১ নং সেক্টরের কতিপয় গেরিলা অপারেশন

Posted on Posted in 10

ডাঃ মোঃ রাজিবুল বারী (পলাশ)

<১০, ১.২ ৪৩-৫৮>

অনুবাদ

১ নম্বর সেক্টরের কতিপয় গেরিলা অপারেশন

 

সবগুলো সেক্টরে সঙ্ঘটিত অসংখ্য রেইড, অ্যামবুশ আর আক্রমণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঘটনাসমূহে যুদ্ধের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায় এবং অনভিজ্ঞ মুক্তিযোদ্ধারা কিভাবে ধীরে ধীরে সারা দেশে ক্রমাগত পাকিস্তানিদের সাথে লড়াই করে দক্ষ ও অভিজ্ঞ সামরিক শক্তিতে পরিণত হল সেটাও জানা যাবে।

 

১নং সেক্টরঃ  মে মাসের প্রথম সপ্তাহে কয়েকটি ছোট গেরিলা দল গঠন করা হয়। এখানে ৩ থেকে ৫ জন ছাত্র ছিল। এরা হ্যান্ড গ্রেনেড এবং হাল্কা অস্ত্রে ট্রেনিং প্রাপ্ত ছিল।  তাদের মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানি সেনা আর রাজাকারদের হত্যা করা। বাইশনাপুর এলাকায় ৪ জুন বিকেলে ১ নং সেক্টরের প্রথম ট্রেনিংপ্রাপ্ত গেরিলা পাঠানো হয়। জুন মাসের ১০ তারিখে একটি পেট্রল বাহিনী রামগড়-কারেরহাট রাস্তার নিকটে হাইকুতে এম্বুশ পাতে। পারস্পরিক যুদ্ধে ৪ জন পাকসেনা নিহত হয়। কোন ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই আমাদের সৈন্যরা ফিরে আসে।

 

উল্লেখ্য কারেরহাট থেকে রামগড় পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার রাস্তার এলাকাটি পাহাড়ি ও জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। লোকজনের বসবাস তেমন ছিলোনা। গেরিলাদের লুকিয়ে থাকার জন্য এটা ছিল মোক্ষম এলাকা। এই রাস্তায় অনেকগুলো আক্রমণ সঙ্ঘটিত হয়েছে। কারেরহাট, হাইকু আর রামগড়ে পাকিস্তানিদের শক্ত ঘাটি ছিল। এরা ৫০ মাইল দূরে চট্টগ্রাম পর্যন্ত তাদের দখল বজায় রেখেছিল। যুদ্ধের পুরোটা সময়ে এই ৩ টি সেন্টার নিজেরা সমন্বয় করে চলত। সবসময় যথেষ্ট পাহারা ছিল এখানে। পর্যাপ্ত অস্ত্র, এম্যুনিশন, জালানি, রেশন, সৈন্য সরবরাহ এবং আহতদের নেবার জন্য এটি ব্যাবহ্রিত হত। তাই শেষের দিকে এখানে পাকিস্তানিরা কিছু রিজার্ভ সৈন্য, এম্যুনিশন এবং রেশনের ব্যাবস্থা করে রাখে। যুদ্ধ পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকায় এবং হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় এই রাস্তাটি খুবই ব্যাস্ত হয়ে পড়ে।

 

জুনের দিকে আমাদের নিয়মিত বাহিনী ও গেরিলারা আরও দক্ষতার সাথে পাকিস্তানি সৈন্যদের সাথে মোকাবিলা করা শুরু করে।

 

১ নম্বর সেক্টরের ৪০০ মাইলের মধ্যে সম্মুখভাগে ছিল ৫০ মাইলের মতন। গেরিলা অপারেশন ঠিক মত চালানোর জন্য এটাকে ৫ ভাগে বিভক্ত করা হয়। প্রতিটি সাব-সেক্টরেই যুদ্ধকালীন সময়ে প্রচুর আক্রমণ সঙ্ঘটিত হয়েছে। পাশাপাশি সুদক্ষ গেরিলা বাহিনী সর্বদাই আক্রমণ ও এম্বুশের মাধ্যমে পাকিস্তানি সৈন্যদের ব্যাতিব্যাস্ত রেখেছে।

 

জুনের ২১ তারিখ ১০ জন গেরিলা রাতের অন্ধকারে শ্রীনগর এলাকায় পাকবাহিনীর উপর আক্রমণ চালায়। প্রথমে পুরো এলাকাটি রেকু করা হয় এবং আটোমেটিক ও সেমিঅটোমেটিক অস্ত্রের অবস্থান নির্নয় করা হয়। ৭৫ মি মি রকেট লাঞ্চার দিয়ে গেরিলারা খুব সহজেই শত্রুদের নিষ্ক্রিয় করে। এর পর তারা গ্রেনেড দিয়ে কয়েকটি বাঙ্কার এবং ২ টি যানবাহন ধ্বংস করে। পাকিস্তানিরা এলোমেলো গুলি চালাতে থাকে গেরিলাদের ভড়কে দেবার উদ্যেশ্যে। ১ ঘণ্টার মত যুদ্ধ চলে। এতে ২টি যানবাহন ধ্বংস হয় এবং ৫ জন পাকসেনা গুরুতর আহত হয়।

 

জুনের ২৩ তারিখ হাইকুর কাছে আরেকটি এম্বুশ করা হয়। রামগড়ের দিকে যাত্রাপথে একটি রেশনবাহী কনভয় এম্বুশে আক্রান্ত হয়। রাস্তার পাশে উঁচু স্থানে ঘন জঙ্গলে গেরিলারা অবস্থান নেয়। রকেট লাঞ্চার ও এল এম জি দিয়ে কনভয়টি আক্রমণ করা হয়। একটি মাইক্রবাস ধ্বংস হয়। ১ জন অফিসার ও ৩ জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়, ২ জন গুরুতর জখম হয়। পাকিস্তানিরা এখানে এম্বুশ আক্রন্ত হবার ব্যাপারে আগে থেকে সতর্ক ছিল। ফলে তারা রাস্তার উল্টো পাশে জঙ্গলে গা ঢাকা দেয়। ইতোমধ্যে পার্শ্ববর্তী হাইকু থেকে আরও সৈন্য চলে আসে এবং যুদ্ধে অংশ নেয়। কিন্তু ততোক্ষণে আমাদের এম্বুশ পার্টি জঙ্গলের ভিতর দিয়ে ঘাঁটিতে ফিরে যায়।

 

জুলাইয়ের ১ তারিখ ক্যাপ্টেন সামসুল হুদার নেতৃত্বে আমি এক প্লাটুন সৈন্য দেবীপুর ঘাঁটি আক্রমণের জন্য পাঠাই। সেটি সফল হয়েছিল। আমাদের সৈন্যরা এক বাঙ্কার থেকে পণ্য বাঙ্কারে যাচ্ছিল – আর তার ভেতরে হ্যান্ড গ্রেনেড মেরে ভেতরে থাকা সৈন্য ও সাবমেশিনগান উড়িয়ে দিচ্ছিল। মিশন শেষ করে গেরিলারা ঘাঁটিতে ফিরে আসে। আমাদের সিপাহি ফজলুর রহমান, হাবিলদার আবুল হোসেন এবং তোহা মিয়া সাহসিকতার সাথে লড়াই করেন এবং শহিদ হন। ৬ জন পাকসেনা নিহত ও ১২ জন আহত হয়।

জুলাইয়ের ৩ তারিখ দুপুরে রামগড়-কারেরহাট রোডে চিকনছাড়া পয়েন্টে পাকসেনাবাহি একটি মাইক্রোবাস আমাদের এম্বুশের শিকার হয়। এতে ক্যাপ্টেন ও ৪ জন পাকসেনা নিহত হয়। এই পথে আমরা অসংখ্য অপারেশন চালাই এবং বেশ কয়েকজন পাকসেনা নিহত হয়। ফলে তারা এই পথে তাদের চলাচল বন্ধ করে দ্যায়, দিনের বেলাও কমিয়ে দ্যায়।

 

জুলাইয়ের ১১ তারিখ গেরিলারা মিরসরাইয়ে হানাপনি ব্রিজটি উড়িয়ে দ্যায়। জুলাই ১৫ তারিখ সুবেদার রহম আলি সহ ২০ জনের মত বেগম বাজার ও রামগড়ের মাঝামাঝি এম্বুশ পাতেন। রেশন ও গোলাবারুদ বাহী একটি কনভয় এর শিকার হয়। গুলি শুরু হওয়া মাত্র পাকসেনারা বিচলিত হয়ে যায় এবং দৌড়ে পালায়। ৬ জন পাকসেনা নিহত হয় এবং বেশ কিছু আহত হয়।

 

বিওপি এবং শত্রু কবলিত অপারেশনগুলো প্রায় একই রকম। আমাদের বাহিনী আগে রেকু করে পাকিস্তানিদের এলএমজি ও মেশিনগানের অবস্থানগুলো চিহ্নিত করত। এরপর ১০ থেকে ১৫ জনের কয়েকটি দল আলাদা আলাদাভাবে সেগুলোতে আক্রমণ করত। কিছু গেরিলারাও প্রস্তুত থাকত নতুন শত্রুসমাবেশ ঠেকাতে। এছাড়া যুদ্ধ শেষে আমাদের সৈন্যদের নিরাপদে ফিরে যেতেও গেরিলারা সাহায্য করত। বাকি গেরিলারা বাঙ্কার ধ্বংস করার জন্য আক্রমণ চালাত। সময় ও সুযোগ হলে তারা আরও বাঙ্ককার ও গুরুত্তপূর্ণ পয়েন্টে আক্রমণ করত, কার্বাইন ফায়ার ও হ্যান্ড গ্রেনেড ও ব্যাবহার করত। উদ্দেশ্য ছিল পাকসেনাদের অস্থির করে তোলা এবং নিজেদের ক্ষতি না করে শত্রুদের যতোখানি ক্ষয়ক্ষতি করা যায়। দীর্ঘক্ষন ধরে লড়াই চালানোর মত সময় আমরা নিতাম না এবং আমাদের এত গোলাবারুদ ও ছিলোনা। তাই আমরা ক্রমাগত সম্মুখ ও অ্যামবুশ আক্রমণ চালিয়ে পাকসেনাদের ব্যাতিব্যাস্ত ও ছত্রভঙ্গ করে দিতাম। এতে পাকসেনাদের মনোবল পুরো ধ্বংস হয়ে যেত এবং বাংলাদেশে যুদ্ধের বুহুরুপের আকস্মিকতায় ভবিষ্যতের যে কোন আক্রমণে তারা আগেই ভিত হয়ে পড়ত। 

 

জুলাই ১৬ তারিখ গুথুমা বিওপি তে আক্রমণ চালানো হয়। ৩ জন পাকসেনা গুরুতর আহত হয়। গেরিলারা নিরাপদে ফিরে আসে।

 

জুলাই ১৯ তারিখ আমরা কারিয়াবাজারে পাকসেনাদের আক্রমণ করি। আমাদের কাছে তথ্য আসে যে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একজন পাকিস্তানি মেজরের নেতৃত্বে একটি দল ভারতে যাবার পথে প্রায় ২০০ বাঙ্গালীকে বন্দী করে। এদের ভিতরে অনেক মহিলাকে তারা নির্যাতন করে। তাই বন্দীদেরকে মুক্ত করার উদ্দ্যেশে আমরা আক্রমণের প্ল্যান করি। রাত ১টা ৩০ মিনিটের দিকে ৪৫জনের একটি গ্রুপ ২ইঞ্চি মর্টার, রকেট লাঞ্চার, এলএমজি এবং রাইফেল নিয়ে কারিয়াবাজার হাই স্কুলে অবস্থিত মেজর ও পাঞ্জাব বাহিনীর উপর আক্রমণ করে। পার্শ্ববর্তী কয়েকটি দোকান ও ঘরে বন্দীদের রাখা ছিল। আক্রমণের শুরুতেই আমাদের বাহিনী এলএমজি দিয়ে পাকসেনাদের স্কুল ঘরের ভেতরেই থাকতে বাধ্য করে। অন্যদিকে গেরিলারা চিৎকার করে বন্দীদের পালিয়ে যেতে বলে এবং নিরাপদে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে। অন্ধকারের সহায়তায় ১৫০ জন বন্দী পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এরপর ভারি মর্টার এবং রকেট লাঞ্চারের আক্রমণ চলে প্রায় ৩০ মিনিট। ১৮ জন পাকসেনা নিহত হয়। আমাদের দিকে কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

 

জুলাই ২৩ তারিখে মুক্তিযোদ্ধারা বরতারিকা এবং মিরসরাইয়ের মাঝখানে রেলপথে মাইন সেট করে। একটি ট্রেন যাবার সময় সেটি বিস্ফোরিত হয়। একটি ইঞ্জিন ও কেবিন বিধ্বস্ত হয় এবং কিছু সময়ের জন্য রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

 

হাইকুতে পাকিস্তানী অবস্থানের উপর আরেকটি আক্রমণ সঙ্ঘটিত হয়। জায়গাটা মিলিটারি যানবাহনের জন্য পার্কিং হিসাবে ব্যাবহার হচ্ছিল। জুলাই ২৭ তারিখে সন্ধ্যা ৪টার দিকে আমরা মর্টার ও রকেট লাঞ্চার দিয়ে আক্রমণ চালাই। পাকসেনারা এতে খুবই অবাক হয়। ১৫ মিনিটের আক্রমণে পার্কিং এলাকা পুরোপুরি ধ্বংস হয়। ৪ জন পাকসেনা নিহত হয় এবং অসংখ্য সেনা আহত হয়। অনেকগুলো গাড়িতে আগুণ লেগে যায় এবং অনেক রাত পর্যন্ত সেগুলো জ্বলতে থাকে।

 

আগস্টের ৩ তারিখ গ্রুপ ক্যাপ্টেন খোন্দকার এবং কর্নেল রব এইচকিউ বাংলাদেশ ফোর্স ১ নম্বর সেক্টরে আসেন। তারা গেরিলাদের সাথে সমন্বয় এবং পাকসেনাদের বিরুদ্ধে অপারেশনের ব্যাপারে আলোচনা করেন। জুলাই ১০ তারিখে কলিকাতায় সেক্টর কমান্ডারদের মিটিংএর সিদ্ধান্ত মোতাবেক এই কো-অর্ডিনেশন সম্পন্ন করা হয়।

 

মিটিং এর সিদ্ধান্ত মোতাবেক  পাকসেনাদের গেরিলা আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়। হাজার হাজার সমর্থ লোকজন স্বেচ্ছায় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দ্যায়। বর্ডার এলাকা দিয়ে নতুন নতুন অনেক ট্রেনিং সেন্টার গড়ে ওঠে। নিয়মিত বিরতিতে আমরা শত শত ট্রেনিংপ্রাপ্ত ছেলেদের পাচ্ছিলাম। ট্রেনিং প্রাপ্ত ছেলেরা সব সময় সম্মুখযুদ্ধে যেতে চাইত। পাকসেনাদের ক্রমাগত পরাজয়ে গেরিলা এবং স্থানীয় জনগণের মনোবল অনেক বৃদ্ধি পেল। তারা দুঃসাহসী ও ভয়ানক আক্রমণে গেরিলাদের সাহায্য করত। বেশী ঝুকিপূর্ন অপারেশনের দায়িত্ব পেলে তারা গর্ববোধ করত।

 

আগস্ট ৯ তারিখে আমাদের সৈন্যরা আন্দারমানিক বিওপি তে আক্রমণ চালায়। প্রায় ১ ঘণ্টা ধরে এই আক্রমণ চলে। নায়েক হারিছ মিয়া নেতৃত্ব নিয়ে অসীম সাহসের সাথে আক্রমণ চালান। কার্বাইন থেকে গুলি করতে করতে আর গ্রেনেড নিক্ষেপ করতে করতে তিনি এক বাঙ্কার থেকে অন্য বাঙ্কারে ছুটে যাচ্ছিলেন আর একাই পাকিস্তানীদের যথেষ্ট ক্ষতিসাধন করছিলেন। পাকিস্তানীরা কোন প্রতিরোধ করতে পারছিলনা এবং যুদ্ধে শেষে আমাদের সৈন্যরা তাদের প্রচুর হতাহত করে নিরাপদে ফিরে আসে।

 

জরাল্গঞ্জের নিকট পাতাকোর্টের কাছে আগস্টের ১০ তারিখ পাকসেনাদের একটি কোম্পানি আর রাজাকার মিলে একটি অ্যামবুশ পাতে। মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে ২০ জন গেরিলাদের একটি দল এদের সাথে যুদ্ধে একজন পাকসেনা নিহত, ২জন আহত ও ৩ জন রাজাকারকে আহত করে। পড়ে গেরিলারা নিরাপদে পালিয়ে যায়।

 

১৪ই আগস্ট ছিল পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস এবং এই দিনে আমরা বৃহৎ কিছু আক্রমণ ও এম্বুশের পরিকল্পনা করি। পাকিস্তানী হাই কমান্ডের পক্ষ থেকে তাদের সৈন্যদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়। আমরাও তাদের প্রস্তুতির কোথা জানতাম এবং সেভাবেই প্রস্তুতি নেই। তাদের স্বাধীনতা দিবসে ১ নং সেক্টরে পরিকল্পিতভাবে আমরা ১০টি আক্রমণ চালাই। ছাগলনাইয়া থেকে রামগড় পর্যন্ত এই আক্রমণ চলে। তাছাড়া অনেক অ্যামবুশ ও ছোট ছোট আক্রমণও চলে।

 

সবচেয়ে গুরুত্তপূর্ণ আক্রমণ হয় সুভাপুরের কাছে শ্রীনগরে। আগে থেকে এলাকাটি রেকু করা হয়। কমান্ড পোস্ট, এল এম গই ও মেশিনগান পোস্ট, রেশন ও অস্ত্রগুদামের অবস্থান সঠিকভাবে নির্নয় করা হয়। আমাদের বাহিনী ধীরে ধীরে ওদের কাছে পৌঁছে রকেট লাঞ্চার দিয়ে পোস্টগুলোকে ধ্বংস করে। তাই এই আক্রমণ বেশিক্ষণ ধরে চলেনি এবং কাজ শেষে গেরিলারা রাতের অন্ধকারে নিরাপদে ফিরে আসে। এক প্লাটুন সৈন্য দিয়ে অপারেশনটি চালানো হয় এবং ২ জন পাকসেনা নিহত ও ৪ জন আহত হয়। আমাদের সৈন্যরা কেউ আহত হয়নি।

২৫শে আগস্ট পূর্ব ওয়ালিনগরের কাছে আম্লিঘাটে আরেকটি আক্রমণ সঙ্ঘটিত হয়। পাকসেনাদের ৩ জন আহত হয়। আমাদের একজন সৈন্য সামান্য আহত হয়। কিন্তু তারা নিরাপদে ঘাঁটিতে ফিরে আসে।

 

২৮শে আগস্টে নিজামের নেতৃত্বে এফ এফ ১৫ গ্রুপ মিরসরাইয়ের কাছে একটি রেলওয়ে ট্র্যাকে মাইন সেট করে। সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে একটি পাকসেনা ও রাজাকারবাহী ট্রেন সেখান দিয়ে যাবার সময় বিস্ফোরণ ঘটে। এতে প্রায় ৩৫ জন পাকসেনা আহত হয়।

 

সেপ্টেম্বরের ৫ তারিখে চট্টগ্রামের একটি রাজাকার ক্যাম্পে আক্রমণ করে ৬ জন রাজাকার নিহত ও অনেক আহত করা হয়।

 

১২ই সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক বর্ডারের কাছে সমরখন্দ এলাকায় একটি অ্যামবুশ করা হয়। ১৯ রাজপুত ব্যাটালিয়নের (ইন্ডিয়া) একটি অংশ আমাদের সাথে অংশগ্রহণ করে। একটি পাকিস্তানী পেট্রোল দলের ৫ জন আহত হয় এবং বাকিরা যুদ্ধ না করে পালিয়ে যায়।

 

সেপ্টেম্বরের ১৪ তারিখে ইন্ডিয়ান আর্মি কমান্ডার লে জেন জগজিৎ সিং এর সাথে খুব গুরুত্তপূর্ণ একটি মিটিং হয়। একসাথে গারিলা ও নিয়মিত সৈন্যবাহিনী নিয়ে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়। সংক্ষেপে পরিকল্পনাগুলো নিম্নরূপ –

 

১। যেগুলোতে পাকসেনা কম আছে সেগুলো আগে দখল করা

২। প্রতিশোধমূলক আক্রমণ চালানো এবং তাদের ক্ষয়ক্ষতি করার চেষ্টা করা

৩। পাকসেনাদের যোগাযোগ ব্যাবস্থা ধ্বংস করা

৪। গেরিলা কার্যক্রম বাড়ানো

 

আমরা বুঝতে পারি, ভারতীয় কমান্ডারের এই সিধান্ত আসলে ভারতীয় সরকারেরই সিদ্ধান্ত। এতে আরও প্রমাণ হল যে ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকবাহিনীর যে কোন আক্রমণের জন্য প্রস্তুত আছে। এতে আমরা খুব অনুপ্রাণিত হলাম এবং আমাদের মনে হল আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তারা আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে যাচ্ছে।

 

সেপ্টেম্বরের ১৫ ও ১৬ তারিখে আমরা স্থানীয় ভারতীয় কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার সেহবাগ সিং এর সাথে বিস্তারিত আলোচনায় বসি। খালেদ মোশাররফ ও শফিউল্লাহ – ও সেখানে ছিলেন।

 

সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখ পরশুরামের কাছে আমজাদহাট এলাকায় আমাদের ১০ জন সৈন্য অ্যামবুশ করে। সেখানে পাকসেনাদের সাথে প্রায় ২ ঘণ্টা ধরে লড়াই চলে। নায়েক নাদিরুজ্জামান খুব সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেন এবং নিরাপদে অ্যামবুশ বাহিনীকে সরে যেতে সহায়তা করেন। পাকসেনাদের ৮ জন আহত হয়। আমাদের ১ জন ও আহত হয়।

 

সেপ্টেম্বরের ১৮ তারিখ শ্রীনগর এলাকায় ১৯ রাজ আরআইএফ এর কর্নেল শর্মার সাথে আমাদের প্রথম মিটিং হয়। বর্ডারের কাছে ভারতীয় সৈন্যদের সহায়তায় পাকসেনাদের ছোট কয়েকটি অবস্থান আমরা একসাথে মুক্ত করি। একসাথে কাজ করা খুব প্রয়োজন ছিল যাতে করে পাকসেনারা বর্ডার ক্রস করে পুনরায় আক্রমণ না চালাতে পারে। যদিও আক্রমণ বাংলাদেশ সৈন্যরাই করবে। তবে খুব জরুরি মুহুর্তে তারা আমাদের ফায়ার সাপোর্ট দেবে।

 

রাতে আমাদের সৈন্যরা গঊরঙ্গপাড়ায় অ্যামবুশ পাতে। ১৫ জনের বেশী পাকসেনা তাতে আহত হয়।

১৯শে সেপ্টেম্বর কর্নেল শর্মা এবং আমি পাকিসেনাদের অবস্থানগুলো সম্পুর্ণ রেকু করি। ভারতীয় আর্টিলারি কমান্ডারও আমাদের প্ল্যানে ছিলেন। মেইন হেডকোয়ার্টার ও সাব-সেক্টর থেকে আমরা আমাদের সৈন্য জোগাড় করি। যে মুহূর্তে আমরা অপারেশনের প্ল্যান করছিলাম অন্যন্য এলাকায় এবং বাংলাদেশের ভেতরে আরও গেরিলা অপারেশন চলছিল।

 

সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখ সুবেদার রহম আলি চম্পানগর বিওপিতে পাকসেনাদের উপর আক্রমণ চালান। সংক্ষিপ্ত আক্রমণের পর পাকসেনাদের ৩ জন আহত হয়।

 

পরের দিন ২১ শে সেপ্টেম্বর গুথুমা বিওপি তে অ্যামবুশ আক্রমণে আমরা ৩ পাকসেনাকে আহত করি এবং আমাদেরও ১ জন আহত হয়। খাজুরিয়াতে আরেকটি অ্যামবুশ আক্রমণে ১ জন পাকসেনা ও ১ জন রাজাকার নিহত হয়।    

 

২২শে সেপ্টেম্বর ১ প্লাটুন সৈন্য জয়চাদপুরে এম্বুশ করে। পাকসেনাদের একটি কোম্পানি এতে আক্রান্ত হয়। আমাদের ক্ষুদ্র অ্যামবুশ পার্টির জন্য এটা একটু বড় হয়ে যায়। আমাদের সৈনিক রুহুল আমি আহত হয় এবং আমরা ২টি রাইফেল, ১ টি মর্টার ও ১টি স্পেয়ার ব্যারেল এলএমজি হারাই। পাকিস্তানীদের কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। একই দিন সন্ধ্যায় শ্রীনগর এলাকায় ভারতীয় সেনাবাহিনী ও পাকসেনাদের মাঝে গুলিবিনময় হয়।

 

২৩শে সেপ্টেম্বরে ১০ম নৌ কমান্ডার ছোট ছোট নৌকা নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের অফ পোর্টে শত্রুজাহাজে মাইন সেট করতে যান। লম্বা দূরত্ব এবং বিক্ষিপ্ত সমুদ্র থাকার কারণে তারা সফল হতে পারেননি এবং অপারেশন বাতিল করতে বাধ্য হন। ফেরার পথে একজন কমান্ডো , মোহাম্মাদ হসেইন, ডুবে মারা যান। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা উপকুলে পাকসেনাদের কোস্টাল নেভি আক্রমণের জন্য ৩ জন কমান্ডোর সমন্বয়ে একটি দলকে পাঠানো হয়। পাকসেনারা সম্পূর্ণ সজাগ ছিল এবং আমাদের ২ জন কমান্ডো ধরা পড়ে যায়।

 

২৩শে সেপ্টেম্বর ভোর ৩-৩০ মিনিটে এক কোম্পানি সৈন্য বল্লভপুরে পাকসেনাদের আক্রমণ করে। ক্যাপ্টেন মাহফুজের নেতৃত্বে আরেকটি দল চাম্পাকনগরে পাকসেনাদের উপর আক্রমণ করে। আক্রমণের প্রথমে আর্টিলারি বাহিনী ১০ মিনিট গুলি চালায়। পাকসেনাদের শক্তিশালী ডিফেন্স প্রস্তুত ছিল এবং বাঙ্কারগুলোও প্রস্তুত ছিল। তাই আর্টিলারি বাহিনী ব্যার্থ হয়। এরমধ্যে পাকসেনারা আরও সৈন্য সমাবেশ করে ভারি আর্টিলারি দিয়ে কারেরহাটে আমাদের অবস্থানগুলোর উপর আক্রমণ চালায়। কয়েকবার চেষ্টা করে না পেরে শেষ পর্যন্ত আমরা আক্রমণ বন্ধ করি। আমাদের ১ জন নিহত ও ২ জন আহত হয়। একজন ভারতীয় সেনা আহত হয় পাকসেনাদের ক্রমাগত বোমাবর্ষনের কারণে। আমাদের আক্রমণ ব্যার্থ হয়ে যায়।

 

সেদিন সন্ধ্যায় পশ্চিম দেভপুরে একটি এম্বুশে ২ জন পাকসেনা নিহত হয়।

 

সেপ্টেম্বর ২৫ তারিখে সকাল ৭টায় ঘথুমায় আমাদের ১৫ জন গেরিলার এম্বুশে ৩ জন পাকসেনা আহত হয়। ঐ রাতে চম্পকনগর বিওপি তে আরেকটি আক্রমণে ৫ জন পাকসেনা আহত হয়। রকেট লাঞ্চার ব্যবহৃত হয় এবং অনেক বাঙ্কার ধ্বংস করা হয়।

 

২৬শে সেপ্টেম্বর গুথুমা বিওপি তে আক্রমণ করা হয়। আমাদের সৈনিক নায়েক হারিস মিয়া হামাগুড়ি গিয়ে কয়েক গজ দূরের একটি বাঙ্কারে গ্রেনেড ঢুকিয়ে দ্যায়। অন্যরাও কয়েক দিক দিয়ে আক্রমণ চালায় এবং পড়ে রাতের অন্ধকারে নিরাপদে সরে আসে। ২ জন পাকসেনা আহত হয়।

 

২৬শে সেপ্টেম্বর সকাল ১০-৩০ মিনিটে দেভপুরে আরেকটি এম্বুশে ৬ জন পাকসেনা আহত হয়। একজন সাধারণ জনগণ আহত হয় এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষনের ফলে।

 

ফেনি নদীতে আন্দারমানিক বিওপি ছিল পাকসেনাদের শক্তিশালী অবস্থান। প্রতি সন্ধ্যায়  সকালে সৈন্যরা ফল-ইন এবং সকালে রোল-কল করা হয়। এই খবরে আমাদের একটি এম্বুশ পার্টি বিওপি তে এম্বুশ পাতে। রোল-কল শেষের সাথে সাথে এলএমজি ও রাইফেল দিয়ে আক্রমণ শুরু হয়। এই সময়ে পাকসেনারা তাদের ট্রেঞ্চ ও বাঙ্কারে লুকানোর চেষ্টা করে। ১ জন জেসিও সহ মোট ১৫ জন আহত হয়। সর্বমোট ২ প্লাটুন পাকসেনাকে রোলকলের জন্য একত্রিত করা হয়।

 

২৯ শে সেপ্টেম্বর ভোর ৫টায় পূর্বমধুপুরে গেরিলাদের একটি দল অ্যামবুশ পাতে। ৩ টি রসদপূর্ণ পাকসেনাদের বাহন অ্যামবুশে আক্রান্ত হয়। কিন্তু পাকসেনাদের কেউ এতে আহত হয়নি।

 

সেদিন রাত ১১-৩০টায় বল্লভপুড় ও ছাগলনাইয়া তে আক্রমণ চালানো হয়। বল্লভপুরে পাকিস্তানীদের হতাহতের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ভারতীয় আর্টিলারি বাহিনীর সহায়তায় ছাগলনাইয়াতে আক্রমণ চালানো হয়। এতে ৫ জন পাকসেনা নিহত ও ৭ জন আহত হয়। একজন পাক অব্জার্ভার আমাদের দিকে আর্টিলারি ফায়ার চালানোর জন্য গাছের উপরে অবস্থান নেয়। কিন্তু আমাদের বাহিনী তাকে সনাক্ত করে এবং গুলি করে নিষ্ক্রিয় করে।

 

পরের দিন সকাল ৪টায় চম্পকনগরের একটি কাল্ভার্ট উড়িয়ে দেয়া হয়। এতে পাকসেনাদের রেশন ও রসদ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।

 

১লা অক্টোবর নিজামের নেতৃত্বে ১৬ জন গেরিলাদের একটি দল মিরসরাইয়ে দুর্গাপুর হাই স্কুলের একটি ক্যাম্পে আক্রমণ চালায়। ক্যাম্পটি মূলত রাজাকারদের ছিল এবং নানা রকম নৃশংসতা ও নির্যাতনের জন্য এটি খুব ভয়ংকর হিসাবে পরিচিত ছিল। কয়েকদিন পর্যবেক্ষনের পর গেরিলারা রাতে ক্যাম্পটি আক্রমণ করে প্রায় ১ ঘণ্টা যুদ্ধ চলে। ২০ জন রাজাকার নিহত হয় এবং ৭টি রাইফেল জব্দ করা হয়। কয়েকজন রাজাকার প্রথম দিকে প্রতিরোধের চেষ্টা করে কিন্তু অনেকেই রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যায়। এই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা ফরিদ নিহত হয় কিন্তু মৃত্যুর পূর্বে সে বলে যায় যে সে নিজে ১০ জনকে মেরেছে।

এর আগে সকাল ১০-৩০ মিনিটে গুথুমার কাছে আরেকটি গেরিলা দল শত্রুচলাচলের পথে  অ্যামবুশ পাতে। একজন পাকসেনা নিহত হয় এবং বাকিরা লাশ ফেলে রেখেই পালিয়ে যায়। প্রকাশ্য দিবালোকে এমন সফলতায় আমরা উদ্দীপ্ত হই এবং গেরিলাদের সক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের আরও আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। আমরা আরও বড় অপারেশনে গেরিলাদের যুক্ত করার ব্যাপারে তাদের উপর নির্ভর করা শুরু করি।

 

পরের দিন চম্পকনগর বিওপি তে রাতে আক্রমণ করা হয়। এতে ২ জন পাকসেনা নিহত হয়। আমাদের একজন সৈন্য গুলিবিদ্ধ হয়ে মারাত্মক আহত হয়।

 

অক্টোবরের ৩ তারিখে খুব সকালে বেলনিয়ার আমজাদনগরে এম্বুশ করা হয়। শত্রুপক্ষের একটি দল খুব সম্ভবত খাদ্য আনার জন্য কোম্পানি হেডকোয়ার্টারের দিকে যাচ্ছিল। সকাল ৫টায় এম্বুশ করা হয়। এই আক্রমণে পাকসেনাদের ২ জন গুরুতর আহত হয় এবং নাকিরা তাদের বহন করে নিয়ে যায়। পরে জানা যায় যে ঐ দুজন পাকসেনা পরে নিহত হয়।

 

সেই রাতে কারেরহাটে করালিয়া টিলার নিকটে আরেকটি এম্বুশ পাতা হয়। পেট্রোল ডিউটি করার সময় ২ জন পাকসেনা ও ৩ জন রাজাকার নিহত হয়। আমাদের বাহিনীর পরে নিরাপদে ফিরে আসে।

 

বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সময়ে এম্বুশ আক্রমণ চলছিল। আমরা ছোট আকারে কয়েকটি পাক ক্যাম্পে আক্রমণ চালানোর পরিকল্পনা করছিলাম যাতে সেগুলো আমরা দখল করে পরে মিলিটারি আক্রমণ চালাতে পারি। আমার সেক্টরে পরশুরামের অবস্থানটিকে প্রথম টার্গেট হিসাবে ধরা হয়। ৩রা অক্টোবর সকাল থেকে আমরা রেকু করা শুরু করি। অক্টোবরের শুরু থেকে আক্রমণ ও অ্যামবুশের সংখ্যা, তীব্রতা এবং দুর্ধর্ষতা বাড়ার সাথে সাথে পাকসেনাদের জোর ও মনোবল কমতে থাকে। রেকু করার সময় একজন ভারতীয় অফিসার ও আমি পাকসেনাদের মেশিনগান ও মর্টাররের আক্রমণের শিকার হই। এলোমেলো গুলিতে একজন সাধারণ জনগণ ও আহত হয়। অক্টোবর এর শুরু থেকে এই ধরনের ঘটনা বাড়তে থাকে।

 

৪ঠা অক্টোবর থেকে আরও কয়েকটি অবস্থান রেকু করা শুরু হয়। একই সাথে আমরা আমাদের বাহিনীর শক্তি পরিমাপ করি।

 

নিয়মিত সৈন্যরা যুদ্ধের শুরুতে সামনে থাকত। তাই তারা তেমন বিশ্রাম নেবার সময় পেতনা। এভাবে সব সময় ব্যাস্ত থাকার জন্য তাদের সক্ষমতা কমতে থাকে। তাই তাদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম, রিগ্রুপিং দরকার ছিল। কিন্তু নিয়মিত সৈন্য সংখ্যা কম হবার কারণে আমরা তাদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিতে পারছিলাম না। বরং এদের দিয়েই সকল মিলিটারি কার্যক্রম চালাচ্ছিলাম।

 

গেরিলারাও অনেক চাপের সম্মুখীন হয়। তাদের মোটামুটি ট্রেনিং ছিল। এই দুর্বলতা আমরা তাদেরকে মানসিক ভাবে উৎসাহ দিয়ে এবং স্বাধীনতার কথা বলে পূরণ করার চেষ্টা করতাম। তারপরও আমরা লক্ষ্য করলাম কিছু নির্দিস্ট ভীতি তাদের ক্ষমতাকে দূর্বল করছে। এই ভয় তাদের নিজেদের নিরাপত্তাহীনতার জন্য নয়। তারা ভয় করত পাকসেনারা সাধারণ জনগণের উপর যে আক্রমণ চালাত সেটা নিয়ে। গেরিলা অপারেশন চালানোর পর চারপাশের সাধারণ জনগণের উপর তারা নির্যাতন করত। সেইজন্য যেখানে পার্শ্ববর্তী সাধারণ জনগণের বসবাস ছিল সেখানে গেরিলা অপারেশন চালাতে তাদের একটু অনিচ্ছা কাজ করত।

 

এই দুর্বলতার কারণে সেই এলাকার রাজাকাররা আরও সুবিধা পেয়ে যেত এবং নানা রকম অত্যাচার চালাতো। এর পরও আমরা নিতমিত ও গেরিলা অপারেশন চালিয়ে গেছি।

 

৪ঠা অক্টোবর সকাল ১০টায় গুথুমা বিওপি এর কাছে ২ জন পাকসেনা নিহত হয়। পরের দিন একজন সিনিয়র ভারতীয় অফিসার আমাদের হেড কোয়ার্টারে আসেন ভবিষ্যতের অপারেশনের সমন্বয়ের ব্যাপারে। ঐ দিন সকাল ১১টায় পূর্ব দেবপুর বিওপি তে অ্যামবুশে ২ জন পাকসেনা নিহত হয়। আমাদের একজন সৈন্য সামান্য আহত হয়।

 

৬ই অক্টোবর শ্রীনগরে নিয়োজিত ব্রিগেডিয়ার সেহবাগ সিং এবং আরও কয়েজন ভারতীয় সেনা অফিসার জায়গাটি রেকু করেন। ওইদিন দুপুর ২-৪৫ মিনিটে গেরিলারা ছাগলনাইয়া ও মুহুরিগঞ্জের মাঝে একটি ব্রিজ উড়িয়ে দ্যায়।

 

একই সময়ে করিমগঞ্জ বাজার হাই স্কুলে পাকসেনাদের একটি অবস্থানে আক্রমণ করে। এতে ৩ জন পাকসেনা, ৫ জন রাজাকার এবং ১ জন সাধারণ জনগণ নিহত হয়।

 

ওইদিন বিকাল ৩ টায় আমি মেলাঘরে ২নং সেক্টরের হেডকোয়ার্টারে সমন্বয় মিটিং এ যাই। সেখানে সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররাফ ছিলেন। সেখানে জানতে পারি ছাগলনাইয়াতে পাকসেনারা বিপুল পরিমাণে সমবেত হয়েছে।

 

সাথে সাথে আমরা আর্টিলাড়ি বাহিনী দিয়ে আক্রমণ শুরু করি। পরে প্রচুর হতাহতের খবর পাই।

৭ অক্টোবর দিনের বেলা ২ নং সেক্টরে বেলোনিয়াতে একটি অ্যামবুশ করা হয়। ক্ষণস্থায়ী এই যুদ্ধে ২ জন পাকসেনা ও ৩ জন রাজাকার নিহত হয়।

 

এর একটু পূর্বে সারবন এলাকাতে পাকসেনারা সনি সমাবেশ করে এবং কিছু মর্টার আনে। এতে আমাদের কিছু রিফুজি ক্যাম্প ও হাসপাতাল মর্টারের সীমানার ভেতর এসে যায়।

 

অক্টোবর ৬ তারিখে কয়েকটি আক্রমণ ও অ্যামবুশ চালানো হয়। চট্টগ্রাম শহর থেকে কয়েক মাইল দূরে হালদা নদীর উপরে মধুনা ঘাটে একটি বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন ছিল। মেইন ক্যাম্প থেকে প্রায় ৭০ মাইল দূরে গিয়ে আমাদের একটি দল ২টি ট্রান্সফর্মার ধ্বংস করে। সিপাহি মান্নান আসল শেল টি নিক্ষেপ করেন যাতে ট্রান্সফর্মার ধ্বংস হয়। কিন্তু পরে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। পরে অবশ্য সে সুস্থ হয়ে যায়।

 

সকাল ৮টার সময় ছাগলনাইয়া বিওপি তে আরেকটি আক্রমণ সঙ্ঘটিত হয়। রাতে আমাদের একটি বাহিনী শত্রু অবস্থানের খুব কাছে গিয়ে শুয়ে থেকে অপেক্ষা করে। সেসময় খুব বেখেয়ালে পাকসেনারা বাঙ্কার রেডি করছিল। সেসময় আমাদের দল আক্রমণ চালায় এবং ৩ জন পাকসেনা নিহত হয়। আমাদের একজন আহত হয়েছিল।

 

সন্ধ্যা ৬টার দিকে হামাগুড়ি দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কে পার্ক করে রাখা দুইটি যানের দিকে এগিয়ে যায়। সেখানে কিছু সৈন্য গোলাবারুদ নামাচ্ছিল। গেরিলারা হ্যান্ড গ্রেনেড ছুড়ে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যায়। একজন পাকসেনা ভীষণ জখম হয় এবং গাড়িগুলো খারাপভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

 

অক্টোবর ৭ তারিখে গেরিলারা ছাগলনাইয়া – বেলোনিয়া সড়কের একটি সেতু উড়িয়ে দ্যায়। এটা করা হয়েছিলো পাকসেনাদের বেলোনিয়াতে আলাদা করে দেবার জন্য। সেতুটি হাল্কা অস্ত্র, এলএমজি ও মেশিনগান সমৃদ্ধ পাকসেনারা পাহারায় রেখেছিল। কিন্তু প্রচুর গোলাগুলির পর গেরিলারা সফল হয়। ওইদিন গেরিলারা রাধানগর তহসিল অফিস গুড়িয়ে দ্যায় এবং মকামিয়াতে পাকসেনাদের আক্রমণ করে। ২ জন পাকসেনা সেখানে নিহত হয়।

 

অক্টোবর ৮তারিখে সকাল ৮-৩০টায় পূর্ব দেবপুরে একটি অ্যামবুশ করা হয়। একটি পাক পেট্রোল কাছাকাছি আসতেই আক্রমণের শিকার হয়। ৩ জন পাকসেনা নিহত ও ১ জন আহত হয়। গেরিলারা কোন ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই ফিরে আসে।

 

৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় ঘুতুমায় পাকসেনাদের অবস্থানের পাশে একটি দল অপেক্ষা করতে থাকে। সেই সময়টা ছিল পাকসেনাদের সান্ধ্যকালিন রোল-কলের। রোল-কল শেষ হবার সাথে সাথে এলএমজি ও ২ইঞ্চি মর্টার দিয়ে আমাদের বাহিনী তাদের উপর আক্রমণ করে। ১০ জন পাকসেনা আহত হয়। গেরিলারা রাতের অন্ধকারে নিরাপদে ফিরে আসে।

 

অক্টোবর ৯ তারিখে সন্ধ্যা ৭-৩০ মিনিটে ঘুতুমা বিওপি তে একটি আক্রমণ করা হয়। একজন মিলিশিয়া নিহত ও ১ জন পাকসেনা আহত হয়।

 

সেই রাতে সামনের আরও কিছু এলাকা আমি রেকু করি। হেডকোয়ার্টারে ১৯ রাজ আরআইএফ এর কর্নেল শার্মার সাথে দেখা হয়। আমরা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করি। সেই দিন পর্যন্ত ভারতীয় সেনাবাহিনীর লক্ষ্য ছিল কোনভাবেই পাকসেনারা যাতে মুক্তিযোদ্ধা খোঁজার নাম করে আন্তর্জাতিক বর্ডার পার হতে না পারে। পাশাপাশি তারা আমাদের সীমিত আকারে নানারকম আক্রমণ ও অ্যামবুশে সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত ছিল। আলোচনার শেষ দিকে ক্যাপ্টেন মাহবুব আমাদের একটি সুখবর দেবার জন্য রুমে প্রবেশ করলেন। প্রায় ১০ দিন আগে আমরা ধুমঘাট ও মুহুরিগঞ্জের মাঝে একটি রেলওয়ে ব্রিজ উড়িয়ে দেবার জন্য কিছু গেরিলা পাঠাই। ব্রিজটি সব সময় পাহারায় থাকত। তাই কাজটি কঠিন ছিল। ইচ্ছা করেই আমরা ঐ এলাকায় এই কয়দিন কোন আক্রমণ চালাইনি যাতে করে পাহারাদাররা অসতর্ক হয়ে থাকে। অনেকগুলো গেরিলাকে পার্শবর্তী গ্রামে অবস্থান করে পাকসেনাদের গতিপথ লক্ষ্য করতে বলা হয়েছিল এবং আক্রমণের সঠিক সময় বের করতে বলা হয়েছিল। তাছাড়া আক্রমণকারী বাহিনীর জন্য নিরাপদ বেইস, টার্গেট পর্যন্ত পৌঁছাতে সহায়তা করা এবং আক্রমণ শেষে নিরাপদে ঘাঁটিতে ফিরে আসার দায়িত্বও তাদের ছিল। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে রেইডিং পার্টি ও ডিমলিশন এক্সপার্ট দের সেখানে পাঠানো হয়। সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টারের কাছে একটি ব্রিজে তারা রিহার্সাল করে। টার্গেট থেকে ১ মাইল দূরে ২টি পরিত্যাক্ত খামার বাড়িতে তারা অবস্থান নেয়। এরপর মূল গেরিলা গ্রুপটি ভেতরে যায় এবং টার্গেটে পৌঁছে। সেখানে কয়েকদিন ধরে তারা রেকু করে – সেন্ট্রি কখন কি করে, ডিউটির সময়, ডিউটি পরিবর্তনের সময় ইত্যাদি। শেষে ৬ অক্টোবর রাতে আক্রমণ শুরু হয়। ব্রিজটি অংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছিল – তবে ঢাকা- চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগ পুরপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

 

সে সময়ে গুজব ওঠে রাজনীতিবিদের একটি অংশ যারা রাজাকার ছিল তারা শান্তিপূর্ণ অবস্থানের আগ্রহী। এতে আমাদের সৈন্য, গেরিলা ও সাধারণ জনগণ খুব চমকিত হল। রাজাকারদের যোগ্য শাস্তি দরকার ছিল। পাকিস্তানীরা সংলাপের পথ বন্ধ রেখেছিল। বাহিনীকে আক্রমণ তীব্রতর করে বিজয় ছিনিয়ে আনতে নির্দেশ দেয়া হয়।

 

অক্টোবর ১০ তারিখে গেরিলারা বড়বাজারে একটি পাক অবস্থানের উপর আক্রমণ চালায় এবং ৬ জন আহত হয়।

 

অক্টোবর ১২ তারিখে পরশুরাম এলাকায় পাক অবস্থানে আক্রমণ করা হয়। ২ জন পাহারাদার নিহত হয় এবং ১৫ মিনিট যুদ্ধের পড় গেরিলারা ফিরে আসে।

 

৯-৩০ মিনিটে ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডে গেরিলারা অ্যামবুশ পাতে। এতে ২ জন পাকসেনা নিহত ও ১ জন আহত হয়।

 

ঐ রাতে পাকিস্তানী প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানী রেডিওতে ঘোষণা করেন যে পাকিস্তানের সমস্ত বর্ডারে ইন্ডিয়ান আর্মি ঘিরে রেখেছে এবং কমান্ডো অপারেশন চালিয়ে সড়ক ও রেলওয়ে ব্রিজ ধ্বংস এবং বিদ্যুৎ লাইন ধ্বংস করছে। এই বক্তব্য থেকে আমরা বুঝতে পারি যে তিনি আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা কার্যক্রমকে উল্ল্যেখযোগ্যভাবে লক্ষ্য করছেন এবং এইসকল ঘটনা তাঁর অহং এ লাগে। পাশাপাশি তাঁর স্বপ্ন ধ্বংসের পথে কাজ করে।

 

১৪ অক্টোবর পূর্বঅংশের সেক্টর কমান্ডাররা আগরতলা যান তৎকালীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিকে রিসিভ করতে। তারা ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে পৌঁছেন। আমরা সংক্ষেপে আমাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ স্বল্পতা সম্পর্কে আলোচনা করি। পাকিস্তানীপন্থীদের সাথে শান্তিপূর্ণ অবস্থানের গুজবটিও আলোচনায় আসে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সেটা নাকচ করে দিয়ে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বজায় রাখতে বলেন। কোন প্রকার সাময়িক স্বাধীনতা প্রস্তাব ও গ্রহণ করা হবেনা বলে তিনি আমাদের নিশ্চিত করেন।

 

অক্টোবর ১৫ তারিখে আমাদের বাহিনী বল্লভপুর, দারগাহাট ও ছয়ঘরিয়া তে আক্রমণ চালায়। এতে ৬ জন পাকসেনা ও অনেক রাজাকার এবং মিলিশিয়া নিহত হয় এবং ৮ জন আহত হয়।

 

অক্টোবর ১৬ তারিখে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন সাহেব শ্রীনগর এলাকা পরিদর্শন করেন। এটি পাকসেনাদের অবস্থান থেকে মাত্র ১ মাইলের দূরত্বে এবং তাদের মর্টার রেঞ্জের ভিতরেই ছিল। সেদিন রাজনৈতিক নেতা মোশাররফ হোসেন এমসিএ এর নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমান্ডো গ্রুপ চালু করা হয় বাংলাদেশের ভেতরে। তাদের কাজটি হল চট্টগ্রামের নৌঘাঁটিতে অবস্থিত ফুয়েল ডাম্প ধ্বংস করা।

 

১৭ অক্টোবর সকালে জগন্নাথ সোনাপুর গ্রামের কাছে গেরিলারা এম্বুশ করে।  সেখানে ২ইঞ্চি মর্টার ও এলএমগজি ছিল। ২ জন পাকসেনা ও ৩ জন মিলিশিয়া নিহত হয়। বেলনিয়া দেবপুর বিওপি তে আরেকটি এম্বুশ করা হয়। সেখানে ৩ জন পাকসেনা নিহত হয়। আমাদের দিকে সিপাহি আমজাদ আলি (বিডিআর ১১ উইং) মারাত্মকভাবে জখম হন।

 

১৭ অক্টোবর সকাল ৫-৩০ মিনিটে আমাদের গেরিলারা পূর্ব দেবপুর এলাকায় এম্বুশ করে। আধা ঘণ্টা ধরে যুদ্ধ চলে এবং ৩ জন পাকসেনা নিহত  হয়। ওইদিন আমি ভারতীয় সেনাবাহিনীর অফিসার লে কর্নেল বিশ্রার সাথে আলোচনা করে পাক সেনাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত যুদ্ধের পরিকল্পনা করি। সেনামোতায়েন, বিন্যাস, আক্রমণ ও গুলির নিয়ম – প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভেতর সমন্বয়ের আরও দরকার ছিল। এই সমন্বয়ের অভাবে ভারতীয় আর্টিলারি ভুলক্রমে আমাদের অবস্থানের উপর আক্রমণ করে বসে এবং ছাগলনাইয়াতে আমাদের ৪ জন সৈন্য আহত হয়।

 

১৮ অক্টোবর প্রথম প্রহরে আমরা গুথুমা বিওপি তে আক্রমণ করি। প্রথমে ৩ইঞ্চি মর্টার থেকে ৫০ রাউন্ড গুলি করা হয়। পাকিস্তানীরা তখন তাদের আর্টিলারি দিয়ে আমাদের উপর আক্রমণ শুরু করে। আধা ঘণ্টা ধরে যুদ্ধ চলে এবং ১০ জন পাকসেনা নিহত হয়। আমাদের ২ জন জখম হয়। সিপাহি লতিফ গুরুতর আহত হন এবং বেলোনিয়া হাসপাতালে পাঠালে পরে তিনি শহিদ হন।

 

ওইদিন সকালে মাতুয়া গ্রামে অন্য এক আক্রমণে ৩ জন পাকসেনা নিহত হয়।

 

২১শে অক্টোবর সকালে আমজাদনগরে ১০-৩০ মিনিটে অ্যামবুশ করা হয়। ১ জন পাকসেনা নিহয় ও ৩ জন মিলিশিয়া আহত হয়। এলপাতাড়ি গুলিতে একজন স্থানীয় সাধারণ লোক নিহত হন। ওইদিন ৫টি রিকশায় এক গ্রুপ পাকসেনা এবং মিলিশিয়া চাদগাজি যাচ্ছিল। ১২-৩০ মিনিটে সেখানকার গেরিলারা তাদের আক্রমণ করে। ৩ জন পাকসেনা নিহত হয়। একজন রিকশা চালকও নিহত হয়।

রামগড়ের কাছে বারো পানুয়া তে অন্য একটি এম্বুশে ৫ জন পাকসেনা নিহত হয়।

 

এবং মিরধরবাজারে ২ প্লাটুন সৈন্য অ্যামবুশ করে থাকে পাকিস্তানী একটি পেট্রলের অপেক্ষায়। কাট-অফ পার্টি হিসাবে দক্ষিণ যোধপুরে একটি গেরিলা বাহিনীও পাঠানো হয়। পাকিস্তানী বাহিনী এম্বুশের কাছে আসলে তীব্র গুলির শিকার হয়। যুদ্ধ চলতেই থাকে এবং ছাগলনাইয়া থেকে যোধপুর পর্যন্ত পাকসেনারা সমবেত হতে থাকে। এই দুইটি এম্বুশে আমাদের বাহিনী ২ ইঞ্চি মর্টার, এলএমজি ও রাইফেল ব্যাবহার করে। পরে জানা যায় ১০ জন পাকসেনা নিহত হয়েছে এবং ১৫ জন আহত হয়।

 

২২ শে অক্টোবর বড়পানুয়াতে আরেকটি এম্বুস করা হয়। ৩ জন পাকসেনা জখম হয় এবং গেরিলারা ১টি এলএমজি , কিছু ৩০৩ রাইফেল এবং গোলাবারুদ উদ্ধার করে। ওইদিন কিছু ভারতীয় মিডিয়াম গান বর্ডারের দিকে অগ্রসর হয়। ভারতীয় হেডকোয়ার্টারও সামনে আগানো হয়। পুরো বর্ডার জুড়ে প্রচুর রসদ ও যন্ত্রপাতি জড়ো করা হয়।

 

২৭শে অক্টোবর গুথুমাতে একটি অ্যামবুশে ১ জন পাকসেনা জখম হয়। ঐ রাতে লে রকিবের নেতৃত্বে একটি কোম্পানি বাংলাদেশের ভেতরে পাঠানো হয় – মিরসরাই ও চট্টগ্রামের মাঝখানে গেরিলা অপারেশন চালানোর জন্য। চট্টগ্রামের একজন এম পি ডা মান্নান এই গ্রুপের সাথে যান।

 

২৮শে অক্টোবর একটি দল দেবপুর বিওপি তে অ্যামবুশ করে। সকাল ৮তার দিকে পাকসেনারা কিছু রেশন ও গোলাবারুদ একটি গরুর গাড়ি থেকে নামাচ্ছিল। সেই সময়ে আমাদের গেরিলারা আক্রমণ করলে ২ জন পাকসেনা ও ২ জন রাজাকার নিহত হয়।

 

অক্টোবরের শেষ দিনগুলো আমাদের এবং ভারতীয় সৈন্যদের জন্য খুবই ভোগান্তির ছিল। আমরা পাকসেনাদের অবস্থানের উপর অনেক অপারেশনের প্ল্যান করি। ছোট ছোট গুলিবিনিময় প্রায়শই হচ্ছিল। এলোমেলো আর্টিলারি ফায়ারের জন্য সাধারণ লোকজন জখম হচ্ছিল। পাকিস্তানীরা সাধারণ জনগণের উপর বিনা কারণে ক্রমাগত গোলাবর্ষণ করছিল।

 

সকল ভারতীয় সেনা তাদের যুদ্ধের অবস্থান নিচ্ছিল।

 

শান্তির বাজারে ৮৩ ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে ১লা নভেম্বর একটি খুব গুরুত্তপূর্ণ কনফারেন্স হয়। এই প্রথম বারের মর্ম ভারতীয় সৈন্যদের বাংলাদেশের সীমানার ভেতর ঢুকতে দেয়ার অনুমতি দেয়া হয়, রক্ষণভাগ দখল এবং বাংলাদেশ ফোর্সের অন্যন্য দায়িত্ব ও কাজ নেবার অনুমতি দেয়া হয়। ভারতের ৮ বিহার রেজিমেন্ট ও ২ রাজপুত ব্যাটালিয়ন স্থায়ী ঘাটি তৈরি করে বেলনিয়াতে। এখান থেকে আমাদের সৈন্যদের পরিচালনা করা এবং গুরুত্তপূর্ণ অবস্থান দখল করে পাকিস্তানীদের বেলনিয়া ও পরশুরাম এলাকায় পৃথক করার প্ল্যান করা হয়। ৫/৬ তারিখ রাত আক্রমণের জন্য নির্ধারন করা হয়। সেই পর্যন্ত আমরা এখানে সেখানে ছোট ছোট অপারেশন চালিয়ে যাচ্ছিলাম যাতে পাকিস্তানীরা বড় কোন অপারেশন সম্পর্কে ধারণা করতে না পারে।

 

৩রা নভেম্বর গেরিলাদের একটি গ্রুপ রানিরহাট রাংমতি রোডে একটি ব্রিজ ধ্বংস করার চেষ্টা করে। হঠাত সেখানে পাকিস্তানী পেট্রোল, মিলিশিয়া ও রাজাকাররা এসে পড়ে। পরিমল সরকার নামে একজন গেরিলা ধরা পড়ে এবং পার্শবর্তী পাকিস্তানী ক্যাম্পে তাকে নেয়া হয়। বাকি গেরিলারা সাথে সাথে ক্যাম্পে আক্রমণ চালায় এবং পরিমলকে মুক্ত করে। ৪ জন পাকসেনা সেখানে নিহত হয়। একজন গেরিলা আহত হয়।

 

নভেম্বর ৫ তারিখ রাত ৮-৩০ টায় পাকিস্তানীদের বেলনিয়াতে কাটঅফ করার অপারেশন শুরু হয়। অন্য কোথাও এই অপারেশনের কথা বিস্তারিত লেখা আছে।

 

৬ নভেম্বর সকালে গেরিলারা অন্ধ্রমানিক বিওপি তে আক্রমণ করে। এতে তারা ২ইঞ্চি মর্টার ও ৭৩ মি মি রকেট ব্যাবহার করে। ৩ জন পাকসেনা জখম হয়।

 

৬ নভেম্বর দুর্গাপুর মির সরাই পুলিশ স্টেশনের কাছে গেরিলারা পাকিস্তানী পেট্রলের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। ১৫ মিনিট ধরে যুদ্ধ চলে। ১ জন পাকসেনা নিহত ও ২ জন আহত হয়। আমাদের অংশে মজাম্মেল হক গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। আমাদের গ্রুপ তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে এবং গোপনে তাঁর মেডিকেল চিকিৎসা চলে।

 

৭ নভেম্বর পাকসেনারা ২ প্লাটুন সৈন্য নিয়ে আমাদের আক্রমণ করে বেলনিয়াতে। হাবিলদার আলি হোসেন ও তাঁর দল আক্রমণের জবাব দেন। তারা একটি বড় পুকুরের পাশে অবস্থান নেন। তাদের অবস্থান শক্তিশালী ছিল এবং পুরো অংশ অস্ত্রসজ্জিত ছিল। পাকসেনাদের সফল আক্রমণ ফিরিয়ে দেয়া হয়।

 

বেলনিয়াতে আরেকটি কাউন্টার আক্রমণে আমাদের ৩ জন সৈন্য ও প্লাটুন কমান্ডার নিহত হন এবং বাকি সৈন্যরা সরে যেতে চেষ্টা করে। এই সময়ে ইপিআর সুবেদার গনি সামনে এগিয়ে আসেন। গনি সাহসী আক্রমণ শুরু করেন। ফলে অবস্থানটি আমরা পুনর্দখল করি এবং অবস্থা আমাদের আয়ত্তে আসে।

 

৮ নভেম্বর গেরিলারা রামগড়-কারেরহাট রোডে অ্যামবুশ পাতে। উঁচু জায়গায় থাকার কারণে অ্যামবুশ পার্টি এলএমজি, কার্বাইন ও হ্যান্ড গ্রেনেড ছুড়ে আক্রমণ করে। ৪ জন পাকসেনা নিহত ও ২ জন আহত হয়।

 

নভেম্বর ১২ তারিখে এক প্লাটুন সৈন্য চম্পকনগর এলাকার বিশ্বনাথে অ্যামবুশ করে। সকাল ১০টায় ২টি সেকশনের পেট্রল আক্রমণের শিকার হয়। ৭ জন পাকসেনা নিহত ও ১ জন আহত হয়। বাকিরা পালিয়ে যায়। একজন আহত মিলিশিয়া আমাদের হাতে বন্দী হয়। পথিমধ্যে সে মারা যায় এবং আমরা তাকে পথেই কবর দেই।

 

১৬ই নভেম্বর পূর্ব দেল্পুর বিওপি তে আক্রমণ করা হয়। প্রায় ১ ঘণ্টা ধরে এটা চলে। সেই সময়ে সেখানে মূলত মিলিশিয়ারা ছিল। ৩ জন পাকসেনা নিহত হয়। ৭ জন রাজাকার আমাদের বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করে। প্রচুর পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ আমাদের দখলে আসে।

 

১৭ই নভেম্বর মউনিদ্দিনের নেতৃত্বে গ্রুপ ১৯ মিরসরাইয়ে পাকসেনাদের উপর এম্বুস করে। ৩ জন হখম হয়। আমাদের একজন গেরিলা সামান্য আহত হয়।

 

১৮ই নভেম্বর কর্নফুলি টি এস্টেট এ আক্রমণ চালানো হয়। ৬ জন পাকসেনা আহত হয়। ওইদিন ফটিক’ছড়িতে একটি অপারেশনে ২ জন পাকসেনা নিহত হয়। আমাদের বাহিনী ৬০টি রাইফেল, ১টি এল এম জি , ২টি স্টেনগান এবং প্রচুর গোলাবারুদ পায়। ১১ জন পাকিস্তানী পুলিশ বন্দী করা হয়।

 

২০ নভেম্বর ১৮১ ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে সম্মিলিত সামরিক আক্রমণের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সেই সময়ে সৈন্যসংখ্যা, যানবাহন, মজুদ এবং অন্যান্য সরঞ্জাম উভয় পক্ষেই প্রচুর পরিমাণে ছিল। মনে হচ্ছিল আমাদের চূড়ান্ত যুদ্ধের প্রস্তুতি প্রায় শেষ। কয়েকটি অবস্থান পরিদর্শনের পড় আমি হেডকোয়ার্টারে ফিরে আসি। বাহিনী সে সময়ে তাদের নামাজ পরছিল। এদের অনেকেই গত ৮ মাসে তাদের পরিবারের কোন খবর জানেনা। আল্লাহর কাছে সেজদা করার সময় তারা বাচ্চাদের মত কান্নাকাটি করছিল। আমি নামাজে যোগ দেই, শান্ত থাকার চেষ্টা করি এবং নামাজ শেষে সবার সাথে হাসিমুখে মোলাকাত করি। কিন্তু এই হাসি আমার মন থেকে আসছিলনা। অনেকেই আমাকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠল।

 

২১শে নভেম্বর বেলনিয়ার উত্তর ভাগ মুক্ত হল এবং বেলনিয়ার বাকি অংশ মুক্ত করার কাজ দ্রুত শুরু করলাম। ইতোমধ্যে পাকিস্তানীরা ফেনি এলাকায় বিশাল সংখ্যক সৈন্য সমাবেশ করছিল।

 

২২শে নভেম্বর তবলছড়িতে পাকসেনাদের ক্যাম্পে আক্রমণ করে ২ জন পাকসেনা আহত, ১৩ জন রাজাকার তাদের রাইফেল ও গোলাবারুদ সহ আমাদের বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করে। ওইদিন আমাদের ২ টি কোম্পানি বেলনিয়ার ভেতরে যুদ্ধ করছিল। সেখানে ৬ ও ১৪ কুমায়ুন ব্যাটালিয়ন নিযুক্ত ছিল। তারা ১০ জন পাকসেনাকে বন্দী করে। সেখানে আরও ২২ জন যখম হয় এবং তাদের বন্দী করা হয়। আমাদের ২ জন গেরিলা আহত হয় এবং ১ জন জেসিও এর পা মাইনে উড়ে যায়।

 

২৩শে নভেম্বর চম্পকনগর বিওপি তে অ্যামবুশ করা হয়। এতে ২ জন পাকসেনা জখম হয়। আমি জোনাল কাউন্সিলের (বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি যারা ঐ এলাকার মিলিটারিদের সিভিল ব্যাপারে সহায়তা করে) সাথে মিটিং করি। এটি শান্তিবাজারে ছিল এবং তাদের সাথে

মুক্ত এলাকার ব্যাপারে আলোচনা করি। কে ফোর্সের কমান্ডারদের নিয়ে মিটিং হয় সেখানে ভারত ও বাংলাদেশের ১ নং সেক্টরের কমান্ডাররা ছিলেন। ভারতীয় ব্রিগেডের কমান্ডার হাই কমান্ড থেকে নির্দেশপ্রাপ্ত হয়ে ছিলেন। এবং এই সিদ্ধান্ত হয় যে খুব জরুরি মুহূর্তে ভারতীয় অফিসাররা আমাদের সৈন্যদের নেতৃত্ব দিতে পারবে। যদিও যে পরিমাণ অফিসার দরকার ছিল আমাদের তাঁর ৫% ও ছিল না। যদিও আমরা সেই সাহায্য চাইনি এবং আমাদের অফিসার ও জেসিও দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলাম।

নভেম্বর ২৪ তারিখ আমরা ফুলগাজি ও চাঁদগাঁজি মুক্ত করি। পরের দিন আমি বেলনিয়ার মুক্ত অঞ্চল ভিজিট করি। সেদিন মির’সরাইয়ে আমাদের গেরিলারা রাজাকারদের একটি ক্যাম্পে আক্রমণ করে। ৩ জন রাজাকার নিহত হয় এবং কয়েকটি রাইফেল ও গোলাবারুদ দখল করে।

 

২৬ শে নভেম্বর আমাদের বাহিনী বেলনিয়ার আরও এলাকা মুক্ত করে। আমাদের সফলতার খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে বিশাল পরিমাণ রাজাকার আমাদের কাছে আত্মসমর্পন করা শুরু করে।

 

২৭শে নভেম্বর প্রায় ৩০ জন রাজাকার ছাগলনাইয়াতে তাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ সহ আত্মসমর্পন করে। সেদিন আমরা বেলনিয়া-ফেনি রোডে মুনসীরহাটে মুক্ত এলাকা ভিজিট করি। মুক্ত এলাকার জনগণও তাদের বাড়িতে ফিরে আসতে শুরু করে।

 

২৮শে নভেম্বর মিরসরাইয়ে হাদির ফকির হাটে আমাদের গেরিলারা আক্রমণ করে। ৪ জন পাকসেনা জখম হয়। কিছুক্ষণ পরে আরও পাকসেনারা বাজারে জড়ো হতে থাকে। তারা পুরো বাজার আগুণ জ্বালিয়ে দ্যায় এবং সাধারণ মানুষকে হত্যা করতে থাকে। এরপর গেরিলারা আত্মঘাতী বোমাহামলা শুরু করে। গারিলা শাহ্‌ আলম তাঁর কার্বাইন নিয়ে জীবনে ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তানিদের উপর আক্রমণ চালাতে থাকে। সে ধরা পড়ার আগে ৮ জন পাকসেনাকে হত্যা করে। পাকসেনারা তাকে নির্যাতন করে এবং সেখানেই মেরে ফেলে। গেরিলারা পরে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করে এবং যথাযথ ভাবে সৎকার করে।

 

৩০শে নভেম্বর গেরিলারা নালুয়া চা বাগানে পাকসেনাদের উপর আক্রমণ করে। ৫ জন পাকসেনা জখম হয়। ১টি এলএমজি ও ২টি রাইফেল জব্দ করে।

 

নভেম্বরের শেষ দিকে এটা সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে যেকোনো সময় যুদ্ধ শুরু হবে। এটাও শোনা যায় যে ইয়াহিয়া খান ইউএন এর কাছে একটি বৃহৎ যুদ্ধের ইস্যু তৈরি করতে চাচ্ছিলেন এবং তাৎক্ষনিক যুদ্ধ বিরতি সহ বর্ডার এলাকায় ইউএন অব্জার্ভার দেবার আবদন করতে চাচ্ছিলেন। ইউএন অব্জার্ভার দেয়া হলে আমাদের সৈন্য ও গোলাবারুদের নিয়মিত সরবরাহ ব্যাহত হবে।

 

ইতোমধ্যে ভারতীয় সেনাদের সম্পূর্ণ প্রস্তুতি ছিল। গত মাসে আমাদের গেরিলা বাহিনীদের সংখ্যাও সর্বোচ্চ হয়ে গেছে এবং তারা বাংলাদেশ ও ভারতীয় মিলিটারি অপারেশনের সাথে একত্রে যুদ্ধ করার জন্য যোগ্য ছিল। বাংলাদেশের ভেতরে যেসব গেরিলা বাহিনী অপারেশন চালাচ্ছিল তাদেরকে শত্রু লাইনের পেছনে কাজ চালিয়ে যেতে বলা হল। এতে করে পাকিস্তানীদের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ করা যাবে এবং আরও বড় ক্ষয়ক্ষতি করা সম্ভব হবে। আমাদের আক্রমণের এলাকায় পাকিস্তানীরা সময় মত কোথাও নতুন কোন সরবরাহ করতে পারছিলনা।

 

৪ ঠা ডিসেম্বর গেরিলারা জানতে পারল যে কাটিরকাট বাজারে পাকিস্তানীরা মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে সাধারণ মানুষকে এরেস্ট করছে। তারা বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দেয়া শুরু করে এবং ৩০ জনকে এরেস্ট করে বাজারের কাছে গুলি করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। এই তথ্যের উপর ভিত্তি করে গেরিলারা কারিরহাট দখল করে। ৬ জন পাকসেনা নিহত হয়। বাকিরা পার্শবর্তী ক্যাম্পে পালিয়ে যায়। গেরিলারা বন্দীদের মুক্ত করে।

 

৩ ডিসেম্বর যুদ্ধ শুরু হলে গেরিলারা তাদের আক্রমণের তীব্রতা অনেক গুন বাড়িয়ে দ্যায় এবং আরও বেশী সংখ্যক আক্রমণ ও অ্যামবুশ চালাতে থাকে।

 

৯ ডিসেম্বর নাজিরহাঁট এলাকায় গেরিলা কোম্পানি পাকসেনাদের আক্রমণ করে। লে শওকতের নেতৃত্বের এই কোম্পানি ২০ জন শত্রুসৈন্য নিহত করে এবং তাদের মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে। কিছু পাকিস্তানী মৃত্যুবরন করে আর বাকিরা চট্টগ্রামের দিকে পালিয়ে যায়। আমাদের ৫ জন নিহত ও ৩ জন আহত হয়।

 

স্বাক্ষর ………    

২০ শে মার্চ, ১৯৮৩

 

*[মেজর (অবঃ) রফিক উল ইসলাম, বীর উত্তম এর ২০ মার্চ ১৯৮৩ তারিখে গৃহীত সাক্ষাতকার থেকে ]