সাক্ষাৎকারঃ লেঃ কর্নেল মোস্তাফিজুর রহমান

Posted on Posted in 10
শিরোনামসূত্রতারিখ
১৬।৮নং সেক্টরে সংঘটিত যুদ্ধ সম্পর্কে অন্যান্যের বিবরণবাংলা একাডেমীর দলিলপত্রমে-ডিসেম্বর ১৯৭১

<১০, ১৬.১, ৩৭২-৩৭৪>

সাক্ষাৎকারঃ লেঃ কর্নেল মোস্তাফিজুর রহমান

৬-১০-১৯৭৩

 

বেতাই, বানপুর, বনগাঁ, গোজাডাঙ্গা ইত্যাদি স্থানে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প করা হয়ঃ ১। বেতাই ক্যাম্পের কোম্পানী কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন আজম চৌধুরী। ২।বানপুরে ছিলেন ক্যাপ্টেন মোস্তাফিজুর রহমান। ৩।বয়রায় ছিলেন ক্যাপ্টেন কে,এন, হুদা। ৪। বনগাঁয় ছিলেন ক্যাপ্টেন তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী। ৫।গোজাডাঙ্গায় ছিলেন ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন এবং পরে ক্যাপ্টেন মাহবুব উদ্দিন।

আমাকে বানপুর ক্যাম্পে রাখার উদ্দেশ্যে ছিল, আমি ছিলাম প্রকৌশলী অফিসার। যশোর, ঈশ্বরদী, কুষ্টিয়াতে যে সমস্ত রেল চলাচল করত কৌশলে যাতে ঐ সমস্ত রেল লাইন চলাচল ব্যাহত করতে পারা যায় তার জন্য বিশেষভাবে আমাকে ক্যাম্পে নিয়োগ করা হয়।

মে মাসঃ মে মাসের ১২/১৩ তারিখে কুষ্টিয়া জেলার জীবননগর বিওপিতে অ্যামবুশ করে পাক আর্মিদের কাছ থেকে একটি জীপ দখল করা হয়। পাক আর্মি মাঝে মাঝে বিওপিতে আসত। তারা মুক্তিবাহিনীর হামলায় জীপটি রেখে চলে যায়। মুক্তিবাহিবাহিনী সর্বপ্রথম ঐ জীপটি পাকবাহিনী থেকে উদ্ধার করে। ঐ জীপের ভিতর থেকে পাক আর্মির ব্যক্তিগত চারখানা চিঠি উদ্ধার করা হয়। চিঠিগুলোর মধ্যে একটিতে উর্দুতে এক সৈন্য তার বাবার কাছে লিখেছে যে,’ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যেসব ঘটনা ঘটছে পশ্চিম পাকিস্তানে বসে শুনেছেন তার চেয়ে বহুগুণ সব ঘটছে।‘’ ২য় পত্র জনৈক সৈনিক তার বন্ধুর কাছে লিখেছেঃ ‘’একটি কমান্ডো ব্যাটালিয়নের চট্টগ্রাম যুদ্ধে আমরা ৪/৫ জন ছাড়া  আর সবাই মারা গেছে। আমাদের অন্য ব্যাটালিয়নের সাথে থেকে যুদ্ধ করতে হচ্ছে।’’

এভাবে যুদ্ধ করতে করতে মে মাস কেটে গেল। মে মাসের ১১/১২ তারিখে দর্শনাও জীবননগরের রাস্তার মাঝামাঝি স্থানে শিয়ালমারী নামে একটি জায়গা আছে। ঐ রাস্তায় মুক্তিযোদ্ধারা ৪ খানা বিধ্বংসী ট্যাঙ্ক মাইন লাগায়। সেখানে ব্রীজ না থাকার জন্য একটি ডাইভারশন সড়ক ছিল। এই মাইন লাগানোর ফলে পাকবাহিনীর একটি ট্রাক উল্টে যায়। এর ফলে ৮/১০ জন পাকসেনা মারা যায় এবং কিছু আহত হয়। মাইন বিস্ফোরণের সময় পাকবাহিনী বুঝতে পারেনি যে মাইন ফেটেছে। তারা মনে করেছিল মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ করেছে। ঐ রাস্তা দিয়ে একই সঙ্গে দুটি ট্রাকও একটি জীপ যাচ্ছিল। প্রথমে জীপটি রাস্তা পার হয়ে চলে যায়। পরে ট্রাকটি ধ্বংস হয় এবং সবার পিছনের ট্রাকটি রক্ষা পায়। পাকবাহিনী ওখানে ২/৪ গ্রামবাসীকে গুলি করে হত্যা করেও এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে থাকে।

মে মাসের ১৫তারিখের দিকে নায়েক বাশার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের(অনার্স) একজন ছাত্র বাবলু ও অপর তিনজন মুক্তিযোদ্ধাকে এক্সপ্লোসিভ দিয়ে দর্শনা থেকে ২ মাইল উত্তরে দুতপাতিলা নামক স্থানে রেলব্রীজ উড়িয়ে দেয়ার জন্য পাঠান হয়। তাদের কাজ ছিল ঐ দিনরাত্রিতে যে ট্রেনটি আসবে এবং তা যখন ব্রীজের উপর দিয়ে যাবে তখন তাকে এক্সপ্লোসিভ দিয়ে উড়িয়ে দেয়া। দুঃখের বিষয়, ঐ দিন সারারাত আর কোন ট্রেন আসেনি। মুক্তিযোদ্ধারা এক্সপ্লোসিভ তার নিয়ে পাশে আখক্ষেতে অপেক্ষা করছিল। ভোর বেলায় একজন কৃষক জমি চাষ করার জন্য ঐ পথ দিয়ে আসছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের ছাত্র মনে করেছিল যদি কৃষকের লাঙ্গলে এক্সপ্লোসিভের তার লাগে তবে তারটি উপরের দিকে উঠে যাবে। তাই ভেবে, কৃষকটি তারের কাছে আসার পূর্বেই সে এক্সপ্লোসিভ ফাটিয়ে দেয়, এর ফলে প্রচণ্ড আওয়াজ করে ব্রিজটি ধ্বংস হয়। এ আওয়াজ পেয়ে গ্রামবাসীরা যার যার ঘর থেকে বের হয়ে আসে। ঐ মুক্তিযোদ্ধারা আখক্ষেতে থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বাবুল ও নায়েক বাশার গ্রামবাসীর হাতে ধরা পড়ে যায়। কিন্ত গ্রামের মুসলিম লীগ দালালের খপ্পরে পড়ার ফলে মুসলিম লীগের দালালরা তাদেরকে দর্শনা পাকফৌজ ক্যাম্পে চালান করে দেয়। এরপর তাদের দুজনকে যশোর ও পরে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। ঢাকা বেতার থেকে তাদের বিবরণী প্রচার করা হয়েছিল। তাদের প্রহার করে কিছু কিছু গোপন সংবাদও তাদের মুখ থেকে বের করা হয়েছিল।

জুন মাসে তেমন কোন অপারেশন হয়নি। বিভিন্ন জায়গায় মাইন পোঁতা হয়েছিল, তাতে কোন কাজ হয়নি। বিভিন্নস্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের গ্রেনেড দিয়ে পাঠানো হয়েছিল, কিন্ত মুক্তিযোদ্ধারাও কোন অপারেশন করতে পারে নাই।

জুলাই১৯৭১ঃ১৩ই জুলাই দর্শনা পাকবাহিনীর ক্যাম্পে ভারতীয় বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধারা যৌথ উদ্যোগে রেইড করার ফলে ১২/১৪ জন পাকসেনা মারা যায়।

দর্শনা-ঝিনাইদহ রাস্তার ডিঙ্গাসহ ও জালসুক ব্রীজ দুটি এক্সপ্লোসিভ দিয়ে উড়িয়ে দেয়া হয়। এর ফলে পাকবাহিনীর চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।

জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসে মুক্তিযোদ্ধারা দর্শনা, জীবননগর, হাঁসদহ, খালিশপুর, কোটচাঁদপুর, কাপাশডাঙ্গা, দত্তনগর, কালিগঞ্জ ইত্যাদি স্থানে সড়কও রেলব্রীজের উপর এত বেশী মাইন পাতে যে, শেষপর্যন্ত পাকবাহিনী ট্রেনের ইঞ্জিনের সামনে বালির গাড়ি লাগিয়ে চলাচল করত, যাতে মাইনের আঘাতে ইঞ্জিন নষ্ট না হয়। এমনকি তারা গ্রামের লোকের হাতে  লণ্ঠন দিয়ে রাত্রে দেয়ার ব্যবস্থা করে, যাতে মুক্তিযোদ্ধারা মাইন লাগাতে না পারে। কিন্ত এত বাধাবিপত্তির পরও মুক্তিযোদ্ধারা মাইন লাগাত। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসগুলিতে যে সমস্ত মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং নিয়ে আমার ক্যাম্পে আসত তাদেরকে ভিতরে বেইস গড়ার জন্য পাঠাতে থাকি। এই বেইসগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ক্যাপ্টেন ওহাব সাহেবের নেতৃত্বে যশোর জেলার মাগুরাতে এবং কুষ্টিয়া জেলার হরিনাকুন্ডুতে  আবদুর রহমান নামে একজন প্রাক্তন সৈনিকের নেতৃত্বে ক্যাম্প খোলা হয়। ক্যাপ্টেন ওহাবের সাথে ছিলেন সহকারী লেঃ মোস্তফা এবং ৭০ জন নিয়মিত বাহিনীর লোক। ক্যাপ্টেন ওহাব মাত্র ৭০ জন সৈনিক নিয়ে মাগুরা যান। এ সংবাদ পাকসেনারা জানতে পায়। কিন্ত গুজব রটে যে, একজন ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে ৭/৮ হাজার মুক্তিযোদ্ধা মাগুরাতে অপারেশন করতে আসছে। এ সংবাদ জেনে পাকবাহিনীর সৈন্যরা মনোবল হারিয়ে ফেলে। শেষপর্যন্ত পাকবাহিনী ডিসেম্বর মাসে যুদ্ধের সময় মাগুরা থেকে ফরিদপুর চলে যায়। ক্যাপ্টেন ওহাব একটি সংবাদ যৌথ-সেনাবাহিনীর কাছে পৌঁছায় যে, মাগুরাতে পাকসেনাদের পেট্রোল ডিপো আছে।ডিসেম্বর মাসে ভারতীয় বিমানবাহিনীর আক্রমণে পেট্রোল ডিপোটি ধ্বংস হয়ে যায়। অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে হরিণাকুণ্ড ক্যাম্পের আবদুর রহমানের দল হরিণাকুণ্ড থানা আক্রমণ করে। এর ফলে একজন পাকিস্তানী ডি এস পি মারা যায়এবং ডি এস পির পোশাক হেড অফিসে পাঠিয়ে দেয়া হয় এবং ঐ থানা আক্রমণে কয়েকজন পুলিশ মারা যায়।

নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ভারতীয় সৈন্যরা তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের ভেতর প্রবেশ করতে থাকে। দর্শনা সীমান্তের বা দিকে মদনাতে ভারতীয় বাহিনীর ৪১ পাবর্ত বিগ্রেডের কিছু অংশ ঐ সমস্ত স্থানে মুক্তিবাহিনীকে সঙ্গে করে ডিফেন্স নিতে আরম্ভ করে। ভারতীয় বাহিনীর উপর একটি বিগ্রেড দর্শনার ডানদিকে( ভারত থেকে ডানদিকে) জীবননগর, দত্তনগর,কৃষিখামার, ধোপাখালি এলাকায় রেকি করতে থাকে। ১২ই নভেম্বর রাত্রিতে এক ভারতীয় প্লাটুন মুক্তিবাহিনীর সাথে মেজর বার্মার নেতৃত্বে এবং ২ জন ভারতীয় ক্যাপ্টেনের সাথে আমি ধোপাখালী বিওপি রেইড করতে যাই। এই রেইড করার ফলে পাকসেনাদের ১৫/২০ জন সৈন্য নিহত হয়। এ যুদ্ধে আমার পেটে গুলি লাগে। অয়ারলেস অপারেটর নায়েক মোহাববতের সহায়তায় ক্যাম্পে ফিরে যেতে সক্ষম হই। ঐ গুলি লাগে ২টার সময় এবং মেজর ভার্মা পায়ে ও হাতে আঘাত পান। আমাকে চিকিৎসার কোর ফিল্ড হাসপাতালে পাঠান হয়।

পাকিস্তানী সৈন্যরা বিগত কয়েকমাস যাবত যুদ্ধে কোনদিন আর্টিলারী ব্যবহার করেনি। কিন্ত ঐ দিনের অপারেশনে পাকিস্তানীরা তাদের সব অস্ত্র ব্যবহার করে। কিন্ত এ সমস্ত অস্ত্র ব্যবহার না করার ফলে মুক্তিযোদ্ধারা ও ভারতীয় বাহিনী জানত না পাকিস্তানীদের কি কি অস্ত্র এবং কোন স্থানে আছে। পাকবাহিনী তা ব্যবহারের পরে সমস্ত কিছু জানা গেল। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী ধোপাখালী(কুষ্টিয়া) বিওপি ব্যাপকভাবে আক্রমণ করে যার ফলে পাকবাহিনী আর্টিলারী ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। এই অপারেশনে মুক্তিবাহিনীও ভারতীয় বাহিনীর কোন ক্ষতি হয়নি।

*১৯৭১ সালে ক্যাপ্টেন পদে কর্মরত ছিলেন