(১) ৪র্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সশস্ত্র প্রতিরোধ সাক্ষাৎকারঃ লেঃ কর্নেল শাফায়াত জামিল

Posted on Posted in 9

<৯, ৩.২, ১২৮-১৩৩>

সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধে ৪র্থ বেঙ্গল রেজিমেন্ট

সাক্ষাৎকারঃ লেঃ কর্নেল শাফায়াত জামিল

(১৯৭১ সালের মার্চে ৪র্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর পদে কর্মরত ছিলেন। সাক্ষাৎকারটি বাংলা একাডেমির দলিলপত্র থেকে সংকলিত)

১৯৭১ সনের ১লা মার্চ তারিখে আমি আমার চতুর্থ বেঙ্গলের এক কোম্পানী সৈন্য নিয়ে কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া চলে আসি আমার সাথে চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের এর একটা কোম্পানী ছিল যার কমান্ডার ছিল একজন পশ্চিম পাকিস্তানী সিনিয়র মেজর। আমাদের পাঠানোর উদ্দেশ্য ছিল ভারতের সম্ভাব্য আক্রমণ মোকাবেলা করার জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে প্রতিরক্ষাব্যূহ তৈরী করা। এখানে বলে রাখা দরকার যে, চতুর্থ বেঙ্গলে আমিই বাঙালিদের মধ্যে সিনিয়র মোস্ট ছিলাম। আমরা চলে আসার পর কুমিল্লা সেনানিবাসে চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের আরও দুই কোম্পানী সৈন্য থেকে যায়।

 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আমি সব সময় কুমিল্লা সেনানিবাসের বাকি দুই কোম্পানীর সাথে যোগাযোগ করতাম। এ ব্যাপারে আমি সুবেদার আবদুল ওহাবকে ব্যবহার করতাম।

 

মার্চের ১ তারিখ থেকে ২৪ তারিখ পর্যন্ত কুমিল্লা সেনানিবাসের অস্বাভাবিক ঘটনাবলিঃ

 

১। আমাদের ইউনিট লাইনের চারদিকে পশ্চিম পাকিস্তানী অফিসার এবং জেসিওদের বিশেষ করে আর্টিলারী বাহিনীর লোকদের অস্বাভাবিক গতিবিধি বা চলাফেরা।

 

২। রাতের বেলায় মেশিনগান আমাদের ইউনিট লাইন, অফিসারদের বাসস্থান, অস্ত্রাগার এবং কোয়ার্টার গার্ডের দিকে পজিশন করে রাখতো। এবং দিনের বেলায় সেনানিবাসের বাহিরের দিকে পজিশন থাকতো। তাছাড়া আমাদের ইউনিট লাইনের চারিদিকে উঁচু পাহাড়ে পরিখা খনন করে। জিজ্ঞেস করলে বলতো “আমরা ট্রেনিং করছি।”

 

৩। ইউনিট লাইনে ব্রিগেড কমান্ডার ও অন্যান্য অফিসারদের অপ্রত্যাশিত পরিদর্শন।

 

৪। আমাদের খেলার মাঠের চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্ট অফিসার ও জেসিওদের সাথে ব্রিগেডের অফিসার ও জেসিদের দৈনিক খেলাধুলা প্রতিযোগিতা (যেটা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ছয় মাসে একবার, দুইবার হয়)। খেলার মাঠ রক্ষার জন্য অন্য রেজিমেন্টের প্রটেকশন পার্টিকে অস্ত্রশস্ত্রসহ নিয়োগ করা।

 

৫। যদিও সম্ভাব্য ভারতীয় আক্রমণের জন্য আমাদের উপর ছুটির ব্যাপারে কোন বাধা নিষেধ আরোপ করা হয় নাই। বরং চতুর্থ বেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসার ও ব্রিগেড কমান্ডার জোয়ানদেরকে বলেন, যার যার ইচ্ছানুযায়ী ছুটি নিতে পারে।

 

৬। মার্চ মাসের ১৮/১৯ তারিখে ইউনিট লাইনে রাত প্রায় বারোটার সময় গোলন্দাজ বাহিনীর একজন বাঙালি এসে খবর দেয় যে সেনানিবাসে আজ রাতে চতুর্থ বেঙ্গলের উপর পশ্চিম পাকিস্তানীরা হামলা চালাবে। এ খবর পাওয়া মাত্র ক্যাপ্টেন গফফার, লেফটেন্যান্ট মাহবুব, লেফটেন্যান্ট কবীর, বেঙ্গল রেজিমেন্টের দুই কোম্পানী (যারা সেনানিবাসের ভিতরে ছিল) নির্দেশ দেয় যে, সব জোয়ান নিজেদের অস্ত্রশস্ত্র অস্ত্রাগার থেকে নিয়ে যেন নিজেদের কাছে রাখে। চতুর্থ বেঙ্গলের সৈন্যদের দেখাদেখি সেনানিবাসের অন্যান্য পাকিস্তানি ইউনিট অস্ত্রশস্ত্র সহকারে তৈরী থাকে। সে রাতে কোন হামলা হয়নি। ২০শে মার্চ ভোরে সবাই আবার অস্ত্র জমা দেয়। রাতে অস্ত্রাগার থেকে বাহির করার জন্য কারো কাছে কোন কৈফিয়ত চাওয়া হয় নি। চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্ট কমান্ডিং অফিসার নিজে জেনেও উপরোল্লিখিত অফিসারদের কাছে কোন কৈফিয়ত চান নাই।

 

৭। ব্রিগেড কমান্ডার, ব্যাটালিয়ন কমান্ডার সপ্তাহে একবার সৈন্যদের উদ্দেশ্যে উপদেশ দিতেন, যেটা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার।

 

৮। ১০ মার্চ (১৯৭১) ১৭টি গাড়ি (রসদপত্র, তেল বোঝাই) কুমিল্লা থেকে সিলেট পাঠানো হয়। চতুর্থ বেঙ্গলের একজন সুবেদার সামসুল হক এবং দশজন (বাঙালি) লোককে এই কনভয়কে প্রটেকশনে পাঠানো হয়। এই কনভয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যও ছিল। দুই দিনে এই কনভয় কুমিল্লা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসে। রাস্তায় বেরিকেড ছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে এই কনভয়কে নিয়ে সিলেটের খাদিমনগরে পৌঁছাবার জন্য আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়। রাস্তায় রাস্তায় বেরিকেড অতিক্রম করে খাদিমনগরে পৌঁছাতে তিন দিন লাগে। ১৫ মার্চ আমি খাদিমনগর পৌঁছাই ও নির্দেশ মোতাবেক ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসার প্রস্তুতি নিই। কিন্তু আমাকে বলা হয় যে, অনির্দিষ্টকালের জন্য আমাকে ৩১ পাঞ্জাবের সাথে থাকতে হবে। এ খবর পাওয়া মাত্র আমি কুমিল্লায় টেলিফোন করলাম। বাঙালী অফিসাররা বিশেষ করে ক্যাপ্টেন গাফফার, লেফটেন্যান্ট মাহবুব, লেফটেন্যান্ট কবীর এবং জেসিওরা কমান্ডিং অফিসাররা আমাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য করেন। ১৭/১৮ তারিখে আমি ও আমার চতুর্থ বেঙ্গলের অন্যান্য সৈনিক ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে আমার কোম্পানিতে ফিরে আসি।

 

উপরোল্লিখিত আমি সন্দিহান হয়ে পড়ি। আমি সুবেদার ওহাবের মাধ্যমে কুমিল্লা সেনানিবাসে বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার ও জেসিদের কাছে খবর পাঠাতাম যে, কোন পরিস্থিতিতেই তারা যেন আত্মসমর্পন না করে। যদি প্রয়োজন হয় অস্ত্র নিয়ে তারা যেন বেরিয়ে আসে।

 

এই সন্দেহ এবং অবিশ্বাস সৃষ্টি হবার পর আমার কোম্পানী এবং মেজর সাদেক নেওয়াজের কোম্পানীর উদ্ধৃত্ত অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে আনা হয়।

 

       ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে আমরা ওয়াপদা কলোনী সংলগ্ন স্থানে তাঁবুতে দুই কোম্পানী থাকি। আমার আশংকা ছিল, এই দুই কোম্পানী সৈন্যকে পশ্চিম পাকিস্তানীরা অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে অস্ত্র সমর্পণ করতে বাধ্য করবে। এই সম্ভাব্য আক্রমণকে প্রতিহত করার জন্য আমি আমার কোম্পানীর এবং সাদেক নেওয়াজের কোম্পানীর জেসিওদের নির্দেশ দিই, যেন তারা আত্মরক্ষার জন্য আমাদের ক্যাম্পের চারিদিকে পরিখা খনন করে রাখে। আর যদি প্রয়োজন হয় তবে ঐসব পরিখা থেকে আক্রমণ প্রতিহত করা যেতে পারে।

 

       আমার এই সমস্ত কাজ খুব সাবধানে ও হুঁশিয়ারের সাথে করতে হয়। কেননা, মেজর সাদেক নেওয়াজ সব সময় আমাকে চোখে চোখে রাখতো। সে প্রায়ই আমাকে জিজ্ঞেস করতো, পরিখা খনন করা, পজিশন নেয়া- এগুলোর উদ্দেশ্য কি? আমি বলতাম, ডিগিং প্র্যাকটিস এবং পজিশন নেয়ার প্রশিক্ষণ রিভাইজ করা হচ্ছে।

 

       ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে আত্মরক্ষামূলক বিভিন্ন কাজ এবং বিভিন্ন জেসিওদের সাথে যোগাযোগ, প্রভাবান্বিত করা এবং সতর্ক করার কাজে লেফটেন্যান্ট হারুন আমাকে সর্বতোভাবে সাহায্য করেন। সে এসব কাজে উৎসাহী ছিল এবং অন্যান্য লোকদের প্রেরণা যোগাতো।

 

       প্রসঙ্গতঃ উল্লেখযোগ্য যে কুমিল্লার সাথে আমাদের বাহ্মণবাড়িয়া ক্যাম্পের যোগাযোগ ছিল একমাত্র টেলিফোনের মাধ্যমে এবং একটি সিগন্যাল সেট যেটা অস্বাভাবিকভাবে কুমিল্লা ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারের সাথে যোগাযোগ রাখতো। এ সময় আমি খুব অস্বস্তিকর পরিবেশে ছিলাম। আমি সবসময় চিন্তা করতাম যে কুমিল্লাতে অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ এবং সৈনিক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

 

       ২৪শে মার্চ সন্ধ্যায় আমরা দেখতে পেলাম কুমিল্লার দিক থেকে ৮টা গাড়ির আলো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে আসছে। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আমাদের ক্যাম্পের প্রটেকশন পার্টি পরিখাতে অবস্থান নেয়। গাড়ি কাছাকাছি আসার পর বুঝতে পারি, মেজর খালেদ মোশাররফ তার কোম্পানী নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ১২০ মাইল দূরে সমরেশনগরে নকশালপন্থী এবং ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীদের অশুভ তৎপরতা বন্ধ করার জন্য আসছে। এখানে বলে রাখা দরকার যে, মেজর খালেদ মোশাররফ যিনি আমার থেকে বাঙালীদের মধ্যে সিনিয়র সেদিনই ব্যাটালিয়নে ঢাকা থেকে এসে যোগদান করেন এবং একই দিনে তাঁকে কুমিল্লা থেকে ১৭০ মাইল দূরে সমশেরনগরে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এরপর চতুর্থ বেঙ্গলের একটি রাইফেল কোম্পানী আর হেডকোয়ার্টার কোম্পানী কুমিল্লা থেকে যায়।

 

       সেই রাতে মেজর খালেদ মোশাররফ লেঃ মাহবুবকে সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং তার কোম্পানী আমাদের ক্যাম্পে থাকে। মেজর সাদেক নেওয়াজের সর্বক্ষণিক উপস্থিতির জন্য আমরা খোলাখুলি আলাপ-আলোচনা করতে পারি নাই। শুধু আভাষে, ইঙ্গিতে এটুকু বুঝাতে সক্ষম হই, যে কোন পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে আমরা প্রস্তুত। সত্যি কথা বলতে কি, সেদিন আমি আর লেফটেন্যান্ট হারুন খুব খুশী হই এই ভেবে যে, আমাদের পরিচালনার জন্য একজন পুরোনো অভিজ্ঞ অফিসার চতুর্থ বেঙ্গলে যোগ দিয়ে কুমিল্লা থেকে আরও একটি কোম্পানীকে মরণ ফাঁদ থেকে কনফ্রন্টেশনের আগেই বের করে নিয়ে এসেছেন।

 

       মেজর খালেদ মোশাররফের নিকট একটা সিগন্যাল সেট ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার দিয়ে দেয়। আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে আমার সেট এবং খালেদ মোশাররফের সেট যেন একই ফ্রিকোয়েন্সিতে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়। ২৪/২৫ তারিখ সকালে তিনি তার কোম্পানী নিয়ে সমশেরনগরের দিকে রওয়ানা হয়ে যান।

 

       ২৫শে মার্চ সন্ধ্যাবেলায় কুমিল্লা থেকে নির্দেশ আসলো যে, আরো লোক আসছে তাদের থাকার ও খাবার ব্যাবস্থা করতে হবে। আমরা থাকার ও খাবার ব্যবস্থা করেছি কিন্তু আমরা জানতাম না কারা আসছে। রাত আটটার সময় দেখলাম যে লেঃ কর্নেল মালিক খিজির হায়াত খান কুমিল্লায় অবস্থিত চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাকি কোম্পানীগুলো নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে উপস্থিত হয়েছেন। এসে তিনি বললেন যুদ্ধ আসন্ন। সেজন্য ব্রিগেড কমান্ডার তাঁকে কুমিল্লা থেকে চতুর্থ বেঙ্গলের প্রায় সব লোক নিয়েই পাঠিয়ে দিয়েছেন।

 

       খিজির হায়াত খানের আসার পর চতুর্থ বেঙ্গলের অবস্থান নিম্নরুপঃ

 

       (ক) এক কোম্পানী সমশেরণগরে- যার কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ।

       (খ) তিন কোম্পানী- হেডকোয়ার্টার কোম্পানী আর ব্যাটালিয়ন হেডকোয়ার্টার- ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে।

       (গ) ৭০/৮০ জন লোক কুমিল্লায় ইউনিট লাইন এর প্রহরায় নিয়োজিত।

       (ঘ) এক প্লাটুন কুমিল্লার জাঙ্গালিয়া বিদ্যুৎ গ্রীড স্টেশনের প্রহরায়। এর কমান্ডার ছিল নায়েব সুবেদার এম. এ. জলিল।

 

       খিজির হায়াত খান ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌঁছেই ২৫শে মার্চ রাত এগারটায় আমাকে হুকুম দিলেন যে, আমি যেন আমার কোম্পানীর সৈন্য নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ১৩ মাইল দূরে শাহবাজপুর পুলের কাছে প্রতিরক্ষাব্যূহ তৈরি করি। রাত দু’টার সময় রওনা হয়ে তিনটায় শাহবাজপুরে পৌঁছাই। 

 

       সকাল ছ’টার সময় (২৬শে মার্চ) আবার খবর আসলো, কোম্পানী ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে ফেরত যেতে হবে। দেশে সামরিক আইন জারি করা হয়েছে।

 

সকাল সাতটায় রওনা হয়ে দশটায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌঁছাই। দশ মাইল আসতে তিন ঘণ্টা লাগে, কেননা জনসাধারণ বড় বড় গাছ রাস্তার উপরে ফেলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল।

 

ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে পৌঁছে দেখি সেখানে সান্ধ্য আইন জারী করা হয়েছে। আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌঁছার সাথে সাথে খিজির হায়াত খান আমাকে পুলিশ লাইনে গিয়ে তাদেরকে নিরস্ত্র করার নির্দেশ দিলেন। আমি তাঁকে বললাম যে নিরস্ত্র করতে গেলে খামাখা গণ্ডগোল, গোলাগুলি হবে। তার চেয়ে আমি নিজেই গিয়ে পরদিন ওদের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে আসার অঙ্গীকার করলাম। খিজির হায়াত খান প্রথমতঃ চেয়েছিলেন যে মেজর সাদেক নেওয়াজ গিয়ে প্রয়োজনবোধে শক্তি প্রয়োগ করে পুলিশদের নিরস্ত্র করুক। আমি অনর্থক রক্তপাত এড়ানোর জন্য খিজির হায়াত খানের কাছে এক মিথ্যা অঙ্গীকার করলাম যে আমি নিজে গিয়ে পরদিন ওদের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে আসবো। তিনি আমার কথায় রাজী হলেন।

 

২৬শে মার্চ বেলা বারটার সময় চতুর্থ বেঙ্গলের সিগনাল জেসিও নায়েব সুবেদার জহির আমাকে বললেন যে তিনি অয়ারলেস ইন্টারসেপ্ট করে দুটো স্টেশনের মধ্যে এই কথোপকথন শুনেছেন। তাঁকে খুব চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছিলো।

 

ইন্টারসেপ্টেড মেসেজগুলো ছিলঃ

 

(অনুবাদ)

(১) ট্যাঙ্ক গোলাবারুদ পাঠাও।

(২) হতাহতদের অপসারণ করতে হেলিকপ্টার পাঠাও।

(৩) ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৫০ জন পলাতক….. কিছু অস্ত্রসহ আর কিছু অস্ত্র ছাড়া।

 

এ সমস্ত মেসেজ পেয়ে আমার জুনিয়র অফিসারগণ লেঃ হারুন, লেঃ কবীর, লেঃ আখতার খুব উত্তেজিত হয়ে পড়ে। তখন আমি সিগনাল সেটে গিয়ে মেজর খালেদ মোশাররফের সাথে যোগাযোগ করি এবং অল্প চেষ্টায় তাঁর সাথে আমার যোগাযোগ হয়ে যায়। আমি তাঁকে চোস্ত ঢাকাইয়া বাংলায় ঐ মেসেজগুলো শুনাই এবং তাঁর মতামত জানতে চাই। আমি তাঁকে বলে যে, আমরা তৈরি এবং তাঁকে তাড়াতাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কোম্পানী নিয়ে আসার জন্য অনুরোধ করি। আমার সাথে যখন খালেদ মোশাররফের কথোপকথন চলে তখন সাদেক নেওয়াজ, লেঃ আমজাদ সাইদ এবং খিজির হায়াত খান আমাকে খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছিল। সেই জন্য খুব বেশি কথাবার্তা চালানো সম্ভব হয় নি এবং তিনিও সমশেরনগর থেকে বেশি কথা বলেন নি। শুধু বলেছিলেন যে, তিনি রাতের অপেক্ষায় আছেন।

 

তারপর থেকেই আমার জুনিয়র অফিসাররা তাড়াতাড়ি যে কোন সিদ্ধান্ত নেবার জন্য আমাকে পীড়াপীড়ি করছিল। আমি ব্যাটালিয়নের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন জুনিয়র অফিসারের মতামতের অপেক্ষায় ছিলাম। কেননা, সামান্য ভুল সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী না হলে সবকিছু পণ্ড হয়ে যাবে এবং নিজেদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় হতাহত হবে। আমি অন্ততঃ একজন অফিসার এবং একজন জেসিওকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবার জন্য সারারাত সময় দিই। সন্ধ্যার সময় আমি ইচ্ছাকৃতভাবে সৈনিকদের ক্যাম্পের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। আমাকে দেখা মাত্রই বেশ কয়েকজন সৈনিক যাদের মধ্যে কয়েকজন এনসিও ছিলেন, আমাকে ঘিরে ধরেন এবং বলেন যে, “স্যার দেশের মধ্যে যে কি হচ্ছে তা আপনারা আমাদের চেয়ে অনেক ভাল বোঝেন। আমরা অফিসারদের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। আপনাদের যে কোন নির্দেশ আমরা জীবন দিয়ে পালন করতে প্রস্তুত। আপনারা যদি বেশী দেরী করেন তবে হয়ত আমাদের কাউকে পাবেন না। আমরা আগামীকালের পরেই যে যার বাড়ির দিকে রওনা হবো। কিন্তু সঙ্গে নিজেদের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যাবো। সৈন্যদের এই মনোবল ও সাহস দেখে আমি খুব গর্বিত ও আশান্বিত হলাম এবং দু’একজন অফিসার ও জেসিও’র দ্বিধাদ্বন্দ্ব আমাকে সিদ্ধান্তে অবিচল থাকা থেকে বিরত করতে পারে নাই। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, আমার চেষ্টা সত্ত্বেও দুপুরের পরে খালেদ মোশাররফের সাথে কোন যোগাযোগ করতে পারি নি।”

 

২৬শে মার্চ সন্ধ্যার পরে ইয়াহিয়া খানের বেতার ভাষণ শুনে আমার বাঙালি জুনিয়র অফিসাররা আরো উত্তেজিত এবং ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো এবং আমাকে তক্ষুনি অস্ত্র হাতে তুলে নেবার জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগল। আমি রাতে আমার তাঁবুতে অবস্থান করলাম। সারারাত সাদেক নেওয়াজ এবং লেঃ আমজাদ আমার তাঁবুর ১০০/১৫০ গজ দূর থেকে আমাকে পাহারা দিচ্ছিল। আমার অজ্ঞাতেই তিন চারজন এনসিও (শহীদ হাবিলদার বেলায়েত হোসেন, শহীদ হাবিলদার মইনুল, হাবিলদার শহীদ মিয়া এবং হাবিলদার ইউনুস) সারারাত আমাকে পাহারা দেয় যাতে ঐ দুজন পাঞ্জাবী অফিসার আমার উপর কোন হামলা করতে না পারে। পাঞ্জাবী অফিসাররাও সারারাত সজাগ ছিল।

 

২৭শে মার্চ সকাল সাতটায় আমি লেঃ আখতারকে সাদেক নেওয়াজের কক্ষে পাঠাই এবং তাঁকে বলা হয় যখন সাদেক নেওয়াজ মেসে আমাদের সাথে নাস্তা করতে আসবে তখন যেন তাঁর স্টেনগান এবং ৮ ম্যাগাজিন গুলি অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়। আমার উদ্দেশ্য ছিল রক্তপাতহীন একটা অ্যাকশন পরিচালনা করা। কিছুক্ষণ পর আমি লেঃ হারুন আর লেঃ কবীর দুইজন এন-সি-ও সাথে করে অফিসার মেসের দিকে যাই। অফিসার মেসে পাঞ্জাবী অফিসারদের সাথে আমরা ব্রেকফাস্টে মিলিত হই। এন-সি-ও দের নির্দেশ দিই যে, আমাদের রক্তপাতহীন অ্যাকশনের সময় যদি কোন বাঙালি বিশ্বাসঘাতকতা করে তবে তাঁকে যেন গুলি করে হত্যা করা হয়। আমরা সকাল ৭-২০ মিনিটে ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে আছি। এমন সময় জেসিও খিজির হায়াত খানকে বলল যে, সাদেক নেওয়াজের কোম্পানীতে একটু মনোমালিন্য হয়েছে সুতরাং খিজির হায়াতকে সাদেক নেওয়াজের কোম্পানীতে এক্ষুনি যেতে হবে। একথা শোনা মাত্র খিজির হায়াত খান তক্ষুনি সাদেক নেওয়াজের কোম্পানীর কাছে যেতে উদ্যত হলো। আমি তাকে বাধা দিলাম এবং বললাম যে, পরিস্থিতি না জেনে এভাবে যাওয়া ঠিক হবে না। সুতরাং প্রথমে আমরা অফিসে যাই। ওখানে আলাপ-আলোচনার পর আমরা সকলেই সাদেক নেওয়াজের কোম্পানীতে যাবো। খিজির হায়াত এতে রাজী হলেন। সাদেক নেওয়াজ তখন তার স্টেনগান আনার জন্য তার কক্ষে যেতে উদ্যত হয়। আমি আবার বাধা দিই এবং বলি যে আমার স্টেনগানটা সে যদি চায় তবে সে সঙ্গে নিতে পারে। এতে সে আশ্বস্ত হয় এবং আমরা সকলেই অফিসে যাই। একটা তাঁবুতে অফিস করা হয়েছিল। তিনজন পশ্চিম পাকিস্তানী অফিসার তাঁবুতে ঢোকা মাত্রই লেঃ কবীর আর লেঃ হারুন তাঁবুর দুপাশে গিয়ে দাঁড়ান এবং আমি আমাদের সকলের আনুগত্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি ঘোষণা করি এবং বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে তাদেরকে বলি যে তারা আমাদের বন্দী। তদানুসারে তাদের জীবনের দায়িত্ব আমাদের এবং তারা যেন কেউ কোন বাঙালি অফিসার, জে-সি-ও, এন-সি-ওর সাথে কোন কথা না বলে। বলাবাহুল্য যে, পশ্চিম পাকিস্তানী ১২/১৫ জন সৈনিক যারা চতুর্থ বেঙ্গল এর সাথে ছিল, আমার নির্দেশের অপেক্ষা না করেই প্রায় একই সময়ে তাদেরকে বন্দী করে এক জায়গায় জমা করে রাখা হয়। বিনা রক্তপাতে আমাদের অ্যাকশন সম্পন্ন হয় এবং চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রায় সব ক’টা কোম্পানী তার সম্পূর্ণ অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ, যানবাহন, রসদপত্র নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

 

২৭শে মার্চ সকাল দশটার দিকে প্রায় ১০/১৫ হাজার উল্লসিত জনতা আমাদের ক্যাম্পে চলে আসে এবং ‘জয়বাংলা’ ধ্বনি দিয়ে আমাদের স্বাগত জানায়। অস্ত্র ধারণ করার পর দেখতে পেলাম আমার বেশ কয়েকজন অফিসার, জেসিও এবং এনসিও একটু অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়ছিলেন এই অল্প সময়ের মধ্যে জীবনের এই বিরাট পরিবর্তনে। কয়েকজনের ক্ষণিকের মধ্যে ১০২ থেকে ১০৪ ডিগ্রি জ্বর পর্যন্ত হয়েছিল। কয়েকজন আবোল-তাবোল বকছিল। দুইজন অফিসারকে বেশ কয়েকদিন আর চোখে পড়েনি। আমি নিজেও একটু অস্থির প্রকৃতির হয়ে পড়েছিলাম।

 

সকাল ১১টার দিকে আমি সব কোম্পানীকে নির্দেশ দিলাম তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের চার পাশের গ্রামগুলোতে যেন অবস্থান নেয় যাতে করে পাকিস্তানী বিমান হামলা থেকে ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন না হয়। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে আমাদের ব্যাটালিয়ন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চারিপার্শ্বের গ্রামে গোপন অবস্থান নেয়। বেলা আড়াইটার সময় মেজর খালেদ মোশাররফ তাঁর কোম্পানী নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌঁছেন। রাস্তায় হাজার হাজার বেরিকেড অতিক্রম করে আসার ফলে তাঁর আসতে দেরী হয়েছিল। তিনি আসা মাত্রই আমি চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুক্ত এলাকা তাঁর কাছে হস্তান্তর করি এবং তাঁর নির্দেশে পরবর্তী কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হয়।

 

কুমিল্লা সেনানিবাসে আমাদের যে সমস্ত লোক ছিল তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা আমাদের সম্ভব হয়নি। সুতরাং তাদেরকে ২৭শে মার্চ বলতে পারিনি যে আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করেছি। যা হোক, কর্ণেল খালেদ মোশাররফ ২৯শে মার্চ জাঙালিয়াতে আমাদের প্লাটুনের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন এবং তাদেরকে আমাদের সংগ্রামের কথা জানান এবং নির্দেশ দেন জাঙ্গালিয়া থেকে বেরিয়ে এসে ব্যাটালিয়নে যোগদান করতে।

 

আমরা পরে জানতে পেরেছি যে কুমিল্লা সেনানিবাসে আমাদের যে সমস্ত লোকজন ছিল তারা ২৯শে মার্চ আমাদের সংগ্রামের কথা জানতে পেরেছিল। কিন্তু নেতৃত্বের অভাবে তারা কোন অ্যাকশন নিতে পারে নি। ৩১শে মার্চ বিকাল চারটার সময় সেনানিবাসে অবস্থিত চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৭০/৮০ জন সৈনিকের উপর পশ্চিম পাকিস্তানীরা চারিদিক থেকে হামলা করে এবং প্রায় ছয় ঘণ্টা যুদ্ধের পর আমাদের চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্ট ইউনিট লাইন দখল করে। এই যুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানীদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়। চতুর্থ বেঙ্গলের ৮/১০ জন জোয়ান শহীদ হন। এই যুদ্ধে নায়েব সুবেদার এম এ সালাম অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শন করেন।

 

জাঙ্গালিয়াতে যে প্লাটুন ছিল সেটা ২৯শে মার্চ বের হয়ে মুক্তিসংগ্রামে যোগ দেয় এবং কুমিল্লা-লাকসাম রোডে নায়েব সুবেদার এম এ জলিলের নেতৃত্বে কয়েকটি সাফল্যজনক অ্যামবুশ করে।