সাক্ষাৎকারঃ মোঃ নূরুল হুদা

Posted on Posted in 10

<১০, ১৮.৩, ৪২৯-৪৩৫>

সাক্ষাতকারঃ মোঃ নুরুল হুদা

১৮-৯-১৯৭৩

 

২৬শে এপ্রিল পাকবাহিনী পটুয়াখালী দখল করে ও নানা স্থানে তারা ব্যাপক আক্রমণ ও অত্যাচার আরম্ভ করে। নগন্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ওখানে অবস্থান করা আর সম্ভব হলো না। তাই অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষনের জন্য ভারত চলে গেলাম। পটুয়াখালী থেকে সুন্দরবন হয়ে ভারত যেতে আমাকে ও অপর দুজন সঙ্গী আতাহার ও ইউসুফকে অতিক্রম করতে হয়েছিল এক বিপদসঙ্কুল সুদীর্ঘ পথ। ভারত গিয়ে আমরা প্রথমে দেখা করলাম মেজর জলিল ও ক্যাপ্টেন হুদার সঙ্গে। তাঁরা তখন হাসানাবাদে। মে মাসের শেষের দিকে আমাদের ভর্তি করে দেয়া হলো ৯ নং সেক্টরের তকীপুর ক্যাম্পে। তখন তকীপুর ক্যাম্প ছিল ৯ নং সেক্তরের একমাত্র ক্যাম্প। ঐ অভ্যর্থনা ক্যাম্পে আমাদের নিয়ে মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৭০ জনে। কিছুদিন ওখানে থাকার পরে জুনের শেষের দিকে আমাদের পাঠানো হলো বিহারের চাকুলিয়া প্রশিক্ষন কেন্দ্রে। ওখানে আমাদের গেরিলা প্রশিক্ষন দেয়া হলো। ৬ সপ্তাহের গেরিলা প্রশিক্ষণ শেষ করে ফিরে এলাম ৯ নং সেক্টরে।

আগষ্ট মাসের এক রাত্রে আমরা বরিশাল সাব- সেক্টোরের জন্য নিযুক্ত কামান্ডার ক্যাপ্টেন ওমররের (শাজাহান) নেতৃত্বে বাগদা বর্ডার দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করলাম। আমরা বরিশালের বানারিপাড়া থানার বাড়াকুঠা স্কুলে শিবির স্থাপন করলাম। আসার পথে যশোরের একস্থানে আমরা পাকবাহিনীর বাঁধার সম্মুখীন হই। সংঘর্ষে লিপ্ত না হয়ে আমরা অন্য পথে অগ্রসর হই। আমরা যখন ফরিদপুরের হুলারহাটের কাছাকাছি, তখন আমরা একটি বিমান ও একটি গানবোট দ্বারা অনুসৃত হই। কিন্তু ক্যাপ্টেন ওমরের বিচক্ষনতার জন্য আমরা ওদের চোখে ধুলা দিয়ে বরিশালের দিকে অগ্রসর হতে সক্ষম হই। যেহেতু আমাদের সমস্ত তৎপরতা প্রধানতঃ বরিশাল জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, সে জন্য আমরা পথিমধ্যে সমস্ত সংঘর্ষ এড়িয়ে যাই।

আমরা জেলায় প্রবেশ করের পরের দিনই পাতারহাটের অনতিদূরে ক্যাপ্টেন ওমরের নেতৃত্বে পাকবাহিনীর একটি গানবোট ও দুটি লঞ্চ আক্রমণ করি এবং প্রত্যক্ষ সংঘর্ষে লিপ্ত হই। এই সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন পাকসৈন্য হতাহত হয়। ক্রমে ক্রমে আমাদের তৎপরতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। বরিশালের মুক্তিবাহিনীর ছোট ছোট দলগুলো একে একে ক্যাপ্টেন ওমরের একক নেতৃত্বে আমাদের সাথে যোগ দিল। আমাদের শক্তি আরও বেড়ে গেল। একে একে জয়শ্রী, উজিরপুর, বানারিপাড়া প্রভৃতি স্থানে সাফাল্যজনক অপারেশন চালানো হয়।

প্রথম দুটি স্থানে আমি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলাম না। গেরিলা কমান্ডো জামালের নেতৃত্বে আমি, নুরু, ওদুদ, হাকিম, ইসমাইল, সাখাওয়াত, আলতাফসহ ৮০ জনের একটি দল সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি বানারিপারায় অপারেশন চালাই। ৪ ঘণ্টা যুদ্ধের পর আমি, সাখাওয়াত, আলতাফ উইথড্রয়াল সংকেত পাওয়ার পর থানার ঘাট থেকে একটি লঞ্চ নিয়ে শিবিরে চলে আসি। এখানে বিপক্ষ দলের কয়েকজন হতাহত হয়। ওখানে কিছুদিন থাকার পর ক্যাপ্টেন অমরের কতগুলি যুদ্ধ সম্বন্ধীয় তথ্য অগুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট নিয়ে সেক্টর হেডকোয়ার্টারে চলে আসি। এখানে একজন লোকের কথা উল্লেখ না করলেই নয়। তার সাহায্য না পেলে দুর্গম ও বিপদসঙ্কুল অরন্য সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধাদের চলাচল ও তৎপরতা চালানো হয়ত অসম্ভব না হলেও অতটা সহজসাধ্য হোত না। এই লোকটির নাম রয়জদ্দিন- শিক্ষক আলোক থেকে বঞ্চিত।  এই লোকের কাছে আসি উজ্জ্বল দেশপ্রেমের নিদর্শন পেয়েছি। সুন্দরবন এলাকায় পাকবাহিনীর অবস্থান ও সম্ভাব্য আনাগনা ছিল তার নখদর্পণে। সুন্দরবনের দুর্গম ও অজ্ঞাত পথহ দিয়ে

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সে মুক্তিবাহিনীর পথপ্রদর্শকের ভুমিকা পালন করতো। সুন্দরবন দিয়ে আসা যাওয়ার শাতাধিক পথ তার জানা ছিল। আমি এবং আমার তিনজ সঙ্গী কবীর, খালেক ও নওশের এই রয়জদ্দিন মাঝির সাহায্যে ভারত এসে পৌছাই। ভারতে এসে মেজর জলিল সঙ্গে দেখা করি। তিনি তখন থাকতেন টাকি সেক্টর হেডকোয়ার্টারে। গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রগুলি পেয়ে উনি খুশি হলেন। ঐদিনই উনি আমাকে একটা দল নিয়ে পটুয়াখালী জেলায় আসার জন্য প্রস্তুত হতে বলেন।

আমি ৬০ জনের একটি দল সংগঠন করলাম। সেপ্টেম্বর মাসের একরাতে আরও অন্যান্য দলসহ প্রায় ৪০০ মুক্তিযোদ্ধা রয়জদ্দিন মাঝির সাহায্যে সুন্দরবন দিয়ে সুন্দরবনের একটি ঘাঁটি বগির দিকে অগ্রসর হই। বগী পৌছাতে প্রায় ৮/১০ দিন লেগে যায়। আমাদের অভ্যর্থনা জানায় সুন্দরবন এলাকার কমান্ডার ক্যাপ্টেন জিয়া। বগী থেকে যার যার নির্দেশিত এলাকায় যাবার প্রস্তুতি নিতে থাকি।       পাকবাহিনী টের পায় আমাদের অবস্থান। গানবোট আক্রমণ চালায় আমাদের ক্যাম্পে। মর্টার সেলিং চালাতে থাকে অনবরত। কিন্তু আমাদের কাছে লং-রেইঞ্জ ফায়ারিং অস্ত্রশস্ত্র না থাকায় এল-এম-জি-আর, ৩০৩ রাইফেল নিয়ে নদীর কুলে পজিশন নিয়ে থাকি। ওরা প্রায় ২ মাইল দূর থেকে শেলিং করে। কাছে আসতে সাহস না পেয়ে ছ’ঘণ্টা অনবরত শেলিং করার পর গানবোট নিয়ে চলে যায়। রাতে আমরা আমাদের অবস্থান সুন্দরবনের আরো একটু ভেতরের দিকে সরিয়ে নিই। পরের দিন সকালে আবার গানবোট আক্রমণ চালায় এবং সকাল ১১ টার দিকে ওরা চলে যায়। সাত মাইল প্রশস্ত বগী নদীতে সন্ধ্যা ৭ টার দিকে পাড়ি শুরু কর এরাত ১০ তার ওপারে চলে আসি। যার যার দল নিয়ে এবং পথপ্রদর্শক নিয়ে আমরা আমাদের নির্দেশিত এলাকার দিকে পায়ে হেঁটে রওনা দিই।

সেক্টর হেডকোয়ার্টার থেকে প্রয়োজনীয় কতকগুলো কাগজপত্র দিয়ে মেজর জলিল আমাকে পটুয়াখালী জেলার সাব- সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন মেহেদীর সাথে দেখা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ক্যাপ্টেন মেহেদী আলী ইমাম তখন ধামুরাহাটের কাছাকাছি বুকাবুনিয়ায় থাকতেন। তার ছদ্মনাম ছিল ক্যাপ্টেন কুমার।আমার তারিখটা থিক মনে নেই, তবে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম দিকে আমি আমার দল নিয়ে তাঁর সাথে দেখা করি। আমাদের পেয়ে তিনি খুশী হলেন। সাথে সাথে তিনি সকল এলাকা থেকে ছোট ছোট দলগুলোকে তাঁর হেডকোয়ার্টারে ডেকে পাঠালেন। সমস্ত জেলার ১০টা থানাকে তিনি মোট পাঁচটা ভাগে ভাগ করলেন। প্রতিটি জোনের জন্য একজন করে জোনাল কামান্ডার ঠিক করে দিলেন।

পটুয়াখালী ও গলাচিপা থানা নিয়ে জোন গঠন করা হয় দেয়া হয়েছিল আমার উপর। সবকিছু ঠিকঠাক হওয়ার পওে আমি আমার দল নিয়ে নির্দেশিত জায়গায় চলে আসি আমার সাথে যারা ছিল। সকলের নাম আমার মনে নেই। তবে যাদের নাম আমার মনে আছে তাদের নাম এখানে উল্লেখ করেছিঃ মোঃ নুরুল হুদা (কমান্ডা), হাবিবুর রহমান (শওকত সেকেন্ড- ইন-কমান্ড), খলিফা, মস্তফা, রবীন , ইউসুফ, সুলতান, হাবিব, শাজাহন , কুন্ড, গোমেস, ভূদেব, মান্নান, শরীফ, আবুল, জাহাঙ্গীর, ফোরকান, সুনীল, কাওসার; মন্মথন, লতিফ, আলম এবং অনেকে। মস্তাফা এবং কাওসার বুকাবুনিয়া থেকে আমাদের পথপ্রদর্শন করছিল।

ভারত থেকে আবদুল বারেক এম-সি-এ (পটুয়াখালী) আমাদেও মুক্তিবাহিনীর হিতাকাঙ্ক্ষী অনেকের নাম দিয়েছিলেন। সেই অনুসারে একদিন পানপট্টির মিঃ রবদের বাড়ী এসে উঠলাম আমি এবং মুস্তফা। রব সাহেব বিপুল উৎসাহ আমাদের সাথে সহযোগিতা করলেন। পনপট্টির একটি সাইকেনান শেলটাওে আমরা শিবির স্থাপন করলাম। ওখানে বসে পাক বাহিনীর বিভিন্ন ঘাঁটির উপর আক্রমণ চালাবার পরিকল্পনা করতে থাকলাম। পটুয়াখালী জেলার পাক জান্তা প্রধান তখন মেজর ইয়ামীন। আমাদের অবস্থান তার কানে গেল। আমরা গলাচিলা থানা আক্রমণ করার সমস্ত পরিকল্পনা এবং মানচিত্র ঠিক করে ফেলেছি। ৪০ জনের একটি দল নিয়ে গলাচিপা থানা আক্রমণে রওনা হলাম। কিন্তু বাস্তব এবং প্রতিকূল অবস্থান পরিপ্রেক্ষিতে সে রাতে গলাচিপা থানা আক্রমণ করা হলা না। এখানে উল্লেখ্য যে, আমরা আমাদের অপারেশনগুলো বেশীর ভাগই রাতের দিকে করতাম।

পানপট্টির যুদ্ধঃ তাঁবুতে ফিরে এসেছি রাত তিনটায় ৫/৬ জন সেনট্টি রেখে, বাকী সকালে ঘুমিয়ে নিচ্ছি। ঐ দিন রাত ৪টায় (১৮-১১-৭১) গলাচিপা বন্দরের ৫ বৎসরের বাবলুর ঘুম ভেঙ্গে গেল। তার বাসার সম্মুখ থেকে অনেকগুলো বুটের শব্দ তার কানে এলো। ধড়মড়িয়ে উঠে বসল বাবলু। সাবধানে জানালাটা খুলে দেখল পাকদস্যুও এক বাহিনী বিপুল অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হেঁটে যাচ্ছে। একটু পরেই কয়েকটা রাজাকারের চাপা আলোচনা থেকে ঝুঝতে পারলো পাকদস্যুরা আমাদের ক্যাম্প আক্রমণ করতে পানপট্টি যাচ্ছে। বাবলু ছিল গলাচিপা বন্দরে আমাদের একজন গুপ্তচর। আর তো বাবলুর বসে থাকা চলে না। পিছনের দরজা দিয়ে বাবলু আরম্ভ করল। এক নাগাড়ে ছয় মাইল দৌড়ে আমাদের শিবিরের উত্তর পাশের নদীটির পাওে ছুটে চলে এলো। দুর্ভাগ্য! ঘাটে খেয়া নেই। কিন্তু তাতে কি। বাবলু ঝাঁপিয়ে পড়ল নভেম্বরের ঠান্ডা নদীতে। সাঁতড়িয়ে চলে এলো এপার। আর একটা দৌড়। তারপর আমাদেও শিবির। আমাকে যখন বাবলু খবরটা দিল তখন সকাল ৬-৩০মিঃ। অন্য সকলে ঘুমে। শওকত ও উঠে গেল। ফল-ইন এর বাঁশি বাজিয়ে দিল শওকত সবাই ছুটে এল ফল-ইন-এ। সংক্ষেপে বুঝানো হল ব্যাপারটা। শওকতকে সাইক্লোন শেলটারের ছাদে। সেটা ছিল আমাদের ও-পি। বাইনোকুলার লাগিয়ে শওকত পাকবাহিনীর গতিবিধি সব বলে দিতে লাগল। আমি সেই অনুসাওে ঢেলে সাজালাম আমার দলের সবাইকে। আগে থেকেই আমাদের বাক্সক্ষার করা ছিল। আবুল ছিল প্রথম এল-এম-জি ম্যান। ভূদের, সুনীল ও শরীফ ছিল ওর গার্ড এবং সহকারী। সাইক্লোন শেলটারের ছিল দোতালা দালান।  দক্ষিন দিক থেকে একটা কাচা রাস্তা শেলটারের পশ্চিম পাশ ঘেঁষে সোজা উত্তর দিকে গলাচিপা দিকে চলে গেলে। এই রাস্তা ধওে কিছুদূও আসলে পানপট্টির সেই ছোট নদীটা সামনে পড়বে নদী পার হয়ে রাস্তা ধরে চলে গেলে একেবারে গলাচিপা পৌঁছা যায়। শেল্টারটার। সামনে একটা টিনের স্কুল তার পার একটা খালের কূলে কূলে কয়েকটা বাড়ি এবং ঠিক পশ্চিম পাশ্বের বাড়িগুলো লতাপাতায় ঘেরা- যা আমাদেরকে আড়াল আড়াল করে রেখেছিল। উত্তর দিকের সেই রাস্তাটার দু-পাশে একটু দূওে দু’একটা বাড়ি। পূর্ব দিকটার অনেকখানি জুড়ে ধানের মাঠ। দক্ষিন কোনে কাছাকাছি কোন বাড়ি নেই।

ও-পি থেকে শওকতের অবজারভেশন অনুযায়ী পশ্চিম দিকের শক্তি বাড়িয়ে দিলাম। রবিন, কুন্ড, মুস্তফা, কাওসার, গোমেস ওদেরকে রাখলাম পশ্চিম দিকের একটা বাড়ির পশ্চিম পাশে ৫০ গজ ব্যবধানে কভার করে। শওকতের তথ্য অনুযায়ী পাকসেনারা পশ্চিম দিক দিয়ে আমাদের মার্চ করতে পারে রবিনদের একটু দূরেই বাঁধ। আমাদের ক্যাম্পের পশ্চিম থেকে যদি খানসেনাদের আসতে হয় তবে ঐ বাঁধ পেরিয়ে আসতে হবে। শওকত দেখল খানসেনাদের একটা আমাদের সেন্টারের পশ্চিম পাশ দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। বাকী দু’দল পশ্চিম দিক থেকে আমাদের ক্যাম্পের দিকে আসছে। এই দুটোর একটা দল পশ্চিম দিকের একটা বাড়ির মধ্যে আত্মগোপন কওে রইল। বাকীটা ২৫/৩০জনে বিভক্ত হয়ে আগে-পাছে আমাদের ক্যাম্পের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ওদেও এই চতুর্থ দলে সর্বমোট প্রায় ৭০/৮০ জন খানসেনা ও দালাল সেনা।

শওকতের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য নিয়ে সকল পজিশনে আমাদেও প্লনটা জানিয়ে দিলাম। এস-এল-আর, ৩০৩ রাইফেল, ৩৬-এইচ-ই- গ্রেনেড নিয়ে সবাই মাটির সাথে লতাপাতার সাথে এক হয়ে গেছি আর এক দুই করে আসল সময়ের অপেক্ষা করছি। শওকতের কথাই ঠিক হলো, রবিনদের সামনের সেই বাঁধটার দিকে পাকসেনারা অগ্রসর হচ্ছে। প্রথম ব্যাচে ২৫/৩০ জন। ১৫/২০ জন  পশ্চিমা খান আর বাকীগুলো রাজাকার, পুলিশ। রবিনরা তাক করে শুয়ে আছে। অতি সতর্কতার সাথে খানদের দল বাঁধের উপর উঠে এসেছে। ৩/৪ জন বাঁধ পার হয়ে গেছে। অমনি রতনদেও দল ট্রিগার টিপল। গুডুম গুডুম কয়েকটা শব্দ এবং সাথে সাথে গোমেজ ছুড়ে মারল গ্রেনেড। ২টা পুলিশ ও ৬টা খানসেনা লুটিয়ে পড়ল। ছিটকিয়ে গেল খানদের দল। পুলিশ রাজাকাদের সামলাতে তাদেও বন্দুক উঁচিয়ে রাখতে হল। খানদের দল পিঁছিয়ে গেল খানিকটা । এটা ঘটল সকাল ৮ টার দিকে। আমরা চুপচাপ। শওকত আবার চলে গেল ওপিতে- দেখল ওদের গতিবিধি পাকা তিন ঘন্টা ধরে ওরা ওদের ছিটকিয়ে পড়া সাথীদের পশ্চিমে একটা বাড়ির আড়ালে একত্রিত করল। এর মধ্যেই খবর এলো ৩৭৫ জনের এই দলটি পরিচালনা করছেন পটুয়াখালী জেলার পাক জান্তা প্রধান মেজর ইয়ামিন নিজে। আমরা দলে ছিলাম ৬০জন মাত্র। অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে একটা এল-এম-জি, এস,এল আর, ৬টা স্টেনগান, ৩৫টা ৩০৩ রাইফেল। ওদের কাছে ২টা ২” মর্টার, ৭/৮ টা এল-এম-জি , চাইনিজ স্বয়ংক্রিয় রাইফেলসহ বহু আধুনিক হালকা অস্ত্রশস্ত্র। আমাকে খবরটা দিয়েছিল ওদেরই দলের একটা পুলিশ। প্রথমবারের গোলাগুলির সুযোগ পালিয়ে এসে আমাকে খবরটা দিয়ে সে আবার চলে গেল। একটু ঘাবড়ে গেলাম। কিন্তু মনের দূর্বলতা কাউকে টের পেতে দিলাম না। সকলকে সাহস দিয়ে চাঙ্গা রাখলাম। প্রথম দফান খানদেও হটিয়ে দিয়ে এবং ৮ জনের খতম করে প্রত্যোকের মনের আনন্দ লেগেছে।

আনুমানিক বেলা ১টার ওরা আমাদের ওরা আবার আমাদের তিনদিকে ঘিরে ফেলল । দক্ষিন। দিকটা খোলা রেখে পশ্চিম- উত্তর ও পূর্ব দিক থেকে ওরা আক্রমণ চালাল। পূর্বদিক দিয়ে ওরা আমাদের ক্যাম্পে আসতে পারবে না, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিন্ত ছিলাম। কারণ এ দিকটার ছিল ছিল অনেকখানি ধানের মাঠ। বহু দূরে থেকে ওদেরকে দেখা যাবে। ভয় হল উত্তর এবং পশ্চিম দিকটা নিয়ে। এই দুটো দিক শক্তিশালী করলাম। সব ধরনের ঝংকার তুলে বেপরোয়া হয়ে খানদের দল এগিয়ে আসতে লাগল। আমরাও মরীয়া হয়ে পাল্টা জবাব দিলাম। সুবিধা ছিল ধান খেতের মধ্যে পালিয়ে পালিয়ে আসলেও ওদের গতিবিধি দেখতে পাই। কিন্তু ওরা আমাদের টিকিটিরও সন্ধান পায় না। ওদের দল থেকে আর্তনাদেও শব্দ আমরা যতই শুনছি সাহস আমাদেও ততই বাড়ছে। তবুও ওরা থামে না। কয়েকটা ২” মার্টারের শেল আমাদও ট্রেঞ্চের আশেপাশে পড়ল। মাটি নরম থাকায় বাক্ট করল না সেগুলো।

ঠিক এমনি সংকটের সময়ে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিল আমাদের এল-এম-জি গ্রুপ। এল- এম-জি’টা নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল আবুল। চোরা একটা গলিপথ বিভিন্ন কোণে আরম্ভ করল ফায়ার। একবার পশ্চিম দিকের বাড়িগুলোর উপর, আবার একটা দৌড়ে সেখানে থেকে সওে এসে উত্তর দিকে ওদের পজিশন বারবার, আবার তার পর মুহুর্তে পূর্বে দিকে ওদের পরিশনের দিকে মুখ রেখে। ওদেরকে এস-এল-আর, স্টেনের স্বয়ংক্রিয় ফায়ারিং তো চালছেই। রাইফেল বসে নাই। গ্রেনেডও ফুটছে দুটো একটা। সে এক গগনবিদারী শব্দতান্ডব। সম্ভব হল না। রাইফেল ফেলে যে যেদিকে পারলো পালালো। অল্প কয়েকজন পা-চাটা বাঙ্গালী দালাল, তখনও মেজর ইয়ামিনের চারদিকে ঘুরছে। আমি ছিলাম পশ্চিম পাশ্বে আমাদের পজিশনের সবচেয়ে সামনের লাইনে। সিভিল ড্রেসে চীনা রাইফেল হাতে লম্বা একটা নজরে পড়ল। তার সাথে কয়েকটি খানসেনা। প্রায় এক হাজার গজ দূরে ছিল ওরা। তাক করে টিপলাম এস-এল-আরের শুয়ে পড়ল সিভিল ড্রেসধারী। ভাবলাম শেষ কিন্তু । শেষ হয় নাই। শুনেছি তিনিই ছিলেন মেজর ইয়ামিন। ঐ যে শুলেন আর উঠলেন গিয়ে ১ মাইল দূরে একটা নদীর পাড়ে, যেখানে তার জন্য স্পীডবোট তৈরী ছিল- অর্থাৎ প্রায় ১ মাইল পথ তিনি কখনও রোলিং কখনও ক্রলিং করে কোন রকমে কাদামাখা হয়ে স্পীডবোটে উঠে এক চস্পটে পটুয়াখালী।

ওদের আক্রমণের দ্বিতীয় পর্যায়ে আমরা প্রথম দিকে ওদের কয়েকজনেকে খতম করি এবং তার পূর্বে পরিকল্পনা অনুসারে তিনদিকে সমানে গুলি ছুড়া আরম্ভ করি, তার উপরে ছিল আবুলের এল-এম-জি চালানোর কৌশল। এতে করে ওরা আমাদের বিরাট বাহিনী ভেঙ্গে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। মোটামুটি বিকেল ৪ টার দিকে অপর পক্ষের আর কোন সাড়া শব্দ পেলাম না। যে যেখানে দিয়ে পেরেছে পালিয়ে বেঁচেছে। ৩০/৩৫ টা লাশ রেখে “মুক্তি বহুত হারামী হায়” বলে মামা আপন প্রাণ বাঁচা সারা বলে পৃষ্ঠাপ্রদর্শন করল।

আমাদের দলের রবিনের ডানহাতে একটা গুলি লেগেছিল। কিন্তু কাউকে না জানিয়ে গামছা দিয়ে বেঁধে সে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করছে। আমরা দলের অর্ধেকের বয়েস ছিল বিশের নীচে এবং কারো বয়সই ২৮- এর উপরে ছিল না। একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি যে, ২০-এর নীচের কচি ছেলেগুলো সবচেয়ে নয়, আমি যে ক’টা যুদ্ধের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলাম প্রায় সব যুদ্ধেও অভিজ্ঞতা থেকে এ কথা বলা যায়।

পল্লীর পর্ণকুটিরের আধা- শিক্ষিত অশিক্ষিত মানুষদের দেশপ্রেমের কোনদিন ভূলতে পারব না। তারা বন্দুক চালাতে পারে না। আধুনিক অস্ত্রের সামনে তারা তাই নিরূপায়। কিন্তু প্রাণের যে আবেগের পরিচয় তারা বিশেষ করে ঐ পানপট্টির যুদ্ধেও দিনে দেখিয়েছিল তার মর্যাদা দেবার মত যোগ্যতা আমার নেই। গ্রামবাসীরা জানতে, আমরা সকালে কিছু মুখে দিকে পারি নাই। পাক হানাদারদের রেইঞ্জের দূরের গ্রামে আমাদের জন্য মুড়ি, চিড়া, গুড়, শতে ডাব কেটে বালতি ভরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পৌঁছিয়ে দিয়েছিল। ছোট ছোট জঙ্গলের বাঁকে বাঁকে তারা আটার রুটি, গুড় এসব যে যেখানে পেরেছে পাঠিয়ে দিয়েছিল- নিয়ে এসেছিল। বিকেল ৫ টার সময় আসা আরম্ভ করল ভাত তরকারি, ডাল ইত্যাদি। এসকল খাদ্যসামগ্রী এত বেশী হাওে এসে জমা হল যে আমরা ১৫ দিন বসে খেয়েও শেষ করতে পারতাম না।

গলাচিপা আক্রমণঃ ৩/৪ দিন পর ঠিক করলাম তাদের ঘাটি আক্রমণ করতে হবে। শওকতকে প্রধান করে জাহাঙ্গীর, মোস্তাফা, হাব্বিসহ ৩৫ জনের দল পাঠালাম গলাচিপা আক্রমণ করতে। ওরা ঠিক পরিকল্পনা করল। মারা গেল বিপক্ষেও কয়েকজন। দিন শেষ হয়ে গেল। ওরা ফিওে এল শিবিওে। আবার পরিবল্পনা করল সেই রাতেই আক্রমণ করার । কিন্তু রাত আর আসতে পারলো না। দুপুরের দিকে সদলবলে থানা ছেড়ে পটুয়াখালী দিকে চম্পট। পেলাম রাতে। শওকত লাফিয়ে পড়ল। তখনই ১০ জনের একটা দল নিয়ে সে চলে গেল গলাচিপায়। পরের দিন বাকী সকলকে নিয়ে আমিও গিয়ে পৌঁছলাম। পটুয়াখালী থেকে জার্তিসংঘের একটা ছোট জাহাজে কয়েকজন পুলিশ দিয়ে মেজর ইয়ামিন একটা দল পাঠালেন পর্যবেক্ষণ করতে, অর্থাৎ গলাচিপা খবরাখবর সংগ্রহ করতে।

শব্দ শুনে রেডি হলাম। কিছুক্ষণ পর চোখ পড়ল জাতিসংঘের জাহাজটার গলাচিপা বন্দরের দিকে এগিয়ে আসছে। আমরা ওঁৎ পেতে থাকলাম। আওতার মধ্যে আসার সাথে সাথে আক্রমণ। প্রায় ১ মাইল এলাকা নিয়ে আমরা পজিশন নিয়েছিলাম। বাঙালী পুলিশগুলো তাদেও হাতের অস্ত্রশস্ত্র সব নদীতে ফেলে দিল। শেষ পর্যন্ত কূলে ভিড়ালো জাহাজটি। চেষ্টা করেছিল কাটিয়ে যেতেম কিন্তু পারল না। দখল করলাম জাহজটি। ওটার নাম ছিল ‘বাট্টি- মে-বি’। মালয়েশিয়ার লোক ছিল ক্রু। তাদের কাছ থেকে আমাদের এয়ার ফোর্স এর শাহজাহান, মজিদ, মিজান শিখে জাহাজটি চালাবার পদ্ধতি। মালয়েশিয়ানদের সসম্মানে জাহাজ থেকে উঠিয়ে যত্ন সহকারে তাদেরকে রাখলাম গলাচিপার একটি হোটেল। জাহজটাকে আমরা আমাদের যুদ্ধের কাজ ব্যবহার করলাম।

ডিসেম্বরের পাঁচ তারিখ। হাতেম আলী, আলমগীর, আজাদ, বারেক, ওদের সকালের নিকট ব্যক্তিগত চিঠি পাঠালাম পটুয়াখালী আক্রমণ করার প্ল্যান দিয়ে।

ডিসেম্বরর ১০ তারিখ। রাত ১০টার সময় বারেক তার দল নিয়ে পটুয়াখালীর উত্তর পার দিয়ে, আমি লোহালয়া অর্থাৎ পটুয়াখালীর পূর্ব দিক দিয়ে, হাতেম আলী ও আলমগীর দক্ষিন দিক দিয়ে এবং আজাদ পটুয়াখালীর পশ্চিম পার দিয়ে আক্রমণ চালাবে। পাঁচ কমান্ডারের একটা বৈঠক আহ্বান করলাম বগাবন্দরে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বগাবন্দার বাউফল থানার অন্তর্গত এবং পঞ্চম আলীর দল বাউফল থানা দখল করে নিয়েছিল। তখন পর্যন্ত গলাচিপা, বাউফল, বামনা ও বেগাতী থানা মুক্তিবাহিনীর দখলে।

খেপুপাড়া আক্রমণঃ ৬ই ডিসেম্বর আমরা খেপুপাড়া আক্রমণ করার পরিকল্পনা করলাম। জাহাজ এবং আরও একটা লঞ্চ নিয়ে রওয়ানা হলাম। খেপুপাড়ার ২ মাইল দূরে তিনটা দলে বিভক্ত হলাম শাজাহান (এয়ার ফোর্স-এর) যাবে জাহাজে। লঞ্চটা ওখানেই থাকবে। শাহজাহানের সাথে থাকবে এল-এম-জিসহ ১৫ জন রাইফেলধারী। সে খেপুপাড়া থানার ঘাটে জাহাজ ভিড়ায় স্বাভাবিক ভাবে। অন্যরা পজিশন নিয়ে থাকবে। থানার শত্রপক্ষ ভাববে তাদেরই গানবোট। জাহজটা অনেকটা গানবোটের মতই দেখতে। বিশেষ করে রাত্রে। পরিস্কার উর্দুতে শাজাহান থানার দারোগাকে ডাকবে এবং সকলকে জাহাজে উঠে আসার নির্দেশ দেবে। শাজানের দেহকৃতি পাঞ্জাবীদের মতই ছিল। শাজাহান পাকিস্তান আর্মির ক্যাপ্টেন অভিনয় করবে। জাহানের সামনে এসে শাজাহের নির্দেশ মতো ফল-ইন করবে। সাথে সাথে জাহজ থেকে এলমে-জি এবং রাইফেলের গুলিতে শেষ করা হবে সবগুলোকে। আমরা এর আগেই দুটো দল নিয়ে থানা ঘিরে ফেলব এবং থানার দিকে এলোপাতাড়ি গুলি করে থানায় পড়ব পরিকল্পনাটা ছিল এমনি সুন্দর। শওকতকে একটা ছোট খালের পুল পার হলে থানার উত্তর দিক দিয়ে পজিশন নিতে পাঠালাম। আমি একটা দল নিয়ে থানার পূর্ব দিক দিক দিয়ে একটা ছোট খালের পুল পার হয়ে থানার ৫০ গজের মধ্যে প্রস্তুত থাকব। শওকতের সাথে ইউসুফ, দেলোয়ার সহ ২৫ জনের একটা দল এবং আমার সাথে বাবুদা, হাবিব, রবীনসহ ২৫ জনের একটা দল। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, সরদার জাহাঙ্গীর একটা দল নিয়ে গলাচিপা এসেছিল। তার দলের সদস্য ছিল ৯জন । তারা আমার দলে যোগ দিয়ে দলকে শক্তিশালী করল। ক্যাপ্টেন মেহেদীর নির্দেশক্রমে গলাচিপা ও পটুয়াখালী থানার মুক্তিবাহিনীর অন্যান্য ছোট দলগুলিও আমার একক নেতৃত্ব মেনে নিয়ে কাজ করা শুরু করেছিল।

হাবীব খেপুপাড়ার ছেলে। সে সকলের সামনে, তার পিছনে আমি, আমার পিছনে বাবুদা। খেপুপাড়ায় কোনদিন যাইনি। হাবীব ছিল একমাত্র পথ-ঘাট চেনা ছেলে পুলের উপর উঠতে যাব, অমিন শত্রুপক্ষের পেট্রেল পার্টির সামনে পড়ে গেলাম। ওরা আমাদের উপর গুলি করল। কিন্তু আমাদের কারও গায়ে গুলি লাগাতে পারে নাই। তার পর আরম্ভ হল থানা থেকে গুলি করা করা। আমরা আর পার হতে পারলাম না। ওদিকে আমাদের জাহাজ থেকে পরিকল্পনা কার্যকরী হবার আগে গোলাগুলির শব্দ পেয়ে ওরাও থানার দিকে গুলি ছুড়ারো। আমরা সারারাত থানা ঘিরে রাখলাম। সকালে আমি চলে এলাম। শওকতের উপর সমস্ত ভার দিয়ে সমস্ত দল ওখান থেকে সরিয়ে আনলাম। চলে এলাম বাগবন্দর। আমার সাথে আনলাম বাবুদা, মাস্টার সাহেব, লতিফ, বাবুদা, ফোরকান, দেলোয়ার এদের কয়েকজনকে।

বগাবন্দর থেকে পাক জলযানের উপর আক্রমণঃ বগা এসে পৌঁছালাম ৮ তারিখ আট টার সময় পটুয়াখালী থেকে বগাতে টেলিফোন এলো যে পাক বাহিনী পালিয়ে যাচ্ছে। বগা তখন মুক্ত এলাকা ওখানে পঞ্চম আলীর দলের ১৫/১৬ জনের ঘাঁটি ছিল। আমাকে পেয়ে ওরা খুশী হল। বগা পোস্ট অফিসে অফিসে গিয়ে পটুয়াখালী সাথে যোগাযোগ করলাম। রাত নয়টার সময় দুটো লঞ্চে পাক জান্তারা দল ও দালালদের দল পালিয়ে আলস পটুয়াখালী থেকে। কিন্তু তাদের যেতে হবে বগাবন্দরের নদী দিয়ে। বাউফেল ফোন জানালাম সবকিছু। ফোন পেয়ে বাউফল থেকে একটা দল রওনা হলো বাগার দিকে।দুরত্ব ৮ মাইল পটুয়াখালী থেকে যথারীতি আমরা খবর পেতে থাকলাম। পটুয়াখালীর তকনকার ডি-সি আব্দুল আউয়ালের সাথে যোগাযোগ করলাম এবয় খবরের সভ্যতা প্রমাণ করলাম।

আমরা ২০ জনের মত লোক রাইফেল হাতে বগা নদীর কূলে পজিশন নিলাম। রাত দশটার সময় লঞ্চ দুটো আমাদের রেইঞ্জের মধ্যে এসে গেল। গুলি ছুড়লাম। ৩/৪ টা এল-এম-জির ব্রাশ। লঞ্চ দুটো রাখতে পারলাম না। ফুল স্পীড- এ চালিয়ে রেইঞ্জের বাইরে চলে গেল।

৯ তারিখ সকাল ৮টার সময় ভারতীয় বিমান বোম্বিং করল পটুয়াখালীতে। আমরা পটুয়াখালী চলে গেলাম। খবর পেয়ে অন্যান্য দলের কিছু কিছু মুক্তিবাহিনী চলে এসেছিল। থানা, পুলিশ ক্যাম্প সব দখলে নিয়ে নিলাম এবং প্রত্যেক পজিশন পয়েন্টে পড়া গার্ড মোতায়েন করলাম। ওদিকে পরের বারে খেপুপাড়া আক্রমণ করে এবং থানার সমস্ত অস্ত্রশস্ত্রসহ খেপুপাড়া থানা দখল করে নেয়। ৯ই ডিসেম্বরের মধ্যে আমরা পটুয়াখালী সমস্ত থানা সহ পটুয়াখালী কে মুক্ত ঘোষণা করলাম। তখন আমার কামান্ডে প্রায় ১৫০০ মুক্তিবাহিনী।