সামরিক সরকারের বেসামরিক গভর্নর ডাঃ মালিকের বেতার ভাষণ

Posted on Posted in Uncategorized

৭.১৮৭.৫৩২

শিরোনামসূত্রতারিখ
১৮৭। সামরিক সরকারের বেসামরিক গভর্ণর ডাঃ এ, এম মালিকের বেতার ভাষণসরকারী প্রচার পুস্তিকা- পূর্ব পাক সরকারের তথ্যবিভাগ১৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

.

বেতার ভাষণ

১৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

ডাঃ আবদুল মোতালেব মালিক, এইচ কিউ এ

গভর্ণর, পূর্ব পাকিস্তান

.

আমার প্রিয় দেশবাসীগণ,

 

জনগণ কতৃক নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের উদ্যোগ শুরু করার উদ্দেশ্যে প্রেসিডেন্ট আমাকে এই প্রদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিযুক্ত করেছেন। গভর্ণর হিসেবে আমার একটি মন্ত্রী পরিষদ থাকবে। আল্লাহতায়ালা আমাদের কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করেছেন। প্রদেশের অভ্যন্তরে ও বহিঃশত্রু থেকে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ ও হুমকি প্রদেশের শান্তির বিঘ্ন ঘটিয়েছে এবং অর্থনীতির ক্ষতিসাধন করেছে। আমার জীবনের সায়াহ্নে এই গুরুদায়িত্ব আমি শুধু এই জন্যই তুলে নিয়েছি যাতে যে দেশের প্রতিষ্ঠা ও সংহতির জন্য আমারও ক্ষুদ্র অবদান ছিল, সেই দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠনের কাজে যথাসাধ্য শক্তি নিয়োগ করতে আমি যেন পিছপা না হই।

 

প্রিয় দেশবাসীগণ, আমি আপনাদের সাহায্য ও সহযোগিতা কামনা করছি এই জন্য, যাতে প্রদেশে শান্তি ফিরিয়তে আনা যায়, যাতে করে আমরা এমন এক মুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে পারি যেখানে বিভিন্ন সমস্যা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে, শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নয়; যেখানে জনসাধারণ ও দলসমূহ পরস্পরের সাথে মতানৈক্য থাকা সত্ত্বেও একই দেশের শান্তিপ্রিয় নাগরিক হিসেবে একত্রে বসবাস করতে পারবেন। যে অন্ধ বিদ্বেষ আমাদের বর্তমান দুর্দশার জন্য দায়ী, আসুন আমরা তা পেছনে ফেলে রেখে নতুন যাত্রা শুরু করি। এই যাত্রা পথকে সহজ ও সুগম করার উদ্দেশ্যে প্রেসিডেন্ট ইতিমধ্যেই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন।  এর পূর্ণ সু্যোগ এখন আমাদের গ্রহণ করতে হবে। সকল ভীতি, সন্দেহ ও তিক্ততা দূর করে পরস্পরের সঙ্গে হাত মিলাবার দায়িত্ব আমদেরই।

 

আমার প্রিয় ভাই-বোনেরা, প্রদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে উদ্যোগী হওয়ার জন্য আমি আপনাদের সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাচ্ছি। আমাদের নিজেদের স্বার্থেই এটা প্রয়োজন। আমি আবারও বলছি, আমাদের নিজেদের স্বার্থেই এটা প্রয়োজন। এ সময় পরস্পরকে দোষারোপ করা, কারো ঘাড়ে দোষ দেওয়া কিংবা মনে ক্ষোভ পোষণ করার সময় নয়। এখন অতীতের সমস্ত দোষ ও অভিযোগ বিস্মৃত হয়ে পুনর্গঠনের কাজে সবাইকে সামিল হতে হবে, যাতে জাতি আবার শান্তি ও উন্নতির পথে অগ্রসর হতে পারে।

 

আজকের যুবক শ্রেণী তো জানে না যে, নতুন এক জাতির বাসভূমি আমাদের এই পাকিস্তানকে বাস্তবে রুপায়িত করার জন্য আমাদের কত পরিশ্রম করতে হয়েছে, কত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। যখন অবিভক্ত ভারতে আমরা বুঝতে পারলাম যে, আমাদের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়েছে, তখন আমরা একটা পৃথক আবাসভূমি দাবী করতে বাধ্য হলাম। এই কাজ সহজসাধ্য ছিল না। সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমাদেরকে পদানত করে রাখাই শোষকদের গূঢ় অভিসন্ধি ছিল। আমাদের শ্ত্রুরা আমাদের চেয়ে অনেক বেশী সঙ্গবদ্ধ ছিল এমনকি নতুন ও প্রাণবন্ত এই রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার পরও তারা আমাদের উন্নতির পথে বিঘ্ন সৃষ্টি করার প্রাণপণ চেষ্টা করেছে। সবচেয়ে মৌলিক কথা হচ্ছে এই যে, আমাদের শত্রুরা পাকিস্তানের অস্তিত্বই স্বীকার করতে চায়নি। যা হোক আমরা কিছুতেই আমাদের মাতৃভূমিকে আন্তর্জাতিক ক্ষমতার দন্ধে দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেব না। আবার যারা নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে আমাদেরকে ব্যবহার করতে চায়, তাদের কাছে আমাদের অস্তিত্বকে বিকিয়ে দিতে অথবা অর্থনীতিকে বন্ধক দিতে আমরা রাজী নই। শত্রুর হাতে আমরা ক্রীড়নক হতে চাই না।  তাই আমরা এমন কিছু করব না যা কিনা জাতীয় আত্মহত্যার সামিল হবে। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের যেসব যুবক সীমান্তের ওপারে চলে গিয়েছেন, তাদের এখন ফিরে আসা উচিৎ। এটা তাদেরই দেশ এবং একে পুনর্গঠন করার দায়িত্ব তাদেরই। আমি তাদের ফিরে আসার জন্য আহবান জানাচ্ছি। আমি তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছে। তাই স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলে তাদের কোন ক্ষতির আশংকা নাই। তাদের প্রত্যাবর্তনে বাধাদানের উদ্দেশ্যে যে সকল মিথ্যা প্রচারণা চালানো হচ্ছে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা গুজব রটনা করা হচ্ছে তাতে যেন তারা কর্ণপাত না করেন। এটা অত্যন্ত দুঃখের কথা যে, আমাদের বাস্তুত্যাগীদের প্রতি সহৃদয় ব্যবহার ও সমবেদনা প্রকাশ না করে, বিদেশ থেকে অর্থসাহায্য লাভের উদ্দেশ্যে তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে এবং ক্ষুদ্র সার্থসিদ্ধির তাগিদে তাদের সংখ্যাও অনেক বাড়িয়ে বলা হচ্ছে। সর্বোপরি যারা পাকিস্তানকে ধ্বংস করতে যায়, তাদের রাজনৈতিক গুটি হিসেবে বাস্তুত্যাগীদের ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পথে তাই নানাবিধ বাঁধার সৃষ্টি করা হচ্ছে।

 

আপনারা জানেন যে, সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা ছাড়া প্রেসিডেন্ট সমস্ত প্রকৃত নাগরিকদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের আহবান জানিয়েছেন এবং তাদের পুনর্বাসনের জন্য সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাদের আস্তা ফিরিয়ে আনার জন্য পাকিস্তান সরকার জাতিসংঘের প্রস্তান গ্রহণ করেছেন। এই প্রস্তাব অনুসারে সীমান্তের উভয় পারে এবং ভারতে অবস্থিত বাস্তুত্যাগী শিবিরগুলিতে গঠন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। পিকিক ও আইডিবি ও পাকিস্তানে অবস্থিত অভ্যর্থনা শিবিরগুলিতে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক মোতায়েন করার কথা। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, ভারত এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। ভারতের অসম্মতি জ্ঞাপন সত্ত্বেও প্রত্যাবর্তনকারীদের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে আমরা সীমান্তের এপারে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক মোতায়েনে সম্মত হয়েছি, আমি আপনাদের কাছে অঙ্গীকার করছি যে, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর পদের দায়িত্ব পালনকালে আমি জনগণের মনে আস্থা সৃষ্টির জন্য সকল প্রচেষ্টা চালাবো। যারা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করবেন তাদের পুনর্বাসনের জন্য সকল প্রকার ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং সীমান্ত পার হয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রে গমনের জন্য কারও বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না। যাদের বাসগৃহ, দোকানপাট ও জীবিকার উপায় বিনষ্ট হয়েছে তাদের পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে সর্বপ্রকার আর্থিক ও প্রশাসনিক সাহায্য করা হবে। যাদের সম্পত্তি বেআইনিভাবে দখল হয়েছে কিংবা যাদের সম্পত্তি সাময়িকভাবে অন্যদের মধ্যে বন্টন করা হয়েছে, সেগুলি প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দেয়া হবে। এই কার্যে বাধাদানের কোন প্রকার চেষ্টা হলে তাকে কঠিন হস্তে দমন করা হবে। জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টির সম্মুখেই আমাদের পুনর্বাসনসূচি রুপায়ণ করা হচ্ছে এবং এই কাজ যাতে দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে সম্পাদিত হয় সেদিকে আমি কড়া নজর রাখবো।

 

এই সুযোগে আমি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে এই আশ্বাস দিতে চাই যে, পাকিস্তানের অন্যান্য নাগরিকদের মত তারাও নাগরিকত্তের সমঅধিকারে অধিকারী। স্বদেশে পাকিস্তানের বিশ্বস্ত নাগরিক হিসেবে শান্তিপূর্ণভাবে জীবন যাপনের জন্য প্রেসিডেন্ট ইতিমধ্যেই তাদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। তাদের বাড়িঘর ও অন্যান্য সম্পত্তি তাদের ফিরিয়ে দেয়া হবে। ১৯৫০ সালের লিয়াকত-নেহেরু চুক্তি মোতাবেক সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিষয়ক মন্ত্রীপদ আমি গ্রহণ করেছিলাম। আমি তাদের সমস্যা সম্পর্কে অবগত আছি। কাজেই যাতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কোন ব্যক্তির প্রতি কোন প্রকার অবিচার না করা হয়, সেদিকে আমি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখবো। লিয়াকত-নেহেরু চুক্তি মোতাবেক ভারত সরকারের মন্ত্রী মিঃ সি সি বিশ্বাস ও পাকিস্তান সরকারের উজির হিসেবে আমি মিলিতভাবে কাজ করছি, যাতে উভয় দেশের উপদ্রুত অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনা যায়। এখন পুনরায় অনুরুপ ব্যবস্থা গ্রহণ কেন সম্ভবপর হবে না তার কোন কারণ আমি দেখতে পাই না। এই বিরাট মানবিক সমস্যা সমাধানের জন্য আশু ব্যবস্থাদি আলোচনা করার উদ্দেশ্যে আমি এই বিষয়ক ভারতীয় মন্ত্রীর সঙ্গে যত শীঘ্র সম্ভব বৈঠকে মিলিত হতে রাজী আছি। প্রকৃত সদিচ্ছা ও মানবিক দুর্গতির প্রতি সত্যিকারের সহানুভূতি থাকলে এই সমস্যা সমাধানে আমাদের অপারগ হওয়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না।

 

অতঃপর আমি আমাদের ছাত্র সম্প্রদায়কে এটা উপলব্ধি করতে বলবো যে, তারা হলেন পাকিস্তানের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তারাই হলেন জাতির ভবিষ্যত স্থপতি। সুতরাং তারা যাতে ভবিষ্যতে নিজ দায়িত্ব যথাযতভাবে পালন করতে পারেন তার জন্য তাদের প্রস্তুত হতে হবে এবং তাদের শিক্ষা জীবন যাতে বাধাপ্রাপ্ত বা বানচাল না হয়, সেদিকে তাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। তাদের শিক্ষা জীবন পুনরায় শুরু করার জন্য যত শীঘ্র সম্ভব তাদের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করা উচিৎ। কোন ভয়, ভীতি বা ভ্রান্ত ধারণা তাদের শিক্ষা জীবন ব্যাহত করুক তা কারুর কাম্য নয়। কারণ এ মনোভাব কোন জাতির পক্ষেই মঙ্গলজনক নয়। অপরপক্ষে এর ফলে সমাজ দুঃখ-দুর্দশার সম্মুখীন হয়। আমার যৌবনের প্রাক্কালে কিছু সময়ের জন্য আমিও বাংলার সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। কিন্তু শীঘ্রই আমি উপলব্ধি করলাম যে সন্ত্রাসবাদের অর্থই হল আমার দেশবাসীর জন্য ধ্বংস ও মৃত্যু এবং এই নীতি অনুসরণ করলে আমরা কোন লক্ষ্যেই উপনীত হতে পারব না। তাই আমি সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন থেকে নিজেকে মুক্ত করে স্বজাতির অধিকার অর্জনের উদ্দেশ্যে নিয়মতান্ত্রিক ও অহিংসামূলক পথ বেছে নিলাম। এবং আমি নিজেও দেখেছি যে, নিয়মতান্ত্রিক ও অহিংসামূলক আন্দোলন খুবই ফলপ্রসূ। সেকালের অন্যান্য সন্ত্রাসবাদী নেতৃবৃন্দও অনুরুপ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অসহযোগ আন্দোলন ফলপ্রসূ না হওয়ায় জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যেও সি আর দাস ও মতিলাল, নেহেরুর মত বড় বড় নেতারা স্বরাজ পার্টি গঠন করেন এবং আইন পরিষদে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেন। আমি সাধারণভাবে যুবকদের এবং বিশেষ করে ছাত্র সম্প্রদায়ের কাছে আবেদন জানাচ্ছি যেন তারা পাকিস্তানের পুনর্গঠন ও উন্নতির ক্ষেত্রে তাদের ভবিষ্যত দায়িত্ব স্মরণ রাখেন নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত হন।

 

শ্রমিক ও মজুরদের এক আজীবন সেবক হিসেবে আমি শ্রমিক ও মালিক উভয় সম্প্রদায়ের নিকট অনুরোধ করবো যেন তারা দেশের অর্থনীতিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য একযোগে কাজ করেন। শ্রমিকদের এটা বুঝতে হবে যে, কলকারখানা বন্ধ হলে প্রকারান্তরে তাদেরই সমূহ ক্ষতি। এবং এর ফলে জনসাধারণকেই ভুগতে হয়। মজুররা যাতে শান্তিপূর্ন পরিস্থিতিতে উৎপাদন কার্য সম্পাদন করতে পারেন এবং যাতে তাদের ওপর কোন প্রকার জুলুম বা হয়রানি, ভীতি প্রদর্শন অথবা প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, সেদিকেও আমি লক্ষ্য রাখবো। এ ব্যাপারে আমি আপনাদের আমার ব্যক্তিগত আশ্বাস দিচ্ছি। আপনাদের প্রতি আমার আবেদন এই যে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনারা কাজে যোগদান করুন। মালিকদের উদ্দেশ্যে আমি বলতে চাই যে, সামাজিক ন্যায় বিচার ও সুখী শ্রমশক্তি ছাড়া কোন শিল্পেরই উন্নতি বা অর্থনীতির বিকাশ সাধিত হতে পারে না।

 

বর্তমান প্রধান সমস্যা হল প্রদেশের প্রতিটি লোকের কাছে প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ করা। দুঃখের বিষয় হলো যে, উপর্যুপরি বেশ কিছু বছর ধরে এই প্রদেশ খাদ্য ঘাটতি অঞ্চল হয়ে পড়েছে। এই বৎসর এই খাদ্য ঘাটতির পরিমাণ আরও বেড়ে যাবে, কারণ উৎপাদন হ্রাসের আশঙ্কা রয়েছে। তাই বর্তমান আর্থিক বছরে আমরা পশ্চিম পাকিস্তান ও বিদেশ থেকে ১৩ লক্ষ টন  খাদ্যশস্য আমদানীর ব্যবস্থা করেছি। প্রদেশব্যাপী সরবরাহ কেন্দ্রসমূহ মারফত খাদ্যশস্য চলাচল ও বন্টন ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং এই উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রদেশের প্রত্যেক অঞ্চলের খাদ্যশস্য সরবরাহ পরিস্থিতির উপর সবিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। উপকূলীয় জাহাজ ও অভ্যন্তরীণ নৌযানের সংখ্যা বৃদ্ধি করে নদী পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি সাধন করা হচ্ছে। এই ব্যবস্থা অনুসারে আমন ধান ওঠার আগ পর্যন্ত, আগামী ৪ মাসে, মাসপ্রতি দেড় লক্ষ থেকে দু লক্ষ টন খাদ্যসামগ্রী বন্দর থেকে বন্টন কেন্দ্রসমূহে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মোটকথা নিয়মিত খাদ্যশস্য সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করার ফলে যে কোন বিশেষ সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের খাদ্য চাহিদা মেটানোর পূর্ণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

 

পূর্ব পাকিস্তানের বর্তমান খাদ্য পরিস্থিতির মূল কারণ এটা নয় যে খাদ্যদ্রব্যের অনটন রয়েছে। আসল সমস্যা হল, যোগাযোগ ব্যবস্থার অসুবিধা, আর তার কারণ হল প্রদেশে সাম্প্রতিক গোলযোগের ফলে রেলগাড়ি ও সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে অসুবিধা। বন্দর থেকে খাদ্যসামগ্রী প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিতরণ কেন্দ্রে প্রেরণ করতে হবে। গোলযোগের আগে শতকরা ৬০ ভাগেরও বেশী খাদ্যদ্রব্য রেলগাড়ীর সাহায্যে পাঠানো হত। যেহেতু পূর্বের তুলনায় বর্তমানে রেল ও সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার অপ্রতুলতা রয়েছে সেহেতু বেশীরভাগ খাদ্যসামগ্রী নৌযানের সাহায্যে পাঠানো হচ্ছে। এই ব্যাপারে বন্ধুরাষ্ট্রসমূহের মধ্যে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র বেশকিছু উপকূলবর্তী জাহাজ সরবরাহ করে আমাদের খাদ্যশস্য বন্টনের কাজে বিশেষ সহায়তা করেছেন। খাদ্য সরবরাহের কাজে এই অতিরিক্ত ব্যবস্থার ফল হবে এই যে, চট্টগ্রাম থেকে অভ্যন্তরীণ নৌ-বন্দরগুলিতে সরবরাহের পরিমাণ ৩ গুণ বেড়ে যাবে। এর ফলে চট্টগ্রাম থেকে চলাচলের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানো সম্ভবপর হবে।

 

সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা আরও উন্নত করবার উদ্দেশ্যে ইতিমধ্যেই বিদেশ থেকে ট্রাক আমদানীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ১০০ থেকে ১৫০টি ট্রাক পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

 

এটা বলা হচ্ছে যে, খাদ্যশস্যের সরবরাহ থাকলেও অনেকের পক্ষে ক্রয় করার ক্ষমতা থাকবে না। সরকার এই সমস্যা সম্পর্কেও সচেতন রয়েছে। এবং ইতিমধ্যেই গ্রামাঞ্চলে টেস্ট রিলিফের কাজ শুরু করা হয়েছে, যার ফলে সহজ কায়িক শ্রমকে কাজে লাগানো হচ্ছে। উপদ্রুত অঞ্চলে কাজ সৃষ্টি করে লোকজনের আয়ের পথ সুগম করে দেওয়া হচ্ছে যাতে তাদের কষ্ট লাঘব কারা সম্ভব হয়। ইতিমধ্যে এই কাজের খাতে কেন্দ্রীয় সরকার প্রাদেশিক সরকারকে ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন এবং প্রয়োজনবোধে আরো টাকা দেওয়া হবে। বর্ষার শেষে গ্রামাঞ্চলে ওয়ার্কস প্রোগ্রামের যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে যার জন্য বাজেটে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, এই টেস্ট রিলিফের কাজ তার অতিরিক্ত।

 

গত কয়েক মাসের ঘটনাবলীর ফলে আমাদের অর্থনীতিতে বড় রকম ক্ষতিসাধন হয়েছে। মার্চ মাসে সকল প্রকার অর্থনৈতিক কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল এবং তারপরে ব্যক্তিগত ও জাতীয় সম্পদের প্রভূত ক্ষতি হয়েছে।

 

অর্থনৈতিক কার্যকলাপ পূর্ণোদ্যমে চালু করার জন্য সরকার ইতিমধ্যে বহু পন্থা অবলম্বন করেছে এবং এর ফলে অনেকটা উন্নতিও দেখা দিয়েছে। বড় বড় কারখানাগুলির উৎপাদন ক্ষমতাও বর্ধিত হচ্ছে। বন্দরগুলিও স্বাভাবিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। জুন ও জুলাই মাসে চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দর থেকে মোট ১৮ কোটি ৭২ লক্ষ টাকার মাল রফতানী করা হয়েছে। গত বৎসর এই সময়ে মোট ২৪ কোটি ৫২ লক্ষ টাকার মাল রফতানী করা হয়েছিল। সুতরাং তুলনামুলকভাবে দেখতে গেলে এই বৎসরের রফতানীর পরিমাণ নেহাৎ খারাপ নয়। ব্যাংকগুলি পূর্ণোদ্যমে কাজ করে যাচ্ছে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যো ভালোভাবেই চলছে। সুতরাং দেশের অর্থনীতি ক্রমে ক্রমে আগের পর্যায়ে ফিরে আসবে। এ প্রসঙ্গে আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই যে, জনসাধারণের সার্বিক কল্যাণের জন্যে প্রদেশের অর্থনীতিকে পুনর্গঠন এবং উন্নয়নমূলক কর্মসূচীর পুনরুজ্জীবন আমার সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সরকারের এই প্রচেষ্টায় আমি প্রদেশের সকল শ্রেণীর নাগরিকের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করছি।

 

জরুরী মেরামত ও পুনর্বাসন কার্যের জন্য যা কিছু প্রয়োজন সরকার ইতিমধ্যেই তা নির্ধারণ করার চেষ্টা করেছে। এই কাজের জন্য এই বৎসরের বাজেটে ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রদেশের উৎপাদন শক্তিকে বাড়ানোর জন্য উন্নয়ন খাতে যে ২৭৯ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, এই ১৫ কোটি টাকা তার অতিরিক্ত বরাদ্দ। ঢাকায় অবস্থিত উচ্চ ক্ষমতাবিশিষ্ট একটি বোর্ডের অধীনে সৃষ্ট তহবিল পুনর্গঠনের জন্য বরাদ্দকৃত এই অর্থ দেওয়া হয়েছে। আশু মেরামত, পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের সকল প্রস্তাব অনুমোদনের সকল ক্ষমতা এই বোর্ডের উপর ন্যস্ত করা হয়েছে।

 

ব্যক্তিগত মালিকানাধীন কারখানাগুলিতে সত্বর স্বাভাবিক কাজ আবার শুরু করার জন্য কারখানাগুলিকে সর্বপ্রকার সাহায্য দেওয়া হয়েছে। কাঁচামাল আমদানীর জন্য আমদানী নীতিতে সুবিধা দান, ব্যবসা ও বাণিজ্যের সম্প্রসারণের জন্য স্টেট ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ কতৃক ঋণদানের বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যুক্তভাবে সাহায্যের প্রয়োজনে বিভিন্ন ব্যাংক একজোট হয়ে কনসোর্টিয়াম গঠন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। পিকিক ও আইডিপিকে দেয়া পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন কারখানাগুলির ঋণ পরিশোধের সময় বাড়িয়ে দেওয়া ছাড়াও নগদ পুজিদানেরও সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গোলযোগকালে যে সকল ব্যক্তিগত মালিকানাধীন ব্যাবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে তাদের বীমার টাকা দিয়ে দেবার নীতিও গ্রহণ করা হয়েছে। এর ফলে ব্যক্তিগত ব্যবসায়ে রত লোকদের পক্ষে তাদের ব্যবসাকে পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া হবে।

 

প্রদেশের অর্থনীতির প্রধান অবলম্বন কৃষি ক্ষেত্রে ঋণদানের বিশেষ ব্যবস্থা করবার জন্য এডিবিপিকে বিশেষ খাতে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। এই বৎসরের পাটনীতিতে পাটের সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণকালে মণ প্রতি ২ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে পাটচাষীদের আয়ের পথ সুগম হবে। পাটের এই বর্ধিত মূল্যকে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে কাঁচা পাট রফতানীর ক্ষেত্রে বোনাসের সুযোগও শতকরা ১০ থেকে ১৫ ভাগ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকার কতৃক প্রতিষ্ঠিত জুট ট্রেডিং কর্পোরেশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তারা যেন সরকার কতৃক নির্ধারিত সর্বনিম্ন মূল্যে বহুল পরিমাণ পাট ক্রয় করে। এ কাজ যাতে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে পারে তার জন্য এই সংস্থাগুলোকে যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। এই দুই সংস্থার কাজে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে সরকার আরও একটি সংস্থার সৃষ্টি করার সিদ্ধান্ত করেছেন। তার নাম হবে জুট প্রাইস স্টেবিলাইজেশন কর্পোরেশন। এই প্রতিষ্ঠানের কাজ হবে যে, প্রদেশের সমস্ত বিকল্প পাটের বাজার থেকে পাট ক্রয় করা।

 

অবশ্য আমি এ কথা বলতে পারি না যে, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ সন্তোষজনক। এখনও এমন অনেক অর্থনৈতিক ক্ষেত্র রয়ে গেছে যা সরকারের পক্ষে উদ্বেগের কারণ। যা হোক এ কথা অনস্বীকার্য যে, আমরা মোড় ফিরাতে সক্ষম হয়েছি এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পথে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছি। আমি আমার দেশবাসীর নিকট আবেদন জানাচ্ছি যে, তারা যেন আমাদের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে সরকারকে সর্বোতভাবে সাহায্য করেন। এই বিরাট কাজে যে শুধু জনগণ ও প্রদেশের সরকারের কর্মতৎপর হতে হবে তাই নয়, বরং এতে সমগ্র জাতির সম্পদ ও সহায়তার প্রয়োজন হবে। আমি এ সম্বন্ধে একেবারে নিশ্চিত যে, সম্মিলিত, শক্তিশালী ও আত্মপ্রত্যয়ী জাতি হিসেবে পাকিস্তান যাতে উন্নতির পথে অগ্রসর হতে পারে, তার জন্য এই মহান দেশের আপামর জনসাধারণ একই সঙ্গে হাত মিলিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করবে।

এবার আমি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে দু-একটি কথা বলব। আমাদের চারিদিকে এখন যা ঘটছে তাতে জনসাধারণের মনে দারুণ উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। আমি জানি যে, এই অস্বাভাবিক অবস্থার দরুন সমাজের প্রায় সকল স্থরের লোক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। তাদের এই দুঃখ-দুর্দশায় আমি গভীরভাবে দুঃখিত। তাদেরকে আমি আমার আন্তরিক সহানুভূতি জানাচ্ছি। কাজেই সামজিক পুনর্বাসন অপেক্ষা মানবিক পুনর্বাসন আজ অনেক বেশী জরুরী। কার্য-কারণ অনুসন্ধান করলে আমরা দেখতে পাব যে, প্রত্যেকের মনেই ভয় ও ভীতির সঞ্চার হয়েছে। এই অবস্থার অবসান ও জনগণের মনে সম্পুর্ণ আস্থা ও শান্তি ফিরিয়ে আনা আমার সরকারের প্রধান দায়িত্ব। এই গুরুদায়িত্ব পালনে আপনাদের আন্তরিক সহযোগিতা একান্ত কাম্য।

 

আমার বিশ্বাস যে, এই ব্যাপারে বেসামরিক প্রশাসন ব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সাম্প্রতিক গোলযোগে শাসন ব্যবস্থারও প্রভূত ক্ষতি হয়েছে। আমি আশা করি দেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সরকারী কর্মচারীরা সততা, নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে তাদের কর্তব্য পালন করে যাবেন, আমি তাদের এই আশ্বাস দিতে চাই যে তারা যাতে সুচারুরূপে তাদের কর্তব্য সম্পাদন করতে পারেন সেজন্য সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হিবে।

 

পরিশেষে আমি আরও একবার আমার পূর্বের কথা আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, আমার সরকার একটি অন্তবর্তীকালীন সরকার। যে মুহুর্তে স্বাভাবিক অবস্থা ফিয়ে আসবে এবং নির্ধারিত কার্যক্রম অনুসারে উপনির্বাচন সমাপ্ত করা হবে, সেই মুহুর্তে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে জনগণের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হবে। আজ আমরা আল্লাহর নিকট মোনাজাত করি, তিনি যেন আমাদের এই প্রচেষ্টাকে সাফল্যমন্ডিত করেন।

পাকিস্তান পায়েন্দাবাদ।