১৪১. ১৪ সেপ্টেম্বর সম্পাদকীয়ঃ দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে বাংলাদেশ

Posted on Posted in 6

নোবেল

<৬,১৪১,২৩০-২৩১>

সংবাদপত্রঃ বাংলার বাণী মুজিব নগরঃ ৩য় সংখ্যা

তারিখঃ ১৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

সম্পাদকীয়

 

[বাংলার বাণীঃ সাপ্তাহিক। সম্পাদকঃ আমির হোসেন। মুজিবনগর হতে আমির হোসেন কর্তৃক বাংলার বাণী প্রেসে মুদ্রিত এবং প্রকাশিত।]

দূর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে বাংলাদেশ

দুর্ভাগা বাংলার শত্রুকবলিত এলাকাসমূহে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ শুরু হইয়াছে। বাংলাদেশের ১২টি জেলার বিস্তির্ণ এলাকা জুড়িয়া ভয়াল দূর্ভিক্ষের মরণ- ছোবলে ইতিমধ্যেই ১৯১টি মানব জীবন মৃত্যুর অতলান্তে হারাইয়া গিয়াছে। ঘরে ঘরে উঠিয়াছে অন্নহীন উপায়হীন বুভুক্ষ মানুষের মরণার্তি। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা আড়িয়ালখার তীরে তীরে বাতাসে বাতাসে ভাসিয়া বেড়াইতেছে দুঃসহ ক্ষুধার জ্বালায় জর্জরিত অগণিত নরনারী শিশুর সকরুণ আর্তনাদঃ বাঁচাও।

 

বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুসারে, যে ১২টি জেলায় সর্বনাশা দুর্ভিক্ষ সমস্ত হিংস্রতা লইয়া মারণনৃত্যে মাতিয়া উঠিয়াছে সেই জেলাগুলি হইতেছে ঢাকা, কুমিল্লা, সিলেট, দিনাজপুর, রংপুর, পাবনা, বরিশাল, নোয়াখালী, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, যশোর ও খুলনা। দুর্ভিক্ষ পীড়িত এলাকাসমূহে প্রতিদিন অবস্থার অবনতি ঘটিতেছে। প্রতিদিন অগণিত মানুষ অনাহারে তিলে তিলে ধুঁকিয়া ধুঁকিয়া মরিতেছে। অধিকৃত এলাকা সফর শেষে হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের ডাঃ জন রোড বলিয়াছেন, ‘বাংলাদেশে ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের পর বর্তমানে যে ধরনের খাদ্যাভাব দেখা দিয়াছে এরূপ সাংঘাতিক অবস্থা আর কখনো দেখা যায় নাই। কম করিয়া ধরিলেও প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ আসন্ন দুর্ভিক্ষের সময়ে অনাহারে মৃত্যুবরণ করিতে বাধ্য হইবে।

 

ইহার চাইতে উদ্দেগজনক খবর, ইহার চাইতে ভয়াবহ অবস্থা আর কি হইতে পারে? জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞদের রিপোর্ট অনুসারে পৃথিবীতে যত রকমের দুঃখ আছে তারমধ্যে সব চাইতে মর্মান্তিক, সব চাইতে দুঃসহ হইতেছে অনাহারে থাকার দুঃখ, অফুরন্ত ঐশর্যে ভরা এই পৃথিবীতে ক্ষুধার যন্ত্রণায় পুড়িয়া তিলে তিলে ছাই হওয়ার দুঃখ। আর এই দুঃখ আজ যুদ্ধবিক্ষত বাংলার মানুষকে আষ্টেপৃষ্টে গ্রাস করিয়া লইয়াছে। বাংগালী জঙ্গীশাহীর গুলি খাইয়া মরিতেছে,রোগে ব্যাধিতে মরিতেছে অনাহারে- বুভুক্ষার সুতীব্র দংশনের দুঃসহ যন্ত্রণায়।

 

কিন্তু কেন? এই বাংলা ছিল সোনার বাংলা। একদিন বাংলাদেশ ছিল অফুরন্ত ঐশ্বর্যের ভাণ্ডার। সেদিন বাংলার মাটি ছিল স্বর্ণপ্রসবিনী। বাংলার সেই স্বর্ণযুগে বাঙ্গালীর ঘরে ঘরে গোলাভরা ধান ছিল, গোয়ালভরা গরু ছিল, পুকুরভরা মাছ ছিল, দিগন্ত বিস্তৃত প্রান্তর ভরিয়া ছিল সোনালী ফসলের সোনার সম্পদ। সেদিন বাংলার দশদিগন্তে ছড়াইয়া ছিল সুখ আর তৃপ্তির মুঠো মুঠো সোনা। বাংলার মানুষ সেদিন নদীর বাঁকে, চাষের ক্ষেত্রে। খালে বিলে গলা ছাড়িয়া গান গাহিত, প্রাণ খুলিয়া হাসিত, জীবনকে অভিনন্দন জানাইতে পারিত আত্মার অন্ত্রঙ্গতম অনুভূতির ঐশ্বর্যে।

 

কিন্তু সোনার বাংলার সেই সোনার দিনগুলি কবে কোথায় হারাইয়া গিয়াছে। বাংলার সোনার সম্পদই তার কাল হইয়াছে। এই সম্পদের লোভেই বার বার বাংলার শ্যামল উপকূলে হানা দিয়াছে সম্পদলোভী ঠগ, বর্গী, পর্তুগীজ ওলন্দাজ, ইংরেজ দস্যু দল। জননী জন্মভূমির বুক চিরিয়া চিরিয়া কাড়িয়া নিয়াছে সোনালী সম্পদ। সর্ব শেষ আসিয়াছে পাঞ্জাবী লুটেরা দস্যুর দল। তুলনাহীন নিষ্ঠুরতায় তারা কামড়াইয়া ছিড়িয়া খাইয়াছে বাংগালীর হাড় মাংস কলিজা, দুই হাতে লুটিয়া নিয়াছে বাংলার সর্বস্ব। এই সম্পদলোভী দস্যুদানবের দল বাংলাকে ব্যাবহার করেছে কলোনী হিসেবে, পণ্য বিক্রয়ের অবাধ মুনাফা লুটিবার খোলা বাজার হিসেবে। আর এভাবেই তারা একদিনের সোনার বাংলাকে পরিণত করিয়াছে এক অন্তহীন দুঃখের ভাগাড়ে। লুটেরা দস্যুদের সাথে যোগ দিয়েছে ঝড় বন্যা প্লাবন। প্রকৃতি দানব সর্বাত্মক হিংস্রতা লইয়া বার বার ছোবল হানিয়াছে বাংলার বুকে, ছিড়িয়া ফাড়িয়া তছনছ করিয়াছে বাংলার মাটি, মানুষ আর অর্থনীতি। দিনে দিনে বাঙ্গালীদের অবস্থার ক্রমশঃ অবনতি ঘটিয়াছে। ক্ষুধা, দারিদ্র, অনটন আর দুর্ভোগ তাদের ললাটে জাঁকিয়া বসিয়াছে দুরপনেয় কলঙ্ক চিহ্ন হইয়া।

 

বাংলাদেশকে একদিন বলা হইত প্রাচ্যের শস্য ভাণ্ডার। কিন্তু এই শস্যভান্ডার একদিন পরিণত হইয়াছে ক্রমাবনতিশীল শস্য ঘাটতির দেশে। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে খাদ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল মুটামুটিভাবে বার্ষিক ১২ লক্ষ টন। বিশেষজ্ঞদের মতে, অত্যন্ত জরুরী ভিত্তিতে কমপক্ষে ২৯ লক্ষ টন খাদ্যশস্য আমদানী এবং সঙ্গে সঙ্গে জনগণের মধ্যে বিতরণের ব্যাবস্থা করিতে না পারিলে বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধের কোন আশা নাই। বলা বাহুল্য, ইহা এক অসম্ভব ব্যাপার। কারণ জঙ্গীশাহী বাংলার মানুষকে মারিতে চায়, তাদের বাঁচাইয়া রাখার জন্য কসাইদের কোন গরজ নাই। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধকল্পে ১৫ টি বা তারও বেশি সি ৩০ পরিবহণ বিমানযোগে সেখানে খাদ্যশস্য নিক্ষেপের জন্য প্রস্তুত রহিয়াছে বলিয়া জানাইয়াছে।

দুর্গত মানবতার সেবাই যদি এই প্রস্তাবের লক্ষ্য হয়, তবে ইয়া একটি মহান প্রস্তাব একথা স্বীকার করিতে আমাদের দ্বিধা নাই। কিন্তু একটা প্রশ্ন আছে। কাহার হাতে এই খাদ্যশস্য দেওয়া হইবে, কাহার মাধ্যমে ইহা বিতরণ করা হইবে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সমগ্র পৃথিবীকে আমরা বলিয়া দিতে চাই, ইয়াহিয়ার জঙ্গীশাহীর হাতে খাদ্যশস্য তুলিয়া দেওয়ার অর্থ হইবে বাঙ্গালীদের খুন করার জন্য আর কিছু বুলেট সরবরাহ করা। কারণ, এই খাদ্য সাহায্য সে নিশ্চিতভাবে বাঙ্গালীদের দাবাইয়া রাখার সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যাবহার করিবে। অতীত অভিজ্ঞতা নির্ভুল ভাবে এই কথাই প্রমাণ করিয়াছে। তাই বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের আবেদন, বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ পীড়িত মানুষকে বাঁচাইবার জন্য সাহায্য সামগ্রী লইয়া আগাইয়া আসুন। মানবতার নামেই আমরা আবেদন করিতেছি ক্ষুধার্থ বাঙ্গালীদের মুখে অন্ন তুলিয়া দিন। কিন্তু এ সাহায্য সামগ্রী যেন কোনমতেই ইয়াহিয়ার হাতে না যায়। যে কোন সাহায্য দ্রব্য পৌঁছাইতে হইবে স্বাধীন বাংলা সরকারের হাতে। কারণ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সরকারই বাংলাদেশের একমাত্র বৈধ সরকার। আর এই সরকারই বাংলার এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মোকাবিলা করিতে আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হইবেন বলিয়া আশা করা যায়। যদি কেহ পাকিস্তান সরকারের হাতে খাদ্যসামগ্রী তুলিয়া দেন, আমরা ধরিয়া নিব বুভুক্ষ মানুষকে খাদ্য সরবরাহের না ভাঙ্গাইয়া তাহারা ধনীদের হাতে বাঙালী নিধনের হাতিয়ারই তুলিয়া দিতেছেন। সংশ্লিষ্ট সকলকে এই স্পষ্টভাবে মনে রাখিতে হইবে।