(১) বড় কামতার যুদ্ধ(২) মুক্তিযুদ্ধে ফেনী(৩) চন্দ্রগঞ্জের যুদ্ধ(৪) সোনাইমুড়ি রেলস্টেশন প্রতিবেদনঃ সত্যেন সেন

Posted on Posted in 9

<৯, ৩.৮, ১৪৯-১৫৯>

কুমিল্লা ও নোয়াখালী জেলায় সশস্ত্র প্রতিরোধের আরও বিবরণ

(সত্যেন সেন রচিত ‘প্রতিরোধ সংগ্রামে বাংলাদেশ’, কলিকাতা, আগস্ট ১৯৭১ থেকে সংকলিত)

।।বড় কামতার যুদ্ধ।।

বর্ডার পেরিয়ে আগরতলা এসে পৌছেছি। তারপর কটা দিন কেটে গেছে। মুক্তিবাহিনীর ভাইদের স্বচক্ষে দেখবার জন্য আর তাদের মুখে মুক্তিযুদ্ধের কথা শোনবার জন্য আকুলি-বিকুলি করে মরছিলাম। কিন্তু আমাদের মত লোকদের এত তাড়াতাড়ি তাদের সন্ধান পাওয়া সহজ নয়। অতিরিক্ত আগ্রহ দেখালে হয়তোবা সন্দেহভাজন হয়ে পড়ব! শুনলাম শহর থেকে মাইল পাচেক দূরে প,বি, হাসপাতালে মুক্তিবাহিনীর দশ-বারো জন আহত যোদ্ধা রয়েছে। সেখানে গিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করলে আমাদের মনের আশা মিটতে পারে।

কিন্তু কাজটা কি এতই সহজ! আমরা যে পাকিস্তানের গোয়েন্দা বিভাগের লোক নই তারই বা প্রমান কি? এখানকার অবস্থায় এই সন্দেহ তো জাগতেই পারে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে নেমে দেখলাম, আমাদের খুব বেশী বেগ পেতে হোল না। আমরা যে পরিচয়সুত্রটুকু নিয়ে গিয়েছিলাম, তাতেই কাজটা সহজ হয়ে গেল। বেলা এগারোটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমরা তাদের মুখে নানান কাহিনী শুনলাম।আমার মনে হল তারা যেন প্রথমত কিছুটা আড়ষ্ট বোধ করছিল,পরে কথা বলাবলির মধ্যে দিয়ে আমাদের সম্পর্কটা সহজ হয়ে গেল।

সবসুদ্ধ চার জায়গায় চারজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে আমরা আলাপ করেছি।তিনজনের সাথে কথা শেষ করে চতুর্থ জনের সঙ্গে কথা শুরু করতেই চমকে উঠলাম। আমি প্রশ্ন করেছিলাম আপনি কোন জায়গায় লড়াই করে জখম হয়েছেন। তিনি উত্তর দিলেন- সে জায়গার নাম বড়কামতা এই কথা শোনার পর আমার চমকে উঠার কথাই তো। এই তো কদিন আগে বড়কামতায় এক রাত্রি যাপন করে এসেছি। সে কথা কি এখনই ভুলে যেতে পারি!

বড়কামতা?

হ্যাঁ, বড়কামতা। আমার মানসচক্ষে সেই স্বল্পভাষী যুবকটির মুখ ভেসে উঠছিল। আর স্মৃতিপটে ভেসে আসছিল স্খলিত কণ্ঠে বৃদ্ধের সেই ব্যাকুল প্রার্থনা, দুর্গা, দুর্গা। তাহলে আমার সেই এক রাত্রির স্নেহঘন আশ্রয় বড়কামতা গ্রামটিও যুদ্ধের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে?

ওরা কোন তারিখে হামলা করেছিল আর সেই সময় আপনারাইবা সেখান থেকে কতদুরে ছিলেন?

ওরা হামলা করেছিল ৩০-এ, অর্থাৎ ৩০-এ এপ্রিল তারিখে।

আমরা ২৫-এ তারিখে সেখানে প্রথম যাই।তারপর থেকে সেখানেই ছিলাম। কি আশ্চর্য কাণ্ড, আর কি অদ্ভুত যোগাযোগ!

আমি খুব তাড়াতাড়ি মনে মনে হিসাব করে দেখলাম আমরা চার বন্ধু সেই ২৫-এ এপ্রিল তারিখেই বড়কামতায় আশ্রয় নিয়েছিলাম। এঁরাও আমাদের কাছাকাছি ছিলেন। কিন্তু আমরা বাইরের লোক, এঁদের কেমন করে জানব।

আপনারা ক’জন ছিলেন?

আমরা মুক্তিবাহিনীর দশজন লোক সেখানে গিয়েছিলাম। কিন্তু ঐ কটি দিনের মধ্যে ঐ অঞ্চলে আরও পাঁচজন লোককে ট্রেনিং দিয়ে আমাদের দলের সঙ্গে যুক্ত করে নিয়েছিলাম বলে আমাদের মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দাঁড়াল পনের।

এই কদিন বড়কামতার লোকেরা আমাদের, নিজেদের আপন জনের মত গ্রহন করে নিয়েছিল। আমরা সবাই মিলেমিশে সংসার করছিলাম। আমরা এখান থেকে ওখান থেকে বড় বড় মাছ ধরে আনতাম। কখনো তাঁরা রান্না করতেন, কখনো বা আমরা। কিন্তু খাবার বেলায় সবাই ভাগাভাগি করে খেতাম। কিসের হিন্দু আর কিসের মুসলমান, আমাদের জাত-পাতের বালাই ছিল না।

উপরের নির্দেশ পেয়ে আমরা ২৯শে এপ্রিল তারিখে চান্দিনার পূর্বদিকে ঢাকা-কুমিল্লা সড়কে একটা পুল উড়িয়ে দিলাম। কদিন থেকেই চান্দিনা অঞ্চলে মিলিটারিরা বেশ তোড়জোর চালাচ্ছে দেখতে পাচ্ছিলাম।

কয়েকদিনের মধ্যে এরা কিছু একটা ঘটাবে সেটা মনে মনে অনুমান করেছিলাম। আমাদের এই ছোট্ দলটিও সেজন্য তৈরী ছিল। ওরা কিছু একটা অঘটন ঘটালে আমরাও একেবারে চুপ করে থাকব না। ওরা যাই মনে করে থাকুক না কেন, ব্যাপারটা একদম একতরফা হবে না।

২৯ তারিখে পুল উড়িয়ে দেবার পর ওরা কোথাও না কোথাও হামলা করবেই। কিন্তু ওদের সেই হামলাটা কোথায় হবে সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন।

কিন্তু এ নিয়ে বেশী মাথা ঘামাতে হোল না। ওরা পরদিন সকালবেলা চারখানা সৈন্য বোঝাই গাড়ি সাজিয়ে এই বড়কামতায় এসে হানা দিল। ওরা কি তবে সন্দেহ করতে পেরেছে যে , আমরা এখানে এসে আশ্রয় নিয়ে আছি? কিন্তু তখন বেশী ভাব্বার সময় ছিল না। ওরা প্রথমেই কতকগুলি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিল। ওদের সংখ্যা পঞ্চাশ থেকে ষাট। ইতিমধ্যে আমরা মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধারা ওদের দৃষ্টির আড়ালে নিজ নিজ পজিশন নিয়ে নিয়েছি। ওরা প্রথমেই কোন বাধা না পেয়ে নিশ্চিন্ত মনে তাদের ধ্বংসের কাজে এগিয়ে চলছিল।

আমরা প্রথম সুযোগ পাওয়া মাত্র একই সঙ্গে চারটা গাড়ির উপর উপর “ব্রাশ” করে চললাম। আমাদের মিলিটারি ভাষায় “ব্রাশ” কথার মানে একই সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গুলির পর গুলি চালিয়ে যাওয়া। থামিয়ে না দিলে এইভাবে ক্রমান্বয়ে গুলির পর গুলি চলতে থাকে। এই একটানা গুলিবর্ষণের ফলে সৈন্য বোঝাই চারটা গাড়িই লণ্ডভণ্ড হোতে চলল। আমাদের এই প্রচণ্ড আক্রমণ শেষ পর্যন্ত ওরা সহ্য করতে না পেরে প্রান নিয়ে পালাল।

৩০শে এপ্রিলের যুদ্ধের এটা প্রথম পর্ব। এরপরই যে দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়ে যাবে সেটা বুঝতে বেশী বুদ্ধির দরকার করে না। এখানে ক্যান্টনমেন্ট কতই বা দুর।কিন্তু দ্বিতীয় পর্বটা যে এত তাড়াতাড়ি শুরু হয়ে যাবে তা আমরা ভাবতে পারিনি। এর এক ঘণ্টা কি দেড় ঘণ্টা বাদেই ওরা সৈন্য বোঝাই গাড়ির মিছিল সাজিয়ে চলে এল। ওদের আঠারটা ট্রাক বিকট আওয়াজে পথঘাট এই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে দ্রুতবেগে ছুটে আসছিল। অনুমানে বুঝলাম প্রতিপক্ষ দুশ জনের কম হবে না। ওদের সঙ্গে মর্টার, মেশিনগান, রাইফেল কোন কিছুর অভাব ছিল না। ওরা এবার রীতিমত শিক্ষা দিয়ে যাবে। ওরা এসেই বেশ বড় একটা এলাকাকে ঘেরাও করে ফেলল।

আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে চারজন সেই ঘেরাও-এর মধ্যে আটকা পড়ে গেছে। আমাদের ঘেরাও-এর সুবিধা হচ্ছে এই যে, ওদের আমরা ভালভাবেই দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু এত সমস্ত লোকের ভিড়ে মুক্তিযোদ্ধারা কোথা মিশে আছে এবং তাঁরা কোথায় কোথায় পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে সম্পর্কে ওদের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই।

বড়কামতা গ্রামের অধিবাসীদের মধ্যে বেশ বড় একটা অংশ বারুই বা বারুইজীবী শ্রেণীর লোক। সেজন্য গ্রামের এখানে ওখানে বহু পানের বরোজ আছে। এই বরোজগুলি সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে যথেষ্ট সাহায্য করেছিল এইগুলির মধ্যে আশ্রয় নিয়ে তাঁরা শত্রুদের বেছে বেছে তাক করে মারছিল।

একটা কথা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার পাক সৈন্যদের বিরুদ্ধে শুধু যে আমরাই লড়াই করেছিলাম তা নয়, গ্রাম থেকে দলে দলে লোক এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। দু’একশ লোক নয়, আমার মনে হয় তাদের সংখ্যা দু-তিন হাজারের কম হবে না। লোকগুলি ক্ষিপ্তের মত ছুটে আসছিল। তাদের হাতে লাঠিসোঁটা, বর্শা-বল্লম থেকে শুরু করে বন্দুক পর্যন্ত। এই দুঃসাহসী লোকগুলি এই হাতিয়ার নিয়ে মর্টার আর মেশিনগানের বিরুদ্ধে লড়াই করতে ছুটে আসছে। এদের উন্মাদ ছাড়া আর কি বলা চলে! কিন্তু একটা কথা স্বীকার করতেই হবে যে, তাদের এই উন্মাদনা আমাদের মধ্যে নতুন শক্তি ও অনুপ্রেরনা সৃষ্টি করে তুলছিল। ওরা নানারকম জয়ধ্বনি আর বিকট গর্জন করতে করতে ছুটে আসছিল। সেই গর্জন শত্রুদের মনেও ভয়ের কাঁপন জাগিয়ে তুলছিল। ওরা কেমন যেন দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। এ ধরনের ঘটনা যে ঘটতে পারে এটা আমরা কখনও আশা করতে পারি নি। অতি সাধরণ কিছু মানুষ যে দেশের ডাকে, স্বাধীনতার ডাকে এমন অসাধরণ ভুমিকা গ্রহন করতে পারে , এমন অভিজ্ঞতা আমাদের আর কখনও হয়নি। এইভাবে ঘণ্টা দুই ধরে দুই পক্ষে যুদ্ধ চলল।আমরা নিরাপদ আশ্রয়ে দাঁড়িয়ে শত্রুসৈন্যদের তাক করে করে মারছিলাম। আর এই ক্ষিপ্ত জনতা তাদের যৎসামান্য হাতিয়ার নিয়ে তাদের পক্ষে যেটুকু সম্ভব তা করে চলছিল। মর্টার গর্জন করছে, বোমা ফাটছে, মেশিনগান চলছে, গ্রামের পর গ্রাম আগুনে পুড়ে যাচ্ছে, কিন্তু ওরা যেন ভয় পাবার কথা ভুলেই গেছে। ভয় পেয়ে পালাবে দূরে থাক, ওদের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলছে।

এই দু’ঘণ্টার যুদ্ধে বহু সাধারণ মানুষ মারা গেছে। আমরা যে চারজন ঘেরাও-এর মধ্যে আটকা পড়ে গেছি তাদের মধ্যে দুজন জখম হয়েছে। এই দুই ঘণ্টার যুদ্ধ ওদের অনেক হিসেবই ভণ্ডুল করে দিয়েছে। হাজার হাজার সাধরণ মানুষের এই নির্ভীক ও মারমুখো মূর্তি এবং তাদের মুহুমুহ গগনভেদী চীৎকারে ওরা কেমন যেন হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। এমন অভিজ্ঞতা ওদের কখনো হয় নি। এমন দৃশ্য আমরা কোন দিন দেখি নি।

শেষ পর্যন্ত আমরাই সেদিন এই যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলাম। আমাদের সামান্যসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা সেদিন যে বীরত্ব ও রণচাতুর্য দেখিয়েছিল সে কথা হয়তো কেউ কোন্ দিন জানবে না। কিন্তু এই অঞ্চলের সাধরণ কৃষক জনতা সেদিন যে শক্তি, সাহস আর দেশপ্রেমের দিয়েছিল, আর কেউ জানুক আর না জানুক, আমরা তা কোনদিন ভুলতে পারব না।

শেষ দৃশ্য। পাকসৈন্যরা রণক্ষেত্র ত্যাগ করে প্রান বাঁচানোর জন্য যে যেদিকে পারছে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলছে। তাদের পেছন পেছন ক্ষিপ্ত, উন্মুক্ত জনতা যার যার হাতিয়ার উঁচিয়ে তাড়া করে চলছে।

আমার কাছ থেকে বেশ কিছুটা সামনে তিনজন পাঞ্জাবী সৈন্য ওদের অজানা অচেনা পথে ছুটে চলছে। একমাত্র আমি ছাড়া ওরা যে আর কারও নজরে পড়েনি, এটা ওদের জানা নেই। কেমন করে জানবে? একবার মুখ ফিরিয়ে পেছন দিকে তাকাবার সাহস পর্যন্ত নেই। আমি সেই সুযোগটাকে ভালভাবেই কাজে লাগালাম। আমি পরপর গুলি করে একজন একজন করে ওদের তিনজনকেই ভুপাতিত করলাম। সামনে গিয়ে দেখলাম, ওদের তিনজনের মধ্যে একজন তখনও মরে নি। আমি এক গুলিতে আমার সেই অসমাপ্ত কাজটিকে সমাপ্ত করে দিলাম।

এর পরের কাজ ওদের থেকে অস্ত্র নিয়ে নেয়া। সেই অস্ত্র নিয়ে বীর জনতার হাতে তুলে দিলাম। এতক্ষন বাদে আমার নজরে পড়ল আমি নিজেও অক্ষত নই। এই যে দেখুন, আমার হাতের এই জায়গায় একটা বুলেট বিদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু এতক্ষন এত সমস্ত উত্তেজনাকর ঘটনার মধ্যে আমিও তা টের পাইনি। এরপর চিকিৎসার জন্য চলে এলাম এ হাসপাতালে।

যিনি এতক্ষন এ কথা বলছিলেন, তিনি বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন সুবেদার। এই পর্যন্ত বলে তিনি থামলেন। তার কথা বুঝলাম বড়কামতার যুদ্ধের ঐখানেই পরিসমাপ্তি।

কিন্তু আমার বোঝাটা যে কত বড় ভুল বোঝা সেটা বুঝলাম আরও কয়দিন বাদে। এবারকার এই ‘পতন-অভ্যুদয় বন্ধুর পন্থায়’ চলতে চলতে কি আশ্চর্যভাবে আর কি অপ্রত্যাশিতভাবে কতরকম লোকের সঙ্গে যোগাযোগ হয়ে যাচ্ছে! একজনের মুখে শোনা অসম্পূর্ণ কাহিনী কি বিচিত্রভাবে আর একজন এসে সম্পূর্ণ করে দিয়ে যাচ্ছে। এই তো সেদিন হঠাৎ চান্দিনা কৃষক সমিতির আমার এক পরিচিত সহকর্মীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তার মুখে শুনলাম, এই বড়কামতার যুদ্ধে শুধু মুক্তিযোদ্ধারা নয়, তারা নিজেরাও ভালভাবেই জড়িত ছিলেন।

৩০শে এপ্রিল তারিখে পাকিস্তানী সৈন্যরা যখন দ্বিতীয়বার বড়কামতা আক্রমণ করল তখন শুধু মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধারাই তাদের সঙ্গে মোকাবিলা করেনি, বহু সাধরণ মানুষ সেদিন এ লড়াইয়ে যোগ দিয়েছিল, এ কথা আমরা সেই মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধার মুখে আগেই শুনছিলাম। আমাদের চান্দিনার সেই পরিচিত কৃষক কর্মীটির মুখে শুনলাম প্রায় পাঁচ-ছয় হাজার কৃষক সেদিন এ লড়াইয়ে যোগ দিয়েছিল।

পরদিন ১লা মে তারিখে গতদিনের পরাজয়ের ঝাল মেটাবার জন্য সকাল দশটায় প্রায় হাজারখানেক পাকসেনা পুনরায় এই অঞ্চলে আসে। গতদিনের অভিজ্ঞতা থেকে তাদের মনে এই ধারনার সৃষ্টি হয়েছিল যে, এই এলাকায় মুক্তিবাহিনীর বেশ বড় রকমের ঘাঁটি রয়েছে। তাদের সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেবার সঙ্কল্প নিয়ে তারা বেশ বড়রকমের প্রস্তুতি নিয়ে এখানে এসে হামলা করল। তারা চান্দিনার দুই মাইল পূর্বে কোরপাই থেকে আরম্ভ করে চান্দিনার এক মাইল পশ্চিমে হাটখোলা পর্যন্ত সমস্ত পাকা রাস্তায় পজিশন নেয়। তাছাড়া কিছু দূরে মেশিনগান ও কামান পেতে রাখে। তিন-চারশ পাকসেনা বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ে এবং বাড়িগুলি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিতে থাকে। কিন্তু মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধারা তখন ঘটনাস্থল থেকে বহু দূরে সরে গিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় খুজে নিয়েছে হামলাকারীরা বুঝতে পারল যে, তাদের হাতের শিকার ফসকে গিয়েছে। শেষ পর্যন্ত চারদিককার গ্রামবাসীদের উপর মনের ঝাল মিটিয়ে এই রক্তখাদক মানুষশিকারীর দল তাদের ক্যান্টনমেন্টে ফিরে চলে গেল।

।। মুক্তিযুদ্ধে ফেনী ।।

এপ্রিলের প্রথমভাগেই নোয়াখালীর ফেনী শহরে মুক্তিবাহিনী গড়ে উঠেছিল। বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়াউর রহমান ছিলেন এই বাহিনীর সংগঠক ও নায়ক। বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ই পি আর বাহিনীর জওয়ানরা, পুলিশ,আনসার, ছাত্র, সাধারণ মানুষ- এরা সবাই এই বাহিনীতে সামিল হয়েছিল। হাতিয়ার বলতে এদের কিছু রাইফেল আর বন্দুক। তাছাড়া বর্শা, বল্লম, লাঠিসোটা ইত্যাদিও ছিল। এই অস্ত্র সম্বল করে, সবকিছু জেনেশুনেও তারা কামান, মর্টার আর মেশিনগানের বিরুদ্ধে লড়াই করবার জন্য তৈরী হয়েছিল। তখন তারা ভাবতেও পারেনি যে, এর চেয়ে মারাত্নক অস্ত্র নিয়ে ওরা তাদের উপর হামলা করবে। কিন্তু যখন সে সময় এর, তখন তাতেও পিছ-পা হয়নি তারা।

মুক্তিবাহিনী প্রস্তুতি নেবার জন্য বেশী সময় পায় নি। এপ্রিলের প্রথম দিকেই আক্রমণকারী পাক সৈন্যের একটি দল ফেনী শহর দখন করার জন্য মার্চ করে এগিয়ে গেল। কিন্তু কাজটা যত সহজ বলে মনে করেছিল তা-ঠিক নয়, কার্যক্ষেত্রে সেটা প্রমানিত হয়ে গেল। ওরা ফেনী শহর এসে পৌঁছাবার আগেই মুক্তিবাহিনি তাদের পথ রোধ করে দাঁড়াল। যাকে বলে মুখোমুখি লড়াই তা নয়, মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধারা নিজেদের আড়ালে রেখে নানা দিক দিয়ে আক্রমণ চালিয়ে শত্রুপক্ষকে এমনভাবে অস্থির করে তুলল যে, শেষ পর্যন্ত ওরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পেছনে হটে যেতে বাধ্য হোল। এই গেল প্রথম রাউণ্ড। কিন্তু প্রথম রাউন্ডেই জয়-পরাজয়ের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হোল না। এরপর দু,পক্ষের মধ্যে পরপর কয়েকবার সংঘর্ষ ঘটল। কিন্তু মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধাদের হাতে প্রচণ্ড মার খেয়ে আক্রমণকারীদের মুখ চুন হয়ে গেল। এই দুর্গম পথে, জীবনপন করা দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করা সহজ কথা নয়, তা করতে গেলে যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। এই সত্যটা নিশ্চিত হয়ে ওরা তখনকার মত স্থলপথে আক্রমনের কাজটা স্থগিত রাখল।

এইভাবেই মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধ সংগ্রামের প্রথম অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল। কিন্তু যুদ্ধবিদ্যায় অভিজ্ঞ মেজর জিয়াউর রহমান এবং তার সহযোদ্ধারা একথা ভালভাবেই জানতেন, যুদ্ধের এইখানে ইতি নয়, সুচনা মাত্র। ওরা শীঘ্রই শক্তি বৃদ্ধি করে ফিরে আসবে। আত্মসন্তুষ্টির অবকাশ নেই, এবার প্রবলতর আক্রমণের সম্মুখীন হতে হবে। কিন্তু সেজন্য ভয় করলে চলবে না। শত্রু যতই প্রবল হোক না কেন , তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়েই যেতে হবে, আত্মবিশ্বাসে উদ্দীপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা এই দৃঢ় সংকল্প গ্রহন করেছে। ফেনী শহর ও নিকটবর্তী গ্রামঞ্চলে সাজ সাজ রব পড়ে গেল। মুক্তিবাহিনীর প্রচণ্ড লাঠির ঘায়ে জঙ্গিবাহিনীর নেতারা ফেনী শহরকে আক্রমণ করার এবার এক নতুন পরিকল্পনা তৈরী করল।

এপ্রিল মাসের মধ্যভাগ। একদিন হঠাৎ অপ্রত্যাশিত ভাবে দুটো বিমান প্রচণ্ড গর্জন তুলে সারা শহরটাকে প্রদক্ষিন করে চলল। ওরা শুধু অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতেই আসেনি, বোমারু বিমান দুটো ঘুরে ঘুরে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুর উপর বোমা ফেলে চলছে। বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দে সারা শহর কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। সাধারণ মানুষ এমন একটা আকস্মিক ঘটনার জন্য একেবারে প্রস্তুতি ছিল না। তারা উদ্ভ্রান্ত হয়ে ছুটোছুটি করতে লাগল। কিছু কিছু লোক হতাহতও হোল। এইভাবে কিছুক্ষন বোমা ফেলে বিস্ফোরণ ঘটাবার পর সেই হিংস্র যন্ত্র দানবগুলি স্বস্থানে ফিরে গেল।

পরদিন আবার ওরা এল। এসেই আগেরকার দিনের মত বোমা ফেলে চললো। কিন্তু একটি দিনের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে শহরের সাধরণ মানুষ অনেক বেশী সাহস সঞ্চয় করেছে। বোমা বিস্ফোরণের মধ্যে কি করে আত্মরক্ষা করতে হয়। সেই কৌশলটাও তারা কিছুটা আয়ত্ত করে নিয়েছে। তারা দিগবিদিক জ্ঞান হারিয়ে পাগলের মত ছুটোছুটি করছিল না, অথবা বহু লোক এক জায়গায় ভিড় করে দাঁড়িয়ে ওদের হাতে আক্রমণের সুযোগ তুলে দিচ্ছিল না, তারা ঠাণ্ডা মাথায় আত্মরক্ষা করে চলেছিল। আর মুক্তিযোদ্ধারা? মুক্তিযোদ্ধারা কি করছিল?

সেই ধ্বংসলীলার মাঝখানে দাঁড়িয়ে মেজর জিয়া নির্ভীক কণ্ঠে হেঁকে উঠলেন, মুক্তিবাহিনীর জওয়ান ভাইরা, আমরা মরবার জন্য তৈরী হয়েই দস্যুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছি, তবে আর আমাদের ভয় কি! কুছপরওয়া নেই, আমরা ঐ বিমান দুটোকে পাল্টা আক্রমণ করে মাটিতে ফেলে ছাড়বো।

মুক্তিযোদ্ধারা বিস্মিতকন্ঠে প্রশ্ন করল, আমাদের হাতে তো এন্টি এয়ারক্রাফট কামান নেই, আমরা কেমন করে এই বিমানগুলিকে ধ্বংস করব?

হ্যাঁ, এন্টি এয়ারক্রাফট থাকলে আমরা আগেই ওদের দফা রফা করে দিতে পারতাম। কিন্তু নাই-বা থাকল তা, আমাদের রাইফেল তো আছে। এই রাইফেল দিয়েই আমরা ওদের এমন শিক্ষা দেব, যা ওরা কোন দিন ভুলতে পারবে না। জওয়ান ভাইসব, শহরে যে সমস্ত উচু দালান আছে, তাদের উপর উঠে ওদের তাক করে গুলি চালাতে থাক। ভিয়েতনামের মুক্তিযোদ্ধারা এই ভাবে শত শত মার্কিন জঙ্গি বিমান ফেলে দিয়েছে, আমরাই বা কেন পারব না? এক মুহূর্ত দেরী নয়, জওয়ান ভাইরা, ছুটে চল সবাই।

শুধু নির্দেশ দেওয়া নয়, মেজর জিয়া সবার আগে নিজেই রাইফেল বাগিয়ে ছুটলেন। রাইফেলধারী যোদ্ধারা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে ছুটতে ছুটতে শহরের উচু উচু দালান গুলির ছাদে গিয়ে উঠে পড়ল। এই দালানগুলি যে কোন সময় বোমার আঘাতে ধসে পড়ে যেতে পারে , কিন্তু সে জন্য মনে বিন্দুমাত্র চিন্তা নেই, বিন্দুমাত্র ভয় নাই। সবাই একমনে বিমান দুটোকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ে চলছে। তাদের এইভাবে আক্রান্ত হতে হবে বিমান চালকরা একথা কল্পনাও করতে পারেনি। তাই তারা নিশ্চিন্ত মনে রাইফেলের নাগালের ভেতরে এসে গিয়েছিল। তারা জানত যে, সে ক্ষেত্রে তারাই শুধু আক্রমণকারী। কিন্তু তারাও যে আক্রান্ত হতে পারে, এটা তাদের জানা ছিল না। কয়েকটা দালানের ছাদের উপর থেকে প্রায় একই সঙ্গে একঝাক রাইফেলের গুলি ছুটল। আর একই সঙ্গে সমস্ত মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযোদ্ধারা তখনও গুলি চালিয়ে যাচ্ছে। জলন্ত বিমানটার অবস্থা দেখে অপর বিমানটা ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালাল, দেখতে দেখতে আকাশপথে মিলিয়ে গেল। গুলিবিদ্ধ বিমানটা উল্কার মত জ্বলতে জ্বলতে পূর্বদিকে ছুটল। ওটা একটু বাদেই জ্বলে- পুড়ে শেষ হয়ে যাবে, পরে জানা গিয়েছিল, জলন্ত বিমানটার ধ্বংসাবশেষ ত্রিপুরার সীমান্তে গিয়ে পড়েছিল।

জয়, মুক্তিবাহিনীর জয়! জয়, স্বাধীন বাংলা জয়! বিজয়গর্বে উদ্দীপ্ত হাজার হাজার জনতার জয়ধ্বনিতে ফেনী শহর মুখরিত হয়ে উঠল। সবাই মেতে উঠল উৎসবে। মুক্তনগরীর বুকে স্বাধীন বাংলার পতাকা পতপত করে উড়ছিল।

 

।। চন্দ্রগঞ্জের যুদ্ধ ।।

মুক্তিবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের চর এসে সংবাদ দিল, সামরিক ভ্যান-বোঝাই একদল পাকসৈন্য ফেনী থেকে চন্দ্রগঞ্জের দিকে আসছে। ওদের যখন চন্দ্রগঞ্জের দিকে চোখ পড়েছে, তখন ওরা সেখানে লুটপাট না করে ছাড়বে না। খবর পেয়ে লাফিয়ে উঠলেন সুবেদার লুৎফর রহমান। বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর লুৎফর রহমান , যিনি এই অঞ্চলে একটি মুক্তিবাহিনী গঠন করেছিলেন। সৈন্যদের সংখ্যা পঞ্চাশ-ষাট জনের মত হবে। এদের প্রতিরোধ করতে হলে দলে কিছুটা ভারী হয়ে নেওয়া দরকার। খোঁজ খবর অল্প সময়ের মধ্যে মাত্র ছয়জন মুক্তিযোদ্ধাদের জড় করা গেল।

সাতজন মানুষ সাতটি রাইফেল। এই সামান্য শক্তি নিয়ে ওদের সঙ্গে মোকাবিলা করতে যাওয়াটা ঠিক হবে কি? মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে একজন এই প্রশ্নটা তুলেছিলেন। কথাটা মিথ্যে নয়, এটা একটা দুঃসাহসের কাজই হবে। অথচ হাতে সময় নেই, মুক্তিবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করার জন্য যে-সময়ের প্রয়োজন , তার মধ্যে এই লুণ্ঠনকারী দস্যুরা এদের কাজ হাসিল করে সরে পড়বে। চোখের সামনে এই ঘটনা ঘটে যাবে, আর তারা বসে বসে তাই দেখবে! না, কিছুতেই না, গর্জে উঠলেন সুবেদার লুৎফর রহমান, যেভাবেই হোক এদের প্রতিরোধ করতেই হবে। আমাদের চোখের সামনে দিয়ে ওরা অক্ষতভাবে হাসতে হাসতে চলে যাবে, এ কিছুতেই হতে পারে না। ওরা আমাদের অনেক রক্ত নিয়েছে, তার বিনিময়ে ওদেরকেও কিছুটা রক্ত দিতে হবে।

রাস্তার ধারে একটা বড় রকমের ইটের পাঁজা। কে যেন কবে একটা দালান তোলবার জন্য এখানে এই ইটগুলি এনে জড় করে রেখেছিল। অনেকদিন হয়ে গেল, সেই দালান এখনো তোলা হয়নি, ইটগুলি যেমন ছিল তেমনি পড়ে আছে। চন্দ্রগঞ্জে ঢুকতে হলে সৈন্যবাহী গাড়ীগুলিকে এই রাস্তা দিয়েই যেতে হবে। সুবেদার লুৎফর রহমান আর ছয়জন মুক্তিযোদ্ধা সেই ইটের পাঁজার পেছনে পজিশন নিয়ে দাঁড়ালেন। এখানে থেকেই তাঁরা সেই হামলাকারী দস্যুদের প্রতিরোধ করবেন, এটা খুবই দুঃসাহসের কাজ। তাঁরা জানতেন, তাঁরা তাঁদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে চলছেন। কিন্তু এমন একটা সময় আসে যখন জেনেশুনে বিপদের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য চিত্ত ভাবনাহীন। অবস্থাবিশেষে বামন হয়েও তাঁদের দানবের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করতে হয়। মুক্তিবাহিনীর নায়েক সুবেদার লুৎফর রহমান বললেন, এখনকার অবস্থা হচ্ছে তেমনি এক অবস্থা।

কিন্তু বেশী কথা বলার সময় ছিল না। দূরে থেকে অস্ফুট সামরিক ভ্যানের গর্জন শোনা গেল। ঐ যে, ঐ যে আসছে ওরা! তাঁরা সাতজন সাতটি রাইফেল নিয়ে তৈরী হয়ে দাঁড়ালেন। সেই অস্ফুট আওয়াজ ক্রমেই স্ফুট থেকে স্ফুটতর হয়ে উঠতে লাগল। তারপর একটু বাদেই দেখা গেল সামরিক ভ্যান পথের ধুলো উড়িয়ে দ্রুতবেগে ছুটে আসছে। উত্তেজিত প্রতীক্ষায় তাঁদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গুলি ইস্পাতের মত দৃঢ় আর কঠিন হয়ে এল।

সামরিক ভ্যান দ্রুত আসতে হঠাৎ থেমে গেল। না থেমে উপায় ছিল না, কাদের অদৃশ্য হস্তের গুলিতে গাড়ির টায়ারের চাকা ফুটো হয়ে গেছে। একই সঙ্গে কতগুলি রাইফেলের আওয়াজ। বিস্ময়ে, আতঙ্কে সৈন্যরা ঝুপঝাপ করে গাড়ি থেকে লাফিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ল। কিন্তু সেই অদৃশ্য হস্তের গুলিবর্ষণের যেন শেষ নাই। সৈন্যদের মধ্যে যারা সামনের দিকে ছিল, তাঁদের মধ্যে অনেকে হতাহত হয়ে ভুমিশয্যা নিল। একটু বাদেই রাইফেলের আওয়াজ থেমে গিয়ে পল্লী- প্রকৃতির নিস্তব্ধতা আর শান্তি ফিরে এল।

সৈন্যরা সন্ধানী দৃষ্টি নিয়ে তন্ন তন্ন করে চারদিক পরীক্ষা করে দেখতে লাগল। অদৃশ্য শত্রুরা কি তবে ভয় পেয়ে পালিয়ে গিয়েছে? না , ওদের বিশ্বাস নাই, একটু বাদেই হয়তো ওরা আরেকদিক থেকে আক্রমণ করে বসবে। রাস্তার দু পাশে অনেক ঝোপঝাড়- জঙ্গল। তাদের মাঝখানে ওরা কোথায় আশ্রয় নিয়ে বসে আছে কে জানে! তবে দলে ওরা ভারী সে বিষয়ে সন্দেহ নাই।তা না হলে তাদের বিরুদ্ধে এমন করে হামলা করতে সাহস পেত না।

চন্দ্রগঞ্জ সমৃদ্ধ অঞ্চল। এখানে এসে অবাধে লুটপাট করা যাবে, এই আশা নিয়ে তারা এখানে এসেছিল। এই অঞ্চলে তাদের একজন জামাতে ইসলাম পন্থী দালাল ছিল। তার কাছ থেকে খবর পেয়েই তারা লুটের আশায় এখানে ছুটে এসেছে। তারা শুনেছিল এখানে তাদের বাধা দেবার মত কেউ নেই। কিন্তু হঠাৎ কে জানে কোথা থেকে এই শয়তানের দল মাটি ফুঁড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে! কে জানে, হয়তো ওরা ইতিমধ্যে তাদের চারদিক দিয়ে ঘেরাও করে ফেলছে! প্রতি গাছ আর প্রতিটি ঝোপঝাড়ের আড়ালে যে একজন করে শত্রু লুকিয়ে নেই এমন কথাই বা কে বলতে পারে! ওদের রাইফেলগুলি এইভাবে বহু গুলি অপচয় করার পর থামলো।

কিছু সময় নিঃশব্দে কেটে গেল। সৈন্যরা ভাবছিল, তাদের অদৃশ্য শত্রুরা সম্ভবত পালিয়ে গেছে। এমন প্রবল গুলি বৃষ্টির সামনে ওরা কেমন করে দাঁড়িয়ে থাকবে! কিন্তু তাহলেও ওদের গতিবিধি লক্ষ্য করা দরকার। এবার বেশ হুশিয়ার হয়ে এগুতে হবে। যারা হতাহত হয়ে ভুমিশয্যা নিয়েছে, ওরা তাদের একজন একজন করে ভ্যানের উপর তুলছিল। ঠিক সে সময়ে আবার কতকগুলি রাইফেল একসঙ্গে গর্জে উঠল। গুলির পর গুলি আসছে বিরতি নেই। সৈন্যদের মধ্যে এক অংশ আছে ভ্যানের উপর, অপর অংশ রাস্তায়। অদৃশ্য হস্তগুলি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ছে। একটি গুলিও বৃথা যাচ্ছে না সৈন্যদের মধ্যে ভীষণ হট্টগোল পড়ে গেল। তারা একটু সামলে নিয়ে আবার প্রবলভাবে গুলিবর্ষণ করে চলল। কিন্তু তাদের সামনে কোন নিদির্স্ট লক্ষ্য নেই। এইভাবে কিছুক্ষন দুপক্ষের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলল। ইতিমধ্যে সৈন্যদের হতাহতের সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলছে। অপর পক্ষে অদৃশ্য প্রতিপক্ষের কি পরিমান ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে তা বোঝার কোন উপায় ছিল না।

অবস্থা দেখে আতঙ্কিত হয়ে উঠল সৈন্যরা। কিন্তু একটু আগেই তাদের দালাল, জামাতে ইসলামপন্থী সেই লোকটি , তাদের সাহায্য করবার জন্য এসে গেছে। সে অত্যন্ত চতুর লোক, চারদিকে ভালভাবে নজর করে সে এই রহস্য বুঝতে পারল। দূরবর্তী ইটের পাঁজাটার দিকে আঙ্গুলী নির্দেশ করে সে বলল, আমার সন্দেহ হয়, ওরা ঐ পাঁজাটার পেছনে দাঁড়িয়ে গুলি চালিয়ে যাচ্ছে। ঠিক কথাই তো, এই সন্দেহটা সকলের মনে জাগা উচিত ছিল কিন্তু এতক্ষন এই কথাটা ওদের কারও মাথায় আসে নি।

এবার ওদের রাইফেলগুলি একেবারে নিঃশব্দ হয়ে গেল। সৈন্যরা তিন ভাগে ভাগ হয়ে অতি সন্তর্পণে তিন দিক দিয়ে এগিয়ে চলল। ইটের স্তূপটাকে ঘেরাও করে ফেলতে হবে। খুব সাবধান, ওদের একটাও যেন সরে পড়তে না পারে।

মুক্তিবাহিনীর জওয়ানরা ইটের পাঁজার আড়াল থেকে সব কিছুই দেখছিল। সৈন্যদের মতলব বুঝতে তাদের বাকী রইল না।

আর এক মুহূর্ত দেরী করার সময় নাই। এখনই তাদের সরে পড়তে হবে। এই সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে তারা যতটা আশা করছিল, তার চেয়ে অনেক  বেশী কাজ হাসিল করতে পেরেছে। এবার তারা সাচ্ছন্দে ছুটি নিতে পারে। একজন একজন করে সাতজন মুক্তিযোদ্ধা ওদের দৃষ্টি এড়িয়ে ঝোপঝাড়ের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। কিন্তু কি দেখল এসে? দেখল পাখিগুলি তাদের একদম বোকা বানিয়ে দিয়ে মুক্ত আকাশে উড়ে চলে গিয়েছে। ইটের পাঁজার পেছনে একটি জনপ্রাণী নেই। শুধু মাটর উপরে অনেকগুলি কার্তুজের খোল ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়ে আছে।

সেদিন কার যুদ্ধে সবসুদ্ধ ২৩ জন সৈন্য হতাহত হয়েছিল। আর মুক্তিবাহিনীর জওয়ান সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসতে পেরেছিল। যে দেশদ্রোহী দালালটি শত্রুদের সাহায্য করবার জন্য এগিয়ে এসেছিল, এর কয়েকদিন বাদেই মুক্তিযোদ্ধারা তাকেও খতম করল।

সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ঘা খেয়ে পাক সৈন্যদের চূড়ান্তভাবে নাকাল হতে হয়েছিল। চন্দ্রগঞ্জে লুটপাট করা দূরে থাক, হতাহত বন্ধুদের নিয়ে গাড়ি বোঝাই করে ওরা মাথা হেট করে ফিরে এসেছিল কিন্তু এই অপমান আর লাঞ্ছনা ওরা ভুলে যেতে পারেনি। দিন কয়েক বাদে ওরা আবার নতুনভাবে তৈরী হতে চলল চন্দ্রগঞ্জের দিকে। তাদের মনের জ্বালাটা এবার ভাল করেই মিটিয়ে নেবে।

পাকসৈন্যরা আবার হামলা করতে আসছে, এই খবরটা পৌঁছে গিয়েছিল চন্দ্রগঞ্জে। সুবেদার লুৎফর রহমান এখন সেখানে নেই, অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যেও কেউ নেই। এবার কে তাদের প্রতিরোধ করবে? ওরা সেদিন আচ্ছামত ঘা খেয়ে ঘরে ফিরে গেছে, এবার ভাল করেই তার প্রতিশোধ তুলবে। চন্দ্রগঞ্জকে এবার ওরা ধ্বংসস্তুপে পরিণত না করে ছাড়বে না। যাকে পাবে তাকেই মারবে। ওদের হাতে কেউ কি রেহাই পাবে? সারা অঞ্চলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। চন্দ্রগঞ্জের মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে শুরু করল। ওরা ওদের যা করবার বিনা বাধায় করা যাবে।

কিন্তু চন্দ্রগঞ্জের একটি মানুষ এই কথাটাকে কিছুতেই মেনে নিতে পারলেন না। না, কিছুতেই না, গর্জে উঠলেন তিনি, এ আমি কিছুতেই হটে দেব না। আর যদি কেউ না যায়, আমি একাই যাব, একাই গিয়ে ওদের সঙ্গে লড়াই করব।

কে এই লোকটি? কি তাঁর নাম? না, তাঁর নাম আমার জানা নেই। কোন খ্যাতনামা লোক নন তিনি। একজন বৃদ্ধ প্রাক্তন সৈনিক। আর দশজন বৃদ্ধের মত তিনিও তাঁর জীবনের শেষ দিন গুলি ‘আল্লাহ আল্লাহ’ করে কাটিয়ে যাচ্ছিলেন। একজন সাধরণ মানুষ। কেউ কোনদিন তাঁর কোন অসাধারণত্তের পরিচয় পায়নি। কিন্তু আজ দেশের এক বিশেষ অবস্থায় একটি বিশেষ অনুকুল মুহূর্তে তাঁর ভেতরকার সুপ্ত আগুনকে জাগিয়ে তুলিছে। যেখানে হাজার হাজার মানুষ ভয়ে অস্থির সেখানে এই একটি মানুষ দৃঢ় নিষ্কম্প কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, যদি একা যেতে হয়, আমি একাই যাব, আমি একাই ওদের সঙ্গে লড়াই করব।মরবার আগে এই হিংস্র পশুগুলির মধ্যে একটাকেও যদি মেরে যেতে পারি, তবে আমার জীবন সার্থক হবে।

যারা তাঁর হিতৈষী, তারা তাঁকে নিবৃত্ত করবার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছিল। বলেছিল, তুমি একা মানুষ, তাঁর উপরে বুড়ো হয়েছ, তুমি কি করে ওদের সঙ্গে লড়াই করবে? কিন্তু কারও কোন বাধা তিনি মানলেন না, দৃঢ় মুষ্টিতে রাইফেলটা আঁকড়ে ধরে বেরিয়ে পড়লেন ঘর থেকে। তাঁর এই দৃষ্টান্তে অনুপ্রানিত হয়ে তাঁর তরুন ছেলে তাঁকে ডেকে বলল, দাঁড়াও আব্বা, আমিও তোমার সঙ্গে যাব।তোমার মত আমিও ওদের সঙ্গে লড়াই করব। ছেলের কোথা শুনে বাপের মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। দুজনের হাতে দুটি রাইফেল পিতাপুত্র পাশাপাশি প্রতিরোধ সংগ্রামে যাত্রা করল।

আজও ওরা সেই ইটের পাঁজার পেছনে আশ্রয় নিল। ওরা পিতা পুত্র পাশাপাশি বসে শত্রুদের আগমনের জন্য অধীর চিত্তে প্রতীক্ষা করতে লাগল। কিছুক্ষন বাদে দূর থেকে মোটর ভ্যানের গর্জন শোনা গেল। হ্যা এইবার ওরা আসছে। দেখতে দেখতে সৈন্য বাহী একেবারে কাছে এসে পড়ল। সৈন্যদের মধ্যে অনেকের কাছেই এই ইটের পাঁজাটি সুপরিচিত। ঐটিকে ভুলে যাওয়া তাদের পক্ষে কোন মতেই সম্ভব নয়, কিন্তু আজও যে কেউ তাদের আক্রমণ করবার জন্য এর আড়ালে ওৎ পেতে বসে থাকতে পারে, এটা তারা ভাবতে পারেনি। ভাবতে না পারা স্বাভাবিক ও নয়। কিন্তু ওরা এই স্তুপটার বরাবর আসতেই পর পর তিনজন সৈন্য গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেল। সবাই দেখতে পেল কে বা কারা তাদের লক্ষ্য করে স্তূপটার আড়াল থেকে গুলিবর্ষণ করে চলছে। এরপর সঙ্গে সঙ্গেই সৈন্যরা এর পাল্টা জবাব দিল। ইটের পাঁজাটাকে লক্ষ্য করে ঝাকে ঝাকে গুলিবর্ষণ চলল। এরপর সেই স্তুপের পেছন থেকে আর কোন গুলির শব্দ শোনা গেল না। সৈন্যরা একটু সময় অপেক্ষা করল,তারপর ছুটে গেল স্তূপটার সামনে। উদ্যত রাইফেল বাগিয়ে ধরে যখন তারা পায়ে পায়ে সেই স্তূপটার পিছনে গিয়ে দাঁড়াল, তখন দেখতে পেল, সেখানে এক বৃদ্ধের রক্তাক্ত মৃতদেহ পড়ে আছে। কিন্তু অস্ত্র বলতে কোন কিছু সেখানে নেই, শুধু কয়েকটা কার্তুজের খোল পড়ে আছে। ওরা বুঝল, এই বৃদ্ধের সঙ্গে আরও যারা ছিল তারা অস্ত্রসহ পালিয়ে গিয়েছে।

।। সোনাইমুড়ি রেলস্টেশন ।।

চন্দ্রগঞ্জের যুদ্ধের পর সুবেদার লুৎফর নোয়াখালীর বিভিন্ন অঞ্চলে শিকারের সন্ধানে ছুটে চলছিলেন। তাঁর এক মুহূর্তেও বিশ্রামের অবকাশ নেই। তিনি পাক সৈন্যদের গতিবিধি সম্পর্কে দক্ষ শিকারির মত তীক্ষ্ণ সন্ধানী দৃষ্টি নিয়ে ফিরছিলেন। মুক্তিবাহিনীর গুপ্তচরেরা নিত্য নতুন সংবাদ নিয়ে আসছে। আর সেই সুত্র অনুসরণ করে তাদের মুক্তিবাহিনী যেখানেই সুযোগ পাচ্ছে, সেখানেই শত্রুদের উপর ঘা দিয়ে চলছে।

এপ্রিলের শেষ ভাগ। খবর এল একদল সৈন্য কুমিল্লার লাকসাম থেকে ট্রেনে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি ষ্টেশনে এসে পৌঁছাবে। লুৎফর রহমান এই খবর পাওয়ার সাথে সাথেই তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে পরামর্শ করতে বসলেন। স্থির হোল, ওদের বিনা বাধায় এগুতে দেওয়া হবে না। সোনাইমুড়ি ষ্টেশনেই এই হামলাকারীদের উপর হামলা করতে হবে। রেল স্টেশনে চড়াও হয়ে আক্রমণ। হয়তো সে জন্য মুক্তিবাহিনীকে বেশ কিছুটা মূল্য দিতে হবে, অনেক ক্ষয়ক্ষতি বরণ করে নিতে হবে। তা হোক, এই শিকারকে কিছুতেই ফস্কে যেতে দেওয়া চলবে না।

কিন্তু এবার আর চন্দ্রগঞ্জের যুদ্ধের মত সাতজন মুক্তিযোদ্ধা দিয়ে চলবে না। এবার আর আগেরকার মত আড়াল থেকে যুদ্ধ নয়, যুদ্ধ বলতে দিবালোকে প্রকাশ্যে, মুখোমুখি। ওদের সৈন্য সংখ্যা বড় কম নয়, আক্রমণ করতে হলে বেশ কিছুটা শক্তি সংগ্রহ করে নিতে হবে সেই অল্প সময়ের মধ্যেই পঞ্চাশজন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাকে সোনাই মুড়িতে এনে জড় করা গেল। অবশ্য যতদূর জানা গিয়েছে, সৈন্যদের সংখ্যা এর চেয়েও অনেকটা বেশী। তাহোক, এই শক্তি নিয়েই ওদের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।

নির্দিষ্ট সময়ে সৈন্য বাহী ট্রেনটা সোনাইমূড়ি স্টেশনে এসে পৌছাল। মুক্তিবাহিনী কাছেই কোন এক জায়গায় লুকিয়ে ছিল। ট্রেনটা এসে পৌঁছাবার সাথে সাথেই রাইফেলধারী মুক্তিযোদ্ধারা বিদ্যুৎগতিতে ছুটে এসে ট্রেনটাকে ঘেরাও করে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে তারা ট্রেনের আরোহীদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে লাগল। ওরা গাড়ির ইঞ্জিনটাকেও লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছিল। ড্রাইভার ইঞ্জিন থেকে লাফিয়ে পড়ে প্রান নিয়ে পালাল। ফলে ড্রাইভারহীন ট্রেনটা অচল হয়ে গেল।

প্রকাশ্য দিবালোকে এইভাবে আক্রান্ত হতে হবে, পাক সৈন্যরা তা কল্পনাও করতে পারেনি। তারপর ঘটনাটা এমন দ্রুত ঘটে গেল যে একটু সময় ওরা হতভম্ব আর স্তব্দ হয়ে রইল। প্লাটফর্মের উপর নেমে পড়তে লাগল। ওদের মধ্যে কয়েকজনকে কামরা থেকে নামবার আগেই মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে প্রান দিতে হল।

এবার দু’পক্ষ শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ। এবারকার বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে রেলস্টেশনের উপরে এ ধরনের লড়াই আর কোথাও ঘটেছে বলে শোনা যায়নি। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি রেলস্টেশন এজন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে এই লড়াই চলল। এই যুদ্ধে পয়ত্রিশজনের মত পাকসৈন্য নিহত হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ছয়জন শহীদ হলেন।

ইতিমধ্যে খবরটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। খবর পেয়ে ঘণ্টা তিনেক বাদে আক্রান্ত পাক-সৈন্যদের সাহায্য করবার জন্য চৌমুহনী থেকে সামরিক ভ্যানে করে একদল সৈন্য ঘটনাস্থলে এসে পৌছল। এবার পাক- সৈন্যদের মোট সংখ্যা দাঁড়াল আড়াইশতের উপর। হতাহতদের বাদ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা তখন আনুমানিক চল্লিশ-এ এসে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াটা নির্বুদ্ধিতার নামান্তর মাত্র। মুক্তিযোদ্ধারা এমন ভুল কখনও করে না। তারা যেমন বিদ্যুৎ গতিতে এসে আক্রমণ করেছিল। তেমনিভাবে ঘটনাস্থল থেকেই অদৃশ্য হয়ে গেল। পাক সৈন্যরা তাদের পেছন পেছন করে আক্রমণ করতে চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তাদের সে চেষ্টা ব্যর্থ হল।