১৩. ১৫ সেপ্টেম্বর সম্পাঃ ইয়াহিয়ার বেসামরিকি করণ

Posted on Posted in 6

চুয়েট ডিবেটিং সোসাইটি

<৬,১৩,৫৮৭-৫৮৮> অনুবাদ                       

        শিরোনাম         সংবাদপত্র         তারিখ
সম্পাদকীয়ঃ ইয়াহিয়ার বেসামরিকি করণ     বাংলাদেশ টুডে

   সংস্করণ ১ : নং ২

    ১৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

 

ইয়াহিয়ার বেসামরিকি করণ

 

         জেনারেল ইয়াহিয়া খান জেনারেল টিক্কা খানের পদে ডঃ মালিককে পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেন।জেনারেল টিক্কা খান বর্তমানে পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর “প্রধান কমান্ডার” হিসেবে পদন্নোতি পেয়েছেন।ডঃ মালিকের প্রধান দায়িত্ব এমন বাঙ্গালী রাজনীতিবিদদের নিয়ে সামরিক মন্ত্রিসভা গঠন করা যারা ইয়াহিয়ার সাথে মতৈক্য পোষণ করবেন। পশ্চিম পাকিস্তানী সমর্থন লাভের জন্য প্রচারকার্যের মাধ্যমে এটি ত্বরান্বিত করা হয়েছে যা রাজনৈতিক স্থিরতা পুনরায় ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে দেশকে সংস্কার হতে মুক্ত করবে। একজন  বেসামরিক শাসকের নেতৃত্বে কোনরকম নির্বাচন ছাড়াই গঠিত মন্ত্রিসভা যাই হোক অপরিবেশনযোগ্য হতে পারে যা বেসামরিক নিয়ম কানুনের ভাসা ভাসা চেহারাটি দেখায়। অট্টালিকার সম্মুখভাগ খুব সুন্দরভাবেই রহস্যপূর্ণ কারিগর দ্বারা চাকচিক্যময় করে তোলা হয়েছে!দর্শকদেরকে বেশ চাকচিক্যময় ভাবেই বোকা বানানো হচ্ছে!

      যদি ও ডঃ মালিকের শাসনে ইয়াহিয়ার সহযোগী মন্ত্রীসভা শীঘ্রই তৈরী হবে,তবু ও পৃথিবীই এর বিচার করবে যে পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে কোন বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে কীনা।প্রায় এক লক্ষ সামরিক সেনা বাংলাদেশের শহর এবং বন্দর এলাকায় রয়েছে। গত কয়েক মাসে বেসামরিক,পুলিশ এবং গোয়েন্দা বিভাগ এর  পদসমূহ পাঞ্জাবী কর্মকর্তাদের দ্বারা পূর্ণ হয়েছে।বাংলাদেশীদেরকে সুচতুরভাবে উচ্চ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতিই পশ্চিম পাকিস্তান হতে বিশাল পুলিশ বাহিনী আনা হয়েছে। এই পুলিশবাহিনীকে কাজে লাগানোর জন্য পূর্ব বাংলায় বসবাসকারী অবাঙ্গালী বিশাল রাজাকার বাহিনীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে যারা সামরিক বাহিনীর বর্শার ফলা হিসেবে কাজ করবে। সংবাদপত্র,আন্দোলন এবং সকল প্রকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষিদ্ধতা আগের মতই বজায় থাকবে। রাজনৈতিক নেতাদেরকে অপহরণ করা যারা একসময় দেশপ্রেমিক বলে গণ্য হতেন,নিষ্পাপ নারী পুরুষ দেরকে হত্যা করা সৈন্যদের আনন্দের খেলা হিসেবে চলতেই থাকবে।দেশ আসলে কে শাসন করবে? কে পারবে এই অন্ধকার সামরিক শাসনের আসল শক্তিটাকে কাজে লাগাতে?যখন জেনারেলরা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন  এবং তাদের ভয়ানক উপস্থিতি সাধারণ মানুষের জীবনকে লন্ডভন্ড করে দেয়,তখন কেউ কী ভাবতে পারে যে ডঃ মালিক এবং তার মন্ত্রীসভা কেবলমাত্র জেনারেলদের হাতের কয়েদী? তারা ও অন্যদের মতই জেনারেলদের হাতের পুতুল হবেন।

        এমনকি ইয়াহিয়ার একান্ত অনুগত ভুট্টো ও ‘সে(ডঃ মালিক) নিজেকে ছাড়া আর কী উপস্থাপন করে?’ বলার মাধ্যমে ডঃ মালিককে নিয়োগ দেওয়ার কড়া সমালোচনা করেন।যদি পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য ও একই  ব্যবস্থা করা হয় তাহলে ভুট্টোর পশ্চিম পাকিস্তান শাসন করার স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে।সন্দেহাতীত ভাবেই ভুট্টোর মত একজন ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদ মালিকের নিয়োগের মাঝে বেসামরিক নিয়মের মৃত্যু দেখেছিলেন।    

 পৃথিবীকে বোকা বানানোর চেষ্টায় থাকা ইয়াহিয়া খান শুধুমাত্র নিজেকে এবং গত সাধারণ নির্বাচনে (ডিসেম্বর ১৯৭০) বাংলাদেশীদের দ্বারা নাকচ হওয়া তার কিছু সহযোগীদেরকে ছাড়া আর কাউকেই বোকা বানাতে পারেননি।কোন বাঙ্গালীই ভাবতে উদ্যত হবে না যে এই পরিকল্পনাটি সামরিক শাসন তুলে নেওয়ার দিকে একটি ভেজালবিহীন পদক্ষেপ।এতে কোন সন্দেহ নেই যে ইয়াহিয়া খানের বাহিনীর শেষ সৈন্যটির মৃত্যু নিশ্চিত না করা পর্যন্ত গেরিলা বাহিনী লড়াই চালিয়ে যাবে।গেরিলারা নিজেদেরকে এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করে নিয়েছে।ইয়াহিয়া খানের সহযোগীদেরকে গেরিলারা সবচেয়ে উপযুক্ত শাস্তিটাই দিবে।বাঙ্গালিরা এবং গেরিলা বাহিনী তাদের সহযোগীদের  মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ের হাস্যকর তালিকার পুরোটাই জানে যা ক্রমেই অন্যায় এবং অজনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠছে।ইয়াহিয়ার হাতের পুতুলরা দপ্তরে আসবে, যাবে কিন্তু তাদের ভাগ্যে বাংলাদেশের সাড়ে সাত লক্ষ মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়া নেই।

      যাই হোক,বেসামরিক শাসন কায়েমে ইয়াহিয়ার ব্যর্থতা হলো অর্থনৈতিক সমস্যা।তিনি এখন চরম অর্থনৈতিক মন্দার মুখোমুখি হচ্ছেন। বিদেশী সাহয্যের জন্য ইয়াহিয়ার আবেদন এর মধ্যে দুইবার নাকচ করা হয়েছে।তৃতীয় সাক্ষাতের সময় ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে এবং এইবার ইয়াহিয়ার দ্বারা তার ভিক্ষার থালা পুরোপুরিভাবে খালি নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।সাহয্যের পুনরায় আবেদন করতে হলে  বেশ কিছু তথ্য প্রমাণ লাগবে যা পর্দার পেছনে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা বর্ণনা করবে। এই প্রমাণের জন্য ইয়াহিয়া খানকে সাহায্যকারী দেশগুলো বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র প্রচুর চাপ দিচ্ছে।ইয়াহিয়া যা করে আসছিলেন তা কেবলমাত্র সাহায্যকারী দেশগুলোকে খুশি করার জন্য একধরনের ধোঁকা ছাড়া আর কিছুই নয়।

        যদি এখন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোন দেশ পাকিস্তানকে সাহায্য করে,তাহলে বাঙ্গালীরা একে একধরনের পরিত্যাগই ভাববে।এতে কারো কোন সন্দেহ নেই যে এই সাহায্য বাংলাদেশে অবস্থানকারী পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্য বাহিনীর ভরণ পোষণের জন্য ব্যবহৃত হবে।গত বিশ বছরের ও বেশী সময় ধরে সামরিক এবং অর্থনৈতিক সাহায্য প্রদানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে তার একটি অস্ত্রাগার এবং পাকিস্তানী সৈন্যবাহিনীকে সাম্যবাদ বিরোধী হিসেবে গড়ে তুলেছে।যখন আমেরিকান প্রশাসন নির্বিচারে বাঙ্গালী হত্যা থেকে তাদের সাম্যবাদ বিরোধীদের বিরত রাখতে পারেনি,তখন আমেরিকা ইয়াহিয়া খানের ঘৃণ্য কাজকর্মের সঙ্গী হয়।পৃথিবী আশা করেছিল আমেরিকা এই যুদ্ধ বন্ধের মাধ্যমে তাদের নৈতিক দায়িত্ব পালন করবে।তারা এইক্ষেত্রে পুরোপুরি ভাবে অসফল।ইয়াহিয়ার জান্তাকে পুনরায় সাহয্য করার মাধ্যমে তারা তাদের দায়িত্বকে চরম ভাবে পরিত্যাগ করার পাশাপাশি তারা পৃথিবীর এই অংশটার গণতন্ত্রের দাফনের কাজটির অর্থায়ন ও করে দিয়েছে।