স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রচারিত ইংরেজী অনুষ্ঠান

Posted on Posted in 5
শিরোনামসূত্রতারিখ
২০। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত

ইংরেজী অনুষ্ঠানঃ নিউজ কমেন্টারি

স্বাধীন বাংলা বেতার

কেন্দ্রের দলিল পত্র

জুন-সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

সংবাদ ভাষ্য

বিশ্বব্যাংকের পাকিস্থানের সাহায্যার্থে আসন্ন বৈঠক স্থগিত করার মধ্য দিয়ে তৎকালীন সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তানের প্রদেশ তথা বাংলাদেশে সংগঠিত গণহত্যার প্রতি আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ায় নতুন রূপে শুরু হয়েছে। এই স্থগিতকরণ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কারণ প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের জনতার সাথে পাকিস্থানের সামরিক জান্তার মধ্যকার ৮৬ দিনের পুরনো যুদ্ধ নিয়ে সর্ববৃহত সহায়ক রাষ্ট্রগুলো যেমন ইউএসএ এবং বৃটেন পূর্বাঞ্চলে যা চলছে তা নিয়ে তারা তাঁদের নীরব কিন্তু পরিষ্কারভাবে তাদের অপছন্দ প্রকাশ করেছে। সর্বোপরি, এই সমিতি কোন দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়। এটা শুধুমাত্র তখনই ঋণ মঞ্জুরে আগ্রহ প্রকাশ করে যখন তারা বুঝতে পারে যে ঋণ গ্রহীতা আসল এবং মুনাফার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে। গণহত্যার জন্য পাকিস্থান যে পুরো দেউলিয়া হয়ে পড়েছে তা বুঝতে কোন বিশেষজ্ঞের দরকার পড়ে না। যদিও নিউজউইক আন্তর্জাতিক মুদ্রা বাজারে পাকিস্তানি রুপির অত্যন্ত কম দাম উদ্ধৃত করেছে, বাস্তবতা হচ্ছে পাকিস্তানি রুপি কিছুতেই বিক্রয়যোগ্য নয়। বৈরুত, হংকং এবং ব্যাংককের মতো খোলা অর্থবাজার হতে প্রত্যক্ষদর্শীর প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে ক্রেতারা পাকিস্তানি রুপি স্পর্শ করছেই না, দর করা তো দূরের কথা। পাকিস্তান এই অবস্থার অস্থায়ী পরিত্রাণ হিসেবে সমৃদ্ধ শেখরাজত্ব হতে ধার করার চেষ্টা করছে। কিন্তু তারাও ব্যবসায়ী এবং তারা এটা প্রমাণ করতে চায় না যে পাকিস্থানের একমুখী ক্ষয়িষ্ণু দোদুল্যমান অর্থনীতিতে বিশাল রকমের সোনা ছুঁড়ে দেওয়ার জন্য তারা উৎসুক হয়ে আছে।

গত সপ্তাহে বিশ্বব্যাংকের যে দলটি বাংলাদেশ সফর করেছেন তাঁরা তাঁদের জন্য তৈরী করা ইয়াহিয়ার পোষা গুন্ডাদের দ্বারা সাবধানতার সাথে আরোপিত অবগুন্ঠনের আড়ালের ছলচাতুরি দ্রুততার সাথেই দেখে এসেছেন। তাঁদের প্রতিবেদনানুযায়ী, বাংলাদেশের কোণায় কোণায় দুর্ভিক্ষের ব্যাপকহারে মাত্রই ছড়িয়ে পড়া শুরু হয়েছে। করাচি ত্যাগের পূর্বে বিশ্বব্যাংকের পাকিস্তান-সহায়তা তহবিলের চেয়ারম্যান পিটার কার্গিল শুধুমাত্র সম্ভাব্য বর্ধিত খাদ্য সহায়তা সম্পর্কে বলেছেন। তাঁর এই মন্তব্যের কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মাধ্যমে এটাই পরিষ্কার যে বিশ্বব্যাংক চাইছে পাকিস্থান পূর্বাঞ্চলের সমস্যার জন্য রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজে নিলে অধিকতর অর্থনৈতিক সহায়তাকে আরো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা যেতে পারে। মার্কিং পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম রজার এর কাছ থেকেও প্রায় একই রকমের বিবৃতি এসেছে। তিনিও বাংলাদেশে যুদ্ধের একটি রাজনৈতিক নিষ্পত্তির উপর জোর দিয়ে আসছেন যা উপমহাদেশের জন্য দীর্ঘস্থায়ী শান্তি হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। পাকিস্থান সহায়তা সমিতির অন্যান্য তিন সদস্য- ফ্রান্স, কানাডা ও জাপানও সম্ভবত একই রকম চিন্তা করছে।


ইংরেজী সংবাদ ভাষ্যগুলি আহমেদ চৌধুরী’ ছদ্মনামে আলমগীর কবীর রচিত।

.

সুতরাং দুইটি সুস্পষ্ট বৈশ্বয়িকমতবাদ বাংলাদেশের বিষয়ে নতুন দুইটি মেরু যুক্ত করছে। ব্যাপকভাবে বিস্তৃত সংবাদ প্রতিবেদনের দ্বারা বিশ্বজুড়ে জনমত বাংলাদেশের মানুষের জন্য একমাত্র আইনগত ও নৈতিক মুখপাত্র হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর দলকে চিহ্নিত করার পক্ষেই যাচ্ছে। তাঁরা বিশ্বাস করছেন যে, বাংলাদেশের জনগণের উপর সামরিক জান্তা দ্বারা গণহত্যাজনিত যুদ্ধের পর পাকিস্থানের মূল উদ্দেশ্য বিলুপ্ত হয়েছে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা অবিলম্বে প্রদান করা আবশ্যক হয়ে উঠেছে। তাঁরা সত্যিকার অর্থেই উক্ত এলাকায় আন্তর্জাতিক শান্তির উপর মারাত্মক হুমকির জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন।

দ্বিতীয় মতটি পশ্চিমা সরকারগুলোর। এটা যদিও দৃঢ় হতে সময় নিচ্ছে, কিন্তু পরিষ্কারভাবেই এই সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান চাওয়ার জন্য ইয়াহিয়া সরকার এর উপর চাপ তৈরী করা হচ্ছে। যদি সেই উন্মাদ জেনারেলরা শোনার মতো স্থিতিশীল অবস্থায় থাকে তবে কোন প্রকার ত্যাগ করা ছাড়াই রাজনৈতিক কূটকৌশল প্রয়োগের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ জায়গা থাকার প্রস্তাবে তারা প্রলুব্ধ হতে পারে। দ্রুততার সাথে প্রস্তাব ও পাল্টা প্রস্তাব অন্তত আরো কয়েক দশকের জন্য বাংলাদেশে উপনিবেশ স্থাপনের মতো দুঃসাহসিক পাগলাটে অভিযানের লক্ষ্যে ক্ষিপ্ত প্রয়াস চালনার পদক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ যোগানের সময় এনে দিতে পারে। একটি ফ্যাসিবাদী সেনাদল যারা অযাচিতভাবে অধিগ্রহণ করছে এবং কোন প্রকার সশস্ত্র প্ররোচনা ছাড়াই বৃহৎ হত্যাযজ্ঞের আয়োজন করেছে তারা স্বেচ্ছায় রাজনৈতিক সমাধানের জন্য সহমত পোষণ করবে এই আশা করাটা বোকামী হবে।

যদি প্রতিক্রিয়া হিসেবে ভারতের সাম্প্রদায়িকতাপ্রবণ এলাকায় হাজার হাজার মুসলমান মারা যায় তবে পাকিস্থানের সামরিক জান্তা এটাকে অগ্রাহ্য করে থাকতে পারবে না। তারা যা চায় তা হচ্ছে ভারতের উপর রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন। ভারতের যে সকল মুসলমান পাকিস্তানের সামরিক জান্তার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করছে এবং বুঝতে পারছে বাংলাদেশের জনগণের উপর সামরিক জান্তা দ্বারা সংগঠিত মহান দুর্বিপাকে সহানুভূতি প্রকাশ করাটাই এই সময় অত্যন্ত কঠিন যা মনে রাখা উচিত। তাঁদের আরো মনে রাখা উচিত যে পাকিস্থানের বিভিন্ন প্রদেশে, বিশেষ করে পশ্চিম পাঞ্জাবে ভারত হতে উদ্বাস্তুদের সাথে কি রকম আচরণ করা হচ্ছে।  যাই হোক, ভারতের প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানের এই হীন চক্রান্ত মোকাবেলায় একাধিকবার তার সংকল্প প্রকাশ করেছেন এবং ভারতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে ফেলা হয়েছে।

বিশ্বকে এখনই কাজ শুরু করতে হবে- শুধুমাত্র বন্দী ও বাস্তুহারা বাংলাদেশীদের জন্যই নয় বরং নিজের স্বার্থেই। একে অবশ্যই বাংলাদেশের জনগণের ভোটে নির্বাচিত ও বৈধ সরকারকে স্বীকার করে নিতে হবে এবং ইয়াহিয়ার সেনাবাহিনীর আক্রমণ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। শুধুমাত্র এইভাবেই এই অঞ্চলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যেতে পারে।

…জুন, ১৯৭১

পশ্চিমা সরকারগুলো, যদিও এখনও অপ্রতুলতার সাথে, পাকিস্থানের সামরিক জান্তা দ্বারা ইচ্ছাকৃতভাবে বিপুলায়তনের উদ্বাস্তু ভারতের উপর চাপিয়ে দেওয়া সমস্যা নিয়ে তাঁদের জেগে ওঠার সাড়া দিচ্ছেন। প্রতিবেদনানুযায়ী, ত্রাণ সামগ্রী নিয়মিতভাবে প্রতিদিনই কলকাতায় আসছে। এর সবই দ্রুততার সাথেই ক্যাম্পের লক্ষ লক্ষ্য ক্লিষ্টদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে। সাহায্যের পরিমাণ আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যেই বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু তা বাংলাদেশের ভেতর এবং বাহিরের ক্লিষ্টদের মাঝে অত্যাধিক আশা জাগানোতে উৎসাহিত করা উচিত নয়। উদ্বাস্তুদের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহানুভুতি সম্ভবত অনির্দিষ্টকালের জন্য, কিন্তু সাহায্যের হাত খুব সম্ভবত

বছর শেষ হওয়ার আগেই ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই কেউ এটা আশা করতে পারে না যে দাতা দেশ অনিদির্ষ্ট কালের জন্য এই রকম ভারী বোঝা বহন করে যাবে। তাহলে শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে? পুরো ভারটিই আবার ভারতের বিষম বিপন্ন অর্থনীতির উপর বর্তাবে। কিন্তু ভারত কী এই ধাক্কা সামলাতে পারবে? না।

সুতরাং বিশ্বের কাছে এই উপমহাদেশ আরো একটি রক্তক্ষয়ী জায়গা হিসেবে পরিচিত পাওয়ার আগেই এর একটা স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করা আবশ্যক। বিশ্বের মনোযোগ অপরাধী হতে অপরাধমূলক কর্মকান্ডের দিকে সরিয়ে নেওয়ার মতো প্রচারণার ক্ষেত্রে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা দারুণভাবে সফল। পুরো বিশ্ব শরণার্থীদের যারা সীমান্ত পার করে এসেছে তাঁদের ত্রাণের অস্থায়ী সমাধানের ব্যবস্থা করেছেন যেখানে ইয়াহিয়ার দল যারা শুধু এই সঙ্কটের জন্যই দায়ী নয় বরং অনিবার্য সমাধানে যথা, রাজনৈতিক আবহ, শরণার্থীদের সম্মানজনক ও সামঞ্জস্যমূলকভাবে সাগ্রহের সাথে তাঁদের ঘরে ফিরে যেতে বিলম্ব করছে। তারা ততদিন ফিরে যেতে পারবে না যতদিন হানাদার বাহিনীর কান্ডজ্ঞানহীন নিষ্ঠুরতা সেই মাটিতে আছে, যারা তাঁদের প্রিয়জনদের খুন করেছে এবং তাঁদের ভিটে হতে উচ্ছেদ করেছে । পুরো বিশ্বকে একইভাবে সেই সব লক্ষ লক্ষ লোকের ভাগ্যের জন্য সাড়া দিতে হবে যারা বিবিধ কারণে তাঁদের দেশ ছাড়তে ব্যর্থ হয়েছে এবং বর্তমানে নিদারুণভাবে সময়কে ভয়ংকরতম হিসেবে দুষছে। দখলকৃত এলাকায় ইচ্ছাকৃতভাবে খাদ্য শস্য ও ফসল ক্ষেতের বিনষ্ট করায় অভূতপূর্ব দুর্ভিক্ষের নিশ্চিত সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে।  ইতোমধ্যেই বরিশাল, পটুয়াখালী ও ফরিদপুর জেলায় দুর্ভিক্ষের বিস্তার ঘটেছে। পাক হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের শুরু থেকেই গ্রীষ্মকালীন ফল পাকার আগেই জনগণ সেইসবের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। মে মাস শেষ হওয়ার আগেই সকল কাঁচা আম, কাঁঠাল, কলা এবং আর যা কিছুই মানুষের ভক্ষণযোগ্য আছে সবই নিঃশেষিত হয়ে যাবে। চালের দাম মণ প্রতি ৪০ রুপির উর্ধ্বে অর্থাৎ, ৮০ হতে ৯০ রুপি প্রতি মণ। একটি বক্সের দাম পড়ছে ৫০ পয়সা। সেখানে কোন লবণ নেই, নেই কোন চিনি অথবা চা পাতা। গরীব কিংবা দুঃখীকারোরই কিছু কেনার মতো টাকা নেই। পাক হানাদার বাহিনীর সৈন্য ও অফিসাররা শুধু বাজার এবং গুদামের শস্যই নষ্ট করেনি বরং সেই সাথে প্রতিটি বাড়িঘর হতে টাকা ও সোনা লুট করে নিয়েছে।এক রাতের মধ্যেই হাজারো পরিবার ভিক্ষুকে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সেখানে এমন কি কোন ধনীও রইলো না যে তাঁদের পর্যাপ্ত সহায়তা দিতে পারে।

রাষ্ট্রে ব্যাপারটা এমনই ছিলো যে পাকিস্থানের এইসব উন্মাদ জেনারেলরা তাঁদের লুন্ঠনরাজ অব্যাহত রাখছিল যতক্ষণ না তাঁদের উর্ধ্বতন ক্ষমতার কেউ তাঁদের হয় বহিষ্কার করছে অথবা এই দুঃসাহসিক অভিযান স্থগিত করতে বাধ্য করছে। প্রবল ক্ষয়ক্ষতি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তরুণ অফিসারদের মাঝে কিছুটা মতভেদ বৃদ্ধি করেছে। একটি অভ্যুত্থানে শাসিত করা যায় না। কিন্তু বিশ্ব তা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে যেতে পারে না, কারণ কবে ঘটবে তা কেউই জানে না…

২০ জুলাই, ১৯৭১

একজন ভীতু ইয়াহিয়া যুদ্ধের হুমকি দিয়েছে। এই মরিয়া মানুষটি এই খেলায় তার আন্তর্জাতিক ছলচাতুরী ও প্রতারণার শেষ ট্রাম কার্ড নিয়ে এসেছে যখন থেকে সে বাংলাদেশে নিরপরাধ মানুষদের উপর তার আদিম দলটিকে গণহত্যার জন্য ছেড়ে দিয়েছে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস অব লন্ডনের সংবাদদাতাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এভাবেই বলতে চেয়েছেন যে, যদি ভারত পূর্ব পাকিস্থানের কোন অংশ দখল করে তবে তিনি ভারতের সাথের যুদ্ধ শুরু করার হুমকি দিচ্ছেন। তিনি এমনকি এই ইঙ্গিতও দিয়েছেন যে যদি তিনি ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তবে তিনি শুধু যে একা তা নয়, প্রকৃতপক্ষে,এটি অন্যান্য রাজনৈতিক সংকটেরই শাখাভুক্ত যা তিনি এবং তার সঙ্গীরা মার্চের এক তারিখ থেকেই করে আসছেন যেদিন তিনি পাকিস্তানে গণতন্ত্র পুনঃনির্গমন এর চুক্তি করে প্রাণঘাতী আঘাত করেছিলেন এবং ২৫ দিন পরের পূর্ণ বিঘটন এর পথ নিশ্চিত করেছিলেন।ইয়াহিয়ার ভয়প্রদর্শন চূড়ান্ত নৈরাশ্য প্রকাশ করছিলো যা সাধারণত স্নায়বিক স্বাস্থ্যভঙ্গ এর আবির্ভাব ঘটাকে অধিকতর প্রয়োজনীয় করে তোলে। এটি এখন আসলে জনসাধারণের অনিশ্চিত যুদ্ধ অবস্থানে প্রবেশ মাত্র। তিনি এখন স্বীকার করেছেন যে পাক সেনাবাহিনী বাংলাদেশের প্রকান্ড এলাকাজুড়ে নিজেদের কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলেছে।

বিভিন্ন সম্মুখভাগ এর প্রতিবেদন অনুসারে,পাকিস্তানী সেনাবাহিনী মুক্তিফৌজসমূহের বিশাল হামলার জন্য সকল সেক্টরে পিছু হটেছে। বিশেষ করে পশ্চিমা ভাগে পাক সেনাবাহিনীর অনেক বেশী সৈন্য নিহত বা আহত হয়েছেন এবং প্রায় পুরো কুষ্টিয়া জেলাই মুক্তিবাহিনী কর্তৃক পুনঃদখল করা হয়েছে। পর্যবেক্ষকরা বিশ্বাস করেন যে,এই ভাগে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যেসব তাৎপর্যপূর্ণ হামলার ভেতর দিয়ে দিয়েছে তা মূলত ভারতে যুদ্ধের প্রতি ইয়াহিয়ার হুমকির কারণে হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই তিনি যেসব স্থানে তার সামরিক বাহিনী মুক্তিবাহিনীর কাছে পরাজিত হয়েছে,তার কারণ হিসেবে ভারতেকে দোষী করছেন। তিনি কীভাবে মানবেন যে তার “অজেয়” সেনাবাহিনী বাংলাদেশী মুক্তিবাহিনীর পর্যাপ্ত অস্ত্রাদি বিহীন কিন্তু চমৎকারভাবে অনুপ্রাণিত যুবকদের সাথে করুণভাবে পরাজিত হচ্ছে? তার সেনাবাহিনী শক্তিশালী ভারতের কাছে পরাজিত হচ্ছে,এরূপ অভিনয় অন্তত তার নিজের বিবেক এর কাছে একটি কপট ছলনা ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু,পৃথিবীই ভালো জানে। অগণিত বিদেশী সাংবাদিক বাংলাদেশের মুক্তিপ্রাপ্ত এলাকাগুলো ঘুরে গিয়েছেন। তারা মাইলের পর মাইল বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পও পরিদর্শন করেছেন এবং সেনাপতি এবং সৈন্যদের সাথে কথা বলেছেন। বিদেশী টেলিভিশন নেটওয়ার্ক সমূহ যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর কর্মকান্ড ক্যামেরায় ধারণ করেছেন। তাদের প্রতিবেদনে খুব সহজেই প্রমাণ হয়ে যাবে যে মুক্তিযুদ্ধের সাথে ভারতের কোন সম্পর্ক নেই। যুদ্ধের আদর্শ সম্পূর্ণ ভাবে মেনে নিয়ে এই যুদ্ধ করছে শুধুমাত্র দেশপ্রেমিক বাংলাদেশীরা। তাদের অসাধারণ সাফল্যের কারণ গোলাবর্ষণ এর ক্ষমতা নয়,বরং এর পেছনে রয়েছে তাদের দেশপ্রেম। তারা তাদের মাতৃভূমিকে মুক্ত করার জন্য যুদ্ধ করছে।যদিও পাকিস্তানী আক্রমণকারীদের অস্ত্রসমৃদ্ধ অস্ত্রাগার আছে,তা কখনোই তাদের আত্মা এবং নীতির সাথে মিলবে নাহ।

কিন্তু ইয়াহিয়া এবং তার সঙ্গীরা নিজেদের মধ্যেই ডুবে ছিলেন বলে তাদের পক্ষে এটি বুঝে ওঠা সম্ভব হয়নি। যুদ্ধ তো আর কোন গোষ্ঠী বা তার পরিবারকে হুমকির মুখে ফেলেনি। একদিকে হাজার হাজার সৈন্য হাজার মাইল দূরে বাংলাদেশের জঙ্গলের কাদামাটির ভেতর তাদের প্রাণ বিসর্জন দিচ্ছে,আর অপরদিকে এসব কর্মকর্তারা অফিসারস মেস এর আরাম এবং আন্তর্জাতিক পতিতাদের সঙ্গ ভোগ করছেন। সুইস ব্যাংক তাদের নিজেদের সৌভাগ্যের নিরাপত্তার দিকে-সৌভাগ্য যা তারা আসন্ন বৃষ্টির দিনে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানকে লুট করে সঞ্চয় করবে। যখন সৈন্যশ্রেনী তাদের ভয়ংকর উদ্দেশ্য আবিষ্কার করবে এবং পরিস্থিতি উত্তপ্ত হবে তখন তারা তাদের পরিবার নিয়ে সুইস ভিলার নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে আকাশপথে গমন করবেন। অজ্ঞাত তথ্য হচ্ছে, ভারতের বিরুদ্ধে আক্রমণের সময় ইয়াহিয়া একা থাকবেন না, যা প্রমাণ করে তিনি এখনো স্কুলপড়ুয়া বালকটিই রয়ে গেছেন যার উপর কর্তৃত্ব খাটানো যায়। অবশ্যই তিনি ভুলে গেছেন যে,চীন কখনোই কোরিয়ার পর তার সীমান্তের বাইরে আসার সাহস করেনি। এমনকি লাওসের যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য পাওয়া আক্রমণ ও তাকে নাড়াতে পারেনি। সে ভারতের সাথে সরাসরি মিলিটারী আক্রমণে শুধুমাত্র ইয়াহিয়ার সামরিক জান্তাকে তুষ্ট করতে আসবে কীনা,এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া খুব বেশী কষ্টকর নয়।

অপরদিকে,ভারত এই উশৃঙ্খল বলশালী সৈন্যবাহিনী এবং ইয়াহিয়ার মত ভয়ানক ভয়ার্ত দলপতিকে ভয় পাচ্ছে নাহ।যাই হোক,ইয়াহিয়ার নিজেকে ফাঁকি দেওয়া ধারণা যে,ভারতের কোন বন্ধু নেই;আবারো তার রাজনৈতিক ধারণা কীরূপ তার দিকে সম্পূর্ণভাবে ইঙ্গিত করে।

৮ আগস্ট,১৯৭১

নয়া দিল্লীতে সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই গ্রোমিকোর গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকারের সঙ্গে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লড়াই এর চূড়ান্ত দশা শুরু হয়। সোভিয়েত সরকারের জনশ্রুতি ভারত-এর জন্য তার সমর্থন সম্পর্কে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে যদি ইসলামাবাদ সামরিক জান্তা এবং চীনা অনুমোদন এইটি উন্মত্তবৎ ভারতের বিরুদ্ধে আত্মঘাতী প্রচেষ্টায় যুদ্ধ ঘোষণা করতে বেছে নেয় এবং বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর উপর নির্ভর করে বাংলাদেশে সামরিক পরাজয় এড়াতে পারে। সোভিয়েত সরকারের এই বদ্ধপরিকর অবস্থানে নিক্সন এবং লিন পিয়াও উভয়ই ইয়াহিয়া ও তার সহযোগীর কুশ্রী মুখ রক্ষা করার জন্য ভয়াবহ ফলাফল এর সঙ্গে একটি বিশ্বযুদ্ধ ঝুঁকি নিতে রাজি হন না। অন্য কথায়, ইন্দো-ইসলামাবাদ সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা এখন একটি মহান চুক্তি প্রবর্তিত হয়েছে, এমনকি মনে হয় এটি কয়েক দিন আগে করেছেন।এবং এর মানে স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপর্যয়কর একটি দৃশ্য সঙ্গে বাংলাদেশ বিষয়টি আন্তর্জাতিকীকরণ করতে ইয়াহিয়া জান্তার ব্যর্থতা।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন যে, চীনা, এমনকি এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জেদ ধরে থাকা নতুন সপ্তাহে বাংলাদেশ, পশ্চিম পাকিস্তান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভবিষ্যতের জন্য গুণগত পরিবর্তনের সম্মুখীন হতে পারে যা বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামাবাদ জান্তার প্রতি আমেরিকান সামরিক এবং অর্থনৈতিক সাহায্যের বিরুদ্ধে ভারতীয় প্রতিবাদ এর নিশ্চিত প্রভাব নিক্সন সরকার এর উপর রয়েছে। ভারত ওয়াশিংটনকে জানিয়েছে যে আমেরিকাকে সমর্থনের কারণে ইয়াহিয়ার যুদ্ধ হুমকি ছিলো সরাসরি পরিণতি। ভারতের এরূপ প্রকাশ্যে নিন্দা জ্ঞাপন নিশ্চিতভাবেই আমেরিকার ঘরোয়া রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রাভেব ফেলবে। ভারত যখন স্পষ্টভাবে আমেরিকান প্রভাবক্ষেত্রের বাইরে চলছে, চীন তখনো যুদ্ধ থেকে পিছু হটছে না যতক্ষণ পর্যন্ত আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদ এখানে সম্পৃক্ত। সর্বশেষে আসছে, বাংলাদেশের মানুষদের প্রতি প্রেসিডেন্ট নিক্সন এর নিষ্ঠুর আচরণের কথা। যুক্তরাষ্ট্রে ইয়াহিয়া জান্তার গণহত্যার অপরাধে তুলনামূলকভাবে কম প্রচার সত্ত্বেও রাজনৈতিকভাবে সচেতন সাধারণ মানুষ নিক্সন আর হত্যাকারীদের একতা দেখে মর্মাহত হয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধের থেঁতলে যাওয়া বিবেক এর উপরে এটি আরো একটি বোঝা হিসেবেই প্রমাণিত হয়। নিক্সনের চীন দখলের বেপরোয়া চেষ্টার সময় পাকিস্তানী ফ্যাসিবাদীদের প্রতি বিশ্বাস আনার জন্য মিডিয়াতে প্রচারণা চালানোর টুকু সময় ছিলো না। এখন যদি ইয়াহিয়া শাসন এর হুমকী মোতাবেক শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়, যেখানে নিক্সন সহজেই তাঁর মুক্তি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারতেন, তাহলে তার মানে দাঁড়াবে নিক্সন এর আর ফিরে আসার কোন পথ থাকল না। এমন একটি খারাপ রেকর্ড সঙ্গে নিয়ে নিক্সন নিশ্চয় ১৯৭২ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একজন খুব খারাপ প্রার্থী প্রমাণিত হবেন।

এটা এমন নয় যে নিক্সন গত কয়েক সপ্তাহে যে বিশৃঙ্খলায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন তা তিনি বুঝেন নি। রিপাবলিকানদের হয়ে তার রাজনৈতিক দুর্যোগ ঠেকাতে যা তার কৌশল হতে পারত। স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশের জন্য রাজনৈতিক সমাধান খোঁজা এবং এতে শেখ মুজিবের সম্মতি আদায় করা সম্ভবত তার প্রথম পদক্ষেপ হত। ইয়াহিয়া জান্তা দৃশ্যপট এতই বিশৃঙ্খল করেছিল যে তা কনফারেন্স টেবিলে উপস্থাপন যোগ্য ছিল না। সিআইএ কে তাদের প্রিয় খেলায় ফিরতে দেখে এবং তথাকথিত মধ্যপন্থী জেনারেলদের দ্বারা রাষ্ট্রদ্রোহ ঘটিয়ে সরকার উৎখাত করতে দেখে কারো অবাক হওয়া উচিত নয়।

তখনো বাংলাদেশে অবস্থানরত আমেরিকান কর্মকর্তাদের মাঠ প্রতিবেদন নিশ্চয় তাকে তা উপলব্ধি করিয়েছিল যে বাংলাদেশে ধরা খাওয়া পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জয় দূরের কথা সামরিক পরাজয় আসন্ন। যদি নিক্সন সেখানে অবস্থানরত বেচে থাকা সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের রক্ষা করতে পারেন তবে পাকিস্তান বিশুদ্ধ কৃতজ্ঞতা স্বরুপ যুক্তরাষ্ট্রের বহিঃরজ্জুতে আবদ্ধ থাকবে।

অন্যদিকে ইস্যুটিতে চীনাদের অবস্থান অনমনীয় নেই। পিকিং রেডিও অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময়ের জন্য বিষয়টির ব্যাপারে নীরব থাকে। পাকিস্তানী জান্তাদের জন্য সর্বশেষ আমেরিকান পূর্ণ সমর্থন তাদেরকে অবশ্যই বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনে, তারা বুঝতে পারে সিনো-পাক বন্ধুত্ব শুধুমাত্র ভারতের প্রতি তাদের উভয়ের সাধারণ ঘৃণার উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। সব অস্ত্র ও সুদ বিহিন অর্থ সাহায্য দেওয়া স্বত্বেও পাকিস্তান হোয়াইট হাউজের কাছে সবসময় শিশুই রয়ে গেছে। এই বাস্তবতা পিকিংয়ের বৈদেশিক বিশেষজ্ঞদের কাছে বরং অবশ্যই বিরক্তিকর ঠেকছে। সম্প্রতি, স্পষ্ট প্রতীয়মান ব্যাপারগুলো ভারতের প্রতি চীনাদের মনোভাবকে অভিযুক্ত করে। আমেরিকার সাথে বন্ধুত্বের ব্যাপারে ভারতের মোহ মুক্তির পর ইন্দো-চীনা সম্পর্ক নতুন পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে, কেননা এখন পর্যন্ত চীনাদের কাছে সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল ইন্দো-আমেরিকান বোঝাপড়ার। এদিকে, ক্ষমতাসীন কংগ্রেস সহ প্রায় সব রাজনৈতিক দলই ইন্দো-চীনা নীরব সংঘর্ষ পূণর্মূল্যায়নের পক্ষে মত প্রকাশ করছে। এইসব নতুন ঘটনা আন্তর্জাতিক আবহ বাংলাদেশের পক্ষে থাকবে এরূপ ভবিষ্যদ্বাণী প্রদানে নিশ্চিত ভাবেই উৎসাহ দেয়। যুদ্ধ ক্ষেত্রে মুক্তি বাহিনীর দর্শনীয় সাফল্য এবং বাংলাদেশে জায়গা দখল ও স্বাধীনকরণ এবং তা ধরে রাখার অবস্থানগত যুদ্ধে তাদের ক্রমাগত শক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধি একাধিক দেশ কর্তৃক বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি প্রধানের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে আগস্ট মাসটি অবশ্যই খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

১২ই আগস্ট, ১৯৭১

  আমি আমার ভয় পুনরায় প্রকাশ না করে পারছি না। এই মুহূর্তে একমাত্র প্রশ্ন হল শেখ কি এখনো জীবিত? ইয়াহিয়ার হঠাৎ করে দেওয়া সবচেয়ে কমসময়ে সম্ভবপর- সঠিক ভাবে বললে ৪৮ ঘন্টার নোটিশে বিচারের তারিখ ঘোষণার পূর্বেই কি উন্মাদনাগ্রস্ত ব্যক্তিরা তাকে শেষ করেনি? কেন তারা তাড়াহুড়া করছে? শেখ পালিয়ে যাচ্ছে না! সে তাদের হাতে আছে এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরে আছে যেখানে পরাজয় পাক সেনাবাহিনীকে খুব ধীরে নয় কিন্তু অটলভাবে পূর্ণ করে দিচ্ছে। বিচারের সময় নির্ধারণে তাদের বিচার ব্যবস্থার উজ্জ্বলতা দেখানোর চেয়ে বড় কোন কারণ অবশ্যই লুকিয়ে আছে।

শেখ কে গ্রেফতার করার পর থেকেই নির্জন কারাগারে রাখা হচ্ছে। তাকে গ্রেফতার করা জঘন্য ব্যক্তিরা বাদে তাকে আর কেউ দেখেনি। অবশই, শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কন্যা বেগম সুলাইমান, এবং বর্তমানে যে সামরিক জান্তাদের পক্ষ হয়ে দেশদ্রোহী, মে মাসের শেষের দিকে ঢাকায় দাবি করে যে খুনী জেনারেলগণ কর্তৃক উদ্ভাবিত আপস রফা পরিচালনা করার আমন্ত্রণ করার জন্য আটকের সামরিক জেলে সে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করেছে।

স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান যে, শেখ তাকে নিজের কাজে মন দিতে বলেছিলেন।এমনকি এই গল্প যদি সত্যি হয় তবে সাত সপ্তাহ ধরে এমন কারো সাথে শেখের যোগাযোগ হয়নি যে পৃথিবীকে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার বর্ণনা দিতে পারবে। শুধু মাত্র ইয়াহিয়া নিজে এক বিদেশি সাংবাদিকের সাথে স্বীকার করেছে যে সেনাবাহিনীর সরবরাহকৃত খাদ্য অনুপভোগ্য হওয়ায় শেখের স্বাস্থ্য ভালো না।

গুজব ছিল্ যে বঙ্গবন্ধু অমানবিক অত্যাচারের শিকার হয়েছেন। এই গুজব সত্যি হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটা সর্বসাধারণে বিদিত ছিল যে ইয়াহিয়া তার সাহস কে ঘৃণা করত।সভ্যতার চেতনা শূন্যব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ঔদ্ধত্যে প্রশিক্ষিত একজন ব্যক্তির জন্য নিরস্ত্র শেখকে হুমকি ধামকিতে বাগে আনার ও সামরিক হুমকিতে আত্মসমর্পণ করানোর ব্যর্থতা ইয়াহিয়ার ভঙ্গুর ধৈর্যকে শেষ করে দিয়েছে।

সংখ্যা গরিষ্ঠ দলের নেতাকে পুরোপুরি অবহেলা করে ভুট্টুর পরামর্শে জাতীয় সংসদ স্থগিতাদেশের পর তার বক্তব্য গুলোকে এই বিষয়ে উল্লেখ করা যায়। সে ভুট্টুর সাথে তথাকথিত ‘ঐক্য’ তৈরির ব্যর্থতার জন্য শেখকে অভিযুক্ত করে কিন্তু রাগের কারণে ভদ্রতা ভুলে গেছে। যখন সে খলনায়ক হিসেবে ভুট্টুকে মি. ভুট্টু হিসেবে উল্লেখ করেছিল সেখানে সে শেখকে মুজিব হিসেবে উল্লেখ করেছে। ব্রিটিশ রীতির সেনা মেসে বেড়ে উঠা ব্যক্তির জন্য এটি অসতর্কতাজনিত ভুল নয়। এটি সহজেই বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বের প্রতি তার বিরাগকে ফাঁস করে দেয়। ৬ মার্চ তার পরবর্তী বক্তব্যে যেখানে সে ২৫শে মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন ডাকার বিষয়ে অনিচ্ছায় অনুমোদন করে সেখানেও সে পুনরায় একইভাবে শেখকে অপমান করে, প্রকৃতপক্ষে তখন সে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণের সময় ক্রুদ্ধতা প্রকাশ করে। ২৬শে মার্চের ভাষণে তার বাজে আচরণের পুনরাবৃতি লক্ষ্য করি। এটা স্পষ্ট ছিল শেখের মৃত্যুই তাকে সবচেয়ে বেশি খুশি করতে পারত।

ইচ্ছাকৃতভাবে ফাঁসকৃত তথ্যে জানা যায় যে শেখ তার পক্ষে কৌঁসুলি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান যা তাদের অসাধুতার ব্যাপারে সন্দেহ বাড়িয়ে দেয়। শেখের সাথে বহির্বিশ্বের কোন যোগাযোগ ছিলনা। ইয়াহিয়ার সহায়তা ছাড়া কিভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের অস্বীকৃতির গল্প বিশ্ব সংবাদ হয়ে যায়? যদি ইতিমধ্যে ঘটে যাওয়া অপরাধ লুকানোর জন্য এই তথাকথিত বিচার আয়োজন করা হয় তবে এই ‘অস্বীকৃতির গল্প’ কি খুবই কাজের হয়না? বিশেষ করে সবাই যখন জানে যে বৈদেশিক সামরিক আদালতে বিচার করতে শেখ কখনো একমত হবেন না। এই রহস্য আরো জোড়াল হয় যখন জানা যায় যে এপ্রিল থেকে সন্তানসহ গৃহবন্দী থাকা বেগম মুজিবুর রহমানকে ঢাকা থেকে করাচি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তার পরিবারকেও কি শেষ করে দেয়া হয়েছে? মধ্যযুগীয় ভয়ঙ্কর গল্পের মত কোন অপরাধ ঘটানো তাদের পক্ষে অসম্ভব নয়।

বিশ্ব জুড়ে নিন্দা ও তাদের পরামর্শদাতা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক ভয়ের উপর জোর দিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ সত্ত্বেও জান্তা এই অবৈধ বিচার চালিয়ে যায়। যদি এটি সত্য হয় তবে এটা প্রমাণিত হয় যে ইয়াহিয়া বিদেশি সংবাদকে ধোঁয়াশায় রাখছে যখন তার জল্লাদরা শেখ মুজিবের গলায় দড়ি পড়াচ্ছে। এই অপরাধের ব্যাপারে নিক্সনের প্রতিক্রিয়া কৌতূহলোদ্দীপক হবে। জান্তাকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য সে অজুহাত দেখাচ্ছিল যে যুক্তরাষ্ট্র সরকার এই পথে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমঝোতার উপর আকাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য সাধন করতে পারবে। যতদিন পর্যন্ত শেখ বেচে থাকবে ও বন্দী থাকবে ততদিন পর্যন্ত এই অজুহাত কভার আপ নকশা হিসেবে সুবিধা জনক। কিন্তু তাকে ছাড়া সে সঙ্কটে পড়ে যাবে।

আন্তর্জাতিক ক্ষমতার খেলায় তিনি করুণ ভাবে হেরেছেন যেহেতু তার ভোটারদেরকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের বিপরীতে দেখানোর জন্য তার কাছে শুধুমাত্র একটি পিংপং বল আছে। নিক্সন এবং ইসলামাবাদে তার আশ্রিতদের জন্য শেখের মৃত্যু দুর্যোগ নিয়ে আসবে।

কেননা বাংলাদেশের জনগণ তার মৃত্যুর সন্তোষজনক প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত বিশ্রাম নেবে না।

হাজারে একবারও যদি বঙ্গবন্ধুর বেচে থাকার সুযোগ থাকে তবে বিশ্ব ক্ষমতার উচিত দেরি হওয়ার পূর্বেই এই প্রহসনের বিচার বন্ধ করা।

১৭ আগস্ট, ১৯৭১

ইসলামবাদের খবর সমূহ ধারণা দেয় যে ইয়াহিয়া টিক্কা খানের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। ইসলামাবাদ যেটাকে তার পূর্ব উপনিবেশ হিসেবে মনে করত এই উন্মাদ খুনি নিজেকে জন সম্মুখে সেটার অদ্বিতীয় শাসক ঘোষণা করাই বাকি রেখেছিল। এখন ইয়াহিয়া ঢাকায় আসতে ভয় পায়। অন্যদিকে টিক্কাও হঠাত গ্রেফতারের ভয়ে ইসলামাবাদ ভ্রমন করতে ভয় পাচ্ছে। ইয়াহিয়া বাংলাদেশে দখল কৃত জায়গা ভ্রমনে তার বহুল প্রচারিত সফর দ্বিতীয়বারের মত বাদ দেয়, শেখ মুজিবুর রহমান ও বাংলাদেশের জনগনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার পর যেখানে ভ্রমন করার সাহস সে পায় না এবং রাতের আধারে চোরের মত সে ঢাকা থেকে পালিয়ে গিয়েছে। দুই সপ্তাহ আগে সে কিছু সংখ্যক বিদেশি সাংবাদিককে বলেছিলেন তার পাশে থাকতে যদি তারা তার ঢাকা সফরে সঙ্গী হতে চায়। তাদের অনেকে এখনো মুখে কুলুপ এঁটে তার পাশে আছে। এইদিকে কিছুদিন আগে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভায় টিক্কা খান লক্ষণীয়ভাবে অনুপস্থিত ছিল।

এটাও লক্ষনীয় যে ১৪ই আগস্ট ইয়াহিয়া রুটিন মাফিক টিক্কাকে হিলাল-ই-কায়েদ-ই-আজম উপাধিতে ভূষিত করে। যদি তাদের সম্পর্ক ভালো থাকত তবে পাকিস্তান ধ্বংসের মত ঐতিহাসিক কার্য সমাধার জন্য তাকে নিশ্চিতভাবেই হিলাল-ই-পাকিস্তান উপাধি দিত। এটা অবশ্যই সম্ভব যে ইয়াহিয়া পদকটি নিজের জন্য রেখে দিয়েছে।

টিক্কা তার অপরাধের বিপরীতে বিশ্ব প্রতিক্রিয়া কি হবে তা সম্পূর্ণভাবে বুঝতে পারার অভাবেই এই দুর্বৃত্তদের মাঝে ফাটল ধরেছে। সে ইয়াহিয়াকে বিশ্বাস করিয়েছে যে পূর্বের পরিস্থিতি স্বাভাবিক এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য সে যেকোন সংখ্যক সাংবাদিক পাঠাতে পারে। সম্ভবত সে ভেবেছিল যে, পশ্চিম পাকিস্তানি ভাড়াটেদের মত সেনা মেসে মদ ও নৈশাহারের বিনিময়ে এই সাংবাদিকদেরও কেনা যাবে। সম্ভবত তারাও তোতাপাখির (চমকপ্রদভাবে এন্থনি মাস্কারেনহাস ব্যতিক্রম ছিল) মত তার বানানো গল্প বলত। সত্যবাদী বোকার মত ইয়াহিয়া তাকে বিশ্বাস করে সাংবাদিকদের পাঠিয়ে ছিল যারা যথা সময়ে টিক্কার মিথ্যাগুলো ফাঁস করে দেয়। দৃশ্যতই এটি ইয়াহিয়াকে বিরক্ত করে যে সাংবাদিকদের বাইরে রাখতে চেয়েছিল বিশেষ করে যখন শুধু মাত্র ঢাকায় কতগুলো স্থাপনা মেরামত করার মাধ্যমে বাংলাদেশীদের মাঝে চালানো নগ্ন হামলা লুকান যাবে না। সে আশা করেছিল টিক্কা ইসলামাবাদে আসলে তার ব্যয়বহুল ভুলের জন্য শাস্তি দিতে পারবেন। কিন্তু তখন টিক্কা রাষ্ট্র পরিষদে তার বন্ধুদের মাধ্যমে এটার গন্ধ পায় এবং ইসলামাবাদের বাইরে থাকে।

এখন সে এই ভেবে চিন্তা না করে পারছিল না যদি ঢাকা সফরের সূচী ঠিক রাখতে বারবার ব্যর্থ হবার ফলে ইয়াহিয়া’র আন্তর্জাতিক অবস্থান দ্বিগুণ হাস্যকর হয়ে যায়।

একটা ব্যাপার নিশ্চিৎ যে এই জুটি আর টিকতে পারবে না। হয় টিক্কা যাবে, নাহয় ইয়াহিয়া যাবে। বাহ্যত, প্রেসিডেন্ট নিক্সন চায় যে তারা উভয়েই ক্ষমতা ছেড়ে যাক এবং এমন আমেরিকাপন্থী জেনারেল ক্ষমতায় আসুক যারা শেখ মুজিবের সাথে সমঝোতায় পৌঁছাতে দ্বিধা করবে না। প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট ভাবেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে কিন্তু পাকিস্তানের কাঠামোর ভিতরে একটা রাজনৈতিক সমঝোতা দেখে খুশিই হবেন যা এখন বাংলাদেশের মানুষের নিকট সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।

১৮ই আগস্ট, ১৯৭১

সর্বশেষ খবর অনুসারে যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাকিস্তানি দুতগণকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এটা জানা যায়নি যে তাদেরকে বহিস্কার করা হয়েছে অথবা ইসলামাবাদে সচিবদের গুদামে বিদেশ বিষয়ক তুচ্ছ কোন প্রকল্পে নিয়োগ করা হয়েছে কিনা। তাদের কপালে যাই ঘটুক এটা পরিষ্কার যে কোন প্রতিফল ছাড়াই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যে বিশৃংখলা তৈরি করেছে তার ফলে এই দুর্বৃত্তের দল পাগল হয়ে গেছে।

ওয়াশিংটন ও ব্রিটেনে ইয়াহিয়ার লোক আগা হিলালি ও সালমান আলি ও তার সমর্থকদের ব্যর্থতা হচ্ছে তারা যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের কোন পত্রিকায় বাংলাদেশে ইয়াহিয়ার অপরাধের পক্ষে কোন লেখা প্রকাশ করতে পারেনি, তাই তারা পেটে গুঁতো খেয়েছে। ঈশ্বরের কসম তারা কি চেষ্টা করেনি? আমেরিকানরা বাদে সালমান আলি ও তার মত কূটনীতিকদের জন্য ব্রিটিশ সংবাদ পত্রে এমন কিচ্ছু প্রকাশ করা খুবই কঠিন যাতে সম্পাদকরা একমত হয় না। দুর্বল সালমান তা জানত তাই সে প্রাথমিক ব্যর্থতার পরেই সেই নিস্ফল প্রচেষ্টা বাদ দেয়। কিন্তু হিলালি প্রকৃতিতে ভিন্ন ধরণের লোক। সে এমন ধরণের প্রাণী যে সাধারণ এক শব্দের না তার উদ্যম কমানোর জন্য যথেষ্ট না। তার উপর, সে ঘটনাক্রমে পুর্ব পাকিস্তানের অধিবাসি। যদিও সে বাংলায় একটি শব্দও বলতে পারে না তবুও সে রাষ্ট্রদূতের পদ দখল করেছে বাঙ্গালি কোটায়। সে মূলত মাদ্রাজ হতে উদ্বাস্তু হলেও বিদেশী অফিসে পাঞ্জাবি গোষ্ঠীর একজন হতে পারেনি। সে যদি বাঙালি কোটা বাণিজ্যের না হত তবে অনেক আগেই তাকে সরিয়ে দেওয়া হত। যখন ইয়াহিয়া গণহত্যা চালাচ্ছিল তখন সে নিজের টিকে থাকার জন্য একে প্রশ্রয় দিয়েছে এবং ঘন ঘন ও জোরে জোরে এই অপরাধের পক্ষে হ্যাঁ হ্যাঁ বলেছে যেন প্রমাণ করা যায় সে যাই হোক বাঙালি নয়। সে টিভিতে আমেরিকান দর্শকদের সামনে স্কুল ছাত্রের মত ঘ্যানঘ্যান করে অভিযোগ করে যে আমেরিকান সংবাদ পত্র তার কথা শুনে না এবং তার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিগুলো প্রকাশ করে না। এগুলো এমন করুণ ঘটনা ছিল যে ইসলামাবাদের গ্রাম্য স্বৈরাচারও লজ্জিত বোধ করেছে। এবং পাঞ্জাবি গোষ্ঠীও তার থেকে মুক্তি পাওয়ার অপেক্ষা করছিল।

কিন্তু তাদের উত্তরসুরিরাও কি এর চেয়ে ভাল করতে পারবে? কিভাবে একজন এমন জঘন্য বিষয়ের পক্ষ সমর্থন করবে? সর্বোপরি, পাকিস্তানের সীমানা ও লিনপিয়াও এর চীনের বাইরে একটা আদর্শ সভ্যতার অস্তিত্ব রয়েছে। কমপক্ষে এক মিলিয়ন জীবনের রক্তে সিক্ত পাটবস্ত্র স্নো হোয়াইট বলে উপস্থাপন করা অসম্ভব।

২০ আগস্ট, ১৯৭১

২৫ মার্চে স্বেচ্ছায় গ্রেফতার হওয়া শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্য ও প্রকৃত হদিস এখনো রহস্যের বেড়াজালে আবৃত। যদিও বিতর্কিত চরিত্র যেমন বেগম আখতার সুলেমান দাবি করেছেন যে তিনি জেলখানায় তাকে দেখতে গিয়েছিলেন তবুও গ্রেফতারের রাত থেকে মনোবিকারগ্রস্ত খুনি টিক্কা খানের ক্রোধ থেকে এখনো তিনি বেচে আছেন কিনা তার অকাট্য প্রমাণ একটিও নেই।

বন্দুকবাজ জান্তার কাছের সুত্রদের দ্বারা ইচ্ছাকৃতভাবে ফাঁস হওয়া খবর সমূহ বিশ্বকে আজ পর্যন্ত অনিশ্চিত ধারণায় নিমজ্জিত রাখছে। জান্তার দপ্তর থেকে আসা একান্ত ও অন্তর্নিহিত নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াটি ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের নিরাপত্তা নিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব কর্তৃক জনসম্মুখে উদ্বেগ প্রকাশকে নগ্ন সমালোচনা করার প্রচেষ্টা। উ থান্ট এবং অন্যান্য বিশ্ব ব্যক্তিগণ এই বিচার প্রক্রিয়া যার রায় কৌঁসুলি তথা বিচারক তথা ঘাতক ইয়াহিয়া তার অনেক সাক্ষাতে বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে প্রকাশ করেছেন তা সভ্যতার আদর্শ ও চেতনার উপর আরো একটি আঘাত বলে বিবেচনা করেছেন। আমেরিকান ও চীনাদের চাপ সত্ত্বেও উ থান্ট এই ক্ষেত্রে তার জঘন্য নীরবতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন (বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের চালানো গণহত্যার প্রথম সপ্তাহে তিনি নীরব ছিলেন- যে নীরবতা রক্তপিপাসু জেনারেলদেরকে ভয়ঙ্করভাবে শেখের জীবন নিতে উৎসাহ দেয়)। পাকিস্তানের বিদেশ বিষয়ক দপ্তর ধৃষ্টতার সাথে মহাসচিবকে দেখিয়ে দেয় যে উত্তর আয়ারল্যান্ডে ব্রিটিশ গণহত্যার সময় তিনি নীরব ছিলেন। এর দ্বারা পাকিস্তানিরা বুঝাতে চেয়েছিল যে বাংলাদেশে তাদের অপরাধের ব্যাপারে জাতি সংঘের নিষ্ক্রিয় থাকা তাদেরও অধিকার। এটা এমন যে এক খুনি আরেক খুনির বেচে যাওয়াকে উদাহরণ দিয়ে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে। এই মনোভাব তাদের লজ্জাহীনতার স্তর প্রকাশ করে এবং দেখায় যে তারা কতটা নীচ হতে পারে।

এমনকি সবচেয়ে বড় অবমাননা হল এই হিটলার ও মার্কো দে সেইদ এর সন্তানেরা তাদের অপরাধী মনোবিকারকে অনেক দূর নিয়ে গেছে। বিশ্ব কি এতই ক্ষমতাহীন যে তারা এই ধরা থেকে এসব কুৎসিত বস্তুকে সরিয়ে দিতে পারছে না এবং একে মানুষের জন্য আরো বাসযোগ্য করতে পারছে না? যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ বিশ্ব ক্ষমতা কি এতই বিবেকহীন ও অন্ধ যে তারা তুচ্ছ জাতীয় স্বার্থের জন্য এই অপরাধেসাহযোগী হওয়া অথবা নীরব দর্শক হওয়ার খেলা খেলবে?এই সংঘর্ষের প্রথম দলকে ভুলে তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম দলেরসাথে চুক্তি করা বাদে কি বাংলাদেশের জনগণ ও তার অবিসংবাদিত নেতার প্রতি সোভিয়েত ইউনিয়নের আরো বড় দায়িত্ব নেই?

ধারণা করে নেই যে খুনিরা শেখ মুজিবকে এখনো জীবিত রেখেছে। আমি একথা বলছি এই জন্যে যে, অন্য একটা খবরে জানা গেছে শেখ মুজিবঅত্যাচারিত হয়েছেন যা তথাকথিত বিচারের আদালতে কক্ষে তার ভেঙ্গে পড়ার কারণ। এখন, বিশ্ব নিন্দাকে কলা দেখিয়ে ইয়াহিয়া যদি নেতাকে শেষ করার পথে এগিয়ে যায় তখন বিশ্ব ক্ষমতাধারীরা কী করবে? শুধু কথার বাহিরে অর্থবহ কোনকিছু কী তারা করবে? এই ঘৃণ্য দুঃখজনক ঘটনার পর্যবেক্ষকদের মনে এই প্রশ্নটিই প্রাধান্য বিস্তার করছে।

যদি বিশ্ব ইসলামাবাদের খুনিদের মত ভাবে, শেখ মুজিবের খুন বাঙালি জাতিকে দমিয়ে দিবে এবং সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে তাহলে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে। মহা ক্ষমতাধরদের আবার মনে করিয়ে দেই বাংলাদেশ বায়াফ্রা কিংবা কঙ্গো নয়। পুরো জাতি ভয়ঙ্কর উন্মাদ, সামন্তবাদী এবং ফ্যাসিবাদী সামরিক রাষ্ট্রযন্ত্র এর অন্যায্য ও অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধের দ্বারা আঘাত পেয়েছে।