(১) চট্টগ্রামের প্রতিরোধ যুদ্ধসাক্ষাৎকার: লেঃ কর্নেল মাহফুজুর রহমান

Posted on Posted in 9

<৯, ২.৬, ৫১-৫৮>

চট্টগ্রামের প্রতিরোধ যুদ্ধ

সাক্ষাৎকার: লেঃ কর্নেল মাহফুজুর রহমান

(১৯৭১ সালে লেফটেন্যান্ট পদে কর্মরত ছিলেন। সাক্ষাতকারটি বাংলা একাডেমীর দলিলপত্র থেকে সংকলিত)

(অনুবাদ)

২৫-৮-৭৩

 

বৃহস্পতিবার, ২৫ মার্চ ১৯৭১। লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুর রশিদ জাঞ্জুয়া অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলের সকল অফিসারকে নির্দেশ দিয়েছিল চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন স্থানে জনসাধারণের দেয়া ব্যারিকেড সরিয়ে দেয়ার। গতরাতের আঁধারে জনসাধারণ একটি আস্ত যাত্রীবাহী ট্রেনকে তুলে এনেছিল এবং ষোলশহরে আমাদের ব্যাটালিয়নের কাছে রেলওয়ে জংশনের প্রধান রাস্তায় ব্যারিকেড হিসেবে রাখা হয়েছিল। ক্যাপ্টেন (বর্তমানে মেজর) সাদেক হোসেইনের অধীনে থাকা সম্পূর্ণ কোম্পানী এবং লেফঃ কর্নেল জাঞ্জুয়াসহ ব্যাটালিয়নের প্রায় সকল অফিসার রেলওয়ে জংশনের রাস্তার ট্রেনটি সরাতে সেখানে ছিল।

 

চারপাশের সকল বেসামরিক লোকজন ও স্থানীয় শিল্পের শ্রমিকেরা সেখানে জড় হয়ে ব্যারিকেড সরানোর বিপক্ষে চিৎকার দেয়া শুরু করেছিল। ক্যাপ্টেন আহমেদ দ্বীন (অন্যতম পাকিস্তানী অফিসার) ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন- “এই সকল জারজদের চুপ করানোর একমাত্র ওষুধ হচ্ছে গুলি করা।” ব্যারিকেড কতটুকু সরানো যাবে এটা নিয়ে লেফঃ কর্নেল এতোটাই চিন্তিত ছিলেন যে ক্যান্টনমেন্টের ২০ জন বেলুচ  সেনাকে তৈরী রাখা হয়েছিল যাতে যে কোন বিপদে তারা সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসতে পারে। খুব সম্ভবত তিনি তার নিজের ব্যাটালিয়নের উপরও ভরসা করতে পারছিলেন না।

 

যাই হোক, অনেক চেষ্টার পরে ট্রেনটি সরানো হয়েছিল। ৫-৬ ঘন্টা লেগেছিল এই কাজটা করতে। এই ব্যারিকেডের জন্য রাস্তার উভয়পাশে একশ’র বেশি গাড়ী জ্যামে আটকা পড়েছিল। আমরা ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অন্তর্ভুক্তভেবে জনসাধারণ আমাদের উপর যতসম্ভব ক্ষোভ দেখায়নি। তারা আমাদের নিয়েও খুব বেশী খুশী ছিল না। মেজর (বর্তমানে কর্নেল) শওকতকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন তরুণ ছাত্র জিজ্ঞেস করেছিল- “আপনারা কি আমাদের দলে না?” তারা যত সম্ভব আশা করেছিল যে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট তাৎক্ষনিকভাবে জনসাধারণের সাথে যোগ দিবে। মুচকি হেসে মেজর (বর্তমানে কর্নেল) শওকত উত্তর দিয়েছিলেন- “সময় এলেই দেখতে পাবে।”

 

আমরা বুঝতে পারছিলাম যে চারপাশের সার্বিক পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে। শহরের সকল স্থানে জনসাধারণ ক্রমেই উত্তেজিত হয়ে উঠছিলো। একটার পর একটা মিছিল বের হচ্ছিলো, যোগাযোগ বন্ধ করার শহরের রাস্তায় রাস্তায় জন্য ব্যারিকেড দেয়া হচ্ছিল।  বেশিরভাগ দোকান-পাট বন্ধ ছিল। এদিকে-সেদিকে লোকজন দল বেধে বসে আলোচনা করছিল যে কি ঘটতে যাচ্ছে। ২০ জন বালুচ সেনার একটি কোম্পানির সাথে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলের অন্যতম একটি কোম্পানিকে সুবেদার আবদুল কাদেরের অধীনে চট্টগ্রামের জেটিতে পাঠানো হয়েছিল অস্ত্র নামানোর জন্য যেগুলো পাকিস্তান থেকে ‘শামস’ নামক একটি মালবাহী জাহাজে করে আনা হয়েছিল। সৈন্যরা জাহাজ থেকে অস্ত্র নামানোর চেষ্টা করছিল।কিন্তু জন সাধারণ তাদেরকে এটা করতে দিচ্ছিল না। আমরা বুঝেছিলাম যে মারাত্মক কিছু ঘটবে।

 

সন্ধ্যায় একটা কোম্পানিসহ লেফঃ (বর্তমানে ক্যাপ্টেন) শমসের মবিন চৌধুরীর সাথে আমাকে ষোলশহর ক্যান্টনমেন্টের রাস্তায় পাহারা দিতে বলা হয় যাতে রাতে আর কোন ব্যারিকেড সেখানে না দিতে পারে। আমার সাথে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ হুমায়ূনও (পাকিস্তানী অফিসার) ছিল। রাত এগারটার দিকে, কে রহমানের কোকাকোলার ফ্যাক্টরীতে বিশ্রাম নেয়ার সময়, শহর থেকে আমি একটা টেলিফোন পেলাম।  একজন অপরিচিত ব্যাক্তি আতঙ্কিত ও অস্থির হয়ে ফ্যাক্টরীতে তার কোন এক আত্মীয়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা পাঠাতে চাচ্ছিলেন এবং আমার পরিচয় জানতে চাইলেন। আমি উত্তরে বললাম যে আমি কোন দায়িত্বে নেই। সেই ব্যাক্তি আমাকে ফ্যাক্টরীর কোন এক পাহারাদার ভেবেছিল এবং বলেছিল- “ঢাকা থেকে এইমাত্র আমরা একটা টেলিফোন পেয়েছি যে সেখানে গুলিবর্ষণ শুরু হয়েছে, পাকিস্তানীরা গণহারে সাধারণ মানুষ মারা শুরু করেছে এবং সবাই তাদের মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে।” টেলিফোনে এরকম একটা তথ্য দেয়ার জন্য আমি সেই অপরিচিত ব্যাক্তিকে ধন্যবাদ দিয়ে রিসিভার রেখে দিলাম।

 

ষোলশহরে আমাদের ইউনিটের দিকে কিছু আগানোর পরই দেখলাম সুবেদার সুবেদ আলি সরকার দৌড়ে আমার দিকে আসছে এবং ফিসফিস করে বাংলাতে বললো আমি যেন যথাশীঘ্র ইউনিটে পৌছেঁ যাই। আমি বাকিটুকু বুঝে গিয়েছিলাম। আমার সৈন্যদের নিয়ে তাড়াতাড়ি ষোলশহরে পৌছে দেখলাম মেজর (বর্তমানে ব্রিগেডিয়ার) জিয়াউর রহমান আমাদের সৈন্যদের একসাথে লাইনে দাঁড় করাচ্ছেন।

 

বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সৈন্যদের একসাথে করতে এক ঘণ্টার মত সময় লেগেছিল। মেজর (বর্তমানে ব্রিগেডিয়ার) জিয়াউর রহমান অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলের নেতৃত্ব নিয়ে নিলেন এবং সৈন্যদের উদ্দেশ্যে কয়েক মিনিট ভাষণ দিলেন- “বাঘেরা আমার, পাকিস্তানীরা বাঙালিদের গণহারে হত্যা করা শুরু করেছে। তারা ইতিমধ্যেই ইস্ট বেঙ্গলের কয়েকটি ব্যাটালিয়নকে নিরস্ত্র করেছে। তারা আমাদের সবাইকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা ইতিমধ্যে আমাকে ফাঁদে ফেলেছিল কিন্তু সৌভাগ্যবশত আমি রক্ষা পেয়েছিলাম। আমাদের সবাইকে তাড়াতাড়ি সংগঠিত হতে হবে এবং যেকোন মূল্যে দেশকে রক্ষা করার জন্য তাদের মুখোমুখি হতে হবে। তোমরা সবাই কি আমার সাথে এই কাজটা করতে প্রস্তুত?” আমরা সকলে রাজী হয়েছিলাম এবং সেটা করার জন্য আল্লাহর নামে শপথ নিয়েছিলাম।

 

অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলের একটি কোম্পানি কিছুদিন আগে অগ্রগামী দল হিসেবে খরিয়া ক্যান্টনমেন্টে পৌছেছিল। পাকিস্তানের ইস্ট বেঙ্গলের পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম ব্যাটালিয়নের একটি কোম্পানিকে আসতে হয়েছে। তাদের খরিয়া যাবার আগেই একটি কোম্পানির শক্তিমত্তার সৈন্যরা ছুটিতে গিয়েছিল এবং সেই মুহূর্তে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলের সর্বমোট ২৫০ জনের মত সৈন্য ছিল। কয়েকমাস আগে ১৯৭০ সালের ৩০ অক্টোবর ষোলশহরে এই ব্যাটালিয়নের জন্ম হয়। যেহেতু এই দলটি খরিয়া যাচ্ছিল তাই সেখানে সকল অস্ত্র, গোলাবারুদ, যন্ত্রপাতি, মজুদ, গাড়ি ইত্যাদি তৈরী রাখা হয়েছিল। এই ব্যাটালিয়নটি ইবিআরসি’র কাছ থেকে থ্রি নট থ্রি ধরনের ১৫০টি বন্দুক, একটি ১০৬ মিলিমিটার আর আর এবং বেলুচ ২০ থেকে কোন গোলাবারুদ ছাড়া দুইটি ৩ ইঞ্চি মর্টার প্রশিক্ষণের জন্য এনেছিল।যেগুলো সৌভাগ্যবশত ব্যাটালিয়নের সাথেই ছিল। ষোলশহরের বাজার যেখানে ব্যাটালিয়নটি বেড়ে উঠেছিল সেখানে থেকে এইসব লুকিয়ে রাখা মোটেই উপযুক্ত জায়গা ছিল না। উপরন্তু সেই মুহূর্তে কোনকিছু ছাড়া সুবিধাজনকভাবে অপারেশন চালানো ব্যাটালিয়নের পক্ষে সম্ভব ছিল না। সুতরাং, আপাততঃ শহরের বাইরে কোথাও সংগঠিত হয়ে  অপ্রথাগতভাবে অপারেশন চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হল।

 

ভোররাত দুইটার দিকে আমাদের সাথে থাকা অস্ত্র-গোলাবারুদ নিয়ে ইউনিট ত্যাগ করি। আমরা কালুরঘাট রাস্তার রেলওয়ে সেতু পার হয়েছিলাম এবং গ্রামে লুকিয়ে থাকার একটি অস্থায়ী স্থান খুঁজে পেয়েছিলাম। পরবর্তীকালে আমাদের সাথে ক্যাপ্টেন (বর্তমানে মেজর) হারুন আহমেদ চৌধুরী যোগ দেন যিনি ১৭ উইং ক্যাপ্টেনের কাছ থেকে তাঁর সর্বোচ্চ সংখ্যক সৈন্য, অস্ত্র, গোলাবারুদ নিয়ে পালিয়ে এসেছিলেন। এটা ছিল সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ যার জন্য আমরা বিপুল পরিমাণে এত অস্ত্র-গোলাবারুদ এবং প্রস্তুত সৈন্যদের পেয়েছিলাম। বিভিন্ন এমসিএ, নেতা এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা সেখানে আমাদের সাথে দেখা করেছিল। একটা খসড়া পরিকল্পনা তৈরী করা হয়েছিল এবং সন্ধ্যার অন্ধকারে আমরা আবার শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

 

কালুরঘাট রেলওয়ে সেতুর বিপরীত পাশের একটি গ্রামে আমি আমার কোম্পানিকে নিয়ে অস্থায়ী আশ্রয় নিলাম। আমার একজন সিপাইকে সাথে নিয়ে সম্পূর্ণ ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে শহরে ঢুকেছিলাম এবং শহরে শত্রুপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান চিহ্নিত করেছিলাম। কিছু উঁচু পাহাড় ও দালান শত্রুপক্ষের অধীনে ছিল যেখান থেকে তারা অনবরত গুলিবর্ষণ করছিল। অনেক উঁচু পাহাড় ও দালান তখনও কারো অধীনে ছিল না। ছাত্ররা তাদের শটগান বাইরে বের করে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ গতিতে ছাদখোলা গাড়ি চালাচ্ছিল। তারা খাবারসহ বিভিন্ন জিনিস আওয়ামী লীগ অফিস থেকে সংগ্রহ করে অনেক ছাত্র যোদ্ধা, আনসার পুলিশ, মুজাহিদ, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা বিভিন্নদের মধ্যে বিতরণ করছিল।

 

২৯ মার্চ ১৯৭১, আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল কালুরঘাট সেতুর উভয় পাশে নিরাপত্তা দিতে এবং সেদিনের মধ্যেই এটা করা হয়েছিল। দুপুরবেলা পাকিস্তানের একটি সি-১৩০ বিমান সন্দেহের দৃষ্টিতে সেতুর উপর দিয়ে উড়ে গিয়েছিল। রাতে আমরা সবাই শুনেছিলাম যে কুমিল্লা থেকে কিছু কমান্ডো প্যারাট্রুপার আনা হয়েছিল এবং তারা চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে নেমেছিল। রাত আটটার দিকে খুবই শক্তিশালী সার্চলাইট জ্বালিয়ে একটি মোটরলঞ্চ আমাদের প্রতিরক্ষার দিকে এগিয়ে আসছিল। নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের সৈন্যদের গুলি না করতে বললাম। দূরে নদীর তীরের একপাশে লঞ্চটি আধাঘন্টার মত দাড়িয়ে সার্বিক পরিস্থিতি দেখছিল এবং কিছুসময় পরে চলে গেল। আমরা জানতাম না কি ঘটেছিল। সৈন্যরা সারারাত উদ্বেগের সাথে সজাগ ছিল। ভোর সাড়ে চারটার দিকে আমাদের প্রতিরক্ষার খুবই কাছে কিছু গুলির শব্দ শুনেছিলাম।

 

একাত্তরের ৩০ মার্চ সকালের দিকে মোহাম্মদ আসাফ নামে একজন বেসামরিক ব্যাক্তি আমার সাথে দেখা করলো এবং ‘শত্রু’ ‘শত্রু’ বলে চিৎকার করা শুরু করলো। মেজর (বর্তমানে ব্রিগেডিয়ার) জিয়াউর রহমান আমার সাথে ছিল। তিনি আমার মুখের দিকে তাকালো এবং এক প্লাটুন সাথে নিয়ে তাদের মুখোমুখি হতে বললো। উচ্চ পদস্থ কমান্ডার সাথে থাকায় আমার প্রথম অপারেশনে যাবার জন্য অনেক সাহস পেয়েছিলাম। সেনাবাহিনীর একটি গাড়িতে ইস্ট বেঙল এবং ইপিআর মিলিয়ে এক প্লাটুন সৈন্য নিলাম এবং চলা শুরু করলাম। সেই বেসামরিক ব্যাক্তি মোহাম্মদ আসাফ আমাদের পথ দেখিয়ে এমন জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল যেখানে আমার পুরো প্লাটুন সরাসরি গুলির নিচে পড়ে গেল। আমরা গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নেমে কিছু বাড়ি আর ঝোপেঁর পিছনে আশ্রয় নিলাম। কিছুদূর সামনে আগানোর পর আমরা শত্রুর অবস্থান নির্ণয় করতে পারলাম। এটা ছিল কৃষি বিভাগের তিনতলার বড় একটি বাড়ি যার পিছনের দিকে তারা আশ্রয় নিয়ে সেখান থেকে গুলি করছিল।

 

শত্রুরা আমার প্লাটুনের অবস্থান নির্ণয় করে এমজি ও এলএমজি (লাইট মেশিন গান) চালানো শুরু করেছিল। এখন আমার পুরো প্লাটুনটি শত্রুপক্ষের দালানটির ৪০০-৫০০ গজ দূরের ছোট একটি জায়গার সম্মুখভাগে চলে আসলো। আমি একবার আরেকটু কাছে যাবার চেষ্টা করলে শত্রুরা এমজি চালালো এবং আমি একটি ছোট গাছের নিচের সরে এলাম। গুলি আমাকে আঘাত করতে পারেনি। ইপিআর এর সেপাই নূর মোহাম্মদ তাঁর এলএমজি নাম্বার ২ নিয়ে আমাকে অনুসরণ করা শুরু করলো। শত্রুরা এখন তাদের সবগুলো অস্ত্র চালানো শুরু করলো। বেসামরিক ব্যাক্তি আসাফকে নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে আমি একটি বালির স্তূপের পিছনে কিছুদূর আগালাম এবং এখন আমার এসএমজি’র নিশানার মধ্যে দালানটি চলে আসলো। দালানটা এখন ২০০-৩০০ গজদূর দিয়ে তিনদিক থেকে প্রায় বৃত্তাকারে ঘেরা ছিল। আমার প্লাটুন এবং শত্রুপক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময় শুরু হলো। প্রথম তলা থেকে দ্বিতীয় তলার কাঁচের সারির মধ্য দিয়ে দালানের ভিতর শত্রুপক্ষের অবস্থান নির্ণয় করা আমাদের জন্য সহজ ছিল। হঠাৎ করে দালান থেকে একটি রকেট লঞ্চার ছোড়া হল এবং তাঁর নিচে একটি ছোট আমগাছের পিছনে আমার প্লাটুনের সিপাই নূর মোহাম্মদ তাঁর এলএমজি দিয়ে গুলি করছিল। দৈবক্রমে এক ও দুই নম্বর এলএমজি’তে আঘাত করেনি এটা। তারপর সাথে সাথে আমার অবস্থান লক্ষ্য করে আরেকটি রকেট লঞ্চার ছোড়া হল। সৃষ্টিকর্তা জানেন কিভাবে সেটা বালির বস্তার উপরে পড়ে গেল এবং আমার পিছনে বিস্ফোরিত হলো। আমি পড়ে গিয়ে এখন আমার রকেট লঞ্চার দালানের দিকে ছোড়া শুরু করলাম এবং সেটা খুব ভালো কাজে দিলো। সকাল সাড়ে দশটার দিকে শত্রুপক্ষের সেনাবাহিনীর দুটি বিমান আমাদের অবস্থানের উপর পৌছালো। বিমানটি আমার বর্তমান অবস্থানের প্রায় ১০০০ গজ সামনে চট্টগ্রাম বেতারে বোমাবর্ষণ করলো যেটা সুবেদার সাবেদ আলী সরকারের অধীনে আমাদের সৈন্যদের দখলে ছিল।

 

আমরা দিনের বেলা দালানটি দখলে নিতে পারিনি। রাত হবার সাথে সাথেই আমরা দালানটিকে চারদিক থেকে ঘিরে রাখলাম এবং পাহারা দিতে শুরু করলাম যাতে শত্রুরা পালাতে না পারে। রাতে কোন গুলি বিনিময় হয় নি। পরেরদিন সকালবেলা আমি আমার প্লাটুন নিয়ে দালানের ভিতরে চার্জ করলাম এবং ভিতরে নিন্মোক্ত জিনিস খুঁজে পেলামঃ-

 

পাঁচটি শত্রুপক্ষের মৃতদেহ, একজন আধমরা ল্যান্সনায়েক যে পরবর্তীতে মারা গিয়েছিল এবং একজন জীবিত কিন্তু গুরুতরভাবে আহত মোহাম্মদ আকবর নামে একজন সিপাই। যখন জিজ্ঞেস করা হল তখন সে বললো যে সে হামজা কোম্পানীর তৃ্তীয় এসএসজি (কমাণ্ড) ব্যাটালিয়নের অন্তর্ভুক্ত। ক্যাপ্টেন সাজ্জাদের নির্দেশে ৩০ জনের একটি প্লাটুন রাতে এসেছিল এবং কালুরঘাট রেলওয়ে সেতু উড়িয়ে দেবার জন্য দালানটি দখলে নিয়েছিল। শত্রুপক্ষের বাকি সৈন্যরা নিম্নোক্ত জিনিস রেখে রাতের আঁধারে পালিয়ে গিয়েছিলঃ-

 

মেশিন গান ওয়ান-এ-থ্রি- ১ টি

লাইট মেশিন গান-৭.৬২ চাইনিজ- ১ টি

জি-থ্রি রাইফেল- ২টি

স্মল মেশিন গান- ১ টি

স্মল মেশিন গান-৭.৬২ চাইনিজ- ২ টি

৪০ মিলিমিটার রকেট লাঞ্চার- ৩টি (রকেটসহ)

ওয়্যারলেস সেট-জিআরসি-নাইন (সকল যন্ত্রাংশ সহ)- ১টি

৯ মিলিমিটার ওয়াল্টার পিস্তল- ১ টি

অত্যন্ত হালকা পিস্তল- ২ টি

কমান্ডো নাইফ- ১ টি

কমান্ডো বেল্ট- ৭ জোড়া

কমান্ডো বুট- ৭ জোড়া

কমান্ডো বেরেট- ৮ টি

৭.৬২ এমুনিশনস- ২০০০ (বুলেট এবং ম্যাগাজিন)

এবং সেইসাথে বিপুল পরিমাণে বোমা।

 

হাজার হাজার জনতা দালানে জড়ো হয়ে আমাদের উৎসাহ দিতে শুরু করলো। দখলে নেয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ আমরা সংগ্রহ করলাম এবং আমার প্রতিরক্ষায় আনলাম। দুর্ভাগ্যবশত শত্রুপক্ষের সিপাই আকবরও ফেরার পথে প্রচণ্ড ব্যথায় মারা গেল। সেই কৃ্ষি দালানের চৌকিদার ও অন্যরা শত্রুপক্ষের মৃতদেহগুলো নিয়ে গিয়েছিল এবং দালানের উত্তর-পূর্ব কোনে কবর দিয়েছিল। মেজর (বর্তমানে ব্রিগেডিয়ার) জিয়াউর রহমান আমার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিদর্শন করলেন। আমার প্রথম অপারেশনের সফলতা শুনে এবং দখলে নেয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র গোলাবারুদ দেখে তিনি খুবই খুশি হয়েছিলেন।

 

শহরেও একইসাথে যুদ্ধ চলছিল। ক্যাপ্টেন (বর্তমানে মেজর) হারুন আহমেদ চৌধুরী এবং লেঃ (বর্তমানে ক্যাপ্টেন) শমসের মবিন চৌধুরী শহরের প্রবেশমুখ চকবাজারে কঠিনতর যুদ্ধ করেছিল যেখানে বেলুচ ২০ ট্যাঙ্কও ব্যবহার করেছিল।  এক এক করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আমাদের দখলে আসছিল। আমি আমার প্রতিরক্ষা বুহ্য চট্টগ্রাম বেতারে সামনে থেকে ইস্পাহানি, লিভার ব্রাদার্স, এফআইডিসি ইত্যাদি থাকা কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত বাড়িয়েছিলাম। একাত্তরে ২ এপ্রিল শত্রুপক্ষ আমাকে আঘাত করতে প্রথমবারের মত ৩ ইঞ্চি মর্টার ব্যবহার করেছিল। ফসফরাস ব্যবহার করে তারা শত শত বাড়ি, দোকান ইত্যাদি পুড়িয়ে দিয়েছিল।

 

আমাকে আমার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের দিকে মুখ করে চট্টগ্রাম-কাপ্তাই রাস্তার জংশন দখলে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। প্রায় এক মাইলব্যাপী একটি সম্পূর্ণ গ্রাম আমার একটি কোম্পানির দখলে ছিল। আমার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সামনে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট এবং পিছনে চট্টগ্রাম বেতার ছিল। নিঃসন্দেহে আমার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী ছিল কিন্তু কালুরঘাটের প্রধান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে আমার অবস্থান ছিল খুবই দূরে এবং আমার অবস্থানের পিছনে একটি বড় অংশ খালি ছিল। দুইদিন ধরে আমার সামনের শত্রুপক্ষকে ভালোভাবে আটকে রেখেছিলাম কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল সেগুলো ছিল শত্রুপক্ষের গৌণ অথবা মিথ্যা আক্রমণ। ৭ এপ্রিল শত্রুরা একটি সম্পূর্ণ ব্যাটালিয়ন নিয়ে চট্টগ্রাম বেতারে সুবেদার সাবেদ আলী’র অবস্থানে আক্রমণ করে এবং দখলে নেয়।

 

মেজর (বর্তমানে কর্নেল) শওকত যিনি শত্রুপক্ষের জাহাজ না ভিড়তে দেয়ার জন্য এবং পেছন থেকে অগ্রসর হবার জন্য দীর্ঘতম উপকূলীয় এলাকা পাহারা দিচ্ছিলেন। তিনি আজকে পিছু হটেন এবং অর্ধেক হারানো কালুরঘাট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নেতৃ্ত্বভার নেন। আমি তার সাথে যোগাযোগ করি এবং সাহায্য চাই। তিনি চট্টগ্রাম-কাপ্তাই রাস্তার মদনঘাট সেতুতে প্রধান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে যাওয়ার এবং প্রধান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ২ মাইল সামনে থেকে শত্রুপক্ষের মুখোমুখি হবার নতুন পরিকল্পনা দিয়েছিল। সাবেক কর্পোরাল করিম, যিনি একজন সাহসী মানুষ, তিনি বিভিন্ন সৈন্যের প্রায় এক কোম্পানি শক্তি নিয়ে আমার সাথে যোগ দেয়। মদনঘাট সেতুর উভয়পাশে আমি আমার স্থায়ী ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলি এবং সামনে থেকে শত্রুদের পাশে ও পিছনের দিকে চাপ দিতে শুরু করি।

 

একাত্তরের ৯ এপ্রিলের প্রথম প্রহরে মেজর (বর্তমানে কর্নেল) শওকত আমার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ২ মাইল সামনে থাকা শত্রুপক্ষের অন্যতম শক্তিশালী পোস্ট মন্টি ট্যানারীতে হানা দেয়ার একটি কাজ দেয় যার মাধ্যমে তিনি আমাকে সাহায্যের জন্য মর্টার ছোড়া এবং কালুরঘাটে শত্রুপক্ষের অবস্থানের উপর তার অন্যতম অপারেশনের সমন্বয় করতে চেয়েছিলেন। শত্রুপক্ষের অবস্থানের কাছাকাছি বানিয়াপাড়া ও চৌধুরীপাড়া নামে একটি গ্রাম ছিল যেটা লুকানোর জন্য ব্যবহৃত হবার কথা ছিল। গ্রামটি দৈর্ঘ্যে ৫০০ গজ ও প্রস্থে ২০০ গজ ছিল এবং এর চারপাশে বড় উন্মুক্ত জায়গা ছিল যা মন্টি ট্যানারীর শত্রুপক্ষের বন্দুকের নিশানার মধ্যে ছিল। দিনেরবেলা সেই বড় উন্মুক্ত জায়গাটি পার হয়ে গ্রামটি দখলে নেয়া সম্ভব ছিল না। একটি শক্তিশালী প্লাটুন নিয়ে একাত্তরের ৮ এপ্রিল প্রথম প্রহরের আগে এটা দখলে আনি এবং সারাদিন বসে সন্ধ্যা হবার জন্য প্রার্থনা করছিলাম। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ যে শত্রুপক্ষ আমাদের অবস্থান ধরে ফেলেনি। অন্যথায় তারা খুব সহজেই আমাদের ঘিরে ফেলে হত্যা করতে পারতো। সন্ধ্যায় আমরা আমাদের লক্ষ্যের চেয়ে ৫০-১০০ গজ দূরত্বের কাছাকাছি চলে আসলাম। ১০-১২ জন সৈন্যকে আমরা একটা সেনাবাহিনীর গাড়ি থেকে নামতে দেখলাম। যেহেতু দিনেরবেলা লক্ষ্যবস্তু থেকে সরে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না সেহেতু আমি শত্রুপক্ষের অবস্থা ও তাদের শক্তিমত্তা সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারলাম না।

 

শারীরিক আক্রমণের জন্য আমি দালানের মধ্যে প্রবেশ করি নি। কিন্তু আমরা একসাথে আমাদের সকল অস্ত্র চালানো শুরু করলাম। বিহারী ল্যান্সনায়েক সালেহউদ্দিন সাকে আমি সন্দেহ করতাম তিনি শত্রুপক্ষের পরিকল্পনা আর দালানের বিরুদ্ধে ৮৩ মিলিমিটার ব্লেন্ডিসাইড ব্যবহার করে এই অপারেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ৪-৫ মিনিটের মধ্যে আমরা পিছিয়ে আসলাম। এর কিছুক্ষন পর মর্টার চালু হয় এবং কালুরঘাট থেকে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। আমরা নিরাপদ দূরত্বে সরে এসে শত্রুপক্ষের অবস্থানের উপর শেল বিস্ফোরণ দেখলাম এবং এটা পুনঃদখলে নিলাম। চট্টগ্রামের সেই অপারেশনে প্রথম শহীদ হন অষ্টম ইস্ট বেঙলের ল্যান্সনায়েক নাইব।

 

একাত্তরের ৯ ও ১০ এপ্রিল শত্রুপক্ষ তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল কালুরঘাট ও মদনঘাট সেতু দখলে নেবার কিন্তু ব্যর্থ হয়েছিল। এগার তারিখে পিএনএস জাহাঙ্গীর এবং ফিল্ড আর্টিলারির একটি রেজিমেন্ট সকাল থেকে একইসাথে উভয় সাথে অস্বাভাবিক চাপ দিতে থাকে। চট্টগ্রাম-কাপ্তাই রাস্তার কোন থেকে ৩১ পাঞ্জাবের একটি অংশ সামনে থেকে চাপ দিতে থাকে। তাদেরকে আটকে রাখা আমার জন্য খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়লো। সেতুর অন্যপাশ থেকে এক প্লাটুন এনে সামনে বসানো লাগলো। শত্রুপক্ষের শেলের জন্য আমাদের কি পরিমাণ আতঙ্ক কাজ করছিল সেটা বলে বোঝানো যাবে না। কালুরঘাট সেতুতে শত্রুপক্ষ আরো চাপ দিয়ে এটা দখলে নিয়ে নিল। সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করা ক্যাপ্টেন (বর্তমানে ক্যাপ্টেন) শমসের মবিন চৌধুরী আঘাত পেল এবং পাকিস্তানীদের কাছে আটকা পড়লো।

 

আমাদের সৈন্যের বেশিরভাগ একটা নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়া পর্যন্ত আমাকে আমার অবস্থান ধরে রাখতে বলা হয়েছিল। ২ কোম্পানি সৈন্য নিয়ে আমি এখন একা মদনঘাট সেতু ধরে রেখেছি। দুপুর দুইটার দিকে সেতুর চারপাশ থেকে এবং আমার প্রতিরক্ষার ব্যবস্থার উপর শত্রুপক্ষের জাহাঙ্গীর হতে আরো বেশি চাপ দেয়া শুরু করলো। সেতুর অপর পাশে এক কোম্পানি বেশি এবং চট্টগ্রাম শহরমুখী শত্রুপক্ষের সেতুর দিকে এক কোম্পানি এর কম সৈন্য ছিল। সেতুর অন্যপাশে আব্বাস নামে এক বেসামরিক ব্যক্তিকে পেয়েছিলাম এবং আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত তাকে যেতে বারণ করেছিলাম। যখন আমি সেতু পার হয়ে আমার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সম্মুখভাবে চলে আসি তখনই শত্রুপক্ষ আমাদের অবস্থানকে আক্রমণ করে সেতুকে বন্দুকের নিশানার মধ্যে নিয়ে আসে।

 

যদি আমি শত্রুপক্ষকে কিছুদূর সামনে এগোতে দিতাম তাহলে তখন আমরা কখনোই নদী পার হতে পারতাম না। শত্রুপক্ষের আর্টিলারি থেকে শেল ছুড়ে আমাদের সরে যাওয়াকে বাঁধা দিতে চাচ্ছিল। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ যে তখনই একটা ভয়ঙ্কর ঝড় শুরু হয় এবং আমি ভাবলাম আমার সামনের সৈন্যকে নৌকা দিয়ে বিকল্প পথে পিছনে নিয়ে আসার এটাই সুযোগ। দুই ঘণ্টা পর আমরা নদীর অপরপাশে আসতে পারলাম এবং কোন হতাহত ছাড়া প্রধান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাথে যোগ দিলাম। যেহেতু সেতুটা অরক্ষিত ছিল এবং শত্রুপক্ষের শেল তখনও চলছিল তাই নদীর এই পাড়ে থাকাও সম্ভব ছিল না। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম এখান থেকে সরে গিয়ে কয়েক মাইল পিছনে উপযুক্ত জায়গায় একটি বিকল্প প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার। হঠাৎ করে আমার আব্বাসের কথা মনে পড়লো আর ভাবলাম শত্রুপক্ষের শেল দ্বারা সেই জায়গা হয়তো লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছে এবং তিনি নিশ্চয়ই সেই জায়গা অনেক আগেই ত্যাগ করেছেন। কিন্তু তারপরও সাবেক কর্পোরাল করিম ও ১৭ উইং ইপিআর এর সিপাই মানিক মিয়ার সাথে আমি সেই জায়গাটা দেখে আসার প্রয়োজন অনুভব করলাম। সেই সাহসী মানুষকে নিশ্চল পাথরের মত প্রধান রাস্তার পাশে তার গাড়ি নিয়ে দাড়িয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করতে দেখাটা ছিল আমাদের কল্পনারও বাইরে। বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় পুরো মুক্তিযুদ্ধ জুড়েই তিনি আমার সাথে ছিলেন। তিনি এটাকেই পুরষ্কার হিসেবে গ্রহন করেছিলেন।

 

একই দিকে প্রথম প্রহরের মধ্যে মদনঘাটের কয়েকমাইল দূরে নোয়াপাড়া কলেজে আমি আরেকটি অস্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলি। রাতে শত্রুপক্ষ সেতু পার হয়নি। ১৪ এপ্রিল সকালবেলা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া আরো সৈন্যকে এদিক-সেদিক থেকে সংগ্রহ করি এবং তাদের আমার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করি। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন ব্রিগেডিয়ার এম আর মজুমদারের গাড়িচালক হাবিলদার আরব আলী। চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের পাকিস্তানি বন্দীশালা থেকে তিনি পালিয়ে এসেছিলেন। তিনি নির্দয়ভাবে প্রহৃত হয়ে অর্ধমৃত ছিলেন।

 

আমার সাঙ্ঘাতিক ভুল ছিল আমার সৈন্যদের ইপিআর এর এক সিনিয়র জেসিও এর অধীনে রেখে যাওয়া এবং সাবেক কর্পোরাল করিমকে সাথে নিয়ে কাপ্তাইয়ের পিছনের দিকে আমাদের প্রধান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অবস্থান জানতে চাওয়া যারা গতকাল চলে গিয়েছিল। কাপ্তাইয়ে পৌছার পর আমি জানতে পারলাম আমার সৈন্যরা খাগড়াছড়ি যাবার জন্য রাঙামাটির দিকে রওনা হয়েছে। আমি আমার সৈন্যদের দিগ্বিদিক ছোটাছুটি অবস্থায় খুঁজে পেলাম। শত্রুপক্ষ ইতিমধ্যে আমার অবস্থান আক্রমণ করে সবকিছু তছনছ করে দিয়েছিল। ২ কোম্পানি সৈন্যের মধ্যে আমি কষ্ট করে ২ প্লাটুন সৈন্য খুঁজে পেলাম যাদের নিয়ে আমাদের প্রধান বাহিনীর খোঁজে পিছনে সরে যেতে শুরু করলাম।

 

একাত্তরের ১৩ এপ্রিল খাগড়াছড়ি পৌছে আমি সকল অফিসার ও সৈন্যদের সাথে দেখা করলাম। মেজর (বর্তমানে ব্রিগেডিয়ার) জিয়াউর রহমান যিনি সোবহানপুর-ছাগলনাইয়া রাস্তা, কালুরঘাট-চট্টগ্রাম রাস্তা, নাজিরহাট-চট্টগ্রাম রাস্তার মত বিভিন্ন স্থানে শত্রুপক্ষকে ধরে রেখেছিলেন তিনি খাগড়াছড়ি আসেন এবং চেঙ্গী নদী দিয়ে রাঙামাটিকে সামনে থেকে ধরে রাখার একটি নতুন পরিকল্পনা আমাদের দেন। ১৪ এপ্রিল আমরা সকলে মহলছড়িতে ফিরে আসি এবং আমাদের কৌশলের প্রধান কার্যালয় তৈরী করি। সৈন্যদের পুনরায় সংগঠিত করে বিভিন্ন জায়গায় ভাগ করে দেয়া হচ্ছিল। ক্যাপ্টেন (বর্তমানে মেজর) খালেকুজ্জামান, ক্যাপ্টেন আফতাব কাদের এবং এক প্লাটুন সাথে নিয়ে মেজর (বর্তমানে ব্রিগেডিয়ার) জিয়াউর রহমান একাত্তরের ১৫ এপ্রিল ঘাগড়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। ইপিআর এর সুবেদার খাইরুজ্জামান, সাবেক কর্পোরাল করিম, দুইজন বেসামরিক ব্যাক্তি- একজন ছিল কেপিএম এর ক্যামিকেল ইঞ্জিনিয়ার জনার ইশাক এবং অন্যজন ছিল চন্দ্রঘোনার একজন আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলোয়াড় জনাব মুরি, দুইজন সাহসী ছাত্র- একজন ছিল ফারুক আহমেদ এবং অন্যজন শওকত আলীর (উভয়েই বর্তমানে লেফটেন্যান্ট) সাথে এক প্লাটুন সৈন্য নেই এবং বুড়িঘাট বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দেই। কয়েকদিনের জন্য আমরা শত্রুপক্ষকে হানা, চোরাগোপ্তা হামলা ও হয়রানি করে তটস্থ করে রাখি। ১৭ এপিল শত্রুপক্ষের এক প্লাটুন আচমকা মোটরলঞ্চে করে ক্যাপ্টেন (বর্তমানে মেজর) খালেকুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন আফতাব কাদেরের দ্বীপে ঢুকে পড়ে এবং হতাহতের ঘটনা ঘটায়। ১৮ তারিখ ২-৩ টি লঞ্চ নিয়ে শত্রুপক্ষের একটি কোম্পানি ক্যাপ্টেন (বর্তমানে মেজর) দ্বীপকে ঘিরে ফেলে আক্রমণ করে। অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলের ল্যান্সনায়েক মুন্সী আবদুর রব সেই অপারেশনে সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে শহীদ হন। মিজোদের সাথে যোগাযোগ করে শত্রুপক্ষ গত কয়েকদিন ধরে তাদের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। তারা মহলছড়ির কাছে আমাদের টেকনিক্যাল হেড কোয়াটারে পৌছে গিয়ে অপারেশন শুরু করে। আমাদের সবাইকে ডেকে নিয়ে টেকনিক্যাল হেড কোয়াটারে পাহারা দিতে বলা হয়।

 

২৭ এপ্রিল শত্রুপক্ষ ২ সৈন্যের সাথে হাজারের বেশি মিজোদের নিয়ে আমাদের টেকনিক্যাল হেড কোয়াটারের কাছে জড়ো হয়। দুর্ভাগ্যবশত পাহারা দিতে থাকা আমাদের এক বাহিনী তাদের লুকিয়ে থাকা ধরে ফেলে। কোন বিকল্প না পেয়ে টেকনিক্যাল হেড কোয়াটারের সামনে ক্যাপ্টেন (বর্তমানে মেজর) খালেকুজ্জামানের উপর অপরিকল্পিত আক্রমণ করতে হয়। ক্যাপ্টেন খালেককে শক্তিশালী করে এক প্লাটুনসহ আমাকে মেজর শওকত পাঠায়। এইসময়ের মধ্যে আমি সেখানে গিয়ে ক্যাপ্টেন খালেককে কমবেশি চারপাশ থেকে ঘেরা অবস্থায় আবিস্কার করি। আমি আমার প্লাটুন নিয়ে ক্যাপ্টেন খালেকের পরিখাগুলো দখলে করে যুদ্ধ শুরু করি। আমার ডান সেক্টরের অধীন সুবেদার সাকবেদ আলী শত্রুপক্ষের সামনে পড়ে যায় কিন্তু ক্যাপ্টেন খালেকসহ তার কিছু সৈন্যকে মুক্ত করতে ভালো একটা চেষ্টা চালায়।দুইজন সেক্টরকে সাথে নিয়ে আমি শত্রুপক্ষের সম্মুখভাগের গুলির মধ্যে চলে আসি। জঙ্গলের মধ্য থেকে শত শত মিজোরা সবুজ পোশাকের ছদ্মবেশে আমাদের দিকে ছুটে আসছিল। বাম সেক্টরে এলএমজিধারী যোদ্ধা সিপাই (বর্তমানে নায়েক) সামনে থেকে অনেককে হত্যা করে কিন্তু তার সকল গোলাবারুদ শেষ করে চিৎকার দেয়া শুরু করে। ডান সেক্টরের একটি এলএমজি তখনো চলছিল।

 

অনেক হতাহতের পরও শত্রুপক্ষ সামনের দিকে আগানোর চেষ্টা করছিল। যখনই আমরা কিছুটা পিছিয়ে আসি তখন টেকনিক্যাল হেড কোয়াটার থেকে মেজর শওকত শত্রুপক্ষের উপর এমজি চালানো শুরু করে। আমি আমার প্লাটুনকে সৌভগ্যবশত অক্ষত অবস্থায় নিয়ে আসি এবং মেজর শওকতের সাথে যোগ দেই। আমার সেক্টর কমান্ডারের অন্যতম ইপিআর এর সুবেদার লোনি মিয়া এই অপারেশনে অভূতপূর্ব সাহসিকতার পরিচয় দেয়। শত্রুপক্ষ তাদের গতি ধরে রেখে আমাদের টেকনিক্যাল হেড কোয়াটারের উপর ৩ ইঞ্চি মর্টার ছোড়া শুরু করে। প্রতিশোধ নেয়ার জন্য আমাদের কাছে এমনকি একটা ২ ইঞ্চি মর্টারও ছিল না। আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম পাকিস্তানি সৈন্যরা পিছন থেকে মিজোদের সামনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শত্রুপক্ষের আগানো ঠেকানোর জন্য আমাদের সম্মুখভাগ বাম থেকে ডানে চওড়া করা এবং নিজেদের সৈন্যদের উৎসাহ দেয়া লেগেছিল। এটা ছিল আমাদের দুর্ভাগ্য যে ক্যাপ্টেন আফতাব কাদেরর ডান পাশ থেকে একটি গুলি এসে বুকের বাঁ পাশে বিদ্ধ হয় এবনহ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তিনি শহীদ হন। আমরা আরেকজন সাহসী যোদ্ধাকে হারাই।

 

শত্রুপক্ষের ভীষণ গুলিবর্ষণের মধ্যে তার মৃতদেহ দুই ছাত্রের (বর্তমানে লেফটেন্যান্ট) সাথে রামগড়ে পাঠানো হয় এবং ডাকঘরের সামনে শ্রদ্ধার সাথে কবর দেয়া হয়। প্রথম রাতের পরই সাথে সাথে আমরা পিছিয়ে আসি। যেটেকনিক্যাল হেড কোয়াটারকে আমরা অর্ধেক মাস পর্যন্ত সুরক্ষা করে রেখেছিলাম গিয়ে দেখি সেটা আগুনে দাউ দাউ করে পুড়ছে।

 

২৮ এপ্রিল খাগড়াছড়ি হয়ে আমরা গুইমারা পৌছি এবং আরেকটা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলি। পরেরদিন আমরা রামগড়ে পিছিয়ে আসার সংকেত পাই কারণ শত্রুপক্ষ নিজেদের সৈন্যদেরকেই কারেরহাট-নাজিরহাট দিক দিয়ে একইসাথে রামগড়ের দিকে চাপ দিচ্ছিল। ৩০ তারিখ কর্নেল (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল)  আতাউল গনি  ওসমানী সেখানে সম্মানজনক পরিদর্শন করে আমাদের সৈন্যদের সাথে দেখা করে এবং ২৪ ঘন্টার জন্য রামগড় ধরে রাখার নির্দেশ দেয়। রামগড়ের ৫ মাইল সামনে চিকনছড়ায় ক্যাপ্টেন (বর্তমানে মেজর) অলি তার সৈন্যসহ ছিলেন এবং আমি আমার সৈন্যদের নিয়ে ক্যাপ্টেন অলির অবস্থানের এক মাইল দূরে বাগানবাড়ির বিওপি তে অতিরিক্ত হিসেবে প্রতিরক্ষা গড়ে তুলি। শত্রুপক্ষ আর্টারীর সাহায্যে ক্যাপ্টেন অলির অবস্থান আক্রমণ করে। তিনি তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে শত্রুপক্ষকে আটকে রাখে এবং রামগড়ে পিছিয়ে আসে। শত্রুপক্ষ তখন আমার সামনে ছিল এবং নিয়মিত বিরতিতে চাপ দিয়ে তারা নিজেরাও বেশিসংখ্যক হতাহতের সম্মুখীন হয়।

 

একাত্তরের ২ মে সকাল দশটা থেকে বিকাল তিনটা পর্যন্ত আমরা শত্রুপক্ষকে খুব শক্তভাবেই ধরে রেখেছিলাম। তারপর তারা বড় আর্টারী ব্যবহার শুরু করে। অনেক শেল আমাদের কাছে পড়েছিল কিন্তু সৌভাগ্যবশত আমরা বেঁচে গিয়েছিলাম। পিছিয়ে আসার সময় রামগড়ের দুই মাইল সামনে মহামুনি বুদ্ধ মন্দিরে আমার এক প্লাটুন নিয়ে আমি আটকা পড়ি এবং মুক্ত হতে পারছিলাম না। অস্টম ইস্ট বেঙ্গলের সুবেদার আনোয়ার দুঃসাহসিকভাবে তার এলএমজি নিয়ে সরাসরি রাস্তায় চলে আসে এবং গুলির আড়াল করে দিয়ে প্লাটুনকে বের হয়ে আসতে সাহায্য করে। তখন আমরা রামগড়ে আমাদের নিজেদের এমজি’র তত্ত্বাবধানেই ছিলাম। একবার সুযোগ পেয়ে মেজর শওকত এমজি শেষবারের মত চালিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত আমরা বাংলাদেশের শেষ টুকরো ভূখণ্ড রামগড়কে ত্যাগ করি এবং সন্ধ্যায় সাব্রুমপাড়ি দেই।  

 স্বাক্ষরঃ

২৫-০৮-১৯৭৩