১১৬। ১ অক্টোবর সম্পাদকীয়ঃ স্বাধীন বাংলাদেশ বাস্তব সত্য

Posted on Posted in 6

তাসমিয়া তাসিন

<৬,১১৬,১৯১-১৯২>

সংবাদপত্রঃ বাংলার মুখ ১ম বর্ষঃ ৭ম ও ৮ম সংখ্যা

তারিখঃ ১ অক্টোবর, ১৯৭১

সম্পাদকীয়

.

স্বাধীন বাংলাদেশের বাস্তব সত্য

বিশ্বের বুকে আজ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ বাস্তব সত্য। বাংলাদেশের যুদ্ধরত সিংহশাবকরা একথা চরমভাবে প্রমাণিত করছেন । বাংলার সশস্ত্র মুক্তিবাহিনী বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদ গোষ্ঠীকে হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করাতে পেরেছেন যে, বাংলার বুকে তাদের পাঁয়তারার দিন শেষ হয়ে গেছে । বর্বর পশু সেনাবাহিনীর নেতা জেনারেল ইয়াহিয়াও বুঝতে পেরেছে তার ঘৃণ্য মানসিকতাও বিধ্বস্ত । মানবীয় ও সচেতন বিশ্ব তার সমালোচনায় মুখর । বিশ্ব-ব্রিগেড গড়ে তোলার প্রস্তাব নেওয়া হয়েছে । দিল্লীতে বিশ্ব-সম্মেলনে । বাংলাদেশ সম্পর্কে অন্ধকারে রাখা পশ্চিম পাকিস্তান ও আর অন্ধকারে নয় । বিশ্ব- সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী ২৫ টি রাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দের পশ্চিম পাকিস্তান প্রতিবাদ পরিক্রম তাদের নতুন চোখ খুলে দিবে ।

.

রাষ্ট্রসংঘের সেক্রেটারী উ থান্টের মুখ খুলেছে । অবশ্য তার মুখ সাম্রাজ্যবাদ গোষ্ঠীরই মুখ একথা স্পষ্ট । চীনেরও মনোভাবের পরিবর্তন (?) ঘটেছে । 

.

এসবের সাথে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্বের রাজনৈতিক চিন্তাধারাও পরিবর্তন হচ্ছে অভূতপূর্বভাবে। এই পরিস্থিতির মধ্যে বসেছে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ অধিবেশন । বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে সেখানে যোগদান করছেন স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকারের একটি প্রতিনিধি দল। উদ্দেশ্য বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানবাত্মার আত্মবিশ্বাস, দৃঢ়তা ও সঙ্কল্পকে জানিয়ে দেয়া । বিশ্ব বিবেককে বুঝানো বাংলাদেশ কি চায় , সেখানে কি ঘটছে । কি ঘটবে । বাংলাদেশের স্বাধীন সার্বভৌম সরকারের স্বীকৃতি বিনাশর্তে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি, পশু পাক-সৈন্যদের বাংলার মাটি থেকে সরিয়ে নেয়ার দাবী জানাবেন তারা । পাকিস্তানের বর্বর আক্রমণের বিরুদ্ধে যুগোশ্লাভিয়া, চেকোশ্লাভিয়া, ইরাক, রাশিয়া ও আরো ক’টি দেশ ধিক্কার জানাবেন। বাংলাদেশকে রাষ্ট্রপুঞ্জে গ্রহনের দাবীও তোলা হবে । প্রতিনিধিদল বিশ্বের ক’টি দেশও ঘুরে আসবেন । স্বীকৃতি সাপেক্ষে অস্ত্রের কথাও তুলবেন তারা ।

.

বাংলাদেশ সম্পর্কে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারত যে মানবীয় দায়িত্বের তাগিদে কাজ করেছেন একথা স্পষ্ট । প্রতিনিধিদল একথাও বুঝবেন । ভারত শরণার্থীদের জন্যে যা করেছেন তা মানবীয় , রাজনৈতিক নয় । এ ব্যাপারে জঙ্গী পশু পাক সরকার যা বলেছেন যা করেছেন তা ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত , সঙ্কীর্ণ মানসিকতা সম্পন্ন বই আর কিছু নয় । একথা বিবেকবান বিশ্ব আজ ভালো করেই জানেন ।

.

একদিকে এই হলো আন্তর্জাতিক বিশ্ব । পক্ষান্তরে বাংলার সিংহশাবকরা অবিরাম সংগ্রাম করে চলেছেন । মুক্ত করছেন মাতৃভুমিকে পাক হানাদারদের কাছ থেকে । দিন দিন তাদের হামলা দুর্বার হচ্ছে ।

.

আজ সংগ্রামী বাংলার যে কন্ঠস্বর তা হচ্ছে পূর্ণ স্বাধীনতা রাজনৈতিক সমাধান নয় । স্বাধীনতা অর্জনের জন্য , বিশ্বের বুকে সাম্রাজ্যবাদ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দুর্বার গণ-রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্যে চাই অস্ত্র । এ হলো তাদের প্রথম ও সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দাবী । সাম্রাজ্যবাদ গোষ্ঠী ইয়াহিয়াকে নিয়ে বাংলাদেশের উপর যেভাবে দাবা খেলতে বসেছেন তা নিপাত করতে অস্ত্রের প্রয়োজন। অস্ত্র ব্যাতীত তাদের মরণ কামড়কে প্রতিরোধ করার মতো ক্ষমতা অন্যকিছু আছে কিনা তাদের জানা নেই । মনেপ্রাণে তারা প্রয়োজন বোধে বাংলার সংগ্রামী জনগণের অধিক দান করতেও সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে ।

.

এর বাইরে যদি কেউ কিছু চিন্তা করে থাকেন তা হলে তারা বাংলার সংগ্রামী স্বাধীনতাপ্রিয় জনগণের বাইরের বলেই বিবেচিত হবেন । জনগণের পরম শত্রু বলে বিবেচিত হবেন তারা । এ ব্যাপারে বাংলার সংগ্রামী নেতৃবৃন্দের বলিষ্ঠ ভূমিকারও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে । আজ তাদের নেতৃত্বে বাংলার বুকে যা জাতি গড়ে উঠছে তা শুধু বাংলার নয়, বিশ্বের নিপীড়িত , নির্যাতিত, মানব গোষ্ঠীরও আশা ভরসা । তারা আজ সংগ্রামী বাংলার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন ।

.

জাতিসংঘে  প্রতিনিধিদল সংগ্রামী বাংলার সত্যিকার রূপ, মানসিকতা বলিষ্ঠতার সাথে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারবেন এ দৃঢ় বিশ্বাস জনগণ পোষণ করছেন ।