সূর্য ওঠার স্বপ্ন নিয়ে

Posted on Posted in 5
সূর্য ওঠার স্বপ্ন নিয়ে

২ নভেম্বর, ১৯৭১

প্রেরণার আলোয় যে হৃদয় দীপ্ত, সে হৃদয় প্রকাশের উন্মাদনায় উন্মুখ। এই প্রেরণা জীবনের প্রেরণা এই আলো মেঘের পরে মেঘ জমা আঁধারের ফাঁকে ফাঁকে টুকরো আলো নয়। অনেক অনেক আলো।

জীবনকে সুখের ঐশ্বর্যে শান্তির পরশ বুলিয়ে আপন ভৌগোলিক অবস্থানের মধ্যে পেতে চাই। ঐশ্বর্য বা শান্তিই প্রেরণার উৎস।

প্রেরণার দীপশিখা যে হৃদয়কে স্পর্শ করেছে, সে হৃদয় অনির্বাণ- কেননা এই দীপশিখা দেহকে একদিনে উত্তপ্ত করেনি। সময়, হ্যাঁ প্রচুর কালহননের পর বিবেকতাড়িত মন একটি বিশেষ মুহুর্তে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। হৃদয় তখন প্রকাশের প্রতীক্ষায় মাতোয়ারা হয়ে ওঠে। আমরা প্রেরণা পাই। আলো জ্বলে, আলো নেভে না। তথাপি ঝড় ওঠে। বাতাস ছোটে। দীপশিখায় কাপন জাগে। কখনো মৃদু, কখনো ভয়ঙ্কর। তাই বলে কি নিভিয়ে দেবে প্রেরণার আলো। নীরব অন্ধকার ঠেলে দেবে স্বর্ণোজ্জ্বল ভবিষ্যৎ? না, দিতে পারে না কস্মিনকালেও না।

প্রেরণার আলো অন্তরে জ্বলেছে। জেনেছি প্রেরণার উৎস কোথায়। শুধু পাইনি ফসলটুকু। কিন্তু শুনেছি তো কবির কষ্ঠে, “সেদিনও এমনি ফসল বিলাসী হাওয়া মেতেছিল তার চিকুরের পাকা ধানে।”

‘পাকা ধান আর রূপসীর শরীরের মিষ্টি ঘাণ। মনে হলে কেমন যেন আবেশ জাগে। উত্তাপও। অথচ না পাওয়ার একটা জলার্ত বেদনা।

না না না, এ হতে পারে না। পেতেই হবে। আলোর রশ্মিটা দিব্যদর্শন করেছি। আর বেশী দূরে নয়। তিমির রাত্রির অবসান হবে। ভোর হবে। পাখি ডাকবে। আবার জানালায় দাঁড়িয়ে প্রভাতসূর্যোদয় প্রাণভরে উপভোগ করবো। হঠাৎ চমকে উঠবো, একি সন্ধ্যা তুমি, এমনি অকালে!

– হ্যাঁ, আমি, চমকে উঠলে যে বড়। এই নাও, মালাটা রাখ।

সন্ধ্যার চোখে-মুখে দুষ্টুমি হাসি। হাতে বকুলমালা শয্যা থেকে ওঠা সন্ধ্যার মিথিল বৈশিষ্ট্য দৃকপাত করতে অজান্তেই কেমন যেন শৈথিল্য আসে। অন্যমনস্ক হতে চায়। কিন্তু শুধুই কয়েকটি মুহুর্ত। অন্যমনস্ক চিত্ত আবার চঞ্চল হয়ে ওঠে একটি কথায়- এমন করে আমাকে দেখছ কি? আকাশের দিকে চোখ মেলে দেখ।

ও তাই তো! আমাকে আকাশের দিকে চোখ মেলে তাকাতে হবে। আমার দৃষ্টি হবে প্রসারিত। আকাশ। মাটি স্বদেশ। ভালবাসা।

সন্ধ্যা আমাকে ভালোবাসে। ভালোবাসে বলেই আমার দৃষ্টিপথ সৃষ্টি করে দিলো একটি সরল সংলাপে। আমি হাত বাড়িয়ে মালাটি নিলাম নিমেষে দৃষ্টির আড়ালে মিলিয়ে গেল সন্ধ্যা।

বকুল ও সন্ধ্যা’। এই দুটোর মধ্যে কেমন যেন দূর অস্তিত্বের সম্পর্ক বিদ্যমান। বকুল-সন্ধ্যা না হয়ে ‘মালতী’-সন্ধ্যা হতে পারত। কিন্তু সন্ধ্যা মালতী নিয়ে এল না। এল বকুল নিয়ে। প্রভাতসূর্যোদয় মুহুর্তে। একটি বকুলমালাও জীবনের মহৎ প্রেরণা।

এমনি মহৎ প্রেরণার উৎস খুঁজে বেড়াবো। স্বদেশের লাখো লাখো সন্ধ্যা প্রভাতসঙ্গীতের সুর নিয়ে জীবনের নতুন অধ্যায় রচনা করবে। আবার চিনতে পারবো নিজেকে। উপলব্ধি করতে পারবো।

সন্ধ্যা, এই মুহুর্তে আমি তোমার স্মৃতিচারণ করছি। তোমার সরল সংলাপ আমার মনে পড়ছে। পঁচিশে মার্চের কয়েকদিন আগে বলেছিলে, তুমি ভয়ানক ঘরকুনো একদিন মিছিলেও যোগ দিলে না। এত ঘরকুনো আমার ভাল লাগে না- তোমার কথায় সেদিন লজ্জা পেয়েছিলাম। এ লজ্জা যে আমার দীনতা তাও বুঝতে পেরেছিলাম, কিন্তু তোমার কাছে ঠিক সেই মুহুর্তে পরাজয়টা স্বীকার করে নিতে পারিনি। কঠিন জবাব দিয়েছিলাম- যা বোঝ না তা নিয়ে কথা বলো না সন্ধ্যা। হাউকাউ করে, মিছিলে ঘুরে স্বাধিকার পাওয়া যায় না।

রূঢ় জবাবে তোমাকে সাময়িক স্তব্ধ করতে পেরেছিলাম হয়তো কিন্তু বিবেককে আমি ফাঁকি দিতে পারিনি। পরক্ষণেই ভীরু হৃদয় আমার সংকুচিত হয়েছিল। সন্ধ্যা, তুমি জানতে না এসব শ্লোগান মিছিল সভা শোভাযাত্রা আমার বডড ভয় করতো! কিন্তু আজ? তুমি জান না কেমন করে আমি জনতার মিছিলে লিখেছি আমার নাম। আমি এখন মিছিলের ভিড়ে। ছিন্নমূল মানুষের মাঝে। তুমি দেখতে পাচ্ছ না কেমন করে লাখো লাখো ছিন্নমূল প্ৰাণ জীবনের জয়গান করে। কেমন করে মরিয়া হয়ে ঈপ্সিত লক্ষ্যে পৌছুবার সংগ্রামে ওরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। হয়তো তুমিও এতক্ষণে তস্করদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছ।

জান, বুকের ভেতরটা মাঝে মাঝে কেমন যেনো করে। তোমার মুখখানি মনে পড়লে একতা অজনিত আশংকায় কেপে উঠি। না জানি তুমি কোথায় কেমন করে আছো! অবশ্যি আমি একটি শক্তিও অর্জন করে ফেলেছি। আত্মসান্তনার বিপুল শক্তি। আগে তো সপ্তাহখানেক না দেখলে কেমন ভেঙ্গে পড়তাম। কই, এখন তো আর তেমন হয় না। বলতে পার কোথায় পেয়েছি এই সান্তনা। এই সংযমশক্তি। আমার মনে হয় কি জানো, এর পেছনে প্রেরণা আছে। তোমার ভালোবাসাই এই প্রেরণার উৎস।

সন্ধ্যা, আমার অনেক আশা। হয়তো তুমি এক মারাত্মক অস্ত্রে সজ্জিতা। ঘরের বাইরে। ঝড় কেটে গেলে তুমিও একদিন সুন্দর একটি ঘরের মানুষ হবে। বাংলার লাখো লাখো সন্ধ্যা তোমার মতো সংলাপী হবে। তারা আমার সহোদরা একদিন বধূ হবে। মা হবে। বীর সন্তানের জননী। তোমার মধ্যে আমি কোথায় আমার মায়ের আদল খুঁজে পাই। আমার মাও যে এমনি কথা বলে। বাংলার বিস্তীর্ণ প্রান্তরে প্রান্তরে আমি তোমার অস্তিত্ব খুজি। দিনমণি বিদায় নিলে আমরা অন্ধকারে জলে জলে স্থলে, কখনোবা কালো পাহাড়ের গায়ে মিলে যাই, অতন্দ্র

রাত জাগি, হানাদার শত্রুশিবির নিশ্চিহ্ন করে অন্যমনে পরিপূর্ণ ভিন্নজগতে- তখন সত্যি ভুলে যাই তোমার কথা। ভুলে যেতে হয়। সূর্য ওঠার স্বপ্ন নিয়ে যখন ক্যাম্পে ফিরি, তখন নিশুতি রাতে অসহায় ছিন্নমূল মানুষের কান্নার শব্দ ভেসে আসে। রাতজাগা দু’একটি পাখি পাখা ঝাপটায়। আমি বাতাসে তোমার ঘন ঘন নিঃশ্বাস শুনতে পাই। অনুভব করি। তুমিও বুঝি এতক্ষণেও কোনও ক্যাম্পে ফিরছ।

সূর্য ওঠার এখনও দেরী। বাকি রাতটুকু আমাদের পাড়ি দিতে হবে। জমাটবাঁধা অন্ধকার ব্যারিকেড সবল বাহুতে উপড়ে ফেলে আবার প্রভাতসঙ্গীতের সুর শুনব জানালায় দাঁড়িয়ে প্রভাতসূর্যোদয়কে অভ্যর্থনা জানাবো। তুমি আমার বকুলমালা হাতে নিয়ে স্নিগ্ধ হাসবে।

(মেসবাহ আহমেদ রচিত)