সার্বজনীন ভোটাধিকার আদায়ের জন্য জনগণের প্রতি পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান নেতৃবৃন্দের আবেদন

Posted on Posted in 2

<2,40,226-227>
শিরোনাম : সার্বজনীন ভোটাধিকার আদায়ের জন্য জনগণের প্রতি পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান নেতাদের আবেদন।
সূত্র : সর্বদলীয় ভোটাধিকার ও প্রত্যক্ষ নির্বাচন কর্মপরিষদের প্রচারপত্র।
তারিখ : মার্চ, ১৯৬৪
আগামী ১৮ ই ও ১৯ শে মার্চ ভোটাধিকার দাবিতে প্রদেশব্যাপী সভা,
শোভাযাত্রা ও হরতাল।

দেশবাসী ভাই ও বোনেরা,

সুদীর্ঘ দুইশত বছর বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াই করিয়া আমরা যে স্বাধীনতা তথা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার লাভ করিয়াছিলাম, আজ ছয় বছর সেই অধিকার হইতে আমরা বঞ্চিত। আবার সেই অধিকার ছিনাইয়া লইয়াছে এমনই এক শাসক শ্রেণি যারা দেশবাসী কে ভোটাধিকার লাভের যোগ্য বলিয়া মনে করে না ; বরং ” গরু – ভেড়ার ” সমতুল্য বলিয়া মনে করে। আজ বিশ্বের দিকে দিকে যখন নাগরিক অধিকার ও ব্যক্তি স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ক্রমশ : সাফল্য লাভ করিতেছে ঠিক সেই সময় আমাদের শাসকবর্গ দেশবাসী কে ভোটাধিকার লাভের অযোগ্য ঘোষণা করিয়া চরম স্বৈরাচারী পন্থায় দেশ শাসনের ব্যবস্থা করিয়াছেন।

জাতীয় জীবনের এক সংকটজনক সন্ধিক্ষণে আজ আমরা অবস্থান করিতেছি। একবার আপনার পরিবারের, আপনার সমাজের, আপনার দেশের কথা ভাবিয়া দেখুন। সমাজের সর্বশ্রেণী ও সর্বস্তরে আজ এক চরম হতাশা এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুর্যোগ বিরাজমান। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির আকাশ চুম্বী মূল্য বৃদ্ধিতে সমাজ ধ্বংসের পথে। নগরশুল্ক হইতে আরম্ভ করিয়া হাজারো রকম ট্যাক্স ও বর্ধিত খাজানার চাপে দেশবাসীর অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড আজ ভাঙিয়া পড়িবার উপক্রম হইয়াছে। উন্নয়নমূলক কাজের নামে কোটি কোটি টাকার ঘুষ ছড়াইয়া দেশে এক নাটকীয় পরিবেশের সৃষ্টি করা হইয়াছে। অর্ডিন্যান্স – এর যাঁতাকলে বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রায় লুপ্ত। গণতন্ত্রের নামে একনায়কত্ব আজ দেশের বুকে চাপাইয়া দেওয়া হইয়াছে।

ভাইসব, পাকিস্তান অর্জিত হয় জনগণের ভোটে। আর আজ সেই পাকিস্তানের জনগণ কে ভোটাধিকার হইতে চিরতরে বঞ্চিত করার এক জঘন্য ষড়যন্ত্র চলিয়াছে।উহার নজীর কোন স্বাধীন ও সভ্য দেশে নাই – এমনকি বৃটিশ আমলেও ছিল না। আইয়ুব সরকার স্বয়ং যে কমিশন নিয়োগ করিয়া ছিলেন, সেই কমিশন ও সার্বজনীন ভোটে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের সুপারিশ করিয়াছিল। কিন্তু সকল সুপারিশ, গণদাবী উপেক্ষা করিয়া স্বৈরাচারী সরকার দেশবাসীর প্রত্যক্ষ ভোটাধিকারের মাধ্যমে নির্বাচন ব্যবস্থা কে চিরতরে নস্যাৎ করিবার জন্য জাতীয় পরিষধের বর্তমান অধিবেশনে আইন পাসের চক্রান্ত করিতেছেন।

যে দেশবাসী রাষ্ট্র পরিচালনায় রসদ যোগাইতেছে, খাজনা – ট্যাক্স যোগাইতেছে, রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যাপারে তাদের কোন অধিকার থাকিবে না, মতামত প্রকাশের অধিকার থাকিবে না, তাদের দেওয়া টাকা কিভাবে খরচ হয় তাহাতেও তাঁহাদের মতামতের কোন সুযোগ নাই – কোন স্বাধীন দেশে এ ব্যবস্থা চলিতে পারে না। অথচ, বর্তমান সরকার উক্ত অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দেশে চালু করিতে চাহিতেছেন এবং ক্ষমতাবিহীন জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদ গুলিকে এক তামাসায় পরিণত করিয়া অর্ডিন্যান্স – এর দ্বারা দেশ শাসন করিয়া চলিয়াছেন।

ভাই – বোনেরা,

সুদীর্ঘ ছয় বছরের সস্বৈরাচারী শাসনে নিস্পিষ্ট আমাদের জাতীয় মানসে আজ এই একটি সত্যই সুস্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে যে, হয় দাসত্ব বরণ, নয় সুদৃঢ় গণ – ঐক্য ও গণ আন্দোলন দ্বারা স্বৈরাচারের প্রতিরোধ – এই দুই ব্যবস্থা ছাড়া আমাদের জন্য তৃতীয় কোন পথ খোলা নেই।

আমরা জানি, গণ ঐক্য ও দুর্বার গণ – আন্দোলন ই আমাদের পথ। আমাদের হতাশ হওয়ার কিছু নাই।দেশবাসীর গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় রক্তদানের আত্মদানের সুমহান ঐতিহ্য আমাদের রহিয়াছে। তাই আমরা জানি, স্বৈরাচারী শাসকবর্গের প্রতিক্রিয়াশীল ষড়যন্ত্র রুখিবার ক্ষমতা আমাদের আছে। সুতরাং বর্তমান স্বৈরাচারী ব্যবস্থার বাহু মুক্ত হইতে হইলে ছাত্র, মজুর, কৃষক, মধ্যবিত্ত, চাকুরিজীবী, আইনজীবী তথা সকল শ্রেণির, সকল পেশার, সকল দল ও মতের মানুষের নিকট আমরা আবেদন জানাইতেছি, সার্বজনীন ও প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার আদায়ের দাবিতে নিয়মতান্ত্রিক দুর্বার গণ – আন্দোলন গড়িয়া তুলুন ও আগামী ১৮ ই মার্চ বুধবার সারা প্রদেশ ব্যাপী রাস্তার মোড়ে মোড়ে সভা অনুষ্ঠান ও খন্ড মিছিল বাহির করুন এবং ১৯ ই মার্চ বৃহস্পতিবার প্রদেশব্যাপী হরতাল, জনসভা, শোভাযাত্রা করুন।

আমাদের আজ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করিতে হইবে, সার্বভৌম ক্ষমতা দেশের জনগণের উপর ন্যস্ত, কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষের হাতে নয়। নির্ভীক চিত্তে বলিতে হইবে, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত নয় এমন কোন সরকার দেশবাসী গ্রহণ করিবে না। যতদিন আমাদের এই সার্বজনীন ভোটাধিকার ও প্রত্যক্ষ নির্বাচনের গণদাবী আদায় না হইবে ততদিন সংগ্রাম চলিতে থাকিবে।।

ঢাকার কর্মসূচী

★ ১৮ ই মার্চ, বুধবার : রাস্তার মোড়ে মোড়ে সভা ও খন্ড মিছিল

★ ১৯ শে মার্চ, বৃহস্পতিবার : হরতাল

★ বিকাল চারটায় পল্টন ময়দানে বিরাট জনসভা

★ সভাশেষে শোভাযাত্রা ।

সর্বদলীয় ভোটাধিকার ও প্রত্যক্ষ নির্বাচন কর্মপরিষদ

মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, সভাপতি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি।

মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাপিশ।

শেখ মুজিবুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ।

মহিউদ্দিন আহমেদ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি।

মওলানা সৈয়দ মোসলেহউদ্দিন, সভাপতি, পূর্ব পাকিস্তান নেজামে ইসলামী পার্টি।

মওলানা সিদ্দিক আহমদ, সাধারণ সম্পাদক, পূর্ব পাকিস্তান নেজামে ইসলামী পার্টি।

মওলানা আবদুল আলী, এম, পি, এ ( ভূত পূর্ব জামাতে ইসলাম) ।

মওলানা আখতার উদ্দিন আহমদ, এম, এন, এ ( ভূতপূর্ব জামাতে ইসলাম )।