হাজার প্রাণের হত্যাপুরী লাকসাম সিগারেট ফ্যাক্টরি

Posted on Posted in 8

৩৩। হাজার প্রাণের হত্যাপুরী লাকসাম সিগারেট ফ্যাক্টরি (৪১৩-৪১৪)

সূত্র – পূর্বদেশ, তারিখঃ ৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২
হাজার প্রাণের হত্যাপুরী লাকসাম সিগারেট ফ্যাক্টরি
।। এম, এ খায়ের মিয়া ।।

লাকসাম, কুমিল্লা
লাকসাম জংশন এ দাঁড়িয়ে দক্ষিণ -পশ্চিম দিকে দৃষ্টি মেলে ধরলে দেয়াল ঘেরা সুবিশাল এলাকাজুড়ে কালো রং মাখা যে দ্বিতল প্রাসাদটি দেখা যায়, সেটি একটি সিগারেট ফ্যাক্টরি। কিন্তু তার নাম যাই থাকুক না কেনো, লাকসাম বাসীরা এটাকে হত্যাপুরী বলেই জানে। বিগত নয়টি মাসে এই ফ্যাক্টরির বিভিন্ন কোণায়,বিভিন্ন কক্ষে ও কোঠায় বিভিন্ন সেলে এবং ছাদে যে অত্যাচার, নারী ধর্ষণ এবং নির্বিচারে গণহত্যা চলেছিলো তার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। দিনে রাতে যখন তখন লাকসাম থানার বিভিন্ন গ্রামগঞ্জে হানা দিয়ে গ্রাম বাংলার নিরীহ নারী – পুরুষদের ধরে এনে এবং লাকসাম জংশন এ অপেক্ষমান ট্রেন থেকে যুবক, যুবতী ও যাত্রীদের ছিনিয়ে এনে এই হত্যাপুরীতে এই হত্যাপুরীতে বর্বর খান সেনারা বিনষ্ট করেছে অগণিত মা, বোনের ইজ্জত, বধ করেছে হাজার হাজার প্রাণ।

ট্রেন থেকে মহিলা যাত্রী আর গ্রাম থেকে পল্লীবালা ও কূলবধূদেরকে ছিনিয়ে এনে ওদের উলঙ্গ করে কারখানার ছাদের উপর উঠিয়ে দুই হাত উপরে তুলে সারাদিন ভর রেলিং বিহীন ছাদের উপর হাটতে বাধ্য করা হতো। কারখানার অনতিদূরে যাত্রীবাহী ট্রেন থামিয়ে যাত্রীদের অই ছাদের উপর দৃষ্টিপাত করতে নির্দেশ দেয়া হতো। এমনিভাবে সারা দিনভর ধৃত মা – বোনদের বেইজ্জতি করে, রাতে কারখানের বিভিন্ন কোঠায় নিয়ে মেজর গার্দিজি ও তার দোসররা মা বোনদের উপর চালাত পাশবিক অত্যাচার। নিজেরা তো মদ পান করতো, নারীদেরও মদপানে বাধ্য করা হতো। চাবুকে আর চাবুকে এবং পাশবিক অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে রাত্রির গভীরতা ভেংগে প্রায়ই ভেসে আসতো মা -বোন্দের বুকফাটা করুণ আর্তনাদ।কিন্তু মদ্যপায়ী নর-পশুদের অট্টহাসিতে সবকিছু চাপা পড়ে যেত। অনেক অনেক মা-বোনকে বলাতকার স্থলেই মৃত্যুবরন করতে হয়েছে। আর যারা নামে মাত্র বেচে থাকত তাদের সংজ্ঞাহীন দেহ রাতের আধারে সে কারখানার বিভিন্ন কোণায় পুতে ফেলা হতো।

বিগত ১লা ফেব্রুয়ারি সে কারখানার প্রহরারত মিত্রবাহিনীর অনুমতি নিয়ে লাকসামের এম, সি এ জনাব আব্দুল আউয়াল ও থানার সেকেন্ড অফিসার এবং জনাকয়েক ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শী সহকারে কারখানাটি দেখতে গিয়েছিলাম। পশ্চিম কারখানাটিতে ঢুকতেই ভেসে এলো পচা গন্ধ। হয়তো রক্ত পচা গন্ধই হবে, এ কারখানার যেখানেই যে কক্ষে ঘুরেছি সর্বত্রই অনুভব করতে পেরেছি রক্তের চাপ সে রক্তে র্দূগন্ধের আবাস। ভিতরে ঢুক্তেই সামনে দেখতে পেলাম দুটি জীবন্ত পেয়ারা গাছ ও সদ্য মৃত একটি কাঁঠাল গাছ। গাছ তিনটির প্রত্যেকের ডালে দেখলাম এখনো ঝুলে রয়েছে হত্যার প্রতীক কয়েকটি রশি। জনৈক প্রত্যক্ষদর্শী জানালেন এ গাছ তিনটি তে যে সমস্ত রশি এখনো ঝুলে রয়েছে সে সমস্ত রশিতে অসংখ্য নারী -পুরুষকে ঝুলিয়ে রেখে চাবুকের প্রহারে নিস্তেজ করা হতো। তারপর সে সমস্ত সংজ্ঞাহীন দেহ গুড় মেখে একটি চিলেকোঠায় ফেলে রাখা হতো। বলা বাহুল্য, সেই চিলেকোঠায় পূর্বাহ্নেই লুট করা খেজুরের গুড় বা মিষ্টি দ্রব্য ছিটিয়ে অজস্র পিপড়া জড়ো করে রাখা হতো। তারপর সেই পিপড়ার ভিড়ে সংজ্ঞাহীন দেহকে ফেলে রাখা হতো।

সারারাত বিষাক্ত পিপড়ার তীব্র দংশনে অনেককেই সেই চিলেকোঠায় নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। এমনিভাবে প্রাথমিক নির্যাতন শেষে অনেককে চোখ বেধে লাইনে দাড় করানো হত, তারপর গর্জে উঠতো হিংস্র হায়েনাদের অস্ত্র, নিমিষেই ভুলুন্ঠিত হত অগণিত প্রান। আর একটু এগিয়ে গেলাম, দেখলাম একটি পুকুর। পুকুরের পশ্চিমপাড়ে দুটি আমগাছ, এ আম গাছেও দেখলাম কয়েকটি রশি ঝুলছে আর গাছের নীচে দেখলাম আগাছায় ভরা এক ফালি জমি।

জনৈক প্রত্যক্ষদর্শী জানালেন অই সব পেয়ারা, কাঁঠাল গাছের নিচে, এই আম গাছের নিচে আর অই আগাছায় ভরা জমিটুকু খুড়লেই বের হয়ে পড়বে অসংখ্য ভাই -বোনের নরকংকাল।

আর এক প্রত্যক্ষদর্শী পুকুরের পূর্ব পাশে একটি ভরাট গর্তের চিহ্ন দেখিয়ে জানালেন যে একটি জীবন্ত লোককে হাত পা বেধে এই গর্তে ফেলে দিয়ে মাটিচাপা দিতে তিনি দেখছেন। তাছাড়া এম, সি, এ আউয়াল সাহেবও এই খবরটি বহু লোকের মুখে শুনেছেনবলে জানিয়েছেন। তারপর ঢুকলাম কারখানার ভিতরে।

সঙ্গী সেকেন্ড অফিসার সাহেব পূর্বেই শুনেছিলেন যে ইলেক্টিক হিট দিয়ে নাকি এখানে লোক মারা হতো। তাঁর নেতৃত্বে আমরা সে রুমটি খুজে পেলাম। দেখলাম একটা সুইচ বোর্ড, আর অসংখ্য বৈদ্যুতিক তার। সে ঘরটির পাশেই দেখলাম যে বেশ কিছু সামরিক ও বেসামরিক লোকের পোষাক। এখানে সামরিক ও বেসামরিক লোকদের উলঙ্গ করে ইলেক্টিক হিট দিয়ে মারা হতো।

সারাটা কারখানা ঘুরে দেখলাম। সর্বত্রই দেখা যায় ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে অনেক কাগজ পত্র। খান সেনাদের চিঠি ও পারিবারিক ফটো।

লাকসাম রেলওয়ে হাসপাতালের মালী মনিন্দ্র চন্দ্র, উপেন্দ্র চন্দ্র ও শ্রী রাম চন্দ্রমালীকে বিগত কয়েকমাস ধরে এ কারখানার খান সেনাদের কাজ করতে হয়েছে বলে অনেক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে তারা আমাকে জানিয়েছেন, এখানে অনুষ্ঠিত অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞ দেখে সে ভীত হত হয়ে অনেক আগেই পালাতে চেয়েছিলো, কিন্তু সুযোগ মেলেনি। মনিন্দ্র চন্দ্র আরো জানিয়েছেন যে, প্রায় রাতেই দলে দলে লোকদের চোখ বেধে জংশনের দক্ষিনের বড় হাই লাইটটির পূর্বদিকে বেলতলায় নিয়ে গিয়ে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হতো। যাদের হাতে দিনের বেলা গর্ত করা হতো রাত্রির বেলায় তাদেরকেই সেই গর্তে মাটি চাপা দেওয়া হতো।

মনীন্দ্র চন্দ্রের ও তার সংগীদের নির্দেশিত গর্তগুলি খুঁড়লে আজো অসংখ্য প্রমান মিলবে বলে তারা জোর দাবি জানান। লাকসাম এর প্রখ্যাত ডাক্তার জনাব মকবুল আহমেদ, মিল মালিক জনাব আব্দুর রহিম ও আব্দুল মতিন এক সাক্ষাৎকারে জনালেন যে পাক সেনাদের কুখ্যাত মেজর মুজাফফর গর্দিজি, ক্যাপ্টেন ওবায়দুর রহমান, সুবেদার মুস্তফা খান ও রেলওয়ে পুলিশ বাকাওয়ালীর নেতৃত্বে এবং স্থানীয় কতিপয় দালালদের যোগসাজশে লাকসামে সহস্রাধিক লোকের প্রান নাশ ঘটে।

লাকসাম থানার প্রখ্যাত আওয়ামীলীগ কর্মী ২৪নং আর্দা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জনাব আলী আশরাফ এবং লাকসামের বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক ও খসরুকে এই হত্যা পুরীতে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়।