পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক শাসনের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরকে লেখা চিঠি

Posted on Posted in 2

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্রের ২য় খণ্ডের ১৩-১৫ নম্বর পৃষ্ঠায় মুদ্রিত ৫ নম্বর দলিল থেকে বলছি…

শিরোনামসূত্রতারিখ
পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক শাসনের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরকে লেখা চিঠিসরকারী২১ মে, ১৯৫৯

 

গোপন

আধা-সরকারী পত্র নং ৩২৫-এস৯(১)/৫৯

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী,
পাকিস্তান সরকার,
করাচি, ২১ মে, ১৯৫৯

প্রিয় জনাব জাকির হোসেন,

 

আপনি পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি সংক্রান্ত সংযুক্ত প্রতিবেদনটি দেখতে আগ্রহী হতে পারেন।

 

২. এটা সাধারণত জনতার মনোবল বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তাকে সামনে আনবে এবং প্রতিকূল প্রচারণার বিরোধিতায় সহায়তা করবে, যা অন্তত আংশিকভাবে এর জন্য দায়ী। এটা জনতার সাথে অবিলম্বে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপনে প্রশাসনের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়াদিকে সামনে আনবে যেন ৭ অক্টোবরের সশস্ত্র বাহিনী দিবসের জন্য স্বতস্ফূর্ত উদ্যম তৈরি হয়।

 

৩. যদিও আমি নিশ্চিত যে, উপর্যুক্ত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা গ্রহণের নিমিত্ত আপনার ব্যক্তিগত মনোযোগ আকৃষ্ট হবে, তথাপি আমি আপনাকে সুপারিশ করবো যে, আপনি যেন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের উপর প্রভাব সৃষ্টিকারী বিভিন্ন ছোট এবং সহজেই প্রতিকারযোগ্য বিষয়গুলো বিবেচনায় এনে অবিলম্বে সেগুলোর উন্নয়ন করেন। উদাহরণস্বরূপ, পৌরসেবার তাৎক্ষণিক উন্নয়ন, জনগণের অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দ্রুত প্রতিকারের মধ্যে দিয়ে এটা সম্ভব। অতঃপর, পল্লী সহায়তাসহ উপর্যুক্ত ক্ষেত্রগুলোকে এবং প্রদেশের মানুষের পারস্পারিক সহযোগিতা ও আত্মনির্ভরশীলতার মাধ্যমে যা কিছু অর্জিত হয়েছে,  সেগুলোর প্রয়োজনীয় প্রচার করা যেতে পারে।

 

৪. আশা করি অদূর ভবিষ্যতে আপনার সাথে দেখা হবে।

                    ধন্যবাদান্তে

আপনার অনুগত
স্বাক্ষরিত/-

কে.এম. শেখ
লেফটেন্যান্ট জেনারেল

 

জাকির হোসেন, স্কয়ার (সম্মানসূচক পদবী),
গভর্নর, পূর্ব পাকিস্তান
ঢাকা।

 

  

সংযুক্তিঃ

পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি চাকুরীজীবীদের মনোবল দৃশ্যত বেশ কম। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, বিশেষতঃ যারা নোটিশ পেয়েছেন, তাঁদের মতামত প্রকাশ করতে শোনা যায় যে- মার্শাল ল’ বেসামরিক প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করছে এবং বেসামরিক প্রশাসনকে মুক্ত করতে মার্শাল ল’ প্রত্যাহার করা উচিত। বেসামরিক ব্যাপারগুলোতে সামরিক কর্মকর্তাদের ‘হস্তক্ষেপ’ বা উপদেশকে তারা ক্ষতিকর মনে করেন।

 

২. মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করা বিষয়গুলোর টেকসই উন্নয়নের কোন চিহ্ন নেই। পৌরসেবার অবনতি হয়েছে। প্রশাসন এবং আমজনতার মাঝে যোগাযোগ অকার্যকর হয়ে আছে। ছোট এবং সহজেই প্রতিকারযোগ্য বিষয়গুলোর ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহের জন্য কোন প্রতিষ্ঠান না থাকায় এটি হতে পারে, যা জনতার মনোবলকে প্রভাবিত করে।

 

৩. উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর সহায়তা ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের মত একটি জায়গায় জনতার মনোবল ধরে রাখা কঠিন। দৃশ্যত রাজনীতিবিদগণ এই দৃষ্টিকোণটি অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এছাড়াও বিতর্ক চলছে যে, পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনী বেসামরিক প্রশাসনের দায়িত্ব নিতে ও সফলভাবে চালাতে পারলেও তা পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। এ কারণেই পূর্ব পাকিস্তানে বেসামরিক প্রশাসনের আরও বেশি স্বাধীনতা প্রয়োজন। সরকার ও সশস্ত্র বাহিনীর সাথে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে সম্পৃক্ত করা এবং জনতার জন্য সরকার যতটুকু সম্ভব সবই করছে বলে মানুষের মাঝে বিশ্বাস জন্মানো অপরিহার্য, বিশেষ করে ৭ অক্টোবরকে সশস্ত্র বাহিনী দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত বিবেচনায়। যদি সেদিন মানুষের দ্বারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে যথাযথ উদ্যম প্রকাশিত না হয়, তবে এটি সরকারের উপর অনাস্থা জ্ঞাপনের নীরব ভোট হিসেবে আখ্যায়িত হবে, যা বিধ্বংসী উপাদান এবং বৈদেশিক বিরূপ প্রচারমাধ্যম কর্তৃক সম্পূর্ণরূপে ব্যবহৃত হবে।

 

৪. প্রতিকূল শক্তিসমূহ নিশ্চিতভাবে পূর্ব পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থা ও উত্তেজনা তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয় নি। রাজনৈতিক নেতারা ব্যক্তিগত সভায় বক্তব্য প্রদান করেন এবং রাজনৈতিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন। বিধ্বংসী শক্তিসমূহ যথারীতি বিরূপ মনোভাব ও অপপ্রচার ছড়িয়ে যাচ্ছে। প্রসঙ্গক্রমে, “পররাষ্ট্র নীতি” নিয়ে মার্শাল যে অনুচ্ছেদটি লিখেছেন, সেটি হাতে হাতে ছড়িয়ে সরকারবিরোধী মতাদর্শ লালনের করা হচ্ছে বলে শোনা যায়। সরকারের পক্ষাবলম্বনে এবং বিরূপ প্রচারণা মোকাবেলায় কার্যকলাপ সীমিত বিধায় এসব ঘটছে। বিরূপ প্রচারণা মোকাবেলা কার্যকর হবে না যদি না তা জনগণের দৈনন্দিন উন্নয়নের প্রকৃত প্রমাণের উপর ভিত্তি করে করা হয়। তা দৈনন্দিন উন্নয়ন যতোই ক্ষুদ্র হোক না কেন।

 

৫. বরিশাল শহরে আশ্বিনী কুমার হল নামে একটি হল (টিন-শেড) আছে। আশ্বিনী কুমার এই জেলার একজন মহান সমাজসেবক ছিলেন এবং তিনি প্রায় ৬০ বা ৭০ বছর আগে সমাজের নৈতিক পুনর্জন্মে যথেষ্ট প্রভাব রেখেছিলেন। তাঁকে একজন হিন্দু হিসেবে নয় বরং একজন মহান সামাজিক নেতা হিসেবে সম্মানের স্থানে রাখা হয়। বর্তমান জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হলটিকে ‘আইয়ুব হল’ নামে  নামান্তর করলে উপযুক্ত হয় বলে বিবেচনা করেছিলেন। এটা করাটা ভুল বলে একজন স্থানীয় হিন্দু জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে বলেন এবং একটি পুরনো প্রতিষ্ঠানকে নামান্তর  না করে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে উপদেশ দেন অন্য কিছু করতে যদি তিনি আসলেই প্রেসিডেন্টের নামে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম চান এবং এই ধরনের নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্য তিনি কাজ করতে ও তহবিল সংগ্রহ করতে ইচ্ছুক। জানা গেছে, ঐ ভদ্রলোকের উপর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রেগে যান এবং নাশকতামূলক কার্যক্রমের অভিযোগে মিথ্যা পুলিশ রিপোর্টের ভিত্তিতে তাকে নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার করা হয়। অভিযোগগুলো প্রাদেশিক সরকারের নিকট করা হয়েছে কিন্তু ভদ্রলোক এখনও নিরাপত্তাজনিত কারণে আটক আছেন। যা অভিযোগ করা হয়েছে, তা যদি সত্য হয়, তাহলে একটি জেলার দায়িত্বে থাকার মত প্রয়োজনীয় দৃষ্টিভঙ্গি এই জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেই। এটা সত্যিই দুঃখের বিষয় যে, এমন একটি ব্যাপারকে প্রাদেশিক সরকারের নজরে আনার পরও প্রশাসন প্রয়োজনীয় প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

 

৬. ভিআইপিদের নামে ব্যক্তিগত প্রচারের অভিযোগ শোনা যায়। ব্যক্তিগত প্রচারণা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না হলে তা এমনকি সরকারের সুনামেও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। আমাদের মন্ত্রীদের ঘন ঘন গ্রামের বাড়ি পরিদর্শনের ব্যাপারেও অভিযোগ এসেছে, যা বিরূপ প্রচারণার জন্য একটি সজ্জিত উপকরণ।

 

৭. এই পীড়াদায়ক পটভূমির বিরুদ্ধে জাতিগঠনের জন্য কিছু করার ব্যাপারে যুবসমাজের (বামপন্থি দলগুলো নয় বরং অবশ্যই পাকিস্তানপন্থি এবং ডানপন্থী দলগুলো) মাঝে বিবেচনাযোগ্য উদ্যম লক্ষ্য করা যায়। এই উদ্যমকে ধারণ করতে কোন চেষ্টাই করা হচ্ছে না। একে দ্রুত ধারণ করা না গেলে, তারা নিরুৎসাহিত হবে এবং এই উদ্যম প্রকাশের অভাবে নিজেই নিস্তেজ হয়ে যাবে।