১৬৭. ৭ ডিসেম্বর চিঠিপত্রের জবাবে

Posted on Posted in 6

রাশেদুজ্জামান রণ

<৬,১৬৭,২৮৪-২৮৬>

সংবাদপত্রঃ বাংলার বাণী মুজিবনগরঃ ১৫শ সংখ্যা

তারিখঃ ৭ ডিসেম্বর, ১৯৭১

                              চিঠিপত্রের জবাবে
                                 আজাদ
আনোয়ারা বেগম
বনগাঁ।
প্রঃ-  সাত মাস হইল দেশান্তরী হইয়াছি। কবে আবার দেশে ফিরিতে পারিব?
উঃ-  উতলা হইবেন না বোন। আপনাদের অগণিত সন্তান, অগণিত ভাই মাতৃভূমিকে শত্রু মুক্ত করিয়া আপনাদের ঘরে ফিরাইয়া আনার জন্য জীবনপণ যুদ্ধে নিয়োজিত। এই যুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় ত্বরান্বিত করার জন্য চেষ্টা ও সাধনার শেষ নাই। সুদিন যখন আসিবে, নিশ্চয়ই আপনারা ঘরে ফিরিতে পারিবেন- দুইদিন আগেই হউক আর পরেই হউক।

মাসুদ হোসেন
টাঙ্গাইল।
প্রঃ- বলিতে পারেন এই যুদ্ধ কবে থামিবে?
উঃ- যেদিন স্বাধীন বাংলার জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের মধ্যে ফিরিয়া আসিবেন, যেদিন বাংলাদেশ হানাদার দুশমনের কবল মুক্ত হইবে।

অনিরুদ্ধ
বর্ধমান।
প্রঃ-  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক মূলমন্ত্র এবং আদর্শ কি?
উঃ-  স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষ শোষণবিহীন সমাজ এবং জাতীয়তাবাদী চেতনা।

সাহাদত হোসেন
কালিগঞ্জ।
প্রঃ-  বঙ্গবন্ধুর ডাকে আমরা স্বধীনতার যুদ্ধ করিতেছি। স্বাধীনতা অর্জনের পর আমাদের কি কর্তব্য?
উঃ- সে দায়িত্ব আরও কঠিন। মাতৃভূমি শত্রুমুক্ত হইবার পর মুহুর্তেই অধিকতর নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা লইয়া শান্তি শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার, সামাজিক পুনর্গঠন এবং বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আদর্শ বাস্তবায়নের কাজে আত্মনিয়োগ করিতে হইবে।

সালামতউল্লা
ফরিদপুর।
প্রঃ-  যে স্বাধীনতার জন্য আমরা যুদ্ধ করিতেছি, এই স্বাধীনতা হইবে কাহার জন্য?

উঃ- সকলের জন্য। স্বাধীনতার সুবর্ণ ফসল সকলের দ্বারে পৌঁছাইয়া দেওয়ার সংগ্রামই অধিকতর কঠিন স্বাধীনতার সংগ্রাম।

আব্দুল করিম
বনগাঁ।
প্রঃ-  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করিয়া দিল কেন?
উঃ-  নিক্সনের ল্যাঙ্গট জল্লাদ ইয়াহিয়াকে মদদ দেওয়ার উদ্দেশ্যে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাস, ভারতের অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ হইলে ভারত পাকিস্তানের কাছে কাবু হইয়া পড়িবে। আর এইভাবেই ভারতকে নাজেহাল করা যাইবে। ভারতের ‘অপরাধ’ সম্ভবতঃ এই যে, ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করে।

অঞ্জনা রায়
কলিকাতা।
প্রঃ-  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মার্চ মাসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়াছেন। কিন্তু এই ব্যাপারে তিনি কি আগে কোন আভাস দিয়াছিলেন?
উঃ- বাঙ্গালী জাতির দাবী আদায়ের জন্য যে সংগ্রাম করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে, সে আভাস তিনি জাতিকে সব সময়েই দিয়াছেন। নির্বাচনী প্রচার সভাগুলিতেও তিনি জনগণের কাছে সমস্ত পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করিয়া দুইটি জিনিস চাহিয়াছেন; একটি ভোট আরেকটি আপোষহীন সংগ্রামের ওয়াদা। তিনি বলিয়াছেন নির্বাচনী রায়ের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে দেখাইতে হইবে আমরা কি চাই। আর আমাদের আশা-আকাঙ্খা এবং আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা যদি বানচাল করিয়া দেওয়ার চেষ্টা চলে একযোগে শত্রুর বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইতে হইবে। সুতরাং আমাকে শুধু ভোট দিলেই চলিবে না। যখন সংগ্রামের ডাক দিব, তখন সর্বাত্মক সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত থাকিতে হইবে।

১৯৭০ সালের ৪ঠা জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণ দান কালে ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলিয়াছিলেন, ‘ছয়দফা’ যদি মানিয়া লওয়া না হয় তখন কয় দফা দিতে হইবে সে আমি জানি। সময় যখন আসিবে, আমি বিপ্লবের ডাক দিব। প্রস্তুত থাকিও। উপকূলীয় প্রলয় বিধ্বস্ত এলাকা সফর শেষে ২৩শে নভেম্বর ঢাকার হোটেল শাহবাগে ২ শতাধিক দেশী-বিদেশী সাংবাদিকের এক সমাবেশে বঙ্গবন্ধু দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে ঘোষণা করেন নিয়মতান্ত্রিক পথে আমাদের অধিকার আদায়ের প্রয়াস যদি বানচাল করিয়া দেওয়া হয় বিশ্ববাসী আর ষড়যন্ত্রকারী শাসক-শোষকেরা জানিয়া রাখুক সংগ্রামের মাধ্যমেই আমরা উহা আদায় করিব। যে দশ লক্ষ মানুষ দূর্ভাগা বাংলার উপকূলে প্রলয় রাত্রির হিংস্র ছোবলে প্রাণ হারাইয়াছে, তাদের আত্মার প্রতি আমাদের ইহাই দৃঢ় অঙ্গীকার। প্রয়োজনবোধে আরও দশ লক্ষ লোক শহীদ হইব। কিন্তু তবু আমরাই আমাদের শাসন করিব, বাংলাকেই করিয়া তুলিব বাংলার ভাগ্যবিধাতা।

তরিকুল আলম
বসিরহাট।
প্রঃ-  বাংলাদেশ সম্পূর্ণভাবে শত্রুমুক্ত হইবার পর কারা স্বাধীন বাংলার শাসনতন্ত্র প্রণয়ণ করিবেন?
উঃ- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাহার যে সব অনুসারী নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিরা মহান মর্যাদা রক্ষা করিয়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চালাইয়া যাইতেছে।

শফিকুল আলম
বসিরহাট।
প্রঃ- যে সামান্য কয়েকজন আওয়ামী লীগ দলীয় পরিষদ সদস্য বিশ্বাসঘাতকতা করিয়া শত্রুর সঙ্গে হাত মিলাইয়াছে স্বাধীন বাংলায় তাদের স্থান হইবে কোথায়?
উঃ- কবরে। ৩রা জানুয়ারী ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই জনগণের প্রতি সুস্পষ্ট নির্দেশ প্রদান করিয়াছেন। নির্বাচিত সদস্যদের যদি কেউ দেশ ও দেশবাসীর সঙ্গে বেঈমানী করে তাকে জ্যান্ত কবর দিয়া দিও।

সেলিনা আখতার
সিলেট।
প্রঃ- বিদেশে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশের জনগণের সব চাইতে বড় বন্ধু এবং সব চাইতে বড় দুশমন কে?
উঃ- সব চাইতে বড় বন্ধু ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী আর সব চাইতে বড় দুশমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিক্সন।

আতাহার আলী
কুষ্টিয়া।
প্রঃ- আমি একজন ছোট দোকানদার। বাংলাদেশ স্বাধীন হইলে কি আমার ভাগ্য পরিবর্তিত হইবে?
উঃ- বাঙ্গালী জাতির ভাগ্য তো সুখে দুঃখে একই সূত্রে গাঁথা। সুতরাং আপনার একার ভাগ্য পরিবর্তনের প্রশ্ন তো অবান্তর। সামগ্রিকভাবে জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যই তো এত রক্তপাত, এত ত্যাগ তিতিক্ষা- এই স্বাধীনতার সংগ্রাম।

জনৈক মুক্তিযোদ্ধা
ফরিদপুর।
প্রঃ- হাজার হাজার বাঙ্গালী যখন অস্ত্র লইয়া শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করিতেছে, তখন আপনারা রণাঙ্গন হইতে দূরে নিরাপদ আশ্রয়ে বসিয়া কাপুরুষের মত কলমবাজি করিতেছেন। লজ্জা করেনা আপনাদের?
উঃ- না। আপনাদের মত আমাদের যে সব বীর ভাই বন্ধু জীবনের ঝুঁকি লইয়া রণাঙ্গনে শত্রুর মোকাবিলা করিতেছেন তাদের অবদানের কোন তুলনা নাই। তবে একটা কথা, কলমবাজি করিতেছি ব্যবসায়ীক স্বার্থে নয়- দেশ ও নেতার আদর্শের বাণী প্রচারের প্রয়োজনে। মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কারামুক্তি এবং জননী বাংলার শৃঙ্খল মোচনের সাধারণ লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যেই আপনারা যেমন সমরাস্ত্রের সাহায্যে যুদ্ধ করিতেছেন, আমরা কলমের সাহায্যে লড়াই করিতেছি। আপনারা এবং আমরা একই যুদ্ধের দুই পৃথক ফ্রন্টের সৈনিক। একই ‘হাইকমান্ডের’ নির্দেশ অনুযায়ী যুদ্ধের প্রয়োজনেই আপনারা রণাঙ্গনে, আমরা পত্রিকা অফিসে। একই সংগঠনের আমরা সদস্য। আমাদের মধ্যে এ ধরণের ভুল বুঝাবুঝির অবকাশ না থাকাই কি সমীচীন নয়?

শ্রীকৃষ্ণ
বাগদা।
প্রঃ- ভুট্টো এখন কি করিতেছে?
উঃ- পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার খায়েশ তার চুরমার হইয়া গিয়াছে। তাই বাংলাদেশের আশা ছাড়িয়া ‘নতুন পাকিস্তান’ গঠনের চেষ্টা-তদ্বিরে ব্যস্ত। আরেকটা ডিউটি আছে তার। ইয়াহিয়ার জুতা পালিশ করা।