সাম্প্রদায়িতকাঃ সামন্তবাদ প্রসঙ্গ

Posted on Posted in 5
সাম্প্রদায়িকতাঃ সামন্তবাদ প্রসঙ্গ *

মোস্তফা আনোয়ার

সামন্তবাদ সভ্যতার ইতিহাসে একটি মৃত অধ্যায়। বাংলাদেশেও একদিন ছিলো সামন্ততন্ত্র ছিলো জমিদারের শাসন ও শোষণ। এই জমিদারদের ছিল দুর্দান্ত প্ৰতাপ। পরগাছার মত এই জমিদার-শ্রেণী বেঁচে ছিল লাঞ্ছিত-নিপীড়িত মানুষের রক্ত শোষণ করে। এই জমিদাররা নিজেরাই এক জাতি-নিজেরাই একটা শ্রেণী। এরা হিন্দুও নয়, মুসলমানও নয়। এরা রক্তপায়ী এক জীব। এরা দরিদ্র মুসলমান কৃষককে শোষণ করেছে-নিরন্ন হিন্দু কৃষককেও ক্ষমা করেনি। এদের রক্তলোলুপ থাবা থেকে কেউ-ই রেহাই পায়নি। সম্পর্কটি ছিলো জমিদার ও কৃষকের মধ্যে শোষক ও শোষিতের সম্পর্ক- হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্ক নয়। হিন্দু জমিদারের মধ্যে যেটা কাজ করেছে সেটা শ্রেণীস্বর্থ-জমিদাররূপে অত্যাচারিত কৃষকের রক্ত-পানের উদগ্র নেশা।

হিন্দু বা মুসলমান জমিদারদের অত্যাচারের এটাই বাস্তব চিত্র। শুধু বাংলাদেশে কেন সমগ্র বিশ্বে সামন্ততন্ত্রের এটাই আসল চেহারা। রাশিয়ায় বা আমেরিকায় এই সামন্ত প্ৰভুদের অত্যাচারের কাহিনী রক্তলেখায় লেখা আছে ইতহাসে ও সাহিত্যে।

(বিশ্বের প্রতিটি দেশে সাধারণ মানুষ অত্যাচারিত, লাঞ্ছিত, নিপীড়িত হয়েছে এই জমিদার শোষকগোষ্ঠী দ্বারা। কিন্তু এই অমানিশারও শেষ আছে। মানুষের মুক্তির সূর্যোদয় অবশ্যম্ভাবী। অত্যাচারিত মানুষ জেগেছে। ঘুম ভেঙ্গেছে দৈত্যপুরীর রাজকন্যার। অবশেষে কবর রচিত হয়েছে সামন্ততন্ত্রের। অত্যাচার আর নিপীড়নের হয়েছে অবসান। শোষণহীণ গণতান্ত্রিক সমাজ গঠন করেছে সংগ্রামী মানুষ।)

আমরা আগেই বলেছি, সামন্তবাদ বা জমিদারতন্ত্র সভ্যতার ইতিহাসে একটি মৃত অধ্যায়-যাদুঘরের সামগ্ৰী। যে জমিদার অত্যাচার করেছিলো, সে জমিদার শেষ হয়েছে। নিশ্চিহ্ন হয়েছে এই রক্তাপায়ী জোঁক শ্রেণী। ব্যাপারটি হচ্ছে শ্রেণী-সংঘর্ষের- হিন্দ-মুসলমানের নয়। বরং সর্বহারা কৃষকের জয় ঘোষিত হয়েছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পত্তনের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের দরিদ্র কৃষকের দুঃখের অবসান হয়েছিল। বাংলার কৃষকের চোখে নেমেছিলো নতুন ফসলের আশা। বাংলার কৃষক দুর্ভিক্ষ দেখেছে। দেখেছে জলোচ্ছাসের ভীষণ তাণ্ডবলীলা, দেখেছে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণির বিধ্বংসকে। তবু সে বুক বেঁধে দাঁড়িয়েছে প্রতিবার। পদ্মাপারের মানুষ ধ্বংসকে ভয় করে না, তার হাতে আছে দুর্জয় সৃষ্টির মন্ত্র।

কিন্তু এতবড় দুর্যোগ কি কেউ কোনোদিনও দেখেছে? নিজের দেশে, নিজের ঘামঝরানো পয়সায় কেনা গুলি এসে বিধে নিজেরই বুকে। কারা চালালো গুলি? হিন্দু জমিদার-নাকি সেই দস্যু বর্বর পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদার?


চট্টগ্রাম সীমান্তবর্তী মুক্তাঞ্চলে দ্বিতীয় পর্যায়ে স্থাপিত বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত

.

কারা পুড়িয়ে দিলো কৃষকের সাজানো সবুজ ক্ষেতকে- কারা কামান ও গোলায় গুড়িয়ে দিলো কৃষকের কুটির- কারা কেড়ে নিলো নবান্নের উৎসব- কারা, কারা, তারা কারা?

ইতিহাসের কবর থেকে উঠিয়ে আনা হচ্ছে জমিদারকে । জমিদার তো অত্যাচার করাই ছিল আর তার শাস্তিও পেয়েছে গণ-মানুষের হাতে। কিন্তু তোমাদের শাস্তির দিনও যে দ্রুত ঘনিয়ে আসছে- তা কি জানো?

তোমরা কি ভেবেছ জমিদার ও কৃষকের শ্রেণী-সংঘাতের ইতিহাসটি মুছে দিয়ে আজকের জাগ্রত শ্রেণীসচেতন মানুষকে সাম্প্রদায়িতার ভাঁওতায় ভোলাতে পারবে? ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যা করে দাঙ্গাবাজ রাজনীতি এদেশের মাটিতে আজ অচল।

আজ প্রতিটি বাঙালী জানে, এ যুদ্ধ তার বাঁচার জন্য। এ যুদ্ধ তার চিরদাসত্বের নিগড় থেকে মুক্তির জন্য। বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধকে তাই ইতিহাসের কবরে পচে যাওয়া সাম্প্রদায়িকতার বিষে ঘুলিয়ে দেওয়া যাবে না।

তথাকথিত পাকিস্তান আর নেই। পাকিস্তানের নিশান আমরা পুড়িয়ে ভস্মীভূত করেছি। আমরা উড়িয়েছি আমাদের বুকের রক্তে রাঙানো স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। রক্তে আমাদের স্বাধীনতার আগুন গদগদ করছে। চোখে আমাদের প্রতিশোধের দাবাগ্নি দাউ দাউ করে জ্বলছে। মুখে আমাদের স্বাধীনতার বাণী চৌচির করে ফেটে পড়েছে শত-কোটি কণ্ঠে ।

এই মহান বিপ্লবকে বিভ্রান্ত করার জন্য ওরা তাই উঠে-পড়ে লেগেছে। কিন্তু ওদের রসদ কই? হ্যাঁ, আছে বস্তাপচা রাজনীতি- হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা-বাধানোর অপচেষ্টা। বুকে বেপরোয়া গুলি চালিয়ে সমস্ত বাঙালী জাতিটাকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার হীন-ষড়যন্ত্রে মেতে, অখণ্ডতার প্রলেপ মাখানো আর ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী ভূত দেখানোতে ।

এক কথায়, দাঙ্গাবাজি, লুটতরাজ, নারী-হরণ প্রভৃতি অসামাজিক পৈশাচিক নারকীয় পশুত্বের রাজত্ব সৃষ্টি করতে চায় ওরা লক্ষ শহীদের রক্তভেজা বাংলার মাটিতে। যে জাতি সূৰ্যতেজে জেগে উঠেছে সে কি অন্য কোন রাষ্ট্রের কাছে দাসত্বের জন্য হার মানে? অদ্ভুত ওদের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। অদ্ভুত ওদের ইতিহাসের ব্যাখ্যা। অদ্ভুত ওদের বেপরোয়া গণ-হত্যার নজির।

দাঙ্গাবাজি কলা-কৌশল আর চলচে না। লাঞ্ছিত নিপীড়িত দরিদ্র বাঙালী গণ-মানুষ ওদের কলঙ্কিত রাজনীতির মুখোশ উন্মোচিত করেছে। ওদের নগ্ন আসল রূপটি অতি দুর্ভাগ্যের রাত্রে আমরা দেখে ফেলেছি। পশুও বুঝি এত নগ্ন নয়- এত বিশ্রী, এত কুৎসিৎ এত বীভৎস নয়।

ওরা মানুষ হত্যা করেছে- আসুন আমরা পশু হত্যা করি।

জয় বাংলা।

প্রচারঃ ২১-8-৭১