সাক্ষাৎকারঃ সুবেদার মেজর জিয়াউল হক

Posted on Posted in 9

<৯, ৫.২, ২১৬-২১৮>

সশস্ত্র প্রতিরোধে ময়মনসিংহ
সাক্ষাৎকারঃ সুবেদার মেজর জিয়াউল হক
৮-৬-৭১

২৬শে মার্চ বেলা একটার সময় ঢাকা ইপিআর হেডকোয়ার্টার থেকে কমর আব্বাসকে অয়ারলেস সেটে এ কথা বলার জন্য ডাকা হয়। তখন ডিউটি অপারেটর ছিল নায়েক ফরহাদ হোসেন (বাঙালি)। ঢাকা থেকে বলা হল, অয়ারলেস সেট অন করার পর সেখানে যেন কেউ না থাকে। তাই নায়েক ফরহাদ ঝুঁকি নিয়ে পাশের ঘরে একটা জায়গায় চুপি চুপি দাড়িয়ে থাকে। সৌভাগ্যবশত সে পাঞ্জাবী ভাষা বুঝতো। ঢাকা থেকে উইং কমান্ডারকে বলা হচ্ছিলো সমস্ত বাঙালি ইপিআরকে নিরস্ত্র করার জন্য এবং কোতে, ম্যাগাজিন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জায়গার চাবি নিয়ে নিতে এবং বাঙালিদের কোন ডিউটি না দেয়ার জন্য। ঢাকা থেকে ইপিআর-এর ষ্টাফ কর্ণেল সিকান্দার খান তাকে আরো বলে যে, আজ রাতের মধ্যে সমস্ত বাঙালি ইপিআরকে খতম করতে হবে এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় ইপিআরদের সমন্ধে তোমাকে পরে নির্দেশ দেয়া হবে।  

 

নায়েক ফরহাদ হোসেন অয়ারলেস সেট-এর পেছনে চুপি চুপি এই কথাগুলো শোনে এবং সমস্ত বাঙালি ইপিআরকে তা জানিয়ে দেয়। নায়েক ফরহাদ অয়ারলেস সেটে ২৭শে মার্চ আমাকে ভোর ছয়টার সময় উক্ত মেসেজ জানায় এবং বলে যে, আপনি আপনার বন্দোবস্ত করেন যদি বাঙালি জোয়ানদেরকে বাঁচাতে চান।  

 

সেই নির্দেশ অনুযায়ী সবাইকে নিরস্ত্র করা হয়। একমাত্র সি-কোম্পানীর এক প্লাটুন ইপিআর অস্ত্র সমর্পন করতে অস্বীকার করে। নিরস্ত্রকরণের মধ্যে সীমান্ত এলাকায় ইপিআর’রা অর্ন্তভুক্ত ছিল না। ঐ প্লাটুন-এর নেতা ছিল সুবেদার ফরিদউদ্দিন আহমদ।

 

এই ঘটনার পর থেকে স্থানীয় স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজের নেতৃস্থানীয় ছাত্রবৃন্দ ও আওয়ামী লীগ নের্তৃবৃন্দ, আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁরা আমাদেরকে যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সাহায্য ও সহযোগিতার আশ্বাস দেন। ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন ডাক্তার আবদুল্লা-আল-মাহমুদ ও তার সহকর্মীবৃন্দ, আর ছিলেন এডভোকেট সৈয়দ আহমেদ এবং তার সহকর্মীবৃন্দ, অধ্যক্ষ মতিয়ূর রহমান (আলমগীর মিন্টু কলেজ) সৈয়দ আবদুস সুলতান (বর্তমানে ইংল্যান্ডে হাই কমিশনার), জনাব রফিকউদ্দিন ভূঁইয়া, এডভোকেট মোশাররফ আকন্দ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং অন্যান্য স্থানীয় আওয়ামী লীগ নের্তৃবৃন্দ। মোজাফফর ন্যাপের অধ্যাপক আবদুল হান্নান ও অধ্যাপক দেওয়ান এবং ভাসানী সমর্থক ছাত্রনেতা আবদুল হামিদও ছিলেন।   

 

২৭শে মার্চ ক্যাপ্টেন কমর আব্বাস ঢাকায় নির্দেশ অনুসারে সমস্ত পশ্চিম পাকিস্তান জেসিও-এনসিওদের বাঙালি ইপিআরদের খতম করার নির্দেশ দেন রাত এগারোটার সময়। ট্রুপস ব্যারাক, উইং কমান্ডারের বাংলো এবং কোয়াটার গার্ড কোতে এবং ম্যাগাজিনের সমস্ত এলাকায় পশ্চিম পাকিস্তানী ইপিআরদের অস্ত্রশস্ত্র এবং গোলাবারুদসহ মোতায়েন করা হয়। উইং কমান্ডার-এর বাংলোতে সি কোম্পানী এক প্লাটুনকে ডিউটির জন্য মোতায়েন করা হয়। গার্ড কমান্ডার শফি এবং অন্য দুইজনের কাছে করে ৩০৩ রাইফেল ছিল। বাকীদের কাছে কোন অস্ত্রশস্ত্র ছিল না।

 

রাত এগারোটার সময় হেডকোয়ার্টারের তিন তলা থেকে হাবিলদার মেজর হাসিব উল্লাহ এক রাউণ্ড গুলি ফায়ার করে। সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক জায়গা থেকে ফায়ারিং শুরু হয়ে যায়। হেডকোয়ার্টারে তখন ২য় ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি কোম্পানী অবস্থান করছিলো। গোলাগুলি শুরু হবার পর বাঙালি ইপিআররা ওদের সাথে মিশে যায়। ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের নায়েক সুবেদার বড়ুয়া এবং সুলতান আমাদের জোয়ানদের সঙ্গে যোগ দেয় এবং তাদের অস্ত্রশস্ত্র বাঙালি ইপিআরদের দিয়ে দেয়। গোলাগুলি চলতে থাকে । ইতিমধ্যে ইপিআরের কিছু সাহসী বাঙালি জোয়ান স্থানীয় কয়েকজন ছাত্রের সহযোগিতায় কোতে এবং ম্যাগাজিনের ভেন্টিলেশন ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে অস্ত্রশস্ত্র বের করতে সমর্থ হয়। ২৮ শে মার্চ ভোরবেলা জনাব রফিকউদ্দিন ভূইয়া, শামসুল হক এমপি, ছাত্রনেতা আবুল হাশেম ও হামিদের সহযোগিতায় ময়সমসিংহ জেল এবং পুলিশ লাইনের অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ এনে বাঙালি ইপিআরদের দেয়া হয়।

 

২৮শে মার্চ বেলা ৮টা পযর্ন্ত দুই পক্ষে তুমুল লড়াই চলে। পশ্চিম পাকিস্তানীদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৯৩/৯৪ জন। ১১ জন জেসিও-এসসিও জেসিও মেসে সারারাত ফায়ার করার পর ১৭ থেকে ১৯ বাক্স গুলিসহ আত্মসমর্পন করে সুবেদার ফরিদের কাছে। ক্যাপ্টেন কমর আব্বাস সকালবেলা সিপাহী নান্নু মিয়া এবং আফতাব হোসেনের সাথে সংঘর্ষে নিহত হয়। উল্লেখযোগ্য যে, সিপাই নান্নু এবং আফতাব স্বাধীনতা সংগ্রামে কর্ণেল নুরুজ্জামানের অধীনে এবং ডালু সেক্টরে অত্যন্ত সাহস ও বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেছে।  

 

১১ জন জেসিও এনসিওকে সুবেদার ফরিদউদ্দিন ও অন্যান্যদের সহযোগিতায় ময়মনসিংহ জেলে বন্দী করা হয়। অতঃপর ময়মনসিংহের সকল বাঙালি জোয়ান এনসিও মেজর শফিউল্লাহর নের্তৃত্বে সংগঠিত হয়ে ৪/৬ কোম্পানী গঠন করে জয়দেবপুর ও টঙ্গী অভিমুখে যাত্রা করে।  

 

এদিকে রংপুর সীমান্ত এলাকায় মাদারচর বিওপি থেকে সিলেট সীমান্তের মহেশখোলা বিওপি পর্যন্ত ২৪টা বিওপি’র সমস্ত বাঙালি ইপিআরকে (প্রত্যেক বিওপিতে তিনজন করে রেখে) দুই কোম্পানীতে সংগঠিত করে সুবেদার মেজর আব্দুল হাকিম এবং আমার নেতৃত্বে মুক্তাগাছা, রসুলপুর, মধুপুর, জামালপুর, ঘাটাইল এলাকা পযর্ন্ত মোতায়েন করা হয়। তখন আমাদের সঙ্গে ময়মনসিংহ শহরের শামসুল হক এমপি, মুক্তগাছার শহীদুল্লাহ এমপি, রফিকউদ্দিন ভূঁইয়া, নাগরপুর কলেজের অধ্যক্ষ হুমায়ূন খালিদ, লতিদ সিদ্দিকী এম-পি এবং কাদের সিদ্দিকী আমাদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সাহায্য এবং সহযোগিতা করেন। এই সময় ময়মনসিংহ সদরে এসডিও, মেজর শফিউল্লাহর প্রতিনিধি ক্যাপ্টেন মতিয়ুর রহমান এবং জনাব রফিকুদ্দিন ভূইয়া, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ক্যাপ্টেন বালাজিৎ সিং ত্যাগী ও কর্ণেল রাংগাজান (৮৩ বিএসএফ ব্যাটালিয়ন কমান্ডার) এর সাথে যোগাযোগ করেন।  সঙ্গে সঙ্গে কোন সাহায্য না দিলেও ভবিষ্যতে কর্ণেল রাংগাজান আমাদের সাহায্যের আশ্বাস দেন। তিনি আমাদের সামনে দিল্লীতে এ ব্যাপারে ম্যাসেজ পাঠান। সৈয়দ নজরুল ইসলাম, রফিকুদ্দিন ভূইয়া, আব্দুল মান্নান (বর্তমানে পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রী) ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ আমার কোম্পানীর হেডকোয়ার্টার করইতলীতে (হালুয়াঘাটে) অবস্থান করছিলেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেব কে তাঁর বাড়ী থেকে আবুল হাশেম গাইড করে নিয়ে আসেন এবং আমাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে তাঁকে নেতা বানানো হয়। তাদেরকে কর্ণেল রাংগাজানের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় ভারতের গাচুয়াপাড়া রেষ্ট হাউস ইন্সপেকশন বাংলাতে।

 

সৈয়দ নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল প্রতিনিধি কলকাতাতে পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শ্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চলে যান। সীমান্ত এলাকায় বিভিন্ন ব্যাপারে সাহায্য ও সহযোগিতার ভার রফিকউদ্দিন ভূইয়ার উপর অর্পন করা হয়। অন্যকোন অস্ত্রশস্ত্র না পেলেও আমরা যথেষ্ট পরিমান হ্যাণ্ড গ্রেনেড এবং ২৭টি এলএমজি বিএসএফ ক্যাপ্টেন ত্যাগীর নিকট থেকে পাই। তিনি ছদ্মবেশে রসুলপুর এলাকাতে আমার সাথে কাজ করতে থাকেন। এছাড়াও প্রত্যেক রাত ভারত থেকে (ডালু এবং মহেন্দ্রগঞ্জ থেকে) ইন্ডিয়ান আর্মি ইঞ্জিনিয়ার টিম পুল এবং রাস্তা ধ্বংস করার জন্য আসতেন এবং কাজ সমাধা করে রাত্রেই চলে যেতেন। ২৭শে মার্চ ময়মনসিংহের উইং হেডকোর্য়াটারে পশ্চিম পাকিস্তানীদের খতম করার পর সীমান্তের সমস্ত পশ্চিম পাকিস্তানী ইপিআরদেরও খতম করা হয়।   

 

এপ্রিল মাসের দ্বিতীয় কি তৃতীয় সপ্তাহে আমাদের উপর কালিহাতি, রসুলপুর, মধুপুর, জামালপুর, মুক্তাগাছা, শম্ভুগঞ্জ, গৌরীপুর ইত্যাদি স্থানে পাকিস্তানী বিমান বাহিনী পর্যায়ক্রমে বিমান হামলা চালায়। তাদের সৈন্য সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে যেতে থাকে এবং ক্রমশ আমাদের বাঙালিদের মনোবল ভেঙ্গে যেতে থাকে বলে আমরা অনুমান করি। বিমান হামলার ফলে মেজর শফিউল্লাহ তার সৈন্যসামন্ত নিয়ে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার দিকে চলে যান।