স্বাধীনতার চূড়ান্ত লড়াই

Posted on Posted in 10

স্বাধীনতার চূড়ান্ত লড়াই

 

বেলুনিয়ায় আমার অগ্রবর্তী কমান্ড পোস্টের দিকে জিপ চালিয়ে এগিয়ে যাই। ধুলায় আচ্ছন্ন পথ। দুই পাশে সোনালী ফসলের মাঠ। ধান কাটা মৌসুম এসে গেছে।

 

অন্যান্য দিনের মতই সূর্য ডুবে গেল। তারপর সমস্ত এলাকা পূর্ণ চাঁদের আলোয় ভরে উঠে।পথের পাশে একটি টহলদার দলকে ব্রিফিং দেয়া হচ্ছিলো।অল্প দুরেই আমাদের মেশিনগানের আওয়াজ শোনা যায়। ফাঁকে ফাঁকে পাকিস্তানী মেশিনগান,….. কখনও বা আর্টিলারী শেল শুরু হয়। সবকিছুই নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনা….. বাংলাদেশের হয়ত সব ফ্রন্টেই  তা ঘটেছিলো প্রতিদিন।

 

মিসেস ইন্দিরা গান্ধী সেদিন কলকাতার এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দিলেন। তাঁর নয়াদিল্লী ফিরে যাবার কোন তাড়াহুড়োই ছিল না। 

 

জেনারেল অরোরার ইস্টার্ন কমান্ড হেড কোয়াটারে আর একটা কর্মব্যস্ত দিনের অবসান ঘটলো। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী রাজধানীর বাইরে তাই ইস্টার্ন কমান্ডের কেউ কোন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ বা সিদ্ধান্ত পাওয়ার আশা করছিলো না।  ওদিকে ইয়াহিয়া খান তখন ইসলামাবাদে।দশদিনের মধ্যে তিনি যুদ্ধ করার যে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন তা শেষ হতে আরও দুইদিন বাকী।

 

ভারতের সমস্ত অগ্রবর্তী বিমান ঘাঁটিসমূহের যুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিলো। তবে বিমানঘাঁটিগুলোতে যুদ্ধের সবগুলো বিমান তখন পর্যন্ত পৌঁছেনি। ভারতীয় নৌবাহিনীর ইস্টার্ন ফ্লীট এবং ওয়েস্টার্ন ফ্লীট তখন পর্যন্ত শান্তিকালীন ঘাঁটিতে অবস্থান করছিলো।

 

পাকিস্তানের বহুল প্রচারিত সাবমেরিন ৩১১ ফুট দীর্ঘ পি-এন-এস গাজী এগিয়ে চলল ভারতের নৌঘাঁটি বিশাখাপত্তমের দিকে। উদ্দেশ্য ছিল ভারতের বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ‘ভীক্রান্ত’ কে টর্পেডো মেরে ডুবিয়ে দেয়া। ৩রা ডিসেম্বর। শুক্রবার।ভারতীয় সময় বিকাল ৫ টা ৪৭ মিনিটে পাকিস্তানী বিমানবাহিনী অতর্কিতে ভারতের ৭টি ঘাঁটিতে একযোগে হামলা চালায়। রাত সাড়ে আটটায় জম্বু এবং কাশ্মীরে দক্ষিণ-পশ্চিম ছাম্ব এবং পুঞ্চ সেক্টরে ব্যাপক আক্রমণ  অভিযান শুরু করে।

 

এই ধরণের পরিস্থিতির জন্য ভারত পুরো প্রস্তুত ছিল। মিসেস গান্ধী দ্রুত রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করলেন এবং ঐ রাতে ১২টা ৩০ মিনিট জাতির উদ্দেশ্য প্রদত্ত ভাষণে সকলকে চরম ত্যাগ স্বীকারের জন্য তৈরি হওয়ার আহবান জানালেন। ততক্ষণে জেনারেল অরোরাও আক্রমণের নির্দেশ পেয়ে যান। ভারতীয় নৌবাহিনী ইতিমধ্যেই সফল অভিযান শুরু করে দিয়েছিলো। বিশাখাপত্তম উপকূলের মাত্র কয়েক মাইল দূরে ভারতীয় ডেস্টায়ার ‘আই এন এস রাজপুত’ পাকিস্তানী সাবমেরিন গাজীর সন্ধান পেয়ে যায়। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ‘রাজপুতের ডেপথ চার্জে পাকিস্তানের সাবমেরিন গাজী টুকরো টুকরো হয়ে সাগর গর্ভে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। একই সঙ্গে অন্যদিকে ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং মুক্তিবাহিনী যৌথভাবে বাংলাদেশ সীমারেখায় অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করলো। ইস্টার্ন ফ্লীটও দ্রুত লক্ষ্যস্থল অভিমুখে অগ্রসর হল। ভারতীয় বিমানবাহিনী কিছুক্ষণ আগে থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় সবগুলো বিমান ঘাঁটি এবং রাডার কেন্দ্রের উপর আঘাত হেনে চলছিলো। রাত ৩টায় ভারতীয় বিমানগুলো ঢাকা ও কুর্মিটোলা বিমান ঘাঁটিগুলোর প্রথম হামলা শুরু করে। ইতিহাসের আর একটি মহান স্বাধীনতার চূড়ান্ত সংগ্রামের সুচনা হল।

 

যুদ্ধের প্রথমদিনে সকল রণাঙ্গনে পাকিস্তানীরা মরণপণ শক্তিতে আক্রমণ প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলো। বেলা ১০টার মধ্যে ভীক্রান্ত তার নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে ৬টি ‘সী হক’ বিমান চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজারের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যস্থলগুলোতে আঘাত হানার জন্য ডেক উড়ে গেলো।

 

পূর্ব সেক্টর অর্থাৎ মেঘনা নদীর পূর্ব দিকের অঞ্চলে পাকিস্তানী সৈন্যদের ধ্বংস করার দায়িত্ব  ভারতীয় ৪র্থ কোরের উপর ন্যস্ত ছিল।এই সেক্টরে প্রধান সড়কপথে রণকৌশলগত প্রতিবন্ধকতা ছিল দুটি স্থানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং লাকসামে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া দহল করতে পারলে পূর্ব সেক্টরের সকল পাকিস্তানী সৈন্য বিশেষকরে সিলেটও মৌলভীবাজারের সৈন্যরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে বাধ্য। একই সঙ্গে লাকসাম আমাদের দখলে এলে কুমিল্লা গ্যারিসন থেকে চট্টগ্রামও ঢাকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। চাঁদপুরও ফেনী দখলের দায়িত্ব ছিল ৪র্থ কোরের উপর। যুদ্ধ শেষ হওয়ার ১০দিনের মধ্যেই এই স্থান দখল করার পরিকল্পনা নেয়া হয়। একই সঙ্গে উত্তরে শমসেরনগর বিমানঘাঁটি, মৌলভীবাজার এবং সিলেটও মুক্ত করার দায়িত্ব এই কোরের উপর ছিল। ৪র্থ কোরের প্রাথমিক পরিকল্পনায় ঢাকা মুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল না। সে অনুসারে কোর কমান্ডার সগত সিং ৮ মাউন্টেন ডিভিশনকে শমসেরনগর বিমানঘাঁটি, মৌলভীবাজার এবং সিলেট শহর মুক্ত করার নির্দেশ দেন। করিমগঞ্জের নিকট সীমান্ত অতিক্রম করে ৮ম মাউন্টেন ডিভিশনের কলাম সিলেটের দিকে এবং অন্য একটি মৌলভীবাজারের দিকে অগ্রসর হয়। শমসেরনগর বিমানঘাঁটি মুক্ত হয় প্রথম দিনেই। পাকিস্তানীরা অবস্থা বেগতিক দেখে এই অঞ্চলের অধিকাংশ সীমান্ত ফাঁড়ি থেকে পশ্চাদপসরন করতে থাকে।

 

এই কোরের ৫৭তম ডিভিশনকে আগরতলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর আখাউড়া মুক্ত করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পথে অগ্রসর হওয়ার পথে নির্দেশ দেয়া হয়। কুমিল্লা এবং ময়নামতি মুক্ত করার কাজে নিযুক্ত ২৩ মাউন্টেন ডিভিশনকে সাহায্য করাও ৫৭ ডিভিশনের দায়িত্ব ছিল। তারপর মেঘনা নদীর তীরে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ কেন্দ্র চাঁদপুর এবং দাউদকান্দি মুক্ত করার লক্ষ্যে যুদ্ধভিযান চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশও এই ডিভিশনকে দেয়া হয়।

 

এই সেক্টরে দক্ষিণে ফেনী শহর থেকে পাকিস্তানীরা সন্তর্পণে পালিয়ে যায়। সাথে সাথে আমার বাহিনী শহরটিতে প্রবেশ করে। ফেনী আমাদের হাতে চলে আসায় চট্টগ্রাম পাকিস্তানীদের সাথে দেশের অন্যান্য স্থানের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এসময় কুমিল্লাও লাকসাম এলাকায় প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়।

 

আমার সেক্টরে  ফেনী এবং বেলুনিয়া এলাকা সম্পূর্ণ শত্রু মুক্ত হওয়ার পর পাকিস্তানীরা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে লাকসামের দিকে পশ্চাদপসরন করে। এটাই হচ্ছে একমাত্র এলাকা( অর্থাৎ চট্টগ্রাম সেক্টর) যেখানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কোন নিয়মিত পুরো বিগ্রেড নিয়োজিত হয়নি। এখানে অভিযান চলেছে আমার তিন ব্যাটালিয়ন সেক্টর ট্রপস ( যার মধ্যে থেকে ২ কোম্পানী ইতিপূর্বেই চট্টগ্রামের অভ্যন্তরে প্রেরণ করা হয়েছিলো) এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর দুটি ব্যাটালিয়নের শক্তির উপর নির্ভর করে।

 

বেলুনিয়াও ফেনীতে আমাদের হাতে চরম মার খাওয়ার পর ৫৩ বিগ্রেডসহ ১৫ বালুচ রেজিমেন্ট ৬ডিসেম্বর লাকসামের দিকে পলায়ন করেছিলো। ৬ডিসেম্বর আমরা ফেনী মুক্ত করে চট্টগ্রামের পথে অগ্রসর হই। সামনে আমাদের ৬৫ মাইল পথ। শুভপুরের কয়েক মাইল দক্ষিণে ধুমঘাট রেল সেতুটি দখল এবং রক্ষা করার জন্য আমি সাথে সাথেই দুই প্লাটুনকে পাঠিয়ে দেই ধুমঘাটের দিকে। চট্টগ্রামের পথে অগ্রসররমান আমাদের মূলবাহিনীতে ছিল আমার সেক্টরের তিনটি নিয়মিত বাহিনী এবং বাংলাদেশের একটি কামান বহর নাম ছিল মুজিব ব্যাটারী।(শেখ মুজিবর রহমানের নাম অনুসারে)।ভারতীয়  বাহিনীতে ছিল ২য় রাজপুত ব্যাটালিয়ন, বি এস এফের গোলন্দাজ রেজিমেন্ট। এই সেক্টরে বাংলাদেশ বাহিনীর কমান্ডার হিসাবে আমি এবং ভারতীয় বাহিনীর কমান্ডার বিগ্রেডিয়ার আনন্দ সরুপ ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য করে চলছিলাম। আগেই বলা হয়েছে আমাদের যৌথ বাহিনীর নাম’কিলো ফোর্স’ ।

 

ফেনী থেকে রওনা হওয়ার পথে পাকিস্তানের ৩৯ অস্থায়ী ডিভিশনের সৈন্যদের মোকাবিলা হবে বলে আমরা জানতাম। পাকিস্তানী এই ডিভিশনের সাথে কামানও সাঁজোয়া বহর ছিল। আমার কিংবা ভারতীয় বাহিনীর সাথে ট্যাংক বিধ্বংসী অস্ত্র ছিল না।এই কারণে ভারতীয় সেনাবাহিনী একটু সতর্কটার সাথে অগ্রসর হচ্ছিলো। একই সঙ্গে একটি বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নকে চট্টগ্রাম পাহাড়ের মধ্য দিয়ে পাঠানো হয় হাটহাজারী এবং চট্টগ্রাম ক্যান্টমেন্টের মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থান গ্রহণ করার জন্য। এই জায়গাটি বন্দর নগরী চট্টগ্রামের কয়েক মাইল উত্তরে। আর আমরা মূল বাহিনী মহাসড়ক পথে চট্টগ্রামের পশ্চিম দিক দিয়ে এগিয়ে চললাম।

 

চট্টগ্রাম অগ্রাভিযান আমরা ছাগলনাইয়া মুক্ত করার পর ৭ নভেম্বর ফেনী নদীর উপর স্মরণীয় শুভপুর সেতুর কাছে পৌঁছো। চট্টগ্রামের পথে আমাদের সামনে হচ্ছে এটিই হচ্ছে সর্বশেষ বাধা।অবশ্য এরপরও কয়েকটি ছোটখাটো সেতু রয়েছে। শুভপুর সেতুর কাছে গিয়ে দেখি পাকিস্তানীরা সুদীর্ঘ সেতুর দুটি স্পান সম্পূর্ণ ধ্বংস করে গেছে। আমরা আরো খবর পাই যে তারা ৮ মাইল দূরে মিরেশ্বরাই গিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যূহ গড়ে তুলেছে।

 

তৎক্ষণাৎ ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সদস্যদের ডাকা হয়। তারা যৌথবাহিনী যানবাহনও ভারী অস্ত্রশস্ত্র পার করার জন্য ফেনী নদীতে একটি প্লাটুন ব্রিজ তৈরি করার কাজে লেগে যায়। কিন্ত নতুন সেতুর জন্য আমরা অপেক্ষা না করে আমার সৈন্যদলের একটি অংশ নিয়ে আমি ৮ ডিসেম্বর বিকেলে নৌকাযোগে নদী পার হয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হই। স্বল্পতম সময়ে কবেরহাটে আমরা সেক্টর হেডকোয়াটার স্থাপন করে আমরা জোরারগঞ্জ পর্যন্ত এলাকা শত্রুমুক্ত করি। ভারতের বিগ্রেড কমান্ডারও কবেরহাট পৌঁছে যান। আমার এলাকায় যুদ্ধের জন্য রসদ সংগ্রহই ছিল বড় সমস্যা। আমাদের খাদ্যদ্রব্য এবং  অন্যান্য জিনিসপত্রের জন্য পুরোপুরি ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর উপর নির্ভর করতে হচ্ছিলো। এগুলোর জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীকে আবার তাদের পেছনের ঘাঁটির উপর নির্ভর করতে হতো।এই ঘাঁটি ছিল শুভপুর থেকে প্রায়৫০ মাইল দূরে। এই পথটুকুর অধিকাংশ ছিল আবার ভীষণ খারাপ। তাই আমাদের রসদ সরবরাহ ব্যবস্থায় মারাত্মক সংকটের সৃষ্টি হয়েছিলো। হয়ত এই কারণেই আমার সঙ্গের ভারতীয় ব্যাটালিয়নগুলো সাবধানে এগুতে চাইছিলো। ভারতীয় কমান্ডার যুদ্ধের সরঞ্জাম এবং রসদের সরবরাহ সম্পর্কে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বেশিদূর অগ্রসর হতে চাইছিলো না। এদিকে শত্রুরা শুভপুর সেতু ধ্বংস করে আমাদের আরও সংকটে ফেলে দিয়েছিলো। এই প্রতিকূলতা অবস্থা  সত্ত্বেও আমরা বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে পারছিলাম না। জাতিসংঘে আমাদের জন্য ক্ষতিকারক কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের এবং পাকিস্তানের অনুকূলে মার্কিন ৭ম নৌবহরের সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পূর্বেই যত তাড়াতাড়ি পারা যায় আমাদের চট্টগ্রাম পৌঁছতে হবে।

 

ইতিপূর্বেই আমি মিরেরশ্বরাইয়ের নিকট গেরিলা তৎপরতায় লিপ্ত আমার নিয়মিত কোম্পানী এবং মিরেশ্বরাইও সীতাকুণ্ড এলাকার সকল গেরিলা গ্রুপকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলাম যে, তারা যেন শত্রুর উপর প্রচণ্ড আক্রমণ শুরু করে। ৯ই ডিসেম্বর দিবাগত রাতে প্রতিটি গেরিলা দল মহাসড়ক অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকে। গ্রাম গ্রামান্তর থেকে তাঁরা গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে সড়কের দিকে আসছিলো এবং এতে করে  ২০ মাইল দীর্ঘ এবং১০ মাইল প্রস্থ জুড়ে  এলাকায় এমন ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো যে, মনে হচ্ছিলো মুক্তিবাহিনীর পুরো একটি কোরই বোধহয় আক্রমণ চালিয়েছে। সেই রাতেই পাকিস্তানীরা পশ্চাদপসারণের আদেশের জন্য অপেক্ষা না করেই পেছনের দিকে পালিয়ে যায়।

 

এদিকে আমরা যখন একটি জাতি হিসেবে আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য লড়াই করছিলাম আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে তখন চলছিল আরেক খেলা কিছু আমাদের সমর্থনে আবার কিছু ছিল আমাদের বিরুদ্ধে। ৫ই ডিসেম্বর নিরাপত্তা পরিষদে পাকিস্তানের পক্ষে অবিলম্বে যে যুদ্ধবিরতির জন্য যে প্রস্তাব পেশ করা হয়েছিলো, সোভিয়েত ইউনিয়ন তাতে ভেটো দেয়। পাকিস্তান যখন হেরে যাচ্ছিলো সেই মুহূর্তে যুদ্ধবিরতি মানা হলে ইসলামাবাদেরই তাতে সুবিধা হতো, আর আমরা যেটুকু অর্জন করেছিলাম তাও হারাতাম।

 

এরপরের দিন অর্থাৎ ৬ই ডিসেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস গান্ধী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের ঘোষণা করলে তা মুক্তিযোদ্ধাদের এবং বাংলাদেশের জনগণের মনোবল বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। পাকিস্তানের বন্দীশালায় আটক শেখ মুজিবর রহমানের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে সেদিন মিসেস গান্ধী বলেছিলেন, এই নবজাত রাষ্ট্রের যিনি জনক বর্তমান মুহূর্তে আমাদের সমস্ত চিন্তা তাঁকেই কেন্দ্র করে।

 

৮ই ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সৈন্য প্রত্যাহারের একটি প্রস্তাব সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পাশ হয়েছিল। প্রস্তাবটির উদ্যোক্তা ছিল মার্কিন সরকার। বৃহৎ শক্তিবর্গের  মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন পাকিস্তানকে ভরাডুবির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য যুদ্ধবিরতির পক্ষে ভোট দিয়েছিলো। প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট পড়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের। ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং অন্য ৮টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।

 

সাধারণ পরিষদে মার্কিন প্রস্তাব গ্রহণের বিষয়টি আমাদের কাছে  তেমন বিস্ময়কর কিছু ছিল না। এতে এমন কিছু ঘটেনি যা আমাদের লক্ষ্যচ্যুত করতে পারে। ভারত, পাকিস্তান কিংবা এই মহতী জাতি সংস্থার অন্যান্য সদস্য হয়ত এই প্রস্তাব মানতে বাধ্য। কিন্ত আমরা তখনও জাতিসংঘের সদস্য নই। বরং আমাদের এই লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত পবিত্র আর সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে  আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম।এমনকি এসময় যদি ৭ম নৌবহর পাকিস্তানের সহায়তার জন্য যেকোনোভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তো তবুও আমরা এই মুক্তির সংগ্রাম চালিয়ে যেতাম। ৭ম নৌবহরের যুদ্ধে যোগদানের ফলে হয়তো বাংলার আরও অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারাতো। কিন্ত মৃত্যু আর ধ্বংসযজ্ঞ এ দুটোর কোনটিই তখন এদেশের মানুষের অজানা কিছু নয়। পাকিস্তানের জন্যে এই যুদ্ধ ছিল নিছক জয় এবং পরাজয়ের। কিন্ত আমাদের জন্যে এই যুদ্ধ ছিল জাতি হিসেবে বেঁচে থাকার মরনপ্রান সংগ্রাম, অন্যথায় সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার। এযুদ্ধ আমাদের দেবে গৌরবময় জীবনের সন্ধান নতুবা মৃত্যু।

 

 

ভারতের চীফ অব আর্মি স্টাফ জেনারেল এসএইসএফ মানকেশ যুদ্ধের এক নতুন কৌশল অবলম্বন করলেন ৮ই ডিসেম্বর থেকে। যৌথবাহিনীর সাফল্যে সন্তুষ্ট হয়ে তিনি এক সময়োচিত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ( সাইকোলজিক্যাল ওয়ার) শুরু করেন। তাঁর ভাষণ পর্যায়ক্রমে বেতারে প্রচারিত হতে থাকে। অন্যদিকে এই ভাষণ প্রচারপত্রের মাধ্যমে বিমানের সহয়তায় পাকিস্তানী অবস্থানসমূহের উপর বিলি করা হয়। বাংলাদেশে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অফিসারও জওয়ানদের মানকেশ তার বার্তায় সরাসরি বলেন, অস্ত্র সংবরণ করো, নইলে মৃত্যু অবধারিত। যৌথবাহিনী তোমাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। তোমাদের বিমানবাহিনী সম্পূর্ণ ধ্বংস ও নিয়ে আর কোন  সাহায্য পাবেনা। বন্দরগুলোও এখন অবরুদ্ধ, তাই বাইরে থেকে কোন সাহায্য পাওয়ার আশা বৃথা।মুক্তিবাহিনী এবং  জনগণ প্রতিশোধ নিতে উদ্যত। তোমাদের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে গেছে।সেই সাথে তিনি তাদের এই আশ্বাসও  দেন সময় থাকতে অস্ত্র সংবরণ করলে তোমাদের সৈনিকদের যোগ্য মর্যাদা দেয়া হবে।

 

মুক্তিযোদ্ধা এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন একসাথে কাজ করে আসছিলো।১০ই ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনীর সিনিয়র কমান্ডারের অধীনে ভারত এবং বাংলাদেশ বাহিনীর যৌথ কমান্ড গড়ে তোলা হয়।

 

এই দিনই(১০ই ডিসেম্বর) ঢাকা রেডিওর ট্রান্সমিটারের উপর সরাসরি এক বিমান হামলায় বেতার প্রচার বন্ধ হয়ে যায়।ভীক্রান্তের বিমানবহর তখন চট্টগ্রাম পোর্ট বিমানবন্দরও সামরিক দিক দিয়ে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য কেন্দ্রের  উপর সমানে আক্রমণ যাচ্ছিলো।

 

মার্কিন ৭ম নৌবহরের টাস্কফোর্স ইতিমধ্যেই মালাক্কা প্রণালী অতিক্রম করে দ্রুত বঙ্গোপসাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো। মার্কিনী এই বহরে ছিল পারমাণবিক শক্তি চালিত বিশাল বিমানবাহী জাহাজ’ এন্টারপ্রইজ’ এবং আরও ৬টি যুদ্ধজাহাজ। এব্যাপারে মার্কিন সরকারের অজুহাত ছিল বাংলাদেশে মার্কিন নাগরিকদের সরিয়ে নেয়ার জন্যই ৭ম নৌবহরকে এই অঞ্চলে আনা হচ্ছে। এই যুক্তি মার্কিন জনসাধারণের কাছেও গ্রহণযোগ্য ছিল না, কারণ আমাদের যৌথ কমান্ড ১১ই ডিসেম্বর থেকে বিমান হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে ঢাকা বিমানবন্দর মেরামতের সুযোগ করে দেয়। যাতে আন্তর্জাতিক পথের বিমানগুলোতে বিদেশী নাগরিকরা ঢাকা ত্যাগ করতে পারেন। কিন্ত মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে এসময়ে ঢাকা ত্যাগের তেমন কোন লক্ষণ দেখা যায়নি।

 

ততক্ষণে যুদ্ধ সম্পর্কে সবাই স্পষ্ট ধারণা করতে পারছিলো। যৌথবাহিনীর সাফল্যের সাথে মেঘনা নদীর অপারে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের পর সামরিক বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেছিলেন সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে ঢাকার পতন ঘটবে। নিয়াজি অবশ্য তখনো  নিরাপদে ঢাকায় বসে হুংকার দিচ্ছিলেন প্রতি ইঞ্চি জায়গার জন্য একটি প্রাণ বেঁচে থাকা পর্যন্ত আমরা যুদ্ধ  চালিয়ে যাব।রাও ফরমান আলী কিন্ত ঠিকই বুঝেছিলেন খেলা শেষ। বাংলাদেশে পাকিস্তানীরা যে জঘন্য অপরাধ করেছিলো অপারেশন জেনোসাইডের অন্যতম স্থপতি ফরমান আলী সে বিষয়ে পুরো সচেতন হয়ে পড়ছিলেন। পরাজয় তখন অবশ্যম্ভাবী। মুক্তিবাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পাবার উদ্দেশ্যে ১১ই ডিসেম্বর যুদ্ধবিরতির জন্য জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এক আবেদন জানান।  ফরমান আলী এখানকার পাকিস্তানী সকল পাকিস্তানীকে অপসারণের ব্যবস্থা করারও  অনুরোধ জানান। সঙ্গে সঙ্গে ইয়াহিয়া খান জাতিসংঘকে  জানিয়ে দেন ফরমান আলীর প্রস্তাব অনুমোদিত।ইয়াহিয়ার তখনো আশা যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন তাকে উদ্ধারের জন্য এগিয়ে আসবে। নিয়াজীকে তিনি আরেকটু অপেক্ষা করার নির্দেশ দেন।

 

চীন বোধহয় একা অজুহাতের জন্যই  অপেক্ষা করছিলো। আর ৪ঠা ডিসেম্বর মার্কিন ৭ম নৌবহর বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করে।

 

চট্টগ্রাম সেক্টরে আমাদের সকল সৈন্য ৯ই ডিসেম্বর বিকালের মধ্যে শুভপুর সেতু বরাবর ফেনী নদী পার হয়ে যায়। সামনে শত্রুরা কোথায় কি অবস্থায় আছে পর্যবেক্ষণের জন্য আমরা যথারীতি টহল দল আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিলাম।পাকিস্তানীরা মিরেশ্বরাই ছেড়ে যাচ্ছে বলে একজন গেরিলা বেস কমান্ডার আমাকে খবর দেয়। মিরেরশ্বরাই থেকে১৫ মাইল দূরে গিয়ে সীতাকুণ্ডুতে তারা নাকি নতুনভাবে অবস্থান গ্রহন করে।আমি সাথে সাথে মিরেরশ্বরাই দখল করার জন্য একটি ব্যাটালিয়ন পাঠিয়ে দেই।  তখনো আমাদের কোন যানবাহন ফেনী নদী  পার হতে পারেনি।ব্যাটালিয়নের সৈন্যদের তাই পায়ে হেঁটেই অগ্রসর হতে হচ্ছিলো। ভারী অস্ত্রশস্ত্রও মালামাল নেওয়ার জন্য কয়েকটি রিকশাও গরুর গাড়ি জোগাড় করা হয়।

 

বিকালে আমি পরিষদ সদস্য মোশারফ হোসেনকে নিয়ে একখানি রিকশায় মিরেরশ্বরাইয়ের দিকে যাত্রা শুরু করি। আমাদের ব্যাটালিয়নও তখন একই দিকে মার্চ করে যাচ্ছিলো। পথে তাদের পেছনে ফেলে আমরা এগিয়ে যাই। অবশ্য এইভাবে একা সামনে এগিয়ে যাওয়া ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। পাকিস্তানীরা ঠিক কোথাও রয়েছে কিনা তখনো আমরা তা জানতাম না। তারা সকলে মিরেরশ্বরাই ত্যাগ করেছিলো কিনা তাও জানা ছিল না। তারা সকলে মিরেরশ্বরাই ত্যাগ করেছে কিনা তারও নিশ্চয়তা ছিল না। তবু আমি মিরেরশ্বরাই ঝুঁকি নিয়ে পৌঁছে দেখি একটু আগে শত্রুসেনারা সে স্থান ছেড়ে চলে গেছে। স্থানীয় কয়েকজন কর্মকর্তা মিরেরশ্বরাই হাইস্কুল ভবনে আমার সাথে একত্র হলেন। পাকিস্তানীরা আবার রাতে ফিরে আসতে পারে বলে তার আশংকা করছিলেন। আমাদের তখন অত্যন্ত দ্রুত চট্টগ্রাম দখল করা দরকার। তাই মিরেরশ্বরাইতে আমরা দ্রুত প্রতিরক্ষা অবস্থান গড়ে তুললাম। এপ্রিলও মে মাসে এই অঞ্চলেই আমরা যুদ্ধ করেছিলাম। তাই পুরো এলাকাটি আমার এবং আমার অধিকাংশ সৈন্যেও ছিল সুপরিচিত। মিরেরশ্বরাইতে আমরা বেসামরিক প্রশাসন চালু করি। কবেরহাটে অবস্থানরত ভারতীয় বিগ্রেডিয়ার আনন্দ সরুপকে আমরা নতুন অবস্থানের কথা জানিয়ে তাকে সত্বর  এখানে চলে আসার অনুরোধ জানাই।চট্টগ্রামের পথে শত্রুসেনার সঠিক অবস্থান জানার জন্য একটি টহলদার দল পাঠিয়ে দেই মিরেরশ্বরাই থেকে সীতাকুণ্ডের দিকে। ভোরেই আবার যাত্রা শুরু করতে হবে। তাই মিরেরশ্বরাই হাইস্কুলে সে রাতটা কাটালাম।

 

পরেরদিন স্বল্পদৈর্ঘ্য সংঘর্ষের পরই সীতাকুণ্ডে শত্রুদের প্রতিরোধ  ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে।সীতাকুণ্ড অতিক্রম করার পর ১৩ই ডিসেম্বর কুমিরায় পৌঁছে আমরা পাকিস্তানীদের শক্তিশালী ঘাঁটির সম্মুখীন হই। ভূমি বৈশিষ্ট্যের কারণে এই জায়গাটি শত্রুদের যথেষ্ট অনুকূলে ছিল। পশ্চিমে সাগর এবং পূর্বে উঁচু পাহাড়ের মধ্যবর্তী সরু এলাকা জুড়ে পাকিস্তানীদের সুদৃঢ় অবস্থান নিয়ে বসেছিল। সড়কের একস্থানে গভীর খালের উপর সেতুটি তারা ধ্বংস করে দিয়েছিলো। রাস্তার উপর প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী উঁচু পাহাড়ে যক্ষ্মা হাসপাতালের কাছে ছিল তাদের মূল প্রতিরক্ষাঘাঁটি। পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টা উভয়পক্ষে তুমুল সংঘর্ষ হয়। আমাদের কয়েকজন সংঘর্ষে হতাহত হলেও পরদিন সকালের মধ্যে আমরা পূর্বদিকে অগ্রসর হতে সক্ষম হই।  বেসামরিক জনগণ শত্রুসেনাদের অবস্থান সম্পর্কে আমাদের খবরাখবর দিচ্ছিলো।সংবাদ অনুযায়ী সঠিক লক্ষ্যস্থলের কামান দেগে ওদের ঘায়েল করেছিলাম। ১৪ই ডিসেম্বর ভোর রাত ৩তার মধ্যে আমরা কুমিরা পুরোপুরি শত্রুমুক্ত করে ফেলি।চট্টগ্রাম এখন মাত্র ১২ মাইল দূরে। কুমিরা মুক্ত হওয়ার মাত্র ৩ঘণ্টার মধ্যে আমাদের যানবাহন এবং কামানগুলো ভাঙ্গা সেতু এড়িয়ে খাল পার হতে শুরু করে। কয়েক হাজার নারী, পুরুষ, শিশু ভাঙ্গা সেতুর কাছে জমায়েত হয়ে আমাদের সাহায্য করছিলো। একদল খালের পাড় কেটে ডাইবারসন রোডের ব্যবস্থা করেছিলো। অন্যদল আবার গাছ, পাথর, মাটি যা পাচ্ছিলো তাই দিয়ে খাল ভরে ফেলার চেষ্টা করছিলো। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছিলাম। এই সময় এক বৃদ্ধা আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, বাবা চিন্তা করোনা। এই কাজ আমরাই পারবো। দ্যাকো তোমাদের মালপত্র আর গাড়িঘোড়া কিভাবে পার করার বন্দোবস্ত করছি। দরকার হলে আমরা সবাই খালে শুয়ে পড়বো। আর তার উপর দিয়ে তমাদের গাড়ি পার করার ব্যবস্থা করবো। দেরি করোনা বাবা। প্রত্যেক মুহূর্তে তারা আমাদের লোক মারছে। বৃদ্ধা একটু থামলেন। তার দুই চোখ পানিতে ভরে গেছে। বৃদ্ধা বললেন, তোমরা জানোনা, কিছুদিন আগে ঈদের সময় চাটগাঁয়ে একটি  লোকাল ট্রেন থামিয়ে তারা সকল বাঙ্গালী যাত্রীকে খুন করেছে।প্রায় একহাজার হবে।দা, চুরি এসব  দিয়ে মেরেছে। আমার মেয়ে আর নাতিনাতনিও ছিল। আর বলতে পারবোনা। তোমরা এগিয়ে যাও, তাড়াতাড়ি এগিয়ে যাও। তিনি আমাকে প্রায় ঠেলে দিয়ে আবার কাজে ফিরে গেলেন।আমিও পাকিস্তানীদের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কথা শুনেছিলাম। তবে, চট্টগ্রামের যে সর্বশেষ খবর আমি পেয়েছিলাম তা ছিল আরও ভয়াবহ। পাকিস্তানী সামরিক জান্তা এবং অবাঙালিরা সম্মিলিতভাবে পরিকল্পনা করছিলো চট্টগ্রাম শহরে কয়েক হাজার বাঙ্গালিকে নির্বিচারে হত্যা করতে। এটা ছিল তাদের শেষ মরণকামড়।

 

ততোক্ষণে বঙ্গোপসাগরে ৭ম নৌবহরের অনুপ্রবেশে পরিস্থিতি বেশ জটিল হয়ে উঠেছিলো। চট্টগ্রামের কোন সমুদ্র উপকূলে টাস্কফোর্সের মার্কিন বাহিনী অবতরণ করতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছিলো। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমরা চট্টগ্রাম মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেই। সেই উদ্দেশ্যে ভারতের ২৩ ডিভিশনের ৮৩ বিগ্রেড লাকসাম থেকে দ্রুত যাত্রা শুরু করে এবং কুমিরার কাছে আমাদের সাথে যোগ দেয়। অন্যদিকে ভারতের বিমানবাহিনী ও ইস্টার্ন ফ্লীট পাকিস্তানী অবস্থানগুলোর উপর অবিরত গোলাবর্ষণ করে চলছিলো। এখানকার পাকাবাহিনীকে ধ্বংস করা এবং পোর্ট অচল করে দেওয়ার জন্যই এই আক্রমণ চলছিলো। বোমার আঘাতে জ্বালানি তেলের ট্যাংকগুলো কয়েকদিন ধরে জ্বলছিল।  ক্ষতিগ্রস্ত এবং নিমজ্জিত জাহাজের সংখ্যাও ছিল প্রচুর।ডুবন্ত চ্যানেল প্রায় পুরোপুরি বন্ধ। পোর্টের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল ব্যাপক। ৫০০ এবং১০০ পাউন্ড বোমার গর্তগুলো ভরাট এবং ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতে পরে সময় লেগেছিল এক বছরেরও বেশী।

 

মুক্তিযোদ্ধারা খবর নিয়ে এলো যে, কিছু পাকিস্তানী অফিসার ও সৈন্য কক্সবাজার হয়ে পালাবার স্থলপথে পালাবার চেষ্টা করছে। কেউ কেউ আবার জাহাজে করে কেটে পড়ার চেষ্টা করছে। কয়েকটি পাকিস্তানী জাহাজকে বিদেশী জাহাজের মত রং লাগিয়ে এবং বিদেশী পতাকা উড়িয়ে ছদ্মবেশে পালানোর জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এই খবর ভারতের ইস্টার্ন ফ্লীটকে পাঠালে ইস্টার্ন ফ্লীট সতর্ক হয়ে যায়। ছদ্মবেশে পালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে বেশ কয়েকটি পাকিস্তানী জাহাজ ভীক্রান্ত এর গোলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

 

বার্মা দিয়ে পাকিস্তানীদের পালাবার চেষ্টা বন্ধ করার জন্য এসময়ে কক্সবাজারে একটি অভিযানের পরিকল্পনা নেয়া হয়। এই উদ্দেশ্যে রোম ফোর্স নামে এক নতুন বাহিনীর সৃষ্টি হয়। এই বাহিনীতে ছিল ভারতের১/২ গুর্খা রাইফেলস এবং ১১বিহার রেজিমেন্টের দুটি কোম্পানী। মর্টার সজ্জিত এই বাহিনী ভারতের একখানি সওদাগরী জাহাজে ১৪ই ডিসেম্বর কক্সবাজার উপকূলে গিয়ে পৌঁছে। সেখানে মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের সহায়তায় রোম ফোর্স তীরে অবতরণ করে। কিন্ত ঐ এলাকায় কোন পাকিস্তানীকে অবশ্য  তারা পায়নি।

 

১৫ই ডিসেম্বর গভীর রাতে পাকিস্তান চীফ অফ আর্মি স্টাফ থেকে নিয়াজী শেষ নির্দেশ লাভ করেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর চীফ অব স্টাফ আত্মসমর্পণের যে শর্ত দিয়েছেন তা যুদ্ধবিরতির জন্য গ্রহণ করা যেতে পারে বলে এতে নিয়াজীকে পরামর্শ দেয়া হয়। এই রাতেই দুটার মধ্যে বাংলাদেশের যেসব স্থানে পাকিস্তানী সেনাদল অবস্থান করছিলো নিয়াজী তাদেকে ওয়্যারলেস  যুদ্ধবিরতি পালন এবং যৌথবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ জারি করেন।

 

রাত শেষ হয়ে আসে। ১৬ই ডিসেম্বর শেষরাতের দিকে ভারতীয় ৯৫ মাউন্টেন বিগ্রেডে নিয়োজিত বিগ্রেডিয়ার ক্রেয়ার নিয়াজীর হেডকোয়াটারের একটি ম্যাসেজ ইন্টারসেপট করেন। এই বার্তায় ভোর ৫টা থেকে নিয়াজী তার সকল সেনাদলকে যুদ্ধবিরতি পালন করতে বলেছিলেন। ক্লেয়ার সাথে সাথে এই অয়ারলেস বার্তার কথা জেনারেল নাগরাকে জানিয়ে দেন পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর বিগ্রেড কমান্ডার এবং ডিভিশনাল কমান্ডার মিরপুর ব্রিজের কাছে দ্বিতীয় ছত্রী ব্যাটালিয়ন যেখানে অবস্থান করছিলো সেখানে পৌঁছান। সেখানে অবস্থানরত মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় প্যারা ব্যাটালিয়ন বাহিনীর থেকে তারা জানতে পারলেন যে, ভোর ৫টার পর ব্রিজের কাছে আর গোলাগুলি হয়নি। এরপর জেনারেল নাগরা তাঁর একজন এডিসি এবং ভারতীয় ছত্রী ব্যাটালিয়নএরন একজন অফিসারকে শ্বেত পতাকাবাহী জিপে করে ব্রিজের অপর পাড়ে পাঠিয়ে দেন। তখন বেলা ৯টা। জীপের আরোহীরা জেনারেল নিয়াজীর উদ্দেশ্যে লেখা জেনারেল নাগরার একটি বার্তা বহন করছিলেন। রণক্ষেত্রের করোতার পরিবর্তে বার্তাটিতে নাটকীয়তাই ছিল একটু বেশি। জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী এবং জেনারেল নাগরা দুজন ছিলে ব্যক্তিগত জীবনে পরিচিত সম্ভবত তাই বার্তাটিতে ছিল নরমের সুর। প্রিয় আবদুল্লাহ আমি এসে পড়েছি। তোমার সব বাহাদুরি আর খেলা শেষ। আমার কাছে এখন আত্মসমর্পণ করবে, এই আমার উপদেশ। পাকিস্তানের জন্য সত্যই তখন সকল খেলা শেষ।নিজ বাহিনীর প্রতি যুদ্ধবিরতি এবং আত্মসমর্পণ করার যে নির্দেশ নিয়াজী জারি করেছিলেন, ১৬ই ডিসেম্বর সকালেই তা ভারত সরকারকে জানিয়ে দেয়ার জন্য ঢাকাস্থ মার্কিন সামরিক এটচিকে অনুরোধ করেন। তার অনুরোধ যথারীতি ভারতে মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে ভারত সরকারকে জানানো হয়।

 

চট্টগ্রাম এলাকায় আমরা তখন কুমিরার দক্ষিণে আরও কয়েকস্থানে শত্রুমুক্ত করে ফেলেছি। আমাদের যাত্রা বিলম্বিত করার উদ্দেশ্যে এসব জায়গায় কিছু কিছু পাকিস্তানী সৈন্য অবস্থান করছিলো। পথের সকল বাধা পরাভূত করে ১৬ই ডিসেম্বরের মধ্যে আমরা ভাটিয়ারীর শক্তিশালী ঘাঁটির সম্মুখীন হই। এখান থেকে ফৌজদারহাট এলাকা পর্যন্ত পাকিস্তানীরা দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষামূলক ঘাঁটি গড়ে তুলেছিল। এখানে তাদের অধিকাংশ সৈন্য এবং সমরাস্ত্র এনে মোতায়েন করছিলো।আমাদের লক্ষ্য ছিল কিভাবে এই কমপ্লেক্স আমরা ধ্বংস করতে পারি। যুদ্ধ করতে করতে ওরা যদি চট্টগ্রাম শহরে মধ্য দিয়ে গিয়ে অবস্থান করতে পারে তাহলে আমরা পড়বো বিপদে। বাড়িঘর অধ্যুষিত এলাকায় যুদ্ধ গেলে প্রতিটি বাড়িই আত্মরক্ষাকারীর আড়াল হিসেবে কাজে লাগাতে পারবে। সেই পরিস্থিতিতে শহরের মধ্যে পা বাড়ানো আমাদের জন্য দুরুহ হয়ে পড়বে।

 

তাই ফৌজদারহাট এবং চট্টগ্রামের মাঝখানে শত্রুদের অবরোধ করার সিদ্ধান্ত নেই।উদ্দেশ্য ছিল ভাটিয়ারী এবং ফৌজদারহাটে অবস্থান গ্রহণকারী সৈন্যরা যেন পেছনে গিয়ে শহরে প্রবেশ করতে না পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী শত্রু বাহিনীর পেছনে আমাদের সৈন্যরা তাদের পশ্চাদপসরনের পথ রুদ্ধ করে রাখবে এবং সামনে থেকে আমাদের অবশিষ্ট অংশ আক্রমণ চালাবে। অভিযানের এই পদ্ধতি কতটা ‘’ঘাড়ে ধরে মুখে আঘাত করার মত’’ বলা যেতে পারে। সেই অনুসারে ভারতের ৮৩ বিগ্রেডের দুটি ব্যাটালিয়ন ২রাজপুত এবং ৩ ডোগরাকে পেছনের পথ বন্ধ করে দেয়ার জন্য পাঠানো হয়। ভারতের তৃতীয় আরেকটি  ব্যাটালিয়ন সম্মুখ সমরে আমাদের মুক্তিযোদ্ধা ব্যাটালিয়নের  সাথে যোগ দেয়।পূর্বোক্ত ব্যাটালিয়ন দুটি রাতের আঁধারে সড়ক থেকে প্রায় ১৫ মাইল পূর্ব দিক দিয়ে পাহাড়ী রাস্তা ধরে ফৌজদারহাটের কিছুটা দক্ষিণে গিয়ে আবার সড়কে উঠবে এবং সেখানে রাস্তা বন্ধ করে অবস্থান গ্রহণ করবে এই ছিল তাদের প্রতি নির্দেশ।পাহাড়ের মধ্য দিয়ে অগ্রসরমান এই দলের মালামাল বহনের জন্য প্রায় ১২০০ বেসামরিক লোক জোগাড় করা হয়। প্রয়োজনীয় সব জিনিসই এই বাহিনীর সাথে থাকবে যাতে তারা অন্তত ৪দিন চলতে পারে। খাদ্যদ্রব্য, গোলাবারুদ, ট্যাংক বিধ্বংসী কামান, মর্টার, মাটি খননের সরঞ্জাম, রান্নার উনুন এবং অন্যান্য তৈজসপত্র এ দুটি ব্যাটালিয়নের জন্য যাকিছু প্রয়োজন সবই বহন করতে হবে। এছাড়া বেসামরিক লোক যারা যাবে তাদের খাদ্য এবং কিছু জ্বালানি কাঠও সঙ্গে থাকবে।

 

১৫ই ডিসেম্বর সন্ধ্যার কিছু আগেই ব্যাটালিয়ন দুটি পাহাড়ের ভেতর দিয়ে যাত্রা শুরু করে। স্থানীয় কিছু কিছু লোক আগে চলে যেতে থাকে গাইড হিসেবে। এই অভিযানের সাফল্যের উপরই চট্টগ্রামে আমাদের চূড়ান্ত লড়াইয়ের ফলাফল নির্ভর করছে।

 

ইতিমধ্যে আমার নির্দেশে মিরেরশ্বরাই এবংসীতাকুণ্ড এলাকায় প্রায় ২০০০ সৈন্য একত্র হয়ে কয়েকটি নির্ধারিত স্থানে অবস্থান গ্রহণ করে।যথাসময়ে তারাও লড়াইয়ে যোগ দেবে। শহর এলাকা সম্পর্কে ভালোভাবে জানে বলে রাস্তায় যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে তারা খুব কাজে লাগবে।তাদেরকে একত্রিত করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রাখলাম।

 

ভাটিয়ারীতে ১৫ই ডিসেম্বর সন্ধ্যায় আমরা পাকিস্তানীদের প্রথম রক্ষাব্যূহের উপর আক্রমণ চালাই। দুটি কোম্পানীর এই আক্রমণ  ওরা প্রতিহত করে দেয়, আমাদের পক্ষে হতাহত হয় ২ জন। ১৬ই ডিসেম্বর অগ্রবর্তী দলটি শত্রুর পেছনে ব্যারিকেড সৃষ্টি করার পরই আমাদের আসল আক্রমণ শুরু হবে। তাই আমরা পরেরদিন হামলা চালাবার  জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু করি।  

ঢাকার অদূরে ভারতীয় জেঃ নাগরা যে দুজন অফিসার জেঃ নিয়াজীর কাছে পাঠিয়েছিলেন তার ২ ঘণ্টার পর ১১টার দিকে ফিরে আসে। তাদের জীপের পেছনে একখানি গাড়িতে করে আসেন পাকিস্তানের ৩৬ ডিভিশনের জেনারেল মোহাম্মদ জামসেদ। জেনারেল নিয়াজীর সরকারী প্রতিনিধি হিসেবে তিনি যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসিয়মর্পণের প্রস্তাব নিয়ে আসেন।এরপর নাগরা এবং আরও কয়েকজন অফিসারকে জামসেদের হেডকোয়াটারে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখান থেকেতারা নিয়াজীর অফিসে যাওয়ার প্রাক্কালে কলকাতাস্থ ইস্টার্ন কমান্ডের হেডকোয়াটার এবং ৪র্থ কোরের হেডকোয়াটারের সর্বশেষ  পরিস্থিতি সম্পর্কে যথারীতি খবর পাঠিয়ে দেন।এর আগে সকাল সাড়ে সাতটার দিকে নিয়াজী অয়ারলেসযোগে মানেকেশকে আত্মসমর্পণের মেয়াদ আরও ৬ঘণ্টা বাড়িয়ে দেয়ার অনুরোধ করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি আরো অনুরোধ করেন যে, আত্মসমর্পণের শর্তাবলী নির্ধারণ করার জন্য তিনি যেন একজন ভারতীয় সিনিয়র সামরিক অফিসারকে ঢাকা পাঠিয়ে দেন।

 

এতসব ঘটনা সম্পর্কে আমরা কিছুই জানতাম না। আমরা ভাটিয়ারীতে তখন যুদ্ধে লিপ্ত। আমদের অগ্রবর্তী দল সাফল্যের সঙ্গে পাহাড়ী পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলো। কথা ছিল ১৬ই ডিসেম্বর কোন একসময়ে তারা শত্রুর পেছনের দিকে রাস্তা বন্ধ করে অয়ারলেসযোগে সে খবর আমাদেরকে জানিয়ে দেবে। আমরা সবাই তাদের খবর শোনার জন্য রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিলাম।

 

নাগরার কাছ থেকে নিয়াজীর আত্মসমর্পণের কথা জানতে পেরে জেনারেল অরোরা তার চীফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জ্যাকবলকে বিমানযোগে ঢাকা পাঠিয়ে দেন। ততক্ষণ মিরপুর যৌথবাহিনী ব্রিজ পার হয়ে ঢাকায় প্রবেশ করতে শুরু করে। এসময়ে নগরীর রাস্তাঘাট ছিল জনমানবশূন্য।

 

মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় সৈন্যদের রাজধানীতে প্রবেশের খবর দাবানলের মতো চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। উল্লাসের জোয়ারে ঢাকার লক্ষ লক্ষ লোক নেমে আসে রাস্তায়। জনমানবহীন নিঃশব্দ নগরী মুহূর্তে ভরে উঠে মানুষের বিজয় উল্লাসে। ওরা এসেছে এই বাণী উচ্চারিত হতে থাকে মানুষের মুখে মুখে। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে ধ্বনি উঠে জয় বাংলা। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। যৌথবাহিনীর জন্য মানুষ এগিয়ে আসে ফুলের ডালি হৃদয়ের গভীর আর ভালবাসা নিয়ে।

 

ঢাকায় সেদিন একদিকে চলছিল মানুষের বিজয় মিছিল। তারই পাশাপাশি ছিল পরাজিত  পাকিস্তানীদের পলায়নের হাস্যকর দৃশ্য।কিন্ত মানুষ যে কত জিঘাংসা পরায়ণ হতে পারে পাকিস্তানীরা তার এক নতুন নজীর সৃষ্টি করেছিলো। পালিয়ে জাবার সেই মুহূর্তেও পাকিস্তানীরা বিভিন্ন নিরীহ মানুষের উপর এলোপাতাডি গুলি চালায়। ফলে বহু নিরীহ বাঙ্গালী হতাহত হন।

 

আত্মসমর্পণের একটা খসড়া দলিলসহ জেনারেল জ্যাকব বেলা ১টায় জেনারেল অরোরার হেডকোয়াটার থেকে ঢাকা এসে অবতরণ করলেন। বেলা ২টা ৫০ মিনিটে জেনারেল অরোরা তার সৈনিক জীবনের সবচাইতে  আকাঙ্ক্ষিত বার্তা পেয়ে গেলেন। জীবনের খুব কম সংখ্যক সেনানায়কই এমন বার্তা পেয়েছেন। বার্তাটি ছিল, নিয়াজীতার সেনাবাহিনীর সকলকে নিয়ে আত্মসমর্পণে রাজী হয়েছেন এবং আত্মসমর্পণ দলিলেও স্বাক্ষর করেছেন।পশ্চিম সেক্টরে পাকিস্তানী ৯ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আনসারীর আত্মসমর্পণ পর্ব ততক্ষণে সাঙ্গ হয়েছে। বিকাল ৩টার মধ্যে মুক্তিবাহিনীর শত শত তরুণ এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি বিগ্রেড বিজয়ীর বেশে রাজধানী ঢাকায় প্রবেশ করে। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের জন্য জেনারেল অরোরা তার বিমানও নৌবাহিনীর চীফ অব স্টাফকে নিয়ে একটু পরেই  ঢাকায় অবতরণ করলেন।

 

আমার বিশ্বস্ত জেসিও সুবেদার আজিজ এবং ১৫ বছরের এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধা এতসব ঘটনার কিছুই অবহিত ছিল না।পাকিস্তানীদের একটি খালের অপর পাড়ে হঠিয়ে পুনরায় আক্রমণ পরিচালনার জন্য অবস্থান গ্রহণ করছিলো। অল্প বয়স্ক ছেলেটি কাছেরই এক গ্রামের। তাঁর গ্রাম আগেই শত্রুমুক্ত হয়েছে। মা-বাবার সাথে দেখা করার জন্য ১৫ই ডিসেম্বর তাকে ১২ ঘণ্টার জন্য ছুটি দিয়েছিলাম। কিন্ত সে প্রত্যয়দৃপ্ত কণ্ঠে জবাব দিয়েছিলো, না স্যার। চট্টগ্রাম মুক্ত করার পরই আমি বাড়ি ফিরবো। কয়েকদিন বা আর লাগবে। আত্মসমর্পণের জন্য জেনারেল নিয়াজীর নির্দেশ তখনো তার সকল সেনাদলের কাছে পৌঁছেনি। আমরা জানতাম না যে, বেলা ৪টা৩১মিনিটে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান  সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান সমাপ্ত হচ্ছে।

 

চট্টগ্রাম শহর থেকে মাত্র ৬মাইল দূরে মহাসড়কের উপর  ভাটিয়ারী দখলের জন্য আমরা তখন লড়াই করছি। আক্রমণ চালাচ্ছে মুক্তিবাহিনীর একটি কোম্পানী। ঘড়িতে তখন বেলা ৪টা ৩০মিনিট। ঢাকা এবং অন্যান্য জায়গায় অস্ত্রের গর্জন থেমে গেছে। নিয়াজী এবং অরোরা হয়তো কলম হাতে নিয়ে আত্মসমর্পণের চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করছেন। নিয়তির নির্মম পরিহাস। ঠিক সেই মুহূর্তে ঢাকা থেকে ১৬০ মাইল দূরে পাকিস্তানীদের একটি কামানের  গোলা আমার অধীনস্থ মুক্তিযোদ্ধা এই কোম্পানীর মাঝখানে এসে পড়লো। সুবেদার আজিজ এবং ১৫ বছরের সেই ছেলেটি দুজনে গোলার আঘাতে আহত হলো। আস্তে আস্তে পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবে গেলো, সেই সাথে বাতাসে মিলিয়ে গেলো তাদের শেষ নিঃশ্বাস। তখন সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে ধীরে, ধীরে। একজন পাকিস্তানী মেজর ভাটিয়ারীর ভাঙ্গা ব্রিজের মুখে এসে দাঁড়ালো। হাতে তার সাদা পতাকা। তারা নিয়াজীর নির্দেশ পেয়ে গেছে, এখন আত্মসমর্পণ করতে চায়।