১৯৫. ২৮ নভেম্বর গণচীন ও বাংলাদেশের সংগ্রাম

Posted on Posted in 6

জেসিকা গুলশান তোড়া

<৬,১৯৫,৩৩৯-৩৪০>

শিরোনামঃ গণচীন ও বাংলাদেশের সংগ্রাম

সংবাদপত্রঃ দাবানল ১ম বর্ষঃ ৬ষ্ঠ সংখ্যা

তারিখঃ ২৮ নভেম্বর,১৯৭১

.

গণচীন ও বাংলাদেশের সংগ্রাম

(দাবানল পর্যবেক্ষক)

রাষ্ট্রসংঘে চীনের অন্তর্ভুক্তির ফলে বিশ্বের প্রতিক্রিয়া স্বভাবতই উৎসাহব্যঞ্জক। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশ চীনের অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে পৃথিবীর দুই-তৃতীয়াংশ রাষ্ট্রের সঠিক ভূমিকা পালনের জন্যে আশা প্রকাশ করেছেন। এদ্বারা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আদর্শেরই বিজয় সূচিত হয়েছে। উপস্থাপিত হয়েছে মহাচীনকে। আহবান জানিয়েছেন বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রামকে সমর্থন করার জন্য। আমরাও বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে গণচীনকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।

.

পঁচিশে মার্চ তারিখ থেকে পাকিস্তানের ফ্যাসিবাদী চক্র বাংলাদেশের জনগণের উপর বর্বর আক্রমণ চালান। প্রতিরোধ করার পর থেকে ভারত পাকিস্তান আক্রমণ করবে এবং তার জন্যে বাংলাদেশে সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারী পাঠিয়েছে এই বলে জঙ্গীচক্র চীৎকার করতে থাকে। এই পরিপ্রেক্ষিতে গণচীন পাকিস্তানকে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছে। সরাসরিভাবে গণচীন বাংলাদেশে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা না করলেও, বিদেশী আক্রমণের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের অখন্ডতা ও অসংহতি রক্ষাকল্পে আমরা পাকিস্তানের পাশে থাকবো-চীনের এই বক্তব্য বাংলাদেশে স্বাধীনতা সংগ্রামকে ভারত পাকিস্তান বিবাদ প্রতীয়মান করতে পাকিস্তানী উদ্যেগকে সহায়তা করেছে।

.

বাংলাদেশে সামরিক জান্তার উৎপীড়ন ও ব্যাপক গণহত্যায় যখন ডানপন্থী ও বামপন্থী উভয়েই বিপন্ন,এই ব্যাপক অত্যাচার, হত্যা, লুন্ঠন যখন বিশ্ববিবেককে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল দেশে দেশে ধিক্কার উঠেছিল জঙ্গীশাহীর বিরুদ্ধে তখন একটি বিশেষ মতাদর্শে পীঠস্থান এবং এশিয়ার সর্ববৃহৎ শক্তি গণচীনের মৌনতা তারই অনুসৃত আদর্শের ব্যতিক্রম। গণচীণ, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, প্যালেস্টাইনের মুক্তিযুদ্ধের সর্বান্তকরণে সমর্থন করে যাচ্ছে এবং যুদ্ধাস্ত্র থেকে শুরু করে সবরকম প্রয়োজনীয় সাহায্য করে যাচ্ছে। অথচ সেই জনগণতান্ত্রিক চীন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সরাসরি সমর্থন করছে না।

.

পৃথিবীর অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশেও এর প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত। এমনকি চীন অনুসৃত আদর্শে অনুপ্রাণিত বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক শিবিরে চীনের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে মতভেদ দেখা দেয় এবং ক্রমশঃ প্রকট আকার ধারণ করতে থাকে। গণচীনও এই প্রতিক্রিয়ার সাথে সম্পূর্ণ অবহিত। সেই কারণেই বোধ করি গণচীনও বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের সঠিক তাৎপর্যকে উপলব্ধি করতে চেষ্টা করেছে।

.

এরই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত প্রতিভাত হয় গত ৭ই নভেম্বর ভুট্টোর নেতৃত্বে পাক-সামরিক সর্দারদের সম্মানে আয়োজিত ভোজসভায় ভারপ্রাপ্ত চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী কর্তৃক বাংলাদেশে ন্যায়সঙ্গত সমাধানের জন্য পাকিস্তানকে উদ্যেগী হতে আহবানের মধ্য দিয়ে। এই আহবানে বাংলাদেশের ব্যাপারে চীনা নীতির নবমূল্যায়নের স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই। সঙ্গে সঙ্গে চীনা মন্ত্রী এ অভিযোগও রেখেছেন, ভারত পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করছে।

.

বাংলাদেশ সমস্যা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো গণচীনের এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য থেকে কোনো সার্থক সিদ্ধান্তে পৌঁছান সম্ভব নয়। এটি শুধুমাত্র উভয় কূলকে সন্তুষ্ট করার প্রচেষ্টা বলে মনে হয়।

.

সুদীর্ঘ সাত মাস অতিক্রম হবার পর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যখন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠেছে এবং বীর যোদ্ধারা সাফল্যের পর সাফল্য অর্জন করে চলেছে তখন বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের স্বপক্ষে জনমত ক্রমশঃ জোরদার হয়ে উঠেছে। দেশে দেশে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে এগিয়ে আসছেন পৃথিবীর গণতান্ত্রিক ও মুক্তিকামী জনগণ। মুক্তি সংগ্রামকে সমর্থন করার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছেন নিজ নিজ সরকারের ওপর। তখন গণচীনসহ বিভিন্ন বৃহৎ শক্তির কাছে আমাদের আহবান আপনারা বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের সঠিক তাৎপর্যকে সম্যকভাবে উপলব্ধি করুন, নরঘাতক ইয়াহিয়া চক্রকে অর্থ ও অস্ত্রদান বন্ধ করুন, বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের অবশ্যম্ভাবী বিজয়কে ত্বরান্বিত করার জন্য সর্বতোভাবে সাহায্য করুন।