সাক্ষাৎকার- মেজর এ আর আজম চৌধুরী

Posted on Posted in 9

<৯, ৭.২, ২৪৭-২৫০>

চুয়াডাঙ্গাকুষ্টিয়া প্রতিরোধ
সাক্ষাৎকার- মেজর এ আর আজম চৌধুরী

২৬০৩১৯৭৩

 

আমি তখন চুয়াডাঙ্গা ইপিআর ৪নং উইং-এ একজন ক্যাপ্টেন হিসেবে কাজ করছি। ২৩শে মার্চ আমাদের সীমান্ত পরিদর্শনে যাই। ফিরি ২৫শে মার্চ রাত সাড়ে এগারোটার দিকে। মেজর ওসমান চৌধুরী ২৪শে কুষ্টিয়া গিয়েছিলেন। ২৬শে মার্চ ১২টার দিকে চুয়াডাঙ্গাতে আসেন।

 

যশোর ইপিআর হেডকোয়ার্টার থেকে ইপিআর মেজর চুয়াডাঙ্গাতে যান আমাদের সকল অফিসারকে আনবার জন্য কনফারেন্সের নাম করে ২৫ তারিখ সকাল ১০টার দিকে।

 

রাতে ফিরে শুনলাম যশোরের মেজর চুয়াডাঙ্গায় অবাঙালি ক্যাপ্টেন মোঃ সাদেকের বাসায় আছেন। ২৬শে মার্চ সকাল সাড়ে ছ’টার দিকে মেজরসহ ক্যাপ্টেন সাদেক ও তার পরিবার আমার বাড়িতে আসে। আমি বাথরুমে ছিলাম। বের হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মেজর বললো, ‘এতনা জলদী আগিয়া?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, কাজ শেষ হয়ে গেছে।’ আমি মেজরকে দুপুরের খানা খেয়ে যেতে বললাম। অবাঙালি মেজর রাজী হলো না।

 

১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর হতে আমাদের কাছে চিঠি আসে কতজন পাঠান এবং পাঞ্জাবী পরিবার পূর্ব পাকিস্তানে আছে তার একটা তালিকা পাঠাতে। আমরা পৃথক পৃথক ভাবে সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে সে তালিকা পাঠিয়ে দেই। ২৬শে সকালে ক্যাপ্টেন সাদেকের স্ত্রী আমার আম্মার সাথে কান্নাকাটি করলেন। কিছুতেই যেতে চাচ্ছিলেন না। তিনি শেষবারের মতো বললেন, ঢাকাতে যদি থাকি তো আবার দেখা হবে। ক্যাপ্টেন সাদেকের ফ্যামিলিকে একেবারেই শেষে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠাবার ব্যবস্থা করা হয়।

 

আমি সকাল সাড়ে আটটায় অফিসে যাই এবং ইপিআর সুবেদার আমাকে বললো যে, পাঞ্জবী মেজর এখানে সকল পাঞ্জাবী এবং পাঠানদের ডেকে পাঞ্জাবীতে কি বলে গেছে। আমার তাতে সন্দেহ দৃঢ় হলো।

 

২৬শে মার্চ সকালে আমাদের অফিসে অয়ারলেসের মাধ্যমে জানলাম ঢাকা পিলখানা এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইনকে পাক আর্মি ট্যাংক দিয়ে আক্রমণ করে ধ্বংস করতে চলেছে-খবর আসলো ৮/৯টার দিকে।

 

সকাল নয়টার দিকে হাবিলদার মুজিবর রহমান আমাকে এসে বলে যে, আমরা বিদ্রোহ করবা। আমি মুজিবরকে নিষেধ কি এবং বলি যে কোতের চাবি তুমি (কোতের চাবি আমি যখন সীমান্তে যাই তখন ওর কাছে দিয়ে গিয়েছিলাম।) কোয়ার্টার গার্ডে যে পাঞ্জাবী আছে তাদের ছুটি দিয়ে দাও এবং সকল পাঠানদের উপর নজর রাখো। শহীদ মুজিব আমাকে আরো খবর দেয় যে, অবাঙালিদের কার কার কাছে গুলি এবং অস্ত্র আছে। আমি বললাম আমার উর্ধ্বতন অফিসার মেজর ওসমান যখন বাঙালি তখন তার আসা পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করা উচিত।

 

আমি ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বাড়ি যাই। ১১/১২টার দিকে মেজর ওসমান আসার সাথে সাথে আমরা স্বাধীন বাংলার পতাকা তুলি এবং রাজকীয় মর্যাদা দেই। অবাঙালি যত ছিলো তাদের অস্ত্রহীন করে একটি ঘরে বন্দী করে রাখি।

 

২৬শে মার্চ বেলা ১১টার দিকে যশোর হেডকোয়ার্টার থেকে লেঃ কঃ মোঃ আসলাম (অবাঙালি) যাত্রা করে চুয়াডাঙ্গার উদ্দেশ্যে কিছু সৈন্য, দুটো গাড়ি এবং অয়ারলেস সহ। এই খবর আমরা যশোর ইপিআর ক্যাম্প থেকে পেলাম অয়ারলেসের মাধ্যমে। সঙ্গে সঙ্গে মেজর ওসমান আমাকে এক প্লাটুন সৈন্য নিয়ে পজিশন নিতে বলেন। যশোর হেডকোয়ার্টার হয়তো খবর পেয়েছে যে, আমরা বিদ্রোহ করেছি। লেঃ কঃ আসলাম বারবাজার পর্যন্ত এসে এই সংবাদ শুনে ফিরে যায়।

 

ইতিমধ্যে আমরা ভারতীয় সীমান্তের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করি। ৭৬ বিএসএফ কমান্ডার লেঃ কঃ চক্রবর্তী এবং আইজি, ডিজি সবাই গেদেতে রয়েছেন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকার সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন। আমাকে মেজর ওসমান বেলা চারটার দিকে গেদেতে যাবার জন্য বলেন। আমি রওয়ানা হয়ে গেলাম। আমরা সাউথ ওয়েষ্ট কমাণ্ড হিসেবে পরিচয় দিয়ে কাজ করতে থাকি। বেলা পাঁচটার দিকে গেদে পৌঁছলাম। ভারতীয় অফিসারদের সাথে সাক্ষাৎ করলাম। আমার পুরা ইউনিফর্ম ও আর্মসহ তিনজন গার্ড ছিলো। আমাদের অভ্যর্থনা জানালো ভারতীয় বিএসএফ ক্যাপ্টেন মহাপাত্র। ক্যামেরাম্যানরা আমার ছবি তুলবে বলে আমি গামছা ছিয়ে মুখ ঢেকে বর্ডার পার হই। মেজর ওসমানের পত্র দেই। সেখানে একটি আর্টিলারী ব্যাটারী, এক স্কোয়াড্রন ট্যাংক, এক ইনফ্যাইন্ট্রি ব্যাটালিয়ন সৈন্য যশোর আক্রমণের জন্য চাইলাম। ভারতীয় প্রধান বলেন, আমরা সরাসরি সাহায্য করতে পারছি না। তবে গোপনে আপনাদের সাহায্য করবো এবং আপনাদের এই চাহিদা দিল্লী নিয়ে যাচ্ছি আলোচনার জন্য। আমি আবার দেখা হবে বলে চলে আসি।

 

২৮শে মার্চ থেকে ট্রেন চালু হয়ে যায় ভারত সীমান্ত থেকে। ইতিমধ্যর ভারতীয় নাগরিকরা সাবান, পেট্রোল, খাবার, ঔষধপত্র ইত্যাদি যাবতীয় জিনিস নিয়ে এসে আমাদের সাহায্য করতে থাকে।

 

২৬শে মার্চ রাতে মেহেরপুরের এসডিও তৌফিক এলাহী সাহেব এবং ঝিনাইদহের এসডিপিও মাহবুবউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে আলোচনা করা হয় কুষ্টিয়া সম্পর্কে। কুষ্টিয়াতে ইতিমধ্যে পাক সৈন্য চলে এসেছিলো। কিভাবে আক্রমণ করা হবে এ বিষয়ে আমরা মত বিনিময় করি।

 

কুষ্টিয়াতে কতজন পাকিস্তানী সৈন্য আছে তা জানার জন্য ইপিআর ক্লার্ক বারি এবং আরো দু একজনকে পাঠাই। কুষ্টিয়াতে কত সৈন্য ছিলো তার সঠিক সংখ্যা পেলাম না। মেজর ওসমান আমাকে ২৯ তারিখ কুষ্টিয়া আক্রমণ করতে বললেন।

 

তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে কুষ্টিয়া আক্রমণের প্ল্যান করা হয়। একটি দল যায় ভেরামারা তারাগঞ্জ হয়ে এবং দ্বিতীয় দল নিয়ে আমি নিজে চুয়াডাঙ্গা-পোড়াদহ হয়ে যাই। তৃতীয় দল যায় ঝিনাইদহ এবং কুষ্টিয়ার মাঝে তারাগঞ্জ দিয়ে। সার্বিকভাবে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলাম। আমরা প্রাথমিক অবস্থায় ২০০ জনের মতো ছিলাম। পরাগপুর ও ভেড়ামারার নেতৃত্ব দিচ্ছিলো সুবেদার মজাফফর আহমেদ।

 

২৯ তারিখে আক্রমণের কথা ছিলো। কিন্তু নানা কারণে ওই তারিখে সম্ভব না হওয়ায় ৩০শে মার্চ ভোর পাঁচটার সময় আমরা একই সময় তিন ভাগ থেকে আক্রমণ চালাই। সারাদিন আক্রমণ চলে।

 

৩১শে মার্চ কুষ্টিয়া সম্পূর্ণ মুক্ত হয়। ২৫০ জন পাক সৈন্য মারা যায়। কিছু ধরা পড়ে, লেঃ আতাউল্লাহ তাদের মধ্যে একজন। আমাদের মুক্তিবাহিনীর ২জন মারা যায়। কিছু আহত হয়।

 

৩১শে সকাল ১০টার দিকে পাক বাহিনীর বিমান এসে বোমাবর্ষণ করে প্রায় এক ঘন্টা ধরে। কেউ মারা যায়নি। ঐদিনই আমি টেলিফোন মারফত মেসেজ পেলাম আমাকে যশোরের দিকে অগ্রসর হতে হবে। আমি ১ এপ্রিল যশোরের দিকে রওয়ানা হই।

 

৩১শে মার্চ সকাল ৯টার দিকে বিশখালীতে যে দল আমাদের ছিলো তাদের সাথে যশোর থেকে আগত পাক বাহিনীর সংঘর্ষ বাঁধে। যশোর বাহিনী কুষ্টিয়ার দিকে যাচ্ছিলো সাহায্যর জন্য। কিন্তু ব্রিজের ওখানে ব্যারিকেড থাকায় তারা যেতে পারেনি। ওখানে মুক্তিবাহিনীর ২জন মারা যায় এবং ৩/৪জনকে পাকবাহিনী ধরে নিয়ে যায়। যশোর সেনানিবাস থেকে সাত মাইল দূরে আমরা পজিশন নেই। মেজর ওসমানের নির্দেশক্রমে আমরা দূরে ঘাঁটি গাড়ি। কেননা ভারত থেকে ভারী অস্ত্রের অপেক্ষা করছিলাম। আমার হেডকোয়ার্টার ছিলো ঝিনাইদহ। আমার একটি পেট্রল ছিলো মাগুরার এসডিও’র সহযোগীতায় লেবুতলায়। সুবেদার আব্দুল মুকিদ ছিলো কমান্ডিং অফিসার। ৫/৬ এপ্রিল পাক বাহিনীর একটি সার্চিং পার্টি লেবুতলার দিকে নিয়ে আসে রেকি করতে। আমাদের দল তৈরী ছিলো। কারণ আগে থেকেই আমরা জানতাম যেহেতু যশোর-কুষ্টিয়া রোডে আমরা আছি তাই অন্যদিকে নিশ্চয় গ্যাপ খুঁজতে আসবে। এ্যামবুশে পাকবাহিনীর ১৫/১৬ জন মারা যায় একজন লেফটেন্যান্ট সহকারে। আমরা বহু ম্যাপ, নোটবুক উদ্ধার করি। মর্টার ফায়ার করে পাক বাহিনী তাদের মৃতদেহ নিয়ে যায়।

 

ইতিপূর্বে ২৭/২৮ তারিখের দিকে লেঃ কঃ জলিলের (১ম বেঙ্গল রেজিমেন্ট) কাছে আমরা দু’বার মেসেজ পাঠাই আমাদের সাথে যোগ দেবার জন্য। কিন্তু তিনি রাজি হননি। তখন কর্নেল জলিল সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মাসলিয়াতে ছিলেন।

 

৫ নং খুলনা উইং-এ আমরা ২৭/২৮ তারিখেই খবর পাঠিয়েছিলাম বেনাপোলে জমায়েত হবার জন্য। নির্দেশ দিলো, ইতিমধ্যে যদি কোনো অবাঙালি অফিসার তোমাদেরকে নিরস্ত্র করতে চায় তাহলে তাকে বন্দী অথবা হত্যা করবে।

 

ক্যাপ্টেন মোঃ সাদেক ২৭শে মার্চ খুলনা বিওপিতে যায় নিরস্ত্র করবার জন্য। কিন্তু রক্ষী তাকে চ্যালেঞ্জ করলে ক্যাপ্টেন পিস্তল দিয়ে তাকে হত্যা করে। পরে বিওপির ভিতর থেকে গুলি করে পাঞ্জাবী ক্যাপ্টেনকে হত্যা করা হয়। ক্যাপ্টেনের সঙ্গীরাও প্রাণ হারায়। সমগ্র যশোর ক্যান্টনমেন্ট এলাকা আমাকে দেখতে হতো। ফলে কোথাও ২/৪ ঘন্টার বেশী অবস্থান করতে পারতাম না।

 

১০ই এপ্রিল ঝিকরগাছা যাই ৫ নং উইং দেখার জন্য। কিন্তু পাকবাহিনী তখন অগ্রসর হয়ে পথ বন্ধ করে ফেলে এবং সংঘর্ষ হয়। আমি ভারত সীমান্ত ঘুরে ১১ই এপ্রিল বেনাপোল আসি।

 

১১ তারিখে ৭২নং বিএসএফ-এর কর্নেল কেবি সিংহ বিএসএফ আইজি, ৫নং গার্ডসদের সাথে আলাপ আলোচনা করি এবং গতকালের যুদ্ধের ঘটনা বলি। আমি দর্শনা হয়ে চুয়াডাঙ্গা আসি এবং মেজর ওসমানকে যুদ্ধের কথা বলি। ঝিকরগাছা থেকে ওই দিনই ঝিনাইদহে রাত দশটায় পৌঁছে যাই।

 

১২ এপ্রিল বারবাজার থেকে ক্যাপ্টেন শফিউল্লাহর মেসেজ পেলাম যে ওখানে ভীষণ আর্টিলারী এবং ভারী অস্ত্রের আক্রমণ চালাচ্চে পাকবাহিনী। সে আমার কাছে মতামত চাইলো। আমি তাকে কালিগঞ্জ চলে আসতে বলি এবং আমাদের বাহিনীকে কালিগঞ্জ এবং বারবাজারের মধ্যখানে থাকতে বলি। ওখানেও আমাদের বাহিনী বেশ কিছু অস্ত্র এবং সেনা হারিয়ে ফিরে আসে।

 

১৩ এপ্রিল পাকবাহিনী কালিগঞ্জ দখল করে নেয়। ১৪ এপ্রিল আমি চুয়াডাঙ্গা আসি। ১৪ এপ্রিল পাক বাহিনী ঝিনাইদহ চলে আসে। ১৫ এপ্রিল আমরা মেহেরপুরে ঘাঁটি সরিয়ে নেই।

 

১৬ এপ্রিল মেহেরপুরে থাকলাম। ঐদিন রাতে ইছাখালী বিওপিতে থাকি। ১৭ এপ্রিল খুব ভোরে মুজিবনগরে বৈদ্যনাথতলা যাই মন্ত্রীপরিষদের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেবার জন্য। ইপিআরের একটি কোম্পানী নিয়ে গিয়েছিলাম। বিচ্ছিন্ন ইপিআর বাহিনী সব বেতাইয়ে একত্র হয়। সমস্ত এপ্রিল মাসটা সৈন্য সংগ্রহ করা হয়। মে মাস থেকে কোম্পানী ভাগ করে দেওয়া হয়।