১৪৮. ২১ সেপ্টেম্বর বাঙালী কূটনীতিকদের আনুগত্য বদল অব্যাহত

Posted on Posted in 6

দীপংকর ঘোষ দ্বীপ

<৬,১৪৮,২৪১-২৪২>

সংবাদপত্রঃ বাংলার বাণী মুজিব নগরঃ ৪র্থ সংখ্যা

তারিখঃ ২১ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

                              ইয়াহিয়ার মুখে লাথি মারিয়া

                           বাঙ্গালী কূটনীতিবিদদের আনুগত্য বদল অব্যাহত

                                  ( কূটনৈতিক সংবাদদাতা )

       বাংলাদেশে জঙ্গীশাহীর বর্বরতম গণহত্যার প্রতিবাদে ইসলামাবাদের বিদেশস্থ দূতাবাসের আরও একজন বাঙ্গালী কূটনীতিবিদ গত ১৩ই সেপ্টেম্বর জঙ্গীশাহীর চাকুরীতে ইস্তফা দিয়া লন্ডনস্থ বাংলাদেশ মিশনে যোগদান করেন । তিনি হইতেছেন জনাব মহিউদ্দিন জোয়ারদার ।

       জনাব মহিউদ্দিন লাগোস এবং নাইজেরিয়াস্থ ইসলামাবাদ মিশনের চেন্সারী প্রধান ছিলেন এবং কখনও কখনও অস্থায়ী হাইকমিশনার হিসাবে কাজ করিতেন ।

       একই দিনে ম্যানিলাস্থ ইসলামাবাদ দূতাবাসের প্রধান জনাব খুররম খান পন্নী ইসলামাবাদ জঙ্গীশাহীর সহিত তাঁহার সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন ।

       গত বৎসর মার্চ মাসে তিনি রাষ্ট্রদূত হিসাবে ম্যানিলা গমন করেন । তাঁহার পদত্যাগের পূর্বে হংকংস্থ ইসলামাবাদ মিশনের প্রধান জনাব মহসীন আলী বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন ।

       বাংলাদেশের সমর্থনে এ পর্যন্ত বিদেশস্থ ইসলামাবাদ কূটনৈতিক মিশনসমূহের ৪০ জন কূটনীতিবিদ ইসলামাবাদের সহিত তাঁহাদের সম্পর্ক ছিন্ন করিলেন ।

       জনাব পন্নীর পদত্যাগের কারণ সম্পর্কে  আনু্ষ্ঠানিকভাবে তিনি এখনও কিছু বলেন নাই । অপর একটি সূত্র হইতে জানা যায়, সম্প্রতি ইসলামাবাদ কর্তৃপক্ষ তাঁহাকে ইসলামাবাদে ফিরিয়া যাওয়ার জন্য বার্তা পাঠাইয়াছিল ।

       জনাব পন্নীর পদত্যাগের পর এখন কেবল পিকিংযেই ইসলামাবাদ জঙ্গীশাহীর বাঙ্গালী কূটনীতিবিদ অবশিষ্ট রইল । পিকিংস্থ ইসলামাবাদ দূতাবাসের এই বাঙ্গালী কূটনীতিবিদ হইতেছেন জনাব কায়সার । জানা যায়, তিনিও ইসলামাবাদ জঙ্গীশাহীর কোপদৃষ্টিতে আছেন । কারণ, ইয়াহিয়ার বাংলাদেশ নীতির প্রতি পিকিং সরকারের সমর্থনের ফলে বাঙ্গালী কূটনীতিবিদ জনাব কায়সার খুবই অসুবিধায় পড়িয়াছেন । তিনি আর নিজেকে পিকিংয়ের সহিত খাপ খাওয়াইতে পারিতেছেন না ।

       প্রকাশ, ইতিমধ্যেই তাঁহার গতিবিধির উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হইয়াছে । জনাব কায়সারকে হংকং যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হইতেছে না ।

       জনাব পন্নীর পদত্যাগের আভাস পূর্বেই পাওয়া যায় । সম্প্রতি ম্যানিলায় প্রেসিডেন্ট ফার্ডিন্যাণ্ড মারকোসের নিকট হইতে একটি পদক গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভাষণদানকালে জনাব পন্নী ইচ্ছাকৃতভাবেই পাকিস্তান সরকার কথাটি একবারও উচ্চারণ করেন নাই ।

       জনাব পন্নী ম্যানিলায় বাংলাদেশ মিশন স্থাপন করিয়া তথায় বাংলাদেশের স্বীকৃতির জন্য কাজ চালাইয়া যাইবেন ।

 

       ১৪ই সেপ্টেম্বর বিবিসি-এর এক খবরে বলা হয়, ওয়াশিংটনস্থ ইসলামাবাদ মিশনের আরও কয়েকজন বাঙ্গালী কূটনীতিবিদ বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছেন । অবশ্য বিবিসি এইসব বাঙ্গালী কূটনীতিবিদদের নাম বা পদবী ঘোষণা করেন নাই ।

       এদিকে বাংলাদেশ সরকার ইসলামাবাদের যে সমস্ত বিদেশী দূতাবাসে এখনও বাঙ্গালী কূটনীতিবিদ রহিয়াছেন, তাহাদের প্রতি আগামী এক পক্ষকালের মধ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের জন্য নির্দেশ দান করিয়াছেন । উক্ত নির্দেশে আরও বলা হইয়াছে যে, যে সকল বাঙ্গালী কূটনীতিবিদ আগামী এক পক্ষকালের মধ্যে বিদেশী হানাদার ইসলামাবাদ সরকারের সহিত সম্পর্ক ছিন্ন করিয়া বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে ব্যর্থ হইবেন, তাঁহারা দেশদ্রোহী বলিয়া পরিগনিত হইবেন ।

       গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের এই গোপন নির্দেশ ইতিমধ্যেই ইসলামাবাদের বিদেশস্থ কূটনৈতিক মিশনের বাঙ্গালী কূটনীতিবিদদের নিকট পৌঁছিয়াছে । এই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে লণ্ডন, ওয়াশিংটন এবং ম্যানিলাস্থ ইসলামাবাদ দূতাবাসের বাঙ্গালী কূটনীতিবিদগণ জঙ্গীশাহীর চাকুরী ইস্তফা দিয়া বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন ।

       জনাব কায়সার এবং সিরিয়ার ইসলামাবাদের বাঙ্গালী দূত জনাব হুমায়ুন পন্নী ইয়ালামাবাদ চক্রের সহিত সম্পর্ক ছিন্নের সুযোগের অপেক্ষায় রহিয়াছেন ।

       এদিকে ইরানে নিযুক্ত ইসলামাবাদের সাবেক বাঙ্গালী রাষ্ট্রদূত জনাব ফতেহ ইসলামাবাদের অর্থ আত্মসাৎ করিয়াছেন বলিয়া যে মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করা হইয়াছে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খোন্দকার মুশতাক ইহার তীব্র নিন্দা করিয়াছেন । তিনি ইসলামাবাদ চক্রের এই জঘন্য মিথ্যা অভিযোগে বিস্ময় প্রকাশ করেন ।

       পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জনাব ফতেহ ইসলামাবাদের অর্থ লইয়া আসিয়া বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশই কেবল পালন করিয়াছেন এবং বাংলাদেশের ন্যায্য প্রাপ্য যথাসময়ে বাংলাদেশের পক্ষ হইতে আদায় করিয়া লইয়াছেন ।

       তিনি আরও বলেন, উক্ত অর্থ এখন স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তহবিলে জমা হইয়াছে এবং উহা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ব্যয়িত হইবে ।