১৮। ২৫ জুন সম্পাদকীয়ঃ এরই নাম কি স্বাভাবিক অবস্থা?

Posted on Posted in p6

কম্পাইলারঃ পার্থ সুমিত ভট্টাচার্য্য

<৬,১৮,৩৫-৩৬>

শিরোনামঃ সম্পাদকীয় – এরই নাম কি স্বাভাবিক অবস্থা ?

সংবাদপত্রঃ জয় বাংলা, ১ম বর্ষঃ ৭ম সংখ্যা।

তারিখঃ ২৫ জুন, ১৯৭১।

সম্পাদকীয়

এরই নাম কি স্বাভাবিক অবস্থা ?

.

মিথ্যার শত জাল বুনেও সত্যকে কোনদিন ঢেকে রাখা যায় না। স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ বিশ্ব মানবতার কাছে আজ একটি মহাসত্য। এই সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সাড়ে সাত কোটি মানুষ ত্যাগ, তিতিক্ষা, শৌর্যবীর্যে ও আত্মদানের যে নজীর স্থাপন করেছে তা মানব ইতিহাসে চিরদিন ভাস্বর থাকবে। অথচ এই মহাসত্যটি মুছে ফেলার জন্য সুপরিকল্পিত ভাবে জল্লাদ ইয়াহিয়া খান প্রথম থেকে একের পর একটি করে মিথ্যার জাল বুনে বুনে তার প্রচার যন্ত্র, ব্যক্তিগত দূত ও পৃথিবীর সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত ডিপ্লোম্যাটিক মিশনের মাধ্যমে প্রচার চালিয়ে পৃথিবীর মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার কত কোশেশই না করে এসেছে। সত্যের কাছে মিথ্যা পরাজিত হবেই। তাই ইয়াহিয়া খানে ধোঁকাবাজিও বিশ্ব-মানবতার কাছে হার মানতে বাধ্য।

.

সাড়ে ৭ কোটি বাঙালী জাতিকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তথা সর্বতোভাবে নিশ্চিহ্ন করার মানসে নজিরবিহীন নৃশংস গণহত্যা, ব্যভিচার, লুণ্ঠন প্রজ্বলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যার ফলে প্রায় ১০ লক্ষ নিরস্ত্র মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ সর্বহারা বাস্তুত্যাগী হয়ে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। শুধু তাই নয়, গুটিকয়েক শহর ও বন্দর এবং মুষ্টিমেয় এলাকায় হানাদার বাহিনীর আধিপত্য সীমাবদ্ধ থাকলেও বাংলার ৬৪ হাজার গ্রামের প্রায় ৪ কোটি পরিবারের প্রায় প্রত্যেকটি গ্রাম ও পরিবার প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে আজ জল্লাদ ইয়াহিয়ার নৃশংস হত্যাযজ্ঞ ও অত্যাচারের শিকারে পরিণত হয়েছে। অথচ সম্পূর্ণ ব্যাপারটিকে ঢেকে রাখার জন্য পৃথিবীর মানুষকে অপপ্রচারের মাধ্যমে এ কথাই বুঝাতে চেয়েছিলেন যে, বিষয়টি একান্ত ভাবেই পাকিস্তানের ‘ঘরোয়া ব্যাপার’। কিন্তু সাড়ে সাত কোটি মানুষের করুণ ফরিয়াদে বিশ্বের দরবারে এই সত্যটি আজ প্রকাশ্য দিবালোকের মত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, ইয়াহিয়া খানের কাছে যা ঘরোয়া ব্যাপার, মানব ইতিহাসে সেটা জঘন্যতম কলঙ্ক। কখনও ইসলামের ব্যবসা করে, কখনও তথাকথিত প্রতিষ্ঠিত রাজ্যে অখণ্ডতার নামে, আবার কখনও সাম্প্রদায়িকতার জঘন্যতম অপপ্রচার করে বাংলার সাড়ে ৭ কোটি মানুষের শাশ্বত সত্য প্রাণের চেয়েও প্রিয় যার জন্য প্রতিটি বাঙালী যে কোন ত্যাগকে হাসিমুখে গ্রহণের জন্য সদা প্রস্তুত সেই স্বাধীনতা সংগ্রামকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য কত কৌশলই না করেছে। কিন্তু সূর্যের আলো থেকে কুয়াশা দূরে সরে যাবেই। যতই দিন যাচ্ছে শত মিথ্যার ধুম্রজালকে ভেদ করে পূর্ব দিগন্তে সূর্যরশ্মি ততই আসন্ন হচ্ছে।

.

আজ সার্বভৌম বাংলাদেশ যেমন মহাসত্য, তথাকথিত পাকিস্তানের অবলুপ্তিও তেমনি তকটি সত্য। ব্যক্তিবিশেষ কিংবা গোষ্ঠী বিশেষের স্বার্থান্ধতা ও হঠকারিতা এবং ভুলের মাশুল হিসাবেই এই অবলুপ্তি ঘটেছে, একথা আমরা পূর্বেই বলেছি এবং পৃথিবী তা স্বীকার করেছে। কারণ, মৃত পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক সাহায্য দিতে পৃথিবী আজ নারাজ। এর কোনো বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে না। কনসোর্টিয়াম বৈঠক থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি সাহায্যকারী দেশ অভিমত প্রকাশ করেছে ইয়াহিয়ার পাকিস্তানের ‘অভ্যন্তরীণ ব্যাপারটি’ আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, বাংলাদেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে না আসা পর্যন্ত সাহায্য দেওয়ার প্রশ্নটি স্থগিত রাখাই বাঞ্ছনীয়। এ রকম অভিমত প্রকাশের পিছনে অবশ্য একটি গূঢ় রহস্য আছে। সাহায্যকারী দেশ ভালভাবেই জানেন যে, বাংলাদেশও আর ইয়াহিয়া খানের মৃত পাকিস্তান এক নয়। আর বাংলার পাট, চা, তামাক এবং চামড়ার টাকা ছাড়া বৈদেশিক ঋণ শোধ করার কোন সম্ভাবনা নেই। সুদের জন্যই যেখানে কিস্তি ভিক্ষে সেখানে আসল পাওয়ার সম্ভাবনা কোথায় ? কাজেই জনাব ইয়াহিয়া খান ঢাকঢোল পিটিয়ে মুক্তিফৌজ থেকে শুরু রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে যারা দু’দিন আগে দুষ্কৃতিকারী ও  অনুপ্রবেশকারী বলে আখ্যায়িত করেছে তাদেরকে সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শনের নামে রিসেপশন ক্যাম্প খুলে, আগে অস্বীকার করে পরে বিপাকে পড়ে মাত্র ৪০ হাজার বাস্তুত্যাগী স্বীকার করে ‘স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছে’ শিরোনামওয়ালা ১২ পৃষ্ঠার জায়গায় ২ পৃষ্ঠায় সংবাদপত্রগুলোকে প্রকাশ করতে বাধ্য করে, আর মুক্তিফৌজের কাছে পাক সেনাবাহিনীর বেধড়ক মার খাওয়া গোপন করে, গুটিকতক ভাড়াটিয়ে পদলেহী তথাকথিত শিল্পীকন্ঠে ঢাকা বেতার কেন্দ্র থেকে ইসলামের গান গাইয়ে ইয়াহিয়া খান এ কথাই প্রমাণ করেছেন যে সাহায্য পাওয়ার স্বাভাবিক অবস্থা এখন ফিরে এসেছে।

.

বাংলায় স্বাভাবিক অবস্থা বাঙ্গালীরাই ফিরিয়ে আনবে। প্রতিটি বাঙালী আজ দৃঢ়প্রতিজ্ঞা যে, সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর নয়নমণি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্ত করে, হানাদার ইয়াহিয়া বাহিনীদের বাংলার মাটি থেকে নিশ্চিহ্ন করে, বাংলার স্বাধীনতা স্বীকৃতি আদায় করে, বিগত দিনের অর্থনৈতিক বঞ্চনার প্রতিশোধ ও ক্ষতিপূরণ আদায় করে বাংলার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনবেই।