সাক্ষাৎকারঃ লেঃ কর্নেল এম. এ. ওসমান চৌধুরী

Posted on Posted in Uncategorized
শিরনামসূত্রতারিখ
১৫। ৮নং সেক্টরের সংঘটিত যুদ্ধবাংলা একাডেমীর দলিলপত্রমে-ডিসেম্বর১৯৭১

<১০, ১৫.১, ৩৬৭-৩৬৯>

সাক্ষাৎকারঃ লেঃ কর্নেল এম এ ওসমান চৌধুরী**

৩১-১-৭৪

খুলনা ও যশোরের ছিন্নমূল ও বিক্ষিপ্ত অনেক ইপি আর এবং আরও কিছু সংখ্যক নিয়মিত বাহিনীর সৈন্য  পুলিশ আমার সাথে যোগদান করে। আমি আমার সমস্ত  বাহিনীকে পুনঃসংঘটিত করে ৭টি কোম্পানীতে বিভক্ত করে করে ৭ জায়গায় ৭জন কোম্পানী কমান্ডারের অধীনে ৭টি বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়োগ করিঃ (১)প্রথম কোম্পানী উত্তরে মহেশকুন্ড বিওপি এলাকায় লেফটেন্যান্ট জাহাঙ্গীরের (বর্তমানে ক্যাপ্টেন) অধীনে। (২) দ্বিতীয় কোম্পানী তার দক্ষিণে জীবননগর বিওপি এলাকায় ক্যাপ্টেন মুস্তাফিজুর রহমানের অধীনে। (৪) ৪র্থ কোম্পানী কাশিপুর/ মুকুন্দপুর বিওপি এলাকায় ক্যাপ্টেন খন্দকার নাজমুল হুদার (বর্তমানে লেঃ কর্নেল) অধীনে ।(৫) ৫ম কোম্পানী বেনাপোল কাস্টম চেকপোস্ট এলাকায় ক্যাপ্টেন আবদুল হালিমের অধীনে। (অবশ্য এই কোম্পানীর কমান্ডার বেশ কয়েকবার পরিবর্তিত হয়। ক্যাপ্টেন তৌফিকও কিছুকাল এই কোম্পানীর কমান্ডার ছিলেন) (৬) ৬ ষ্ঠ কোম্পানী আরও দক্ষিণে বাকশা/ কাকডাঙ্গা বেনাপোল থানাধীন এলাকায় ক্যাপ্টেন শফিউল্লাহর অধীনে (৭) ৭ম কোম্পানী ভোমরা এলাকায় ক্যাপ্টেন( বর্তমান মেজর) সালাহউদ্দিনের অধীনে। মে মাসের শেষদিকে ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন হেডকোয়াটার  মুজিবনগরে বদলি হলে ক্যাপ্টেন মাহবুবউদ্দিনকে এই কোম্পানীর ভার দেয়া হয় ।

আমার বাহিনী পুনঃ সংগঠিত হওয়ার পর আমি সম্মুখ সমর পরিহার করে যথাসম্ভব গেরিলা পদ্ধতিতে শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য নির্দেশ দেই। মে মাসের প্রথমার্ধে মুজিবনগরে বাংলাদেশ ফোর্সেস হেড কোয়াটার সংগঠিত হয়। ঐ মাসেরই শেষার্ধে গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ করার পুরোপুরি সিদ্ধান্ত নেয়া এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ নিয়ম সহকারে সমস্ত সেক্টরে নির্দেশ প্রচার করা হয়। আমার সেক্টর হেড কোয়াটার স্থাপন করি বেনাপোলের সীমান্তবর্তী এলাকায়। ওখান থেকে সময়ে সময়ে যেসব বিদেশী গুরুত্বপূর্ণ লোকজন অথবা সাংবাদিকও টেলিভিশন রিপোর্টাররা যুদ্ধের প্রত্যক্ষ রিপোর্ট নিতে আসতেন, তাঁদেরকে বাংলাদেশের ভিতরে নিয়ে যেতাম। মে মাসের শেষার্ধে খবর আসলো যে, ইংল্যান্ড থেকে মাননীয় জন স্টোন হাউস এম পি ও মিঃ চেসওয়ার্থ মুক্তিবাহিনী দ্বারা মুক্ত এলাকা সত্যি বাংলাদেশের কিনা , সেই তথ্য পর্যবেক্ষণ করতে বাংলাদেশে আসবেন। আমার নির্দেশমত ব্যবস্থা হল ভারতের বয়রা এলাকা দিয়ে তাঁরা বাংলাদেশে ঢুকবেন। সব ব্যবস্থা করে আমি সীমান্তের একটা সীমান্ত খুঁটির কাছে মহামান্য অতিথিদের অপেক্ষায় রইলাম । অতিথিদের আগমনের সাথে সাথেই আমি তাদেরকে খুঁটি দেখিয়ে বললাম- -`This is the border survey post and the moment you have crossed this post, you are on the Bangladesh soil. Sir let us have a photograph here as a mark of identification between the two lands.” ওখানে ফটো তোলার জন্য তাঁদেরকে ভিতরে নিয়ে গেলাম।গাছের উপর, বাড়ির ছাদে, তাঁরা বাংলাদেশের পতাকার জন্য দেখতে পেলেন। পরিদর্শন করলেন আমার সেখানকার কোম্পানী হেড কোয়াটার। দেখতে পেলেন মুক্তিবাহিনীর আনাগোনা, কর্তব্য পালন, পাহারা ও ডিউটি পরিবর্তন ইত্যাদি।খুশি হলেন, আমাদের সাথে মোরগের মাংস দিয়ে দুপুরের খাওয়া খেলেন।আমাদের অধিকৃত চীনা হাতিয়ার হাতে নিয়ে বাংলাদেশের পতাকাকে পিছনে রেখে ছবি তুললেন।মুক্ত এলাকা পরিদর্শন করলেন। সবশেষে বিদায় নেবার পূর্বে মাননীয় স্টোনহাউসের আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট আমি স্বাক্ষরও সেক্টর হেড কোয়াটার মোহর দিয়ে লিখে দিলাম-‘‘Admitted into Bangladesh and allowed to visit liberal area.”

১৫ইমে থেকে নিয়মিতভাবে প্রত্যেক কোম্পানীকে সাপ্তাহিক অপারেশনাল ট্যাস্ক দিতে থাকলাম এবং সেগুলোর বাস্তব সিচুয়েশন রিপোর্ট নিয়মিতভাবে বিডিএফ হেডকোয়াটারে পাঠাতে থাকলাম।সেক্টর কমান্ডার হিসাবে আমি প্রতিনয়তই কোম্পানী থেকে কোম্পানী এলাকা ভ্রমণ,পরিদর্শনও অপারেশনাল কাজকর্মগুলো সমন্বয় করতে থাকলাম।

একটা কথা বলতে ভুলে গেছি যে, মে মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রাক্তন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট জামালুদ্দিন চৌধুরী এমপি-এ ও ক্যাপ্টেন আবদুল ওহাব এবং লেফটেন্যান্ট ইনামুল হক(বর্তমান ক্যাপ্টেন ও প্রেসিডেন্ট এডিসি) আমার হেডকোয়াটারে যোগদান করেন। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট জামালুদ্দিন চৌধুরীকে আমার সেক্টর সদর দপ্তরে স্টাফ ক্যাপ্টেন পদে নিয়োগ করি।সমস্ত অপারেশনের পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণও নির্দেশনার ভার ছিল তাঁর উপর,যা তিনি অতি সুষ্ঠু সমর পরিচালকের মত সম্পন্ন করেন।

প্রায় প্রত্যেক অপারেশন টাস্ক সম্পূর্ণ করতে গিয়ে কিছু না কিছু পাকসেনা হতাহত এবং অস্ত্রশস্ত্র হস্তগত করা হত।মাঝে মাঝে শত্রুসেনা বন্দীও করা হত।রাজাকার আত্মসমর্পণ,দালাল নিধন ইত্যাদি ছিল প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।তন্মধে উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ হয় ৭ম কোম্পানী এলাকায় ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিনের অধীনে।সেদিন ছিল ২৭মে ১৯৭১সাল। আমাদের অবস্থান ছিল সীমান্তবর্তী একটা বাঁধের উপরেও তার পিছনটায়। আমাদেরই এই উঁচু পজিশনের জন্য পাকিস্তানীরা কাছে ঘেঁষতে পারত না।দূর থেকেই তাদের আমরা তাড়িয়ে দিতে পারতাম।এই পজিশনটাকে ভাইটাল মনে করে পাকিস্তানীরা ২৭মে ভোর ৪টার দিকে ২ কোম্পানী সৈন্য দিয়ে আমাদেরকে আক্রমণ করে।তীব্র যুদ্ধের পর তাদের ঐ আক্রমণ প্রতিহত করা হয়। ২ঘণ্টা পর আবার তারা ২কোম্পানী সৈন্য নিয়ে আমাদের অবস্থানকে আক্রমণ করে। এবারও তাদের আক্রমণ ব্যর্থ করা হয়।এভাবে পরপর ৬বার তারা ২ কোম্পানী এবং ১ ব্যাটালিয়ন দিয়ে আলাদা আলাদাভাবে আমাদের উপর আক্রমণ চালায় কিন্ত ক্ষয়ক্ষতির পর তারা পিছপা হতে বাধ্য হয় এই যুদ্ধ ১৪ ঘণ্টাকাল স্থায়ী হয় এবং তাদের আনুমানিক ৩০০ সৈন্য হতাহত হয়। এর মধ্যে তাদের ব্যাটালিয়ন কমান্ডার আহত হয় এবং ব্যাটালিয়নের ২য় কমান্ডারও ১জন ক্যাপ্টেন মারা যায়। উৎসাহ ভরে এই ক্যাপ্টেনের লাশ নিজ এলাকায় দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় ঐ ক্যাপ্টেনের লাশ আনতে সক্ষম হয়। ঐ চেষ্টায় প্রথমত ১জন জওয়ান মারা যায়। দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় ঐ ক্যাপ্টেনের লাশ আনতে সক্ষম হয়।এছাড়া আরও ৫টি পাকসেনার লাশ উদ্ধার করে অপর বাংলার জনসাধারণকে দেখানোর জন্য পাঠানো হয়। ভারতীয় জনগণ বাঙ্গালীদের বীরত্বের ভূয়সী প্রশংসা করে। এভাবে চলতে থাকে আমাদের দৈনন্দিন মুক্তিযুদ্ধ এবং শত্রুহনন অভিযান। হিসেব করে দেখা গেছে এই সেক্টরে গড়ে প্রতি মাসে ৭০০ শত্রুসেনা নিধন হয়েছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে, ১৯৭১ সনের জুন অথবা জুলাই মাসে বাংলাদেশের সেনাপতিও ভারতীয় পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের মধ্যে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, বাংলাদেশের সেক্টরগুলিতে কিছু সংখ্যক ভারীও হালকা হাতিয়ার বন্ধুরাষ্ট্র ভারত আমাদেকে দেবে। সেই অনুযায়ী আমি বারবার ভারতীয় কমান্ডারদের কাছ থেকে চেয়েও ঐ হাতিয়ারগুলি পাইনি। সময়মত অস্ত্রশস্ত্র না পাওয়ার আমাদের যুদ্ধ চালাতে যথেষ্ট অসুবিধা হয়।

১৯৭১ সনের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ ফোর্সেস হেডকোয়াটার মুজিবনগরে সেক্টর কমান্ডারদের কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়।এই কনফারেন্সের উদ্বোধনী দিনে সাধারণভাবে বাংলাদেশ বাহিনীর সেনাপতি কর্নেল ওসমানীরই ভাষণ দেবার কথা,কিন্ত উদ্বোধনী ভাষণ শুরু করলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীও প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাননীয় তাজউদ্দিন আহমদ। ব্যবস্থানুযায়ী তা যদিও বা হল তবুও কর্নেল ওসমানীর উপস্থিতি সেখানে ছিল অপরিহার্য। কিন্ত তিনি নেই দেখেই ব্যাপারটা অস্বাভাবিক মনে হল। যাই হোক লম্বা- চওড়া উদ্বোধনী বক্তৃতার পর প্রধানমন্ত্রী সাহেব যা বললেন তার অর্থ হল- এই যে সেক্টর কমান্ডারদের অনাস্থাবশতঃকর্নেল ওসমানী পদত্যাগপত্র দাখিল করেছেন। তিনি অনুরোধ করলেন যে, ঐ সঙ্কট মুহূর্তে সেনাপতির পরিবর্তন আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অগভীরতা ও অনৈক্যেরই পরিচালক হবে। ব্যাপারটার গুরুত্ব উপলব্ধি করে আমরা সমস্ত সেক্টর কমান্ডারই কর্নেল ওসমানীর সেনাপতিত্বে আস্থা প্রকাশ করি।

প্রাসঙ্গিকভাবে একটা কথা বলতে চাই যে, কর্নেল ওসমানীর আদেশক্রমে আমার সেক্টর এর ইপিআর বাহিনী থেকে ভাল ভাল যুবক সৈনিকদের এক এক করে ছিন্নমূল প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে পুনঃসংগঠিত করি এবং আমরাই পাকসেনাদের কাছ থেকে দখলকৃত ভারীও হালকা অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ দিয়ে ওদেরকে সম্পূর্ণরূপে সজ্জিত করি। মে মাসের শেষদিকে এই পুনঃসংগঠিত ব্যাটালিয়নকে উত্তর-পূর্ব রণাঙ্গনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেনাপতির কাছে নিবেদন করেছিলাম যে, আমার বাহিনীর ‘ক্রিম অব সোলজারস’ নিয়ে গেলে আমার সেক্টরের ক্ষমতা বহুলাংশে কমে যাবে। তিনি বলেছিলেন যে, আমাকে নতুন নতুন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈন্য দেওয়া হবে। নতুন নতুন প্রশিক্ষিত সৈন্য আমি ঠিকই পেয়েছিলাম কিন্ত তারা ছিল গেরিলা ট্রেনিংপ্রাপ্ত অনিয়মিত বাহিনীর সদস্য যাদেরকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত করে অস্ত্রশস্ত্র –গোলাবারুদও সামান্য টাকাপয়সা দিয়ে ভিতরে পাঠিয়ে দিতে হয়েছে। আমার সেক্টর নিয়মিত বাহিনীর ‘ক্রিম অব সোলজারস’ চলে গেলো তার আর কোন দিন রিপ্লেসমেন্ট হয় নি। সময়ে সময়ে পাকিস্তান থেকে যেসব নিয়মিত বাহিনীর সৈন্যরা এসেছিল তাঁদেরকেও উত্তর-পূর্ব রণাঙ্গনেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। এতদসত্ত্বেও এই সেক্টরের সাফল্য প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত অন্য কোন সেক্টরের এর তুলনায় যে কম ছিল না, আন্তর্জাতিক দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক পত্রিকা এবং টেলিভিশনও রেডিও রীলগুলি স্টাডি করলেই বোঝা যাবে।

সপ্তাহকাল কোম্পানী এলাকাগুলো পরিভ্রমণও পরিদর্শনের পর ১৫ই আগস্ট বিকেল ৬টায় আমার সেক্টর সদর দপ্তরে পৌঁছে দেখতে পেলাম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর এম এ মঞ্জুর( বর্তমান কর্নেল) আমার অফিসে বসে আছেন। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে, তিনি ‘প্রপার মুভমেন্ট’ অর্ডার নিয়ে আমার থেকে সেক্টর এর কর্মভার গ্রহণ করার জন্য এসেছেন। শুনে অবশ্য আশ্চার্যবোধ করলাম যে, আমাকে না জানিয়ে এটা কেমন করে সম্ভব! টেলিফোন করে জানতে পারলাম যে, মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তরে মুজিবনগরে এসিস্ট্যান্ট চীফ অব স্টাফ(লজিস্টিকস) এই দপ্তরের সংগঠন ও দায়িত্ব পরিচালনার জন্য আমার ওখানে যাওয়া একান্ত প্রয়োজন। এই সংবাদে সেক্টর এর নিয়মিত বাহিনী অত্যন্ত বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। আমিও কমান্ড পরিবর্তনকে আমার উপর ইনসালট বলে মনে করি। এতদসত্ত্বেও সেনাপতির প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে ১৮ই আগস্ট বিকেলে সেক্টর-এর কর্মভার হস্তান্তর করে আমি মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তরে হাজির হই।

** ১৯৭১ সালে মেজর পদে কর্মরত ছিলেন।