সাক্ষাৎকারঃ সুবেদার আহম্মদ হোসেন

Posted on Posted in 9

<৯, ১০.৫, ৩০৩-৩০৬>

সশস্ত্র প্রতিরোধে দিনাজপুর
সাক্ষাতকারঃ সুবেদার আহম্মদ হোসেন

১৮-১১-১৯৭৪

 

আমি একাত্তরের মার্চে ৯ নং উইং হেডকোয়ার্টার ঠাকুরগাঁতেছিলাম। উইং- এর অধীনে ৫টি কোম্পানী ও একটি সাপোর্ট ছিল। হেডকোয়ার্টারে ছিল ‘ডি’ কোম্পানী, কমান্ডার ছিল এম এ হাফিজ। রুহিয়াতে ছিল ‘এ’ কোম্পানী, কমান্ডার ছিল সুবেদার কালা খান (পাঞ্জাবী)। ‘বি’ কোম্পানী ছিল চিলাহাটিতে, কমান্ডার ছিল একজন বিহারী। ‘সি’ কোম্পানী ছিল তেতুঁলিয়ায়, কমান্ডার ছিল (ভারপ্রাপ্ত) পাঞ্জাবী নায়েক সুবেদার মীর্জা খান। ‘ই’ কোম্পানী ছিল পঞ্চগড়ে, কমান্ডার ছিল মেজর মোহাম্মদ হোসেন। সেকেণ্ড-ইন-কমাণ্ড ছিল ক্যাপ্টেন নাবিদ আলম। নির্বাচনের পর থেকেই আমরা ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতাম।

 

২৫ শে মার্চের রাতে ‘ডি’ কোম্পানী উইং হেডকোয়ার্টারে ছিল। আমাদের উইং হেডকোয়ার্টারে ম্যাগাজিনের সঙ্গে মুজাহিদের জন্য একটি ম্যাগাজিন ছিল।৫জন পাকসেনারা দায়িত্বে থাকতো। পাক বিমান বাহিনীর চারজন লোক ও থাকতো। যারা সকল বিমানের গতিবিধি লক্ষ্য করতো এবং ঢাকা সেনানিবাসে রিপোর্ট করতো।

 

২৬শে মার্চ আমরা ঢাকায় পাক আক্রমণের খবর পেলাম।

 

৭ই মার্চের পর থেকে আমাদের আই- এস- ডিউটি বেড়ে যায়। তখন থেকেই অস্ত্র আমাদের সঙ্গে থাকতো।২৩শে মার্চ থেকেই কয়েকবার আমাদের কাছ থেকে অস্ত্র জমা নিয়ে নেবার চেষ্টা হয়। কিন্তু আমরা অস্ত্র কোতে জমা দেইনি।

 

আগে থেকেই জেনেছিলাম ২৮ শে মার্চ রাতে পাক বাহিনী আমাদের উপর আক্রমণ করতে পারে।তাই আমরা সুবেদার হাফিজের নেতৃত্বে ২৮শে মার্চ রাত সাড়ে ১০টায় উইং হেডকোয়ার্টারে অবস্থানরত সকল অবাঙালি ইপিআর বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ি। আই- এস ডিউটির জন্য আগে থেকেই উইং- এর চারপাশে বাঙ্কার তৈরী ছিল।

 

সুবেদার হাফিজ প্রথম উইং কমান্ডার ও সহকারী উইং কমান্ডারের গার্ডের উপর গুলি ছোড়েন। ২৫শে মার্চ ১০ টার কিছু আগে আমরা ক’জন যেমন- আমি, নায়েক সুবেদার মতিউর রহমান, বজল আহম্মদ চৌধুরী, সুবেদার এম এ হাফিজ এবং আতাউল হক মিলে সুবেদার মেজর কাজিমুদ্দিন সাহেবের বাসাতে গিয়েছিলাম আলাপ- আলোচনার জন্য। তখনই হাবিলদার আবু তালেব আমাদের কাছে এসে খবর দেয়, সুবেদার মেজর কাজিমুদ্দিনকে বন্দী করতে আসছে পাকসেনারা ৪ জন। আমরা তখনই বেরিয়ে আসি এবং যার যার অস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। সুবেদার হাফিজ তখনই চাইনিজ মেশিনগান নিয়ে মেজর সাহেবের বংলোতে যান এবং গুলি ছোড়েন। তারপর সারারাত ধরে উভয় পক্ষে গোলাগুলি চলতে থকে।কোতের দায়িত্বে ছিল সব অবাঙালি। ২৯শে মার্চ সুবেদার আতাউল হক ভূল বুঝাবুঝির জন্য বাঙালিদের গুলিতে মৃত্যুবরণ করেন। ঘটনাটি ছিল নিন্মরূপঃ

 

২৯শে মার্চ ভোরবেলা সুবেদার আতাউল হক ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন কি অবস্থা, এমন সময় সিদ্দিক নামে এক সিপাই বাঙ্কার থেকে উঠে এসে সুবেদার আতাউলহক সাহেবের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।সিপাই সিদ্দিক ভেবেছিল সুবেদার হয়তোকিছু বলবেন না।সুবেদার আতাউল হক সম্পূর্ণ নতুন, সবাইকে চিনতেন না ফলে সিদ্দিককে বিহারী মনে করেন এবং উর্দুতে ‘তুমি এখনও বেঁচে আছ’ বলেই স্টেন তোলে। সিদ্দিক ও সাথে সাথে রাইফেল তুলে গুলি চালায়। সুবেদার আতাউল হক ওই গুলিতে মৃত্যুবরণ করেন।

 

অবাঙালি ইপিআর থাকতো প্রধানতঃ তিনতলার উপর এবং কোয়ার্টার গার্ডে। এর ফলে তাদেরকে আয়ত্তে আনা কঠিন ছিল। ১লা এপ্রিল বেলা ৪টার মধ্যে আমরা উইং সম্পুর্ণ দখল করতে সক্ষম হই। অবাঙালি ক্যাপ্টেন নাবিদ আলম এবং ক্যাপ্টেন নজির আহমদ পালাতে গিয়ে জনতার হাতে ধরা পড়েন এবং সবাই মৃত্যুবরণ করেন।

 

২রা এপ্রিলের মধ্যে সীমান্তের সমস্ত ইপিআর উইং হেডকোয়ার্টারে চলে আসে সুবেদার মেজর কাজিমুদ্দিন সাহেবের নির্দেশক্রমে। আমাদের আনসার-মুজাহিদও এসে জমায়েত হয়।      

সুবেদার হাফিজের নেতৃত্বে আমরা একটি কোম্পানী  সৈয়দপুরের দিকে অগ্রসর হই ৩রা এপ্রিল। ৪ঠা এপ্রিল ভূষিরবন্দরে পুলের পাশে প্রতিরক্ষা ব্যূহ রচনা করি।

 

২৯শে মার্চ আমরা খবর পেলাম ৮/১০টি ট্রাক করে পাকসেনা ঠাকুরগাঁ- এর দিকে অগ্রসর হচ্ছে।আমরা তখনই যার যার মতো পজিশন নিয়ে তৈরী থাকলাম। দেখলাম সত্যই তারা আসছে। কিছুক্ষন পর সকাল ৯টার দিকে জানলাম তারা বেঙ্গল রেজিমেন্টের লোক।ক্যাপ্টেন আশরাফ সুবেদার মেজর খবর দেন আমরা শিবগঞ্জে বিমানবন্দরে আইএস ডিউটি করতে যাচ্ছি। কাজিমুদ্দিনের সন্দেহ হয়, তাই পুনরায় একটি সিপাইকে মোটর সাইকেল যোগে বেঙ্গল রেজিমেন্ট সম্পর্কে নিশ্চিত হতে বলেন।ক্যাপ্টেন আশরাফ নিজের সকল জোয়ানকে দেখিয়ে বলেন আমরা সবাই বেঙ্গল রেজিমেন্টের লোক। সিপাই ফিরে এসে সুবেদার মেজরকে রিপোর্ট করলে ক্যাপ্টেন আশরাফ তার কোম্পানী নিয়ে শিবগঞ্জ চলে যান। সুবেদার মেজর কাজিমুদ্দিন অনেক অনুরোধ করেন তাদের সাথে কাজে যোগ দেবার জন্য। কিন্তু ক্যাপ্টেন আশরাফ বিশ্বাস করতে পারেননি সব ঘটনা। ক্যাপ্টেন আশরাফ তার কোম্পানী নিয়ে শিবগঞ্জে পৌঁছালে তাঁর বেঙ্গল- এর ৩/৪ জন জোয়ানের দেখা পান। তারা উপরে পাকবাহিনীর আক্রমণের ঘটনার কথা জানায়। এই ৪ জন বলে, আমরা ২০/২৫ জন ছিলাম। কিন্তু দশমাইল নামক স্থানে পাঞ্জাবীরা আমাদের ঘেরাও করে। আমরা ক’জন পালাতে পেরেছি; অবশিষ্টদের খবর জানি না। ক্যাপ্টেন আশরাফ তখন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বীরগঞ্জে থেকে যান। আমরা সৈয়দপুরের দিকে অগ্রসর হতে বীরগঞ্জে উপস্থিত হলে ক্যাপ্টেন আশরাফের সাথে সাক্ষাৎ হয়। সুবেদার হাফিজ এবং ক্যাপ্টেন আশরাফ আলোচনা করেন। সৈয়দপুরের পথে ভূষিরবন্দর পুলের পাশে পৌঁছাই। পুলের বাম পাশে সৈয়দপুর- দিনাজপুর রাস্তায় আমরা এবং ডান পাশে আশরাফ তার কোম্পানী নিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যূহ রচনা করলেন।

 

৫ই এপ্রিল পাকবাহিনী ১১টি গাড়ী নিয়ে আমাদের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ৩য় বেঙ্গল প্রথমে মেশিনগানের গুলি ছোঁড়ে। পাকসেনারা সামনে অগ্রসর না হয়ে সৈয়দপুরে পালিয়ে যায়।

 

৫ই এপ্রিল তারিখে আমরা আরও ৬ মাইল সামনে চম্পাতলী নামক স্থানে যাই এবং রাতের মধ্যে ডিফেন্স নিই।

 

৬ই এপ্রিল পাকসেনারা সেনানিবাস থেকে দিনাজপুরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। আমাদের রাইফেলের আয়ত্তের মধ্যে আসলে আরম্ভ করি। দুই- তিন ঘণ্টা উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ চলে। পাকসেনারা ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে সেনানিবাসে চলে যায়।

 

ঐ তারিখেই বেলা আড়াইটা- তিনটার দিকে পাকসেনারা একটি ট্যাঙ্ক নিয়ে আমাদের দিকে অগ্রসর হয়। আমরা তখন সৈয়দপুর থেকে দুই মাইলের ভিতর। যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। পাকবাহিনীর আক্রমণে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই এবং বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পিছু হটতে থাকি। বামদিকে নীলফামারীর দিকে পিছু হটি। ৩য় বেঙ্গল এখান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।  

 

পাকসেনারা অগ্রসর হতে থাকে। বাড়িঘরে সব আগুন লাগাতে থাকে। সুবেদার হাফিজ আমাদের নিয়ে রাত ১১টায় দারয়ানী স্টেশনের পশ্চিম পাশে এক গ্রামে আকবর আলী চেয়ারম্যানের বাড়ীতে আশ্রয় নেন। আমরা তখন ৭০/৮০ জন ছিলাম।সেই রাতে আকবর আলী সকলের খাবারের ব্যবস্থা করেন। রাতে ওখানে থাকি।

 

৭ই এপ্রিল আমরা খানসামা নামক স্থানে গেলাম। সেখান থেকে খবর পেলাম নীলফামারীর ৮নং শাখার যে কোম্পানী ছিল তারা পাকবাহিনীর কব্জায় চলে যায়। খানসামাতে নদীরপাড়ে আমাদের ৯নং উইং –এর একটি প্লাটুন আগে থেকেই  ডিফেন্সে ছিল। আমরা এই প্লাটুনের সাথে একত্রিত হই। প্লাটুনকে রেখে আমরা বীরগঞ্জে চলে আসি। সেখানে ৮নং শাখার সুবেদার মেজর রব সাহেবের নির্দেশক্রমে খানসামাতে আমরা ডিফেন্স নিই এবং খানসামাতে অবস্থানরত দশমাইল স্ট্রং ডিফেন্স পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

 

১০ই এপ্রিল পাকসেনারা দশ মাইল  ডিফেন্সের উপর আক্রমণ করে। দশ মাইলে আমাদের বাহিনী টিকতে  ব্যর্থ হয়। সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। পাকসেনারা ভাতগাঁও নামক স্থানে আসে। ভাতগাঁওতে আমাদের ডিফেন্সের পতন ঘটে।

 

১০ই এপ্রিল রাতে আমরা খানসামা ছেড়ে দেবীগঞ্জ পৌঁছাই। ১১ই এপ্রিল সেখানে আমাদের উইং এর একটি কোম্পানী ও একটি প্লাটুন ছিল। আমরা দেবীগঞ্জ পথের পাশে ডিফেন্স নিলাম। ঠাকুরগাঁও থেকে খবর পেয়ে আমরা ১৩ই এপ্রিল ঠাকুরগাঁ পৌঁছাই। সেখান থেকে আমরা বীরগঞ্জ পৌঁছাই।

 

১৩ই এপ্রিল তারিখে খানসামাতে পাকবাহিনীর সামনেই  প্রতিরক্ষা ব্যূহ রচনা করি। রাত ৩টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত ফায়ারিং চলে। সকাল ৮ টায় আমরা পাকবাহিনীর মেশিনগানের অবস্থান জানতে পারি। আমি ২” মর্টার দিয়ে মেশিনগানের উপর গোলা ছুড়তে থাকি। পাকবাহিনী বহু ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে পালাতে থাকে। বহু পাকসেনা এখানে নিহত হয়।এখানে আমরা পাকবাহিনীর ঘাঁটি দখল করে নিই। দুই ট্রাক ভর্তি পাকবাহিনীর মালামাল উদ্ধার করি।

 

১৪ই এপ্রিল আমরা এই এলাকা দখল করে অসতর্ক অবস্থায় বসে ছিলাম। সেই সময় হঠাৎ করে পাকসেনারা নীলফামারী থেকে এসে আমদের উপর আক্রমণ করে বসে ।আমরা হঠাৎ আক্রমণে ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই। সবাই বিছিন্ন অবস্থায় পিছু হটতে থাকি এবং ১৬ই এপ্রিল পঞ্চগড় পৌঁছাই। তখন আমরা ৫০/৬০ জনের মতো ছিলাম। পঞ্চগড়ে ঠাকুরগাঁ থেকে সুবেদার মেজর কাজিমুদ্দিন সমস্ত গোলাগুলি, রেশন এবং সৈন্য নিয়ে অবস্থান করছিল। ১৭ই এপ্রিল আমরা এখানে ডিফেন্স নিই। তখন আমাদের কাছে একটি মেশিনগান ছিল । ১৯ শে এপ্রিল পাকসেনারা  আমাদের উপর আক্রমণ করে। ৯টায় এখানে ২/৩ ঘণ্টা যুদ্ধ হবার পর আমরা পিছু হটে ভজনপুর নামক স্থানে চলে যাই। এখানে নদীর পাড়ে ২০ শে এপ্রিল সকালে ডিফেন্স নিই। অন্যান্য স্থান থেকে টহল দিয়ে বেড়াতো। আমরা ভজনপুর থেকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পাকবাহিনীর উপর হঠাৎ হঠাৎ আক্রমণ চালাতে থাকি। ৮নং শাখার পতন ঘটলে ক্যাপ্টেন নজরুল আমাদের এখানে আসেন। তিনি দায়িত্ব নেন আমাদের। কিছুদিন পর  প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন এবং এম এ জি ওসমানী আসেন এবং ভাষন দেন। আমরা পুনরায় ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে পাকসেনাদেরকে খতম করতে এগিয়ে যাই। ভজনপুর সব সময় মুক্ত ছিল। আমরা বাংলাদেশের মাটিতে থেকেই দেশ মুক্ত হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ করেছি।