১৮২. ২০ সেপ্টেম্বর রাজাকার ও শান্তি কমিটি সমীপে একটি খোলা চিঠি

Posted on Posted in 6

<৬,১৮২,৩১৪-৩১৫>

শিরোনামসংবাদ পত্রতারিখ
রাজাকার ও শান্তি কামটি সমীপে একটি খোলা চিঠিমুক্ত বাংলা

১ম বর্ষঃ ১ম সংখ্যা

২০ সেপ্টেম্বর ১৯৭১

(একটি খোলা চিঠি)

রাজাকার ও শান্তি কামটি সমীপেষু

সীরাজ উদ্দিন

       জালেম পান্জাবী টিক্কার গড়া রাজাকার ও শান্তি কামটির সদস্যদের বলছি- আপনাদেরকে ভুললে চলবেনা যে অপনারা  ও আমরা একই বাংলাদেশের অধিবাসী। বাংলাদেশের মানুষ আজ একটি চরম যুদ্ধে লিপ্ত। পৃথিবীর ইতিহা এমন অসম যুদ্ধের নজির খুব অল্পই আছে। নিরপেক্ষ বিদেশী পর্যক্ষেকদের মতে, হিটলার ইহুদিদের উপর যে অত্যাচার করেছিল বাংলাদেশের জনগনের উপর পান্জাবদের অত্যাচার তাকে ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগে। মাত্র কয়েকমাস পূর্বেও যাদেরকে কিছুসংখ্যক মানুষ এক ধর্মের বন্ধনে আবদ্ধ ভাই বলে মনে করতো আজ ওরাও পান্জাবীদের আসল চেহারা দেখে বুঝতে পেরেছেতারা ভাই নয়- চরম শত্রু। ওদেকে ভালবাসা যায়না শুধু ঘৃনাই করা যায়। তবে ওই বেঈমানদের দিন শেষ হয়ে আসছে। কারণ পাঁচ মাস পূর্বে বাংলার মানুষ নিরস্ত্র ও অসহায় ছিল, এবং সেজন্যই মেশিনগান, ট্যান্ক ইত্যাদি মারনাস্ত্র দিয়ে সারা বাংলাদেশটি জুড়ে রক্তের হলিখেলা খেলছে পান্জাবী দস্যুরা। একতরফাভাবে করেছে খুন, ধর্ষন ও লুন্ঠন।

       আজকের বাংলাদেশ কিন্তু সেই মার্চের অসহায় বাংলাদেশ নহে। অগনিত বাঙ্গালী যুবক যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষা করে যোগ দিচ্ছে মুক্তিফৌজে। মুক্তিফৌজকে করে তুলেছে দুর্জয়। তাদের অগ্রগতি আজ দুর্বার। হানাদার পান্জাবী অমন শক্তিশালী নহে যে আমেরিকার ভিয়েতনাম কিংবা ফরাসীদের আলজিরীয়া যুদ্ধের ন্যায় বাংলাদেশে বছরের পর বছর যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে।

.

 ভয়ে পান্জাবী আর সামনাসামনি যুদ্ধে আসছে না। কেন আপনারা আমাদের ভাই হয়েও ওদের চালাকী বুঝতে পারছেন না? ওরা মুক্তিফৗজের রাজাকার ও শান্তি কমিটির লোকজনকেই ছুড়ে দিচ্ছে।মুক্তিফৌজ অস্ত্রবলে বলিয়ান বলেই আজ কাপুরুষ পান্জাবীদের বীরত্বের দাপাদাপি কমে গেছে। বিনা যুদ্ধে বিজয়ী খেতাবধারী ফিল্ড মার্শাল আইয়ুবের স্বজাতি যে ওরা।

       সিপাহী যুদ্ধের পর থেকে আজকের পান্জাবীদের যুগ পর্যন্ত প্রায় দুইশ বছর – আমাদের কেহ বন্দুক হাতে নেবার সুযোগ পায়নি। তাই ওরা ভেবেছিল আমরা বাঙ্গালীরা ওদের বন্দুকের ভয়েই দ্বাসত্ব স্বীকার করে নেবে। কিন্তু আজ ওরা বুঝতে পেরেছে, স্টেনগান, মর্টার, এল এম জি- ইত্যাদি আগ্নেয়াস্ত্র আমাদের খেলার পুতুল। ওদের বুজ চিনে চিনেই গুলি মারছি।

      মওদুদী, মুফতি মাহমুদ প্রভৃতি ধর্ম ব্যবসায়ী ও তাদের সর্দার ইহাহিয়া খাঁ ও টিক্কা খাঁ – এর ফতোয়া অনুযায়ী বাংলার মুসলমান আমরা নাকি হাবশি গোলামনদের মত। যথা ইচ্ছা ওরা আমাদের ধ্বংস করতে পারে। বাংলার মা বোনদের উপর বলাৎকার করতে পারে। ওদেরকে নাকি সেই পশুবর দান করেছে আল্লাহ। কিন্তু আমরা দেখেছি আমাদের আল্লাহ এই অত্যাচারীদেরকে খতম করে আমাদের দেশে ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠার তৌফিক আমাদেরকে দিচ্ছেন। এবং সেই জন্যই হালকা পাতলা বাঙ্গালী যুবকরা তাগড়া মোষের মত পাঞ্জাবীদেরকেই যে আগ্নেয়াস্ত্র দিয়েই হত্যা করে চলেছে তা নয়, ওদেরকে জ্যান্ত পাকড়াও করেও নিয়ে আসছে।
.
পাকিস্তানের সর্বমোট সৈন্যসংখ্যা প্রায় ৩ লক্ষ। এর মধ্যে ওদের শাদ্দাদী বেহেশতখানা ইসলামাবাদ, লাহোর ইত্যাদি শহরগুলো এবং পশ্চিম পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকা রক্ষা ও পাঠান বালুচ সিন্ধিদের বিদ্রোহ দমনের জন্য ২ লক্ষ ৫৫ হাজার সৈন্য ওখানে মোতায়েন রাখতে হয়েছে। বাংলাদেশে এনেছিল ৭৫ হাজার। কিন্তু ইতিমধ্যে ২৭ হাজার হয়ে গেছে খতম। অবশিষ্ট ৪৮ হাজার বাছাধনেরা বিগত ৫ মাসের অনবরত যুদ্ধের মধ্যে বারশত মাইল দুরে মা বোনদের বাংলার লুন্ঠিত টাকা, অলংকার ও অন্যাণ্য দ্রব্যাদি সমজায়ে দিয়ে আসাতো দুরের কথা লুন্ঠিত সামগ্রী পেটে ও কোমরে বেঁধে রেখে মুহুর্তের জন্যেও একবার বিশ্রামের সুযোগ পাচ্ছেনা। দেশে যাওয়ার রাস্তাটাও বিপদসঙ্কুল। মুক্তিফৌজের চতুর্দিকে আক্রমণ তাদেরকে বঙ্গোপসাগরের অতল গহ্বরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পালাবার সুযোগের জন্য বড় অফিসারেরা বিমান ঘাঁটিগুলো কড়া পাহারায় রেখেছে। পালিয়ে যাওয়ার সময় ওরা কিন্তু বাংলাদেশের সকল দালাল ও বিহারী গুন্ডাদেরকে মুক্তিফৌজের গুলির নিশানায় তাদের সকল পাপের কাফফারা স্বরূপ ফেলে যাবে।
.
ভারত থেকে মার খাওয়া কালো চামড়ার যে বিহারীগণ পশ্চিম পাকিস্তানে মাথা গুজবার ঠাঁইও পায়নি পৃথিবীর সবচাইতে ঘনবসতি অঞ্চল এই পূর্ব বাংলায় আমরাই ওদেরকে ভাই বলে স্থান দিয়েছিলাম। চাকুরী, ব্যবসা এমনকি ক্ষেত খামারে পর্যন্ত অংশীদার করেছিলাম। কিন্তু সেই চরম বিশ্বাসঘাতকেরাই বাংলার মাটির সাথে করেছে বেঈমানী, নিমকহারামী এবং বাংলার মানুষের উপর করেছে অকথ্য অত্যাচার।’
.
বিশ্বের সকল জায়গা থেকেই ওদেরকে ধিক্কার দেওয়া হচ্ছে এবং সেই জন্যই জল্লাদ টিক্কা খাঁকে বাংলার মাটি থেকে সরিয়ে নিয়ে পাঠান, বালুচ ও সিন্ধিদেরকে শায়েস্তা করার ভার ওর উপর দিয়েছে ইহাহিয়া খাঁ। কারণ ওখানকার জনমতও আজ বিক্ষুদ্ধ। ভুট্টো সাহেব কল্কে পাচ্ছেন্না। আর্থিক দিক দিয়েও পশ্চিম পাকিস্তানের অবস্থা কাহিল পাকিস্তানের আয়ের মোট তিন টাকার দুই টাকা ছিল বাংলাদেশের পাট, চা তামাক ও বিলাত প্রবাসী বাঙ্গালীদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা। মুক্তিযুদ্ধের ঠেলায় দুই টাকার স্থলে আট অনাও এখন তাদের কপালে জুটছেনা। বাংলোর সাড়ে সাত কোটি মানুসের বাজারে পশ্চিম পাকিস্তানের কাপড়ের মিলগুলো তাঁতের তৈরি কাপড় করতে না পারায় মিলগুলোতে তালা চাবি লাগাতে বাধ্য হচ্ছে। বেতন দিতে না পারায় পাঞ্জাবী মিল শ্রমিকদেরকে পাইকারীভাবে চাকরী হতে বরখাস্ত করা হচ্ছে। করাচীর বাজারের আমদানীকারক ও বড় বড় ব্যবসায়ীদের তেলতেলীভাব আজ আর নেই। মোগলাই মেজাজ ভোতা হয়ে যাচ্ছে। চব্বিশ বছরে গঠিত বাইশ পরিবারের শোশণের ভিত ভেঙ্গে আজ চুরমার হয়ে যাচ্ছে। সিপাহীদের যুদ্ধকালীন অতিরিক্ত ভাতা হয়ে গিয়েছে বন্ধ। বাংলাদেশে নিয়োজিত সিপাইদেরকে আপাতত ঘুষের টাকা, লুন্ঠিত ঘড়ি, অলংকার ইত্যাদি ও বদমায়েশীর অবাধ লাইসেন্স দিয়েই খুশি রাখার চেষ্টা চলছে। বেতন ও ভাতা দেবে কোন টাকশাল?

      আল্লাহর মেহেরবানীতে করাচি ও ঢাকার দূরত্ব দিন দিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারতের উপর দিয়ে আগে ছিল ১২০০ মাইল আর এখন ভারত ঘুরে ও হাজার মাইল। পাক –ভারত যুদ্ধ বাঁধলে এই দূরত্বের মাত্রা দাঁড়াবে ৭ হাজার মাইলেরওে বেশি। আপনারা তখন যাবেন বঙ্গোপসাগরে – আর ঐ পশ্চিমা দস্যুরা ডুবে মরবে আরব সাগরে।