(১) প্রতিরোধ যুদ্ধে রাজারবাগ পুলিশ বাহিনীসাক্ষাৎকারঃ মোঃ আসমত আলী আকন্দ এস, আই, পুলিস

Posted on Posted in 9

প্রতিরোধ যুদ্ধে রাজারবাগ পুলিশ বাহিনী

সাক্ষাৎকারঃ মোঃ আসমত আলী আকন্দ

(১৯৭১ সালের পূর্বে রাজারবাগ পুলিস রিজার্ভ অফিসের প্রোসিডিং সেকশনে এ-এস-আই হিসেবে কর্মরত ছিলেন)
এস, আই অব পুলিশ, রমনা থানা, ঢাকা
১০-১-৭৪

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ সন্ধ্যায় আমি রাজারবাগ রিজার্ভ অফিসে কাজ করছিলাম। আমাদের রিজার্ভ অফিসের বাইরে সহস্র বিক্ষুদ্ধ জনতা বড় বড় গাছ ও ইট পাটকেল দিয়ে ব্যারিকেড তৈরী করেছিলো। সন্ধ্যার সময় এ সংবাদ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিলো যে, পাক হানাদার বাহিনী রাজারবাগ পুলিশের রিজার্ভ অফিস আক্রমণ করবে। এ সংবাদ শোনার পরে আমি রাত সাড়ে ন’টার সময় তেজগাঁও থানার কর্তব্যরত পুলিশ কর্মকর্তাকে ঢাকা সেনানিবাসে পাক হানাদারদের মনোভাব কি তা জানবার জন্য টেলিফোনে অনুরোধ করি। তিনিও পাক হানাদার কর্তৃক রাজারবাগ রিজার্ভ অফিস আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনার কথা শুনেছেন বলে জানান। এরপর আমি তেজগাঁও’এ আবার ফোন করে জানতে পারি যে, তখন পাক হানাদারদের প্রায় ৮০/৯০টি সশস্ত্র ট্রাক ও জীপ তাদের থানার রাস্তা ধরে রাজধানীতে প্রবেশ করতে তারা দেখেছেন। রাজারবাগ রিজার্ভ পুলিশের উপর পাক হানাদারদের এমন উলঙ্গ হামলার সংবাদ শুনে আমাদের আরআই একেবারে হতবাক হয়ে যান। এরপর আমরা পুলিশের রিজার্ভ অস্ত্রাগার থেকে প্রয়োজন মত অস্ত্র নিয়ে হানাদারদের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত প্রতিরোধ এবং প্রতিহত করার জন্য রাজারবাগ পুলিশ রিজার্ভ অফিসের চারিদিকে পজিশন নিয়ে শত্রুর অপেক্ষা করতে থাকি। আমরা পুলিশ লাইনের সমস্ত বাতি নিভিয়ে চারিদিকের পরিবেশ একেবারে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলি। আমরা বাইরে অনেক দূর থেকে পাক হানাদারদের বিক্ষিপ্ত গুলিবর্ষণের শব্দ শুনছিলাম। আমরা শুধু পজিশন নিয়ে শত্রুর অপেক্ষা করছিলাম। অয়ারলেস ও টেলিফোনের সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো।

সারা শহর অন্ধকার, নীরব, নিথর ও নিস্তব্ধ। আনুমানিক মধ্যরাতে পাক হানাদারেরা প্রথম রাজারবাগ পুলিশ লাইনের হাসপাতাল গেট (দক্ষিন দিক) থেকে গোলাবর্ষণ শুরু করে। আমরা তার পাল্টা জবাব দেই। এবং পাক পশুদের প্রাণপণ প্রতিহত করার চেষ্টা করি। ওরা আমাদের লৌহকঠিন মনোবল ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য ভারী অস্ত্র, শেল, কামান ও ট্যাংক ব্যবহার করে। আমাদের উপর সাংঘাতিকভাবে বৃষ্টির মতো গোলাবর্ষণ করতে থাকে। আমরা প্রথমে আত্মসমর্পণ করিনি এবং আত্মসমর্পণের মতো কোনো দুর্বলতাও দেখাই নি। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের উদাত্ত আহবান অনুযায়ী আমরা আমাদের যার হাতে যে অস্ত্র ছিলো তা দিয়ে সমস্ত পাক হানাদারদের প্রাণপণে প্রতিহত করার চেষ্টা করি। এবং এভাবে আমাদের সামান্য অস্ত্র নিয়ে পাক হানাদেরদের প্রাণপণ প্রতিরোধ ও প্রতিহত করে জীবনদান করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে যুদ্ধ করছিলাম। আমাদের মনোবল ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য ওরা গভীর রাতে রিজার্ভ অফিসের উত্তর দিকে টিনশেড ব্যারাকে লাইট বোম ও পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেখানে পাক সেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টি করেছিলো আমাদের এমন কতিপয় বীর সিপাহী নিদারুন ভাবে দগ্ধীভূত হয়ে শহীদ হন। অনেকে সাংঘাতিকভাবে আহত হয়ে সেখানেই মৃতবৎ পড়ে থাকেন। আগুনের লেলিহান শিখা ক্রমেই প্রসারিত হতে থাকে এবং সমস্ত ব্যারাক পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়। আমরা উপায়ন্তর না দেখে ছাদের উপর গিয়ে আত্মরক্ষা করতে থাকি। সেই সাথে পাক হানাদারদের প্রাণপণ প্রতিহত করা অব্যাহত রাখি। ব্যারাকের চারিদিকে আগুনের লেলিহান শিখায় আমরা বিন্দুমাত্র দমে যাইনি। আর আমাদের মনোবল কোনো সময়ই দুর্বল হয়ে পড়েনি। ওদিকে কামান, শেল আর ট্যাংকের গর্জন ও বৃষ্টির মতো গোলাবর্ষণ চলছিলো। কামান ও শেলের প্রচণ্ড আঘাতে আমাদের কয়েকটি পাকা ব্যারাকের প্রাচীরঘেরা মটর ওয়ার্কশপ মাটিতে ধসে পড়ে। ফলে আমাদের সিপাহীরা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে নিজ নিজ সুবিধামতো স্থান গ্রহণ করে। চারিদিকে জ্বলন্ত আগুন, অবিরাম শেলিং ও কামানের গর্জনের মধ্যেও প্রাণপণে প্রতিরোধ করছিলো পাক পশুদের। আমাদের অনেক বীর সিপাহীকে প্রতিরোধ করতে করতে শহীদ হতে দেখেছি আমি স্বচক্ষে। এমনিভাবে পাক হানাদারদের প্রতিহত করতে করতে রাতের অন্ধকার কেটে যায়। ভোর হয়ে যায় এবং বেলা উঠে যায়। আমাদের গুলি প্রায় নিঃশেষ হয়ে যায় দেখে আমরা আর কোনো উপায়ন্তর পাই না। ইতিমধ্যে পাক হানাদারদের হাজারো হুমকির মুখেও আমাদের মনোবল এতটুকু দুর্বল হয়ে পড়েনি। তারা ব্যারাকে ঢুকে আমাদের বন্দী করে এবং ছাদের উপর থেকে আমাদেরকে নিচে নামিয়ে এনে বুটের লাথি ও বন্দুকের বাট দিয়ে সজোরে এলোপাতারি আঘাত করতে শুরু করে। আকস্মাৎ এক হানাদার পাক পশু হাতের বন্দুক দ্বারা আমার মাথায় সজোরে আঘাত করলে আমার মাথা ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়তে থাকে। তৎক্ষণাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাই। তিন ঘন্টা পড়ে আমি জ্ঞান ফিরে পাই। উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, এমআই, এএসআই, হাবিলদার, সুবেদার, নায়েক, সিপাহীসহ আমরা প্রায় দেড়শত বীর যোদ্ধাকে পাক হানাদারদের হাতে বন্দী অবস্থায় কাটাতে হয়। ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ থেকে ২৯ শে মার্চ পর্যন্ত সম্পূর্ণ বন্দী অবস্থায় কাটাতে হয়।

২৯শে মার্চ বিকাল সাড়ে চারটায় ঢাকার তৎকালীন পুলিশ সুপার জনাব ই.এ. চৌধুরী রাজারবাগে আমাদের পুলিশ লাইনে আসেন এবং পাক হানাদারদের মেজরের সাথে কথোপকথনের পর আমাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয় “আব তুমলোগ চালা যাও, আয়েন্দা কাল ভোর ছ বাজে মিল ব্যারাকমে তোমলোগ রিপোর্ট করেগা, আওর উহাই তোমলোগ রাহেগা- ইদার হামলোগকা জোয়ান রাহেগা।”

৯ম খণ্ডের ১৫ নং পৃষ্ঠার শেষাংশে মুদ্রিত অর্থাৎ উপরের আন্ডারলাইন চিহ্নিত অংশটুকু দলিলপত্রের ৮ম খণ্ডের ২২ নং পৃষ্ঠার সাথে কনফ্লিক্ট করে। আপনারা ক্রসচেক করে দেখতে পারেন।