(১) রাজারবাগ পুলিশ লাইনসাক্ষাৎকারঃ শরীফ খান মোহাম্মদ আলী

Posted on Posted in 9

সাক্ষাৎকারঃ শরীফ খান মোহাম্মদ আলী

(১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাজারবাগ পুলিশ লাইনে হাবিলদার মেজর হিসেবে কর্মরত ছিলেন)

আর্মড সাব-ইন্সপেক্টর অব পুলিশ
বিআরপি, রাজশাহী
৩-২-৭৪

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ সকাল থেকে আমাদের পুলিশ লাইনে নীরব, নিস্তব্ধ ও থমথমে ভাব বিরাজ করছিলো। স্পেশাল আর্ম ফোর্স-এ আমার লাইনে রাত আটটায় বাইরের কর্তব্যরত সিপাহী বাদে আমি নাম ডাকার সময় মাত্র ত্রিশজন বাঙালি সিপাহীকে উপস্থিত পেয়েছি। আমি কোন অবাঙালি সিপাহীকেই লাইনে উপস্থিত পাইনি। ওরা সন্ধ্যার পরপরই আমার লাইন থেকে ডিউটি ত্যাগ করে কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছিল তার কোনো হদিস পাইনি। নাম ডাকার সময় বিপুলসংখ্যক সিপাহীর এভাবে উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনা রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ইতিহাসে আর ঘটে নি। ঢাকা জেলা রিজার্ভ লাইনের এ অবস্থা ছাড়া কেন্দ্রীয় লাইন থেকেও সেদিন সকল অবাঙালি সিপাহী তাদের পদস্থ অফিসারদের নির্দেশ ও মর্যাদা একেবারে উলঙ্গভাবে, পুলিশের ইতিহাসে এই প্রথম , অবজ্ঞা ও উপেক্ষা করে সম্মিলিতভাবে একযোগে উধাও হয়ে গিয়েছিলো। অবাঙালি সিপাহীদের রাজারবাগ পুলিশ লাইন থেকে এভাবে উধাও হয়ে যাওয়ার পর আমরা আসন্ন বিপদের কথা বুঝতে পারি এবং আমার অধীন বাঙালি সিপাহীদের হাতে অস্ত্র দিয়ে পুলিশ লাইনের সকল প্রবেশপথে তাদেরকে কড়া প্রহরায় নিযুক্ত করি। পুলিশ লাইনের চারটি প্রবেশপথে চারজন হাবিলদারের সাথে ছয়জন করে সশস্ত্র সিপাহী মোতায়েন রাখি। আমি খুব চিন্তাযুক্তভাবে পুলিশ লাইনে টহলরত ছিলাম। আমি এক সময় দোতলা থেকে অস্ত্রাগারের সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামছিলাম। এমন সময় অস্ত্রাগারের ভিতরের টেলিফোনটি বেজে উঠলে আমার কর্তব্যরত নায়েক চিৎকার করে আমাকে টেলিফোন ধরতে বলে। আমি দৌড়ে গিয়ে টেলিফোন ধরলাম। অস্ত্রাগারের সেই টেলিফোনে এক ভীতসন্ত্রস্ত কাঁদো কাঁদো কম্পিত কণ্ঠ চাপাচাপা অস্ফুট কণ্ঠে বলছিল “মিলিটারী হেডকোয়ার্টারে বহু সশস্ত্র আর্মি ট্রাক লাইন হয়ে দাড়িয়ে আছে। ওরা এখুনি রাজধানী আক্রমণ করতে যাচ্ছে।” সেই ভীত কণ্ঠ আরো বলেছিলো- “ওদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু রাজারবাগ পুলিশ লাইন, ই-পি-আর হেড কোয়ার্টার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইকবাল হল।“ এ কথা বলেই সেই কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে গেলো। “কে বলছেন? কোথা থেকে বলছেন ?“ আমি চিৎকার করে এসব প্রশ্ন করার সাথে সাথে টেলিফোনের লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। সিপাহীরা টেলিফোনের এ মারাত্মক সংবাদ লাইনের সর্বত্র চীৎকার করে ছড়িয়ে দিচ্ছিলো। এ সংবাদে সকল সিপাহী অস্ত্রাগারের দিকে ছুটে এসে টেলিফোনের সংবাদ সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করতে থাকে। এ সময় আমি লাইনে বসে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের তৎকালীন আর-আই মিঃ মফিজউদ্দীনের সাথে তার বাসায় টেলিফোনে যোগাযোগ করে ঢাকা সেনানিবাস থেকে ভেসে আসা পাক সেনাদের রাজারবাগ পুলিশ লাইনের দিকে ধেয়ে আসার সংবাদ বিস্তারিত জানালে তিনি তৎকালীন পুলিশ সুপার ই,এ, চৌধুরী সাহেবকে সব কিছু জানাচ্ছেন বলে টেলিফোন ছেড়ে দেন। এদিকে আমার সিপাহীরা এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইনের চারশত বাঙালি বলছিলো “অস্ত্র দাও, অস্ত্র দাও। আমাদের হাতে অস্ত্র তুলে দাও, আমরা ওদের প্রতিরোধ করব, প্রতিহত করবো।“ শেষ পর্যন্ত অস্ত্রাগারের সামনে দাঁড়িয়ে আমার হাবিলদার সহকর্মীরা বুকফাটা চীৎকারে রাজারবাগ কাঁপিয়ে তুলে বলছিলো “আমাদের হাতে অস্ত্র দাও, আমরা লড়বো, লড়তে লড়তে মরবো, শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই করবো ঐ বেঈমানদের বিরুদ্ধে কিন্তু পিছু হটবো না, হটবো না।“ এরপর আমি রিজার্ভ ইন্সপেক্টর সাহেবের বাসায় গিয়ে তাকে না পেয়ে আমাদের ফোর্সের সুবেদার আবুল কাসেমকে এ সংবাদ জানালে তিনি লাইনে ছুটে আসেন। এর পরপরই আমাদের আরআই সাহেব পুলিশ সুপার ই,এ চৌধুরীর সাথে আলাপ –আলোচনা করে লাইনে এসে বলেন, “তোমরা ওদের রুখতে পারবে না কোনো প্রকারেই, দেখো আমাদের নীরব থাকাই ভালো।“
কিন্তু তখন নীরব থেকে প্রাণ বাঁচাবার কোনো উপায় ছিলো না। পুলিশ লাইনের সকল বাঙালি সিপাহীই তখন অস্ত্র নিয়ে ওদেরকে প্রাণপণ প্রতিরোধ করার জন্য ব্যাকুল ও ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলো। সিপাহীরা বলছিলো, “আর-আই সাহেব আপনি অস্ত্রাগার খুলে দিন, আমাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিন, আমরা ওদের প্রতিরোধ করবো।“ এরপর আর-আই সাহেব অস্ত্রাগারের চাবি দিয়ে দিলে বাঙালি সিপাহীরা সবাই পাগলের মতো অস্ত্রাগারে প্রবেশ করে যার যার প্রয়োজন মতো রাইফেল ও গুলি হাতে তুলে নেয়। এ সময় চারিদিক থেকে হাজারো জনতা রাজারবাগ পুলিশ লাইনে প্রবেশ করে আমাদের অস্ত্রাগার থেকে বিনা বাধায় অস্ত্র নিয়ে যায়। এসময় আমাদের অফিসাররা বাইরে কর্তব্যরত ছিলেন। এ সময় সুবেদার ফোর্স আবুল কাসেম, আর-ও হাফিজুর রহমান, সার্জেন্ট মূর্তজা হোসেন, সুবেদার আবুল হাশেম, নায়েক মোহাম্মদ আলী (ফুটবল খেলোয়াড়) সবাই সশস্ত্রভাবে আমাদের সিপাহীদের সাথে মরণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য তৈরী ছিলেন। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সমস্ত বাতি নিভিয়ে দিয়ে সমস্ত সিপাহী লাইনের চারিদিকে মাটিতে শুয়ে, ছাদের উপর বসে থেকে, দাঁড়িয়ে থেকে, গাছের আড়ালে থেকে পজিশন নিয়ে পাক পশুদের অপেক্ষায় ছিলো। সেদিন হাবিলদার তাজু আহমেদ, হাবিলদার আবুল হোসেন, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফুটবল খেলোয়াড় নায়েক মোহাম্মদ আলী, হাবিলদার আতাউর রহমান, সিপাহী মোহাম্মদ আলী, আরও কতিপয় হাবিলদার, নায়েক ও সিপাহী এবং কেন্দ্রীয় পুলিশ ফোর্সের সুবেদার খলিলুর রহমান মৃত্যুকে তোয়াক্কা না করে সবার সামনে দাঁড়িয়ে পুলিশ লাইনের সবাইকে এ প্রতিরোধে বীরের মতো নেতৃত্ব দিয়েছেন। ওদের সকলকে সালাম।

আমরা চারিদিকে ছড়িয়ে পজিশন নিচ্ছিলাম ওদের প্রতিরোধ করার জন্য। হঠাৎ টেলিফোন বেজে উঠল। টেলিফোনে এক ভীতসন্ত্রস্ত কম্পিত বাঙালি সিপাহী কণ্ঠ বলছিলো, “ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট ফাঁড়ি থেকে বলছি। একশত সশস্ত্র আর্মি ট্রাক রাজধানীর দিকে এগোচ্ছে।“ এরপরই আরেক বাঙালি পুলিশের কণ্ঠ টেলিফোনে ভেসে আসলো, সেই মার্জিত কণ্ঠ বলছিলো, ”তেজগাঁ থানার সামনে দিয়ে সশস্ত্র আর্মি ট্রাক রাজধানীর দিকে এগোচ্ছে।“ এরপর আমাদের ওয়ারলেসে এক পুলিশ কণ্ঠ বলে উঠল, “ময়মসিংহ রোড থেকে টহলরত অফিসার বলছি, পাক আর্মির বহু ট্রাক রমনা রেসকোর্স মাঠে জড়ো হয়েছে।“ কিছুক্ষণ পরই দেখলাম পাক পশুর একটি দল হাতে স্বয়ংক্রিয় মেশিনগান নিয়ে সশস্ত্রভাবে চোরের মতো টিপে টিপে পা ফেলে আমাদের ব্যারাকের দিকে গুলি বর্ষণ করে। সাথে সাথে আমাদের রাইফেল গর্জে ওঠে। ওদের গুলিবর্ষণের জবাব দেই আমরা সম্মিলিতভাবে। পাক পশুদের প্রথম অগ্রগামী দলের কিছু সেনা মারা যায়। রাস্তায় ওদের লাশ পড়ে থাকে। অবশিষ্ট পাক পশু বিপদ বুঝতে পেরে সেই অন্ধকারে আবার চোরের মতো পিছু হটে যায়। এ ঘটনা ঘটে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই রাজারবাগ পুলিশ লাইনের দক্ষিণ- পূর্ব কোনে হাসপাতালের দিক থেকে অবিরাম শেলিং করতে থাকে পাক পশুরা। এরপর তারা উম্মত্তের মতো শেলিং করতে থাকে আমাদের পুলিশ লাইনের বিল্ডিং- এর উপর, উত্তর – পূর্ব কোণ থেকে। এভাবে তারা অবিরাম শেলিং করতে করতে পুলিশ লাইনের পূর্ব দিক থেকে ঢুকে পড়ে আমাদের এলাকার অভ্যন্তরে। আমাদের রাইফেলধারী বাঙালি পুলিশ প্রহরী তখন প্রাণপণ প্রতিরোধ করে যাচ্ছিল পাক পশুদের অবিরাম শেলিং- এর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। আমাদের বহু সিপাহী পুলিশ লাইনের পূর্ব দিকে ওদের প্রাণপণ প্রতিরোধ করতে করতে শহীদ হন। অবশিষ্ট সিপাহীরা রাইফেল নিয়ে পিছু হটে আমাদের ব্যারাকের বিভিন্ন নিরাপদ জায়গায় পজিশন নিয়ে ওদের প্রতিরোধ করতে থাকে। আমাদের সিপাহীদের প্রতিরোধ ও দৃঢ় মনোবলের সম্মুখে ওরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে আমাদের পুলিশ লাইনের পূর্ব দিকের ব্যারাকে লাইট-বোম বৃষ্টির মত বর্ষণ করতে করতে ভিতরে প্রবেশ করছিল। ওদের অবিরাম গোলাবর্ষণে আমাদের ব্যারাকের চারদিকে আগুন ধরে যায়, অস্ত্রাগারের দেয়াল ভেঙ্গে পড়ে যায়। দোতলার দেওয়ালগুলো ভেঙ্গে পড়তে থাকে আস্তে আস্তে। ওরা আমাদের আওতার বাইরে থেকে শেলিং করছিল, আর লাইট বোম মারছিল। আমাদের পুলিশ লাইনের একেবারে অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে তখনও সাহস পায়নি। রাত আনুমানিক আড়াইটার সময় ওরা মরিয়া হয়ে আমাদের ব্যারাকের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার চেষ্টা করেছিল। অবিরাম শেলিং হচ্ছিল, আগুনের ভয়ংকর ফুলকি নিয়ে লাইট- বোমগুলি একের পর এক পড়ছিল আমাদের দিকে। চারিদিকে আমরা ট্যাংক ও কামানের কান ফাটা ভীষণ গর্জন শুনছিলাম। পাক পশুরা এভাবে অজস্র শেলিং ও কামানের গোলাবর্ষণ করতে করতে আমাদের আওতার ভিতরে এসে গেলে আমাদের সিপাহীদের রাইফেলগুলো আবার গর্জে ওঠে। পশুদের কতিপয় আমাদের বীর নায়েক বিখ্যাত ফুটবলার খেলোয়াড়ের নেতৃত্বে, আমাদের সিপাহী কায়েস, সাত্তার, হাফিজ, নায়েক আঃ সুবহানের রাইফেলের গুলিতে মাটিতে পড়ে যায়। আর অবশিষ্ট পশুর দল পিছু হটে যায়। আমাদের বীর সিপাহীরা অবিরাম প্রতিরোধ করে যচ্ছিল, প্রাণপণে ব্যারাকের সেই জ্বলন্ত আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের বীর সিপাহীরা বীরবিক্রমে প্রতিহত করছিল। উম্মত্ত সেনাদের অগ্রগতিকে রুখে দিচ্ছিল নির্ভিকভাবে। আগুন ক্রমে ক্রমে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের উত্তর দিকের ব্যারাকে ছড়িয়ে পড়ছিল। আগুনের লেলিহান শিখায় সেই ধেয়ে আসা ভস্মের মধ্যে আমাদের কতিপয় বীর সিপাহী প্রতিরোধ সৃষ্টি করার সময় অকস্মাৎ আটকা পড়ে নিদারুন ভাবে শহীদ হন। আর অবশিষ্ট সিপাহী আগুন ও শেলিং –এর মুখে আস্তে আস্তে পিছু হটতে হটতে আমাদের প্রধান বিল্ডিং- এর দিকে আসতে থাকে- আমাদের বীর সিপাহীরা তখনও প্রতিরোধ করে যাচ্ছিল বীর বিক্রমে। মাইক্রোফোনে ওদের উম্মত্ত গর্জন শুনছিলাম, “তোমলোগ সারেন্ডার করো, হাতিয়ার দে দাও, নাই তো খাতাম কার দিওঙ্গা, তামা হও যায়েগা।“

আমাদের বীর সিপাহীরা ওদের মিথ্যা ভাঁওতায় কান না দিয়ে প্রাণপণ প্রতিরোধ করছিলো ওদের। কিন্তু আমাদের বীর সিপাহীরা ও আমাদের সকলের গুলি শেষ হয়ে গিয়েছিলো। আমাদের অস্ত্রাগারেও তখন প্রবেশ করার উপায় ছিলো না। সেখানে ওরা গোলাবর্ষণ করছিলো উম্মত্তভাবে। আমি উপায়ন্তর না দেখে পিছু হটতে হটতে পুলিশ লাইনের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত ঘোড়ার আস্তাবলের পিছনের রাস্তা দিয়ে আমিনবাগের মধ্যে দিয়ে চলে এসে প্রাণ বাঁচাই। এরপর আমি গ্রামের দিকে গিয়ে বাংলার মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ি।