সাক্ষাৎকারঃ সুবেদার মেজর মোহাম্মদ আবদুল খালেক

Posted on Posted in 9

<৯, ৯.৩ ২৮৩-২৮৭>

সৈয়দপুর-রংপুর প্রতিরোধে ৩য় বেঙ্গল রেজিমেন্ট
সাক্ষাৎকার : সুবেদার মেজর মোহাম্মদ আবদুল খালেক

১১-১০-১৯৭৩

৩য় বেঙ্গল রেজিমেন্টকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে দুটো কোম্পানী লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফজল করিমের নেতৃত্বে (যিনি ৩য় বেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসার ছিলেন) বগড়াতে চলে যায়্ দুটো কোম্পানী মেজর নিজামউদ্দীনের নেতৃত্বে ঘোড়াঘাটে (দিনাজপুর) পাঠানো হয় অনির্ধারিত সাঁতার প্রশিক্ষণের জন্য্ দু’জন অফিসার এবং কয়েকজন জেসিও-ও সাথে ছিল। হেডকোয়ার্টার কোম্পানী ইউনিট লাইনকে রক্ষা করার জন্য সৈয়দপুর থেকে যায়।

 

২১শে ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহের দিনগুলোতে প্রতিবেশী ইউনিট ২৬ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্ট এবং ২৩ ফিল্ড গোলন্দাজ বাহিনীর কোন নির্ধারিত প্রশিক্ষণ সূচী ছিলনা। ২৩ ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্ণেল আরশাদ কোরেশীকে সৈয়দপুরে গ্যারিসন কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। সুতরাং হেডকোয়ার্টার কোম্পানীর সবাইকে নিজেদের কাজকর্ম ছাড়াও তার নির্দেশমত কাজ করতে হত। ২৬ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স-এর কিছু লোক আমাদের কার্যকলাপ লক্ষ্য করার জন্য অস্ত্রশস্ত্র এবং অয়ারলেস সেটসহ পানির ট্যাঙ্ক পাহারা দেয়ার ভান করে ইউনিটে থাকতে আরম্ভ করে। অপরপক্ষে ২৩ গোলন্দাজ বাহিনী তাদের কিছুসংখ্যক মেশিনগানকে আমাদের ইউনিটের অস্ত্রাগার, খাদ্য গুদাম, গ্যারেজ প্রভৃতি লক্ষ্য করে তাক করে রাখে। এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা বলে যে, আমরা এই এলাকা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এগুলো লাগিয়েছি।

 

এছাড়াও তারা স্থানীয় জনসাধারণের উপর নানারকম নির্যাতন চালাচ্ছিল। অসহযোগ আন্দোলনের সময় জনসাধারণ সেনানিবাসে সৈনিকদের রসদপত্র সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল। তাই পশ্চিম পাকিস্থানী সৈন্যরা গ্রামে গিয়ে জোর করে গ্রামবাসীদের কাছ থেকে হাঁস মুরগী, ডিম, তরকারী নিয়ে আসত। কিন্তু বাঙালি সৈন্যরা গ্রামে গেলে জনগণ তাদেরকে সবকিছু দিয়ে সাহায্য করত।

 

এই সময় বগুড়ার ছাত্ররা বগুড়াতে যেখানে আমাদের কমান্ডিং অফিসার অবস্থান করছিলেন সেই ভবনের উপর বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে। তারা সিওকে ঘেরাও করে রেখেছিল। কমান্ডিং অফিসার বগুড়া থেকে ঘোড়াঘাটে চলে যান। সেখানে আরো দুটো কোম্পানী ছিল।

 

১৫ই মার্চ আর্টিলারী রেজিমেন্ট আমাদের ইউনিটের চারিদিকে পরিখা খনন করতে শুরু করে। আমরা ঘোড়াঘাটে আমাদের সিওকে এ খবর জানালাম। কমান্ডিং অফিসার কর্ণেল শফি (২৩ আর্টিলারী রেজিমেন্ট)কে এগুলো বন্ধ করতে অনুরোধ জানালেন। তাঁর অনুরোধে এ সমস্ত কাজ বন্ধ করা হয়েছিল।

 

মেজর আখতার ওসি হিসেবে রিয়ারে রয়ে গিয়েছিল। সে তার বাসায় টেলিফোন বসিয়েছিল। এমনকি গোপন অয়ারলেসের সাহায্যে ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী ইউনিট-এর খবরাখবর এবং যোগাযোগ রাখত। সে অনেক সময় কমান্ডিং অফিসারের নির্দেশ পালন করত না। আমরা এ সমস্ত খবরাখবর মেজর আখতারের উপস্থিতিতে আমাদের সিওকে জানালাম। এ সমস্ত কার্যকলাপের কথা শোনে সিও আর ঘোড়াঘাটে গেলেন না। তিনি ইউনিটে রয়ে গেলেন। তিনি আমাদেরকে সব সময় সান্ত্বনা দিতে এবং আমাদের উপর কোন হামলা হবে না আশ্বাস দিতেন।

 

রংপুরের ব্রিগেড কমান্ডার আমাদের সিওকে ঠাকুরগাঁ, বগুড়া, দিনাজপুর এবং পার্বতীপুরে যে সমস্ত সৈন্য আটকা পড়ে আছে তাদেরকে উদ্ধার করার জন্য বলেন।

 

৩১শে মার্চ বেলা সাড়ে বারটার দিকে রংপুর থেকে ব্রিগেড কমান্ডার সিওকে টেলিফোনে ডাকেন। তিনি ব্রিগেড কমান্ডারের সাথে কথা বলেন এবং দু’টার সময় অফিসে আসেন। সুবেদার মেজর হারিস মিয়াকে তিনি ডেকে পাঠান এবং তাঁরা রূদ্ধদ্বার কক্ষে আলোচনা করেন। বের হয়ে সকলের উদ্দেশ্যে তিনি এক ভাষণ দেন- ‘হাজেরানে অফিসার, সরদার আওর জোয়ানো, আপ সবকে লিয়ে ম্যায় এক খোশখবর লে আয়া হুঁ। ওয়হ ইয়ে হ্যায় কে কোর কমান্ডার, জিওসি আওর ব্রিগেড কমান্ডার কি তরফছে আপ সবকো মোবারকবাদ হায়। ইস লিয়ে কে ইস ওয়াকত তক কিছি পলিটিকাল পার্টিও নে হিসসা নিহি লিয়ে, আওর ম্যায় দাওয়া কে সাথ কাহ সেকতা কে থার্ড ব্যাটালিয়ান হর তরফছে পাকিস্থান সরকারকে ওফাদার রাহেগী। ম্যায় আপসে ওয়াদা করতে হুঁ আপ বরদাস্ত করে আওর মুঝ পর ভরোসা রাক্ষে- উছ ওয়াকত তক আপকো কুয়ি কুছ নেহি বোলেগা যব তক মুঝ পর কুইভি কুছ না বোলে।’ তারপর তিনি এ্যাডজুট্যান্ট লেফটেন্যান্ট সিরাজুল ইসলাম এবং তিনজন এনসিও ও ৩০ জন সিপাই সাথে নিয়ে রংপুর রওনা হয়ে যান এবং সেখান থেকে তিনি বগুড়া যান ২৬ এফএফ এবং ২৩ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারী সৈন্যদের ফিরিয়ে আনার জন্য যারা বগুড়াতে ইপিআরদের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়েছিল।

 

সেদিনই বেলা সাড়ে চারটার সময় ২৬ এফএফ এবং ফিল্ড রেজিমেন্ট (আর্টিলারী) ৬৪টা কনভয় নিয়ে ঘোড়াঘাটের দিকে যায়। সেখানে ৩য় বেঙ্গলের দুটো কোম্পানী ছিল। তারা তাদের উপর অতর্কিতে ভীষণভাবে গোলাগুলি ছুড়তে থাকে। অনন্যোপায় হয়ে বেঙ্গল রেজিমেন্টের লোকেরা ছোট অস্ত্র দিয়ে প্রত্যুত্তর দেয়। ঘটনাস্থলে ওদের ১৩ জন নিহত হয়। গ্যারিসন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্ণেল কোরেশী এবং আরো কয়েকজন সাদা পতাকা উত্তোলন করে বরং অস্ত্র সমর্পণ করে এবং বলে যে তারা মনে করেছিল এখানে ইপিআর-এর লোকজন আছে। তারা মেজর নিজামের সাথে আলাপ করল। মেজর নিজাম তাদেরকে চা পানে আপ্যায়িত করেন। লেফটেন্যান্ট রফিক তাদেরকে এগিয়ে দিয়ে যায়। যখনে লে. রফিক কোরেশীর সাথে করমর্দন করছিল তখন কোরেশী তাকে তাঁর জীপে উঠিয়ে নেয় এবং দ্রুত চলে যায়। সাথে সাথে এলএমজি থেকে কয়েক রাউণ্ড গোলা বর্ষণ করা হয় এবং আমাদের তিনজন খেলোয়ার ঘটনাস্থলে মারা যায়।

 

আমাদের কমান্ডিং অফিসার যখন রংপুর থেকে ৩০ মাইল দুরে পলাশবাড়ীর নিকটে আসেন তখন তিনি কোরেশীর কনভয়গুলো দেখতে পান। তারা সিও’র জীপ এবং অন্য ‍দুটো ডজ গাড়ী থামায় এবং কমান্ডিং অফিসারসহ সমস্ত বাঙালি সৈনিককে গাড়ী থেকে নামানো হয় এবং নিরস্ত্র করা হয়। বঙ্গশার্দুলদের তিনটা গাড়ী তাদের কনভয়-এর মাঝখানে রেখে তারা রংপুরের দিকে চলে যান। এই সময় লে. রফিক লে. সিরাজুল ইসলামের সাথে আলাপ করতে সমর্থ হয়। রে. রফিক লে. সিরাজুল ইসলামকে কানে কানে ঘোড়াঘাটের ঘটনা বলেন।

 

কনভয়গুলো রংপুরে ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে রাত ৮টার সময় পৌছে এবং কর্ণেল কোরেশী ব্রিগেড কমান্ডারের সাথে আলাপ করে। কিছুক্ষণ পর আবার কনভয়গুলো সৈয়দপুরের দিকে রওয়ানা হয়। সৈয়দপুরের দু’মাইল নিকট চেকপোষ্ট তৈরী করা হয়। সেখানে বঙ্গশার্দুলদের (৩৩ জন) ছিল সবাইকে একটা অন্ধকার দালানে তালাবন্ধ করে রাখা হয়। লে. সিরাজুল ইসলাম এবং রফিককে অন্য কোন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়।

 

আমাদের কাছে কোন অয়ারলেস সেট না থাকাতে বাইরের কোন খবর পাচ্ছিলাম না। ঢাকা থেকেও কোন খবর পাই নাই। কিন্তু সৈয়দপুরে আমরা মোট ১২০ জন ছিলাম। আমরা সব সময় সতর্ক ছিলাম। আমাদের অনেকেই পরিবার নিয়ে সেখানে ছিল।

 

২০শে মার্চ থেকে ৩১শে মার্চ পর্যন্ত আমরা কোন চিঠিপত্র পাচ্ছিলাম না। ৩১শে পর্যন্ত প্রচুর চিঠিপত্র আসল। আমি ওগুলো দেখতে পারলাম না, কেননা মেজর আখতার, ক্যাপ্টেন মালিক এবং আরো অনেকে আমার কোয়ার্টারে এসেছিল।

 

তারা বেলা ১টার সময় আমার বাসা থেকে চলে যায়। তারপর আমি অফিসে গেলাম। মেইল দেখে বাসায় ফিরছিলাম। মেজর আখতারকে আমাদের কমান্ডিং অফিসারের গাড়ীতে করে ঘুরতে দেখলাম।

 

আমি বাড়ীতে পৌছলাম এবং খেতে বসলাম্ তখনও আমি জীপের আওয়াজ শুনছিলাম। আগে থেকেই মেজর আখতারের কার্যকলাপ সন্দেহজনক ছিল। তাই খাওয়া ছেড়ে আমি বেরিয়ে আসলাম। সুবেদার আলী আহম্মদকে জীপটা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলাম। সে বলল যে, মেজর আখতার সুবেদার মেজর হারিস মিয়াকে ২৬ এফএফ-এর কমান্ডিং অফিসারের কাছে নিয়ে গিয়েছে। আমি তাড়াতাড়ি সেখানে গেলাম এবং সুবেদার মেজর এবং ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেনকে সেখানে দেখলাম। আমাদের কমান্ডিং অফিসার ২২৬ এফএফ রেজিমেন্ট অফিস থেকে ক্যাপ্টেন আনোয়ার ও সুবেদার মেজর হারিস মিয়াকে উপস্থিতির জন্য আদেশ দিয়েছিলেন। সে সংবাদ আমাকেও তারা জানান। ওখানে বসা অবস্থায় আবারও কমান্ডিং অফিসারের টেলিফোন আসে। তিনি ক্যাপ্টেন আনোয়ারকে ২৬ এফএফ-এর অফিসে ‍সুবেদার মেজরসহ যাওয়ার জন্য পীড়াপিড়ি করছিলেন। কিন্তু ক্যাপ্টেন আনোয়ার তাতে সায় দেন নাই। বরং তিনি সিওকে নিজেদের অফিসে আসার জন্য অনুরোদ করছিলেন। কমান্ডিং অফিসারের নির্দেশ অমান্য করার প্রধান কারণ হল মেজর আখতারের সন্দেহজনক কার্যকলাপ – যেহেতু তিনি নিজ অফিস সত্ত্বেও এক মুহুর্তের জন্যও তাঁর জীপ অফিসের সামনে দাঁড় করান নাই। কমান্ডিং অফিসার আবার ক্যাপ্টেন আনোয়ারকে টেলিফোনে বলেন, ‘আনোয়ার, অনুগ্রহ করে তুমি তাড়াতাড়ি চরে আস, ম্যায় তোমহারা ভালাই কা লিয়ে বোলা রাহা হোঁ।’ আমি ক্যাপ্টেন আনোয়ারের টেলিফোন হ্যাণ্ডসেটের সংলগ্ন থাকায় কমান্ডিং অফিসারের কণ্ঠস্বর শুনতে পাই। সে কণ্ঠস্বর কাঁপছিল বরে মনে হচ্ছিল। সুতরাং আমি তাদের যাবার জন্য সায় দিলাম না। তৎক্ষণাৎ সেখানে নায়েক সুবেদার (এডজুটেন্ট) শহীদউল্লা ভুইঞা (শহী) উপস্থিত হন্ আমরা সবাইকে সতর্ক থাকতে উপদেশ দিয়েছিলাম। আনুমানিক ১৫/২০ মিনিটের মধ্যে সমস্ত পরিবারবর্গ আমার বাসায় সমবেত হয়।

 

ঠিক ১লা এপ্রিল রাত ২টা ৪৫ মিনিটের সময় গোলন্দাজ বাহিনীর শেল বা গোলা আমাদের মোটর ট্রান্সপোর্ট গ্যারেজ ও পেট্রল পাম্পে এসে পড়ে। সেখানে সমস্ত যানবাহন আগুন লেগে ভস্মীভুত হয়্ এত ভীষণভাবে গোলাবর্ষণ হচ্ছিল যার দরুন রাস্তার উপর বৈদ্যুতিক তারসমূহ ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। কয়েকটা দালান, অস্ত্রাগার, খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ গুদাম ধ্বসে পড়ে যায়। তবুও অসমসাহসী ১২০ জন বঙ্গশার্দুল সকাল ৮টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত বীর বিক্রমে তাদের ওপর এই কাপুরুষোচিত আক্রমণকে প্রতিহত করে। জনশক্তি কম থাকায় এবং অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ না থাকায় তারা পশ্চাদপরণ করতে বাধ্য হয়। শত্রুর সংখ্যা ১৬০০ ছিল এবং তারা আধুনিক ভরী এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ছিল।

 

১লা এপ্রিল ভোর ৫-৩০টা নাগাদ আমি সমস্ত পরিবা-পরিজনকে (তারা প্রায় ৩০০ জন ছিল) নিকটবর্তী গ্রামের দিকে পাঠিয়ে দিতে সক্ষম হই।

 

এরপর আমি আমার বাসার নিকটবর্তী পরিখায় ১টা স্টেনগান, ১টা এলএমজি এবং কিছু গোলাবারুদসহ অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু সকাল ৮-৩০টার সময় আমার সামনে একটা মর্টারের গোলা এসে পড়ে। সুতরাং আমি পরিখা ত্যাগ করে গ্রামের দিকে অন্যান্য সঙ্গীদের খোঁজে চলে যাই।

 

আনুমানিক ১২-৩০টার সময় সেনানিবাস থেকে প্রায় ৫/৬ মাইল দুরে ক্যাপ্টেন আনোয়ার সাহেবের সঙ্গে আমার দেখা হয়্ তিনি তখন আমার সুবেদারের পদবী কাঁধ থেকে অপসারিত করেন এবং সান্ত্বনা দেন। আমরা আমাদের সৈন্যসংখ্যা গণনা করে মাত্র ৫০ জন দেখতে পেলাম। তারপর আমরা অন্যান্যদের খোঁজে বেরুলাম। কিছুসংখ্যক গুলিবিদ্ধ সৈন্যকে নিকটবর্তী বদরগঞ্জ বেসামরিক হাসপাতালে পাঠানো হয়। পাঁচজন বঙ্গশার্দুল শহীদ হয়। বাকি সবাইকে দুরদুরান্ত থেকে একত্র করা হয়।

 

পূর্বে রাত্রে প্রায় ৪-৪৫টার সময় আমি সুবেদার রহমতউল্লার কাছে একটি চিরকুট পার্বতীপুর পাঠাই। সেখানে মেজর শাফায়াত হোসেনের (পশ্চিম পাকিস্থানী) অধীনে প্রায় ৫০ জন বঙ্গশার্দুল ছিলেন। উক্ত চিরকুট তার কাছে বেলা ৮ ঘটিকায় পৌঁছে এবং তার মর্মানুসারে তিনি মেজর শাফায়াতকে হত্যা করে আমাদের সাহায্যের জন্য গ্রামের পথে অগ্রসর হন। সৌভাগ্যবশত: তার সাথে পথিমধ্যে আমাদের দেখা হয়। অনুরূপ সংবাদ ঘোড়াঘাটে মেজর নিজামউদ্দিন আহম্মদের কাছেও পাঠানো হয়। কিন্তু মেজর নিজামউদ্দিন উক্ত সংবাদ পাওয়া সত্ত্বেও কমান্ডিং অফিসারের বিনা অনুমতিতে সেখান থেকে আসতে অস্বীকার করেন।

 

ঘোড়াঘাটের সংঘর্ষে যে তিনজন বঙ্গশার্দুল শাহাদাৎবরণ করেন তাদের দাফনের জন্য সুবেদার আওয়াল খান (পাঠান)কে দায়িত্ব দেয়া হয়। তার সাথে ১২ জন প্রহরী দেয়া হয়েছিল। সে তখন মৃতদেহ নিয়ে কারমাইকেল কলেজের (রংপুর) সামনে আসে ও রাস্তা অতিক্রম করতে থাকে তখন পথিমধ্যে বাধাপ্রাপ্ত হয়। সে গাড়ী থেকে নামার সাথে সাথে পাকসেনারা গুলি ছুড়তে শুরু করে। গুলিতে ১১ জন বঙ্গশার্দুল নিহত হয়। আওয়াল খান গ্রামের দিকে পালিয়ে যায়। তাকে ছাত্ররা ধরে পিটিয়ে হত্যা করে।

 

খান সৈন্যদের হত্যাযজ্ঞ: যাদেরকে (৩৩ জন) সৈয়দপুরের দু’মাইল দুরবর্তী অন্ধকার দালানে তালাবদ্ধ অবস্থায় রাখা হয়েছিল তাদের সবাইকে রাত ২টা ৪৫ মিনিটে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেখানে আব্দুল কাদের নামক একজন সিপাহী মৃতদেহের স্তুপের মধ্য থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল। আমাদের ব্যাটালিয়নের প্রায় শতকরা ৭৫ ভাগ সৈন্য বদরগঞ্জের নিকটবর্তী কোলাহাটি নামক জায়গায় একত্র হয়।

 

আমরা ২/৩রা এপ্রিল পার্বতীপুর আক্রমণ করি এবং পাকবাহিনীকে প্রতিহত করা হয়। কিন্তু পার্বতীপুর শহর দখল করতে ব্যার্থ হই।

 

১২ এপ্রিল বদরগঞ্জে পাকবাহিনীর সাথে (১৫টি ট্রাক বোঝাই) আমাদের সংঘর্ষ হয়। পাকবাহিনীকে পর্যুদস্ত করা হয়। আমি এবং সুবেদার শহীদুল্লাহ এই যুদ্ধের কমাণ্ড করেছিলাম।

 

১৩ই এপ্রিল পাকবাহিনী ট্যাংক নিয়ে আমাদের উপর আক্রমণ চালায়। তীব্র আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে আমরা পশ্চাদপরণ করতে বাধ্য হই। বদরগঞ্জ সংঘর্ষ শুরু হওয়ার প্রায় দু’ঘন্টা আগে রংপুর থেকে রংপুরের তৎকালীন এসপি বদরগঞ্জ থানা পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে ২৯ ক্যাভলরির একজন মেজরকে পাঠান ড্রাইভারের বেশে বদরগঞ্জে নিয়ে আসে। এসপি’র সাথে কথোপকথনের পর উক্ত ড্রাইভারের পরিচয় জানতে চাওয়ায় তাকে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশের ড্রাইভারের পরিচয় দেয়া হয়। কিন্তু উক্ত মেজর (ড্রাইভার) আমার আগের পরিচিত ছিল। আমি তাকে চ্যালেঞ্জ করায় সে স্বীকার করে। পরে তাকে আমাদের ক্যাম্পে পাঠানো হয় ও হত্যা করা হয়। এসপিকেও গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু সে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

 

তারপর আমরা ফুলবাড়িতে এসে ক্যাম্প করলাম। কিন্তু মুসলীম লীগাররা আমাদের অবস্থান পাকবাহিনিীর গোচরীভুত করে। সেখানেও তারা ট্যাংক নিয়ে আমাদের উপর আক্রমণ চালায়। তারপর আমরা চরকাই (হিলির সীমান্তের কাছাকাছি)তে স্থানান্তরিত করি এবং আমাদের কন্ট্রোল রুমসহ হেডকোয়ার্টার তৎকালীন পাকিস্থানের হিলিতে স্থাপন করি।

 

২২শে এপ্রিল ১৯৭১ পাকবাহিনী আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে বর্ডার বেল্টের ভেতরে আমাদের উপর আক্রমণ করে। তখন অনন্যপায় হয়ে আমরা ভারতের হিলিতে আশ্রয় নিই এবং আমাদের যথারীতি কার্যকলাপ চালিয়ে যেতে থাকি।

 

২৪শে এপ্রিল ১৯৭১ তারা ভারতের হিলির উপরও আক্রমণ করতে দ্বিধাবোধ করে নাই। ঐ দিন অত্যন্ত ঝড়বৃষ্টি ছিল এবং আমাদের সৈন্যরা তাদের সঙ্গে টিকতে না পেরে এদিক সেদিক ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।

 

২৫শে এপ্রিল ৩য় বেঙ্গলের শার্দুলগণ পশ্চিম দিনাজপুরের কামাপাড়া স্কুলে ক্যাম্প স্থাপন করেন। এরা ৪র্থ এবং ৫ম সেক্টরে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।