১৫২. ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম ও বিশ্ব রাজনীতি

Posted on Posted in 6

এফ এম খান

<৬,১৫২,২৪৮-২৫০>

সংবাদপত্রঃ বাংলার বাণী মুজিব নগরঃ ৫ম সংখ্যা

তারিখঃ ২৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১

.

পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে

বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও বিশ্বরাজনীতি

বাংলাদেশের দখলীভূত এলাকা থেকে জবর খবর এসেছে। তাঁবেদার লাট মল্লিকের একজন পেয়ারা মন্ত্রীকে মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা ইউনিট হাতবোমা মেরে পঙ্গু করে দিয়েছে।অধিকৃত ঢাকা বেতার কেন্দ্রের খবরে স্বীকার করা হয়েছে,মন্ত্রীবর্গের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এই খবর লেখার সময় পর্যন্ত জানা গেছে দালাল মন্ত্রী সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালে রয়েছে।

.

               ডাঃ মালিক ওরফে মল্লিকের রসজ্ঞান খুব টনটনে। সম্ভবতঃ শৈশবে এই দাতের ডাক্তার হারাধনের দশটি ছেলের ছড়া পাঠ করেছিলেন। তাই বেছে বেছে তার দালাল মন্ত্রীসভার দশটি দালাল গ্রহণ করেছে।এই দশ দালালের অবস্থা যে কার্যক্রমে হারাধনের দশ ছেলের মত হবে,এ বিষয়ে বাংলাদেশের একজন বালকের মনেও আজ কোন সন্দেহ নেই।হারাধনের দশ ছেলের ছড়ায় আছে।

               ‘হারাধনের দশটি ছেলে

                        ঘোরে বনময়

            একটি গেল বাঘের পেটে

                  রইলো বাকি নয়’।

মুক্তিযোদ্ধারা এই ছড়াটিকেই একটু ঘুরিয়ে এখন বলতে পারেন,

                    মালিক মিয়ার দশটি দালাল

                           ঘোরে ঢাকাময়

                 একটি গেল গ্রেনেড খেয়ে

                     রইলো বাকি নয়।

বাকি নয়টি আস্তে আস্তে যাবে।মীরজাফরের নিমক  হারামের দেউরির মত তাদের বংশে বাতি দিতে কেউ থাকবেনা। এটা ইতিহাসের আমোঘ বিধান।

.

            এবার মুক্তিযুদ্ধের খবর কিছু বলি।একটি বিদেশী সংবাদ সংস্থা খবর দিয়াছেন, যশোরে দত্ত কবি মাইকেলের স্মৃতিপূত সাগরদাঁড়ি এখন মুক্ত এলাকা।সেখানে মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীন বাংলাদেশের  প্রশাসন ব্যাবস্থা গড়ে তুলেছেন। খুলনার সুন্দরবন এলাকায় একটি হানাদার ঘাঁটিতে আক্রমণ চালিয়ে মুক্তি সংগ্রামীরা একশোর মত হানাদার দস্যু খতম করেছেন। রংপুরের চাষারহাট ও পাটগ্রামে  উড়ছে স্বাধীন বাংলার পাতাকা।বিদেশী সংবাদপত্রের খবর প্রকাশ, বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ ভ্রাতা শেখ আবু নাসের সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন,সাম্প্রতি খুলনা বন্দরে ১২ হাজার টনের একটি জাহাজ ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে।মুক্তি সংগ্রামীরা চট্রগ্রাম বন্দরে আরো ১৮ টি জাহাজ ডুবিয়েছে।

.

অসামরিক প্রশাসন ও পুনর্বাসন

একদিকে দেশকে হানাদার বাহিনীর কব্জা মুক্ত করার জন্য মরণপণ সংগ্রাম,সেই সঙ্গে অন্যদিকে চলছে মুক্ত এলাকার স্বাধীন বাংলাদেশের অসামরিক প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং ভারত থেকে শরণার্থী দের ফিরিয়ে নিয়ে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা। বঙ্গবন্ধুর ভ্রাতা প্রকাশ করেছেন, মিত্ররাষ্ট্র হিসাবে ভারত সরকার যদি চার মাসের খাদ্যের ব্যবস্থা করেন,তাহলে বাংলাদেশ সরকার এখনিই অন্ততঃ১৫ হাজার শরণার্থীকে মুক্ত এলাকায় ফিরিয়ে নিয়ে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবেন।সাম্প্রতি জনৈক বিদেশী সাংবাদিক ভারতের মেঘালয় রাজ্যে অবস্থিত একটি শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের সময় শরণার্থিদের জিজ্ঞাসা করেন,তারা দেশে ফিরতে প্রস্তুত কি না? শরণার্থিরা একবাক্যে জবাব দেন,একমাত্র বঙ্গবন্ধু আহবান জানালে তারা দেশে ফিরতে পারেন।নইলে ইয়াহিয়া কিম্বা তার কোন তাবেদারকে তারা বিশ্বাস করতে রাজী নন।

.

               ঢাকা এখন মুক্ত এলাকা হতে পারে

পূর্ব রণাঙ্গনে যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের জনৈক কমান্ডার এক ঘরোয়া সাংবাদিক সাক্ষাৎকারে প্রকাশ করেছেন,বর্তমান মুক্তি সংগ্রামীদের শক্তি দক্ষতা এতটা বেড়েছে যে,তারা ইচ্ছা করলে আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে কুমিল্লা থেকে শুরু করে ঢাকা পর্যন্ত সাত দিনে মুক্ত করতে পারেন।কিন্তু তারা আশঙ্কা করেন,তাদের এই আকস্মিক হামলায় দখলীকৃত এলাকায় বহু বাঙালী ভাইবোনও ধ্বংস হতে পারেন।তাই তারা ভ্রাতৃরক্তপাত পরিহারের উপায় উদ্ভাবনে ব্যস্ত রয়েছেন। অন্যদিকে হানাদার বাহিনীর শক্তিশালী বিমান বহর থাকায় তাদের পক্ষে কুমিল্লা বা ঢাকা হাতছাড়া হওয়ার পরও সেখানে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করা সম্ভব হবে।যেমন সম্ভব হয়েছে মার্কিনীদের পক্ষে ভিয়েতকংদের হাতে পরাজিত হওয়ার পরও ভিয়েতনামে বিমান হামলা চালিয়ে বিপুলভাবে জীবন ও সম্পদত্তির ক্ষয়ক্ষতি করা।মুক্তিযোদ্ধারা তাই বিশ্বের অন্ততঃ কয়েকটি বন্ধুরাষ্টের কাছ থেকে স্বাধীন বাংলার স্বীকৃতির অপেক্ষা করছেন।এই স্বীকৃতি লাভের সঙ্গে সঙ্গে বিমানসহ আধুনিক সমরাস্ত্র সংগ্রহ যেমন সহজ হবে, তেমনি বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সাফল্যও অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে।

.

         আরব বিশ্বের হাওয়া বদল

বিশ্বের ছয়টি মহাদেশের ২৫টি দেশের ৬৫ জন প্রতিনিধি নয়াদিল্লীতে আয়োজিত বাংলাদেশ সম্প্রর্কিত বিশ্ব সম্মেলনে যোগদান করেছিলেন, এ খবর ‘বাংলার বাণী’পাঠকদের আগেই জানানো হয়েছে।এই সম্মেলনে যোগদানকারী কায়রোর ‘আল আহরাম’ পত্রিকার সম্পাদকীয় বোর্ডের একজন বিশিষ্ট সদস্য বলেছেন,বাংলাদেশ সম্পর্কে ইয়াহিয়া সরকার আরব দেশগুলোতে সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালিয়েছে এবং আরবদের মনে বাঙালীদের বিরুদ্ধে জাতিবিদ্বেষ সৃষ্টির চেষ্টা করেছে।কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে, ততই আরব জনগণ বুঝতে পারছেন, বাংলাদেশ সমস্যার একমাত্র সমাধান ১৯৭০ সালের ডিসেম্বর মাসের নির্বাচনে বিজয়ী দল আওয়ামীলীগ ও তার অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্যে নিহিত রয়েছে।

.

        সিরিয়ার এক সাংবাদিক স্পষ্ট ভাষাতেই বলেছেন,আমরা সিরিয়বাসীরা আঞ্চলিক দাবী-দাওয়ার ভিত্তিতে এক সময় যুক্ত আরব প্রজাতন্ত্রের অঙ্গদেশ মিশর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছি।সিরিয়া ও মিশরের জনগণ একই ভাষাভাষী এবং একই ধর্মের বন্ধনে আবদ্ধ।এ সত্ত্বেও মিশর থেকে সিরিয়ার বিচ্ছিন্নতায়  যদি ইসলাম ধর্ম বিপন্ন না হয়ে থাকে তাহলে পাকিস্তান থেকে দুই হাজার মাইল দূরে অবস্থিত ভিন্ন ভাষাভাষী বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেলে ইসলাম বিপন্ন হয় কি করে?

.

              আরব দেশীয় সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের এসব মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে  কায়রো,বৈরুত, দামাস্কাস প্রভৃতি প্রধান আরব রাজধানীর রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেছেন,বাংলাদেশের সমস্যা সম্পর্কে আরব জনগণ ক্রমশঃই সজাগ হয়ে উঠেছেন, এবং ইয়াহিয়া চক্রের স্বরূপ তাদের কাছে ধরা পড়ে যাচ্ছে।

.

 জাতিসংঘ কি করবে?

.

গত ২১শে সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের যে ২৬ তম অধিবেশন শুরু হয়েছে, তাতে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ উঠবে,অথবা বাংলার বাণীর এ সংখ্যা প্রকাশের আগেই উঠে গেছে এমন সম্ভাবনা রয়েছে।সম্মেলনের সভাপতি ইন্দোনেশিয়ার সামরিক জান্তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডাঃ আদম মালিক-যতই অনীহার ভাব দেখান সোভিয়েত ইউনিয়ন, কানাডা,যুগোশ্লাভিয়া প্রভৃতি দেশ দৃঢ়ভাবে বাংলাদেশে সমস্যার কথা পরিষদের অধিবেশনে বলবেন এমন একটা আস্থার ভাব পরিষদীয় লবীতেও নাকি দেখা যাচ্ছে। জাতিসংঘের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিষদের বৈঠকেও বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি উঠবে।বিশ্বময় এই ধিক্কার ধ্বনির মধ্যে ইয়াহিয়া চক্র এখন কানকাটা কুকুরের ভূমিকা গ্রহণ করেছে।জাতিসংঘের সমর্থন লাভের আশায় তারা ধর্ণা দিয়েছে রাজতন্ত্রী মরক্কো সরকারের দরবারে।

.

           জাতিসংঘ বাংলাদেশ সমস্যায় উল্লেখযোগ্য কিছু করবেন অথবা করতে পারবেন,এমন আশা বাংলাদেশের মানুষ করে না।ভিয়েতনাম, এঙ্গোলা, মোজাম্বিক, বায়াফ্রা সমস্যায় নিষ্ক্রীয় ও নৈরাশ্যজনক ভূমিকা বিশ্বের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে।সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালী নর-নারী তাই মনে করে,তাদের সমস্যার ফলপ্রসূ সমাধান হবে রণাঙ্গনে জাতিসংঘের বিতর্ক সভায় নয়।