সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেপ্তারের আগে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে প্রতিবেদন

Posted on Posted in 2

<2.20.138>

 

 

শিরোনামসূত্রতারিখ
সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতারের আগে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে প্রতিবেদনসরকারী১৪ ফেব্রুয়ারী, ১৯৬২

 

 

জনাব সোহরাওয়ার্দীর গ্রেপ্তারের আগের পরিস্থিতি

 

পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক আবহাওয়ায় তখন সাধারণ মানুষের এবং সারা বিশ্বের একটাই চাওয়া প্রতিফলিত হচ্ছিল এবং তা হল সামরিক শাসন উঠিয়ে নিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরত যাওয়া। রাজনীতিবিদরা অবশ্য সংবিধান প্রণয়ন নিয়েই বেশি চিন্তিত ছিলেন যা ছিল গভীর হিসাবনিকাশের ব্যাপার। অন্যদিকে চরমপন্থি অংশটি ধরে নিয়েছিল যে, সংবিধানে প্রদেশের আশা আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়ন করা হবে না, এবং এর ঘোষণায় বিক্ষোভ আরো জোরদার হবে।

 

সাধারণ বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় সংবিধানকে বিবেচনা করেন জাতীয় নীতি বাস্তবায়নের উপায় হিসেবে। তাঁরা মূলত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গৃহীত নীতি আর পদক্ষেপ নিয়েই বেশি চিন্তা করেন এবং তাঁদের চিন্তায় সংবিধানের গঠনপ্রকৃতি কেমন হবে, তার চাইতে বরং এটা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুযোগসুবিধা সৃষ্টিতে কতখানি অংশীদার হবে তারই প্রাধান্য বেশি। সাধারণ মানুষ সে সময় নিয়মতান্ত্রিকতায় ফেরত যাবার ইচ্ছা থেকে কিছু পাবার প্রত্যাশায় ছিল এবং প্রদেশের আশাআকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে এমন অর্থনৈতিক নীতির যুগপৎ ঘোষণাই কেবল পারে সাধারণ মানুষের শঙ্কাকে প্রশমিত করে অনেক দূর এগিয়ে নিতে। একটা পরিষ্কার ব্যাপক অর্থনৈতিক নীতিপ্রণয়নের ঘোষনা দেয়ার এটাই ছিল এক যথার্থ সুযোগ, যা এতদিন শুধু খণ্ড খণ্ড ভাবে দেয়া হয়েছে।

 

 

সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে যারা মফস্বল এলাকার, বর্তমান সরকারের আমলে প্রদেশে গৃহীত আর্থিক গতি ও উন্নয়নে সন্তুষ্ট ছিল। তারা আস্থাবান ছিল যে, প্রদেশে এই উন্নয়নের গতি আরো বাড়বে। আর্থিক বরাদ্দ কমিটি স্থাপন,  ঋণপ্রদান সংস্থাগুলোর বিকেন্দ্রীকরণের প্রস্তাব এবং পি,আই,ডি,সি (PIDC)-র মত প্রতিষ্ঠানগুলোকে দু’ভাগে বিভক্তিকরণ – তাদের ঐ আস্থাকে আরো জোরদার করেছিল। সর্বত্রই, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে, আস্থা ও সন্তুষ্টির একটা স্পষ্ট পরিবেশ বিরাজ করছিল। বুদ্ধিজীবীর অবশ্য তখনো পাকিস্তানের দুই অংশে বিরাজিত বৈষম্য এবং তার দূরীকরণে ঠিক কী পদক্ষেপ নেয়া হবে – তা নিয়ে তর্ক চালিয়ে যাচ্ছিলেন। শাসনতন্ত্রের ব্যাপারে তাঁরা বি,ডি(বেসিক ডেমোক্রেসি – বুনিয়াদী গণতন্ত্র)-কে ইলেক্টোরাল কলেজ (নির্বাচক সমিতি/কমিটি) হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেন।

 

 

দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অবস্থানে ভিন্নতা ছিল। মুসলিম লীগাররা মোটের উপর খুশি ছিল, তবে তারা দেশের আসন্ন রাজনীতির ধারায় নিজেদের অংশগ্রহণ নিয়ে শঙ্কিত ছিল। আওয়ামী লীগাররা স্বাভাবিকভাবেই বর্তমান শাসনামলে গৃহীত উন্নয়নে খুশি হতে পারছিল না। তারা প্রায়ই দাবি করত যে বর্তমান সরকারের গৃহীত উন্নয়ন পদক্ষেপগুলো আসলে তাদের দ্বারাই সূচিত হয়েছিল। রাজনৈতিক কর্মকান্ডে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা আওয়ামী লীগকে জনগণের কাছ থেকে কমবেশি বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। তবে দলের নেতারা এবং বেশির ভাগ কর্মীরাই দলের প্রতি অনুগত ছিল এবং তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে সময় সময় নিজেদের মধ্যে চিঠিপত্র চালাচালি করতেন; যদিও সেটা শহর এবং নগরেই সীমাবদ্ধ ছিল। কর্মীরা ঢাকা এসে তাদের নেতাদের সাথে দেখা করবে – এমনটা কেবল কোন উপলক্ষ হলেই তবে ঘটত।

<2.20.139>

দলীয় পত্রিকা “ইত্তেফাক” পাকিস্তানের দুই অংশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিদ্যমান বৈষম্যগুলো খুব সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরে বর্তমান শাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছিল। এদিকে খুব শীঘ্রই সংবিধান প্রণীত হবে বলে রাষ্ট্রপতির দেয়া ঘোষণার পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভাব চলে আসে যে, তাদের কি এটাকে প্রতিহত করা উচিত নাকি সবাই মিলে জোট গঠন করে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেয়া উচিত। আইয়ুব খানের “এবডো অ্যাক্ট”-এর (EBDO – Elected Bodies Disqualification Order ) অধীনে আওয়ামী লীগের বয়স্ক এবং রাজনীতিতে নিষিদ্ধ ঘোষিত নেতারা সংবিধানের ব্যাপারটায় বিরোধিতা এবং অসহযোগিতার মনোভাব দেখাতে লাগলেন। তাঁরা আসন্ন সাধারণ নির্বাচন বয়কটের পক্ষে অবস্থান নেন। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের তরুণ নেতৃবৃন্দ মত দিলেন যে, বুনিয়াদী গণতন্ত্রের (বেসিক ডেমোক্রেসি) এই নির্বাচনে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ না করলে তাঁরা একটা বিরাট ভুল করবেন এবং তারা যদি এ নির্বাচন বয়কট করে তা হলে তারা চিরতরে শেষ হয়ে যাবেন। তাঁরা মত দিলেন যে, আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমেই কেবল তারা একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে টিকে থাকতে পারবেন।

 

জনাব সোহরাওয়ার্দীর সাম্প্রতিক ঢাকায় অবস্থানের সময় সর্বজনাব আতাউর রহমান খান, আবুল মনসুর আহমদ, শেখ মুজিবুর রহমান, আবদুল জব্বার খদ্দর এবং আরো বেশ কিছু নেতা তাঁর সাথে প্রায়ই অনানুষ্ঠানিক বৈঠক এবং আলাপ আলোচনা করেন। এ আলোচনায় সংবিধান এবং আসন্ন নির্বাচনের বিষয়টি ছিল বলে জানা যায়। আরও জানা যায় যে, জনাব সোহরাওয়ার্দি এবডো-গ্রুপটাকেই সমর্থন করতে বেশি আগ্রহী ছিলেন। যা হোক, তিনি অন্য গ্রুপটার সদস্যদের যার যার সংসদীয় আসনে জেতার সম্ভাবনা হিসেব কষতে বলেন এবং এর ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে যে সংবিধানের ব্যাপারটি গৃহীত হবে নাকি প্রত্যাখ্যাত। কিন্তু এ সিদ্ধান্তের ফলে সংবিধানের ঘোষণা হয়ে গেলে তার পরে দলের নীতি বা কর্মকান্ড কী হবে সে ব্যাপারে কোন পরিষ্কার মতামত পাওয়া গেল না। প্রকৃতপক্ষে, তারা নিজেদের মধ্যেই দারুণভাবে বিভক্ত হয়ে  পড়লেন। 

 

বুনিয়াদী গণতন্ত্রের ( বেসিক ডেমোক্রেসি ) উপদেষ্টারা সবসময় মনে একটা খোঁচা অনুভব করতেন যে, সাবেক রাজনৈতিক কর্মীরা, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির ( ন্যাপ ) কর্মীরা তাদের অবজ্ঞার চোখে দেখে। তাই ভবিষ্যত সংসদে এবং অধিবেশনে তারা নিজেদের মধ্য থেকে যতখানি সম্ভব নির্বাচিত প্রতিনিধি রাখার চিন্তাভাবনা করছিলেন। বেসিক ডেমোক্র্যাটদের করা একটি বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, ৪০ হাজার নির্বাচিত বেসিক কাউন্সিলারের মধ্যে মাত্র ২৯০ জনের রাজনৈতিক অতীত ইতিহাস আছে। একটা খসড়া জরিপে দেখা যায়, শতকরা ২৯ ভাগের বেশি মুসলিম লীগ সমর্থক, ২২ ভাগ আওয়ামী লীগের, ২৬ ভাগ স্বতন্ত্র এবং বাকিরা  অন্যান্য রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক দলের। এ হিসেবে এটা মনে হচ্ছিল না যে, আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যথেষ্ট আসনে বিজয়ী হয়ে আসতে পারবে।

কম্যুনিস্টদেরকে ব্যাপকভাবে জেলেপুরে রাখা সত্বেও তাঁরা গোপনে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁদের কার্যক্ষমতা স্পষ্টত হ্রাস পেয়েছিল। কিন্তু এ দুর্বল শক্তি নিয়েও তাঁরা এ সংবিধানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ তৈরির জন্য সাধ্যমত সবকিছু করার দৃঢ়সংকল্প দেখিয়েছিলেন। তাঁদের মতে এ সংবিধান ছিল অগণতান্ত্রিক এবং একনায়কতান্ত্রিক। তাঁদের সর্বশেষ প্রচেষ্টা ছিল প্রস্তাবিত এ সংবিধানের বিপক্ষে একটা জোট গঠন করা, কিন্তু তাঁরা অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে এ মতে টানতে ব্যর্থ হয়।

 

ক্ষমতাসীন শাসকদের বিব্রত করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রিয় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। কম্যুনিস্টরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ইউনিয়নের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোয় দাপ্তরিক পদগুলোতে শক্ত অবস্থান নিতে সক্ষম হয় নাই। যদিও শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একটা অংশ ছাত্র ইউনিয়নগুলোতে কিছুটা প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়েছিল। তবে এটা আশা করা যাচ্ছিল যে, ছাত্রদের এই অংশটি সংবিধানের ইস্যুতে তাঁদের দ্বারা রাজনীতিতে ব্যবহৃত হবে।

<2.20.140>

জনাব সোহরাওয়ার্দির গ্রেপ্তারের পূর্বের অনুমিত পরিস্থিতি

 

উপরের অনুচ্ছেদগুলোয় উল্লিখিত সাধারণ মানুষের অনুভূতি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর মনোভাব আমলে নিয়ে একটা আশঙ্কা ছিল যে, ছাত্রদের ২১ ফেব্রুয়ারির উদযাপনটাকে আওয়ামী লীগ এবং কম্যুনিস্ট পার্টি শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারে এবং ছাত্রদের এই বিক্ষোভটা যদি যথেষ্ট শক্তিশালী হয় তাহলে তারা আন্দোলনকে সংবিধানের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এছাড়া, মোটের উপর সাংবিধানিকতায় ফিরে যাওয়া নিয়ে একটা আগ্রহ ছিল যাতে সামরিক শাসন উঠে যায় এবং দেশে স্বাভাবিকতা ফিরে আসে। এমনকি যে রাজনীতিবিদেরা সংসদীয় গণতন্ত্রের পক্ষে সবসময় সুর তুলতেন, তাঁরাও এই আসন্ন সাংবিধানিক নির্বাচনের বিপক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। তাঁরা ভেবেছিলেন যে, তাদের রাজনৈতিক আশাআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনের জন্য ভবিষ্যত সংসদে এই সংবিধান সংশোধন করা যেতে পারে। আর সাধারণ মানুষ উৎকণ্ঠা নিয়ে সংবিধানের ঘোষণার অপেক্ষায় ছিল।

 

 

এদিকে সংবিধানের ঘোষণা প্রদানে বিলম্ব করাটা বেশকিছু শঙ্কার সৃষ্টি করেছিল বটে, তবে দৃশ্যত কোন ক্ষোভ তাতে দেখা যায়নি। আসলে খুব শীঘ্রই এ ঘোষণা আসছে এমন একটা পরিবেশ তখন বিরাজ করছিল। সংবিধানের বিপক্ষে ছাত্রদের সম্ভাব্য বিক্ষোভকে মাথায় রেখে প্রস্তাব করা হল যে, সরকার ‘শহীদ মিনার’ তৈরি করে দিতে এবং যথাযোগ্য মর্যাদায় ২১ ফেব্রুয়ারি পালনের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করছে – এমন একটা ঘোষণা দেয়া উচিত। আশা করা হয় যে, এমন একটা পদক্ষেপ ছাত্রদেরকে  বিধ্বংসী কার্যকলাপে ব্যবহৃত করাটা কঠিন করে তুলবে। একেবারে জরুরী না হলে কাউকে গ্রেপ্তার না করতেও প্রস্তাব করা হয়েছিল।

 

জনাব সোহরাওয়ার্দির গ্রেপ্তারের পরবর্তী পরিস্থিতি

 

জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির আকস্মিক গ্রেপ্তার অনেকের কাছে বিস্ময়ের উদ্রেক ঘটায় এবং আওয়ামী লীগারদের মনে প্রচণ্ড ধাক্কার সৃষ্টি করে। সাধারণ ছাত্রসমাজ, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ এখন এ ব্যাপারে সন্দিহান এবং শঙ্কিত হয়ে উঠল যে, একটা অগ্রহণযোগ্য সংবিধান পূর্ব পাকিস্তানের উপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং যে কোন রকমের একটা সংবিধান চাপিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে বিরোধী দলকে দমনের উদ্দেশ্যে আরো রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার করা হবে, সোহরাওয়ার্দির গ্রেপ্তার যার সূচনামাত্র। তবে শ্রমিক আর সাধারণ জনগণ এতে ততখানি প্রভাবিত হয়নি। ‘পূর্ব পাকিস্তান সপ্তাহ’ উদযাপন উপলক্ষে নেয়া বিভিন্ন কর্মসূচীতে সাধারণ জনগণের বিপুল অংশগ্রহণ আর কেবল বরিশাল জেলা ছাড়া অন্য কোথাও এমনকি ছাত্রদেরও প্রতিবাদ করতে দেখা না যাওয়ায় এটা প্রতীয়মান হয় যে, এ প্রদেশে সোহরাওয়ার্দির প্রভাব স্পষ্টতই ক্ষয়িষ্ণু।

 

<2.20.141>

 

 

 

যদিও আওয়ামী লীগে বিদ্যমান বিভিন্ন গ্রুপগুলো যেমন শেখ মুজিবুর রহমান, আতাউর রহমান, মানিক মিয়া প্রমুখের নেতৃত্বের গ্রুপগুলো এক হবার ব্যাপারে কোন নির্দিষ্ট খবর পাওয়া যাচ্ছিল না, কিন্তু তাঁরা এক হয়ে যেতে বাধ্য। নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নে যে মতদ্বৈততা পূর্বে দেখা দিয়েছিল দূর হয়ে যাওয়া এবং এর ফলে সবাই সংবিধান ও আসন্ন নির্বাচনের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়ে যাবার কথা। আর মুসলিম লীগাররা, যারা কিনা নির্বাচনে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক ছিলেন, নিজেদেরকে দেখতে পেলেন পূর্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গৃহীত বিভিন্ন রাজনৈতিক অশুভ তৎপরতার দোষে দুষ্ট এবং প্রতিপক্ষবিহীন এক নির্বাচনী মাঠে। ফলে তাঁরা একটা দারুণ অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়ে গেলেন।

 

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ব্যর্থতার কারণে জনাব সোহরাওয়ার্দি পূর্ব পাকিস্তানে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান খুইয়ে ফেলেছিলেন। তাঁর গ্রেপ্তারটি বরং জনগণের চোখে তাঁর জন্য কিছুটা পুণর্বাসনের মত কাজ করছিল। তাঁর গ্রেপ্তারের দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া হয়েছিল একমাত্র ঢাকা শহরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং জগন্নাথ কলেজের ছাত্রদের মাঝে, আর বরিশাল ও পটুয়াখালি এ দুই ইন্সটিটিউশনের ছাত্রদের মাঝে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রতিবাদস্বরূপ ১৯৬২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তাদের ক্লাস বর্জন করে। এই ইস্যুতে ছাত্রেরা যেন দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছিল। সাধারণত এমনটাই হয়ে এসেছে যে, যখনি ধর্মঘটের মত কোন ব্যাপার হত, ছাত্ররা ধর্মঘটিদের সাথে সংঘর্ষের ভয়ে তাদের ক্লাস বর্জন করত। এই সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি সত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মঘটটি আংশিক সফল হয়েছিল। কিছু পরীক্ষা ছিল যেগুলো এ ধর্মঘটের আওতায় আনা হয়নি।

 

ছাত্রদের ভেতরকার টানাপড়েন দ্রুতই মিটে গিয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতির অদ্ভুত প্রকৃতিই এর কারণ। অনেক সময় নেতৃত্ব হারানোর ভয়ে যৌক্তিক এবং ন্যায্য দৃষ্টিভঙ্গি ধরে রাখাটা কঠিন হয়ে পড়ত। আর এ কারণেই জনাব মঞ্জুর কাদির যখন ফেব্রুয়ারির ৩ তারিখে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে যান, ছাত্রদের উভয় পক্ষই উচ্ছৃঙ্খলতা প্রদর্শন করে। যারা ধর্মঘটের বিপক্ষে ছিল, তারাও সাধারণ ছাত্রদের কাছে নেতৃত্ব ধরে রাখার জন্য আরো বেশি গুরুত্বপুর্ণ এবং উদ্যোগী ভূমিকা পালন করে তাতে।

 

ভবিষ্যত কার্যধারা

 

জনাব সোহরাওয়ার্দির গ্রেপ্তার নিয়ে এখনো আওয়ামী লীগ না প্রকাশ্যে কোন পদক্ষেপ নিয়েছিল, না এ ব্যাপারে কোন পরিকল্পনা তাদের ছিল। তাদের পরিকল্পনায় শুধু ছিল ২১ ফেব্রুয়ারিতে একটা বড়সড় শোভাযাত্রা বের করার এবং সংবিধানের ঘোষণার পর্যন্ত অবস্থা পর্যবেক্ষন করার। সোহরাওয়ার্দির গ্রেপ্তার নিয়ে ছাত্রদের মধ্যকার ঘটনাটাই ছিল সবচে’ গুরুতর সমস্যা। তাদের আরো সংযত করার জন্য ভাইস চ্যান্সেলর এবং আরও কিছু ছাত্র চেষ্টা করতে লাগলেন। তবে সে প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এটা স্থির করা হল যে রমজান উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ দেয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিক্ষোভকারীরা বিস্ময়ের সাথে আবিষ্কার করল যে, ছাত্রদের ব্যবহার করার এবং উত্তেজনা উস্কে দেয়ার সুযোগ তাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। সেইদিন সকালেই তারা একটি বিক্ষোভ সমাবেশ করে এবং এক মিছিল বের করে। এর ফলশ্রুতিতে এ আন্দোলনকে নেতৃত্বশুন্য করে দেয়ার জন্য বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের এবং এ উত্তেজনা ছড়ানোর পেছনের নেতাদেরকে তুলে নিয়ে যাওয়া ছিল পরবর্তী করণীয়।