সাক্ষাৎকারঃ সিপাই শফিক আহমেদ

Posted on Posted in 9

<৯, ৬, ২৩১-২৩৩>

সশস্ত্র প্রতিরোধ সিলেট
সাক্ষাৎকারঃ সিপাই শফিক আহমেদ

১১১৯৭৪

 

       আমি ২৫শে মার্চের পূর্ব থেকেই সেক্টর হেডকোয়ার্টার সিলেটে ছিলাম। সিলেটের অধীন তখন ৩টি উইং ছিল- ১নং, ৩নং এবং ১২ নং উইং। ১নং উইং কুমিল্লার কোটবাড়ীতে ছিল। ৩নং উইং এবং ১২নং উইং ছিল সিলেট শহরে। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন লেঃ কঃ সেকান্দার খান (অবাঙালি), সেকেণ্ড-ইন-কমাণ্ড ছিলেন মেজর করিম (অবাঙালি), এ্যাডজুটেন্ট ছিল ক্যাপ্টেন নসির নাজির (পাঞ্জাবী)। কোয়ার্টার মাস্টার ছিল একমাত্র বাঙালি অফিসার ক্যাপ্টেন আলাউদ্দিন। মেজর এম, এ, কুদ্দুস সেই সময় এ, এম, সি ছিলেন। সিগনাল অফিসার ছিল আহসান কাদির ফয়েজ। উল্লেখ্য যে, ভারতীয় বিমান হাইজ্যাকের পর থেকেই সিলেটের খাদিমনগরে একটি রেজিমেন্ট থাকতো। এখানে ৩১ পাঞ্জাব এবং এফ-এর একটি কোম্পানী থাকতো।

 

       সেক্টর হেডকোয়ার্টারে ইপিআর প্রায় ছিল না। সিগনালের একটি এবং সহকারী (কেরানী) সহ আমরা ৫০/৬০ জন ছিলাম। ১৯/২০ মার্চ থেকে ৩১ পাঞ্জাব-এর ১টি প্লাটুন ইপিআর সেক্টর হেডকোয়ার্টারে থাকা শুরু করে। ১২ নং শাখার ১টি প্লাটুন ২৪ শে মার্চ তারিখে সেক্টর হেডকোয়ার্টারে আসে। সেখানে মাত্র ৪/৫ জন বাঙালি ছিল, বাকী সবাই ছিল অবাঙালি।

 

       ২৬ শে মার্চ বিভিন্ন গ্রাম থেকে ঢাল, সড়কি, বল্লম নিয়ে হাজার হাজার জনতা সিলেট শহরে আসতে থাকে। পাক সেনারা তাদের উপর গুলি চালায়, বহু বেসামরিক নিরীহ লোক নিহত হয়। শহরে তখন কারফিউ চলছিল। ২৬ তারিখে যে সকল ইপিআর অফিসে অনুপস্থিত ছিল তাদেরকে কর্তৃপক্ষ ডেকে আনতে বললেন। ২৬ শে মার্চ আমাদেরকে একটি করে লাঠি দেয় আকস্মিক আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য।

 

২৮শে মার্চ কিছু বাঙালি ইপিআর অফিসে আসে। আমরা ঐ দিন অফিসে আসিনি। পরে আমাদের গাড়ীতে করে নিয়ে আসা হয়। ২৮ তারিখেই আলমারীর এবং অন্যান্য চাবি নিয়ে নেয় হয় এবং বলা হয় ‘তোমরা অফিসে এসো না, দরকার হলে আসতে বলবো’। ক্যাপ্টেন নসির নাজির এটা বলেন।

 

৩রা এপ্রিল পাঞ্জাব ১২নং উইং আক্রমণ করে সকালে। এই খবর এখানকার এপিআররা আগে থেকেই জানতে পেরে ঐ দিন অস্ত্রশস্ত্রসহ পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নেয়। ঐ দিন ঐ উইংয়ে পাঞ্জাবীদের আক্রমণে ৩জন ইপিআর গার্ড শহীন হন। আখালিয়াতে সেক্টর হেডকোয়ার্টারের একটি ৬ পাউন্ডের প্লাটুন থাকতো ট্রেনিং এর জন্য। ৩নং শাখার একটি কোম্পানী আখালিয়াতে থাকতো।

 

৪ঠা এপ্রিল ভোরের দিকে ৩১ পাঞ্জাব আখালিয়া আক্রমণ করে। ১২নং শাখার হেডকোয়ার্টার এভাবে পাকবাহিনীর হাতে চলে যায়। আখালিয়াও পাক সেনার হাতে চলে যায়। ৪ঠা এপ্রিল সিলেট সেক্টর থেকে আবাঙালি ইপিআরররা চলে যায়। পাক সেনারা ঐ তারিখের পর থেকে খাদিমপুরে থাকা শুরু করে।

 

উল্লেখ্য যে, ২৭শে মার্চ ক্যাপ্টেন গোলাম রসুল (১২নং শাখার সহকারী উইং কমান্ডার) বাঙালি মিশিয়ে একটি প্লাটুন শমসেরগন বিমান ঘাঁটিতে নিয়ে যায়। এই প্লাটুনের অগ্রবর্তী দলটি ১০/১২ জন ডজ গাড়ীতে করে শমসেরগন ডাকবাংলোতে আসে। এই দলের ড্রাইভার অগ্রণী হয়ে বলে, দ্বিতীয় দলে ক্যাপ্টেন সাহেব আসলে আমাদের বন্দী করতে পারে। অতএব, এখনই ক্যাপ্টেনকে খতন করে দিই। সাথে সাথে বাঙালি ইপিআররা ডাকবাংলোর ছাদের উপর উঠে যায় এবং লাইট মেশিনগান নিয়ে পজিশন নেয়। সাথে দুজন পাঞ্জাবী সিপাই পালিয়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে ক্যাপ্টেন গোলাম রসুল দ্বিতীয় গাড়ীতে আসে। ইপিআর দলটি উপর থেকে ফায়ার ওপেন করে। সাথে সাথে ক্যাপ্টেনসহ প্রায় সবাই নিহত হয়। ২/১ জন আহত অবস্থায় পালিয়ে যায়।

 

৩নং শাখা কমান্ডার জাবেদ বরকত চৌধুরী ঐ তারিখে একটি ইপিআর এর দল নিয়ে শমসেরণগর রওয়ানা হয়েছিল। পথে ক্যাপ্টেন গোলাম রসুলের মৃত্যুখবর শুনে ফিরে আসে। ৪ঠা এপ্রিলের পর থেকেই পাকসেনারা গাড়ী করে শহরে মাঝে মাঝে টহল দিতে থাকে।

 

অসহযোগ আন্দোলনের সময়েই সামরিক অফিসারের পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। কেবল জেসিও-এনসিওদের পরিবার ছিল।

 

৭ই এপ্রিল সকল পাকসেনা সিলেট শহরের খাদিমপুর ছেড়ে সালুটিকর বিমান বন্দরে ঘাঁটি গাড়ে। ঐ রাতে ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের ১১জন পুলিশকে পাকসেনারা হত্যা করে। সিলেট শহরে কিছু আনসার, মুজাহিদ, ইপিআর প্রবেশ করে।

 

পাকসেনারা সালুটিকর বিমান বন্দর থেকে গাড়ী করে সিলেট শহরে পেট্রোলিং করেতে আসতো। ৯ই এপ্রিল থেকে ১২ই এপ্রিলের মধ্যে পাকসেনারা সিলেট শহরে প্রবেশ করে। মুক্তিবাহিনীর সাথে খণ্ড যুদ্ধ। হয়।

 

সুরমা নদীর দক্ষিণ পাড়ে বেঙ্গল রেজিমেণ্টের একটি কোম্পানী ছিল। ইপিআর, আনসার, মুজাহিদ মিলে একটি কোম্পানীও ওখানে ছিল। পাকসেনাারা উত্তর দিক থেকে মুক্তিবাহিনীর উপর আক্রমণ চালায় ঐ তারিখে।

 

১২/১৩ এপ্রিল পাকসেনারা বিমান হামলাও চালায়। মুক্তিবাহিনী সব ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় পাকবাহিনীর প্রবল আক্রমনে। কিছু ইপিআর শেওরা নামক স্থানে আসে, সেখানে মেজর সি, আর দত্ত ছিলেন।

 

২৩ শে এপ্রিল তারিখে ইপিআর-আনসার মিলে ৩০০ এবং ভারতীর বিএসএফ বাহিনীর ৩০০ মত সৈন্য মিলিত হয়ে গোপালগঞ্জ নামক স্থানে ডিফেন্স নেয়। ২৪ শে এপ্রিল পাকসেনারা গোলাপগঞ্জের মুক্তিবাহিনীর অবস্থানের উপর আক্রমণ চালায় সকাল ৯/১০ টার সময়। আমাদের পার্টি পাল্টা আক্রমণ চালায়। যুদ্ধ আধঘণ্টা স্থায়ী হয়। পাকসেনারা পিছু হটে যায়। এরপর ভারতীয় বিএসএফ ভারতে চলে যায়। আমরা ইপিআর-রা শেওলাতে গেলাম।

 

২৭/২৮ এপ্রিল আমরা মাত্র একটি প্লাটুন ইপিআর ছিলাম শেওলাতে। আনসার ৪-৫ জন ছিল। পাকসেনারা আবার আমাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে শুনে আমরা টিকতে পারবো না ভেবে বড়গ্রাম বিওপিতে চলে গেলাম। মেজর দত্ত ও ক্যাপ্টেন রব আমাদের ঐ ক্যাম্পে যান। আমাদের হেডকোয়ার্টার করলেন বাংলাদেশ চেকপোস্ট সুতারকান্দি চেকপোস্টে। আমরা তখন ৫০ জনের মত ইপিআর হলাম। আমরা ডিফেন্স নিলাম বড়গ্রাম, মনিরং, কোনাগ্রাম এবং সুতারকান্দি চেকপোস্টে। পাক বাহিনী ইতিমধ্যে শেওলা দখল করে নেয়।

 

মে মাসের প্রথম থেকে ক্যাপ্টেন রব থাকতেন সুতারকান্দি চেকপোস্টে। ক্যাপ্টেন রব আমাদের নির্দেশ দিলে ‘হিট এণ্ড রান’ পদ্ধতিতে যুদ্ধ করতে। আমরা হঠাৎ করে পাক আর্মির উপর আক্রমণ করে আবার ঘাঁটিতে ফিরে আসি।

 

মে মাসের ২৩ তারিখে সব অবস্থান থেকে কিছু কিছু করে ইপিআর নিয়ে একটি প্লাটুন তৈরী করে হাবিলদার শামসুল হকে নেতৃত্বে লাতু নামক স্থানে যাই পাকসেনাদের আক্রমণ করতে। ঐ তারিখ রাতে আমরা পাক ঘাঁটির উপর ৩” মর্টার দিয়ে আক্রমণ করি। কিছু লোক ওখানে থাকে সকালে পর্যন্ত আক্রমণের ফলাফল দেখার জন্য। আমরা ১৪ জনের মত রাতেই ফিরে আসি।

২৪ শে মে ভোরে কয়েকশত পাকসেনা পুরা ভারী অস্ত্র নিয়ে আমাদের দিকে এগোতে থাকে। আমরা প্রথমে দেখতে পাইনি। আমাদের বড়গ্রাম, মন্দিরপোর্ট, কোনাগ্রাম পিছে ফেলে আমাদের চেকপোস্টে হামলা চালায়। আমরা তখন তিনটি ঘাঁটি থেকে একই সময় রাস্তার উপর দিয়ে অগ্রসরমান পাকসেনাদের আঘাত হানতে থাকি। চারিদিকের আক্রমণে বহু পাকসেনা নিহত হয়। পাকসেনারা পিছু হটে ফায়ার স্টপ করে। আমরা গুলির শব্দ না পেয়ে তিন পার্টিই রাস্তার উপর উঠে পড়ি, এমন সময় পিছন দিক থেকে আমার গুলির শব্দ পেলাম। পিছে গিয়ে দেখলাম, সমগ্র বড়গ্রাম ৩০০ মত পাকসেনা ঘিরে ফেলেছে, অপর দিকে কোনাগ্রামও ঘিরতে চেষ্টা করছে পাকসেনাদের অপর দল। আমাদের তখন একটাই পথ খোলা ছিল। আমাদের তখন গোলাবারুদ প্রায় শেষ, অস্ত্রও অনেক অকেজো। আমরা পিছু হটে পালাতে টেষ্টা করি। পাকসেনারা আমাদের পিছু ধাওয়া করে। এই সময় বেসামরিক বেশ কিছু লোক পাকবাহিনীর হাতে নিহত হয়। আমরা ৯জন রাস্তা ধরে ভারতের অর্ধ মাইল ভিতের চলে যাই। পাকসেনা তখনও গুলি ছুড়তে ছুড়তে এগিয়ে আসছিল। আমাদের আর পিছু হটার ক্ষমতা ছিল না। ৭/৮ জন পাকসেনারা গুলি করতে করতে ভারতে ঢুকে পড়ে। আমরা ভারতের ঐ স্থানে ৫টি এল-এম-জি পড়ে থাকতে দেখি একসাতে প্রস্তুত অবস্থায়। আমরা তখনই ৫টি এলএমজি নিয়ে পজিশন নিই। আমাদের কাছাকাছি আসলে আমরা গুলি চালাই। একজন সঙ্গে সঙ্গে পড়ে যায়। বাকিরা সব পালাতে থাকে। আমরা পাকবাহিনীর পিছু ধাওয়া করি। যে পাক সেনাটি পড়ে যায় তাকে আহত অবস্থার বন্দী করি। সে ছিল ৩১ পাঞ্জাবের হাবিলদার দোস্ত মোহাম্মদ। এই সময় ভারতীয় বিএসএফ বাহিনীর একজন কর্ণেল এসে বন্দীসহ আমাদেরকে ভারতে ফকিরাবাজার নিয়ে যান। এরপর পাকসেনারা এই এলাকা দখল করে নেয়। আমরা সবাই ভারতে আশ্রই নিই। আমি ৪নং সেক্টরে কর্নেল সি,আর, দত্তের নেতৃত্বে যুদ্ধ করি। আমার কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন রব।