স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার আহবান

Posted on Posted in 4

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহঙ্কারী বিভিন্ন সংগঠনের তৎপরতা

<৪,২০০,৪১৯-৪২১>

অনুবাদকঃ জেসিকা গুলশান তোড়া

       শিরোনাম  

 

         সূত্র

 

        তারিখ

 

২০০। স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার আহবান

 

পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি

 

     ২৯ মার্চ, ১৯৭১

 

 

                       শত্রুবাহিনীকে মোকাবেলায় প্রস্তুত হউন

                         গণস্বার্থে স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার

                            সংগ্রাম অব্যাহত রাখুন

 

ভাইসব,

 

বাংলাদেশের জনগণ আজ গণতন্ত্র ও নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এখানে একটা পৃথক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র কায়েম করিতে বদ্ধপরিকর হইয়াছেন এবং এই জন্য এক গৌরবময় সংগ্রাম চালাইতেছেন। এই সংগ্রামে জনগণ সশস্ত্র সেনাবাহিনীকে অসমসাহসিকতার সহিত মোকাবেলা করিতেছেন এবং নিজেদের আশা-আখাংখা পূরণের জন্য বুকের রক্ত ঢালিতেও দ্বিধা করিতেছেন না। কমিউনিস্ট পার্টি পূর্ব বাংলার সংগ্রামী বীর জনগণকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাইতেছে। পূর্ব বাংলার কমিউনিস্টরা দীর্ঘকাল হইতেই বাঙ্গালীসহ পাকিস্তানের সকল ভাষাভাষী জাতির বিচ্ছিন্ন হইয়া পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের অধিকার তথা আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার দাবী করিয়া আসিতেছে। পূর্ব বাংলার জনগণ আজ অনেক ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতের ভিতর দিয়া পূর বাংলায় একটি পৃথক ও স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের দাবী উত্থাপন করিয়াছেন, আমরা উহাকে ন্যায্য মনে করি, তাই পূর্ব বাংলার জনগণের বর্তমান সংগ্রামে আমরাও সর্বশক্তি লইয়া শরিক হইয়াছি।

 

জনগণের দুশমন কাহারা?

 

বাংলাদেশে পৃথক ও স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের এই সংগ্রামে জনগণের দুশমন হইলো পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠী ও বর্তমান সামরিক সরকার। পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠী বিদেশী সাম্রাজ্যবাদ বিশেষতঃ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, বড় বড় জোতদার-জায়গীরদার-মহাজন ও একচেটিয়া পূঁজির মালিক ২২টি পরিবারের কায়েমী স্বার্থ রক্ষার জন্য গত ২৩ বৎসর যাবৎ বাংলাদেশের শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত-ছাত্র প্রভৃতি জনগণকে শোষণ এবং নিপীড়ন করিয়াছে। সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থে শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার সমগ্র জনগণকে জাতীয় অধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার হইতে আগাগোড়া বঞ্চিত করিয়াছে। আজও উহাদের স্বার্থেই ইয়াহিয়া সরকার প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীসমূহের নব্য নেতা ভুট্টোর সহিত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইয়া জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে নস্যাৎ করে ও গণতন্ত্র, জাতীয় অধিকার এবং শাসন ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে। এই প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার জনগণের বর্তমান সংগ্রামকে দমনের জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রহিয়াছে এবং সেনাবাহিনীকে জনগণের বিরুদ্ধে নিয়োগ করিয়াছে। সেনাবাহিনী পূর্ব বাংলায় ইতিমধ্যেই গণহত্যা ঘটাইয়াছে এবং রক্তের বন্যায় পূর্ব বাংলার জনতার সংগ্রামকে স্তব্ধ করিবার জন্য সেনাবাহিনী প্রস্তুত হইয়া রহিয়াছে।

 

তাই বাংলাদেশের জনগণের দুশমন হইল সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদ ও একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থকামী সরকার ও উহাদের সেনাবাহিনী। পশ্চিম পাকিস্তানের বেলুচ, সিন্ধি, পাঠান, পাঞ্জাবী জাতিসমূহের মেহনতী জনতা পূর্ব বাংলার জনগণের শত্রু নয়। বরং পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের গণতন্ত্র ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর জাতীয় অধিকারকেও পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠী নস্যাৎ করিয়া রাখিয়াছে। পূর্ব বাংলার অবাঙ্গালী উর্দু ভাষাভাষি মেহনতী জনগণকেও ঐ শাসকগোষ্ঠী শোষণ ও নিপীড়ন করিতেছে। তাই ঐ দুশমনের পরাজিত করিয়া বাংলাদেশের জনগণের দাবী কায়েম করার জন্য আজ এখানে গড়িয়া তুলিতে হইবে বাঙ্গালী-অবাঙ্গালী, হিন্দু-মুসলমান জনগণের দুর্ভেদ্য একতা। ঐ দুশমনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে বাংলাদেশের জনগণকে বেলুচ-পাঠান-সিন্ধি-পাঞ্জাবী মেহনতী জনগণকে মিত্র বলিয়া মনে করিতে হইবে এবং পূর্ব বাংলার সংগ্রামে তাহাদের সাহায্য পাইতে সর্বদাই সচেষ্ট থাকিতে হইবে। এই সংগ্রামে এখানকার জনগণের সুদৃঢ় ঐক্য ও বেলুচ-পাঠান প্রভৃতির সমর্থন যত বেশী গড়িয়া উঠিবে গণ-দুশমনের পরাজয়ও ততই নিশ্চিত হইবে।

প্রকৃত মুক্তির লক্ষে অবিচল থাকুন

ঐক্যবদ্ধ গণশক্তি ও জনতার সংগ্রামের জোরে গণ দুশমনদের ও উহাদের সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করিয়া এখানে জনগণের দাবী মতে ‘স্বাধীন গণতান্ত্রিক বাংলা’ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অগ্রসর করিয়া লইতে হইবে। কিন্তু স্বাধীন বাংলা করতে সাম্রাজ্যবাদীদের জুলুমের শৃংখলে বাঁধা না পড়ে, স্বাধীন বাংলার কৃষক সমাজের উপর  যেন জোতদার-মহাজনদের শোষণ ও নিপীড়নে ধুঁকিয়া ধুঁকিয়া মরিতে না হয়, সেজন্য ও সংগ্রামকে দৃঢ়ভাবে আগাইয়া লওয়ার জন্য কমিউনিস্ট পার্টি শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র-মধ্যবিত্ত জনতাকে তাহাদের সংগ্রাম আগাইয়া লওয়ার আহবান জানাইতেছে।

কমিউনিস্ট পার্টি বাংলাদেশে এমন একটি স্বাধীন গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামের আহবান জানাইতেছে যেখানে সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদ উৎখাত করিয়া ও পুঁজিবাদী বিকাশের পথ পরিসর করিয়া জনগণের স্বার্থে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সমাধান করা ও সমাজতন্ত্রের পথে অগ্রসর হইবার বিপ্লবী পথ উন্মুক্ত হইতে পারে।

বিভ্রান্ত হইবেন না

কতকগুলি তথাকথিত ‘কমিউনিস্ট পার্টি’ জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্যা “ধর্মঘট অসহযোগ আন্দোলন প্রভৃতি প্রয়োজন নাই”, “গ্রামে গ্রামে কৃষি বিপ্লন শুরু কর”, “জোতদারদের গলা কাট” প্রভৃতি আওয়াজ তুলিতেছে। কোন কোন নেতা ‘স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠা হইয়া গিয়াছে’ বলিয়া ধ্বনি তুলিয়া স্বধিকার গণসংগ্রামের উদ্দীপনা, সংকল্প ও প্রস্তুতিতে ভাটা আনিয়া দিতে চাহিতেছেন। মার্কিনী এরেস্টন এই সংগ্রামে অনুপ্রবেশ করিয়া সংগ্রামকে বিপথগামী করার প্রচেষ্টা করিতে পারে। শাসকগোষ্ঠী ও প্রতিক্রিয়াশীলদের  উস্কানিতে সমাজবিরোধী দুষ্কৃতকারীরা দাঙ্গা-হাঙ্গামা, লুটতরাজ প্রভৃতি বাধাইয়া সংগ্রামকে বিনষ্ট করিতে তৎপর হইতে পারে। এই সকল বিষয়ে হুশিয়ার ও সজাগ থাকার জন্য আমরা জনগণের প্রতি আহবান জানাইতেছি।

দৃঢ় সংকল্প বজায় রাখুন

বাংলাদেশের জনগণ আজ অভুতপূর্ব দৃঢ়তা ও একতার সাথে অফিস-আদালতে হরতাল, বাজনা-ট্যাক্স বন্ধ প্রভৃতির যে সংগ্রাম চালাইতেছেন, সে সংগ্রাম ইতিমধ্যেই ইতিহাসে এক নতুন নজীর স্থাপন করিয়াছে। সামরিক সরকারের হুমকি, দমন-নীতি, অভাব-অনটন প্রভৃতির মধ্যেও সে সংগ্রাম শিথিল বা দমিত হইবে না এবং শত্রুর নিকট আমরা কখন ও নতি স্বীকার করিব না- এই দৃঢ় সংকল্প আজ বাংলার ঘরে ঘরে জাগিয়া উঠুক।

ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য করুন

নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর, সামরিক শাসন প্রত্যাহার প্রভৃতি যে দাবীগুলি আওয়ামী লীগ প্রধান উত্থাপন করিয়াছেন, সেগুলি আদায় করিতে পারিলে ‘স্বাধীন বাংলা’ কায়েমের সংগ্রামে অগ্রগতির সুবিধা হইবে-ইহা উপলব্ধি করিয়া এ দাবীগুলির পিছনে কোটি কোটি জনগণকে সমবেত করা এবং ঐ দাবীগুলি পূরণে ইয়াহিয়া সরকারকে বাধ্য করা, ইহা হইলো এই মুহুর্তে জরুরী কর্তব্য।

সেনাবাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করুন

বস্তুতঃ হরতাল, লক্ষ লক্ষ জনতার সমাবেশ, মিছিল, সরকারী অফিস-আদালত ও সামরিক বাহিনীর সহিত অসহযোগ প্রভৃতি শান্তিপূর্ণ পন্থায় বর্তমান পর্যায়ে জনগণের আকাংখিত স্বতন্ত্র স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালাইতে হইবে।

কিন্তু জনগণকে আজ সংগ্রাম করিতে হইতেছে প্রত্যক্ষভাবে সশস্ত্র সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। তাই শান্তিপূর্ণ পন্থায় শেষ পর্যন্ত জনগণের সংগ্রাম বিজয়ী হইবে এইরুপ মনে করিবার কারণ নাই। প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠীর আজ্ঞাবাহী সেনাবাহিনী জনগণের উপর সশস্ত্র হামলা শুরু করিতে পারে। তাই আত্মসন্তুষ্টির কোন কারণ নাই। সংগ্রাম যে কোন সময়ে সুতীব্র রুপ ধারণ করিতে পারে। এই অবস্থায় স্বতঃস্ফুর্ততার উপর নির্ভর না করিয়া সুশৃংখলভাবে সংগ্রামের সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করা দরকার। সেনাবাহিনীর আক্রমণ মোকাবেলা ও উহা প্রতিরোধ করার জন্য শহর-গ্রাম সর্বত্র জনগণকে সংগঠিতভাবে প্রস্তুত হইবার জন্য আমরা জনগণের প্রতি আহবান জানাইতেছি।

 

এই জন্য পাড়ায়, মহল্লায়, গ্রামে, কল-কারখানায় সর্বত্র দলমত নির্বিশেষে সমস্ত শক্তি নিয়া গড়িয়া তুলুন স্থানীয় সংগ্রাম কমিটি ও গণবাহিনী। সেনাবাহিনী আক্রমণ করিলে উহা প্রতিরোধের জন্য ব্যারিকেড গঠন করুন, যাহার যাহা আছে উহা দিয়াই শত্রুকে প্রতিহত করুন।

 

শ্রমিক-কৃষক ভাইয়েরা এগিয়ে আসুন

 

অধিকার সংগ্রাম জনগণের ন্যায্য সংগ্রাম। পশু শক্তির বিরুদ্ধে এই সংগ্রামে বিজয়ের বহু কঠিন শপথ ও সংকল্প নিয়া আগুয়ান হওয়ার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি আজ নারী-পুরুষ, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বাংলাদেশের সমস্ত জনগণকে বিশেষতঃ শ্রমিক, শহরের গরীব বস্তিবাসী, কৃষক ও ছাত্র সমাজের প্রতি আহবান জানাইতেছে। সাহসের সহিত শত্রুর বিরুদ্ধে সঠিকভাবে সংগ্রাম চালাইতে পারিলে আমাদের জনগণের বিজয় সুনিশ্চিত।

 

                                                       কেন্দ্রীয় কমিটি

পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি

 

ঢাকা

২৯-৩-৭১