সাক্ষাৎকারঃ সুবেদার মেজর মোঃ কাজিমমউদ্দিন

Posted on Posted in 10

<১০, ১২.৪, ৩১৪-৩১৮>

সাক্ষাতকারঃ সুবেদার মেজর মোঃ কাজিমউদ্দিন

 

জুন মাসের শেষের দিকে উইং কমান্ডার মোহাম্মদ খাদেমুল বাশার আমাদের সেক্টরের অধিনায়ক নিযুক্ত হইয়া আসিলেন এবং তেঁতুলিয়ায় তাহার দপ্তর স্থাপন করিলেন। তিনি পাক বিমান বাহিনির অফিসার। সদ্য মুক্তিবাহিনিতে যোগ দিয়েছেন। স্থলযুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাঁহার সীমাবদ্ধ বৈকি। তবু তাহাকে পাইয়া আমরা আরো উতসাহিত হই এবং আমাদের মনোবল বাড়িয়া যায়। তিনিও অল্পদিনের মধ্যে বিশেশ নিপুনতার পরিচয় দিয়া আমাদেরকে চমৎকৃত করিলেন। রংপুর ও ঠাকুরগাঁও এলাকা নিয়া সেক্টর গঠিত ছিল। তেতুলিয়ায় থাকিয়া কিছুদিন পর্যন্ত কাজ করার পর স্কোয়াড্রন লীডার সদরউদ্দিন সাহেব আসিলেন। ৬ নং সেক্টরকে ২ টি সাব সেক্টরে ভাগ করা হইল। ঠাকুরগাঁ এলাকা নিয়া সাব সেক্টর ৬ এ এবং রংপুর এলাকা নিয়া সাব সেক্টর ৬ – বি। সদরউদ্দিন সাহেব ৬ এ সাব সেক্টর কমান্ডার এবং ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ সাহেব সাব সেক্টর বি এর কমান্ডার নিযুক্ত হইলেন। তখন ক্যাপ্টেন নজরুল হক সহ সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হইলেন। জুলাই মাসের প্রথম দিকে নজরুল হক সাহেব অসুস্থ হওয়ায় আমাকেই পুনরায় কমান্ড নিতে হইল কেননা সদরউদ্দিন সাহেবও উপস্থিত ছিলেন না। আমাদের কাজ চলিতে থাকে। প্রারম্ভ হইতে এই সময় পর্যন্ত আমরা স্বাধীন এলাকার জনসাধারনের সাহায্য সহানুভূতি পাইয়াছি প্রচুর। সমর্থন ও ভালবাসা পাইয়াছি অফুরন্ত। এই দুর্দিনে এদের মধ্যে এককভাবে যিনি আগাগোড়া আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসিতেন, এমনকি অনেক সময় সামরিক অফিসারের ভূমিকা নিয়া কাজ করিতেন তিনি হইলেন পঞ্চগড় ময়দানদীঘির স্বনামধন্য এডভোকেট জনাব সিরাজুল ইসলাম এম সি এ।

যাই হউক, ইতি মধ্যে আমরা নূতন সেক্টর কমান্ডারের নির্দেশ ও প্রেরনায় এবং পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার প্রয়াস পাইতেছি। দুশমন কে অনেকটা ঘেরাও করিয়া তাহার নিকটবর্তী হওয়ার চেষ্টায় আছি। ভজনপুর ডিফেন্স হইতে কোম্পানীগুলিকে উঠাইয়া এলাকার পরিপ্রেক্ষিতে ৩-৬ মাইল আগ বাড়াইয়া অগ্রবর্তী ঘাঁটিতে লাগানো হইল। কাজেই দুশমনের সঙ্গে ছোটখাটো সংঘর্ষ আমাদের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যপার হইয়া দাঁড়াইল। বন্ধুরাষ্ট্রের সাহায্যে আমরাও দুশমন কে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিলাম। দিনে দিনে নূতন মুক্তিসেনার দল ট্রেনিং শেষে বাহিনিতে আসিয়া যোগ দিতে লাগিল, আর পরিকল্পনা অনুসারে আমরা তাহাদিগকে দখলকৃত এলাকায় পাঠাইতে আরম্ভ করিলাম। এই সময় আমরা ফিল্ড হেডকোয়ার্টার ভজনপুর হইতে ৫ মাইল সামনে দেবনগর নামক স্থানে স্থাপন করিলাম এবং সাব সেক্টর হেডকোয়ার্টার তেঁতুলিয়া হইতে ভজনপুর নিয়ে আসা কোম্পানিগুলোর পজিশন ছিল সুবেদার হাফিজের এ কোম্পানী  পঞ্চগড়ের পেছনে কাগপাড়া – ওমরখানা, নায়েক সুবেদার আব্দুল খালেকের বি কোম্পানী সাহেবজুত বেড়াজুত এবং নায়েক সুবেদার মুরাদ আলীর সি কোম্পানী নছুয়াপাড়া এলাকা। সন্দেহ নাই পূর্বের বিধ্বস্ত অবস্থা কাটাইয়া আমরা তখন অনেকটা সংগঠিত ও সুবিন্যস্ত। তবু যেন একটা বিরাট শুন্যতা সব সময় আমরা অনুভব করিতে লাগিলাম। মঙ্গলময়ের ইচ্ছায় এমনি সময় জুলাই মাসের ১৫ তারিখে আঞ্চলিক অধিনায়ক উইং কমান্ডার বাশার একজন নুতন অফিসার নিয়া দেবনগর আসিলেন কনফারেন্স করিতে। তথায় উপস্থিতদের মধ্যে সুবেদার মেজর কাজিমউদ্দিন,  সুবেদার মুহাম্মদ আব্দুল হাফিজ, নায়েক সুবেদার হাজী মুরাদ আলি ও নায়েক সুবেদার আব্দুল খালেকের নাম উলেখযোগ্য। সিও সাহেব বলিলেন, “ আমাদের মুক্তিবাহিনী পুরোপুরি সংগঠিত হইতে যাইতেছে এবং ভবিষ্যতে আমাদের যুদ্ধের অসুবিধা অনেক ক্ষেত্রেই লাঘব হইবে। তারপর তিনি সঙ্গে আসা সেই নতুন অফিসারকে পরিচয় করাইয়া দিলেন এবং তাহাকে আমাদের সাব সেক্টরের ফিল্ড অফিসার হিসাবে নিযুক্ত দিলেন। অন্যান্য অফিসারের অনুপস্থিতিতে সাময়িকভাবে তিনি  সাব সেক্টর কমান্ডার পদেও অধিষ্ঠিত হইলেন। আমি আবার সহকারী হিসাবে কাজ করিতে লাগিলাম।

নূতন ফিল্ড অফিসার পাইয়া আমরা ভারী খুশি। তাহার সঙ্গে অনেক কথাবার্তা হইল। খুব হাসিখুশি, চটপটে আর ছোট্ট গড়নের মানুষটি তিনি, কিন্তু তেজোদীপ্ত চেহারা। পাক পদাতিক বাহিনীর ক্যাপ্টেন তিনি। নাম সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান। কুমিল্লার অধিবাসি। বর্তমান বসতি চাঁটগা। ৬৮ তে কমিশন পাইয়ছেন শুরুতে ১১বালুচ ও পরে ৩১ এফ এফ রেজিমেন্টে চাকুরী করিয়াছেন। সেখান হইতে ন্যাশনাল সার্ভিস ক্যাডেট কোরে চলিয়া যান এবং পলায়ন পূর্ব পর্যন্ত লাহর রৈস্যাবারে পি টি এস ও এবং প্রশিক্ষনদাতার পদে বহাল ছিলেন। কার্য উপলক্ষ্যে আজাদ কাশ্মীর, ঝিলাম,মংলা, শিয়ালকোট ঘুরিয়া অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। ৭১ সালের ৩ রা জুলাই কন এক সুযোগে (পশ্চিম) পাকিস্তান হইতে পালাইয়া আসেন তিনি মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করিতে। শুধু নিজেই আসেন নাই সঙ্গে নিয়া আসিয়াছেন আরো তিনজন অফিসার। যাই হউক অতঃপর কনফারেন্স শেষে অফিসাররা চলিয়া গেলেন সেদিনকার মত।

১৮ ই জুলাই ক্যাপ্টেন শাহরিয়ার আমাদের অধিনায়ক পদয়ে যোগ দিলেন দেবনগরে। দেখিলাম আমাদের প্রথম দর্শনের অনুমান মিথ্যা নয়। তাহার উপস্থিতিতে আমাদের মুক্তিসংগ্রাম অভূতপূর্ব এক মোড় নিল। তাহার যাদু স্পর্শে যেন সঞ্জীবিত হইয়া উঠিল সুপ্ত সাব সেক্টর অকুতোভয় অপরাজেয় মনবলের অধিকারী আর নিবেদিতপ্রাণ খাঁটি বাংলা মায়ের সন্তান তিনি। নিমেষে খাপ খাওয়াইয়া নিলেন নিজেকে বাংলার কাদামটির সঙ্গে। নিখুঁত বীর, মর্দে মোজাহিদ তিনি। মুক্ত এলাকার জনসাধারণ এবং আমরা তাহার কাজে মুগ্ধ হইয়া আদর করিয়া তাহাকে বাংলার বিচ্ছু বলিয়া ডাকিতাম। অনেকের মত নাক সিটকাইয়া ভ্রু কুচকাইয়া ভড়ং দেখন না। তিনি আসিয়াই সমস্ত  ডিফেন্স এরিয়া ঘুরিয়া প্রত্যেকটি সৈনিকের সঙ্গে দেখা করিলেন এবং তাহাদিগকে বিভিন্নভাবে সান্ত্বনা ও উৎসাহ দান করিলেন। সৈনিকেরা তাহার পরশে আবার যেন নতুন করিয়া আশার আলো দেখিতে পাইল। তাহাদের এতদিনের শূন্যতা ঘুচিয়া একটা মূখ্য অভাব পূরন হইল। কারন ক্যাপ্টেন ছিলেন পদাতিক বাহিনীর লোক। তাই নবম শাখার অভাব অসুবিধা সম্বন্ধে অবগত হইতে এবং খুঁটিনাটি খুঁজিয়া বাহির করিতে তাঁহার বেশী সময়ের প্রয়োজন হয়নাই। অবশ্য মানসিক ও দৈহিক পরিশ্রম করিতে হইয়াছিল যথেষ্ট। সবচেয়ে বড় অসুবিধা ছিল রেশন ও গোলাবারুদ সরবরাহ ও সংগ্রহ নিয়া। এক সপ্তাহের মধ্যে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ ও এজেন্সীর সাথে যোগাযগ করিয়া আন্তরিক সম্পর্কের মাধ্যমে সংগ্রহ ও সরবরাহ করিয়া আনিলেন তিনি। তারপর ডিফেনসিভ পজিশন ও যুদ্ধের অন্যান্য জরুরী ব্যপারগুলির খুটিনাটি খুঁজিয়া বাহির করিয়া কিছুটা ঠিক করিলেন। যে সমস্ত সৈন্য নানাভাবে বিভিন্ন সময়ে ছত্রভংগ হইয়া বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিয়াছিল তাহাদিগকে খবর পাঠানো হইল। কোন কোন স্থানে লোকও পাঠানো হইল যাহাতে তাহারা নিজেদের ইউনিটে যোগদান করে। ক্রমে সৈন্যসংখ্যা বাড়িতে লাগিল এবং তাহারা মাসিক ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পাইতে শুরু করিল। সৈন্যদের মনোবল ক্রমাগত দৃঢ় হইতে লাগিল এবং সঙ্গে সঙ্গে পাকবাহিনী বিভিন্ন অপারেশনের মাধ্যমে বুঝিতে পারিল এই এলাকায় মুক্তিবাহিনীর শক্তি ও রণনৈপুন্য দিন দিন বাড়িয়া চলিয়াছে। তাই তাহারাও তাহাদের শক্তি ও সংখ্যা বাড়াইতে লাগিল। এইদিকে নবম শাখার কিছু লোক পুলিশ ও আনসার তেঁতুলিয়া বাংলাবান্ধা ও অন্যান্য স্থানে বিশ্রামে রত ছিল। ক্যাপ্টেন শাহরিয়ার সেই দিকেও খেয়াল করিলেন। ইতিমধ্যে আমাদের পুরাতন তিনটি কোম্পানি পঞ্চগরের দিকে আরো দুই মাইল অগ্রসর হইয়া পজিশন নিল। পাকিস্তানিদের শক্তি এবং সংখ্যাও দিন দিন বাড়িতে লাগিল। তাই তেঁতুলিয়া ও অন্যান্য স্থানের বিশ্রামরত লোকদেরকে ক্যাপ্টেন নিজে গিয়া যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়া আসিলেন এবং তাহাদিগকে নিয়া নতুন কম্পানি খাড়া করিলেন। কম্পানির নাম দেওয়া হইল “ডি” এবং সুবেদার আবুল হাশেমকে সেই কোম্পানীর অধিনায়ক নিযুক্ত করা হইল। নূতন কোম্পানির কিছু প্রশিক্ষনের প্রয়োজন ছিল তাই কয়েকদিন তাহারা ডিফেন্সের পিছনে থাকিয়া তা সমাপ্ত করিল। ইতিমধ্যে পাকবাহিনির কর্মতৎপরতা বাড়িয়া উঠিল। তাহাদের সাথে আমাদের ছোটখাটো সংঘর্ষ হইল। এরপর প্রধানপাড়া, ডাঙ্গাপাড়া ও নুনিয়াপাড়া নামক গ্রামে তাহারা হঠাত আমাদের উপর বড় রকমের আক্রমন চালায়। ইহাতে  আমাদের কিছু লোক আহত ও শহিদ হইলেন। “এ” কোম্পানী যেটা উক্ত এলাকায় ছিল প্রায় ছত্রভংগ হইয়া পরিল। কিন্তু তাহার সুযোগ্য অধিনায়ক সুবেদার হাফিজ একদিনের মধ্যেই সমস্ত কোম্পানিকে একত্র করত আরো শক্ত করিয়া ডিফেন্স নিলেন। তারিখটি ছিল ২৮ শে জুলাই। দিন কয়েক পর পাকিস্তানীদের কয়েকটি অগ্রবর্তী ঘাঁটি যাহা চাওয়ি নদীর তীরে ছিল তাহাতে আমরা প্রচন্ড আঘাত হানি। তাহাদের অনেক হতাহত হয়। আমরা কিছু হাতিয়ার ও গোলাবারুদ কব্জা করি। এরপর ঘন ঘন ছোট খাটো আক্রমন প্রতিআক্রমন বেশ কয়েক দফা হইয়া গেল। আমাদের নিয়মিত ফাইটিং পেট্রল পাকসেনাদের উপর আক্রমন চালাইয়া বহূ হতাহত করিতে লাগিল। এমন একটি দিন ও রাত বাকী থাকিত না যে, পাকিস্তানীরা আহত ও মৃত সৈন্য নিবার জন্য পালটা আক্রমন ও কভারিং ফায়ার না করিত। এইদিকে আমাদের নবগঠিত “ডি” কোম্পানীও পজিশনে আসিল এবং সবাই মিলে আর এক মাইল অগ্রসর হইয়া পজিশন নিল। পাকিস্তানিদের বিতৃষ্ণার সীমা রহিল না কিন্তু সংখ্যা তাহাদের পুরন হইতে থাকিত পিছনে হইতে নিয়মিত সৈন্য আমদানি করিয়া। এই পর্যায়ে একদিন প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দিন আহমদ দ্বিতীয়বারের মত আমাদের সাব সেক্টরে যান এবং ফিল্ড হেডকোয়ার্টার দেবনগরে শুভাগমন করতঃ বিভিন্ন অগ্রবর্তী ঘাঁটি পরিদর্শন করিয়া আমাদের জোয়ানদেরকে উৎসাহিত করেন।

আমাদের কর্মতৎপরতা দেখিয়া কর্তারা খুশি হইলেন এবং গোলাবারুদ ও গোলন্দাজ সাহায্য নিয়মিতভাবে দিতে লাগিলেন। এইদিকে আমাদের মর্টার প্লাটুনও গোলাবারুদ পাইয়া গুরুত্বপূর্ণ পাকিস্তানী অবস্থানসমুহের উপর সুযোগমত বারবার গোলাবর্ষণ করিয়া তাহাদের মনে ভীতির সঞ্চার করিয়া দিল। আমাদের সাব সেক্টরের সৈন্যসংখ্যা বাড়িল, হাতিয়ার বাড়িল, গোলাবারুদ বাড়িল,  শক্তি ও মনোবল আরো দৃঢ় হইল, কর্মতৎপরতা ও রণনৈপুণ্যে পাকিস্তানিরা পরাজিত হইতে লাগিল, কিন্তু পূর্ণতার জন্য আরো কিছু প্রয়োজন ছিল আরো প্রশিক্ষন ও কলাকৌশল দরকার ছিল। তাই ক্যাপ্টেন শাহরিয়ার একখানা ছোট বই ছাপাইয়া তাহার কপি সবাইকে দিলেন। তাহাতে সব নূতন পুরাতন হাতিয়ারের যাবতীয় বিবরণ ও ব্যবহার পদ্ধতি সুন্দরভাবে লেখা ছিল। তাহাতে আরো ছিল বিভিন্ন খবরাখবর ও উতসাহের কথা যাহা যুদ্ধের প্রয়োজনে জানা নেহায়েত দরকার। এইভাবে কাজের ও যুদ্ধের ফাঁকে অসুবিধা সত্বেও চারিদিকে প্রশিক্ষন চলিতে লাগিল। আমাদের ক্যাপ্টেন শ খানেক উৎসাহী গ্রাম্য ছেলে ভর্তি করিলেন যারা ছিল অত্র এলাকার বাসিন্দা। তাহাদের একমাস প্রশিক্ষন দেবার পর চারটি কোম্পানীতে  ভাগ করিয়া দেয়া হইল যাহাতে রাজাকার ও অন্যান্য দালাল ধরিয়া দিতে অসুবিধা না হয়। অধিকন্তু এলাকা ও দুশমন সম্বন্ধে যেন সঠিক খবর পাওয়া যায়। এইসব নতুন লোক ভর্তি ও বিভিন্ন প্রশিক্ষনের বদৌলতে ইতিমধ্যে সাব সেক্টরে একটি সুসংগঠিত পদাতিক ব্যাটালিয়নে পরিনত হল।

সেপ্টেম্বর মাসের ৭ তারিখ একবার জগদলহাট অধিকার করা হইল কিন্তু পাকসেনাদের গলন্দাজ ও জিপে বসানো মেশিনগানের গোলাগুলিতে টিকিয়া থাকা মুশকিল হইল। তাহারা পালটা আক্রমন করে। আমাদের বাহিনী পশ্চাদপসরনে বাধ্য হয়। ঐ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ হইতে পাকিস্তানীরা রীতিমত ভড়কাইয়া গেল কারন তখন হইতে হাতেকলমে সামরিক শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা লাভের জন্য সদ্য ও স্বল্প প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা প্রতি সপ্তাহে গড়ে ২/ ৩ শত করিয়া আমাদের কাছে আসিতে লাগিল। তাহারা সপ্তাহ দুই একের জন্য আসিত এবং অভিজ্ঞতা অর্জনের পর নিজ নিজ অঞ্চলে গেরিলা যুদ্ধের জন্য চলিয়া যাইত। ইহাতে আমাদের সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনার অনেক অসুবিধা হইত বটে কিন্তু যুদ্ধেরব ব্যপারে সুবিধাও ছিল অনেক। আমাদের ক্লান্ত সৈন্যরা মাঝে মাঝে স্বস্তিতে বিশ্রাম করিতে পারিত।

জগদলহাটের আক্রমনটা কিন্তু আমাদের চূড়ান্ত যুদ্ধের মহড়া ছিল। এ ধরনের মহড়া আমরা প্রায়ি করিতাম। ভীত ও নিরাশ পাকিস্তানীরা বহু হতাহতের দরুন হাঁপাইয়া উঠিল। সুযোগ বুঝিয়া আমরা আরো দুই মেইল অগ্রসর হইলাম এবং চাওই নদী আমাদের নিয়ন্ত্রনে নিয়া আসিলাম। তাহাতে অবশ্য আমাদেরও কিছু হতাহত হইল। এ পর্যায়ে ৯ ই অক্টোবর স্বাধীন বাংলার কমিশন প্রাপ্ত প্রথম ক্যাডেট দলের সদ্য পাশ করা তরুন সেঃ লেফটেন্যান্ট আব্দুল মতিন চৌধুরী ও সেঃ লেফটেন্যান্ট মাসুদুর রহমান আমাদের সাব সেক্টরে যোগদান করিলেন। অফিসারের নিতান্তই অভাব ছিল তাই নতুন হলেও এতে আমরা যথেষ্ট উপকৃত হইলাম।

এরপর পাকিস্তানীদের চলাচল একেবারে সীমাবদ্ধ হইয়া পড়িল, কারন আমরা অগ্রসর হওয়াতে অমরখানা পঞ্চগড় রাস্তা আমাদের পেট্রল ও প্রতিরক্ষা হাতিয়ারের আঘাত খমতার আওতায় আসিয়া গেল। আমরা তাহাদের পক্ষে সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিকর রক্ষাবুহ্য রচনা শুরু করিলাম। গড়ে বিভিন্ন অপারেশনে প্রতিদিন পাকিস্তানীদের পাঁচ/ছয় জন করিয়া হতাহত হইতে লাগিল। ২০/ ২৫ দিন এমনতর চলিল। পাকিস্তানীরা সৈন্য পরিবর্তন ও পরিপূরন করিতে লাগিল।

তারপর আমরা দুশমনদের সুদূরবিস্তৃত ঘাঁটিগুলি এমনভাবে ঘেরাও করিয়া বিভিন্ন হাতিয়ারের সাহায্যে আক্রমন চালাইতে লাগিলাম যাহাতে তাহারা অগ্রবর্তী ঘাটীগুলি ছাড়িয়া পিছে হটিতে শুরু করিল। এই সূত্র ধরিয়া ২১ শে নভেম্বর বিকাল ৪ ঘটিকায় আমাদের প্রথম অগ্রাভিযান শুরু হয় তেঁতুলিয়া –ঠাকুরগাঁ সৈয়দপুর পাকা রাস্তাকে অক্ষরেখা ধরিয়া। দুশমন পালাইতেছে আর আমরা পিছনে ধাওয়া করিয়া চলিয়াছি। ২২ তারিখ অমরখানা দখল করিয়া জগদলের দিকে অগ্রসর হইতে লাগিলাম। লাল স্কুলের কিছু আগে দুশমনের আভাস পাওয়া গেল। রাত তখন ১১ টা। পিছনে বহু কিছু বাকি ভাবিয়া ক্যাপ্টেন শাহরিয়ার অগ্রগমন বন্ধ করিয়া আত্মরক্ষামূলক পজিশন নিতে বলিলেন। অগ্রাভিযানের অক্ষে ছিল বি ও সি কোম্পানী। বি কোম্পানীর অধিনায়ক ছিলেন সুবেদার আব্দুল খালেক আর সি কোম্পানীতে ছিলেন লেফটেন্যান্ট আব্দুল মতিন ও সুবেদার হাজি মুরাদ আলী। আবার তাহাদের ডাইনে বামে ছিল যথাক্রমে সুবেদার আহমদ হোসেনের “এ” কম্পানী ও সুবেদার আবু হাশেমের “ডি” কোম্পানী। তাহারা সকলে নিজ নিজ কোম্পানির জিম্মাদারি এলাকা বুঝিয়া নিলেন ক্যাপ্টেনের কাছ হইতে।

পরদিন সকাল হইতে শুরু হইল আমাদের অগ্রাভিযান। আমরা এখন দলে ভারী। আমাদের চার কোম্পানী ছাড়াও ৫/৭ জন মুক্তিযোদ্ধা আমাদের সাথে যোগ দিয়েছে। গোলাবারুদ সাজসরঞ্জামের  কমতি নাই। কাজেই দুশমনের উপর দিলাম ভীষন চাপ। দুশমনদের পা এখন শূন্যে। তাহারা বহুদিনের পুরাতন রক্ষাব্যুহসমূহ ছাড়িয়া দিয়া আর পা মাটিতে লাগাইতে পারতেছেনা।তাহাদের ভাব এখন পালাই পালাই প্রাণ বাঁচাই। আমাদের ভাব মার-মার। তাহারা ভীতসন্ত্রস্ত সদাচকিত পলায়নপর। আর আমরা মহাপ্রাপ্তির বিজয়ের নেশায় আর শতগুনে উতসাহিত ও মাতোয়ারা দিগ্বিজয়ী বীরের বেশে অগ্রসরমান। এ যেন অনেকটা নেকড়ে আর মেষের মোকাবিলা। তবু জগদলের নিকট বেশ কয়েকজন আহত ছাড়াও আমার সাব সেক্টরের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর বেঙ্গল রেজিমেন্টের লেঃ নায়েক শাকিলউদ্দিন শহিদ হন। আমাদের আগে বাড়ার পালা চলিতে লাগিল। কোথাও তুমুল সংঘর্ষ, কোথাও মামুলি,  আবার কথাও একেবারে না।

২৭ শে নভেম্বর। পঞ্চগড় শহর মুক্ত হইল। আগাইয়া চলিলাম। বোদা পৌছিলাম। যুদ্ধের সাধারন বাধাবিপত্তি কাটাইয়া (কোথাও দুশমন কর্তৃক পুল উড়াইয়া দেওয়া,  কোথাও বা মাইন পুঁতিয়া রাখা) অগ্রাভিযান জারি থাকিল। ৩ রা ডিসেম্বর ঠাকুরগাঁ শহর কব্জা হইল। ৪ ঠা ডিসেম্বর সমাগত। এক্ষনে মিত্রবাহিনী সাঁজোয়া ও গোলন্দাজ ইউনিটসহ আমাদের সঙ্গে আসিয়া যোগ দিলেন। কেননা পাকিস্তান ততক্ষনে যুদ্ধ ঘোষনা করিয়াছে এবং মহান ভারতও তাহার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করিয়া প্রত্যক্ষ সমরে নামিয়াছে। বাস। আমাদের পায়াভারী। আরো নির্ভয় ও বেপরোয়া হইয়া উঠিলাম। আগে বাড়িয়া চলিলাম। বিরাম নাই। আগে বাড়িতে বাড়িতে একেবারে বিরগঞ্জ ভাতগাঁও ব্রীজ। এ অগ্রাভিযানে ইতিমধ্যে বোদা বীরগঞ্জ ও অন্যান্য স্থানে বহু দুশমন হইয়াছে আহত আর বন্দী। প্রচুর হাতিয়ার ও গোলাবারুদ রেশন হইয়াছে আমাদের হস্তগত। রাজাকার ও দালালের ত কথাই নাই। কুড়ি কুড়ি শ শ প্রতিদিন আত্মসমর্পণ করিতেছে আর অজস্র হাতিয়ার গোলাবারুদ দিয়া যাইতেছে জমা।

৯ অথবা ১০ ই ডিসেম্বর। স্থান ভাতগাঁও ব্রিজ আর তার আশপাশ এলাকা। দুশমনদের নিকট থেকে আসল ভীষন বাধা। দুইটি ট্যাঙ্ক ধ্বংসসহ বহু মিত্র সৈন্য হতাহত হইল যাহা এই এলাকায় এর আগে হয়নাই কখনো। অগত্যা একনাগাড়ে কয়েকদিন ওখানে থাকিতে হইল, মিত্রবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করা হইল। সম্মুখের দিকে একেবারে চুপ থাকিয়া বাম হাতে খানসামা হইয়া হঠাত প্রবল আক্রমন চালানো হইল যাহাতে অংশ নিল মিত্রবাহিনীর ৬ টি মাঝারিসহ ৬০ টি বিমান, একখানা হেলিকপ্টার, দুইটি ফাইটার ও একটি ট্যাঙ্ক বহর। মুহূর্তে বহু দুশমন সেনা হতাহত হইল ধ্বংস হইল ৬ খানা ট্যাঙ্ক বাকী দুশমন সৈন্য ঘাঁটি ছাড়িয়া লেজ গুটাইয়া নীলফামারির দিকে দিল ছুট। ফলে প্রধান অংশ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া অবরুধ হউয়ার নিশ্চিত আশঙ্কায় দুশমনরা ভাঙ্গিয়া পরিল। তাহারা ভাতগাঁওয়ের বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ মজবুত পুলটিকে একেবারে ধ্বংস করিয়া আমাদের জন্য একটি বিরাট বাধা সৃষ্টি করতঃ সে এলাকা হইতেও পাততাড়ি গুটাইল একেবারে সৈয়দপুর। আমাদের তরফ হইতেও দুইমুখী পশ্চাদ্ধাবন চলিতে লাগিল নাছোড়বান্দা হইয়া। সৈয়দপুর প্রায় ঘেরাও। হঠাত দেখা গেল পাকবাহিনীর হাতে সাদা নিশান শান্তির প্রতীক আত্মসমর্পণের চিহ্ন। জেনেভা কনভেনশন নমস্য। তাই আমাদের অস্ত্র সংবরন করিতে হইল লড়াইয়ে দিতে হইল ইতি। দিনটি ছিল ১৬ই ডিসেম্বর।

স্বাক্ষরঃ মো কাজিমউদ্দিন

ডি এ ডি

১২- ৬-১৯৭৪