সাভারের কয়েকটি হত্যাকাহিনী

Posted on Posted in 8

১৮। সাভারের কয়েকটি হত্যাকাহিনী (৩৮৮-৩৮৯)

সূত্র – দৈনিক সংবাদ, ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২

আম কাঁঠালের আর শন বনের সাভার জনপদ আজ কাঁদছে: আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দাও

 

শহরের একঘেয়ে জীবনের ক্লান্তি দূর করতে আর চিত্তবিনোদনের জন্য প্রতি রোববার অসংখ্য লোকের ভিড় জমে এখানে। সেই প্রকৃতি সুন্দরী সাভার আজ হাহাকার করছে।

হারানো মানিকের দিকে যেন সাভার অপলক দৃষ্টি রেখে হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে আছে। কি যেন তার জিজ্ঞাসা বুঝা কঠিন। হয়তো বলবে আমার সোনার মাণিকদের ফিরিয়ে দাও। কত অফুটন্ত ফুলের কুড়ি অকালে ঝরে পড়েছে। কে তার হিসেব রেখেছে। বাংলার হাটে, মাঠে, ঘাটে, ছড়িয়ে অসংখ্য নরকঙ্কাল। এদের একত্র করলে হয়ে উঠবে এক কঙ্কালের পাহাড়।

বর্বরদের পৈশাচিকতার থৈ থৈ নৃত্য শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু এখন শিয়াল, কুকুর শকুনি খুঁজে বেড়াচ্ছে এর মাংস। এমনি এক অভাগিনী স্বামীহারা সাভারের হরিপদ মজুমদারের স্ত্রী। শুভ্র বসনে বসে রয়েছেন। পাশেই তার ছোট বোন সান্ত্বনা দিচ্ছে নানা কথা বলে। কিন্তু তার অবুঝ মন মানে না। কোলের শিশু নানা প্রলোভন দেখালেই কান্না থেমে যায়। হরিপদ বাবুর কথা জিজ্ঞেস করা হল, কিন্তু চকিত চাহনিতে তাকিয়ে আছে। কোন ভাষা নেই তার মুখে। কি যেন বলতে চাইছে কিন্তু কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছে।

‘’মুন্সীগঞ্জের কেওয়াড় গ্রামের পাশে একটি খাল আছে। সেই খালের পাশে গেলে দেখতে পাবেন কতগুলো নরকঙ্কাল ছড়িয়ে রয়েছে এদিক ওদিক। ওরই মাঝে শুয়ে রয়েছে হরিপদ মজুমদারের কঙ্কালটা।‘’ অপলক দৃষ্টিতে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে কথা কটি বলল মজুমদারের শ্যালিকা।

হরিপদ মজুমদারের বয়স হয়েছিল মাত্র ৩৫ বৎসর। কর্মজীবন সবে মাত্র শুরু। ব্যক্তিগতভাবে তার সাথে মিশে দেখেছি। সদালাপী, শান্ত, দৃঢপ্রত্যয়ী এবং অমায়িক পুরুষ। ভবিষ্যৎ গড়ার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা তার ছিল। ছোট সংসার। তখন মাত্র ২ টা বাচ্চা যখন তার সাথে প্রথম পরিচয়। এখন তার ৫টি সন্তান। ফরিদপুরের মুকসুদপুরে লাইভ-ষ্টক ডিপার্টমেন্টের ফিল্ড এসিস্টেন্ট। এর উপর নির্ভর করত তার সুখের সংসার।

৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিলেন ‘সকল কারখানা বন্ধ’। তাই কাজে যোগ দেননি। তারপর ২৫শে মার্চ নিয়ে এলো বাংলার বুকে ঘন তমসাচ্ছন্ন এক বিভীষিকাময় রাত। দিকে দিকে আগুন আর কান্নার রোল। হরিপদ মজুমদার পালাল। ‘’পালানোর পথ নেই যম আছে পিছে’’।

১৪ই মে। নেমে এলো জীবনের শেষ পরিণতি হরিপদ মজুমদারসহ আরও ২১ টি নিষ্পাপ প্রাণের। পাক মেজর জাভেদ আক্তারের পরিচালনায় গ্রাম ঘেরাও করা হল। এরা ২২ জন ধরা পড়লো। খালের পাড়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হল। তারপর নৃশংস অত্যাচার। তাদের হৃদয়বিদারক চিৎকারে হয়ত তখন গাছের কচি পাতাগুলোও ঝরে পড়ছিল। কিন্তু নরপশুদের এতটুকু মমতা ছিলনা। হঠাৎ কয়েকবার গুলির আওয়াজ শুনা গেল। তারপর তাদের সেই মর্মস্পর্শী চিৎকার ধীরে ধীরে কোন অতল তলে তলিয়ে গেল বলা যায়না।

হরিপদ মজুমদার আর নেই। কিন্তু তার পরিবারের শোকের ছায়া এখনো স্তিমিত হয় নাই। বিধবা স্ত্রী উচ্চস্বরে না কাঁদলেও তার দু’গণ্ড বেয়ে অশ্রুধারা যেভাবে অঝোরে নীরবে ঝরছিল তাতেই তার শোকের পরিমাণ অনেকটা বুঝা যাচ্ছিল।

সাভারের দায়িত্বশীল ও নেতৃস্থানীয় লোকদের মুখ করলেই স্ত্রী বিরেন্দ্র কৃষ্ণ রায়ের কথা প্রথমে মনে পড়ে। ১৯৭১ সালে সাভারের নির্বাচনে যারা আওয়ামীলীগের পক্ষে প্রাণপণ লড়েছেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন জগদীশ সাহা, ডাঃ গুরুদাশ সাহা এবং বিরেন্দ্র কৃষ্ণ রায়। কিন্তু আজ? সে আজ পুত্র শোকাতুর। সাভারে নিহতদের মধ্যে অন্যতম হরিপদ মজুমদার ও বিরেন্দ্র বাবুর বাড়ি পাশাপাশি। পাশাপাশি একজন বাস করছে স্বামীহারা অবলা নারী। অপরজন পুত্রহারা নারী।

এমন স্বামীহারা, পুত্রহারায় আজ বাংলার বুক ছেয়ে গেছে। দ্বিতীয় ছেলে নির্মল রায়। বয়স মাত্র ৩২ হয়েছিল। ঢাকাতে দুলিচান ফর্মের গোডাউন ইনচার্জ। একজন ভাল খেলোয়াড়। স্থির বিনম্র দৃষ্টি। মিষ্টি ব্যবহার। সাভারের নির্মল রায় নামটি বললে সবার মানস-পটে ভেসে ওঠে সে নির্মল রায়। আজ আমাদের মধ্যে নেই। হারিয়ে গেছে লক্ষ হতভাগ্যের মাঝে।

৮ই ডিসেম্বর। ভোর রাত। অন্যান্যসহ নিরমলও তখন রয়েছে ঘুমিয়ে। হঠাৎ বাহিরে বিকট আওয়াজ। সকলেরই ঘুম ভেঙ্গে গেল। উঠে দাঁড়াতেই দেখা গেল চারিদিকে কুখ্যাত আল-বদর পাক বাহিনীর কয়েকজন তাঁদের সবার দিকে অস্ত্র নিশানা করে দাঁড়িয়ে হিংস্র দৃষ্টিতে আপাদমস্তক অবলোকন করছে।

তারপর নির্মলসহ অন্যান্য কয়েকজনকে পাশেই এক বদ্ধভূমিতে নিয়ে যাওয়া হল। কিছুক্ষন নিস্তব্ধ। তারপর কয়েকটি গুলির আওয়াজ এবং সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়বিদারক চীৎকার। তারপর গভীর নীরবতা, সব শেষ। ছেলের এমন মৃত্যুকাহিনি বলতে এক সময় নিজেকে আর সামলাতে পারলেন না বিরেন্দ্র রায়। ছেলের ছবি বুকে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন। ‘’ যে নির্মল আজীবন স্নেহ লালিত্যে মানুষ, একটা কটু কথা যার অভ্যাস নাই আর আজ আমার নিরমলের এ কি পরিণতি।‘’

দুলীচাঁদ ফার্ম থেকে নির্মল রায়ের সাথে যারা জীবনের শেষ সঙ্গী হয়েছিলেন তাঁদের একজন হলেন সূর্য কান্ত রায়। শেষ বয়সী ভদ্রলোক। উক্ত ফার্মের একজন পদস্থ কর্মচারী। সূর্য কান্ত রায়ের স্ত্রী তার একখানা ফটো বের করে দিলেন। তারপর বিলাপ এবং কান্না।

উমেশ চন্দ্র সাহা। বয়স মাত্র ২৮ বৎসর। সংসারের দারিদ্র্যকে কাটিয়ে উঠতে ম্যাট্রিক পাশ করার পরেই এই ফার্মের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ঐ একই দিনে তাঁদের শরীক হতে হয়েছিল জয় গোপাল সাহার। ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন ধীর, স্থির, নম্র, শান্ত এবং দৃঢপ্রত্যয়ী। সর্বশেষ যে মধ্য বয়সী ব্যক্তি তিনি হচ্ছেন মতিলাল সাহা। দুলীচাঁদ ফার্মেরই একজন কর্মচারী। বর্বরদের হাত হতে রেহাই পাননি, ওদের সবার সাথে মতিলাল সাহার আত্মাহুতি দিতে হয়েছিল ৮ই ডিসেম্বরের কালো রাতে।