(১) ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের ঘটনা ও প্রতিরোধ সাক্ষাৎকার : মেজর এনামুল হক চৌধুরী

Posted on Posted in 9

<৯, ২.২, ৩২-৪০>

ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের ঘটনা ও প্রতিরোধ
সাক্ষাৎকার : মেজর এনামুল হক চৌধুরী
(১৯৭১ সালের মার্চে ক্যাপ্টেন পদে কর্মরত ছিলেন। সাক্ষাৎকারটি বাংলা একাডেমীর দলিলপত্র থেকে সংকলিত)

৭ -১১ -১৯৭৩

 

২৪শে মার্চ ব্রিগেডিয়ার মজুমদার,  কর্নেল হামিদ হোসেন শিগরী, ক্যাপ্টেন মোহসিন (এডজুট্যান্ট) চট্টগ্রাম বন্দরে  ‘এম, ভি, সোয়াত’ জাহাজের অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ খালাসের ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য এক উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলনে যোগ দিতে চলে যান। আমাকে নির্দেশ দিয়ে যান ব্রিগেডিয়ার আনসারী,  হেলিকপ্টার যোগে ঢাকা থেকে আসার পর তাকে জীপ যোগে চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠিয়ে দিতে।

 

হেলিকপ্টার যখন চট্টগ্রাম সেনানিবাস অবতরণ করে তখন আশ্চর্যের সাথে দেখতে পাই লেফটেন্যান্ট জেনারেল আব্দুল হামিদ খান (সি-ও-এস,  পাকিস্তান আর্মি),  জেনারেল নওয়াজেশ,  জেনারেল  খাদিম হোসেন রাজা (জি-ও-সি,  ১৪ ডিভিশন,  ঢাকা)  এবং ব্রিগেডিয়ার  আনসারী এরা সবাই হেলিকপ্টারে ঢাকা থেকে এসেছেন। কিন্তু ব্রিগেডিয়ার আনসারী সেই হেলিকপ্টারে চট্টগ্রাম বন্দরে চলে যান। তাদেরকে দেখার সাথে সাথে আমরা সবাই আশ্চর্যান্বিত হয়ে গেলাম কারণ তাদের আগমন অপ্রত্যাশিত ছিল।

 

জেনারেল দের আগমনের সাথে ২০-বালুচের সি-ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফাতমী ই-বি-আর-সি তে আসেন। চা পানের পর জেনারেল খাদেম হোসেন রাজা ২০-বালুচের সি-ওর সাথে ২০-বালুচ অফিসে যান। কিন্তু আমরা আশ্চর্য হয়ে যাই যে, স্টার প্লেট ছাড়াই তিনি গাড়িতে করে ছদ্মবেশে ২০-বালুচের অফিসে চলে যান। ই-বি-আর-সি অফিসার মেস এ আমরা লাঞ্চ পার্টির ব্যাবস্থা করি। সেখানে প্রায় ৩০/৪০ জন অফিসার উপস্থিত ছিলেন।  ব্রিগেডিয়ার মজুমদার ও ব্রিগেডিয়ার আনসারির জন্য আমরা প্রায় ১ ঘন্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলাম। ব্রিগেডিয়ার মজুমদার তিনটার সময় পোর্ট থেকে আমাকে টেলিফোনে পার্টি শুরু করার নির্দেশ দিলেন।

 

পার্টি হৈ হুল্লোড় এবং আনন্দের সাথে শুরু হয়ে যায়। কথা প্রসংগে জেনারেল খাদেম হোসেন রাজা মেজর মং কেও (এস-এস-ও) কে জিজ্ঞেস করেন যে অবসর জীবনে তিনি কি করবেন।  তিনি বললেন,  দেশের এই অনিশ্চিত  পরিস্থিতিতে  বাইরের কিছু চিন্তা করা সম্ভব নয়। খাদেম হোসেন রাজা বললেন, “থিংস আর গোয়িং টু বি নরমালাইজড ভেরী সুন। ডু নট ওরি। প্ল্যান ফর ইওর ফিউচার।“

 

খাদেম হোসেন রাজা আমাদেরকেও বললেন। “দিস আনসারটেইনিটি ইজ গোয়িং টু বি ওভার ভেরী সুন। ওয়ার্ক হার্ড। ডিভোট ইওর টাইম ফর ট্রেনিং।

 

ব্রিগেডিয়ার মজুমদারও বেলা পৌনে চারটার দিকে হেলিকপ্টার যোগে ব্রিগেডিয়ার আনসারী,  ক্যাপ্টেন মোহসিনসহ ই-বি-আর-সি তে আসেন। খাওয়া শেষ করার পর ব্রিগেডিয়ার মজুমদার আমাকে বলেন যে বিশেষ কারনে তিনি ঢাকা চলে যাচ্ছেন। তিনি আরো বলেন, “লুক আফটার ইওরসেল্ফ।”

 

তার সাথে ক্যাপ্টেন আমিন আহমদ চৌধুরী (এ-আর-ও-পি) মেডিকেল চেক আপ এর জন্য ঢাকা আসেন। সব জেনারেল একই হেলিকপ্টারে ঢাকা রওনা হয়ে যান।

 

২৪শে  মার্চ বিকালে ই-বি-আর-সিতে থমথমে ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। আমাদের পেরিমিটার গার্ড এর সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়া হয়।

 

২৫শে মার্চ বিকেলে কর্নেল এম, আর, চৌধুরী (চীফ ইন্সট্রাক্টর, ই-বি-আর-সি) আমাকে  সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র জোয়ানদের দিয়ে দিতে বললেন। সমস্ত জোয়ানদের বিভিন্নভাবে অরগানাইজ করা হয়।

 

এখানে উল্লেখ করা দরকার যে,  ষোলশহরে অবস্থিত অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিশেষ কোন অস্ত্রশস্ত্র ছিল না। ই-বি-আর-সি থেকে দেড়শত রাইফেল তারা ধার চেয়েছিল।  আমরা ঢাকা থেকে স্যাংশন পেয়ে তাদেরকে নিয়ে যেতে নির্দেশ দেই। অষ্টম বেঙ্গলের কোয়ার্টার মাষ্টার ক্যাপ্টেন অলি আহমদ আজ নেবেন কাল নেবেন বলে আর নেন নাই।  অষ্টম বেঙ্গলের কিছু সৈন্য এডভান্স পার্টি  হিসেবে পাকিস্তান চলে যায়। যাবার প্রস্তুতি হিসেবে সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র, গাড়ী জমা দিতে হয়েছিল। খুব কম অস্ত্রশস্ত্র, গাড়ী বাকি সৈন্যদের কাছে ছিল।  

 

২৫শে মার্চ সকাল থেকেই চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন জায়গায় জনসাধারণ ব্যারিকেড সৃষ্টি করতে শুরু করে। বায়েজীদ বোস্তাম  থেকে ব্যারিকেড পরিস্কার করার জন্য ই-বি-আর-সি কে নির্দেশ দেয়া হয়। সাথে বেলুচ রেজিমেন্টের একটি কোম্পানীও ছিল।

 

লেফটেন্যান্ট  কর্নেল এম, আর চৌধুরীকে ব্যারিকেড পরিস্কার করার দায়িত্ব দেয়া হয়।  তার সাথে ক্যাপ্টেন আজিজ ব্যারিকেড পরিস্কারের কাজ তদারকি করছিলো।  

 

সকাল ১১টা থেকে চারটে পর্যন্ত সকল সৈন্যসামন্ত নিয়ে মাত্র ২০০ গজ রাস্তা পরিস্কার করা হয়। বহু কষ্টে বায়েজীদ বোস্তামীর রাস্তার মোড় পর্যন্ত যান। সৈন্যদেরকে সেখানেই দুপুরের খাবার দেয়া হয়।

 

বেলা সাড়ে তিনটার দিকে বেসামরিক ট্রাক যেগুলো আমাদের সৈন্য নিয়ে ব্যারিকেড পরিস্কারের কাজে যাচ্ছিল সমস্ত ড্রাইভার ট্রাক ফেলে পলায়ন করেন।

 

বায়েজীদ বোস্তামের মোড়ে বিপুল জনসমাবেশ হয়েছিলো। তারা ড্রাম দিয়ে ব্যারিকেড তৈরী করছিল। এবং যেখানে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করছিল শ্লোগানে শ্লোগানে সে এলাকাকে তারা মুখরিত করে তুলেছিল।

 

জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য বাধ্য হয়ে কর্নেল এম, আর চৌধুরী নির্দেশে এক রাউণ্ড গুলি ছোড়া হয়। এতে তিনজন লোক আহত হয়।  একজনের অবস্থা খুব শোচনীয় ছিল।  পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আর সামনের দিকে অগ্রসর না হয়ে এম,  আর  চৌধুরী সৈন্য সামন্ত নিয়ে সেনানিবাসে ফিরে আসেন।

 

এরপর কর্নেল এম, আর চৌধুরীর সাথে আমার দেখা হয়। তিনি অত্যান্ত দুঃখের সাথে বলেন যে, এই গুলিটি শুধু পাকিস্তানীদের দেখাবার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলাম।

 

সন্ধ্যা ৭টার দিকে আমাদের এক কোম্পানীকে জেটি এলাকায় যেতে নির্দেশ দেয়া হয়। মেজর কামাল মেহের (পাঞ্জাবী) ক্যাপ্টেন আজিজ কোম্পানীকে নিয়ে জেটিতে রওনা হয়ে যান।

 

২১শে মার্চ ব্রিগেডিয়ার মজুমদার ই-বি-আর-সি’র বাঙালি অফিসারদেরকে ডেকে চট্টগ্রাম শহরকে পুরো নিয়ন্ত্রনে আনা এবং বাঙালিদের যেন অযথা হয়রানি, দুঃখ দুর্দশার সম্মুখীন হতে না হয়। সেদিকে লক্ষ্য  রাখার নির্দেশ দিলেন। তদানুসারে আমরা সমস্ত অফিসার সৈন্যদের নিয়ে শহরে যাই। আমি নিজে অয়ারলেস কলোনীতে যাই। সেখানে ক্যাপ্টেন রফিকের (এডজুট্যান্ট, ই-পি-আর) সাথে দেখা হয়। তার সাথে চট্টগ্রামের ডি-সি এবং এস-পিও ছিলেন। রাত আটটার দিকে অয়ারলেস কলোনীতে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। বহু কষ্টে ই-পি-আর ও বেঙ্গল রেজিমেন্ট পরিস্থিতি  নিয়ন্ত্রনে আনে।  তার জন্য ডি-সি,  এস পি খুব আনন্দিত হন এবং বলেন যে পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা থাকলে পরিস্থিতি আরো মারাত্মক আকার ধারণ করত।

 

পরে আমি নৌবাহিনীর পশ্চিম পাকিস্তানী জোয়ানদেরকে হাতে অস্ত্রশস্ত্র সহ দেখতে পাই। অয়ারলেস কলোনীতেও তাদেরকে দেখা গিয়েছিল। তা আমি ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে বলি। তিনি বললেন যে এরপর নৌবাহিনীর কোন লোককে শহরে দেখা যাবে না।

 

কর্নেল এম, আর, চৌধুরী সেদিন খুব অসুস্থ ছিলেন। তার দুদিন আগে হাতে ব্যাথা পেয়েছিলেন। তিনি বলেন, “পরিস্থিতি খুব খারাপ। আমাদেরকে সাবধানে থাকতে হবে।“ এই সময় ঢাকা থেকে ক্যাপ্টেন আমিন আহমদ চৌধুরী টেলিফোনে চারদিকে খেয়াল রাখতে  বলেন। টেলিফোনটি এম, আর, চৌধুরী কে দিতে বলেন। এম, আর, চৌধুরী টেলিফোনে কথোপকথনের পর আমাকে বলেন, “পরিস্থিতি বড় খারাপ,  আমাদেরকে অত্যন্ত সতর্কের সাথে থাকতে হবে।“

 

২৫ শে মার্চ রাতে মেসে যাবার পর কর্তব্যরত অবস্থায় ক্যাপ্টেন মোহসিন আমাকে বললেন,  তার মেয়ে বড় অসুস্থ। আমি যদি তার জায়গায় ডিউটি করি তাহলে রাতে তিনি বাসায় থাকতে পারেন। আমি তাতে সম্মত হলাম।

 

অফিসে আসার পর ক্যাপ্টেন মোহসীন সব বুঝিয়ে দেন। এই সময়  মেজর বেগ  আসেন,  তিনি কড়া নির্দেশ দিয়ে যান যে আজকের পরিস্থিতি খুব খারাপ। যদি প্রয়োজন হয়  তাহলে সারারাত ডিউটি করতে হবে।

 

কর্নেল এম, আর চৌধুরীর সাথেও আমার দেখা হয়। তিনি বললেন আমি খাবার জন্য মেসে যাচ্ছি, এবং আমার কক্ষে থাকব। প্রয়োজন হলে আমার সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ করবে। তবে পরিস্থিতি খারাপ।

 

রাতে শহর থেকে অনেক টেলিফোন পাই। বন্ধুবান্ধবরা পরিস্থিতি কেমন জিজ্ঞেস করছিলো। তাদেরকে বললাম যে, তারা যদি কিছু জানে তাহলে আমাকে যেন জানায়।  

 

রাত সাড়ে এগারটার দিকে অষ্টম বেঙ্গল থেকে মেজর মীর শওকত আলী টেলিফোনে বললেন, ই-বি-আর-সি ও যত গাড়ী আছে সবগুলোই যেন তাদের জন্য সত্বর পাঠিয়ে দেয়া হয়। কারণ তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে এমভি-সোয়াত থেকে সত্বর অস্ত্রশস্ত্র আনলোড করতে। কিছুক্ষন পর তিনি টেলিফোনে বললেন।  তার অধিনস্থ সকলে গাড়ির জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে।

 

আমি বললাম, গাড়ির জন্য খবর দেয়া হয়েছে। দু’তিন মিনিট তিনি আবার টেলিফোনে বললেন, ব্রিগেডিয়ার আনসারী তার সৈন্যসামন্ত নিয়ে যেতে নির্দেশ দিয়েছেন। যদি পাঠাতে আমি দেরি করি তাহলে আমার অসুবিধা হবে।

 

আমি জবাব দিলাম, “গাড়ি যাচ্ছে।“ এই সময় চট্টগ্রাম শহর থেকে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক এর ভাইস চেয়ারম্যান এম, এ কাদের আমাকে টেলিফোনে বললেন, ঢাকার কোন খবর পেয়েছেন। আমি বললাম না।  তিনি বললেন ঢাকায় পুলিশ, ই-পি-আর’ এর উপর পশ্চিম পাকিস্তানীরা হামলা চালিয়েছে। তারা বিদ্রোহ ঘোষনা করেছে। ঢাকার বাঙালি সামরিক বাহিনীর লোকেরাও বিদ্রোহ ঘোষনা করেছে।

 

টেলিফোন এক্সচেঞ্জ অপারেটর সে সময়ে বাঙালি ছিল,  তাই কোন অসুবিধা হয়নি।  আমি তাদের সবাইকে বললাম। আপনি কর্নেল এম, আর চৌধুরীর সাথে কথা বলুন। কাদের সাহেব ও এম,  আর চৌধুরী যখন কথা বলছিলেন তখন অপারেটর কে বলি তাদের কথোপকথন আমাকে মনিটর করতে।

 

কথা শেষ করে আমি বললাম, স্যার আমি সব শুনছি।  তিনি বললেন,  বাকি যতসব অস্ত্রশস্ত্র আছে সমস্ত জোয়ানদেরকে দিয়ে দিতে। তিনি সত্বর অফিসে আসছেন বলে জানালেন।  আমি সুবেদার মেজর,  নায়েক সুবেদার,  কোয়ার্টার মাস্টার ও অন্যদেরকেও ডেকে অস্ত্রশস্ত্র কোটে থেকে নিয়ে নিতে নির্দেশ দেই। তারা নির্দেশ নিয়ে বাইরে যাবার সাথে সাথে দেখতে পাই ২০-বালুচ থেকে অনেকগুলো গাড়ি আসছে।  গাড়িগুলো আমাদের সামনের রাস্তা দিয়ে শহরের দিকে যেতে দেখতে পাই। কিন্তু কিছুক্ষনের মধ্যে সব গাড়ি থেমে যায়। আমি বাইরে এসে দেখতে পাই গাড়ি থেকে সেনাবাহিনীর লোকজন নিচে নামছে। কোয়ার্টার গার্ড থেকে গার্ড কমান্ডার দৌড়ে এসে আমাকে বলে যে, ২০ বেলুচের সমস্ত লোক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে গাড়ি থেকে নামছে। আমি তাকে বললাম তুমি চলে যাও। সে যাওয়ার সাথে সাথে কোয়ার্টার গার্ডের লোকজনকে স্ট্যাণ্ড টু (সতর্ক) করা হয়।

 

অল্পক্ষনের মধ্যে ২০-বালুচের লোকেরা কোয়ার্টার গার্ডের রক্ষীদের উপর হামলা চালায়। মূহুর্তের মধ্যে চারদিক থেকে গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়।

 

তখন হামিদ হোসেন শিগরী আমাকে টেলিফোন করে জানতে চান কোথা থেকে এ গোলাগুলি হচ্ছে বা কেন হচ্ছে। আমি বললাম, আমি কিছু জানি না। তবে বেলুচ রেজিমেন্টের লোকেরা আমাদের লোকদের উপর গোলাগুলি ছুড়ছে। তিনি বললেন, “ডু নট ওরি। আই উইল ট্রাই টু কন্ট্রোল দি সিচুয়েশন ইফ নিডেড। আই উইল শেড মাই ফর বেঙ্গল রেজিমেন্ট। দেয়ার ইজ নো ডিফারেন্স বিটুইন মাই সন এণ্ড ইউ ক্যাপ্টেন এনাম। আই উইল বি দি ফার্স্ট ম্যান টু টেক ইউ আউট ফ্রম দি ডিউটি রুম।“

 

চারদিক থেকে রাইফেল, এল-এম-জি, ২” মর্টারের আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। এ পরিস্থিতি চলতে থাকে দু’ঘন্টার মত। তারপর গর্জে ওঠে ৩” মর্টারের আওয়াজ।

 

কর্নেল শিগরীর আবার টেলিফোন পাই। তিনি বললেন, কে যে  আমার বাসার চতুর্দিকে গুলি ছুঁড়ছে। কিছুক্ষণ পর দু-তিন মিনিটের বিরতি হয়।

 

তিনি পুনরায় টেলিফোনে বললেন, “ইজ ইট এডভাইজ্যাবল ফর মি টু কাম টু অফিস এণ্ড টেক ইউ আউট?” আমি জবাব দিলাম গোলাগুলি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আসা উচিৎ নয়। তার সাথে সাথে পুনরায় সবরকমের গোলাগুলির আওয়াজ শোনা গেল। সাথে সাথে ট্যাংকের গর্জনও শোনা গেল। আমি যে ডিউটি রুমে ছিলাম, পাশে ৩” মর্টারের গোলা পড়ে। দরজা জানালার চতুর্দিক দিয়ে অনবরত গোলাবর্ষণ হচ্ছিল। আমি বাধ্য হয়ে টেলিফোনটি নিয়ে জমিনের উপর অবস্থান নিয়ে শুয়ে থাকি।  কর্নেল শিগরী আবার টেলিফোনে বললেন যদি কোন অফিসার আসে তাহলে তাকে কর্নেল শিগরীর সাথে কথা বলতে দেয়ার জন্য। আমাকে বললেন, তোমার কোন অসুবিধা হবে না। আমি সত্বর আসব। কিন্তু তারপর তার নিকট থেকে কোন সাড়া পাওয়া গেল না।

 

কিছুক্ষন পর গোলাগুলি কিছুটা কমে যায়।  বাহির থেকে কে যেন বলছিল আমার রুমে বহু লোক আছে।  সাথে সাথে আমি পাঞ্জাবী ক্যাপ্টেন আনোয়ারের কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে উচ্চকন্ঠে বললাম আমার কাছে আসতে।  আমাকে বলা হল বাইরে আসার সাথে সাথে হ্যাণ্ডস আপ করিয়ে তার বিকট স্বরে যেতে বলা হয়। দেখা হওয়ার সাথে সাথে ক্যাপ্টেন আনোয়ার বলে “ডু – নট ওরি।  ইউ আর নট এ প্রিজনার অব ওয়ার।  ফ্যাক্ট ইজ দ্যাট ইউ আনডার মাই কমাণ্ড।“

 

আমি তাকে কর্নেল শিগরীর সাথে কথা বলতে বলি। সে আমার কথামত কর্নেল শিগরীর সাথে আমার ডিউটি রুম থেকে কথা বলে। সে আমাকে সাথে করে ডিউটি রুম থেকে কোট এ নিয়ে যায় আর বলে, ভাগতে চেষ্টা করলে বিপদ হবে সাথে সাথে তিনজন প্রহরী আমার জন্য মোতায়েন করা হয়।

 

সেখানে দেখতে পাই বাঙালি সৈনিকদের মৃত্যুর আর্তনাদ। কেউ বাবারে মারে বলে চিৎকার করছে। কেউ পানির জন্য কাতরাচ্ছে।  আর সাথে সাথে দেখতে পাই পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা ঐ সমস্ত লোকদেরও  বেয়নেটের গুতো দিচ্ছে আর বলছে। বাংগালীকা জান বহুত ছখত হায়। আর ইয়ে শালা মারতা ভি নেহি হায়। মূমুর্ষ বাঙালি সৈন্যদের উপর পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের নির্যাতন যথেচ্ছ চলছিল।  যারা মূমুর্ষু অবস্থায় ছটফট করছিল পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা তাদের গলার উপর বুট দিয়ে চেপে ধরেছে, যাতে তাড়াতাড়ি তারা মারা যায়।

 

আমাকে প্রহরারত এক প্রহরী বলে, আপ আগার অর্ডার দেতে হাম ভি ইয়ে করনে ছাকতা। লেকিন ইয়ে আচ্ছা নেহী হায়। এক মুসলমান দুসরা মুসলমানকো খামাখা মার রাহা হায়। খোদা কি কসম হাম অভিতক এক গুলি ভী নেহী মারা। “সাথে সাথে আমাকে বলে “লেফটেন্যান্ট আবু তালেব (বাঙালি – আর্মি এডুকেশন কোর) সাব জিন্দা হায়।  উসকো সব বেয়নেট কররা থা উস টাইম পর হাম উনকা বাচা দিয়া।  উস দিন এমতেহানমে  সাব নে হামে পাশ করায়া। ইস লিয়ে হামনে ইস ইয়ে কিয়া। “এই সৈন্যটি আমার সাথে খুব ভাল ব্যাবহার করেছিল। আমিও তাকে অনুরোধ করেছি আমার কাছে থাকতে।  সে বলে ” ছোবাহ তাক হাম জিন্দা রাহেগা তো আপ ভী জিন্দা রাহেগা।”

 

ভোর হওয়ার সাথে সাথে ট্যাঙ্কের গর্জন বেশী বাড়তে থাকে। ব্যারাকের উপর ট্যাঙ্কের গোলাবর্ষন চলতে থাকে।  চারদিকে পাহাড়ের উপর তিন ইঞ্চি মর্টারের গোলা পড়তে থাকে আর চতুর্দিকে বাঙালি আহত সৈন্যদের গোঙানী ও আর্তনাদ পুরো এলাকায় এক বিভীষিকা এবং বীভৎসতা সৃষ্টি করেছিল।  তারপর দেখা গেল বহু বাঙালি সৈন্যকে চতুর্দিক থেকে বেয়নেটের মুখে ধরে আনা হচ্ছে আর তাদেরকে ই-বি-আর-সি স্কুল কক্ষে ঢুকানো হচ্ছে। একদল ভেতরে ঢোকার সাথে সাথে আর কয়েকজন পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যকে বড় লাঠি নিয়ে ঢুকতে দেখি। আর সাথে সাথে তাদের বেদম মারপিট শুরু হয়ে যায়।  তারা যখন ভীষন আর্তনাদ শুরু করে তখন পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা বাইরে আসে। বাহির থেকে ভেতরে দু-তিন রাউণ্ড গুলি ছোড়ার সাথে সাথে আর্তনাদ বন্ধ হয়ে যায়।

 

আমার সামনে যে সব সিপাহীকে গ্রেফতার করে আনা হয়েছিল। তাদেরকে বাঁধা হয়। ভোর সাতটার দিকে একজন সুবেদার এসে আমাকে জিজ্ঞেস করে  “খাজনা (ট্রেজারী) কিধার হায়। আমি আঙ্গুল দিয়ে দেখবার সাথে সাথে সুবেদার আমার উপর স্টেনগান উঠিয়ে বলে, ছহি ছহি বাতাও কিধার হায়। কারণ দুদিন আগে দেড় লাখ টাকা সিপাহীদের বেতন বাবদ ঢাকা থেকে ই-বি-আর-সি তে পাঠানো হয়েছিল।

 

কিছুক্ষনের মধ্যে সুবেদার একটি হাবিলদার কে নির্দেশ করে বলে,  সাব কো ভী বাঁধো।  হাবিলদার একটা রশি নিয়ে আসে।  আমি দুই হাত পিছু করার সাথে সাথে সে আমাকে বেশ শক্তভাবে বেঁধে ফেলে।  আমি বলি , ওস্তাদ বহুত জোয়াদা টাইট হায়,  সে বলে সাব আপকা বাজু বহুত মোটা হায়।  আমি হাসতে হাসতে বলি,  হামতো গামা নেহী হায়।  যাক সে আমার বাঁধন একটু শিথিল করে,  কিছুক্ষন পর আমার কমান্ডো  প্রহরীটি বাঁধন খুলে নামেমাত্র বেঁধে দেয়।

 

এই সময় আমাদের সুবেদার মেজর রুহুল আমিন, নায়েক সুবেদার কোয়ার্টার মাস্টার লুৎফুলকেও বেঁধে আনা হয়।

 

কিছুক্ষন পরে সুবেদার রহমান কে বেঁধে আনা হয়। তাকে আমি গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দেখলাম।  একটা গুলি তার পেটে ঢুকে অপর দিকে বের হয়ে যায়। রক্ত পড়ছিল। তাকেও বেঁধে রাখা হয়।  পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা আমাদেরকে দেখিয়ে দেখিয়ে চা, পরাটা, হালুয়া, খাচ্ছিল। কমান্ডো প্রহরীটি আমার জন্য চা আনতে যাওয়াতে তাকে অপমান করা হয়। সে এসে বলে, “সময় সবকিছু করে।“

 

আমার সামনের লোকদেরকে খালি চা দেওয়া হয়।  তারা বিষ মনে করে খেতে ইতস্তত করে।  আমি একটু মুখে নিয়ে বলি, খেয়ে ফেল, কোন অসুবিধা হবে না। কিন্তু সুবেদার মেজর ও নায়েক সুবেদার লুৎফর রহমান তাতেও চা স্পর্শ করলেন না।

 

পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা ই-বি-আর-সি পাহাড়ের নিচে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় আর পাহাড়ের উপর ৩” মর্টার আর ট্যাংক দিয়ে অনবরত গোলাবর্ষন করতে থাকে। উপর থেকে প্রত্যুত্তরে দু-চারটি গুলিও আসতে থাকে।

 

২৬শে মার্চ বেলা এগারটার দিকে আমাদের কোয়ার্টার গার্ড থেকে পলাতক একটি বাঙালি সৈন্য ই-বি-আর-সি ফুটবল মাঠের ড্রেন থেকে অকস্মাৎ তিনটি গুলি ছুড়লে প্রায় ৬ জন পাকিস্তানী সৈন্য মৃত্যুবরণ করে। প্রায় ১২/১৩ জন মারাত্মকভাবে আহত হয়। তারপর সে পালাতে শুরু করে। পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত সৈন্যটি তাদের গুলিতে মৃত্যুবরণ করে।

 

২৬শে মার্চ ভোর ৭টার দিকে পাক সৈন্যরা যেসব লোকদেরকে রাত্রে নির্দয়ভাবে হত্যা করেছিলো তাদেরকে একটি ট্রাকে ভর্তি করতে দেখতে পাই। আমার সামনে দিয়েও শ’খানেকেরও উপর লাশ নিয়ে যেতে  দেখতে পাই। প্রত্যেক লাশকে চারজন সৈন্য হাত পা ধরে মরা কুকুরের মতো নিয়ে যাচ্ছিলো। মাঝে মাঝে সৈন্যদেরকে কিছু লাশ মাটিতে ছেঁচড়িয়ে নিয়ে যেতে দেখতে পাই।

 

এই সময় কয়েকজন পশ্চিম পাকিস্তানী জুনিয়র অফিসারকে দেখতে পাই। তারা আমাকে বাঁধা অবস্থায় দেখে দুঃখ প্রকাশ করে। একজন ২০-বেলুচের লেফটেন্যান্ট কোয়ার্টার মাস্টার কেঁদে ফেলেছিলো।

 

বেলা তিনটার দিকে কর্নেল ফাতমী (২০ বেলুচের কমান্ডিং অফিসার) ইবিআরসি এলাকাতে আসেন এবং আমাকে বাঁধা অবস্থায় দেখে মনোক্ষুন্ন হন। তিনি এক হাবিলদারকে আমার বাঁধন খুলে দিতে নির্দেশ দেন। আমি লেফটেন্যান্ট আবু তালেবের কথা বলাতেও তার বাঁধন খুলে দেয়। অনুরোধ করাতে সুবেদার মেজর রুহুল আমীন ও নায়েক সুবেদার কোয়ার্টার মাস্টার লুৎফর রহমানের বাঁধনও খুলে দেওয়া হয়। আর লুৎফর রহমানকে বলেন, ‘তুমি একটা মেগাফোন নিয়ে যে সমস্ত লোক পাহাড়ের উপর বা অন্যান্য জায়গায় আছে তাদেরকে আত্মসমর্পণ করতে আহবান জানাও।’ তারা যদি খালি হাতে হাত উঁচু করে আসে তাহলে তাদেরকে কেউ মারবে না। পরক্ষণে তিনি সমস্ত বাঙালি সৈন্যর হাতের বাঁধন খুলে এক জায়গায় একত্রিত করতে নির্দেশ দেন। তাই করা হলো। আমাকে বলেন যে তুমি গিয়ে তাদের সাথে কথা বলতে পারো। তাদের উপর আর কোনো অত্যাচার করা হবে না।“

 

আমি গিয়ে সকলকে একত্র করে তাই বললাম। ৫০০/৬০০ জন বাঁধা অবস্থায় ছিলো। পুনরায় কর্নেল ফাতমীর সাথে দেখা করলে তিনি আমাকে বলেন, “এ্যানি হয়ার ইউ ওয়ান্ট টু গো ইউ ক্যান গো। ইফ ইউ ওয়ান্ট টু স্টে ইন অফিসার মেস, গো এহেড। বেটার গো হোম।”

 

আমি অন্যদের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ঢাকা থেকে নির্দেশ পেলে তাদেরকেও ছেড়ে দেওয়া হবে।

 

আমি দুজন সিপাহী নিয়ে মেসে টাকা আনতে যাই। ওখানে প্রহরারত হাবিলদার পাঞ্জাবী ভাষায় আমার প্রহরারত সিপাহীদের বলল, সাহেব যখন ভিতরে যাবে তখন তাকে হত্যা করো। আমি শুনতে পেয়ে একটু সামনে যেয়ে আবার ফিরে এসে বললাম, ওস্তাদ আব লোগ কোকাকোলা ফান্টা পিয়া, হামারা নাম পর পিলে। হামে এক বাদ ইয়াদ আয়া, কর্নেল সাব নে বাতায়া সিএমএইচ ছে ডাক্তার লে কর জখমী কো পহেলা দেখন কি লিয়ে। হাম ফের থোর বাদমে আয়েঙ্গা। এ যাত্রা মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যাই।

 

তারপর আবার কর্নেল ফাতমীর সাথে দেখা হয়। আমি বলি, আমার লোকজনের খাবারের কোনো ব্যবস্থা আছে? তিনি বলেন, আমাদের লোক নিয়ে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করুন। না হয় তারা কষ্ট পাবে।

 

তিনি আরো বলেন, ইবিআরসি’র সামনে কোনো পশ্চিম পাকিস্তানী থাকবে না। রাত্রে তাদের কোনো অসুবিধা হবে না। এখানে বলা যেতে পারে ইবিআরসি’র সামনের জায়গাটা হলো বায়েজিদ বোস্তাম ও বেসমরিক লোকদের বাড়িঘর। লোকজনকে একত্রিত করে পুনরায় আমি তাদের খাবারের ব্যবস্থা করার জন্য বলি। আর বলি আমাকে লেফটেন্যান্ট তালেব, সুবেদার মেজর রুহুল আমীন ও নায়েব সুবেদার কোয়ার্টার মাস্টার লুৎফর রহনানকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা বাইরে যাচ্ছি। বাকিদের ঢাকা থেকে ক্লিয়ারেন্স পেলে ছেড়ে দেওয়া হবে। তবে ইবিআরসি’র সামনে রাত্রে কোনো পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্য থাকবে না।

 

ই-বি-আর-সি থেকে বের হওয়া কষ্টকর ছিলো। চারিদিক থেকে এখনো এলোপাতাড়ি গোলাগুলি চলছিলো। মৃত্যুকে হাতে নিয়ে বহু কষ্টে ইবিআরসি এলাকা থেকে বের হতে সক্ষম হই।

 

ই-বি-আর-সি’র বাইরে একটি ফ্লাটে আমাদের চারজন অফিসার ছিলেন। আসার পথে তাদেরকে বাইরে নিয়ে আসতে যাই। আমাকে দেখে তারা যেনো আকাশ থেকে পড়ছেন বলে মনে হলো। আমাকে দেখার সাথে সাথে তারা ইবিআরসি’র ভিতরের অবস্থা জানতে চান। আমি উপরে বর্ণিত দু-একটি কথা বলার সাথে সাথে তাদেরকে আমার সাথে আসতে বলি। সেখানে ছিলেন মেজর রেজাউল রহমান (মেডিক্যাল স্পেশালিষ্ট), মেজর আশরাফ (রেডিওলজিষ্ট), ক্যাপ্টেন বাশার (আর্মি সাপ্লাই কোর) ও ক্যাপ্টেন মোহসীন (এডজুট্যান্ট, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট)।

 

তাদের মধ্যে একজন বলেন, আমরা তো মনে করেছিলাম ইবিআরসি’তে পশ্চিম পাকিস্তানীরা ফাঁকা আওয়াজ করেছে। জবাবে আমি বলি, “এক হাজারেরও অধিক লোককে তারা বেয়নেট বুলেট ও অন্যান্য মরণাস্ত্র দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে।“

 

এ কথা শোনা মাত্রই মেজর রেজাউল রহমান সকলকে তৎক্ষণাৎ আমার সাথে শহরের দিকে চলে যেতে বলেন। পরিবারের সকলকে নিয়ে আমরা যাযাবরের মতো শহরের দিকে রওয়ানা হই।

 

চট্রগ্রাম শহরে আসার পর দেখি শহরবাসীরা ছোট ছোট অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মারমুখী হয়ে এদিক ওদিক ছোটাছোটি করছে। আমি আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে রাত দশটায় যাই এবং সেখানে রাতযাপন করি।

 

সকালে আওয়ামী লীগ অফিসে জনাব এম আর সিদ্দিকীর সাথে কথা হয়। তিনি আমাকে চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ইপিআরের কমাণ্ড নিতে বলেন।

 

আমি কয়েকজন ছাত্রের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে রওয়ানা হই এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে (চট্রগ্রাম বেতার কেন্দ্র) যাই। সেখানে ক্যাপ্টেন সুবেদ আলী ভূঁইয়া ও লেফটেন্যান্ট শমসের মুবিনকে দেখতে পাই। সুবিদ আলী ভুঁইয়াকে দেখামাত্র বলি, “কেন বিনা যুদ্ধে ই-বি-আর-সি ছেড়ে চলে আসলে?”

 

 সে জবাবে বলে, কোনো উপায় না দেখে আত্মগোপন করছি। বেশী কিছু না বলে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার কথা বললাম। সে আমাকে যাওয়ার জন্য বললো। আমি বললাম, “আমি কোরবানীর বকরা, তাই যাচ্ছি।“ তারপর ছাত্রদের সাথে গাড়িতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই। সেখানে ইপিআর’দের সংগঠিত করি।

 

আমি ইপিআর’এর লোকদেরকে যুদ্ধ করার জন্য এক জ্বালাময়ী বক্তৃতায় ইবিআরসি’র ঘটনাবলীর কথা বলাতে তারা একযোগে পশ্চিম পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে তাদের দৃঢ় শপথ ঘোষণা করলো।

 

ই-পি-আর’দের নিয়ে কোথায় কি করতে হবে তার পরিকল্পনা করার পর আমি পুনরায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে মেজর জিয়াউর রহমানের সাথে যোগাযোগ করতে চেষ্টা করি। দেখা না পেয়ে বেতার কেন্দ্রে একদিনের মতো কাজ করি। বাইরে যাবার পর দেখি চারিদিকে লুটপাট, মারামারি চলছে। একজন ছদ্মবেশী ক্যাপ্টেন, নাম নাসির। তার সাথে কতোয়ালী থানা থেকে অস্ত্রশস্ত্র বাহির করতে যাই। সেখানে প্রহরারত প্রহরীদের দেখি। নাসিরের হাবভাবে মনে হলো যে, সে সেনাবাহিনীর লোক নয়। তদুপরি থানা থেকে ১০/১৫ হাজার টাকা চাওয়াতে মনে আরো সন্দেহ হয়। চট্রগ্রামে আরো দুদিন ছোটখাটো অপারেশন করার পর আমি ফেনীর পথে রওয়ানা হই এবং ফেনী, নোয়াখালী, মাইজদী, লাকসাম, কুমিল্লার মিয়ার বাজার, চৌদ্দগ্রাম এলাকার সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব নেই। ফেনীতে হেডকোয়ার্টার ছিলো। পুলিশ, ইপিআর, আর্মি, মুজাহিদ, ইউওটিসি ও ছাত্রদের নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী মুক্তিবাহিনী গঠন করতে সক্ষম হই। সেখানে জনাব খাজা আহমেদ, জনাব জহরুল কাইয়ূম- এম-সি-এ’কে ভারত থেকে আমাদের জন্য অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করতে অনুরোধ করি। তারা তাদের চেষ্টা চালান। দুদিন পর বেলুনিয়ার এসডিও ও বিএসএফ কমান্ডারের সাথে আমাদের এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়। সেখানে জনাব খাজা আহমদ, জনাব জহুরুল কাইয়ূম, জনাব আবদুর রশিদ এমসিএ উপস্থিত ছিলেন। আমাদের অস্ত্রশস্ত্রের প্রয়োজন তাদেরকে জানাই। বিএসএফ কমান্ডার সবকিছু দিতে স্বীকার করেন।

 

আমরা বাংলাদেশ থেকে ভারত সীমান্তে রসদপত্র রাখার ব্যবস্থা করাই। সেদিনই সব ব্যবস্থা করা হয়। তার সাথে সাথে বার্টার সিস্টেম আমাদের প্রয়োজনীয় জিনিস তারা দিবেন বলেও স্বীকার করেন।

 

আমরা আমাদের এলাকাটাকে পশ্চিম পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী থেকে মুক্ত রাখার জন্য চতুর্দিকে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ঘাঁটি তৈরী করি। যে সব রাস্তা দিয়ে হানাদার বাহিনী চলাচল করার সম্ভবনা ছিলো সেসব রাস্তার গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলো ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়। যেমনঃ চৌদ্দগ্রাম-লাকসাম রাস্তার ডাকাতিয়া নদীর উপর বড় সেতু হরিকোট পুল, ফেনী-লাকসাম রেলওয়ে রাস্তার বড় সেতু পরিকোট ব্রীজ। এছাড়া নোয়াখালীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্রীজও উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলো। পরিকোট ব্রীজের সত্বর মেরামতের কাজ পরিদর্শনের জন্য কুখ্যাত টিক্কা খান এসেছিলো এখানে।

 

লাকসামে আমাদের অবরোধ প্রতিহত করতে পশ্চিম পাকিস্তানীরা মারমুখী হয়ে পড়ে। বিভিন্ন জায়গায় চারদিন অনবরত যুদ্ধের পর আমাদেরকে লাকসাম ছাড়তে হয়।

 

লাকসাম-নোয়াখালী প্রবেশপথে খণ্ড খণ্ড বহু যুদ্ধ হয়। যার নেতৃত্বের ভার সুবেদার লুৎফরকে দেয়া হয়েছিলো। বহুদিন খণ্ডযুদ্ধ চলার পর ভারী আধুনিক অস্ত্রের অভাবে পিছু হটতে বাধ্য হই।

 

সামান্য কিছু অস্ত্র নিয়ে ভারত থেকে মাঝে মাঝে এমসিএ নুরুল হক যুদ্ধক্ষেত্রে আসতেন। তাকে দেখে আমাদের লোকজন দ্বিগুন উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে যুদ্ধ করার মনোবল পেত।

 

সমুদ্রপথে পশ্চিম পাকিস্তানীদের আক্রমণ প্রতিহত করতে চারদিক দিয়ে বহু বাঙ্কার তৈরী করা হয়। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানীরা আমাদের শক্তিশালী অবরোধ দেখে নোয়াখালী থেকে ফেনী না এসে লাকসাম থেকে ফেনীর দিয়ে রেলপথে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অগ্রসর হয়। পরিকোট পুলের নিকটে প্রায় একদিন যুদ্ধ চলে। তাদের ত্রিমুখী আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে আমাদের লোকজন পিছু হটে আসে। আমাদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিলো। ঐ দিনই পাকিস্তানী সেনাদেরকে তিনদিকে আটক করে রাখি। নোয়াখালীর পশ্চিম দিকে, ফেনীর উত্তর দিকে ও বুরবুরিয়া ঘাট এলাকায়।

 

পশ্চিম পাকিস্তানীরা একদিন গুণবতীতে অপেক্ষা করার পর অতর্কিতে ফেনীর তিন দিক ঘিরে ফেলে। আমাদের লোক মারমুখী হয়ে বারো ঘন্টার মতো তাদেরকে বহু কষ্টে ঠেকিয়ে রাখে। কিন্তু তাদের ভারী আধুনিক অস্ত্রের মুখে টিকতে না পেরে ফেনী ছাড়তে বাধ্য হয় এবং ভারতের সীমান্তে গিয়ে একত্রিত হয়। তখন ছিলো মে মাস।

 

একিনপুরে আমরা সবাই একত্রিত হই। একিনপুর থেকে চার কোম্পানী সৈন্য নিয়ে শুভপুর বুরবুরিয়া ঘাট, মুহুরী নদী ও ছাগলনাইয়া ফ্রন্টে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে যাই। ছাগলনাইয়ায় বাঙ্কার তৈরী করে অপেক্ষা করছিলাম। পাক সেনাবাহিনী একদিন অতর্কিতে হামলা করে। তাদের কিছু সংখ্যক মুহুরী নদী পাড় হতে দেই এবং এবং তাদের উপর অতর্কিতে হামলা চালানো হয়। অনেক পাক সৈন্য নিহত হয়। এমনকি তাদের লাশ নিতেও দেড় দিন পর্যন্ত কোনো আসে নাই। বাধ্য হয়ে সকল সৈন্য সামন্ত নিয়ে ভারতে আসতে হয়। আমরা ১নং সেক্টরে প্রথম পর্যায়ে মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সংগঠিত হই। আমার কিছুসংখ্যক লোক খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে ২নং সেক্টরে যুদ্ধ করে।

 

স্বাক্ষরঃ এনামুল হক চৌধুরী

০৭-১১-১৯৭৩