১৬০. ৯ নভেম্বর সম্পাদকীয়ঃ সাম্রাজ্যবাদী খেলা

Posted on Posted in 6

শফিকুল ইসলাম

<৬,১৬০,২৬৯-২৭০>

শিরোনামসংবাদপত্রতারিখ
সম্পাদকীয় সাম্রাজ্যবাদী খেলাবাংলার বানী

মুজিব নগরঃ ১১শ সংখ্যা

৯ নভেম্বর, ১৯৭১

সম্পাদকীয়

সাম্রাজ্যবাদী খেলা

মানবতা ও মানবসভ্যতার চরমতম দুশ্মন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের গদীনশীন কর্ণধার প্রেসিডেন্ট নিক্সন খেলাটা ভালই জমাইয়া তুলিয়াছেন। দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ায় ভারত-পাক উপমহাদেশে নিক্সন যে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের খেলায় মাতিয়া উঠিয়াছে, উহা আগুন লইয়া খেলার সামিল। আর বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বাঞ্চালের উদ্দেশ্যে পাক-ভারত বিরোধ সৃষ্টির অনভিপ্রেত প্রচ্ছন্ন কারসাজি চালাইয়া, মানব ইতিহাসের ঘৃণ্যতম জল্লাদ ইয়াহিয়ার হাতে অঢেল মারনাস্ত্র তুলিয়াছেন। অথচ কি আশ্চর্য! সেই নিক্সনের মুখেই আজ সংযমের ললিত বাণী, শান্তির বাণী- সীমান্ত হইতে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের উদ্দেশ্যমূলক প্রস্তাব। জগতের সব কিছুরই সীমা আছে। সীমা নাই সম্ভবতঃ সাম্রাজ্যবাদী দস্যুদের হঠকারিতায়।

প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সাম্রাজ্যবাদী তস্করসুলভ চরিত্রের বীভৎস চেহারাটি আরেকবার নগ্নভাবে আত্মপ্রকাশ করিয়াছে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর আমেরিকা সফরকালে। শ্রীমতি গান্ধীর সঙ্গে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের বিস্তর আলাপ আলোচনা হইয়াছে। নিক্সনের মুখ দিয়া অনেক ভারী ভারী কথাও বাহির হইয়াছে। শুধু একটিবারের জন্য কোনও মন্তব্য তিনি করেন নাই বাংলাদেশ প্রশ্নে। প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি প্রেসিডেন্ট নিক্সনের দৃষ্টি আকর্ষন করিয়াছেন। ইহার গুরুত্ব সম্পর্কে, পাক-ভারত উপমহাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত হিসাবে বাংলাদেশ ইস্যুকে সুরাহার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নিক্সনকে সচেতন করিতে চেষ্টা করিয়াছেন। কিন্তু নিক্সন ইস্যুকে পাত্তা না দিয়া, এ সম্পর্কে কোন উচ্চবাচ্যও না করিয়া বারবার বলিয়াছেন, তিনি চান যাতে পাকিস্তান ও ভারতে মধ্যে কোন সশস্ত্র সংঘর্ষ না বাধে। এই লক্ষ্য হাসিলের উদ্দেশ্যে নিক্সন ভারন পাকিস্তান সীমান্ত হইতে ভারতী সৈন্য প্রত্যাহারের সুপারিশ করিয়াছেন। সুতরাং বুঝিতে কষ্ট হইবার কথা নয়, নিক্সনের চোখে যা পড়িয়াছে উহা হইতেছে পাক-ভারত যুদ্ধের আশংকা। কারণ, এই যুদ্ধ বাঁধিবার একমাত্র অর্থ হইতেছে তার যেটু নরপিশাচ ইয়াহিয়ার বিনাশ।

আর এই স্বার্থের ঠুলি চোখে লাগানো রহিয়াছে বলিয়াই বাংলাদেশের বীরত্বপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধ এবং বাঙালী জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের কারাবাস কোন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হইয়া তাহার চোখে ধরা পড়ে নাই। আর সে কারণেই ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আলোচনায় বা তার পরে নিক্সনের কন্ঠে একটিবারের জন্যও বাংলাদেশ প্রসঙ্গটি উচ্চারিত হয় নাই। এই কারণেই শ্রীমতি ইন্ধিরা গান্ধী যে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইস্যুর অপরিহার্য সমাধানের গুরুত্ব সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সম্যক অবহিত করিতে চাহিয়াছেন, নিক্সন তখন দক্ষিন ও দক্ষিনপূর্ব এশিয়ার শান্তি প্রতিষ্ঠার ফাঁকা বুলির আবরণে নিজের সাম্রাজ্যবাদী দুরভিসন্ধি চাপা দিতে চাহিয়াছেন।

আসলে নিক্সনের এই শয়তানী চেহারাটা নতুন কিছু নয়। মার্চ মাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হইতে বিশ্বের বিবেকবান মানুষ মাত্রই জল্লাদ ইয়াহিয়ার নারকীয় বর্বরতার বিরুদ্ধে ধিক্কার ও প্রতিবাদ জানাইয়াছেন, পশ্চিম পাকিস্তানী উপনিবেশবাদী জঙ্গীশাহীকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য প্রদান বন্ধ করিয়া দেওয়ার দাবী জানাইয়াছেন।

এখন কি খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি স্বাধীনতা ও মানবিক মূল্যবোধ বিশ্বাসী নেতা ও জনতাও জল্লাদী বর্বরতার প্রতিবাদে বিশ্ববিবেকের কন্ঠে কন্ঠ মিলাইয়াছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই মার্কিন কংগরেস পশ্চিম পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করিয়াছে। কিছুদিন আগে মার্কিন সিনেটও অনুরূপ বিল পাশ করিয়াছে। উহার পাশাপাশি সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডী, সাবেক রাষ্ট্রদূত চেস্টার বোলস, অধ্যাপক গলব্রেথ প্রমুখ বিশিষ্ট মার্কিন নাগরিকের নেতৃত্বে মার্কিন জনমত ইয়াহিয়ার জঙ্গী বর্বরতার বিরুদ্ধে অধিকতর সুসংহত হইয়া উঠিয়াছে। কিন্তু বাংলাদেশ প্রশ্নে ইচ্ছা- অন্ধ নিক্সনের জল্লাদ প্রীতির কোন হেরফের হয় নাই। বাংলাদেশ প্রশ্ন সমগ্র বিশ্ববাসীর সামনে একটি জলন্ত মানবিক ও রাজনৈতিক ইস্যু হিসাবে দেখা দিলেও এই সাত মাসের মধ্যে একটিবারের জন্যও নিক্সনের কন্ঠে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে কোন মন্তব্য উচ্চারিত হয় নাই। বরং বিশ্ব জনমতকে উপেক্ষা করিয়া, নিজ দেশবাসীর মতামতকে পদদলিত করিয়া কংগ্রেস ও সিনেটের সুস্পষ্ট নির্দেশকে অমান্য করিয়া ভিয়েতনামে মার্কিন নরখাদক নিক্সন, বাংলাদেশের মাটিতে পশ্চিম পাকিস্তানী জল্লাদ ইয়াহিয়ার হাতে অঢেল অস্ত্র তুলিয়া দিয়া চলিয়াছেন। আর বলা বাহুল্য সেই অস্ত্রের জোরেই সে ভারতের বিরুদ্ধে উন্মাদসুলভ রণহুঙ্কার ছাড়িতেছে। আর প্রেসিডেন্ট নিক্সন এলাকা হইতে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়া ইয়াহিয়া খানের মতই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে পাক-ভারত বিরোধের খোলস পরাইয়া উহা নস্যাৎ করিয়া দেওয়ার জঘন্য দুরভিসন্ধি চালাইতেছে।

আজ তাই সময় আসিয়াছে। আব্রাহাম লিংকনের আমেরিকার যদি মৃত্যু না হইয়া থাকে, মার্কিন জাতিকে আরও বলিষ্ঠ পদক্ষেপে নিক্সন ষড়যন্ত্রের মোকাবেলায় আগাইয়া আসিতে হইবে, আগাইয়া আসিতে হইবে শান্তি স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী সমগ্র বিশ্ববিবেক। বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নকে নির্মূল করিয়া দেওয়ার জন্য নিক্সন যে সাম্রাজ্যবাদী খেলায় লিপ্ত হইয়াছে, উহা ব্যর্থ করিয়া দেওয়ার জন্য সমগ্র পৃথিবীর মানুষকে একযোগে আগাইয়া আসিতে হইবে। কারণ, সাম্রাজ্যবাদী আর জল্লাদী ষড়যন্ত্রের চালে বাঙ্গালী জাতির মুক্তিযুদ্ধের পরাজয়ের অর্থ হইবে সমগ্র মানব জাতিরই চূরান্ত পরাজয়।