সাক্ষাৎকারঃ সুবেদার মেজর কাজিম উদ্দিন

Posted on Posted in 9
সশস্ত্র প্রতিরোধঃ ঠাকুরগাঁ-দিনাজপুর

 

শিরোনামসূত্রতারিখ
১০। দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁ অঞ্চলে সংঘটিত সশস্ত্র প্রতিরোধবাংলা একাডেমীর দলিলপত্র১৯৭১

 

 

<৯, ১০, ২৯০-২৯৯>

সশস্ত্র প্রতিরোধে ঠাকুরগাঁ-দিনাজপুর
সাক্ষাৎকারঃ সুবেদার মেজর কাজিম উদ্দিন

১২-৬-১৯৭৪

 

       ২৫ শে মার্চের বিকালে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা, পিলখানা হইতে প্রেরিত বেতার সংকেত কিছুই আমাদের কানে পৌঁছে নাই। হঠাৎ মাঝরাতে কি এক জরুরী ডাকে আমাদের নবম শাখার ছোট কর্তা ক্যাপ্টেন নাবিদ আলম এক প্লাটুন লোক নিয়ে দিনাজপুর গেলেন। সেক্টর কমান্ডার লেঃ কর্নেল তারেক রসুল কোরেশীর সঙ্গে কি যেন আলোচনা হইল। ভোর রাত্রে সদলবলে তিনি ফিরিয়া আসিলেন। ২৬শে মার্চের ভোর। আসিয়াই ক্যাপ্টেন ঠাকুরগাঁ হেডকোয়ার্টারে উপস্থিত তামাম জুনিয়র কমান্ডারগনকে অফিসে ডাকিয়া পাঠাইলেন। জরুরী সভা করিয়া সরকারের আদেশ সবাইকে জানাইয়া দিয়া হাজির রিজার্ভ কোম্পানীসহ বাকী সবাইকে অতি অল্প সময়ের মধ্যে পূর্ণ সামরিক সাজে সজ্জিত হইতে আদেশ দিলেন। উপস্থিত সকলেই “বহুত আচ্ছা সব” বলিয়া যে যার কাজে লাগিয়া পড়িল।

 

   এদিকে উইং অধিনায়ক মেজর মোহাম্মদ হুসেন সীমান্ত পরিদর্শনে পঞ্চগড়ের দিকে বাহিরে ছিলেন। তাহাকে বিশেষ করিয়া ডাকিয়া পাঠান হইল। সকলেই রণ সাজে সজ্জিত হইয়া গভীর আগ্রহে বসিয়া আছে। ঠাকুরগাঁ টাউন ততক্ষণে ফাটিয়া পড়িয়াছে, জনতার বান ডাকিয়াছে, রাস্তাঘাটে ব্যারিকেড তৈরী করা হইতেছে ইট পাথর ও অন্যান্য জিনিস দিয়া শত শত গাছ কাটিয়া। উইং হেডকোয়ার্টারে আত্মরক্ষামূলক সামরিক ব্যূহ রচনা করিয়া পাহারার বন্দোবস্ত করা হইল। এমন সময় প্রায় ৯ টার দিকে মেজর আসিলেন, আবার জরুরী সভা বসিল। খামাখাই ছুতানাতায় নেহাৎ ভাল মানুষ বলিয়া সুপরিচিত মেজর বিষম রাগত হইয়া উঠিলেন সবার প্রতি, আর রিজার্ভ কোম্পানীর অধিনায়ক সুবেদার হাফিজকে তো একেবারে হাজতে দিবেন বলিয়া শাসাইলেন। তাহার অপরাধ কোম্পানী রণপ্রস্তুতি নিতে একটু দেরী করিয়া ফেলিয়াছে। মওকা বুঝিয়া ক্যাপ্টেনও এক ধাপ আগ বাড়িলেন-বলিলেন, “ও দিন ভূল যাও – আওয়ামী লীগ-মীগ নেহী চলে গা।” তাহাদের মনের খবর পাওয়া গেল। আমরা চুপচাপ শুধু নীরব শ্রোতা। দীর্ঘশ্বাসটি পর্যন্ত না ফেলিয়া কাজ করিয়া যাইতে লাগিল আমাদের লোক। তবে বাঙালি সৈনিকের অবস্থাতা বেশ আঁচ করিতে পারিল। ডাক-তাড় না থাকিলেও বাতাস যেন কানে কানে চুপে চুপে সব খবর দিয়া যাইতে লাগিল। এমনিভাবে সমূদয় বাঙালি সৈনিকের মন পুরাদস্তুর বারুদের ঘর হইয়া উঠিল। অপেক্ষা একটু মাত্র ইঙ্গিতের কিন্তু আমি লোকদিগকে সান্ত্বনা দিতে লাগিলাম।

 

       এদিকে কালবিলম্ব না করিয়াই বড় কর্তার আদেশে টাউনে পেট্রল পাঠানো হইল, আর কারফিউ জারী থাকিল দিন-রাত। কিন্তু হাজার হাজার বিক্ষুদ্ধ জনতা সকল আদেশ অমান্য করিয়া শোভাযাত্রা বাহির করে এবং নানা জায়গায় ব্যারিকেড স্থাপন করিয়া চলিল। মেজর ও ক্যাপ্টেন আমাকে সঙ্গে নিয়া শহরে গেলেন এবং পরিস্থিতি আয়ত্তে আনিবার চেষ্টা নেন। সেইদিন বেলা দশ ঘটিকার সময় মিছিলের উপর গুলি চালানো হয়। ফলে রিকশাওয়ালা মোহাম্মদ আলী ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। আমাদের লোক আরও খাপ্পা হইল; আমি তাহাদিগকে সান্ত্বনা দিয়া আমার কয়েকজন সহকর্মী সহ পরিস্থিতি সম্পর্কে পরামর্শ করিলাম এবং সকল আলোচনা গোপন রাখা হইল।

 

       আবার সেই দিনই (২৬শে মার্চ) দিবাগত রাত্রে বাঙালি ক্যাপ্টেন নজির আহমেদ সুবেদার আতাউল হকসহ ৩০ জনের একটি প্লাটুন সেক্টর সদর দিনাজপুর হইতে আমাদের সাহায্যার্থে ঠাকুরগাঁ আসিয়া হাজির হইলেন। এই দলে পশ্চিমারা ছিল প্রায় ডজন খানেক। আমাদের হেডকোয়ার্টার সংরক্ষণ ও টাউন পেট্রল ডিউটি সমানে চলিতে লাগিল। প্রায় এক কোম্পানী লোক ইহাতে নিয়োজিত রহিল। ২৭তারিখ আবার ঠাকুরগাঁ টাউন রক্তে রঞ্জিত হইল আমাদের নির্মম গুলির আঘাতে। এই একটি নিষ্পাপ শিশু নিহত হইল। আমাদের ডিউটি চলিতে লাগিল। ইতিমধ্যে জনসাধারণের মনোবল ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছে, তাহারা ততক্ষণে টাউন ছাড়িয়া পালাইতে শুরু করিয়াছে।

 

       আমি সেই দিনই সুবেদার হাফিজ, সুবেদার আতাউল হক, নায়েক সুবেদার মতিউর রহমান, হাবিলদার আবু তালেব ও নায়েক আব্দুল হাকিমকে নিয়া এক গোপন আলোচনা সভায় বসিয়া সিদ্ধান্ত নিলাম পরদিন ভোর ৬টায় পশ্চিমাদের উপর আমাদের তরফ হইতে আক্রমণ চালানো হইবে। কিন্তু হায়, পরিকল্পনা অনুসারে সুবেদার হাফিজ যখন পশ্চিমানিধনে উদ্যত হইলেন তখন জনৈক বাঙালি হাবিলদারের অসহযোগিতার দরুন তাহা বাধাপ্রাপ্ত হইয়া সেই দিনকার মহত আক্রমণ স্থগিত রহিল। আমরা বিশেষ চিন্তিত হইলাম, কারণ, একেত শুরুতেই বাধা আসিল, দ্বিতীয়তঃ যদি আমাদের উদ্দেশ্য ফাঁস হইয়া যায় তবে আর রক্ষা থাকিবে না।

 

       খোদার উপর ভরসা করিয়া সেই দিন চুপ থাকিলাম। কিন্তু সহকর্মীদেরকে নির্দেশ দিলাম সকলেই যেন জরুরী নির্দেশের অপেক্ষায় সব সময় সজাগ থাকে। এই সময় স্থানীয় আওয়ামী লীগ আমাদের কর্মসূচী জানিবার জন্য বার বার আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে, কিন্তু তাহাদেরকে বলি সুযোগ আসিলেই তাহা করা হইবে এবং আপনারা সজাগ থাকিয়া আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখিবেন।

 

       ২৮শে মার্চ ভোরেও বিশেষ কারনে পরিকল্পনামাফিক আমাদের পশ্চিমাদের উপর আক্রমণ চালানো সম্ভব হইল না। মনটা একেবারে বিগড়াইয়া গেল। খোদা না করুন আমাদের পরিকল্পনা ফাঁস হইয়া গেলে এর পরিণাম কি হইবে! আবার ঐদিকে আমাদের পাঞ্জাবী মেজর ও ক্যাপ্টেনসহ পশ্চিমাদের তৎপরতা বেশ বাড়িয়া উঠিল। আমরা সরকারী কার্যের মধ্য দিয়া খুব সতর্ক থাকিলাম। সেই দিন রিজার্ভ কোম্পানী কমান্ডার সুবেদার হাফিজ সেইদিনকার মত টাউন ডিউটি শেষ করিয়া ভারাক্রান্ত হৃদয়ে নিজ বিছানায় শুইয়া নানা চিন্তায় মগ্ন। প্রোগ্রাম মাফিক তার পরবর্তী ডিউটি ছিল পরদিন অর্থাৎ ২৯শে মার্চ সকাল পৌনে সাতটায়, কিন্তু সেই দিন হঠাৎ করিয়া বিকাল পৌনে চারটায় তাহাকে জরুরী পেট্রলে পাঠানো হয় ঠাকুরগাঁও- দিনাজপুর হাইরোড পর্যবেক্ষন ও পরিষ্কার করার উদ্দেশ্যে। মেজর হুসেন নিজে তাহাকে পেট্রল সম্বন্ধে বিস্তারিত বুঝাইয়া দিয়াছিলেন। সুবেদার হাফিজ প্রভুর ইশারায় বলিতে গেলে আদেশ বহির্ভুত কাজ করিয়া অনেক দূর পথ অগ্রসর হইলেন। ফলে পথিমধ্যে দিনাজপুর হইতে পলায়নপর বাঙালি ইপিআর জোয়ানদের নিকট জানিতে পারেন সেই দিন দুপুরেই দিনাজপুর সেক্টর হেডকোয়ার্টার কুটিবাড়ীতে বাঙালি ইপিআর লোকদের সঙ্গে আর্মি ও ইপিআরের পশ্চিমাদের তুমুল সংঘর্ষ শুরু হইয়া গিয়াছে। এক নিমেষে মনে মনে তিনি নিজ কর্তব্য স্থির করিয়া তাড়াতাড়ি উইং সদরে ফিরিয়া আসেন। তখন সন্ধ্যা সমাগত প্রায়। আসিয়াই তিনি মাগরিবের নামাজের জন্য আমাকে মসজিদে উপস্থিত পান এবং উপরোক্ত বিষয় অবহিত করেন। অপরদিকে কিছুক্ষনের মধ্যেই বিশ্বস্তসূত্রে জানিতে পারিলাম রাত্রি পৌনে ১১ টায় উইং- এর শেষ পেট্রল লাইনে ফিরে আসার পরপরই বাংগালীদের উপর হামলা শুরু করার নির্দেশ এবং আমাকে গ্রেফতার করার আদেশ সৈয়দপুর আর্মি হেডকোয়ার্টার দিয়া দিয়াছে।  অতএব আমার বাসায় সুবেদার হাফিজ, ৮উইং- এর সুবেদার আতাউল হক, নায়েক সুবেদার মতিউর রহমান ও আরও জন তিনেক জোয়ান একত্রিত হইয়া মিনিট কয়েকের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিলাম বিপ্লব ঘটাইবার এবং সেই রাতেই। এমন সময় উইং কমান্ডার হইতে আদেশ আসিল সব হাতিয়ার ম্যাগাজিনে জমা দিতে হইবে। মুহুর্তে খানদের চক্রান্ত সম্বন্ধে আমার দ্বিধা দূর হইল। আমি আরও শক্ত হইয়া বাঙালি সহকর্মীদিগকে অস্ত্র জমা না দিবার নির্দেশ দিলাম। পরম পরিতোষের বিষয় সকলেই একবাক্যে আমার আদেশ মান্য করিল এবং হাতিয়ার জমা দেওয়া হইল না একটিও। বিপ্লব করিতেই হইবে, অথচ এদিকে অসুবিধা ছিল ঢের। গোটা এক প্লাটুন টাউনে গিয়াছে পেট্রলে, বাকী সব লোক উইং সদরের চতুর্দিকস্থ পরিখা-বিবর ঘাঁটিতে ডিউটিরত। লাইনে হাজির লোক খুব কম, আবার ওদের সঙ্গে উঠাবসা-শোয়ার ব্যবস্থা। তথাপি কমান্ডারগণ নির্দেশ মাফিক আপন-আপন গ্রুপের লোকজনদের গোপনে ইশারায় সব বলিয়া দিলেন। অতি সতর্কতার সহিত প্রস্তুতি চলিল। প্রচুর উৎসাহ- উদ্দীপনা থাকা সত্ত্বেও অনেককেই এই সময় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িতে দেখা গেল। তবে মঙ্গলময়ের আশীর্বাদপুষ্ট হইয়া সুবেদার হাফিজ খুবই সক্রিয় ছিলেন। তিনি উইং- এর পুরা রক্ষাবূহ্য ঘুরিয়া প্রতিটি মরিচায় যাইয়া প্রতিটি বাঙালির কাছে পৌঁছাইয়া দিলেন অপারেশনের নির্দেশ এবং বাহিরে পেট্রল পার্টির সাথে যোগাযোগ রাখা হইল। খোদাকে ধন্যবাদ কেহ সেই দিন না বলে নাই, যদিও মনে মনে ঘাবড়াইয়া গিয়াছিল অনেকেই।

 

       রাত ১০টা ১৮ মিনিট। চারিদিকে অন্ধকার, থমথমে ভাব। সুবেদার হাফিজের হস্তস্থিত ছোট্র স্টেনগানটা হঠাৎ গর্জিয়া উঠিল। মেজর আর ক্যাপ্টেনের দেহরক্ষীদলের অধিনায়ক হাবিলদার মোহাম্মদ জামান বুকে গুলিবিদ্ধ হইয়া পরকালের যাত্রী হইল তাহারই গার্ড-রুমের বিছানায়। ইশারা বুঝিয়া পর মুহুর্তে আরও অনেক ক্ষুধার্ত হাতিয়ার গর্জিয়া উঠিল একসঙ্গে। বেশ কজন পশ্চিমা পরপারের যাত্রী হইল। আমাদের লোক ‘জয় বাংলা’ ধবনি দিয়া বিজয় বার্তা ঘোষনা করিল। থামিয়া সারা রাত ধরিয়া ফায়ার চলিল, যদিও আমার মতে আদৌ এর দরকার ছিল না। ঐদিকে গোলাগুলির ফাঁকে এক সময় বর্ডার কোম্পানীগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হইল সব পশ্চিমা খতম করতঃ সামান্যসংখ্যক লোক পিছনে রাখিয়া অধিকাংশকে ঠাকুরগাঁ পাঠাইয়া দিতে। রাতের অন্ধকারে তেতলা দালান, বাসাবাড়ী ইত্যাদী বিভিন্ন স্থানে চতুর্দিকে লোক ছড়াইয়া ছিল, তাই একেবারে পশ্চিমা নিধন পর্ব শেষ হইল না। অধিকন্তু নানা সুযোগে নানা জায়গায় কিছুসংখ্যক পশ্চিমা হাতে অস্ত্র তুলিয়া নেয়। তাই আরও কিছুটা সময় লাগিল আমাদের। এই এলোপাতাড়ি পাতলা ফায়ারের ভিতর দিয়া আমাদের বাঙালি পরিবারগুলিকে শহরে স্থানান্তরিত করিয়া দিলাম। শহরবাসীরা প্রথমে গোলাগুলির শব্দে ভীতসন্ত্রস্ত হইয়া পড়িলেও অনতিবিলম্বে আমাদের বিজয় সংবাদ শ্রবণে হাজার হাজার মুক্তিপাগল মানুষ সমবেত কন্ঠে ‘জয় বাংলা’ ধবনিসহ বিভিন্ন শ্লোগানে আকাশ-বাতাস মুখরিত করিয়া তুলিল এবং তাহারা বিভিন্ন প্রকারে আমাদের সাহায্য করিতে লাগিল। সেই দিন ভোররাত্রে বাঙালি ক্যাপ্টেন নজীর আহমদ অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়া ক্যাপ্টেন নাবিদ আলম ও তাহার স্ত্রীকে নিয়া ছদ্মবেশে পলায়ন করিতে থাকেন সম্ভবতঃ সৈয়দপুর যাওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু পদব্রজে সামান্য কিছুদুর যাওয়ার পরই ক্ষীপ্ত জনসাধারণের হাতে মারা পড়েন। ওদিকে সেইদিন ভোররাত্রেই ৮-উইং হইতে আসা সুবেদার আতাউল হক শহীদ হন। এই বিপ্লবে তাহার ভূমিকা অতি প্রশংসনীয়। তাহাঁরই যোগসূত্র ক্রমে সেই রাত্রেই হাজার হাজার লোক টাউনে বাহির হইয়া পড়ে এবং তাহারা আমাদের সহযোগিতা পাইয়া আবার শতগুণ উৎসাহে মাতিয়া উঠে এবং আমাদের সাহায্যার্থে আগাইয়া আসে।

 

       ২৯শে মার্চ সকাল বেলা সামান্য গোলাগুলি চলিতে লাগিল। অবশিষ্ট খানরা দালানকোঠায় থাকিয়া ফায়ার করাতে তাহাদিগকে কাবু করা গেল না। আমরা ছাত্র, জনসাধারণ ও স্থানীয় বিভিন্ন বিভাগের নিন্মপদস্থ কর্মচারী বিশেষ করিয়া ওয়াপদা বিভাগের লোকদের সহায়তায় ছাউনি হইতে আমাদের প্রয়োজনীয় সব হাতিয়ার, গোলাগুলি ও অন্যান্য বহু জিনিসপত্র অন্যত্র সরাইয়া নিলাম।

 

       ২৯শে পার হইয়া ৩০শে মার্চের সকাল। আমি সুবেদার মতিউর রহমানকে এক প্লাটুন লোকসহ ঠাকুরগাঁ হেডকোয়ার্টারকে শ্ত্রুমুক্ত করার নির্দেশ দিলাম। তিনি সঙ্গে সঙ্গে তাহাঁর দলবল নিয়া অগ্রসর হইলেন কিন্তু অনেক্ষন চেষ্টার পর খানদের ব্যূহ ভেদ করিতে না পারিয়া ফেরত চলিয়া আসিলেন। তখন সুবেদার হাফিজ তাহাঁর কোম্পানীর কিঞ্চিদধিক এক প্লাটুন লোক নিয়া ঝাঁপাইয়া পড়েন এবং বিকাল প্রায় তিনটা নাগাদ তেতলা দালানের শেষ দুশমনটি পর্যন্ত খতম করিয়া তাহা পরিষ্কার করেন। তাহাঁরই আদেশে প্লাটুন কমান্ডার বজল আহমদ চৌধুরী একদল লোক নিয়া উইং অধিনায়কের বাসভবন মুক্ত করেন। মেজর হোসেন এই সময়ই নিজ বাসভবনে নিহত হন। একই সময় যুগপৎ আক্রমণ করিয়া নায়েক সুবেদার মতিউর রহমান পাক আর্মির গেরিলা সুবেদার ও তাহাঁর সঙ্গীদের খতম করিয়া জেসিও মেস পরিষ্কার করেন। পাবলিকের সহায়তায় অল্প সময়ের মধ্যে সমস্ত মৃতদেহ অন্যত্র সরাইয়া দাফন করিয়া ফেলা হয়। আর এদিকে দ্রুতগতিতে লাইনের ভিতরকার সবকিছু যথাসম্ভব গোছগাছ করিয়া নিয়া হেডকোয়ার্টারের চতুর্দিকে দৃঢ় প্রতিরক্ষাব্যূহ রচনা করা হইল। সুবেদার হাফিজের নেতৃত্বে তাহাঁর নিজস্ব ডি কোম্পানী ব্যতিত আরও কিছু আনসার-মুজাহিদ এই প্রতিরক্ষা ঘাঁটিতে মোতায়েন রহিল।

 

       ওদিকে স্থানীয় এম-সি-এ জনাব ফজলুল করিমের নেতৃত্বে ঠাকুরগাঁ শহরে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করা হইল। আমাদের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ স্বেচ্ছায়ই তাহারা গ্রহণ করিলেন। তাহাদের কর্তব্য ছিল শহরের শান্তি-শৃংখলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং প্রয়োজনমত যুদ্ধরত লোকদের নানা কাজে সাহায্য করা। ছাত্র-জনতা আমাদের পাশে থাকিয়া যে সাহায্য করিয়াছে তাহা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। স্থানীয় নারী সমাজ পর্যন্ত এই সংগ্রামে প্রচুর সাহায্য ও সমর্থন দিয়াছে। ঐ দিন (৩০শে মার্চ) সন্ধ্যা পর্যন্ত সীমান্তস্থ কোম্পানীসমূহের লোকজন ঠাকুরগাঁয় আসিয়া সমবেত হয়। আমাদের জোয়ানরা ও স্থানীয় জনসধারণ আমাকে মেজর পদে বরিত করিয়া যুদ্ধের পূর্ণ দায়িত্ব আমার উপর অর্পণ করিলেন। বৃদ্ধ বয়সে ঘোর দুর্যোগের সময় এত বড় দায়িত্ব আমাকে বহন করিতে হইল। পরম করুণাময় আল্লাহতায়ালার নাম স্মরণ করিয়া জনসাধারণের শুভাশীষ নিয়া আমি আমার ব্যাটালিয়নকে পুনর্গঠন করিয়া আগামী দিনের জন্য সকলকে তৈয়ার করিতে লাগিলাম এবং সামান্য ভাষনের মাধ্যমে আমরা সমবেতভাবে শপথ নিলাম।

 

       এই দিন বিকালেই সুবেদার আব্দুল খালেকের নেতৃত্বে আমাদের দুই কোম্পানী এবং এক কোম্পানী মুজাহিদকে সাধ্যানুযায়ী সুসজ্জিত করিয়া ঠাকুরগাঁর ২৩ মাইল আগে ভাতগাঁও পুল প্রতিরক্ষার্থে পাঠানো হয়। নায়েক সুবেদার বদিউজ্জামানের অধীনে আমাদের সি কোম্পানীকে এক কোম্পানী মুজাহিদসহ দেবীগঞ্জে পাঠানো হইল। হাবিলদার নুর মোহাম্মদের অধীনে এক প্লাটুন মুজাহিদ শিবগঞ্জ বিমান বন্দর প্রতিরক্ষার জন্য পাঠানো গেল। বাকী সদর কার্যালয়ের সঙ্গে এক কোম্পানী অতিরিক্ত হিসাবে রাখা হইল। সে রাতেই আনসার- মুজাহিদ ভাইয়েরাও অধিক মাত্রায় আসিয়া একত্রিত হইতে লাগিল। সহকারী আনসার এ্যাডজুটেন্ট (মহকুমা) জনাব কবির তাহাদিগকে পুনর্গঠন করিয়া আমার পাশে থাকিয়া অনেক সাহায্য করিতে লাগিলেন। আমরা সীমান্ত এলাকাকে দুইটি সাব সেক্টরে ভাগ করিয়া সুবেদার আবুল হাশেম ও নায়েক সুবেদার হাজী মুরাদ আলীকে যথাক্রমে পঞ্চগড় সাব সেক্টর ও রুহিয়া সাব সেক্টরের দায়িত্বভার অর্পণ করি এবং নিন্মোক্ত বিষয়গুলি তাহাদের দায়িত্বের অন্তর্গত করিয়া দিইঃ

(১) সীমান্ত রক্ষণাবেক্ষণ করা আঞ্চলিক আনসার-মুজাহিদদের সহযোগিতায়;

(২) এলাকায় জনসাধারণের এবং সরকারী বেসরকারি সম্পত্তির নিরাপত্তা বিদান করা;

(৩) আনসার মুজাহিদদের পুনর্গঠন, স্বেচ্ছা সেবক বাহিনী এবং ছাত্রদের সামরিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা;

(৪) বন্ধুরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা এবং প্রয়োজনীয় বিষয়াদি সদর কার্যালয়ে অবহিত করা।

(৫) বন্ধুরাষ্ট্রের যে কোন সাহায্যের জিনিসপত্র সমিতির মাধ্যমে সুষ্ঠভাবে বন্টনের তদারক করা;

(৬) রণাঙ্গনের খবর কতিপয় নির্দিষ্ট লোককে জ্ঞাত করানো।

এমনিভাবে সবরকম আদেশ উপদেশ দিয়া তাহাদেরকে নিজ নিজ জিম্মাদারী এলাকায় মোতায়েন করা হইল।

 

       ইতিমধ্যে হেডকোয়ার্টার এবং বর্ডারের বিভিন্ন স্থানে সংগঠিত বিপ্লব অপারেশনের বিস্তারিত খবর আমাদের নিকট আসিয়া পৌঁছিল। হিসাবে দেখা গেল, এই অপারেশনে  বর্ডারে আমাদের একজন মাত্র লোক আহত হইয়াছে। সে হাবিলদার আব্দুল আজিজ। হেডকোয়ার্টারে চারজন ঘোরতর জখম ও দুই জন শহীদ।

জখমীঃ

(১) হাবিলদার দীন মোহাম্মদ

(২) সিপাহী ওলিউল্লাহ ভূঁইয়া

(৩) সিপাহী আবু তাহের

(৪) একজন মুজাহিদ কমান্ডার

 

এবং শহীদ হনঃ

(১) সুবেদার আতাউল হক

(২) ল্যান্স নায়েক জয়নাল আবেদীন।

 

এই সামান্য ক্ষতির বিনিময়ে আমরা এক মেজর ও এক ক্যাপ্টেনসহ প্রায় ১১৫ জন খান সেনাকে খতম করি- যাহাদের অধিকাংশই ছিল কমিশনড, জুনিয়র কমিশিনড ও নন কমিশনড অফিসার এবং বয়সে প্রবীণ, অভিজ্ঞতায় পরিপক্ক ও সামরিক প্রশিক্ষনে নিপুণ আর সর্বোপরি এই এলাকার রাস্তাঘাট ও অবস্থান এবং আমাদের বৈশিষ্ট্য সমন্ধে ছিল বিশেষ ওয়াকিবহাল। তাই সার্বিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ইহা আমাদের পক্ষে ছিল বিরাট সাফাল্য। পশ্চিমা হতাহতদের মধ্যে ছিল ইপিয়ার-এর ১০৪, আর্মির ৮ এবং বিমান বাহিনীর ৩ জন।

 

       ৩০শে মার্চ হইতে সকল গ্রামেগঞ্জে, স্কুল কলেজে যুবকদের সামরিক শিক্ষা চলিতে লাগিল। আমার ব্যাটালিয়ন ছাড়া একদিনের মধ্যেই এক ব্যাটালিয়ন আনসার ও এক ব্যাটালিয়ন মুজাহিদ পুনর্গঠিত হইল। এক ব্রিগেডের মত শক্তি নিয়া (অবশ্যই শুধু সংখ্যানুপাতিক) আমরা বিখ্যাত সৈয়দপুর শত্রু ছাউনি আক্রমণ করিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করিলাম। এই দিকে দিনাজপুর হইতেও সাহায্য পাইবার আশ্বাস পাইলাম। পরিকল্পনা অনুসারে ইপিআর, আনসার ও মুজাহিদদের মিলিত বাহিনীকে প্রয়োজনভিত্তিক প্লাটুন ও কোম্পানী পর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করা হইল। বিশেষ করিয়া সৈয়দপুর-ঠাকুরগাঁর মধ্যে যোগাযোগকারী বিভিন্ন রাস্তার উপর অবস্থিত গুরুত্ব পূর্ণ স্থানসমূহে। এইভাবে ক্রমে ক্রমে ডাইনে বীরগঞ্জ, শালবাগান, ভাতগাঁ এবং বাঁয়ে খানসামা, দেবীগঞ্জ, জয়গঞ্জ, ঝারবাড়ী প্রভৃতি স্থানে অনেকগুলি রক্ষাব্যূহ তৈয়ার করিয়া আরও অগ্রসর হইবার প্রয়াস পাইলাম। অবশ্য স্থানগুলি ছিল একে অন্য হইতে বহু দূরে এবং যোগাযোগের দিক দিয়া একেবারেই বিচ্ছিন্ন। না ছিল কোন পজিশন অন্য পজিশনের বদলী বা অবস্থান- প্রস্থানের কিছুই জানিত না। অথচ আধূনিক সমরে এ রীতি সম্পূর্ণ অচল। খাদ্য এবং অন্যান্য সামরিক সরবরাহের ব্যাপারও ছিল সম্পূর্ণভাবে জনসাধারণের উপর নির্ভরশীল। কাজেই অনাহার- অর্ধাহার ছিল নিত্যসঙ্গী।

 

       ইতিমধ্যে সৈয়দপুরে ৩নং বেঙ্গল রেজিমেন্টের লোকদের সঙ্গে যোগাযোগ করিলাম, তবে মাত্র তাহাদের সি কোম্পানীর লোকজন সেখানে ছিল। তাঁহারাও ততক্ষণে খানদের দ্বারা একবার আক্রান্ত হইয়া বিধ্বস্ত অবস্থায় সেখান হইতে বাহির হইয়া আসিয়াছে। তাহাদের কোম্পানীর লোকজন পুরা ছিল না এবং তাহার নেতৃত্ব দিতেছিলেন ক্যাপ্টেন আশরাফ। যাহাই হউক, তাহাদের সহযোগিতায় সৈয়দপুরের দিকে অগ্রাভিযানের প্রস্তুতি চলিতে লাগিল। পিছনের দিকে পূর্বে কথিত হাবিলদার নূর মোহাম্মদের নেতৃত্বাধীন প্লাটুনদ্বয় ঠাকুরগাঁ বিমানবন্দরের হেফাজত করিতে লাগিল এবং তথাকার ম্যানেজার আতাউর রহমান ও স্থানীয় জনগণের সহায়তায় বিমানবন্দরকে নানা উপায়ে শ্ত্রুর ব্যবহারের অনুপযুক্ত করিয়া ফেলা হইল।

 

       ৩১শে মার্চ। বন্ধুরাষ্ট্রের ৭৫ নং বিএসএফ ব্যাটালিয়নের কমান্ডার কর্নেল ব্যানার্জী সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করিলাম। তিনি সব রকম সাহায্য দানের প্রতিশ্রুতি দিলেন। পহেলা এপ্রিল রাত্রে কর্নেল ব্যানার্জী সাহেবকে আমাদের অগ্রবর্তী ঘাঁটিগুলি পরিদর্শন করাইলাম, তিনি আমাদের কাজের বিশেষ প্রশংসা করতঃ তাঁহার নিজের কিছু পরিকল্পনা ব্যক্ত করিলেন। আমরা তাঁহার উপদেশ মত নিজ বাহিনীকে সৈয়দপুরের আরও কাছাকাছি নিয়া যাইবার পরিকল্পনা নিলাম। ২রা এপ্রিল হঠাৎ আমরা পুরানো কমান্ডিং অফিসার পাক আর্মির অবসরপ্রাপ্ত মেজর এম, টি হুসেন আমার সহিত দেখা করিয়া আলাপচারী হইলেন। তাঁহার প্রাথমিক আলাপের অবিকল উদ্ধৃতি নিন্মে দেওয়া হইলঃ “সুবেদার মেজর সাহেব, আপনি আপনার লোকজন সহ দেশের মুক্তি আন্দোলনে ঝাঁপ দিয়াছেন তাহা সত্যি অদ্ভুত। আপনি আমাকে আপনার সঙ্গে কাজ করিবার সুযোগ দিবেন কি।” আমি আনন্দের সঙ্গে তাহাকে গ্রহণ করিলাম ও আমাদের কমান্ডিং হিসাবে নিযুক্ত করিলাম।

 

       এক্ষণে আমরা আরও নতুন উদ্যম নিয়া কাজ করিতে লাগিলাম। পরদিন ৩রা এপ্রিল আমরা দিনাজপুর গেলাম এবং সেখানকার সরকারী ও বেসরকারী নেতা ও কর্মচারীবৃন্দকে নিয়া একটি সভা করিয়া আগামী দিনের পরিকল্পনা নিয়া আলোচনা করিলাম। পরিকল্পনা মাফিক ঐদিন ৩রা এপ্রিল ঠাকুরগাঁর রক্ষাব্যূহ উঠাইয়া ফেলা হয় আর সুবেদার হাফিজকে তাহার ডি কোম্পানীসহ সবার আগে দশ মাইল তে-রাস্তার মোড়ের প্রায় দেড় মাইল পূর্বে দিনাজপুর-সৈয়দপুর প্রধান সড়কের উপর করা হইল। সেখানে গিয়া তাঁহারা ক্যাপ্টেন আশরাফের ৩ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সি কোম্পানীর সহিত মিলিত হন। তাহারা মিলিতভাবে সৈয়দপুরগামী সড়কে অক্ষরেখা ধরিয়া সৈয়দপুরের দিকে অগ্রসর হইতে থাকে। ৪ঠা এপ্রিল তাহারা ভূষির বন্দরে প্রতিরক্ষা ঘাঁটি নির্মাণ করে। আবার ঐ দিন দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁ ইপিআর, আর্মি, আনসার ও মুজাহিদ বাহিনী নিয়া একটা যৌথ কমাণ্ড গঠিত হইল। আর ভাতগাঁও পুলের নিকট একটি জরুরী সভা ডাকিয়া তাহাতে যৌথ কমান্ডের অধীনে সৈয়দপুর আক্রমণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হইল।

 

       ৫ই এপ্রিল ৮ উইং দিনাজপুরের সুবেদার আবদুল মজিদের নেতৃত্বে এক কোম্পানী ইপিআর ৯ উইং-এর একটি ইপিআর প্লাটুনসহ সৈয়দপুর- নীলফামারী সদর রাস্তায় সৈয়দপুরের অদূরে দরোয়ানির নিকট প্রতিরক্ষা ঘাঁটি নির্মাণ করে। উক্ত তারিখে ভূষির বন্দরে আমাদের সঙ্গে শত্রুদের সংঘর্ষ হয় এবং তাহারা পালাইয়া যায়। সেইদিনই আমাদের বাহিনী একনাগাড়ে প্রায় ১০ মাইল আগাইয়া চম্পাতলী নামক স্থানে গিয়া পৌঁছে। তখন রাত্রি ১১টা। একেত অপরিচিত স্থান, তদুপরি গাঢ় অন্ধকার ও মুষলধারে বৃষ্টি। যাহা হউক ভোর পর্যন্ত প্রতিরক্ষার অনেকটা ব্যবস্থা হইয়া গেল। কিন্তু ৬ই এপ্রিলের সূর্য উঠিতে না উঠিতেই দুশমনরা গোলন্দাজ বাহিনীর সাহায্যে আমাদের উপর তীব্র আক্রমণ চালায়। তারপর ‘ইয়া আলী’ হুঙ্কার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ইপিআর ও রেজিমেন্টের জোয়ানরা মিলিতভাবে পাল্টা ‘ইয়া আলী’ বলিয়া সিংহনাদে দুশমনের উপর ঝাঁপাইয়া পড়ে। বঙ্গশার্দুলের থাবায় নয়জন খানসেনা প্রান হারায়, বাকী ক্ষত- বিক্ষত অবস্থায় প্রাণ নিয়া পালাইয়া যায়। খানিক পরে ক্যাপ্টেন আশরাফ পরামর্শ সভা ডাকিলেন, জানা গেল তার কাছে গোলাবারুদ একেবারেই কম, কোনমতে সেদিনকার মত চলিতে পারে। তিনি সেইদিনই সন্ধ্যা পর্যন্ত পশ্চাদপসরণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু ততক্ষণ আর অপেক্ষা করিতে হইল না। হঠাৎ করে শুরু হইল শত্রুর গোলন্দাজ বাহিনীর অজস্র শেলিং, পিছনে আসিল কয়েকটি ট্যাঙ্ক, সঙ্গে ৮১ মিলিমিটার মর্টার। অনেক্ষন সংঘর্ষ চলিল। উভয় পক্ষেই হতাহত হইল এবং ছত্রভঙ্গ হইয়া অনেক লোক দলত্যাগী হইবার সুযোগ পাইল। আমরা ভূষির বন্দর প্রতিরক্ষা ঘাঁটিতে পজিশন নিলাম। পরদিন সেখানে তুমুল যুদ্ধ হইল। আমাদের নিকট ভারী এবং প্রতিরোধক অস্ত্র না থাকায় আবার পশ্চাতে আসিতে বাধ্য হইলাম।

 

       এই সময় সুবেদার হাফিজ কোম্পানীর অধিকাংশ দেবীগঞ্জ হইয়া খানসামায় প্রতিরক্ষাব্যুহ রচনা করে। ওদিকে নীলফামারী রাস্তায় মজিদ কোম্পানীর সঙ্গে ৭ এবং ৮ এপ্রিল দুশমনদের তুমুল সংঘর্ষ হয়। সেখানে আমাদের তিনজন শহীদ কয়েকজন আহত ও বহু হাতিয়ারপত্র খোয়া গেলেও দুশমনরাও বিশ-পঁচিশ জন হতাহত নিয়া অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এইখানেও ট্যাঙ্ক এবং গোলন্দাজ হামলার মোকাবিলা করিতে না পারিয়া ক্যাপ্টেন আশরাফ, সুবেদার মেজর আব্দুর রব, ক্যাপ্টেন নজরুল হক এবং আমার উপস্থিতিতে ৪ঠা এপ্রিল ভাতগাঁয়ে অনুষ্ঠিত কনফারেন্সের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা আমাদের কাজ চালাইয়া যাইতে লাগিলাম এবং পিছনে হাটিয়া দশ মাইল স্ট্যান্ডে শক্ত ঘাঁটি গাড়িলাম।

 

       ১০ই এপ্রিল সকাল ৯ ঘটিকায় শত্রুরা ট্যাঙ্ক ও গোলন্দাজ বহর নিয়া আমাদের উপর ভীষন আক্রমণ চালাইল। প্রথম বার আমরা তাহাদের আক্রমণ প্রতিহত করিলাম। দ্বিতীয় বার বেলা ২ ঘটিকার সময় আক্রমণ চালায়। শত্রু পক্ষের গোলার আঘাতে আমাদের দুইটি ছয় পাউন্ডার গান-ই নষ্ট হইয়া যায়। তুমুল যুদ্ধের পর এখানে আমাদের চারজন লোক শহীদ হয় এবং কিছু লোক আহত হয়। ফলে আমাদের লোক দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া দিনাজপুরের লোক দিনাজপুরের দিকে ঘাঁটি পরিবর্তন করে ও ঠাকুরগাঁয়ের লোক ভাতগাঁও পুলের নিকট দৃঢ় অবস্থান নেয়। দশ মাইল স্ট্যান্ডের যুদ্ধে আমাদের ভীষন ক্ষতি হইল, কেননা বাহির হইতে অনেক গোলাবারুদ আমরা এখানে আনিয়া জমা করিয়াছিলাম এবং আমাদের কাছে থাকা কয়েক শত রাইফেল বন্দুকও সেখানে রাখা ছিল। সকলেরই ধারনা ছিল আমাদের এই স্থান ছাড়িতে হইবে না কিন্তু ট্যাঙ্ক বহরের আক্রমণের চাপে ঐ স্থানও ছাড়িতে হইল। লোকের মনোবল যথেষ্ট ছিল কিন্তু ভারী অস্ত্র না থাকায় আবার সরিয়া আসিতে হইল।

 

       আমরা আবার ভাতগাঁয়ের পুলের নিকট শক্তিশালী ঘাঁটি স্থাপন করিলাম। মেজর এম,টি, হোসেনসহ কর্নেল কোন কাজে আসিল না। আমি ব্যানার্জী সাহেবকে বলিয়াছিলাম যে, ভাতগাঁয়ের পতন হইলে আমাদের লোকজনের মনোবল নষ্ট হইবে এবং ঠাকুরগাঁ শহরকে রক্ষা করা সম্ভব হইবে না । তাই যেভাবেই হউক ভাতগাঁওকে রক্ষা করিতে হইবে। আমরা দুইজনে ভারী অস্ত্র সংগ্রহ করিবার অনেক চেষ্টা নিলাম কিন্তু কিছুই হইল না। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী কর্পূরী ঠাকুর আমাদিগকে যে কোন সাহায্য দিতে আশ্বাস দিয়াছিলেন। কিন্তু তাহা পাইতে অনেক দেরী হইয়া গেল।

 

       ১৩ই এপ্রিল ভাতগাঁয়ে সম্মুখ সমরে না আসিয়া খান সেনারা রাস্তা ধরিয়া পিছন দিক হইতে আক্রমণ করিবার পরিকল্পনা নিল। শত্রুদের পরিকল্পনা আমরা অনেকটা বুঝিতে পারিলাম। খানসামায় তখন আমাদের কোন লোক ছিল না। তাই আমরা তাড়াহুড়ো করিয়া গোপনে সুবেদার হাফিজের নেতৃত্বে এক কোম্পানি সেখানে পাঠাইলাম। ১৩ তারিখ সন্ধ্যায় তাহার কোম্পানী বীরগঞ্জ হইতে পদব্রজে অগ্রসর হইয়া খানসামায় পৌঁছে। শত্রু সেনার দুইটি কোম্পানী যখন নদী পার হইতেছিল তখন তাহারা সুযোগ বুঝিয়া তাহাদের উপর অতর্কিতে আক্রমণ চালাইয়া তাহাদের ৮ বেলুচ ডি কোম্পানীকে সম্পূর্ণ রুপে পর্যদুস্ত করিয়া দেয়। প্রচুর হতাহত করা ছাড়াও তাহারা দুশমনের নিকট হইতে ১০ গাড়ী মালামাল হস্তগত করে যাহার মধ্যে অনেক গোলাবারুদ, ৭৫টি বিছানা, প্রচুর রেশন, পাকের সরঞ্জাম, একটি অয়ারলেস সেট, একটি মোটর সাইকেল ও আরও বিবিধ দ্রব্যাদি ছিল। সুবেদার হাফিজের বলিষ্ঠ নেতৃত্বই ছিল এই কোম্পানীর সাফল্যের কারণ। শত্রুর এই আক্রমণ প্রতিহত করিয়া পাল্টা তাঁহাদের যে ক্ষতি সাধন করা হইয়াছিল তাহাতে শত্রুর মনোবল যথেষ্ট ক্ষুন্ন হইয়া যায়, ফলে তিনদিন পর্যন্ত শত্রুদের তরফ হইতে আর কোন সাড়াশব্দ ছিল না এবং পশ্চাৎ আক্রমণ হইতেও আমাদের ঘাঁটি মুক্ত রহিল।

 

       ১৭ই এপ্রিল আমি বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের তিন সদস্যের একটি দলকে নিয়া ভোর পাঁচটায় রয়ানা হই সীমান্তের দিকে তাহাদিগকে গন্তব্য স্থানে পৌঁছাইয়া দিতে। মেজর এম,টি, হোসেন সাহেব থাকিলেন রণাঙ্গনের দায়িত্ব নিয়া। আমি প্রায় দুপুর তিনটায় রুহিয়া পৌঁছি এবং ঠাকুগাঁও কমাণ্ড পোস্টের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করিবার চেষ্টা করি কিন্তু কোন সাড়া না পাইয়া আমার মনে সন্দেহ জাগে এবং আমি তাড়াতাড়ি পঞ্চগড় হেডকোয়ার্টারে চলিয়া আসি। এখানে আমাদের অল্পসংখ্যক লোককে দেখিতে পাইয়া জিজ্ঞেসাবাদে জানিতে পারি ভাতগাঁও ঘাঁটিতে প্রচণ্ড সংঘর্ষের ফলে আমাদের লোকজন ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়িয়াছে। মেজর এমটি হোসেনের কোন খবর নাই, তবে শুনিলাম, তিনি একটি বড় বাস ও একটি জীপ নিয়া অর্ধ লক্ষ টাকাসহ ভারতে চলিয়া গিয়াছেন হাতিয়ার ও গোলাবারুদ আনার জন্য। কিন্তু এখানে উল্লেখ্য যে, দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত তিনি আর দেশে ফিরিয়া আসেন নাই। যাহাই হউক ভাতগাঁও ঘাঁটির নেতৃত্ব ছিল নায়েক সুবেদার আব্দুল খালেকের উপর। তাহার নিকট সমস্ত ঘটনা জানতে পারিলাম। তিনি জানাইলেন শত্রুরা সকাল আটটার সময় প্রচণ্ড বেগে আক্রমণ চালায় ট্যাঙ্ক সাঁজোয়া ও গোলন্দাজ বাহিনীর সাহায্যে। তাহারা প্রথমে কান্ত মন্দিরের পাশ দিয়া ঢুকিয়া সোজা বীরগঞ্জ দখল করিতে চেষ্টা করে কিন্তু আমাদের জোয়ানদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে তাহা ভন্ডুল হইয়া যায়। এরপর শত্রুরা শক্তি বৃদ্ধি করতঃ দ্বিতীয় দফা আক্রমণ করে। আমাদের বাহিনীও অসীম সাহসিকতার সঙ্গে বাধা দেয় এবং প্রায় ৫ ঘণ্টা ধরিয়া তুমুল সংঘর্ষের পর আমাদের লোকজন ছত্রভঙ্গ হইয়া অনেকে দলত্যাগী হইয়া ভারতের দিকে চলিয়া যায় এবং অনেকে পচাঁগড় হইয়া জমায়েত হইতে থাকে। এখানে আমাদের ৩ জন শহীদ হন। তাহারা বীরবিক্রমে লড়াই করিয়া শত্রুপক্ষের অন্ততঃ ২৫/৩০ জনকে আহত করেন। সিপাহী আব্দুল মান্নান, সিপাহী গুল মোহাম্মদ ভূঁইয়া ও হাফিজ আবদুর রহমান এই যুদ্ধে অসীম সাহসীকতার পরিচয় দিয়েছেন। আহতদের মধ্যে সিপাহী আবদুল মান্নান আহত অবস্থায় শত্রুর হস্তে বন্দী হয়- বর্বর পশুরা তাহাকে গুলি করিয়া মৃত মনে করিয়া পুকুরে ফেলিয়া দেয়। স্থানীয় জনসাধারণের সহযোগিতায় এবং তাহাদের প্রাণভরা সেবা ও দয়াময়ের কৃপায় সে সুস্থ হইয়া উঠে ও অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি তেতুঁলিয়াতে আমাদের সাথে যোগদান করে। বাকী দুইজন শাহাদাৎ বরণ করিয়া অমর হইয়া আছেন।

 

       অন্যদিকে খানসামাতে ১৩/১৪ তারিখের সংঘর্ষে হাফিজ কোম্পানী পাক আর্মিকে তিনদিন পর্যন্ত জব্দ করিয়া রাখিলেও আমাদের ভাগ্যলক্ষী প্রসন্ন ছিল না। একেত খানরা মার খাইয়া ততক্ষনে ভারী মর্টার ও গোলন্দাজ বাহিনী নিয়া আসিল, তদুপরি সেইদিন একই সময়ে খবর পাওয়া গেল ভাতগাঁয়ের প্রধান প্রতিরক্ষা ঘাঁটি ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছে। তাই ডি কোম্পানীও খানসামা ছাড়িয়া চলিয়া আসিল। তবে এই কোম্পানী ঐ স্থানে মোতায়েন থাকায় ভাতগাঁও শত্রুর পাশ অথবা পশ্চাৎ আক্রমণ হইতে নিশ্চিতভাবে রক্ষা পাইয়াছিল।

 

       এই কোম্পানীর পশ্চাদপসরণের সঙ্গে সঙ্গে জয়গঞ্জ, ঝারবাড়ী, দেবীগঞ্জ প্রভৃতি স্থানের ছোট ছোট রক্ষাব্যূহগুলিরও পিছু হটিতে বাধ্য হইল। এইভাবে শ্ত্রুসেনার অগ্রাভিযান আর আমাদের পশ্চাদপসরণের পালা চলিতে থাকিল। তবে সান্তনা এই হতাহতের দিক দিয়া শত্রু সংখ্যা বরাবরই ভারী ছিল। আমরা দিনবদিন হাতিয়ার আর গোলাবারুদ হারাইয়া দুর্বল হইতে থাকিলাম- স্বাধীন এলাকার পরিধিও কমিয়া আসিতে লাগিল, জনসাধারণের মনোবল ভাঙ্গিয়া পড়িল- খাদ্য সরবরাহও আমাদের প্রায় বন্ধ হইয়া আসিল। আমরা প্রমাদ গুনিলাম এবং আরও পিছে হটিয়া আসিলাম।

 

       প্রায় ২০/২১ দিন মুক্ত থাকার পর ঠাকুরগাঁয়ের পতন হইল। স্থানীয় জনসাধারণ শহর ছাড়িয়া গ্রামে ও ভারতে আশ্রয় নিতে লাগিল। সামরিক নিয়মে সামরিক বাহিনী কোন স্থান ছাড়িয়া দেয় আবার কোন স্থান দখল করে এবং তাহা পরিকল্পনা মাফিক হইয়া থাকে। আমাদেরও তেমন পরিকল্পনা ছিল কিন্তু আমার অনুপস্থিতিতে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হইতে পারে নাই। যাহা হউক, যতদুর সম্ভব গোলাবারুদ, রেশনপত্র সঙ্গে নিয়া গিয়াছি কিন্তু আরও সরকারী বেসরকারী জিনিস নেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিৎ ছিল। মেজর এম,টি হোসেনের অনুপস্থিতিতে আবার আমাকেই দায়িত্বভার নিতে হইল। আমি সুবেদার হাশেম, নায়েক সুবেদার মতিউর রহমানকে আরও ২২ জন লোকসহ মেশিনগান ও অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র দিয়া ঠাকুরগাঁ পাঠাইলাম ব্যাঙ্কের টাকা পয়সা ও মূল্যবান গহনাপত্র যাহা পাওয়া যায় তাহা নিয়া আসার জন্য। তাহারা ঠাকুরগাঁ আসিয়া স্টেট ব্যাঙ্কের সীলমোহর যুক্ত একত্রিশ বাক্স টাকা লইয়া পঁচাগড়ে ফিরিয়া আসিয়া একটি গাড়ীতে বোঝাই অবস্থায় আমার কাছে অর্পণ করে। আমি ১২ জন লোকের একটি গার্ড দিয়া রেশনের গাড়ীতে ঐ গাড়ীটিও রাখিয়া দিই। কিছু দিন পরে এই টাকা ক্যাপ্টেন নজরুল, জনাব সিরাজুল ইসলাম এমসিএ, জনাব আবদুর রউফ এমসিএ-দের উপস্থিতিতে কর্ণেল ব্যানার্জীর হেফাজতে রাখি এবং পরে অর্থমন্ত্রী জনাব মনসুর আলী সাহেব স্বয়ং আসিয়া ঐ টাকা মুজিবনগরে নিয়া যান। আমিও তাঁহার সঙ্গে যাই টাকা জমা দিতে। সেখানে প্রায় ১ কোটির মত টাকা ছিল যাহার হিসাব অর্থমন্ত্রীর কাছে দেওয়া হয়।

 

       ১৭ই এপ্রিল নাগাদ আমাদের কোম্পানীগুলি বিভিন্ন প্রতিরক্ষা ঘাঁটি হইতে পঞ্চগড়ে আসিয়া পৌঁছিল। তাহারা পরস্পরের সহযোগিতায় সেখানে প্রতিরক্ষা ঘাঁটি নির্মাণ করিতে শুরু করিল। ১৭ এবং ১৮ তারিখ বিভিন্ন কোম্পানীর বেশ কিছু লোক যাহারা নানাস্থানে নানাভাবে বিচ্ছিন্ন হইয়াছিল অথবা আটকা পড়িয়াছিল পঞ্চগড় আসিয়া উপস্থিত হইল। আমাদের লোক নতুন উৎসাহ নিয়া কাঞ্চন নদীর তীরে দৃঢ় প্রতিরক্ষা ঘাঁটি নির্মাণে তৎপর হইল। ১৮ তারিখ ছোট ছোট কয়েকটি দল আগে পাঠাইলাম, অনেক দূর আগাইয়াও শত্রুর কোন আনাগোনা দেখা গেল না। আমাদের প্রায় ১০৬ টি পরিবার ছেলেমেয়ে সহ ছিল। এই সুযোগে তাহাদিগকে সরাইয়া নিরাপদ স্থানে নিবার ব্যবস্থা করিলাম। চিকিৎসাধীন কিছু রোগী এবং আহতকেও হাসপাতালে স্থানান্থরিত করা হইল। এই সময় আমাদের কাছে কোন ডাক্তার ছিল না। একমাত্র কম্পাউন্ডার মনসুরই ছিল আমাদের প্রধান অবলম্বন এবং তাহার সঙ্গে কয়েকজন নার্স ছিল। কম্পাউন্ডার মনসুর বিপদের সময় যে কাজ করিয়াছেন, যেভাবে রোগীদের সেবা যত্ন নিয়াছেন তাহা সত্যিই প্রশংসনীয়।

 

       পরের দিন ২৯ শে এপ্রিল দুপুর। আমার সহকর্মী কমান্ডারদের নিয়া নতুন পরিকল্পনা সম্বন্ধে আলোচনার্থে সবেমাত্র ডাকবাংলায় বসিয়াছি এমন হঠাৎ কয়েকটি গোলার শব্দ শোনা গেল। আমার আলোচনা স্থগিত করতঃ বাহির হইয়া পড়িলাম। অবস্থা আঁচ করিতে না করিতেই আরও কয়েকটা শেল আমাদের ডাইনে- বাঁয়ে- পিছনে আসিয়া পড়িল, বুঝিতে বাকী রহিল না দুশমনের প্রত্যক্ষ আক্রমণ অত্যাসন্ন। কমান্ডাররা যে যার স্থানে চলিয়া গেলেন। ইতিমধ্যে দুশমনের একটি গোলা আমাদের একটি গাড়ীর উপর আঘাত করিল এবং তাহাতে আগুন ধরিয়া গেল। গাড়ীটিতে খানসামায় দুশমনদের নিকট হইতে আটককৃত গোলাবারুদ রক্ষিত ছিল, উহার পার্শ্বেই আমার জীপগাড়ীটিও ছিল, কোনমতে তাহা সরাইয়া নিতে সক্ষম হইলাম। আমরা শত্রুর আক্রমণের জবাব দিতে লাগিলাম। চার ঘণ্টা ধরিয়া চলিল, সুবেদার আবুল হাশেমসহ কয়েকজন আহত হন। ইহাদেরকে পরে হাসপাতালে পাঠানো হয়। অবশেষে ট্যাঙ্ক সহ শত্রু বাহিনী আমাদের উপর ঝাঁপাইয়া পড়ে এবং আমরা পশ্চাদপসরণ করিতে বাধ্য হই। এইবার আরও হাতিয়ার গেল। গোলাবারুদ গেল, বাহিনীর বহু লোক পালাইয়া গেল। নায়েক সুবেদার খালেক ও সুবেদার হাফেজ সাহসে ভর করিয়া ঐ দিন সন্ধ্যায়ই কিছু লোকজনসহ ভজনপুর গিয়া পৌঁছিলেন। এপ্রিলের ২০ তারিখের ভোর হইতে না হইতে তাহারা ভজনপুর ঘাঁটি নির্মাণের কাজ শুরু করিয়া দিলেন। আমি তাহাদেরকে যথারীতি উপদেশ দিয়া নানা জরুরী কাজে ও বিচ্ছিন্ন লোকদেরকে জড় করার উদ্দেশ্যে পিছনে গেলাম। এই দিকে দুশমনরাও অতি তাড়াতাড়ি জগদল এবং ওমরখানায় তাহাদের শক্ত ঘাঁটি গাড়িয়া বসিল। ওমরখানা পর্যন্তই শেষ ঘাঁটি ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত এই অবস্থা বিদ্যমান ছিল।

 

       তারপর ঐ মাসের অর্থাৎ এপ্রিল মাসের এক শুভক্ষণে জানিতে পারিলাম যে স্বাধীন বাংলার সরকার গঠিত হইয়াছে। এমতাবস্থায় মে মাসের ৮ তারিখ আমাদের মুক্তিবাহিনী প্রধান তদানীন্তন কর্ণেল এম এ জি ওসমানী আমাদেরকে ভারতের কদম তলায় ডাকিয়া পাঠান। সেখানে এক জরুরী সভা হইল। তাহাতে যোগ দিলেন ক্যাপ্টেন নজরুল হক, ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ এবং কয়েকজন ভারতীয় অফিসার। মুক্তিবাহিনী প্রধান বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ  হইতে যুদ্ধের পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করিলেন। এরপর তিনি তার পরিকল্পনা অনুসারে আমাদিগকে নির্দেশ দান করিলেন। আমরাও আমাদের অভাব অভিযোগ জ্ঞাপন করিলাম, তিনি যথাসাধ্য পূরণ করার আশ্বাস দিলেন। উক্ত সভায় তিনি ক্যাপ্টেন নজরুল হক সাহেবকে আমার ব্যাটালিয়নের দায়িত্বভার অর্পণ করিলেন। তারপর ঐ দিনই সন্ধ্যায় তিনি আমাদের ভজনপুর ঘাঁটিতে আগমণ করিলেন। তাহার দর্শন লাভে উৎসাহ ও উদ্দীপনায় আমরা আরো সতেজ হইলাম, তার উপদেশের মাধ্যমে পথের দিশা পাইলাম। অধিকন্তু তিনি ক্যাপ্টেন নজরুল সাহেবকে আমাদের অধিনায়ক রুপে নিয়োগ করায় আমরা আরো উৎসাহিত হইলাম। এর কিছুদিন পর প্রধান সেনাপতি আবার ভজনপুর আসেলেন, সঙ্গে বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ। ইহাতে জোয়ানরা খুব খুশী হইল, তাহাদের মনোবল দৃঢ়তর হইল। ততক্ষনে ভারত হইতে অপ্রচুর হইলেও বিভিন্ন রকম সাহায্য আসিতে আরম্ভ করিয়াছে। অতএব মুক্তি সংগ্রামীদের মনোবল উর্ধ্বমূখী হইয়া উঠিল।

 

       ৯ই মে ক্যাপ্টেন নজরুল আমার ব্যাটালিয়নের দায়িত্বভার গ্রহণ করিলেন এবং আমি তাহার সহকারী হিসাবে কাজ করিতে লাগিলাম। এ সময় দুশমনরা ওমরখানার জগদল এলাকায় দৃঢ় প্রতিরক্ষা ঘাঁটি নির্মাণ করিয়া ফেলিয়াছে। তাই আমরা আমাদের মূল ঘাঁটি ভজনপুরের ৩/৪ মাইল আগে মাগুরমারী ও ময়নাগুড়ি নামক স্থানে দুইটি পোষ্ট খুলিয়া দুইটি ক্ষুদ্র সৈন্যদল পাঠানোর ব্যবস্থা করিলাম। ২৬শে এপ্রিল হাবিলদার দেওয়ানের নেতৃত্বে ১০ জনের একটি ছোট দল প্রথম ওমরখানার কাছে মাগুরমারীতে পাঠানো হইয়াছিল। তাহারা দুশমনের গতিবিধি নিরীক্ষন করিত এবং পিছনে আমাদেরকে খবর দিত। ৩০শে এপ্রিল শত্রুদের হঠাৎ আক্রমণে এই ছোট দলের ২ জন শহীদ এবং অন্য ২ জন গুরুতরভাবে আহত হইয়া হাসপাতালে নীত হয়। যাহা হউক, মাগুরমারীতে ক্রমান্বয়ে লোকসংখ্যা বাড়াইয়া শেষ পর্যন্ত দেড় কোম্পানীর মত করা হয়। এর এক কোম্পানী নতুন সি কোম্পানী নাম নিয়া নায়েক সুবেদার হাজী মুরাদ আলীর নেতৃত্বে দুশমনের ওমরখানা ঘাঁটির সন্নিকটে প্রতিরক্ষা ঘাঁটি নির্মাণ করে। ২রা মে হইতে জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ নাগাদ তাহারা সেখানে অবস্থান করে এবং দুশমনদের শতাধিক সৈন্য ও চার পাঁচখানা গাড়ী ধ্বংস করাসহ অশেষ ক্ষতি সাধন করিয়া তাহাদিগকে নির্বাক নির্বীয করিয়া রাখে। আমার হিসাব মতে সিপাহী আবুল হোসেন একাই সত্তর জনের মত শত্রুসেনা খতম করিয়াছে। তবে এই দলকে বহু কষ্টের মধ্যে দীর্ঘ দুই মাস কাটাইতে হইয়াছে, কেননা উন্মুক্ত আর নীচু জায়গায় পজিশন থাকা বিধায় দিনের বেলা এরা সামান্য নড়াচড়া পর্যন্ত করিতে পারিত না- শুধু রাত্রেই এদের খাওয়ার সুযোগ ঘটিত। আমি মাঝে মাঝে এই কোম্পানীর সহিত সাক্ষাৎ করিতে যাইতাম। কোন কোন সময় আমি দেখিয়াছি বৃষ্টির মত গোলাগুলির মধ্যেও হাজী মুরাদ আলী তাহার লোকজনের তদারকি করিয়া ফিরিতেছেন। আমার মতে হাজী মুরাদ আলীর বলিষ্ঠ নেতৃত্বেই এই ক্ষুদ্র দলটি নির্ভীক সৈনিকের ভূমিকা পালন করিতে অনুপ্রাণিত হইয়াছিল।