করি, যেখানে আমার অধীনে সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মজিদ ছিল। এছাড়াও বুকাবুনিয়াতে মুক্তিযোদ্ধাদেও জন্য ট্রেনিং ক্যাম্প গঠন করি। স্বাধীনতা সংগ্রামের পুরো নয় মাসই এখানে পটুয়াখালী জেলার উৎসাহী যুবকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হত এবং ক্যাম্পকে একটা স্থায়ী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে রুপান্তরিত করা হয়। যুদ্ধ চলাকালীন এই ক্যাম্প চারবার পাকসেনাদেও দ্বারা আক্রান্ত হয়। বুকাবুনিয়া ক্যাম্পের প্রশিক্ষণের দায়িত্বভার দিই সুবেদার আনসার আলীর হাতে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এখানে ছেলেদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। পাকসেনারা বুকাবুনিয়া ক্যাম্প আক্রমণ করার সাহস পায়নি। এছাড়াও পরবর্তীকালে মঠবাড়িয়া থানার রাজার হাট, বেতাগী থানার করুনায় মুক্তিযোদ্ধাদের দুটি ট্রেনিং ক্যাম্প খোলা হয়। এই দুটি ক্যাম্প পরিচালনার দায়িত্ব ছিল যথাক্রমে নায়েক আজিজ ও হাবিলদার গোলাম মাওলার কাছে। পটুয়াখালী জেলার বিভিন্ন স্থানে আমার মুক্তিযোদ্ধারা প্রায় প্রতিদিনই গেরিলা পদ্ধতিতে আক্রমণ চালিয়ে রাজাকার, পুলিশ ও পাকসেনাদের কাছ থেকে কিছু অস্ত্র ছিনিয়ে নিতে শুরু করে।

ইতিমধ্যেই আমি খবর পাই লেঃ জিয়া সুন্দরবনে আছেন এবং মেজর জলিল তার কাছে আমার জন্য অস্ত্রশস্ত্র পাঠিয়েছেন। আস্ত্রশস্ত্র যোগাড়ের জন্য রুহুল আমিনকে নিয়ে আমি লেঃ জিয়ার কাছে সুন্দরবনে যাই। সুন্দরবনের বগীতে ফুল মিয়া একটা ঘাঁটি গেড়েছেন। সেখানে রুহুল আমিনকে নিয়ে আমি ফুল মিয়ার সাথে দেখা করি। জানতে পারি লেঃ জিয়া সুন্দরবনের অন্য ক্যাম্প মধুর ওখানে গেছেন। দুইদিন পর লেঃ জিয়া বগীতে ফিরে এলে তাঁকে আমার প্রয়োজনীয় কথা জানাই। লেঃ জিয়া আমাকে ৭টা এস-এল-আর, ২০টা ৩০৩টা রাইফেল, ২টা এনারগা গ্রেনেড ও গোলাবারুদ দেন। এসব অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বুকাবুনিতে ফিরে আসি। ৬টি এলাকার দায়িত্ব যাদেও দিয়েছিলাম, তারা তাদের নিজ নিজ এলাকায় রেকি করে বুকাবুনিয়ায় এসেছিল। তাদের প্রত্যেককে আমি ১টা কওে এস-এল-আর ও ৬টা করে রাইফেল, গ্রেনেড ও গোলাবারুদ ভাগ করে দিই। তাদের আমি পাকবাহিনীর সাথে সরাসরি আক্রমণ যেতে নিষেধ কার। কেননা, সে সময়ে আমাদের শক্তি খুবই কম ছিল। পাকবাহিনীর পিছন দিক থেকে আক্রমণ করে ব্যস্ত রাখতে বলি। অমি তাদের আরও নির্দেশ দিই রাজাকার-আলবদরদের উপর হামলা করার জন্য। রাজাকার-আলাদররা আমাদের কার্যকলাপে বেশ বাধার সৃষ্টি করছিল এবং জনগনের উপর অত্যাচার করত। জনগনের সমর্থন পাবার জন্য আমাদের এসব কার্যকলাপের প্রয়োজন ছিল। আমি তাদের থানা আক্রমণ করার নির্দেশ দিই শত্রুদের ভীতসন্ত্রস্ত করার জন্য।

জুলাই মাসের মাঝামাঝি আমি প্রথম গুরুত্বপুর্ণ অপারেশন চালাই। বুকাবুনিয়ার ভৌগোলিক গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। পটুয়াখালী ও বরিশাল সীমান্তের মধ্যে পটুয়াখালীর বামনা ও বরিশালের মঠবাড়িয়া ও কাঁঠালিয়া থানার সীমান্তের মধ্যে অবস্থিত। বিশখালী নদী হয়ে কাঁঠালিয়া ও বামনা হয়ে বুকাবুনিয়া আসা যায়। বুকাবুনিয়া থেকে এক মাইল দূরে রাজারহাট অবস্থিত। রাজারহাটে দালালদেও প্রতিপত্তি ছিল খুব। আমি বুঝতে পারলাম। এদেও উপর হামলা না করলে আমরা নিশ্চিন্তে কার্যকলাপ চালিয়ে যেতে পারব না। এইসব দালাল অনেক নিরীহ হিন্দুদের উপর অত্যাচার চালিয়ে হত্যা করেছিল। তাই একদিন আমরা অকস্মাৎ রাতে তাদের ঘাঁটিতে হামলা চালাই। আমাদের আক্রমণে তাদের ২ জন মারা যায় এবং ১৫ জনকে বন্দী করা হয়। এর ২/৩ দিন পর মঠবাড়িয়া থানা থেকে পুলিশ আসে। তারা কিছুদিন থেকে রাজারহাট ছেড়ে পালিয়ে যায়। এ আক্রমণের পর রাজারহাট আমাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। দালালদেও কার্যকলাপ বন্দ হয়ে যায়। আমাদের বুকাবুনিয়া ক্যাম্প ও নিরাপদ হয়।

মুক্তিযোদ্ধাদের এই প্রতিরোদের ফলে বুকাবুনিয়াতে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বেড়ে যায় এবং জনগনের মনোবল ও বেড়ে যায়। আগে যে এবটা গুজব ছিল যে বুকাবুনিয়াতে প্রায় ৪০০/৫০০ সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা আছে সেটা এখন সত্য বলে প্রমাণিত হয়। আশপাশের থানার পুলিশরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। বুকাবুনিয়ার মুক্তিবাহিনী সদর দফতরের গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়।

বামনা থানা থেকে পুলিশ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লোকজন ও রাজাকাররা এক সাথে বামনা বাজারে যেত। তারা নিরীহ জনগনের উপর অত্যাচার চালাত। দোকানে মিষ্টি ও চা খেয়ে পয়সা দিত না। এ খবর পাবার পর আমি তাদেও শাস্তি দিবার জন্য বামনা থানা ও বাজারের মধ্যে আগষ্টের প্রথম দিকের কোন একদিনে এ্যামবুশ পড়ে যায়। আমাদের আক্রমণে ওদেও ৭/৮ জন নিহত ও কয়েকজন আহত হয়। ৫টা রাইফেল আমাদের হস্তগত হয়। এতে বামনা বাজারের লোকদের মনোবল অনেক বেড়ে যায়।

কাঁঠালিয়া থেকে ৩ মাইল দূর আমুয়াবাজার একটা গুরুত্বপূর্ণ বন্দর। হাটের দিন পাসেনারা কয়েকজন রাজাকারকে নিয়ে বাজারের লোকদের মাইকে বলে যে মুক্তিযোদ্ধাদের যেন সহযোগিতা করা না হয়। তাদেরকে আক্রমণ করার জন্য কাঁঠালিয়া-আমুয়াবাজারের মধ্যে এক সেতুর নিকটে এ্যামবুশ পাতা হয়। এ ঘটনাটি ঘটে জুলাই মাসের শেষে। সেদিন ৫ জন পাকসেনা ১০ জন রাজাকারকে সঙ্গে নিয়ে সেতুর উপর উঠলে আমাদের এ্যামবুশ পড়ে যায়। এর ফলে ২ জন পাকসেনাসহ ৪ জন নিহত হয়। আমরা ৪টা রাইফেল দখল করি।

এই আক্রমণের পর কাঁঠালিয়া থানার রাজাকার এবং শান্তি কমিটির লোকদের মধ্যে ভীতির সঞ্চয় হয়। শান্তি কমিটির লোকেরা কাঁঠালিয়া ছেড়ে পালিয়ে যায়। ৪০ জন রাজাকার কাঁঠালিয়া কাঁঠালিয়া ছেড়ে যায়। ৫ জন রাজাকার আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়।

পটুয়াখালী থেকে পাকসেনারা পায়রা নদী দিয়ে বামনা-বরগুনা না গিয়ে অনেক ঘুর-পথে মির্জাগঞ্জের পাশ দিয়ে খালের মধ্যে দিয়ে লঞ্চে যেত। আগষ্টের প্রথম আমরা তাদের গতিবিধিতে বাধা দেবার জন্য মির্জাগঞ্জের নিকটে খালের দুধারে এ্যামবুশ পাতি। ১টি লঞ্চ করে যখন পাকসেনারা যাচ্ছিল তকন মির্জাগঞ্জের নিকটে আমাদের এ্যামবুশ পড়ে যায়। লঞ্চটি আমাদের হমলায় খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সঠিক হতাহতের সংখ্যা জানা না গেলেও পরে লোকমুখে জানা যায় যে, পাকসেনাদের ১০ জন নিহত হয়েছে।

বিশখালী নদীতে পাকসেনারা গানবোটে করে পাহারা দিত। রাতে তারা পাহারা দিত বলে আমাদের গতিবিধির জন্য অসুবিধার সৃষ্টি হয়। দিনের বেলায় তারা থানায় থানায় নামত এবং এলাকার অবস্থা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করত। নদী খব বড় থাকায় তারা আমাদের রাইফেলের আওতার বাইরে থাকতো, গুলিতে কিছু হত না। সেজন্য আগষ্টের শেষে পরিকল্পনা নিই দিনের বেলা যখন গানবোট থানার নিকট যাবে তখন আমরা নিকটে থেকে হমলা চালাব। সেইমত আমরা আগে থেকেই বামনা থানার নিকটে অবস্থান নিয়ে তৈরী থাকি। বিকেল ৫টার সময় যখন গানবোট তীরে আসে তখন আমরা শত্রুর গানবোটের উপর আচমকা গুলি চালাতে থাকি। এই গুলির জন্য তারা প্রস্তুত ছিল না। গানবোটের সারেং ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। ফলে গানবোটটা নদীর পাড়ে ধাক্কা খেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা বামনায় না থেমে কাঁঠালীয়ার দিকে যায়। সেখানেও তারা এই ঘটনার সম্মূখীন হয়। এরপর শত্রুরা বন্দরে বা থানায় নামা বন্ধ করে দেয়, কিন্তু দিনেও রাতে নদীর মধ্যে দিয়ে চলাচল করতে থাকি।

আগষ্ট মাসের শেষ সপ্তাহে সমগ্র পটুয়াখালী এলাকায় আমরা আমাদের তৎপরতা বাড়িয়ে তুলি এবং পাকসেনাদের গতিবিধি অনেক কমে যায়। আগষ্টের শেষে মেজর জলিল ৫০ জন ট্রেইন্ড যুবককে আমর এলাকায় পাঠিয়ে দেন। তারা তাদের সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে আসে। তারা ২০টা এল-এম-জিও নিয়ে আসে। ইতিমধ্যে আমার অস্ত্রের সংখ্যা ২০০-তে দাঁড়ায় ও গোলাবারুদ অভাব কিছুটা পুরণ হয়। এই সময় আামি পটুয়াখালী জেলার দুই শহরে পটুয়াখালী ও বরগুনাতে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রবেশ করাই এবং তারা শহরে তাদের কার্যকলাপ শুরু করে। বরগুনা শহরের আশপাশের খাল দিয়ে বিশেষভাবে তৈরী সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারপযোগী গানবোট চলাচল করত। আমরা তার ইপর হামলা চালাতাম এবং প্রয়োজন হলে বরগুনায়া ঢুকে আক্রমণ চালাতাম। পাকসেনাদের অমরা সামনাসামনি আক্রমণ না চালিয়ে গেরিলা কায়দায় আক্রমণ চালাতাম।

অগষ্টের শেষের দিকে পাকসেনারা আমাদের মহিষপুর ক্যাম্পে আকস্মিকভাবে হামলা চালায়। মহিষপুর ছিল তালতলী বন্দরের নিকটে অবস্থিত। এখান থেকে মুক্তিযোদ্ধারা আমতলী ও কুয়াকাটা থানায় হামলা চালাত। এ মহিষপুর থেকে বঙ্গোপসাগরের দূরত্ব ছিল খুবই কম। মহিষপুরের পিছনে জঙ্গলে ভর্তি ছিল। পাকসেনারা দালালদের কাছথেকে আমাদের মহিষপুর অবস্থানের খবর পেয়ে পটুয়াখালী থেখে লঞ্চে ও গানবোটে কওে মহিষপুরে আসে। পাকসেনারা ১টি দল মহিষপুর থেকে ৬/৭ মাইল দূরে নেমে হেঁটে আমাদের অবস্থানের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। অন্যান্য সৈন্যরা গানবোটে করে নদী হয়ে মহিষপুরের সামনে এস আমাদের উপর আক্রমণ চালায়। সকাল টার সময় পাকসেনারা তিনদিক থেকে আক্রমণ চালায়। আমরা এ আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। নদীর ধার থেকে আক্রমণ হতে পাওে এ আশংকা আামাদের ছিল কিন্তু স্থলপথে আক্রমণ হবে এ আমাদের কল্পনাতীত ছিল। তাদের আমাদের আক্রমণে হতবুদ্ধি হয়ে দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে শত্রুদের মোকাবিলা করি। বরিশাল ও পটুয়াখালী এলাকা সম্বন্ধে পাকসেনাদের জ্ঞান ছিল খুবই কম এবং এ জন্যে তারা এখানে খুব ভীতি ছিল। হামলা মোকাবিলার করার সঙ্গে সঙ্গে পাশ্ববর্তী গ্রাম থেকে আমাদের সমর্থনে জনগণ চিৎকার শুরু কওে দেয়। এতে শত্রুরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে মহিষপুর এলাকা পালাতে শুরু করে। এ যুদ্ধে ১১ জন পাকসেনা ও ১১ জন রাজাকার নিহত ও অনেক আহত হয়। তারা অস্ত্রশস্ত্র ও প্রচুর গোলাবারুদ ফেলে পালিয়ে যায়। আমাদের দুজন শহীদ হন। যে দুজন শহীদ হয়েছিলেন তারা কৃষক। আকস্মিক আক্রমণে তারা হতবুদ্ধি হয়ে যান। মহিষপুর থেকে অবস্থান তুলে নিয়ে আমরা অন্যত্র চলে যাই। পাকসেনারা পরে এসে মহিষপুরের পার্শ্ববর্তী গ্রামটি জ্বালিয়ে দেয়।

আগষ্টের শেষে ১৬ বছরের এক মুক্তিযোদ্ধা পটুয়াখালী সার্কিট হাউসে অবস্থানরত পাকসেনাদের লক্ষ্য করে ২টি গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে তাদেও কেউ মারা না গেলেও বেশ কয়একজন আহত হয়।

সেপ্টম্বরের প্রথম সপ্তাহে পাকসেনারা পটুয়াখালীর নিকটবর্তী গ্রামে প্রবেশ কওে ৫/৭ জন যুবক-বৃদ্ধকে মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে গ্রেপ্তার করে এবং তাদের মেরে ফেলবার জন্য নদীর পাড়ে নিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা এ খবর পেয়ে দ্রুত সে অবস্থানে গিয়ে পাকসেনাদের উপর গুলি চালায়। পাকসেনারা এতে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বন্দীদের ছেড়ে পালিয়ে যায়। যাদের বন্দী করা হয়েছিল তাদের মধ্যে একজন নিহত হয়। এর ফলে জনগণের মনে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর আস্থা বেড়ে যায়।

সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বেড়ে যায় এবং তাদের গ্রুপগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় কারা কত ভাল অপারেশন করছে তাই নিয়ে। দালালরা গ্রাম ছেড়ে শহরে আশ্রয় নেয়। পাকসেনাদের গতিবিধি অনেক কমে যায়। পাকসেনাদের গ্রামে দেখলেই মুক্তিযোদ্ধারা তাদের উপর হামলা চালাত। পটুয়াখালী, বরগুনা ও ৮টি থানা সদর এলাকা ছাড়া সমগ্র পটুয়াখালী এলাকা ছাড়া সমগ্র পটুয়াখালী এলাকা আমাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

বস্তুতঃপক্ষে এই সময় পটুয়াখালী জেলার সমস্ত থানা দপ্তর ছাড়া বাকি সমগ্র এলাকা মুক্তিযোদ্ধারা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। সারা সেপ্টেম্বর মাসই দুর্জয় মুক্তিফৌজ ক্রমাগত শত্রুর উুপর ছোটখাটো হামলা চালায়। বস্তুতঃপক্ষে শহর ছাড়া সমস্ত এলাকায় শত্রুর গতিবিধি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ কওে দেয়। এই সময় সমস্ত মুক্তিফৌজের মধ্যে একটা চর্মরোগ গেখা দেয়ায় মুক্তিযোদ্ধারা অবরুদ্ধ শত্রুর ঘাঁটির উপর আক্রমণ চালাতে পারেনি। তথাপি এই মাসে মুক্তিফৌজ প্রায় শ’খানেক অস্ত্র শত্রুর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল।

সেপ্টেম্বরের শেষার্ধ থেকে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের আক্রমণ আবার জোরদার করতে শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ভেঙ্গে গেছে, অস্ত্র নেই-পাকসেনারা এটা মনে করে আবার গ্রামের দিকে ঢুকতে ব্যর্থ প্রয়াষ চালায়। এই সময় পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ জনগনের মধ্যে বিভ্রান্তি এবং ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টির জন্য প্রচারণা চালাতে থাকে যে, ‘তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধারা’ প্রকৃতপক্ষে ভারতের সৈন্য এবং হিন্দু। এরা মুসলমান ধর্ম, কৃষ্টি সমাজ ব্যবস্থা ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এই প্রচারণায় জনগন মোটেই বিভ্রান্ত হয়নি। কারন, মুক্তিযোদ্ধারা তাদেরই পরিচিত লোক।

মুক্তিযোদ্ধারা সর্বদা ভাবতো জয় তাদের সুনিশ্চিত। কারন পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কোণঠাসা হয়ে গেছে। তাই এই সময় মুক্তিযোদ্ধারা আগের মত অতটা সতর্ক থাকত না। এর পরিণতিতে অক্টোবর মাসের মাঝমাঝি বরগুনার দাক্ষিণে কুয়াকাটা কাছাকাছি একদল মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তানী সৈন্যদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। মুক্তিযোদ্ধারা বরগুনার দিকে আসছিল। চারটা নৌকায় করে অতর্কিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীরা তাদের উপর প্রচন্ড গোলাবর্ষণ শুরু করে। আক্রান্ত হয়ে বাধ্য হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা জঙ্গলের ভেতর ঢুকে পড়ে। পাকবাহিনীর প্রায় আড়াই দিন ধওে গুলি ছুঁড়তে থাকে। সেই গোলাগুলির সময় আমাদের কিছু অস্ত্রশস্ত্র নদীতে ডুবে যায়। সেখানে থাকাকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার-দাবারের ভীষণ অসুবিধা হয়।

সেখান থেকে আমরা বরগুনা শহরের দিকে অগ্রসর হতে থাকি। বরগুনা থেকে আড়াই মাইল দূওে পাকিস্তানী চেকপোষ্টের উপর মুক্তিযোদ্ধারা হামলা চালায়। চেকপোস্টের ১২ জন পাকিস্তানী সৈন্য ছিল। স্থানিয় জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধারা ঐ চেকপোস্টের ঘিড়ে ফেলে। রাত বারটার দিকে তাদের উপর আচমকা হামলা চালানো হয়। মাত্র দেড় ঘন্টার যুদ্ধে ঐ চেকপোস্ট মুক্তিযোদ্ধারা দখল করে ফেলে। এখানে মুক্তিযোদ্ধারা ২৮ জনকে বন্দী করতে সক্ষম হয়-যার মধ্যে ৬ জন পাকসেনা ছিল, বাকি ছিল রাজাকার। এখানে একটা এল-এম-জি, ৭টা চাইনিজ ও ৩০৩টা রাইফেল, প্রচুর গুলি ও হ্যান্ড গ্রেনেড আমরা দখল করতে সক্ষম হই। বরগুনার শহরের নিকটে এত বড় একটা ক্যাম্প পতনের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মধ্যে ত্রাহি ভাব সৃষ্টি হয়। পাকসেনারা খুব ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, পটুয়াখালী থেকে একজন সুবেদার পালিয়ে ঢাকা যেতে চেষ্টা করে। কিন্তু পথে সে ধরা পড়ে।

অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে মেজর জলিল আমাকে ভারত যেতে বললেন। মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বৃদ্ধির জন্য তিনি বেশ কিছুসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা এবং অস্ত্রশস্ত্র পাঠিয়ে দেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি ভারতে যাবার পক্ষপাতি ছিলাম না। আমি মনে করতাম যে আমাদেও সত্যিকার আক্রমণাত্মক অভিযান শুরু হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গেরিলা কায়দায় তৎপরতা চালিয়ে পাকসেনাবাহিনীকে ভীতসন্ত্রস্ত রাখাটাই বেশী প্রয়োজন। যাই হোক, হেডকোয়ার্টারের নির্দেশে নভেম্বরের প্রথম দিকে আমি ভারত যেতে মনস্থির করে ফেললাম। যদিও আমার মুক্তিযোদ্ধারা মানসিক দিক হতাশ হয়ে পড়ছিল। তথাপি সমস্ত বেইস কমান্ডার্দেরকে ডেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলী লিখিতভাবে সবাইকে দিয়ে দিই এবং নভেম্বর মাসের প্রথম দিকে আমি দবার আবহাওয়া দরুন যাওয়া স্থগিত রাখি। আমার ট্রেনিং ক্যাম্পে প্রায় ৭০০ মুক্তিযোদ্ধা ছিল। আমি ৩৫০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে সামান্য অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে প্রায় দুহাজার নৌকাযোগে ভারতে পাঠিয়ে দিই। ৫/৭ দিন পর বাকি ৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রায় ৮০০ শরণার্থী নিয়ে আমি ঈদুল ফিতরের দিনে ভারতে রওনা হই। নভেম্বরের শেষ নাগাদ। এই দুর্গম হথের মাঝে মাঝে ছিল পাকসেনাবাহিনীর গানবোটের পাহারা। এই অবস্থার মধ্যে দিয়ে অর্ধাহারে-অনাহাওে চলতে চলতে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ ভারতের হাসনাবাদ গিয়ে পৌঁছি।

স্বাক্ষরঃ মেহেদী আলী ইমাম

*১৯৭১ সালে ক্যাপ্টেন হিসাবে কর্মরত ছিলেন