১৫৮. ১২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনার মাধ্যমেই রাজনৈতিক সমাধান হতে পারে

Posted on Posted in 6

শফিকুল ইসলাম

<৬,১৫৮,২৬৫-২৬৭>

শিরোনামসংবাদপত্রতারিখ
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই রাজনৈতিক সমাধান হতে পারেবাংলার বানী

মুজিব নগরঃ ৭ম সংখ্যা

১২ অক্টোবর, ১৯৭১

 

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই রাজনৈতিক সমাধান হতে পারে
লন্ডনে শ্রমিকদলের সম্মেলনে শেখ মুজিবরের মুক্তি দাবী
জল্লাদী বর্বরতার বিরুদ্ধে বিশ্ব বিবেকের সুতীব্র ধিক্কার
(বৈদেশিক বার্তা পরিবেশক)

বৃটেনের শ্রমিক দলীয় জাতীয় কর্ম পরিষদ বাংলাদেশের জনগণের অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করিয়াছে এবং জাতিসংঘকে এই ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করিবার জন্য আহ্বান জানাইয়াছে। বাংলাদেশের নিরস্ত্র জনসাধারণের উপর সামরিক হামলা চালাইবার জন্য পাকিস্তানকে নিন্দা করিবার জন্য শ্রমিক দল আহ্বান জানাইয়াছে।

জাতীয় কর্মপরিষদের নামে প্রচারিত বিবৃতিতে বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছা এবং গ্রহনযোগ্য রাজনৈতিক সমাধানের জন্য জাতিসংঘকে সরাসরি হস্তক্ষেপ করিবার অনুরোধ করা হইয়াছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হইয়াছে যে এই রাজনৈতিক সমাধান আসিতে পারে বাংলাদেশের নেতা শেখ মুজিবর রহমানের মুক্তি ও তাঁহার সহিত আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে।

ইংল্যান্ডের ব্রাইটনে অনুষ্ঠিত শ্রমিক দলের বার্ষিক সম্মেলন পাকিস্তানী জঙ্গীশাহীর বিরুদ্ধে তীব্র ধিক্কারে সোচ্চার হইয়া উঠিয়াছে। সম্মেলনের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের মানুষের মর্মান্তিক বিপর্যয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করিয়াছেন।

এই সম্মেলনে শ্রমিক দলের প্রাক্তন মন্ত্রী মিসেস জুডিথ হার্ট দলের জাতীয় কার্যনির্বাহক কমিটির পক্ষ হইতে যে বিবৃতি পেশ করিয়াছেন তাহাতে বাংলাদেশের জনসাধারণের দ্বারা গণতন্ত্রসম্মত ভাবে নির্বাচিত নেতাদের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহারের তীব্র নিন্দা করা হইয়াছে।

এই বিবৃতিতে বাংলাদেশ সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বের সকল সাহায্যকারী রাষ্ট্রকে মানবিক জরুরী সাহায্য দান ছাড়া অন্য সকল প্রকার সাহায্য পাঠানো বন্ধ করিতে আহ্বান জানানো হইয়াছে।

বিবৃতিতে বাংলাদেশে অবিলম্বে পাক-সামরিক উৎপীড়নের অবসান এবং রাজনৈতিক নেতাদের বিশেষ করিয়া শেখ মুজিবের মুক্তির দাবী জানানো হইয়াছে।

বিবৃতিটি পেশ কালে মিসেস হার্ট বলিয়াছেন যে বাংলাদেশের এই ঘটনায় সারা এশিয়া মহাদেশে ভয়ঙ্কর বিপদের সূচনা করিয়াছে।

এই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন প্রাক্তন মন্ত্রী মিঃ পিটার শোর। লন্ডনের বাংলাদেশ মিশনের প্রধান বিচারপতি জনাব আবু সাঈদ চৌধুরী সম্মেলনে বক্তৃতা করেন। সম্মেলনে মিঃ জন স্টোনহাউজ, মিঃ ব্রিস ডগলাসম্যান সহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক স্বাস্থ বিভাগের চেয়ারম্যান ডঃ কার্ল টেলর বলিয়াছেন মার্কিন সরকার পাকিস্তানকে অব্যাহত ভাবে অস্ত্রশস্ত্র দান করিয়া বাংলাদেশ সঙ্কটকে ঘোলাটে করিয়া তুলিয়াছে।

ওয়াশিংটন সিনেটের বৈদেশিক সাবকমিটির বৈঠকে ডঃ টেলর বলিয়াছেন ‘পাকিস্তানে অস্ত্র বোঝাই জাহাজ পাঠানোর উপর নিষেধাজ্ঞা জারী হইবার পর তুরস্কের মাধ্যমে পাকিস্তানে মার্কিন অস্ত্র সাহায্য অব্যাহত রাখিয়া মার্কিন সরকার একটি খুবই গর্হিত অপরাধ করিতেছে।

ডঃ টেলর আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছেন আগামী মাসে বাংলাদেশের প্রায় আড়াই কোটি মানুষ অনাহারের কবলে পড়িবেন। এবং নতুন করিয়া শরণার্থী স্রোত আসিতে থাকিবে। তিনি বলেন শেষ পর্যন্ত শরণার্থীর সংখ্যা হয়তো দেড় কোটিতে পৌঁছাইবে। এই সংখ্যা দক্ষিন ভিয়েত্নামের মোট জনসংখ্যার প্রায় সমান।

গত বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রসংঘে সাধারণ পরিষদের নেপালের স্থায়ী প্রতিনিধি মিঃ পদ্মবাহাদুর ক্ষেত্রী বলিয়াছেন যে নেপাল সরকার ও নেপালের অধিবাসীরা বাংলাদেশের বেদনায়ক ঘটনায় মর্মাহত হইয়াছেন। তিনি এই মর্মান্তিক ঘটনাকে তুলনাহীন বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন।

আন্তর্জাতিক ছাত্র ইউনিয়ন বাংলাদেশের ব্যাপারে গণহত্যা ও অবাধ নিপীড়নের তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করিয়াছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি সমর্থন ও সৌভ্রাতৃত্ব জ্ঞাপন করিয়া আন্তর্জাতিক ছাত্র ইউনিয়ন ঘোষনা করিয়াছেন যে ‘বাংলাদেশের মানুষের এই সংগ্রাম শান্তি, প্রগতি ও গণতন্ত্রের জন্য বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী বিরোধী সংগ্রামের অংশ’।

বোম্বাইয়ের রান্দ্রা সেন্ট জোসেফ কনভেন্টের ছাত্রী এবং ক্রিশ্চিয়ান স্টুডেন্টস গ্রুপের সভানেত্রী কুমারী নোয়ালো গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন আগামী ৪ঠা নভেম্বর রান্দ্রা হইতে প্রায় ২ হাজার স্কুল ছাত্রী বাংলাদেশের সমর্থনে এক পদযাত্রা শুরু করিয়া দক্ষিন বোম্বাইয়ের কুপারেজ পর্যন্ত যাইবে।

গত ৫ই অক্টোবর ব্রাইটনের এক সমাবেশে বাংলাদেশের ব্যাপারে উদাসীন থাকায় জাতিসংঘ এবং বিশ্ব সমাজকে ধিক্কার দেওয়া হয়।

গ্রেটবৃটেনের শ্রমিক দলের সম্মেলন উপলক্ষে এ্যাকশন বাংলাদেশ কর্তৃত্ব আয়োজিত এই সমাবেশে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট সদস্য মিঃ ষ্টোন হাউজ বলেন উহা ভাবিতে আশ্চর্য লাগে যে জাতিসংঘ এই বৃহত্তম মানবিক দুর্যোগের প্রতি দৃষ্টি দিতে ব্যর্থ হইয়াছে। লর্ড ব্রকওয়ে, বৃটেনস্থ বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, যুক্তরাজ্য পার্লামেন্টের সদস্য ব্রস ডগ্রাস এবং জুলিয়াস সিলভারম্যান এই সমাবেশে বক্তৃতা দান করেন। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বৃটিশ পার্লামেন্টের প্রভাবশালী সদস্য মিঃ পিটার শোর। বিপুল করতালির মধ্যে শ্রমিক দলীয় নেতা মিঃ ফ্রেড ইভান্স ঘোষনা করেন বাংলাদেশকে তাহার স্বাধীনতা সংগ্রামে অস্ত্র এবং অন্যান্য জিনিস দিয়া সাহায্য করা উচিৎ।

তাঞ্জানিয়া এবং জাম্বিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাহার সাম্প্রতিক সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করিয়া জন ষ্টোন হাউজ বলেন, এই দুই দেশের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের ব্যাপারে সহানুভূতিশীল। তাহারা জন ষ্টোন হাউজকে বলিয়াছেন যে কোন একটি দেশ বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দান করিতে আগাইয়া আসিলেই তাহারাও বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দিবেন। প্রেসিডেন্ট কাউন্ডা বাংলাদেশে নির্যাতন বন্ধ করিবার জন্য ইয়াহিয়া খানের নিকট বেশ কয়েকটি চিঠি লিখিয়াছেন।

জন ষ্টোন হাউজ জাতিসংঘকে ক্লান্ত, জরাজীর্ণ এবং বৃহৎ শক্তিবর্গের প্রমোদশালা বলিয়া অভিহিত করেন। তিনি অভিযোগ করেন বৃহৎ শক্তিবর্গের স্বার্থ যেখানে নাই এমন কোন বিষয় জাতিসংঘে উত্থাপিত হয় না।