(১) ৪র্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সশস্ত্র প্রতিরোধ(২) কুমিল্লার সশস্ত্র প্রতিরোধ সাক্ষাৎকারঃ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ

Posted on Posted in 9

সশস্ত্র প্রতিরোধঃ কুমিল্লা-নোয়াখালী-ঢাকা

 

শিরোনামউৎসতারিখ
৩। চতুর্থ বেঙ্গল ও অন্যান্য বাহিনীর কুমিল্লা, নোয়াখালী, ঢাকা জেলায় সশস্ত্র প্রতিরোধসাক্ষাৎকারঃ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ১৯৭৪-১৯৭৫১৯৭১

 

<৯, ৩.১, ৯৬-১২৮>

সাক্ষাৎকারঃ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ

(খালেদ মোশারফ একাত্তরের মার্চে ৪র্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টে সেকেণ্ড ইন কমাণ্ড হিসেবে মেজর পদে ছিলেন)

১৯শে মার্চ ১৯৭১ আমাকে ঢাকা সেনানিবাস থেকে চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের হেড অফিস কুমিল্লাতে বদলী করা হয়। আমি ২২শে মার্চ আমার পরিবারকে ঢাকার ধানমন্ডিতে রেখে কুমিল্লা চলে যাই এবং সন্ধ্যা সাতটায় চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টে গিয়ে যোগদান করি। ইউনিটে পৌছার সাথে সাথেই বুঝতে পারলাম আমার সৈনিকরা বেশ উদ্বিগ্ন। আরো জানতে পারলাম পাঞ্জাবীদের কমান্ডো এবং গোলন্দাজ আর্টিলারি বাহিনী বেঙ্গল রেজিমেন্টের চতুর্দিকে পরিখা খনন করে মেশিনগান লাগিয়ে অবস্থান নিয়েছে। নির্দেশ পেলেই সবাইকে হত্যা করবে। পাঞ্জাবীরা সেনানিবাস রক্ষার অজুহাতে এসব পরিকল্পনা নিয়েছে। পাঞ্জাবীদের কার্যাবলীতে চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকদের মনে তীব্র অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠেছিল। আমি পৌঁছাবার সঙ্গে সঙ্গে তারা জানতে চায় এখন তাদের কি কর্তব্য? আমি সকলকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে এবং আত্মরক্ষার্থে প্রহরী দ্বিগুণ করার নির্দেশ দিয়ে তাদের শান্ত করি। পরের দিন ২৩শে মার্চ ছুটির দিন ছিল। ২৪শে মার্চ সকাল ৭টায় আমি প্রথম অফিসে রিপোর্ট করি লেফটেন্যান্ট কর্ণেল খিজির হায়াত খানের কাছে। তিনি চতুর্থ বেঙ্গল কমান্ডিং অফিসার ছিলেন এবং পাঞ্জাবী ছিলেন। লেফটেন্যান্ট কর্ণেল খিজির হায়াত খান আমাকে বুঝাতে চেষ্টা করলেন যে আমার পোষ্টিংয়ে তিনি খুব খুশি হয়েছেন এবং ইউনিট সম্বন্ধে নানা বিষয়ে আলাপ আলোচনা করলেন। ঐদিনই আমি যখন আমার অফিসে সেকেণ্ড ইন কমাণ্ড উপ-প্রধানের কাজ বুঝে নিচ্ছিলাম সকাল প্রায় সাড়ে দশটায় তখন খিজির হায়াত খান ডেকে পাঠালেন। আমি অফিসের ভিতর ঢুকে দেখি খিজির হায়াত খান উদ্বিগ্ন। তিনি আমাকে বসার জন্য বললেন এবং জানান যে আমাকে গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব নিয়ে আজই কুমিল্লা থেকে রওনা হতে হাবে। আমি উত্তর দিলাম যে হুকুম যদি হয় আমি নিশ্চই যাব। তবে আমি একদিন হয় এসেছি এবং আমার দায়িত্ব কেবল বুঝে নিচ্ছি, এমতাবস্থায় ইউনিট থেকে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়তো আপনার পক্ষে ভুল হবে। তাকে আরো বুঝাতে চেষ্টা করলাম ব্যাটালিয়ানে আরো অফিসার আছে, তাদেরকেও পাঠানো যেতে পারে। তাছাড়া ইউনিট প্রধানকে সাধারণত: এভাবে পাঠানো হয়না। আমার বক্তব্য শোনে তিনি বললেন ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেজন্য তোমাকেই যেতে হবে। আমি জানতে চাইলাম আমাকে কি ধরণের দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হচ্ছে। খিজির হায়াত খান বললেন যে, খবর এসেছে সিলেটের শমসের নগর নামক একটা জায়গায় নকশালপন্থীরা বিশেষ তৎপর রয়েছে এবং পাশ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারত তাদেরকে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে ব্যাপকভাবে সাহায্য করছে। আরো খবর আছে ভারত থেকে বেশ অনুপ্রবেশও হচ্ছে। এইসব কারণে আমাকে চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটা কোম্পানী নিয়ে সেখানে যেতে হবে এবং তাদেরকে দমন করতে হবে। আমি জবাব দিলাম একটা কোম্পানী যখন যাবে তখন কোন জুনিয়র মেজরকে সেখানে পাঠানো যেতে পারে। সাধারণত উপ-প্রধান একটা কোম্পানী নিয়ে কখনও যায়না। আমার বক্তব্যে খিজির হায়াত খান কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন এবং আমাকে বললেন ঠিক আছে আপনি যান এবং আমি আপনাকে একটু পরে ডেকে পাঠাব। কিছুক্ষণ পরে কর্ণেল আমার আমাকে ডেকে পাঠালেন এবং ব্রিগেড কমান্ডারের কাছে ইকবাল শফি এখনই আপনাকে ডেকেছেন। আমাকে নিয়ে কর্ণেল খিজির হায়াত খান ব্রিগেড কমান্ডারের কাছে গেলেন। ব্রিগেড কমান্ডার আমাকে দেখেই বললেন আমি তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। বিশেষ একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে যা একমাত্র তুমি ছাড়া কেউ সম্পন্ন করতে পারবেনা এবং সেই জন্য আমি তোমাকেই নির্বাচিত করেছি। আশা করি তুমি আমাকে নিরাশ করবে না। তিনি আরো বললেন, তোমার মত একজন সিনিয়র অফিসারকে এই জন্য মনোনীত করা হয়েছে। আমি ট্রুপস ছাড়া শমসের নগর ইপিআর-এর একটি কোম্পানী আছে। এই বড় ফোর্সের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য একজন সিনিয়র বাঙালি অফিসারের দরকার। তুমিই একমাত্র বাঙালি অফিসার কুমিল্লাতে যাকে আমি এ ব্যাপারে বিশ্বাস করতে পারি।

 

আমি বুঝতে পারলাম যেতে আমাকে হবেই। উপায় যখন আর নেই তখন যতটুকু তাদের কাছে আদায় করে নেয়া যায় সেইটুকুই আমার পক্ষে মঙ্গল। আমি ব্রিগেডিয়ার শফিকে বললাম, যে কাজের ভার আমাকে দিচ্ছেন শুধু একটা কোম্পানী দিয়ে তা হবেনা। কোম্পানীর চেয়ে বেশী সৈন্য আমাকে দেয়া হোক। আর হেড কোয়ার্টারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য একটা শক্তিশালী ওয়ারলেস দেওয়া হোক। এছাড়া যেহেতু আমি অনেক দুরে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে যাচ্ছি সেহেতু আমার ট্রুপস-এর জন্য স্বয়ংক্রিয় ভারী এবং হালকা অস্ত্রশস্ত্র এবং মর্টার ইত্যাদি এবং যথেষ্ট পরিমাণ গোলাবারুদ দেয়ার অনুমতি দেয়া হোক। ব্রিগেডিয়ার শফি প্রথমে বললেন, তোমাকে যে কাজের জন্য পাঠানো হচ্ছে, তাতে এসব ভারী অস্ত্রশস্ত্রের দরকার হবে না। আমি উত্তরে বললাম যে, আপনি যে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থার কথা চিত্রিত করেছেন তাতে আমার সামরিক জ্ঞান অনুসারে এই সমস্ত ভারী অস্ত্রশস্ত্রের দরকার হবে বিশেষ করে যেখানে হেড কোয়ার্টার থেকে তাড়াতাড়ি সাহায্য পাবার আশা কম। আমার বক্তব্যে ব্রিগেডিয়ার শফি কনভিন্সড হলেন এবং কর্ণেল খিজির হায়াতকে নির্দেশ দিলেন আমার যা প্রয়োজন তা যেন আমাকে দিয়ে দেয়া হয়। আমরা ব্রিগেডিয়ার শফির কাছ থেকে ইউনিটে ফিরে এলামা। এসই ব্যাটালিয়নের এডজুট্যান্ট ক্যাপ্টেন গফফারকে (এখন মেজর) ডেকে নির্দেশ দিয়ে দিলাম সমস্ত ব্যাটালিয়ান থেকে বেছে বেছে ২৫০ জনের মত সৈন্যকে আলফা কোম্পানীতে একত্র করার জন্য।

 

গাফফারকে বলে দিলাম যে, ব্যাটালিয়নের ভারী অস্ত্রশস্ত্র যতো আছে সব নিয়ে যাও। গোলাবাদরু এমনভাবে নেবে যাতে একমাস যুদ্ধ করা যায়। আমাদের ২৬টা গাড়ী ব্রিগেড থেকে দেওয়া হয়েছিল। সব বোঝাই করতে এবং অস্ত্রশস্ত্র ও সৈনিকদের তৈরী করতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। এই সময় আমি একটা অস্বাভাবিক ঘটনা দেখতে পাই। যতোক্ষণ পর্যন্ত আমি এবং আমাদের লোকজন প্রস্তুত হচ্ছিলাম ততক্ষণ পর্যন্ত খিজির হায়াত এবং অন্যান্য ব্রিগেড স্টাফের অফিসাররা বসে লক্ষ্য করতে থাকলেন।

 

আমি ২৪শে মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় যাওয়ার জন্য তৈরী হই। ব্যাটালিয়নে যে সমস্ত বাঙালি অফিসার থেকে গেল তারা সবাই আমার যাবার পূর্বে মেসে এসে দেকা করে গেল। এদের মধ্যে সিনিয়র অফিসার ছিলেন ক্যাপ্টেন মতিন (বর্তমানে মেজর) তাকে আমি উপদেশ দিলাম যে আমি চলে যাচ্ছি, এতে ঘাবড়াবার কিছু নাই। এখন তুমিই সিনিয়র। যদি কোন অঘটন ঘটে তাহলে এই চতুর্থ বেঙ্গলের বাকী ট্রুপসের নিরাপত্তার পুরো বন্দোবস্ত করবে এবং যদি প্রয়োজন হয় যুদ্ধ করে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে আসবে এবং আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় আমি কনভয় নিয়ে শমসের নগরের পথে রওনা হলাম। রাত প্রায় ২টা-আড়াইটার সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের উপকন্ঠে পৌঁছলাম। সেখানে রাস্তায় অনেক ব্যারিকেড। এই প্রতিবন্ধকতার জন্য আমাদের এগোতে অসুবিধা হচ্ছিল। এই ব্যারিকেড ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে শহরের দিকে এগোচ্ছিলাম। শহরের কিনারে যে পুল আছে (নিয়াজ পার্কের কাছে) সেখানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছাত্র-জনতা আমাদের বাধা দেয়। হাজার হাজার লোক এবং ছাত্র রাস্তায় শোয়ে পড়ে এবং বলে যেতে দেওয়া হবেনা। আমি সেখানকার নেতৃস্থানীয় লোকদের সাথে কথা বলতে চাইলাম। ওখানেই আওয়ামী লীগের তদানিন্তন এমসিএ সাচ্চু মিয়া এবং অন্য কয়েকজন আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রনেতারা আমাকে জানান যে, পূর্ব বাংলার অনেক জায়গায় পাকসেনারা আবার গুলি চালিয়েছে এবং মিলিটারী চলাচল কেন্দ্রীয় নির্দেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তারা আরও বলেন আপনাদের বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকদের ইচ্ছাকৃতভাবে কুমিল্লা থেকে দুরে পাঠিয়ে দিচ্ছে এবং আপনাদের যেতে দেবনা। এই ভাবে কয়েকঘন্টা কথাবার্তা হয়। ইতোমধ্যে মেজর শাফায়াত জামিল (বর্তমানে লে: কর্ণেল), যিনি চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের আর একটা কোম্পানীসহ ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে অবস্থান করছিলেন, তিনিও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তিনিও তাদের বুঝাতে চেষ্টা করলেন যাতে ব্যারিকেড এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু তাতেও তারা আমাদের অনুরোধ রাখতে রাজী হয়না। তারপর তাদের নিয়ে মেজর শাফায়াত জামিলের ক্যাম্পে যাই। সেখানে আবার কথাবার্তা চলে এবং তাদের আমি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিই যে, বেঙ্গল রেজিমেন্ট বাংলাদেশেরই রেজিমেন্ট, যখন দরকার পড়বে বাঙালি জাতির জন্য পিছিয়ে থাকবে না। এমতাবস্থায় আমাদের বাধা দেয়া ঠিক হবেনা। অবশেষে সকাল সাড়ে পাঁচটায় সব নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা আমাদেরকে আর বাধা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আমরা শমসেরণগরের পথে আবার ২৫শে মার্চের সকালে রওনা দিলাম। যাওয়ার আগে মেজর শাফায়াত জামিলকে আলাদা ডেকে সতর্ক করে দিলাম এবং আমার সঙ্গে অয়ারলেস মারফত যোগাযোগ রাখার নির্দেশ দেয় গেলাম। আমি সকাল দশটা-এগারোটার সময় শ্রীমঙ্গলে পৌঁছি। সেখান থেকে শমসেরণগর যেতে হলে মৌলভীবাজার হয়ে যেতে হবে। শ্রীমঙ্গলে কনভয় দাড় করিয়ে স্থানীয় কিছু ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করি শমসেরণগরে যাওয়ার রাস্তা সম্বন্ধে এবং জানতে পারি মৌলভীবাজার হয়ে যাওয়া যায় অথবা আর একটা রাস্তা আছে সোজা শ্রীমঙ্গল হয়ে জঙ্গল এবং পাহাড়ের মধ্য দিয়ে। এই রাস্তা অপেক্ষাকৃত কম দুরত্বের আমি এই সোজা জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে শমসের নগরের পথে রওনা হলাম। যে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার কথা ছিল সে রাস্তা পরিত্যাগ করে পাহাড়ের পথ দিয়ে রওনা হলাম। এই রাস্তা খুব খারাপ ছিল তাই অতি কষ্টে দুপুর ২টায় শমসের নগর গিয়ে পৌঁছি। সেখানে যেয়ে ডাকবাংলোতে আমি আমার ছাউনি স্থাপন করি।

 

দুপুরে খেয়ে আমি এবং লে. মাহবুব শমসেরণগরের চারদিকে ঘুরে দেখে আসি পরিস্থিতি স্বাভাবিক। আর কিছু পেট্রোল পার্টি চতুর্দিকে পাঠিয়ে দিই। স্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে জানতে পারি কোন অঘটন সেখানে ঘটেনি। ইপিআর-এর যে দুটো কোম্পানীর কথা আমাকে বলা হয়েছিল তাদের কোন পাত্তা নেই। ইপিআর-এর একজন সুবেদার এবং আরো কয়েকজন সিপাই শমসেরণগর এয়ারপোর্টে অবস্থান করছিল। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সঠিক কোন উত্তর পাইনি। শমসেরণগরের টিগার্ডেনগুলো ঘুরে জানতে পারলাম। সমস্ত পশ্চিম পাকিস্থানী ম্যানেজার এবং অফিসাররা ঢাকায় চলে এসেছে। নকশালপন্থী বা অনুপ্রবেশকারীদের কোন চিহ্ন আমি খুজে পেলাম না। ২৫শে মার্চের রাতটা এভাবে খবরাখবর নিয়ে এবং পেট্রোলিং করে কেটে গেল। সমস্ত ব্যাপারটা আমার কাছে ঘোড়ালো মনে হলো। আমার মনে জাগল আমাকে এখানে কৌশল করে পাঠানো হয়েছে এবং যা কিছু তারা বলেছিল, তা সবই মিথ্যা। আমি সমস্ত সকাল অয়ারলেসের মাধ্যমে হেড কোয়ার্টারে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি কিন্তু কোন যোগাযোগ হলনা। এইভাবে দুপুর পর্যন্ত চলে যায়। আমি এবং লে. মাহবুব ডাকবাংলোর বারান্দায় বসেছিলাম। হঠাৎ আমাদের এসে খবর দেয় এক পাঞ্জাবী অফিসার এবং বেশ কয়েকজন সৈন্য শমসেরণগর বাজারে এসেছে এবং ষোকনে কারফিউ জারি করে স্থানীয় জনসাধারণের উপর অত্যাচার করছে। সেই দলটি আমাদের ক্যাম্পের সম্মুখে দিয়ে মৌলভীবাজার যাচ্ছিল। আমাদের সেন্ট্রিকে সেই দলটির অফিসারকে ডাকার জন্য পাঠাই। এরা যখন সামনে দিয়ে যাচ্ছিল তখন সেন্ট্রি তাদের আমাদের ক্যাম্পে আসার জন্য অনুরোধ জানায়। অফিসারটি ক্যাম্পের ভিতর আসে এবং আমার সেখানে উপস্থিতি সম্বন্ধে আশ্চর্যবোধ করে। এমন ভাব দেখায় যে, আমার এখানে আছি এটা সে জানত না। কথাবার্তায় আমি জানতে পারি যে, ৩১ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের বেশ কিছু সৈন্য সিলেট থেকে মৌলভীবাজার এসে দুই দিন আগে ক্যাম্প করেছে। অফিসারের হাবভাব এবং কথাবার্তা আমাকে সন্দিহান করে তোলে। যতক্ষণ সে ডাকবাংলোয় বসেছিল ততক্ষণ সে স্টেনগানটি কোথাও না রেখে নিজের হাতে রাখে। এতে সন্দেহ আরও ঘনীভুত হয়। এদের আগমন সম্বন্ধেও আমাকে অবহিত করা হয় নি। এটাও অত্যন্ত অস্বাভাবিক। কিছুক্ষণ পরে অফিসারটি তার দলবল নিয়ে চলে যায় এবং যাওয়ার আগে আমাদেরকে পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। আমি যাওয়ার আশ্বাস দিয়ে অফিসারটিকে বিদায় করলাম।

 

সেই দিনই বিকেলে স্থানীয় জনসাধারণের মুখে আমি জানতে পাই ঢাকাতে কিছু একটা ভয়ংকর অঘটন ঘটেছে। কিন্তু কেউ সঠিক কিছু বলতে পারেনা। আস্তে আস্তে লোকমুখে শুনতে পাই যে, ঢাকায় পাক সেনাবাহিনী হাজার হাজার লোককে গুলি করে মেরে ফেলেছে এবং মারছে। বাংলাদেশের অন্যান্য জায়গাতেও পাক বাহিনী সেই রূপ নৃশংস অত্যাচার এবং হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। হাজার হাজার লোক ঢাকা ছেড়ে জান বাঁচানোর জন্য বাইরে চলে যাচ্ছে। পাক সেনাবাহিনী ট্যাংক, কামান এবং অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নির্দোষ, নিরীহ, নিরস্ত্র জনসাধারণের উপর বর্বরোচিতভাবে অত্যাচার করেছে। ঢাকা শহর একটা ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। আমি অনেকক্ষণ বসে থেকে চিন্তা করতে থাকলাম আমার এখন কর্তব্য কী। অয়ারলেস সেট খোলার হুকুম দিয়ে হেড কোয়ার্টারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করতে লাগলাম। অনেক চেষ্টার পরও কোন যোগাযোগ হলনা্ তবুও আবার চেষ্টা চালিয়ে যেতে বললাম। অনেকক্ষণ পর আমাকে লেঃ মাহবুব এসে খবর দিল যে হেড কোয়ার্টারের সঙ্গে অতি কষ্টে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে। আমি তাড়াতাড়ি দৌড়ে গেলাম অয়ারলেসে কথা বলার জন্য। যখন আমি কথা বলতে চাই, তখনই অপরদিক থেকে কর্ণেল খিজির হায়াত কিংবা ক্যাপ্টেন আমজাদ পাঞ্জাবী জবাব দেয়। তাদের কাছে কোন কথাই খুলে বলা সম্ভব হচ্ছিলো না। শুধু এটুকু বুঝতে পারলাম কর্ণেল খিজির হায়াত এবং চতুর্থ বেঙ্গলের বাকী অংশ কুমিল্লা থেকে ২৫ তারিখে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এসেছে। কর্ণেল খিজির হায়াত আমাকে জানালেন সব কিছু স্বাভাবিক এবং তিনি আরো জানালেন যে, অতি সত্ত্বর তিনি একবার শমসেরণগর পরিদর্শনে আসবেন। আমি তাকে জানালাম এখানে সব শান্ত এবং আমার এখানে থাকার প্রয়োজন নাই এবং আমাকে ফিরে আসার অনুমতি দেওয়া হোক। তিনি জবাবে আমাকে শমসেরণগরেই থাকতে আদেশ দিলেন। কিছুক্ষণ পর আমি আবার অয়ারলেসে কথা বলার চেষ্টা করি। এবার ক্যাপ্টেন গাফফারের (এখন মেজর) সঙ্গে কথাবর্তায় বুঝতে পারলাম যে ক্যাপ্টেন গাফফারের নিকটে কোন পাঞ্জাবী অফিসার আছে। সেজন্য সব কথা খুলে বলতে পারছিলনা। আমি শুধু বললাম যখন সুযোগ পাবে তখন মেজর শাফায়াত জামিলকে আমার সঙ্গে কথা বলতে বলবে। আরো কিছুক্ষণ পরে মেজর শাফায়াত জামিল আমার সঙ্গে অয়ারলেসে কথা বলেন এবং জানালেন ঢাকাতে পাক সেনাবাহিনী গণহত্যা চালিয়েছে এবং এখানো ধ্বংসলীলা চালিয়ে যাচ্ছে। এই কথা চলছিল ২৬শে মার্চের সন্ধ্যা বেলায়। শাফায়াত জামিল লোকমুখে শুনেছেন যে সব লোক ঢাকা থেকে পালিয়ে কুমিল্লার দিকে এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে আসছে। মেজর শাফায়াত জামিল এবং ক্যাপ্টেন গাফফার আরো জানান যে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও সান্ধ্য আইন জারি করা হইয়াছে এবং চতুর্থ বেঙ্গলকে এটা কার্যকরী করতে বলা হয়েছে। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জনসাধারণ সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে মিছিল বের করেছে। এমতাবস্থায় তাদের করণীয় কি তা আমার কাছে জানতে চাইলেন।

 

আমার পক্ষে এ প্রশ্নের জবাব দেয়া কঠিন ছিল। আমি প্রায় ১০০ মাইল দুরে অবস্থান করছি। সমস্ত বাংলাদেশে আর কোথায় কি হচ্ছে সে সম্বন্ধে কোন জ্ঞান ছিল না। ঢাকা শহরে পাক বাহিনী ব্যাপক গণহত্যা চালিয়েছে এবং আরো অনেক জায়গাতেও করেছে। রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে এই মুহুর্তে কোন প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নেই যে তাদের কাছে কোন উপদেশ নেব। একদিকে সামরিক শৃঙ্খলা এবং কর্তব্যবোধ অন্যদিকে বিবেকের দংশন আমাকে পীড়িত করছিল। এই উভয় সংকটে পড়ে আমি আমার চিন্তাশক্তি হারিয়ে ফেলি। মেজর শাফায়াত জামিলকে বললাম, আমাকে কিছুটা সময় দাও, আমি কিছুক্ষণ পরে বলব এবং সঙ্গে সঙ্গে বললাম কোন মতেই যেন গুলি চালানো না হয়। লোকজনকে বুঝিয়ে শান্ত করার চেষ্টা কর। চিন্তায় আমি আমার কামরার চতুর্দিকে পায়চারি করতে শুরু করলাম এবং এমন অবস্থায় চিন্তায় মাথা ঘুরপাক খেতে লাগল। আমি বসে পরলাম এবং লে. মাহবুবও (বর্তমানে ক্যাপ্টেন) সেখানে বসা ছিল। আমার সঙ্গে যেসব বাঙালি সৈনিকরা ছিল তারাও উদ্বিগ্ন হয়ে আমার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিল। অবশেষে আমার বিবেক আমাকে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করল। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। যদিও কোন রাজনৈতিক নির্দেশ সেই মুহুর্তে ছিলনা তবুও বঙ্গবন্ধুর সেই ৭ই মার্চের ঘোষণার কথা মনে পড়ে গেল। তিনি বলেছিলেন “এবার ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” আমি লে. মাহবুবকে ডেকে বললাম যে এই মুহুর্তে আমি স্বাধীন বাংলাদেশের আনুগত্য স্বীকার করলাম। এখনই সব সৈনিকদের বলে দাও আজ থেকে আমরা আর কেউ পাকিস্তানের প্রতি অনুগত নই। স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে দাও। এখন থেকে আমরা পাকসেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরম্ভ করবো। সব সৈনিকদের তৈরী হতে বল। এখান থেকে আমরা ঢাকার দিকে রওনা দেব এবং চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টকে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে একত্রিত করতে হবে। লে. মাহবুব যেন এই নির্দেশের অপেক্ষায় ছিল।

 

সে দৌড়ে গিয়ে সবাইকে আমার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পরেই আমি শুনতে পেলাম বঙ্গশার্দুলদের শ্লোগান “জয় বাংলা।” আমি তাদেরকে প্রথমে শান্ত করলাম এবং বুঝিয়ে দিলাম আমাদের এখন থেকে যে সংগ্রাম শুরু হল সেটা কঠিন এবং বিপদসংকুল। সকলেই নিজেকে স্বার্থের উর্দ্ধে রেখে দেশ ও জাতির এবং বাংলাদেশ সরকারের জন্য আত্মীয়-স্বজন, আর্থিক কষ্ট এবং সব কিছু সুবিধা ত্যাগ করে আত্মবিসর্জন দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আমি দেখতে পেলাম বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকরা সবাই দৃঢ় সংকল্পে তেকে আত্মত্যাগের মনোভাব নিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছে। প্রথমে অয়ারলেসে মেজর শাফায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করি এবং তাকে নির্দেশ দিই যেন সেও তৈরী থাকে। তাকে আরো বললাম, কুমিল্লার রাস্তার দিকে খেয়াল রাখতে। তাকে বললাম যে, আমি অতি শিগগিরই ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে পৌঁছব। ইতোমধ্যে আমার সমস্ত লোক ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে রওনা হবর জন্য তৈরী হয়ে যায়। আমি লে. মাহবুবের সঙ্গে কিছুসংখ্যক সৈন্য দিয়ে শ্রীমঙ্গলে পাঠিয়ে দেই এবং সেখানে ডিফেন্স নিতে নির্দেশ দিই যাতে আমাদের যাওয়ার পথে মৌলভীবাজার থেকে পাঞ্জাব রেজিমেন্ট এসে বাধা দিতে না পারে। শমসেরণগর থেকে জঙ্গলের পথে রাত বারোটায় আমি আমার কনভয় নিয়ে রওনা হয়ে যাই। রাস্তায় আমাদের অগ্রসর অনেক ধীর ছিল। কারণ সমস্ত রাস্তায় ব্যারিকেড এবং কোন কোন জায়গায় রাস্তা কেটেও দেয়া হয়েছিল। জঙ্গলের অনেক জায়গায় বিরাট গাছ কেটে রাস্তার উপর ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এই সব প্রতিবন্ধক আমাদেরকে কেটে কেটে বা মাটি ফেলে পরিষ্কার করে অগ্রসর হতে হবে। সব প্রতিবন্ধকের কাছেই অনেক লোক লুকিয়ে দেখছিল আমরা কি করি। যখনই বুঝতে পারত আমরা বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ঢাকার দিকে বা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে অগ্রসর হচ্ছি তখনই তারা স্বত:স্ফুর্তভাবে এসে ব্যারিকেড সরিয়ে ফেলত এবং রাস্তাঘাট পরিষ্কার করতে সাহায্য করত। তাদের সহায়তায় এবং সক্রিয়তায় আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল কম সময়ের মধ্যে এগিয়ে যাবার। এভাবে অতি মন্থর গতিতে এগোতে এগোতে আমি ভোর পাঁচটায় সাতছড়িতে পৌঁছলাম। এখানে আমার সৈনিকরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়। এখানে এসে আমি আবার অয়ারলেসের মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে যোগাযোগ করি। ঐ অবস্থাতে কর্ণেল খিজির হায়াতের সঙ্গে আলাপ হয়। তিনি আমাকে আশ্বাস দেন যে সেখানে সবকিছু ঠিকঠাক। মেজর শাফায়াত জামিলও আমার সঙ্গে কথা বলে। সে তার উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং জানতে চায় আমি কোথায় এবং আসতে কেন দেরী হচ্ছে। আমি বললাম ভয়ের কোন কারণ নেই কেননা আমি অনেক কাছে এসে গেছি। তাকে আশ্বাস দিয়ে আবার রওনা হই। সকাল ৬টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে দশ মাইল দুরে মাধবপুরে পৌঁছি এবং মেজর শাফায়াত জামিলের সঙ্গে অয়ারলেসে কথা বলি। তিনি আমাকে জানান, সকাল দশটার সময় কর্ণেল খিজির হায়াত একটা কনফারেন্স ডেকেছেন (আমি পরে জানতে পারি যে কুমিল্লা থেকে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একটা কোম্পানী সেই সময়ে আসছিল)। কনফারেন্সের কথা যখন আমি শাফায়াতের কাছে শুনতে পেলাম তখন আমি যথেষ্ট উদ্বিগ্ন হয়ে যাই এবং তাদের পরিকল্পনা সম্বন্ধে সন্দিহান হয়ে উঠি। আমি শাফায়াতকে তখনই নির্দেশ দিই আমার জন্য অপেক্ষা করনা। প্রয়োজন হলে কর্ণেল খিজির হায়াতসহ সমস্ত পাঞ্জাবী অফিসারকে গ্রেফতার করে ফেল এবং যত পাঞ্জাবী সৈনিক আছে নিরস্ত্র কর। আমি আবার রওনা হয়ে গেলাম। পরে শুনতে পেলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে কি হয়েছে। দশটা বাজার দশ মিনিট আগে কর্ণেল খিজির হায়াত, মেজর নেওয়াজ, ক্যাপ্টেন আমজাদ কনফারেন্সে বসেছিল। এমতাবস্থায় মেজর শাফায়াত জামিল, লে. কবির (বর্তমানে ক্যাপ্টেন), লে. হারুন (বর্তমানে ক্যাপ্টেন) হঠাৎ সেই কামরায় প্রবেশ করেন এবং পাঞ্জাবী অফিসারদের তাদের অস্ত্র সমর্পণ করার নির্দেশ দেন। মেজর নেওয়াজ নিজে একজন কমান্ডো ছিলেন, তিনি কিছুটা বাধা দেয়ার চেষ্টা করেন কিন্তু লে. হারুনের ত্বরিত প্রচেষ্টায় তার সে চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং সব পাঞ্জাবী অফিসারকে তারা বাংলাদেশের নামে গ্রেফতার করে। ইতোমধ্যে বাকী বঙ্গশার্দুলরা বাইরে যেসব পাঞ্জাবী সৈনিক ছিল তাদের নিরস্ত্র করে এবং বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দেওয়া হয়। দিনটি ছিল ২৭শে মার্চ। ইতোমধ্যে আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতি সন্নিকটে এসে গেছি। আমার বাহিনী এবং শাফায়াতের বাহিনী বেলা ১১টার দিকে সম্মিলিত হয়। আমি বুঝলাম আমার প্রথম কর্তব্য হল যে সমস্ত এলাকা মুক্ত হয়েছে তা শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করা। আমি প্রথমেই অফিসারদের নিয়ে একা বৈঠক করি এবং এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কিভাবে কার্যকরী করতে হবে তার সম্বন্ধে আমার পরিকল্পনা জানাই। আমার এই পরিকল্পনায় সিদ্ধান্ত ছিল যে, আমরা মেঘনা নদীকে উত্তরে রেখে পশ্চিম প্রতিরক্ষা লাইন তৈরী করব এবং দক্ষিণে ময়নামতি সেনানিবাস পর্যন্ত মুক্ত করে প্রতিরক্ষা বন্দোবস্ত করব। উত্তর-পূর্বে মৌলভীবাজার থেকে সিলেট পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকা মুক্ত করে সিলেটে আরেকটি ঘাটি স্থাপন করবো।

 

এই পড়িপ্রেক্ষিতে ভৈরববাজারে প্রথম দুটো কোম্পানী পাঠিয়ে দিই। আর একটা পার্টিকে কুমিল্লার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে অগ্রসর হতে বলি। মেঘনার পূর্ব পাড়ে একটা প্রতিরক্ষাব্যুহ তৈরীর ব্যবস্তা করি। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চতুর্দিকে তিতাস নদীর চতুর্দিকে একটা আভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষাব্যুহ নির্মাণ করি। ক্যাপ্টেন মাহবুবের নেতৃত্বে একটা কোম্পানী দিয়ে সিলেটের দিকে অগ্রসর হবার জন্য পাঠিয়ে দেই। শ্রীমঙ্গলে তাদের সাথে স্থানীয় সংগ্রামী আনসার, মুজাহিদ এবং আরো কিছু সৈন্য কর্নেল রবের নেতৃত্বে (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল) যোগ দেয়। এই দলটির সাথে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের যেসব সৈন্য মৌলভীবাজারে ছিল তাদের সাথে লড়াই হয় এবং পাঞ্জাবীরা অনেক হতাহত এবং ক্ষয়ক্ষতির পরে মৌলভীবাজার থেকে পালিয়ে যায়। সিলেট শহর পর্যন্ত তাদেরকে ধাওয়া করা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে আমি বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তখন মহকুমা প্রশাসক ছিলেন জনাব রকিব। তিনি অত্যন্ত উৎসাহী, সাহসী এবং সংগ্রামী ছিলেন। তিনি সবসময় আমাদের সাথে ছিলেন। তিনি যুদ্ধ প্রচেষ্টায় বেসামরিক সাহায্যের যতটুকু প্রয়োজন ছিল যেমন রসদ সরবরাহ, যানবাহন যোগাড়, সৈনিকদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা, চিকিৎসা, আর্থিক সাহায্য তিনি অত্যন্ত উৎসাহ এবং উদ্দীপনা নিয়ে করেছেন। তিনি পুলিশ অয়ারলেসের মাধ্যমে বাংলাদেশের সমস্ত জেলা এবং মহকুমা প্রশাসকদের কাছে খবর পাঠান যে, মেজর খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে চতৃর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্ট স্বাধীনতা যুদ্ধ করছে এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে সিলেট পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা শত্রুমুক্ত করেছে। ঐ সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে আমার সাথে জনাব তাহের উদ্দিন ঠাকুর, সাচ্চু মিয়া প্রমুখ রাজনৈতিক নেতাদের সাথে আলোচনা হয় এবং তাদেরকে আমি আমার বাংলাদেশ সরকারের সাথে আমার আনুগত্যের কথা বলি। তারা আমাকে সবরকম সাহায্য-সহযোগিতা করেন। তারা আমাকে জিজ্ঞাসা করেন কিভাবে এই যুদ্ধ পরিচালনায় সহায়তা করা যায়। আমি তাদের অনুরোধ জানাই, যে কোন উপায়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে যদি কোন অস্ত্রশস্ত্র আনার ব্যবস্থা করতে পারেন তাহলে আমি আমার এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরো সুন্দর ও শক্তিশালী করতে পারি। আমি তখন জানতাম যে, আমার কাছে যা গোলাবারুদ আছে তা নিয়ে বেশী দিন পাক্ষিান সেনাবাহিনীকে ঠেকিয়ে রাখা যাবেনা। তারা এই বার্তা নিয়ে আগরতলাতে চলে যান।

 

এই সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে অগ্রসরমান পাঞ্জাবী সৈন্যদের সাথে আমার অগ্রবর্তী সৈন্যদের কোম্পানীগঞ্জে লড়াই হয়। এতে পাকিস্তানীরা অনেক হতাহত হয়ে আবার কুমিল্লা সেনানিবাসের দিকে পশ্চাদপসরণ করে। ২৯শে মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে শত্রুসেনা প্রথম বিমান হামলা চালায়। এতে আমার একজন সৈনিক শহীদ হন। সেদিনই সন্ধ্যায় পাকিস্তানীদের রেকি পার্টি (তথ্য অনুসন্ধানী দল) একজন অফিসার ও ৮ জন সিপাহীসহ ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে আসে। এই দলটি আমাদের অগ্রবর্তী ঘাটির অ্যামবুশে পড়ে যায় এবং অফিসারসহ সব শত্রুসেনা এবং একখানা গাড়ী ধ্বংস করে দিই। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উপর বিমান হামলা আরো চলতে থাকে এবং আমাদের প্রতিরক্ষা আরো অধিকতর শক্তিশালী হতে থাকে। আমি এই অবস্থাতে ভৈরব বাজার এবং নরসিংদীর ভেতরের রেলওয়ে লাইন অনেক জায়গায় বিচ্ছিন্ন করে দিই এবং আর একটা দলকে নরসিংদী পর্যন্ত অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিই। আমার এই দলটির সঙ্গে ঢাকা থেকে আগত আর একটি সাবেক ইপিআর এবং দ্বিতীয় বেঙ্গলের কিছু সৈন্যের যোগাযোগ স্থাপন হয়। এই সম্মিলিত দলটি ঢাকা থেকে পাকসেনাদের অগ্রসরমান এক বিরাট বাহিনীকে অ্যামবুশ করে এবং ঢাকার দিকে পশ্চাদপসরণে বাধ্য করে।

 

আমাদের তখনো বাইরে আর কোন প্রতিষ্ঠান বা বাঙালি সেনাবাহিনীর আর কোন দলের সাথে যোগাযোগ হয়নি। অন্যান্য জায়গা সম্বন্ধে আমি সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলাম।

 

আমি জানতে পাই যে, মেজর সফিউল্লাহ (বর্তমানে ব্রিগেডিয়ার) ময়মনসিংহ থেকে কিশোরগঞ্জে এসে তার দ্বিতীয় বেঙ্গলকে একত্রিত করেছে। আমি আরো জানতে পারলাম যে, সে তার মুষ্ঠিমেয় সৈন্য নিয়ে ঢাকা অভিমুখে যাবার পরিকল্পনা করেছে। এই সংবাদে আমি অতিশয় উদ্বিগ্ন এবং চিন্তিত হয়ে পড়ি। কারণ আমি জানতাম ঢাকাতে পাকিস্তানীদের অন্তত: দুই ব্রিগেড সৈন্য আছে। তাছাড়া সাঁজোয়া বাহিনীর ট্যাংক, গোলান্দাজ বাহিনীর বাহিনীর কামান এবং বিমান বাহিনী আছে। এসব অত্যন্ত শক্তিশালী এবং আধুনিক মরণাস্ত্রে সজ্জিত। বিরাট পাক সেনার বিরুদ্ধে অল্প সংখ্যক সৈন্য ও অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করার মানেই ছিল আমাদের শক্তিকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা। আমার সঙ্গে মেজর সফিউল্লাহর যোগাযোগের কোন ব্যবস্থা ছিলনা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে কিশোরগঞ্জ পর্যন্ত কোন সরাসরি রাস্তা না থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা অসম্বব হয়ে পড়ে। অথচ তার সঙ্গে যোগাযোগ করা খুবই প্রয়োজন। তা না হলে এ সর্বনাশকে কিছুতেই রোধ করা যাবেনা। অনেক চেষ্টার পর আমি একটা খালি রেলওয়ে ইঞ্জিনের ব্যবস্থা করলাম। ক্যাপ্টেন মাহবুবকে সেই ইঞ্জিনে বসিয়ে সোজা কিশোরগঞ্জ পাঠিয়ে দিলাম। তাকে বিস্তারিত বুঝিয়ে দিলাম। কোন কিছু করার আগে তিনি যেন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং সম্ভব হলে আমার সঙ্গে দেখা করার অনুরোধ জানাই।

 

এরপর ক্যাপ্টেন মাহবুব ফিরে এসে জানায় মেজর সফিউল্লাহ এবং সমস্ত সেনাদল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে আসছে। মেজর সফিউল্লাহ তার বাহিনীকে নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌছেনে এবং তিনি আমার হেড কোয়ার্টার তেলিয়াপাড়াতে আসেন। আমাদের দুটো দলের যোগাযোগ হওয়াতে আমাদের শক্তি ও মনোবল বেড়ে যায়। এরপর আমরা বসে আমাদের ভবিষ্যত কর্মপন্থা সম্বন্ধে আলোচনা করি। আমরা জানতে পারি যে, পাকিস্তানীরা আমাদের আক্রমণ করার যথেষ্ট প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং আমরা পাকিস্তানীদের আক্রমণের কৌশল সম্বন্ধে বিশ্লেষণ করি এবং সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, পাকিস্তানী বাহিনী আমাদের উপর বিমান, হেলিকপ্টার এবং নদীপথে ঢাকার দিকে থেকে আক্রমণ করতে পারে। নদী পথে আক্রমণ করার জন্য তারা মেঘনার পথে গানবোটে আসতে পারে এবং মেঘনার দক্ষিণ পাড়ে ল্যান্ডিং করতে পারে এবং সাথে সাথে হেলিকপ্টারযোগেও কমান্ডো এবং শত্রুবাহিনী নামাতে পারে।

 

যে বিস্তীর্ণ মুক্ত এলাকা আমাদের আয়ত্তাধীন ছিল, সেই সব এলাকাতে সৈন্য রাখার মতো আমার কাছে সৈন্য ছিলনা। সেজন্য আমি আমার ট্রুপসকে যেখানে পাকবাহিনীর অবতরণের এবং আক্রমণের বেশী সম্ভাবনা, সেই জায়গাগুলোতে ডিফেন্স নেয়ার বন্দোবস্ত করি। এই সময়ে আমি জানতে পাই চতৃর্থ বেঙ্গলের জনা পঞ্চাশেক সৈন্য যারা কুমিল্লার দক্ষিণে জাঙ্গালিয়া ইলেকট্রিক গ্রীড স্টেশনে প্রহরায় ছিল সেই সব সৈন্যরাও ২৫শে মার্চের পর নিকটবর্তী একটা গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে এবং আমার নির্দেশের অপেক্ষায় আছে। আমি এই অবস্থাতে তাদের কাছে লোক পাঠিয়ে দেই এবং তাদেরকে আরও দক্ষিণে যেয়ে লাকসাম এবং কুমিল্লার মধ্যখানে লালমাই হিলের মধ্যপ্রান্তে টেম্পল পাহাড় নামক এক জায়গায় প্রতিরক্ষাব্যুহ গড়ার নির্দেশ দেই। তাদের উপর এই নির্দেশ দিলাম যে, কুমিল্লা থেকে পাক বাহিনী লাকসাম, নোয়াখালী কিংবা চাঁদপুরের দিকে অগ্রসর হলে তাদের যেন অ্যামবুশ করা এবং বাধা দেওয়া হয়। এর মধ্যে আমি খবর পাই আখাউড়া, কসবা, বুড়িচংখেলাতে পাকিস্তানী সেনা ইপিআর পোষ্টগুলোতে বাঙালি ইপিআরদের বিরুদ্ধে এখানো লড়াই করে যাচ্ছে। এই সংবাদ পেয়ে আমি ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিনকে (বর্তমানে মেজর) পাঠাই কিছু লোকজন নিয়ে যাতে বাঙালি ইপিআরদের নিয়ে সম্মিলিতভাবে এইসব পোষ্টগুলো পাঞ্জাবীদের কবল থেকে মুক্ত করা যায়। বেঙ্গল রেজিমেন্ট ইপিআর এবং স্থানীয জনসাধারণের সম্মিলিত হামলায় অনেক ক্ষয়ক্ষতি এবং হতাহতের পর পাঞ্জাবীরা এই সব অবস্থান থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এইসব খন্ডুদ্ধের পর ব্রাহ্মবাড়িয়া থেকে কুমিল্লার গোমতী পর্যন্ত আমি সমস্ত এলাকা মুক্ত করতে সমর্থ হই এবং কুমিল্লা শহরের বিবিরবাজার নামক একটা জায়গায় একটা প্রতিরক্ষাব্যুহ গড়ে তুলি।

 

ইতোমধ্যে তাহেরউদ্দিন ঠাকুর এবং সাচ্চু মিয়ার প্রচেষ্টায় আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রের কিছু সাড়া পাওয়া যায়। সীমান্তে আমার সঙ্গে আগরতলার জেলা প্রশাসক মি. সাইগলের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। বাংলাদেশের ঘটনাবলী সম্বন্ধে তখনও তাদের কোনও ধারণা ছিলনা। আমার কাছে বিস্তারিত জানতে পেরে তিনি আমাকে জানালেন যে এ সম্বন্ধে তিনি তার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন। তাকে আমি অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাই। তিনি সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলে যান। কয়েকদিন পর আবার সীমান্ত এলাকায় ভারতে সেনাবাহিনীর ৫৭তম ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল গানজালভেজ-এর সঙ্গে দেখা হয়। তাকেও আমি ঘটনাবলীর বিস্তারিত বিবরণ দিই। তখন পর্যন্ত আমরা কোন সাহায্য পাই নি।

 

এপ্রিল মাসের ২/৪ তারিখে কুমিল্লার সীমান্তে মতিনগরের নিকট কর্ণেল এম এ জি ওসমানী (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল) যখন ভারত সীমান্তে পৌছেন তখন আমার সঙ্গে তার দেখা হয়। তিনি প্রথম আমার কাছে সংক্ষেপে আমাদের বর্তমান পরিস্থিতি সম্বন্ধে ওয়াকেবহাল হন এবং তার পরই তিনি আগরতলাতে চলে যান। পরের দিন সন্ধ্যায় আমার হেড কোয়ার্টার তেলিয়াপাড়াতে কর্ণেল ওসমানী আমাকে মেজর শফিউল্লাহ লে. কর্ণেল রবকে (বর্তমানে মেজর জেনারেল) নিয়ে একটা বৈঠক করেন। এই বৈঠকে আমরা যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি সম্বন্ধে সম্পূর্ণভাবে তাকে জ্ঞাত করি। আমি তাকে আরও জানাই, আমাদের যে শক্তি আছে তা দিয়ে বেশিদিন পাকবাহিনীকে ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। অতিসত্বর বন্ধুরাষ্ট্র থেকে বা অন্য কোন জায়গা থেকে অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া তাকে আরো অনুরোধ করা হয় আরো নেতৃস্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অতি শিগির আমাদের বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হউক যাতে আমরা বহির্জগতের স্বীকৃতি পাই এবং যুদ্ধের সময় রাজনৈতিক নেতৃত্ব পাই। তিনি আমাদের বক্তব্য বুঝতে পারলেন এবং আগরতলা থেকে কলকাতা চলে গেলেন। কিছুদিন পর ১৭ই এপ্রিল বঙ্গবন্দুর নেতৃত্বকে স্বীকার করে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দিন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী করে বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়।

 

এই সময় বন্ধুরাষ্ট্র থেকে বিএসএফ-এর ব্রিগেডিয়ার পান্ আমাদের হেডকোয়ার্টার আসেন এবং আমাদের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেন আমাদের সহায়তা করার কিন্তু সে সাহায্য ছিল নগণ্য। আমরা চাচ্ছিলাম হালকা এবং ভারী স্বয়ংক্রিয় হাতিয়ার মর্টার। কিন্তু সে সময় আমাদেরকে খুবই সামান্য ৩০৩ রাইফেল এবং সামান্য গুলি দেয়া হয়। তা ছিল আমাদের দরকারের চেয়ে অনেক নগণ্য। এই সময়ে ব্রিগেডিয়ার পান্ডে আমাদেরকে জিয়াউর রহমান সম্পর্কে বিস্তারিত জানান এবং একদিন মেজর জিয়াউর রহমান (বর্তমানে ব্রিগেডিয়ার) সঙ্গে নিয়ে আসেন। তিনি বলেন, পাক বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণে ৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং যুদ্ধ করার জন্য তার কাছে অতি নগণ্যসংখ্যক সৈন্য আছে এবং তিনি আমাকে ও মেজর সফিউল্লাহকে মেজর জিয়াউর রহমানকে কিছু সৈন্য দেওয়ার অনুরোধ করেন। আমি এবং মেজর শফিউল্লাহ নিজ নিজ বাহিনী থেকে দু’টো শক্তিশালী কোম্পানী গঠন করে মেজর জিয়াউর রহমানের নিকট প্রেরণ করি।

 

এই সময় পাকবাহিনী আশুগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং পাশ্ববর্তী এলাকাসমূহে আমাদের সম্মিলিত বাহিনীর উপর প্রবল বিমান আক্রমণ চালাতে থাকে। এই আক্রমণ এতই ভয়াবহ রূপ ধারণ করে যে, মাঝে মধ্যে ৭ থেকে ৯ ঘন্টা অনবরত স্ট্রাপিং, রকেটিং এবং বোম্বিং করতে থাকে। এপ্রিল মাসের শেষে পাকবাহিনী বিমান বাহিনীর সহায়তায় হেলিকপ্টার এবং গানবোটের সাহায্যে আমাদের আশুগঞ্জ পজিশনে সৈন্য অবতরণ করায়। আমাদের সৈন্যরা শত্রুদের বিমান বাহিনী এবং ছত্রীদের সম্মিলিত সাড়াশি আক্রমণের মুখে অসহায় হয়ে আশুগঞ্জ থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে পিছু হটে আসে। ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও শত্রুবাহিনীর সাথে আমাদের সম্মিলিত বাহিনীর প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয় িএবং এপ্রিল মাসের শেষ পর্যন্ত শত্রুদের সাজোয়া বাহিনী বিমান বাহিনী এবং গোলন্দাজ বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণে আর টিকতে না পেরে আমরা দুই রাস্তায় পিছু হটে গেলাম। আমার সৈন্যরা ক্যাপ্টেন আইন উদ্দিনের নেতৃত্বে আখাউড়াতে এসে তিতাস নদীর উপর পুনরায় প্রতিরক্ষাবুহ্য রচনা করে। মেজর সফিউল্লাহ তাঁর বাহিনী নিয়ে মাধবপুরের দিকে চলে যায়। পাক বাহিনী ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে এক ব্যাটালিয়ন শক্তি নিয়ে আসে এবং আখাউড়া আক্রমণ করে কিন্তু অনেক ক্ষয়ক্ষতি এবং হতাহত স্বীকার করে তারা পশ্চাদপরণে বাধ্য হয়।

 

আমি এই সময়ে কুমিল্লার দক্ষিণে যে দলটি ছিল অর্থাৎ ৪ বেঙ্গলের বি কোম্পানী তাদেরকে লে. মাহবুব এবং লে. দিদারুলের (বর্তমানে উভয়েই ক্যাপ্টেন) নেতৃত্বে আরও কিছু সৈন্য পাঠিয়ে জোরদার করি।

 

কুমিল্লা থেকে এপ্রিল মাসের ১৫/১৬ তারিখে পাক বাহিনীর বিরাট এক কনভয় প্রায় ৩০টি গাড়িতে সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে লাকসামের দিকে যাচ্ছিল। লে. মাহাবুবের নেতৃত্বে ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বি কোম্পানীর সৈন্যরা শত্রুসেনারা এই দলটিকে দুপুর বারোটায় জাঙ্গালিয়ার নিকটে এমবুশ করে। এই এমবুশে শত্রুসেনাদের যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি হয়। সংঘর্ষ প্রায় পাঁচঘন্টা স্থায়ী হয়। পাকসেনারা গাড়ী থেকে নেমে এমবুশ পার্টিকে আক্রমণ করার চেষ্টা করে কিন্তু আমাদের সৈন্যদের সাহসিকতা এবং কৌশলের কাছে পর্যুদস্ত হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। এই সংঘর্ষে লে. মাহবুব এবং লে. দিদার যথেষ্ট কৌশলের এবং যুদ্ধনিপুণতার পরিচয় দিয়েছিল। লে. মাহবুব তাঁর সৈন্যদের নিয়ে রাস্তার পূর্ব পাশে এমবুশ করে ওৎ পেতে বসেছিল। যখন শত্রুদের কনভয় তার এমবুশের মাঝে পড়ে যায়, তখন সে তাদের উপর তার লোকজন দিয়ে গুলি ছুড়তে থাকে এতে কটা গাড়ী রাস্তা থেকে একসিডেন্ট করে পড়ে যায়। বাকী গাড়ীগুলো তেকে পাকসেনারা লাফালাফি করে নীচে নামার চেষ্টা করে। এতেও তাদের যথেষ্ট হতাহত হয়। যে সব পাকসেনা গাড়ী থেকে ভালভাবে নামতে পারে তারা রাস্তার উপরে (পশ্চিম দিকে) গিয়ে একত্রিত হয় এবং লে. মাহবুবের উপর আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। এদিকে লে. দিদারুল আলম রাস্তার পশ্চিম পার্শ্বে বেঙ্গল রেজিমেন্ট-এর সৈন্য নিয়ে তৈরী ছিল। সে পাকিস্থানীদের উপর অকস্মাৎ প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। এইভাবে দুই দিক থেকে আক্রান্ত হয়ে এবং নিজেদের হতাহত দেখে শত্রুসেনাদের মনোবল একেবারেই ভেঙ্গে যায়। মৃতদেহ ফেলে রেখে তারা কুমিল্লার দিকে পালিয়ে যায়। এই যুদ্ধের ফলে লে. মাহবুব এবং লে. দিদারুল আলমের সম্মিলিত দলটি ২টি মেশিনগান, ৬টি হালকা মেশিনগান এবং অজস্র রাইফেল আহত এবং নিহত শত্রুদের কাছে থেকে ছিনিয়ে নেয়। যে বিধ্বস্ত গাড়ীগুলো শত্রুরা ফেলে গিয়েছিল তা থেকে কয়েক হাজার এমুনিশন উদ্ধারা করা হয়। এর তিন দিন পরে স্থানীয় জনসাধারণ আরো ২টি হালকা মেশিনগান, কয়েকটা রাইফেল এবং বেশকিছু গোলাবারূদ যা শত্রুসেনা পালিয়ে যাবার সময় ধানক্ষেতে ফেলে দিয়ে গিয়েছিল তা আমাদের পৌছে দেয়। এই একশনের ফলে আমার এমুনেশনের প্রয়োজনীয়তা সাময়িকভাবে মিটেছিল এবং পাকবাহিনী বেশ কিছুদিন কুমিল্লার দক্ষিণে অগ্রসর হবার সাহস দেখায় নি।

 

এই সময় আখাউড়াতে পাক বাহিনী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিক থেকে আবার আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণে তাদের ২৫ জনের মত হতাহত হয় এবং পাক বাহিনী আবার ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে পশ্চাদপরণ করে। এপ্রিল মাসের শেষে পাক বাহিনী কুমিল্লা থেকে উত্তর দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাস্তায় অগ্রসর হয়ে ১২ নং ফ্রন্টিয়ার ফোর্স নিয়ে সাইদাবাদ দখল করে নেয়। পরে পশ্চিম দিক থেকে আক্রমণ চালিয়ে তারা নিয়ামতবাদ, গঙ্গাসাগর দখল করে নেয়। আমি তখন কুমিল্লার বিবিরবাজার এলাকাতে যেখানে পাকবাহিনী প্রতিদিন আক্রমণ চালাচ্ছিল সেখানে যুদ্ধ পরিচালনা করছিলাম। গঙ্গাসাগর, নিয়ামতবাদ শত্রুকবলিত শুনতে পেয়ে ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিনকে নির্দেশ দিই ৪র্থ বেঙ্গলের ডেল্টা কোম্পানী নিয়ে কসবার উত্তরে চন্ডিমুরা উচু পাহাড়ে প্রতিরক্ষাব্যুহ শক্ত করতে এবং সেই রাতেই কুমিল্লার দক্ষিণ হতে ৪র্থ বেঙ্গলের আলফা কোম্পানীকে উঠিয়ে আমার সঙ্গে নিয়ে গঙ্গাসাগরের নিকটে দুই কোম্পানীকেই একত্রিত করি। সন্ধ্যায় যখন আমি চন্ডিমুরার নিকটে পৌছি তখনই শত্রুদের অবস্থান সম্বন্ধে মোটামুটি একটা বিবরণ ইপিআরদের কাছ থেকে অবগত হই এবং সেই রাত্রেই গঙ্গাসাগর এবং নিয়ামতবাদে শত্রুদের উপর আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিই। ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিন, ক্যাপ্টেন গাফফার এবং একজন সুবেদারের নেতৃত্বে আলফা, চার্লি এবং ডেল্টা কোম্পানী নিয়ে ভোর পাঁচটায় শত্রুদের উপর আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিই। এই আক্রমণের পরিকল্পনা ছিল যে ক্যাপ্টেন গাফফার এবং ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিন পূব দিকে থেকে শত্রুদের গঙ্গাসাগর পজিশনের পেছন দিক দিয়ে ইনফিলট্রেট করে ভিতরে ঢুকে গঙ্গাসাগরের উপর আক্রমণ চালাবে এবং এই সময়ে সুবেদার তার আলফা কোম্পানী নিয়ে নিয়ামতবাদের উপর যে জায়গাতে আমরা শত্রুদের হেডকোয়ার্টার ভেবেছিলাম, সেখানে আক্রমণ চালাবে। এ দুই আক্রমণ এক সঙ্গে চারটায় শুরু হবে। আক্রমণের ঠিক দশ মিনিট আগে সুবেদার শামসুল হকের নেতৃত্বে ৪র্থ বেঙ্গলের মর্টার এই দুই  পজিশনের উপর গোলা ছুড়বে। রাত বারোটায় এই পরিকল্পনা অনুযায়ী আমি এই তিন কোম্পানী নিয়ে শত্রুদের ঘাটিতে ঢুকে যাই। সেদিন টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল। চতুর্দিকে বেশ পানি জমছিল। আমাদেরকে হাটু পানি ভেঙ্গে ত্রাসের রাস্তায় অগ্রসর হতে হচ্ছিল। একসময় আমার মনে হচ্ছিল আমরা যেন আমাদের ঠিক পথে যাচ্ছিনা এবং এই সময়ে নিকটবর্তী একটা বাড়ির একটা লোকের সঙ্গে আমার দেখা হয়। সেও একজন পুরোনো অবসরপ্রাপ্ত সামরিক ব্যক্তি ছিল। এই ব্যক্তি আমাদেরকে শত্রুদের অবস্থান সম্পর্কে দিনে দুরে থেকে যা দেখেছে সে সম্বন্ধে আরো বিস্তারিত খবর দেয়। এই ব্যক্তির সাহায্যে আমি এবং আমার প্রত্যেকটি দল ভোর পাঁচটায় আমাদের লক্ষ্যস্থলে পৌঁছে যাই। আমাদের আক্রমণ করার নির্দিষ্ট সময় ছিল রাত চারটা। যেহেতু আমরা দেরীতে পৌঁছি সেহেতু পাঁচটায় পরিকল্পনা মাফিক আক্রমণ শুরু করে দিই। শত্রুসেনারা অকস্মাৎ তাদের অবস্থান এবং পিছনে ভয়াবহ গোলাগুলির শব্দে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ যুদ্ধ করার পর তারা গঙ্গাসাগর এবং নিয়ামতবাদ ছেড়ে সাইদাবাদে পশ্চদপরণ করে। আমরা পরের দিন গঙ্গাসাগরে আবার প্রতিরক্ষাব্যুহ গড়ে তুলি। শত্রুসেনারা গঙ্গাসাগরে পর্যুদস্ত হয়ে কসবার দিকে অগ্রসর হবার চেষ্টা করে। তাদের প্রথম আক্রমণ আমরা ব্যর্থ করে দিই কিন্তু পরে গোলন্দাজ বাহিনীর সহায়তায় পাকসেনারা টি. আলীর বাড়ি পর্যন্ত অগ্রসর হয় এবং ঘাঁটি গড়ে তোলে। আমরা আমাদের কসবা পুরান বাজার পজিশন শক্তিশালী করে তুলি এবং শত্রুসেনাকে কসবার দিকে অগ্রসর হতে বাধা দিই। টি. আলীর বাড়িতে শত্রুসেনাদের যে ঘাঁটি ছিল সে ঘাটিতে ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গলের ডেল্টা কোম্পানী মর্টারের সহায়তায় ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিন অকস্মাৎ আক্রমণ করে। এই আক্রমণে শত্রুদের চার-পাঁচটা গাড়ীতে আগুন লেগে যায় এবং তাদের ২০/৩০ জন হতাহত হয়। তারা টি. আলীর বাড়ী ছেড়ে আরো পেছনে হটে যায়।

 

ইতোমধ্যে কুমিল্লা বিবিরবাজার পজিশনের উপর পাক বাহিনী প্রচণ্ড আক্রমণ করতে শুরু করে এবং অনেক ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে কুমিল্লা শহরের সন্নিকটে দেড় মাইল পূর্বদিকে তারন্যপুর শত্রুরা দখল করতে সমর্থ হয়। আমি ইপিআর-এর একটি কোম্পানী এবং কিছু সংখ্যক বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্য দিয়ে বিবিরবাজার প্রতিরক্ষাব্যুহ আরও ইপিআর-এর একটি কোম্পানী এবং কিছুসংখ্যক বেঙ্গল রেজিমেন্ট-এর সৈন্য দিয়ে বিবিরবাজার অবস্থানটির উপর পাকসেনাদের লক্ষ্য এজন্য ছিল যে, প্রতি রাত্রে এখান থেকে আমার ছোট ছোট কমান্ডো পার্টি গোমতী নদী অতিক্রম করে কুমিল্লা শহরে পাকিস্থানী অবস্থানের উপর অতর্কিতে হামলা চালাতো এবং ব্যতিব্যস্ত করে তুলতো। এখান হতে আমরা অনেক সময় তাদের অবস্থানের উপর মর্টার হামলাও চালাতাম। এতে প্রায়ই পাকসেনাদের অনেক লোক হতাহত হত। অবশেষে পাক বাহিনী একদিন সন্ধ্যার সময় অতর্কিতে এই পজিশনের উপর ৩৯তম বেলুচ রেজিমেন্টের সাহায্যে গোলন্দাজ বাহিনী এবং ট্যাংকের সহায়তায় প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। প্রথমে শত্রুসেনারা পূর্বদিকে আক্রমণ চালনা করে। এই আক্রমণ আমার সৈনিকেরা নস্যাৎ করে দেয় এবং শত্রুদের অনেক লোক নিহত এবং আহত হয়। এরপর শত্রুসেনারা দক্ষিণ দিক হতে আমাদের পজিশনের উপর পিছনে বাম পার্শ্বে ট্যাংক ও ৩৯তম বেলুচ রেজিমেন্টের সাহায্যে আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণ চার-পাঁচ ঘন্টা স্থায়ী থাকে। আমাদের গুলিতে শত্রুদের অন্তত ১১০ থেকে ১৫০ জন নিহত বা আহত হয়। কিন্তু ট্যাংক এবং গোলন্দাজ বাহিনীর প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ এবং পিছন দিক হতে ঘিরে ফেলার আশংকা থাকায় আমাকে বাধ্য হয়ে এই অবস্থান ছাড়তে হয়।

 

এই যুদ্ধে ইপিআর জওয়ানরা যথেষ্ট সাহসের পরিচয় দিয়েছে। বিশেষ করে মনে পড়ে এক নায়েকের কথা, যে শত্রুদের গুলি করতে করতে এত উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল যে, তাদের নিহতের বিপুল সংখ্যা দেখে এক পর্যায়ে ‘জয় বাংলা’ হুংকার দিয়ে দাড়িয়ে পড়ে এবং সেসময় হঠাৎ দুর্ভাগ্যবশত তার মাথায় গুলি লাগে এবং সে মারা যায়। এ যুদ্ধে আমার ৬ জন সৈন্য মারা যায় এবং ৮/১০ জন আহত হয়। সব আহতদের আমরা পেছনে নিয়ে আসি কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত: তাদের চিকিৎসার বন্দোবস্ত করতে পারি নাই। এরকম একজন আহত তরুণ ছাত্রের কথা আমার মনে পড়ে, যার পেটে গুলি লেগেছিল কিন্তু তৎক্ষণাৎ অপারেশন করার কোন ব্যবস্থা না থাকায় সে মারা যায়।

 

এদিকে গঙ্গাসাগরে এবং আখাউড়ায় শত্রুসেনারা আবার তৎপর হয়ে ওঠে এবং বারবার আখাউড়া এবং গঙ্গাসাগরের উপর আক্রমণ চালায়। জুন মাসের প্রথমে পাকবাহিনীর ১২তম ফ্রন্টিয়ার ফোর্স ট্যাংক, কামান এবং বিমান বাহিনীর সহায়তায় আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশন এবং গঙ্গাসাগরের উপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণে ৪র্থ বেঙ্গলের ডেল্টা কোম্পানী কিছুটা পিছু হটে আজমপুর, আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে আধা মাইল পূর্বে আবার প্রতিরক্ষাব্যুহ গড়ে তোলে। এই প্রতিরক্ষাব্যুহ সিলেট, চট্টগ্রাম, ঢাকা রেলওয়ে লাইনকেও শত্রুদের ব্যবহার থেকে বাধা দিতে সমর্থ। এই অবস্থানগুলির উপর পাক বাহিনী বারবার আক্রমণ চালায় এবং প্রতিবারই ৩০/৪০ জন করে সৈন্য হতাহত হওয়ায় তারা আক্রমণ থেকে নিরস্ত থাকে।

 

মে মাসে জেনারেল ওসমানী আমাদের হেড কোয়ার্টার-এ আসেন। সে সময় ভবিষ্যত যুদ্ধ পরিচালনা কিভাবে হবে সে সম্বন্ধে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। জেনারেল ওসমানী আমাকে নির্দেশ দেন যুদ্ধ পরিকল্পনা তৈরী করে ফেলি। এই পরিকল্পনায় আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে দুই বাহিনীর দ্বারা পরিচালিত করার পন্থা নিই। আমরা পরিকল্পনা করি যে, পাকিস্থানের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হলে আমাদের শক্তিকে আরো বাড়াতে হবে। দুই রকমের বাহিনী গড়ে তুলতে হবে। নিয়মিত বাহিনী, যা ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর এবং অন্যান্য আর্মস ও সার্ভিসেস-এর একটা ডিভিশন গড়ে উঠবে এবং কিছুসংখ্যক নিয়মিত সৈন্য নিয়ে প্রত্যেক সেক্টরেই কোম্পানী গঠন করা হবে এবং সেই সব কোম্পানী শত্রুদের যোগাযোগ ব্যবস্থায় কমান্ডো এ্যাকশন চালিয়ে যাবে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পুরানা এবং নতুন ব্যাটালিয়ান নিয়ে ব্রিগেড গঠন করে সেই সব ব্রিগেড শত্রুদের ঘাঁটির উপর আক্রমণ চালাবে এবং প্রয়োজন হলে দখলীকৃত অবস্থানগুলোতে প্রতিরক্ষাব্যুহ গড়ে তুলবে। যেসব যুবক পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে আমাদের কাছে এসেছে তাদেরকেও ট্রেনিং দিয়ে একটা অনিয়মিত বাহিনী গড়ে তুলতে হবে। এই অনিয়মিত বাহিনী ছোট ছোট গ্রুপ এবং কোম্পানীতে বিভক্ত হয়ে বাংলাদেশের ভিতরে প্রবেশ করে নিজ নিজ এলাকা শত্রুমুক্ত করবে। এসব নিয়মিত বাহিনীর কোম্পানী এবং গ্রুপগুলো যাতে ভালভাবে কাজ করতে পারে সেজন্য তাদের পরিচালনার জন্য নিয়মিত বাহিনী থেকে জেসিও বা এনসিওদেরকে পরিচালনার জন্য পাঠান হবে। এই পরিকল্পনাতে আমরা আরো উল্লেখ করি যে, নিয়মিত বাহিনীর অস্ত্রশস্ত্র পাকিস্থানী নিয়মিত বাহিনীর অস্ত্রশস্ত্রের মতই হবে। কিন্তু অনিয়মিত বাহিনীর অস্ত্রশস্ত্র হালকা ধরণের হবে এবং এলএমজির চেয়ে ভারী অস্ত্র দেওয়ার প্রয়োজন হবে না।

 

জেনারেল ওসমানী আমাদের সাথে একমত হন এবং তিনি আমাদেরকে আশ্বাস দেন যে এই পরিকল্পনা যাতে তাড়াতাড়ি কার্যকর হয় তিনি সে চেষ্টা করবেন, ইতিমধ্যে বাংলাদেশের হাজার হাজার লোক ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। অনেক যুবক আমাদের কাছে যুদ্ধ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। আমি আমার হেড কোয়ার্টারে একটা ট্রেনিং ক্যাম্প চালু করে দিই। এই ট্রেনিং ক্যাম্পে বিভিন্ন ধরণের ট্রেনিং-এর প্রবর্তন করি। বিশেষ করে পাক বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বিধ্বস্ত করে দেয়ার জন্য ডেমোলিশন ট্রেনিং-এর ভার ক্যাপ্টেন হায়দার (বর্তমানে মেজর) এবং হাবিলদার মুনিরের উপর ন্যস্ত করি। অতি সত্বরই আমার বেশ কিছু ডেমোলিশন টিম ট্রেইন্ড হয়ে যায়। প্রথমেই আমি এসব টিমগুলোকে ঢাকা, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণাবাড়িয়া এবং কুমিল্লা-চট্টগ্রাম রেল লাইন এবং পাক সড়কে পাঠিয়ে দিই। তাদের একাজ দিই যে যতোটুকু সম্ভব পুল এবং রেলওয়ে লাইন ধ্বংস করে দেয়ার জন্য। এসব কাজে আমাদের সবচেয়ে বড় অসুবিধার সৃষ্টি হয় ডেমোলিশন-এর সরঞ্জামাদির অভাবে। আমরা হয়তো বারুদ পাই কিন্তু ফোটানোর জন্য ডেটোনেটর পাই না কিংবা অন্য কোন সরঞ্জামাদি। এসব অসুবিধার মধ্যেও আমরা প্রত্যেকটি রেল এবং রাস্তাতে বেশ কিছুসংখ্যক পুল ধ্বংস করে দিতে সক্ষম হই যার ফলে  ঢাকার সঙ্গে এই সব প্র্রধান স্থানগুলোর পাকিস্থানীদের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিনষ্ট হয়ে যায় এবং পাকিস্থানকে বিমান ও জলপথের সাহায্য নিতে হয়। এইরূপ অবস্থা শেষ পর্যন্ত চলে।

 

আমি আমার হেডকোয়ার্টার তেলিয়াপাড়া থেকে সরিয়ে কুমিল্লার কাছাকাছি মতিনগর নামক স্থানে স্থাপন করি। সেখান থেকে কুমিল্লা এবং ঢাকা কাছে হওয়াতে আমার পক্ষে এসব জায়গাতে গেরিলা তৎপরতা চালানো অনেক সুবিধাজনক হয়। আমার ট্রেনিং ক্যাম্প এ সময়ে অনেক বড় হয়ে যায় এবং হাজার হাজার ছেলেদের আমি ট্রেনিং দিতে শুরু করি। এসব ছেলেদের অনেককেই আমি নিয়মিত বাহিনীর শিক্ষা প্রদান করি। প্রথম অবস্থায় সৈন্যদের এবং অনিয়মিত বাহিনীর লোকদের থাকা কাওয়ার ও চিকিৎসার অত্যন্ত অসুবিধা হয়। আমাদের কাছে না ছিল রসদ, না ছিল টাকা পয়সা, না ছিল বাসস্থান। অনেক সময় এই সব হাজার হাজার লোককে খাওয়ানোর জন্য আমাকে বাংলাদেশের ভেতর বিভিন্ন রেশন ডিপো (এলএসডি) থেকে রসদ জোরপূর্বক আনতে হয়েছিল। কোন কোন সময় রসদের ব্যবস্থা হলেও হাজার হাজার লোকের খাবার তৈরীর হাড়ি পাতিল বাসনপত্র ছিল না। তেলের ড্রাম কেটে আমরা পাত্র তৈরী করে নিই। অনেক সময় এমন দিন যায় যে ২৪ ঘন্টার মধ্যে মাত্র একবার ক্যাম্পের লোক খেতে পেয়েছে শুধু আধাসিদ্ধ ভাত, কোন সময় ডাল ছাড়াই। থাকার জন্য কোন আশ্রয় না থাকায় অধিকাংশ লোকজনকে বৃষ্টিতে ভিজতে হতো। কোন বিশুদ্ধ পানি ছিলনা নালার পানি ব্যবহার করতে হতো। তবুও এত কষ্টের ভিতরে আমি ক্যাম্পে লোকজনের মুখে সবসময় হাসি এবং উৎফুল্ল ভাব দেখতাম। এরা সবাই নিয়মিত এবং গণবিহিনী মিলেমিশে সব প্রতিকুল অবস্থার মধ্যে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছিল। আস্তে আস্তে অব্যবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। ভারত সরকার ইউথ ক্যাম্প তৈরী করার জন্য সাহায্য দেয়। আমি আগরতলার রিলিফ ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে একটা ইউথ ক্যাম্পের অনুমোদন করিয়ে নিই। তাদের কিছুটা আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা করি এবং আমার লোকদের প্রচেষ্টায় আমরা মেলাঘর নামক স্থানে একটা ক্যাম্প গঠন করি। এ জায়গাটা পাহাড়ের উপর এবং জঙ্গলের ভিতর বেশ একটা সুন্দর জায়গায় অবস্থিত ছিল। পাকিস্থানী হামলার আশংকা থেকেও বিপদমুক্ত ছিল। এখানেই আমি আমার স্থায়ী হেডকোয়ার্টার স্থাপন করি। এ ক্যাম্পটিতে বেশী জায়গা ছিল বলে আমি তিন চার হাজার লোককে একত্রে থাকা-খাওয়া এবং ট্রেনিং-এর বন্দোবস্ত করতে পারি। এ ক্যাম্পে আমি নিয়মিত ও গণবাহিনীর উভয় প্রকারের মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং শুরু করি। এ সময় কুমিল্লার দক্ষিণে আমার যে সব সেনাদল ছিল তাদেরকে নিয়ে একা সাবসেক্টর গঠন করি। এ সাব সেক্টর হেডকোয়ার্টার আমি নির্ভয়পুরে স্থাপন করি। ক্যাপ্টেন আকবর (বর্তমানে মেজর) লে. মাহবুব এবং লে. কবির এই সাবসেক্টর থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল। এখান থেকে একটি কোম্পানী সুবেদার আলি আকবর পাটোয়ারীর অধীনে লাকসামের পশ্চিমবর্তী এলাকায় তাদের গোপন ঘাঁটি স্থাপন করে এবং এখান থেকে নোয়াখালী, লাকসাম, কুমিল্লা, চাঁদপুরের রাস্তায় শত্রুসেনাদের উপর অনেক আক্রমণ চালাতে থাকে।

 

জুলাই মাসে শত্রুদের একটি শক্তিশালী দল এলাকাকে মুক্তিসেনাদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য লঞ্চযোগে চাঁদপুর থেকে ডাকাতিয়া নদীতে অগ্রসর হয়। বেদার আলী আকবর পাটোয়ারি আগে থেকে এ সম্বন্ধে খবর পেয়েছিল। সে ছাতুরার নিকট একটি সুপারির বাগানে শত্রুসেনাকে এমবুশ করার জন্য প্রস্তুত ছিল। নদীর দু’পাশে হালকা মেশিনগান লাগিয়ে শত্রুদলের অপেক্ষায় ছিল। সকাল ১১টায় শত্রুরা লঞ্চযোগে এমবুশ অবস্থানের মধ্যে পৌঁছায় এবং নদীর দুই তীর থেকে আমাদের কোম্পানীর লোকেরা শত্রুসেনার উপর অতর্কিত গোলাগুলি চালায়। এতে লঞ্চের মধ্যে অনেক শত্রুসেনা হতাহত হয়। উভয় পক্ষের এ সংঘর্ষে শত্রুসেনারা পর্যুদস্ত হয়। উপায়ন্তর না দেখে শত্রুসেনারা পিছু হটে যায় এবং আবার লঞ্চ থেকে নেমে অগ্রসর হওয়ার হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু এবারও তারা পরাস্ত হয়ে চাঁদপুরে ফিরে যায়। এ কোম্পানী পরে চাঁদপুর থেকে কুমিল্লার বেশ কয়েকটি সেতু ও রেলসেতু ধ্বংস করে দেয়। পাকি বাহিনী পরবর্তী পর্যায়ে অনেকবার আমাদের এ মুক্ত এলাকাকে দখল করার চেষ্টা করে কিন্তু তারা অসমর্থ হয়। নির্ভয়পুর থেকে আমাদের সৈন্য এবং গেরিলা বাহিনী লাকসাম-চট্টগ্রাম রেলওয়ে সেতু এবং রাস্তার সেতু ধ্বংস করে দেয় এতে চট্টগ্রাম এবং কুমিল্লার মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়।

 

উত্তরাঞ্চলে কসবা, মন্দভাগ, আখাউড়া শালদানদী প্রভৃতি অঞ্চলে যখন আমার সেনাদলের সাথে পাকবাহিনীর প্রত্যহ সংঘর্ষ তীব্রতর হচ্ছিল, সে সময়ে কুমিল্লা দক্ষিণাঞ্চলে মিয়ার বাজার এবং চৌদ্দগ্রাম অঞ্চলেও আস্তে আস্তে পাকবাহিনীর সাথে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। আমার ৪র্থ বেঙ্গল-এর বি কোম্পানীর একটি প্লাটুন এবং ইপিআর ও মুজাহিদদের নিয়ে গঠিত সম্মিলিত দলটি জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে মিয়ার বাজারে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের উপর প্রতিরক্ষা অবস্থান গঠন করে ব্যুহকে আরো শক্তিশালী করে তোলে। এর ফলে চট্টগ্রাম-ঢাকার মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পাকবাহিনীর মধ্যে এ অবস্থার তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। মিয়ার বাজারের নিকট যে রাস্তায় সেতুটি ছিল, সেটাও উড়িয়ে দেয়া হয়। এছাড়া কুমিল্লার ৬ মাইল দক্ষিণে বাগমারাতে যে রেলওয়ে সেতুটি ছিল, সেটাও ভেঙ্গে দেয়া হয়। পাকবাহিনী ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পুনরায় খোলার জন্য ৩০শে মে সকাল ছটায় দুই কোম্পানী সৈন্য নিয়ে দক্ষিণের দিকে অগ্রসর হয়। বেলা ১১ টার সময় আমাদের একটি এমবুশ দল মিয়ার বাজারে উত্তরে পাকসেনাদের উপরে অতর্কিত হামলা চালায়। শত্রু সেনাদল মিয়ার বাজারের এত আগে এ ধরণের হামলার জন্য প্রস্তুত ছিল না। ফলে তারা সম্পূর্ণ হতচিকত হয়ে যায়। তিন ঘন্টা যুদ্ধের পর শত্রুসেনারা ছত্রভঙ্গ হয়ে কুমিল্লার দিকে পলায়ন করে। এ যুদ্ধে শত্রুদের প্রায় ৫০ জন হতাহত হয় এবং আমাদের সেনাদল দুটি ৩টনের গাড়ী গোলাবারুদ সহ ধ্বংস করে দেয় এবং একটি গাড়ী দখল করে নেয়। আমাদের পক্ষে দুজন সৈন্য নিহত এবং একজন আহত হয়। এরপর শত্রুরা কুমিল্লা বিমানবন্দর অবস্থান থেকে আমাদের মিয়ার বাজারের প্রতিরক্ষা অবস্থানের উপর ভীষণভাবে ভারী কামানের সাহায্যে গোলাবর্ষণ করতে থাকে এবং সঙ্গে সঙ্গে এ অবস্থানের উপর পুনরায় আক্রমণ করার চেষ্টা চালায়। শত্রুদের একটি শক্তিশালী পেট্রোল পার্টি চেওরা হয়ে মিয়ার বাজারের পূর্বদিক দিয়ে আমাদের অবস্থানের ভিতর প্রবেশের চেষ্টা করে। কিন্তু লে. কবিরের নেতৃত্বে আমাদের একটা ছোট দল পাক বাহিনীর পেট্রোল পার্টিকে এমবুশ করে। এই এমবুশে পাকবাহিনীর ১০ জন নিহত হয়। লে. কবির পাকবাহিনীর পিছু ধাওয়া করে তাদের তাড়িয়ে দেয়।

 

মিয়ার বাজারের অবস্থানটির উপর পাকসেনাদের চাপ বাড়তে থাকে। কামানের গোলা দিনে দিনে আমাদের অবস্থানের উপর তীব্র হতে থাকে। অবস্থানটি বেশী দিন আর টিকানো যাবেনা ভেবে আমি লে. ইমামুজ্জামানকে একটু পিছু হটে চৌদ্দগ্রাম থানার বাজারের নিকট নতুন করে অবস্থান তৈরীর নির্দেশ দিই। ইমামুজ্জামান তাঁর দলকে নিয়ে চৌদ্দগ্রামে আবার এক নতুন প্রতিরক্ষাব্যুহ গড়ে তোলে। এ প্রতিরক্ষাব্যুহ তিন দিকে মুখ করে গড়ে তোলা হয়। ৪র্থ বেঙ্গলের প্লাটুনটি মিয়ারবাজারে কুমিল্লার দিকে মুখ করে পজিশন নেয়। কুমিল্লা-চট্টগ্রাম রাস্তায় মিয়ার বাজারের যে সেতুটি ছিল, সে সেতুটির দক্ষিণে অবস্থানটি গড়ে তোলে। এদের উপর দায়িত্ব ছিল কুমিল্লা থেকে পাক বাহিনীকে দক্ষিণ দিকে অগ্রসরে বাধা দেয়া। আরেকটি প্লাটুনকে পশ্চিম দিকে মুখ করে বাগমারা থেকে যে কাঁচা রাস্তা মিয়ার বাজারের দিকে আসে তার উপর প্রতিরক্ষাব্যুহ করার নির্দেশ দিই। মুজাহিদ কোম্পানির দায়িত্ব ছিল দক্ষিণ দিকে মুখ করে মিয়ার বাজার হতে আধা মাইল দক্ষিণে চট্টগ্রাম-কুমিল্লা মহাসড়কের উপর অবস্থান গড়ে তোলা এবং দক্ষিণ থেকে শত্রুসেনাদের অগ্রগতিকে বাধা দেওয়া। কিছু কিছু মাইন সরু বাঁশ কেটে আমার এ অবস্থানের চতুর্দিকে পুঁতে দিই। দুই সপ্তাহ পরে শত্রুসেনারা কুমিল্লার দিক থেকে এ অবস্থানটির উপর দুটি কোম্পানি নিয়ে আক্রমণ চালায়। কিন্তু শত্রুদের বেশ কিছুসংখ্যক সৈন্য হতাহত হওয়ার পরে তারা আক্রমণ বন্ধ করে দিয়ে পশ্চাদপরণ করে। শত্রুরা আমাদের অবস্থানের উপর তাদের কামানের গোলা চালিয়ে যায়।

 

১৪ জুন সকাল ৬টার সময় পাকসেনারা নয়া বাজার হয়ে চৌদ্দগ্রামের দিকে অগ্রসর হয়। কিন্তু তারা আমাদের একটা এমবুশ পার্টির ফাঁদে নয়া বাজারের নিকট পড়ে যায়। শত্রুদের ৩০ জন হতাহত হয় এবং তাদের অগ্রগতি ব্যত হয় এবং পিছু হটে যায়। ১৯শে জুন সকাল ৬টায় পাকসেনারা অন্ততপক্ষে ২টি ব্যাটালিয়ন নিয়ে দুই দিক থেকে (লাকসাম ও ফেনীর দিক থেকে) প্রবল আক্রমণ শুরু করে। তীব্র কামানের গোলার মুখে আমাদের সম্মুখবর্তী সৈনকরা পিছু হটে আসতে বাধ্য হয়। পাকসেনাদের আক্রমণ সন্ধ্যা পর্যন্ত চলতে থাকে। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত পাকসেনাদের আক্রমণে আমাদের চৌদ্দগ্রামে অবস্থানটি সংকটময় হয়ে পড়ে। আর বেশীক্ষণ এ অবস্থানটিতে থাকলে রাতের অন্ধকারে শত্রুসেনা দ্বারা পরিবেষ্টিত হবার আশংকা ছিল। যদিও পাকসেনাদের সমস্ত দিনের যুদ্ধে অন্তত ২০০ জন হতাহত হয়েছিল এবং আমাদের পক্ষে ক্ষতির সংখ্যা ছিল ২ জন নিহত এবং ৪ জন আহত। তবুও চৌদ্দগ্রাম শত্রুদের প্রবল আক্রমণের মুখ থেকে আর রক্ষা করা যাবেনা বলে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় আমাদের সেনাদল অবস্থানটি পরিত্যাগ করে।

 

মে মাসে যখন আমাদের শত্রুদের সঙ্গে সম্মুখসমর চলছিল, সে সময় আমার মুক্তিযোদ্ধারা শত্রু বাহিনীর পিছনে তাদের আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছিল। ২১শে মে দুজন মুক্তিযোদ্ধা জামাল এবং খোকন একটি এন্টি-ট্যাংক মাইন পুঁতে শত্রুবাহী একটি ট্রাককে কুমিল্লার নিকট উড়িয়ে দেয়। গেরিলাদের আর একটি পার্টি দেবীদ্বার থানা আক্রমণ করে ছয়জন দালাল পুলিশকে নিহত করে। গেরিলাদের হাতে হাজিগঞ্জ থানার একজন পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর ও দুইজন দালাল পুলিশ নিহত হয়। এ পুলিশদের নিহত হওয়ার সংবাদ পেয়ে পাকবাহিনীর একটি ছোট দল (দশজনের মত) হবিগঞ্জ থানা পাহাড়ায় নিযুক্ত হয়। গেরিলারা একদিন আক্রমণ চালিয়ে তাদের চারজনকে নিহত করে।

 

এ সময়ে ঢাকাতে আমাদের কমান্ডো ছেলেরা নয়টি সরকার অফিসে আক্রমণ চালিয়ে বিস্ফোরণ ঘটায়। সেগুলো ছিল সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং, হাবিব ব্যাংক, স্টেট ব্যাংক, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, সদরঘাট টার্মিনাল, পাকিস্থান অবজারভার অফিস প্রভৃতি। এসব আক্রমণে চারজন পাক সেনা অফিসার এবং দুজন সৈনিক নিহত হয়।

 

কুমিল্লার দক্ষিণে গৌরীপুর নামক স্থানে আমাদের কমান্ডোরা পাকসেনাদের উপর অকস্মাৎ আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণেও পাকসেনাদের ৯ জন সৈন্য নিহত হয়।

 

পাকসেনারা ইতমধ্যে শালদানদী এরিয়াতে বিশেষভাবে তাদের সৈন্য সংখ্যা বাড়াতে থাকে। তাদের ১টা রেলওয়ে ট্রলি যা শত্রুদের জন্য রেশন এবং এমুনিশন নিয়ে যাচ্ছিল ২১শে মে আমাদের একটা ছোট এমবুশ দলের হাতে ধরা পড়ে। এর ফলে আমাদের হস্তগত হয় এমজিআইএ ৩.৭৫ এমএম এবং ১০৬ আরআর এর শেল।

 

২২শে মে তারিখে মুজাহিদ ক্যাপ্টেন আব্দুল হকের নেতৃত্বে একটি গেরিলা দল শালদা নদী এলাকায় অবস্থানরত শত্রুদের প্রতিরক্ষা ঘাঁটির উপর অকস্মাৎ আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণটা শত্রুদের পিছন থেকে পরিচালিত হয়। শত্রুরা এরকম আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিলনা। মুজাহিদ ক্যাপ্টেন আব্দুল হকের প্লাটুন শত্রুদের অবস্থানটি ভেদ করে ভিতরে প্রবেশ করে। শত্রুরা তাদের অবস্থানের ভিতর এ অতর্কিত আক্রমণে সম্পূর্ণ হকচকিত হয়ে যায়। এ আক্রমণের ফলে পরে আমরা জানতে পারি যে, শত্রুদের প্রায় ১৫ জন হতাহত হয়েছে এবং তাদের মধ্যে ৪ জন মারা যায়।

 

২৫শে মে রাত আড়াইটার সময় আমাদের এমবুশ পার্টি বাটপাড়া জোড়কাননের নিকট শত্রুদের ১টা ট্রাক এবং ১টা আরআর রাইফেল-এর জীপ এমবুশ করে। এই এমবুশে শত্রুদের প্রায় ২০ জন সৈনিক ট৬্রাক এবং জীপসহ ধ্বংস হয়ে যায়। ২৯শে মে সকাল সাড়ে ৬টায় একটা এমবুশ পার্টি সুবেদার আবদুর রহমানের নেতৃত্বে ১৫ জন লোক নিয়ে কুমিল্লার উত্তরে রঘুনাথপুর নামক স্থানে এমবুশ করে বসে থাকে। শত্রুদের একটা পেট্রোল পার্টি ১ জন অফিসার ও ২৫ জন সৈন্য নিয়ে আমাদের এমবুশের ফাঁদে পড়ে যায় এবং সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। ২৭শে মে মন্দভাগ থেকে ১টি প্লাটুন বিকাল সাড়ে পাঁচটায় কুট শালদা নদীর সিএণ্ডবি রাস্তার উপর শত্রুদের এমবুশ করে। এ এমবুশের ফলে শত্রুদের ৯জন লোক নিহত হয় এবং ১১টা জীপ ও ১টা ডজ ধ্বংস হয়ে যায়। শত্রুরা তাদের মৃতদেহগুলো রেখেই পলায়ন করে। পেট্রোল পার্টি ২ জন পাকসেনাকে জীবিত অবস্থায় ধরতে সক্ষম হয়। মে মাসের মাঝামাঝি ফেনী এবং লাকসামের মাঝে রেলেওয়ে ব্রিজি উড়িয়ে দেওয়া হয়। রেলওয়ে ব্রিজের উপর পাকসেনাদের ১০ জন পাহারাদাড় ছিল। তাদেরকেও সে সঙ্গে মেরে ফেলা হয়।

 

২৬শে মে ক্যাপ্টেন আইন উদ্দিনের নেতৃত্বে ১টি শক্তিশালী দল কসবার উত্তরে ইমামবাড়ীর নিকট ১৫০ পাউণ্ড এক্সপ্লোসিভ লাগিয়ে রেলওয়ে ব্রিজ ধ্বংস করে দেয়। এরপর এ দলটির শত্রুদের জন্য এ্যামবুশ করে বসে থাকে। শত্রুরা ব্রিজের দিকে অগ্রসর হয়। শব্দ শোনে আমাদের দল তৈরী হয়। ব্রিজ পর্যন্ত পৌঁছার আগেই পাক সেনারা এমবুশ-এর ভয়ে সেখান থেকে ফেরত চলে যায়। ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিন পরে তার দলটিকে নিয়ে কর্ণাল বাজারে শত্রু অবস্থানের উপর অকস্মাৎ আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণের সময় ৭৫ এমএমআআর-এর সাহায্যে শত্রুদের কয়েকটি ব্যাংকার ধ্বংস করে দেয় এবং সঙ্গে সঙ্গে ৩ ইঞ্চি মর্টারের সাহায্যেও গোলাবর্ষণ করে। এতে শত্রুদের ৮জন সেনা নিহত হয় এবং কয়েকটি ব্যাংকার ধ্বংস হয়।

 

আখাউড়া থেকে আমাদের অবস্থান পরিত্যাগ করার পর আমি আমার দলকে আখাউড়ার উত্তরে আজমপুর গ্রামে সিঙ্গারবিলে পজিশন নেয়ার নির্দেশ দিই। লে. হারুনের নেতৃত্বে ১টি ইপিআর কোম্পানী এবং ৪র্থ বেঙ্গল-এর ১টি প্লাটুন আজমপুর রেলওয়ে কলোনীর পেছনে মাধবপুর সড়ক এবং রেল লাইনের উপর প্রতিরক্ষাব্যুহ গঠন করে। এ জায়গাটা ছিল একটু উঁচু এবং এর ডান দিকে তিতাস নদী থাকাতে এ অবস্থানটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পাকসেনারা প্রথমে বুঝতে পারেনি যে আমরা এ জায়গাতে প্রতিরক্ষা অবস্থান নিয়েছি। শত্রুদল আখাউড়া দখল করার পর ভেবেছিল যে এবার তারা সিলেট আখাউড়া লাইনে ট্রেন যোগাযোগ পুনরায় চালু করবে। এ জন্য সিলেটের দিক থেকে ১টি লাইন-ইঞ্জিন এবং কয়েকটি বগিসহ মাধবপুর থেকে দক্ষিণে পাঠায়। সিঙ্গারবিল স্টেশনের কিছু উত্তরে পুলের নিকট লে. হারুন কয়েকটি এ্যান্টি ট্যাংক মাইন রেল লাইনের নীচে আগেই পুঁতে রেখেছিল। এ ট্রেনটি লাইনের উপর দিয়ে আসার সময় মাইনের আঘাতে লাইনচ্যুত হয়ে যায়। এর কিছুদিন পরে পাকিস্থান বাহিনীর কিছু সৈনিক এবং রেলওয়ে কর্মচারীরা ক্রেন নিয়ে আসে এ ট্রেনটি তোলার জন্য। কিন্তু পাক সেনাদের এ দলটি লে. হারুনের পূর্বপরিকল্পিত এমবুশে পড়ে যায়। এর ফলে প্রায় ২০ জন পাক সেনা নিহত এবং তারা রেলওয়ে কর্মচারীসহ সেখান থেকে পালিয়ে যায়। এর কিছুদিন পর লে. হারুন সিঙ্গারবিল রেলওয়ে ব্রিজ ১৪০ পাউণ্ড এক্সপ্লোসিভ লাগিয়ে উড়িয়ে দেয়। পাকবাহিনী এ সেতুটি মেরামত করার জন্য রেলওয়ে কর্মচারী ও আরো সরঞ্জাম সিঙ্গারবিল রেলওয়ে স্টেশনে জমা করে। এরপর সেসব সরঞ্জাম তারা রেলওয়ে সেতুটির নিকট নিজেদের তত্ত্বাবধানে এবং পাহারাধীনে আনে। লে. হারুনের মর্টার প্লাটুন সুবেদার শামসুল হক (বর্তমানে সুবেদার মেজর) এ সময়েরই অপেক্ষায় ছিল। পাকবাহিনী কয়েকদিন পর সকালে যখন তাদের সেতু মেরামতের কাজ আরম্ভ করেছে, ঠিক সে সময় সুবেদার শামসুল হকের মর্টার তাদের লক্ষ্য করে গোলা ছুড়তে থাকে এবং সঙ্গে সঙ্গে লে. হারুনও তার সৈন্যদের দিয়ে আক্রমণ চালায়। পাক বাহিনী এ আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে তাদের সমস্ত সরঞ্জাম ফেলে সেখান থেকে পলায়ন করে এবং সে সঙ্গে সিলেট-চট্টগ্রাম রেলওয়ে লাইন তাদের জন্য চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। এ সংঘর্ষে পাকবাহিনীর দশজন লোক নিহত হয়।

 

কিছুদিন পর পাকবাহিনী আমাদের আজমপুর পজিশনের উপর কামান দিয়ে গোলাবর্ষণ করতে থাকে। তারা বুঝতে পেরেছিল যে আজমপুর থেকে আমাদের অবস্থানটিকে দখল করতে না পারলে সিলেট ঢাকা রেলওয়ে লাইন তারা কখনো খুলতে পারবে না।

 

২৯শে মে কিছু কিছু ফাইটিং পেট্রোল তারা আজমপুর পজিশনের পশ্চিমে তিতাস নদী বরাবর পাঠায় আমাদের পজিশন বিস্তারিত জানার জন্য। কিন্তু সবেক্ষেত্রেই এসব পাকদল আমাদের হতে পর্যুদস্ত হয়ে পলায়ন করে। আমরাও পাক সেনা বাহিনীর আখাউড়া অবস্থানে ছোট ছোট দল পাঠিয়ে ব্যতিব্যস্ত করে তুলি। আমরা জানতে পারি যে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ট্রলি বা লাইট ইঞ্জিনের মাধ্যমে পাকবাহিনী তাদের রসদ এবং সরঞ্জাম আখাউড়াতে পাঠায়। এ খবর জানতে পেরে আমাদের ১টি দল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ২ মাইল দক্ষিণে রেল লাইনের নিচে মাইন পুঁতে দেয়। কিন্তু পাকবাহিনীর স্থানীয় দালালদের সহায়তায় এসব মাইন সম্বন্ধে জানতে পারে এবং সেগুলি উঠিয়ে নেয়। পাকবাহিনী এ সময়ে রেল লাইনের নিকটবর্তী গ্রামের লোকদেরকে কঠোর সতর্ক করে দেয় যে, কোন গ্রামের নিকটে মুক্তিবাহিনী যদি তাদের কোন ক্ষতিসাধন করে তবে সে গ্রাম পুড়িয়ে দেয়া হবে। এ সতর্কতার ঘোষণায় প্রতিদিন রাতে পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলো হতে লোকজন লাইন এবং সড়ক পাহারা দিত। এর ফলে আমাকে পাকবাহিনীর গতিবিধির উপর বাধাবিঘ্ন সৃষ্টি করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল।

 

এ রকমের বাধাবিপত্তির সম্মুখীন আরো অনেক জায়গাতে আমি হই। আমাদের কাজ অব্যাহত রাখার জন্য যেসব জায়গায় আমার লক্ষ্যস্থল ছিল, সেখানের আমার সেনাদলগুলোকে সান্ধ্য আইন (কারফিউ) জারি করার নির্দেশ দিই এবং এ নির্দেশ বহুলাংশে সফল হয়। যদিও গ্রামবাসীদের পাকবাহিনীকে সহায়তা করার কোন ইচ্ছা ছিল না, তারা তাদের ভয়ে এসব বাধাবিপত্তির সৃষ্টি করতো। আমাদের সান্ধ্য আইনের ঘোষণায় অনেক ফল হয় এবং গ্রামবাসীরা আর বাধা ‍সৃষ্টি করে না। এরপর আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং আখাউড়ার মাঝে ২টি রেলসেতু উড়িয়ে দিই। এর ফলে আখাউড়ায় পাকসেনাদের অবস্থানটির জন্য রসদ এবং অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহে যথেষ্ট অসুবিধা হয়। এরপর তারা আখাউড়াতে হেলিকপ্টারের সাহায্যে রসদ সরবরাহ করতে বাধ্য হয়।

 

পাকবাহিনী আমাদের আজমপুর পজিশনের উপর তাদের চাপ বাড়াতে থাকে। তাদের ২টা কোম্পানী একদিন সকালে আজপুরের আধ মাইল দক্ষিণে দরগার নিকট আমাদের অগ্রবর্তী অবস্থানের উপর আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণ সকাল ৬টা থেকে ১১টা পর্যন্ত চলে। আমাদের সৈন্যরাও আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল। প্রায় ৩০ জন শত্রুসেনা হতাহতের পর তারা আক্রমণ বন্ধ  করে নিয়ে আবার পশ্চাদপসরণ করে।

 

বেশ কিছুদিন পর জুন মাসে পাকস্থানী সৈন্য মাধবপুরের রাস্তা এবং রেল লাইনের উপর আমার পজিশনের দিকে অগ্রসর হয়। এবার পাকসেনাদের ১২ নং ফ্রন্টিয়ার ফোর্স আমাদের অবস্থানের উপর আক্রমণ চালায়। আমাদের অগ্রবর্তী দরগা পজিশন থেকে এ আক্রমণকে বেশ কয়েকদিন বিফল করে দেয়া হয়। কিন্তু জুন মাসের শেষের দিকে আক্রমণ আরো তীব্রতর হয়ে ওঠে। পাক বাহিনী আখাউড়াতে ১২০এমএম ভারী মর্টার এবং ১০৫এমএম তোপ নিয়ে আসে। এসব কামানের গোলার আঘাতে এবং ১২ নং ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের প্রবল চাপে আমাদের অগ্রবর্তী পজিশন সংকটময় হয়ে ওঠে এবং শত্রুদের অন্তত ৫০ জন হতাহতের পর আমাদের পজিশন পরিত্যাগ করতে বাধ্য হতে হয়।

 

এরপর কিছুদিন পর জুলাই মাসে পাক বাহিনী আবার আজমপুরের দিকে মুল অবস্থানের উপর আক্রমণ চালায়। আবারও তারা মাধবপুরের সড়ক ও রেল লাইনের উপর ১২ নং ফ্রন্টিয়ার ফোর্স এবং মিলিশিয়াসহ আক্রমণ চালায়। আক্রমণের পূর্বে প্রচণ্ড গোলাগুলি করতে থাকে। আমরা এ আক্রমণের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলাম। আক্রমণের প্রথম পর্যায়ে যখন পাক সেনারা সারিবদ্ধ লাইনে আমাদের অবস্থানের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন আমাদের মর্টার এবং মেশিনগান তাদের অন্ততপক্ষে ১০০/১২০ জনের মত লোককে হতাহত করে। তারা আমাদের অবস্থানের কোন কোন জায়গায় ঢুকে পড়ে কিন্তু আমাদের পাল্টা আক্রমণে আমরা পাক সেনাদের হটিয়ে দিই। এ সংঘর্ষ প্রায় দুইদিন চলে। আমরাও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম, কোন অবস্থাতেই আমরা আমাদের ঘাঁটি ছাড়বো না। শত্রুসেনাদের যথেষ্ট হতাহত হচ্ছিল প্রতিদিনই, কিন্তু তারাও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ আমাদের এ অবস্থানটিকে দখল করার জন্য। তাদের কামানের গোলায় আমাদের অবস্থানটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছিল কিন্তু তবুও আমাদের সৈনিকরা আত্মবিশ্বাস হারায়নি। আমাদের অবস্থানটি আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের আগরতলা বিমানবন্দরের বেশ নিকটেই ছিল। এরফলে পাকবাহিনীর কামানের গোলার স্প্লিন্টার মাঝে মাঝে বিমানবন্দরে গিয়ে পড়ছিল। পাশ্ববর্তী রাষ্ট্র আমাদের এ অবস্থাটি থেকে যুদ্ধ আরো চালিয়ে যাওয়ার আপত্তি করে। তাদের বিমানবন্দরের ক্ষতি হওয়ার আশংকায় এ আপত্তি করে। আমরা নিরূপায় হয়ে দেড় মাস যুদ্ধ চালানোর পর আজমপুর অবস্থান পরিত্যাগ করে সিঙ্গারবিলে নতুন অবস্থান গড়ে তুলি।

 

পাক বাহিনী মাধবপুর থেকে অগ্রসর হয়ে কমলছড়ি চা বাগান দখল করে নেয়। এই চা বাগানে তারা মিলিশিয়ার এক কোম্পানী এবং নিয়মিত বাহিনীর প্লাটুনসহ একটা শক্তিশালী ঘাঁটি গড়ে তোলে। লে. হারুন বুঝতে পারে যে, পাক সেনারা আখাউড়া থেকে (দক্ষিণ থেকে) এবং মাধবপুর থেকে (উত্তর থেকে) কমলছড়ি হয়ে তার সিঙ্গারবিল পজিশনকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা করেছে। লে. হারুন পাক বাহিনীকে পৃথকভাবে উত্তর এবং দক্ষিণে আঘাত হানার এ পরিকল্পনা নেয়। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী কমলছড়ি চা বাগান প্রথম আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। জুলাই মাসে কমলছড়ি চা বাগান এবং চা বাগানে পাক বাহিনীর ঘাঁটি সম্বন্ধে সে বিস্তারিত খবরাখবর যোগাড় করে। একদিন রাত তিনটার সময় ৪র্থ বেঙ্গল-এর ১টা প্লাটুন এবং ইপিআর-এর ১টা কোম্পানী নিয়ে গোপন পথে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে কমলছড়ি পাকবাহিনীর অবস্থানের ভিতর সাহসের সাথে ঢুকে পড়ে। এ অকস্মাৎ গোপন আক্রমণ পাক সেনাদলকে হতভম্ব করে দেয়। তাদের কিছু বুঝাবার বা বাধা দেয়ার আগেই রে. হারুনের দল পাক বাহিনীর অন্তত ছয়টা ব্যাংকার গ্রেনেডের সাহায্যে ধ্বংস করে দেয়। এরপর সমস্ত রাত ধরে পাক বাহিনীর সঙ্গে হাতাহাতি লড়াই চলতে থাকে। পাকিস্থানী সৈন্যরা অকস্মাৎ আক্রমণের প্রথম পর্যায়ে হকচকিত হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের মনোবল ভেঙ্গে দিয়েছিল। সে জন পরবর্তী পর্যায়ে যখন লে. হারুনের ছোট ছোট দলগুলি চা বাগানের সরু এবং গোপন রাস্তায় অগ্রসর হয়ে একটার পর একটা ব্যাংকার ধ্বংস করে যাচ্ছিল তখন উপায়ন্তর না দেখে পাক বাহিনীর সৈন্যরা মনোবল হারিয়ে পালিয়ে যেতে শুরু করে এবং এতে তাদের বেশ লোক গুলিতে নিহত হয়। সকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত কমলছড়ি চা বাগানটি সম্পূর্ণ লে. হারুনের দখলে এসে যায়। এ যুদ্ধের ফলে পাকিস্থানীদের ৫০ জন নিহত হয় এবং আমাদের হাতে ৪টি মেশিনগান ও ৬টি হালকা মেশিনগান, বেশ কিছু রাইফেল এবং অজস্ত্র গোলাগিুলি ও প্রচুর রসদ এবং কাপড়-চোপড় হস্তগত হয়।

 

ক্যাপ্টেন গাফফার এবং ক্যাপ্টেন সালেকের নেতৃত্বে মুক্তিসেনারা মন্দভাগ এবং মালদানদীতে শত্রুসেনাদের উপর অনবরত আঘাত চালিয়ে যাচ্ছিল। ২৬শে মে রাত ৯টায় সুবেদার ভুইয়ার নেতৃত্বে দুটি সেকশন রকেট লাঞ্চার নিয়ে শত্রুর শালদানদীর পজিশনের ভিতর ঢুকে যায়। এরপর শত্রুদের ২টা ব্যাংকার তারা রকেট লাঞ্চারের সাহায্যে ধ্বংস করে দেয়। শত্রুরা তাদের উপর পাল্টা আক্রমণ চালালে পেট্রোল পার্টি হালকা মেশিনগানের সাহায্যে শত্রুসেনাদের বেশ কিছু লোক নিহত করে এবং তারা পিছু হটে আসে। পরে জানতে পারা যায় যে, এ আকস্মিক হামলায় শত্রুদের ১ জন জেসিও এবং ৯ জন সৈন্য মারা যায়। ২৮শে মে রাতে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডোরা কুমিল্লর নিকট কালিকাপুর রেলওয়ে ব্রিজ উড়িয়ে দেয়। ঐ দিনই সকালে পাকিস্থানী সেনারা কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়কের কাছে রঘুরামপুরে একটি কোম্পানী নিয়ে আসে। এ কোম্পানীকে আমাদের সেনাদল সকাল সাড়ে ছটার সময় অতর্কিতে এমবুশ করে এবং এমবুশে পাকসেনাদের অন্তত একজন অফিসারসহ ৩৫ জন লোক হতাহত হয়। পাকসেনারা আঘাত খেয়ে মরিয়া হয়ে ভবনগর, শালকুমড়া, খাড়েরা, ফকিরবাজার প্রভৃতি গ্রামগুলো জ্বালিয়ে দেয়। এ ছাড়াও শত্রুসেনারা তিন ইঞ্চি মর্টার এবং ১০০এমএম ভারী মর্টারের সাহায্যে যথেষ্টভাবে পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলির উপর গোলা ছুড়তে থাকে।

 

২৮শে মে আরেকটি পেট্রোল পার্টি নায়েক গিয়াসুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে মনোহরপুর নামক গ্রামে শত্রুদের জন্য একটি এমবুশ পেতে থাকে। পাকসেনাদের ১টি কোম্পানী জঙ্গলবাড়ির দিকে যাচ্ছিল কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া রাস্তা দিয়ে। সকাল সাড়ে ৮টায় পাকসেনাদের কোম্পানীটি নায়েক গিয়াসুদ্দিনের এ্যামবুশের ফাঁদে পড়ে যায় এবং তাদের ২৫ জনের মত লোক হতাহত হয়। শত্রুসেনারা পিছু হটে এসে পুনরায় কামানের গোলার সাহায্যে আক্রমণের চেষ্টা করে। তখন আমাদের এমবুশ পার্টি তাদের অবস্থান পরিত্যাগ করে। শত্রুরা পার্শ্ববর্তী মনোহরপুর ইত্যাদি গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় সাথে সাথে কামানের সাহায্যে গোলা ছুঁড়তে থাকে।

 

শালদানদীর শত্রু অবস্থানটির উপর আমাদের চাপ আরো বাড়াতে থাকি। ২৫শে মে আমাদের আর একটি ছোট দল অতর্কিত হামলা করে পাকসেনাদের ১জন জেসিও এবং ৫জন সৈন্যকে নিহত করে। তাদের ২টি মর্টারও ধ্বংস করে দেয়া হয়। ২৭শে মে শত্রুসেনাদের কুটি থেকে সিএণ্ডবি রাস্তায় শালদা নদীতে আরো সৈন্য আনার চেষ্টা করে। সকাল ৭টায মুক্তিবাহিনী পাকসেনাদের এ দলটিকে এমবুশ করে। এমবুশ-এর ফলে ১টা জীপ, ১টা ডজ ধ্বংস ও শত্রুদের ৯ জন লোক নিহত হয়। শত্রুরা সামনে অগ্রসর হতে না পেরে পশ্চাদপরণ করতে বাধ হয়।

 

২৮শে মে সকাল ৬টায় কুমিল্লার দক্ষিণে রাজারমার দীঘির শত্রুদের ১টা ব্যাংকার আমাদের ২জন সৈনিক গোপনে গিয়ে গ্রেনেড ছুঁড়ে ৪জন লোককে নিহত করে এবং তাদের রাইফেলগুলো দখল করে নিয়ে আসে। ঐ দিন সকাল ৯টায় লাকসাম-কুমিল্লা রেল লাইনের উপর আলীশ্বরের নিকট মাইন পুঁতে ১টা রেলওয়ে ইঞ্জিন ও ২টি বগি লাইনচ্যুত করে। ২৬শে মে জগন্নাথদিঘী শত্রু অবস্থানের উপর লে. ইমামুজ্জামানের প্লাটুন রাত ১১টার সময় অকস্মাৎ আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণে ১টি প্লাটুন ২টি তিন ইঞ্চি মর্টার ২টি মিডিয়াম মেশিনগান ব্যবহার করে। আক্রমণের ফলে শত্রুদের ১৯ জন লোক হতাহত হয়। আমাদের ১টি পেট্রোল পার্টি ২৬শে মে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-কুমিল্লা রোডের উপর উজানিরশা সেতুর নিকট পাকবাহিনীর পাহারারত সৈনিকদের ক্যাম্প আক্রমণের জন্য পাঠান হয়। আমাদের দলটির সঙ্গে কমান্ডো শিক্ষাপ্রাপ্ত কিছু লোকও ছিল। কুমিল্লা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া এ দুই জায়গাতেই পাকবাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া রাস্তা তাদের গতিবিধির জন্য বিশেষ জরুরী ছিল। উজানিরশা ব্রিজকে ধ্বংস করে পাকসেনাদের গতিবিধিকে ব্যহত করা ছিল আমাদের লক্ষ্য। আমার দলটি রাত ১১টায় উজানিরশা ব্রিজটি অকস্মাৎ হামলা করে এবং সফলতার সাথে বিস্ফোরক লাগিয়ে ১টা স্প্যান ধ্বংস করে দেয়। এ অকস্মাৎ হামলায় শত্রুদের ১৩ জন নিহত এবং ৬ জন আহত হয়।

 

ক্যাপ্টেন গাফফারের নেতৃত্বে ৪র্থ বেঙ্গলের সি কোম্পানী ২৯শে মে শালদানদীর পিছনে পশ্চিম শিবপুর, বাজার ও সাগরতলাতে শত্রুদের অবস্থানের পিছনে সকাল ৪টায় মেশিনগান এবং ৭৫এমএমআরআরসহ ঢুকে পড়ে। শত্রুরা তাদের পিছনে হঠাৎ মুক্তিবাহিনীর অনুপ্রবেশে বেশ হকচকিয়ে যায়। সকাল ৫টা পর্যন্ত আমাদের দলটি শত্রু অবস্থানের উপর তীব্র আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণে শত্রুদের বেশ কয়েকটা ব্যাঙ্কার ধ্বংস হয়ে যায়, বেলুচের মেজর দুররানিও নিহত হয়।

 

৩১শে মে আমাদের ১টা পেট্রোল পার্টি কুটির নিকট শত্রুসেনাদের অবস্থান সম্বন্ধে তথ্যানুসন্ধানে যায়। কুটির নিকটে তারা দেখতে পায় যে পাকসেনাদের ১টি জীপ ৬ জন সৈনিকসহকুটি গ্রামে প্রবেশ করছে। জীপটি গ্রামের পাশে এসে দাড়ায়। তাদের মধ্য থেকে ৬জন পাকসেনা জীপ থেকে বের হয়ে গ্রামের ভিতরে যায়। আমাদের ছোট দলটি বোমা ছুঁড়ে ড্রাইভারসহ জীপটি ধ্বংস করে দেয়।

 

৩১শে মে-তেই আমাদের ৬ জন সৈন্যের একটি দল সুবেদার আবদুল হক ভুঁইয়ার নেতৃত্বে শালদানদী রেলওয়ে স্টেশনের নিকট অনুপ্রবেশ করে। তারা যখন তথ্যানুসন্ধান করছিল, সে সময় পাক সেনাদের দুইজন ওপি যারা গাছের উপর বসে দুরবীণ লাগিয়ে আমাদের অবস্থান খুঁজছিল, তাদের দেখে ফেলে এবং গুলি করে মেরে ফেলে।

 

৪র্থ বেঙ্গল-এর আলফা কোম্পানী মেজর সালেকের নেতৃত্বে এবং চার্লি কোম্পনী ক্যাপ্টেন গাফফারের নেতৃত্বে শালদানদী এবং মন্দভাগে পাকসেনাদের উপর বারবার আঘাত হেনে যাচ্ছিলো। শত্রুরা প্রতিদিন কিছু না কিছু হতাহত হচ্ছিলো। আমাদের এই দুই কোম্পানীর সেনা দল ৩ ইঞ্চি মর্টারের সহায়তায় শিবপুর, বাগরা, গৌরঙ্গলা প্রভৃতি জায়াগ হয়ে শত্রুঅবস্থানটি প্রায় তিন দিক থেকে ঘিরে রেখেছিল এবং প্রতিদিন আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছিলো। অবস্থা এরূপ সঙ্গীন হয়ে গিয়েছিল যে, পাকসেনাদের পক্ষে তাদের বাংকার থেকে মাথা তোলারও সুযোগ ছিলনা। গুলি এবং মর্টারের গোলার সাহায্যে আমাদের সৈনিকরা তাদের সে অবস্থানে থাকাকে সম্পূর্ণ বিপদজ্জনক করে তুলেছিল। এছাড়া কুটি এবং শালদানদীর রাস্তায় আমাদের এমবুশ পার্টি ২৪ ঘন্টা এমবুশ পেতে থাকত। এর ফলে রসদ এবং অস্ত্র সরবরাহ করা তাদের পক্ষে মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা রেলওয়ে লাইন ব্যবহারের বারবার চেষ্টা করেও বিফল হয়েছে। এরপর শালদানদী দিয়ে রসদ সরবরাহ করার চেষ্টা করে। সেখানেও তারা আমাদের দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এমতাবস্থায় তাদের মনোবল সত্যিই ভেঙ্গে গিয়েছিল।

 

জুন মাসের ১ তারিখে আমাদের চাপের মুখে টিকতে না পেরে তারা মন্দভাগ এবং শালদানদীর অবস্থানগুলি পরিত্যাগ করে নয়নপুর রেলওয়ে স্টেশনের নিকট তাদের নতুন ঘাঁটি স্থাপন করে। সম্মুখসমরে শালদানদী থেকে শত্রুসেনাকে জুন মাসের প্রথম দিকে পর্যুদস্ত করে পিছু হঁটিয়ে দেয়া আমাদের সৈনিকদের জন্য ছিল একটা বিরাট সাফল্য ও কৃতিত্ব। এতে আমার সেক্টরের সব সৈনিকদের মনোবল পুনরুদ্ধার হয়। মার্চ মাস এবং মে মাসের প্রথম দিকে যখন পাক বাহিনী অতর্কিতে বিপুল সৈন্য, কামান, বিমান বাহিনীর সহায়তায় আমাদের উপর আক্রমণ চালায় তখন আমাদের সৈনিকরা অতি সাহসিকতা ও বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে পাক সেনাদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি করে কিন্তু অবশেষে বেশীরভাগ সময়ে পাকবাহিনীর বিপুল শক্তি ও সরঞ্জামের সামনে বাধ্য হয়ে পিছু হটতে হয় এবং সবেক্ষেত্রেই আমরা প্রতিরক্ষা অবস্থানে থেকে যুদ্ধ করেছি এবং পাকবাহিনী আমাদের উপর বারবার আক্রমণ চালিয়েছে। শালদানদী এবং মন্দভাগে প্রথম এক মাস আমরা পাকবাহিনীর উপর প্রতি আক্রমণ চালিয়ে তাদের শক্তিশালী অবস্থান থেকে বিতাড়িত করি। শত্রুসেনা চলে যাবার পর ক্যাপ্টেন গাফফারকে মন্দভাগে প্রধান অবস্থান গড়ে তোলার এবং শালদানদীতে তাঁর অগ্রবর্তী ঘাঁটি করার নির্দেশ দিই।

 

যখন আমি যুদ্ধ চালাচ্ছিলাম এবং যুদ্ধ আস্তে আস্তে যখন তীব্রতর হচ্ছিল, তখন আমার সেনাদলে আহত এবং নিহতের সংখ্যাও বেড়ে চলছিল। সে সময়ে আমার সৈনিক এবং গণবাহিনীর জন্য চিকিৎসার বন্দোবস্ত ছিলনা, শুধু আমার সঙ্গে সেনাবাহিনীর ১ জন ডাক্তার ক্যাপ্টেন আখতার ছিলেন। অফিসারের স্বল্পতায় তাঁকেও আমি একটা কোম্পানীর কমান্ডার বানিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়োগ করেছিলাম এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ক্যাপ্টেন আখতার একজন ডাক্তার হয়েও একজন যোদ্ধা হিসেবে বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। আমার আহতের সংখ্যা যখন বেশ বেড়ে যায় এবং অনেক সময় দ্রুত চিকিৎসার অভাবে অনেক সৈনিক বা গণবাহিনীর ছেলেরা রক্তক্ষয় হয়ে মারা যেতে থাকে তখন আমি বুঝতে পারলাম যে আমার সেক্টরেই চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য ক্যাপ্টেন আখতারকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ডেকে পাঠাই এবং অতি সত্বর আমার হেডকোয়ার্টারের নিকট একটি চিকিৎসালয় স্থাপন করার নির্দেশ দিই। ঢাকা থেকে কিছু সংখ্যক ছেলে-মেয়ে আমার সেক্টরে এসে আশ্রয় নেয়। এদের মধ্যে দুই একজন চিকিৎসা শিক্ষানবিসও ছিল। তারাও আমাকে ১টি হাসপাতাল গড়ার জন্য অনুরোধ জানায়। এসব ছেলেমেয়ে নিয়ে ক্যাপ্টেন আখতার কয়েকটি তাঁবুতে মতিনগরে আমার হেডকোয়ার্টারের নিকট মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রথম বাংলাদেশ হাসপাতালের ভিত্তি স্থাপন করেন। একটা সুন্দর বাগানের ভিতর উঁচু এবং শান্ত পরিবেশে এ হাসপাতালটি অবস্থিত ছিল। প্রথমে হাসপাতালে ব্যবহারের জন্য আমাদের কাছে ঔষধপত্র বা অস্ত্রোপাচারের সরঞ্জাম কিছুই ছিলনা। কিন্তু তবুও আমাদের এই নবীন দলটি ক্যাপ্টেন আখতারের নেতৃত্বে সমস্ত বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও ধীরে ধীরে হাসপাতালটি গড়ে তুলতে থাকে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বেগম সুফিয়া কামালের দুই মেয়ে টুলু এবং লুলু, মেডিক্যাল ছাত্রী ডালিয়া, আসমা, রেশমা, ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম, সবিতা, শামসুদ্দিন প্রমুখ। এসব ছেলেমেয়েদের দল নিজেদের সুখ ও আরাম ত্যাগ করে দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করে যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈনিকদের এবং গণবাহিনীর ছেলেদের সেবাশুশ্রুষা ও চিকিৎসা করে যাচ্ছিলো। এরা রেডক্রস ও বন্ধুরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে অনেক কষ্টে ওষুধপত্র যোগাড় করতো। মাঝে মাঝে আমি যতটুকু টাকা-পয়সা সেক্টর ফান্ড থেকে দিতে পারতাম তা দিয়ে ওষুধপত্র যোগাড় করত। জুন মাসের দিকে লণ্ডন থেকে ডাঃ মবিন (প্রবাসী বাঙালি) আমাদের এই হাসপাতালের কথা শোনে এখানে এসে যোগ দেন। এর কিছুদিন পর ডাঃ মবিনের আরেক বন্ধু ডাঃ জাফরুল্লাহ সংবাদ পেয়ে লণ্ডন থেকে এসে যোগ দেন। এরা দুজনেই লণ্ডনে এফআরসিএস পড়ছিলেন। দেশে মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ শোনে তারাও এসে অংশ নেয়ার জন্য আগ্রহী ছিলেন। তারা তাদের লণ্ডনের সব সুখ ও আরাম ত্যাগ করে আমাদের এ হাসপাতালের নাম শোনে ছুটে এসেছিলেন মাতৃভূমিকে শত্রুদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য। তাদের সঙ্গে আমার বিস্তারিত আলাপ হয় এবং আমরা এই হাসপাতালটি গড়ে তোলার জন্য একটি পরিকল্পনা নিই। ডাঃ মবিন ও ডাঃ জাফরুল্লাহ আমাকে আশ্বাস দেন লণ্ডনে অবস্থিত প্রবাসী বাঙালীরা তাদের মাতৃভূমির জন্য সবকিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত আছে এবং আমরা যদি বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশনের কাছে আহ্বান জানাই তবে এ হাসপাতালে সরঞ্জামের ব্যবস্থা তারা করতে পারবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমি ডাঃ মবিন ও ডাঃ জাফরুল্লাহকে বিস্তারিত সরঞ্জামের তালিকা বানানোর নির্দেশ দেই। আর সেই সঙ্গে ক্যাপ্টেন আখতারকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আর একটু পিছে বিশ্রামগঞ্জে সুন্দর জায়গায় পাহাড়ের উপর অস্থায়ী হাসপাতাল নির্মাণের জন্য পরিকল্পনা নিতে নির্দেশ দেই। আমার সঙ্গে এব্যাপারে আমাদের প্রধান সেনাপতি এম এ জি ওসমানীর (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল) সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়। তাকে আমি আমার সেনাদল ও ছেলেদের চিকিৎসার শোচনীয় অবস্থার কথা জানাই। তিনি আমাকে হাসপাতাল তৈরীর পরিকল্পনায় উৎসাহ দেন এবং সঙ্গে সঙ্গে ত্রিশ হাজার টাকা মঞ্জুর দেন। একমাসের মধ্যে বাঁশ, কাঠ ও ছন দিয়ে আমরা বিশ্রামগঞ্জে ২০০ বেডের হাসপাতাল তৈরী করে ফেলি। ডাঃ জাফরুল্লাহ লণ্ডনে চলে যান হাসপাতালের জন্য ওষুধপত্র ও অস্ত্রোপাচারের সরঞ্জামাদির ব্যবস্থা করতে। আমাদের হাসপাতাল যখন তৈরী হচ্ছিল তখন আহতের সংখ্যাও দিন দিন বেড়েই যাচ্ছিল। ডাক্তারের যথেষ্ট অভাব ছিল। এছাড়াও ওষুধের অভাব ছিল আমাদের প্রকট। কিন্তু তবুও এসব অসুবিধার মধ্যেও আমাদের ছোট হাসপাতালটি আস্তে আস্তে পূর্ণাঙ্গ হয়ে উঠছিল। যদিও এগুলি বাঁশ এবং ছনের ঘর ছিল তবুও উৎসর্গিত ছেলেমেয়েদের প্রছেষ্টায় সমস্ত এলাকাটা শান্তিদায়ক হয়ে উঠছিল। সকালে উঠেই সমস্ত হাসপাতালের বিভিন্ন কাঁচা ওয়ার্ডগুলো তারা নিজ হাতে লেপতো এবং পরিষ্কার করতো। হাসপাতালের রোগীর কাপড়-ধোয়া থেকে শুরু করে তাদের রান্নাবান্না, সেবাশুশ্রুষা সব কিছু এরাই করতো। এদের সঙ্গে আরো ২০ জনের মতো ছেলেমেয়ে এসে যোগ দেয়। কিছুদিন পর ডাঃ জাফরুল্লাহ ও ডাঃ মবিনের প্রচেষ্টায় এবং লণ্ডন প্রবাসী বাঙালি ডাক্তারদের সহায়তায় আমরা এ হাসপাতালটির জন্য অস্ত্রোপাচারের সরঞ্জামাদিসহ ওষুধপত্র পেয়ে যাই। ৯ মাসের যুদ্ধে এ হাসপাতালটি কয়েক হাজার আহতকে চিকিৎসা ও অস্ত্রোপাচার করতে সক্ষম হয়। এ হাসপাতালটির আর একটি অবদান ছিল যে এটি স্থাপনের পর আমার সেনাবাহিনীর ছেলেদের ও গণবাহিনীর মনোবল আরো বেড়ে যায়। তারা বুঝতে পারে যদি তারা যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হয় তবে চিকিৎসার অভাবে মারা যাবে না। যুদ্ধকালীন সময়ে প্রধান সেনাপতি কর্ণেল ওসমানী হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন এবং এটাকে আরো উন্নত করার জন্য উৎসাহ দেন। সেপ্টেম্বর মাসে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দিন আহমেদ হাসপাতালটি পরিদর্শন করেন এবং এর ভূয়সী প্রশংসা করেন।

 

২৯শে মে রাতে আমাদের একটা পেট্রোল পার্টি কুমিল্লার বাটপাড়ায় এমবুশ পেতে বসে থাকে। শত্রুদের ২টা গাড়ী ২টার সময় এমবুশ পেতে বসে থাকে। এমবুশ পার্টি সাফল্যের সাথে ২টি গাড়ী ধ্বংস করে দেয় এবং সেই সঙ্গে ৪ জনকে নিহত করে। শত্রুদের পিছনের গাড়ীটি ফাঁদে পড়ার আগেই পালিয়ে যায়। ২৯শে মে রাত ৯টায় ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিনের নেতৃত্বে ২টি সেকশন করবার পশ্চিমে টি. আলীর বাড়িতে শত্রুদের অবস্থানের উপর অকস্মাৎ অনুপ্রবেশ করে এবং আক্রমণ চালায়। সঙ্গে সঙ্গে মর্টারের সাহায্যে আড়াইবাড়ি শত্রুঅবস্থানের উপর গোলা চালায়। এ আক্রমণে শত্রুদের ১টা ব্যাংকার ধ্বংস হয়ে যায় এবং তিনজন লোক নিহত ও ২ জন শত্রুসেনা আহত হয়। এরপর আমাদের সৈন্যরা আক্রমণ শেষ করে নিজ অবস্থানে চলে আসে।

 

৩১ মে রাত তিনটায় একটা প্লাটুন লে. মাহবুবের নেতৃত্বে কুমিল্লার দক্ষিণে জহমোহনপুর নামক স্থানে শত্রু ঘাঁটির উপর অকস্মাৎ আক্রমণ চালায় এবং শত্রুসেনাদের ১২ জন হতাহত হয়। পাকসেনারা যখন কসবার দিকে তাদের চাপ বাড়াতে থাকে, আমি ক্যাডেট হুমায়ুন কবিরকে একটা কোম্পানীসহ কসবার উত্তরে লাটুমুরায় অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দিই।

 

৩০শে মে সন্ধ্যা ৭টায় আমাদের ১টি ছোট গেরিলা দল ইকবালের (বাচ্চু) নেতৃত্বে বিবিরবাজারে শত্রুসেনাদের অবস্থানে আঘাত হানার জন্য পাঠান হয়্ পাক সেনারা তখন তাদের অবস্থানের উপর বসে তাদের সান্ধ্যভোজনে ব্যস্ত ছিল এবং এ সময়টি সম্বন্ধে আমাদের স্থানীয় লোকের দ্বারা খবর আগে থেকেই সংগ্রহ করা ছিল। পাক সেনারা যখন খাওয়ায় ব্যস্ত ছিল, সে সময় আমাদের গেরিলা দলটি তাদের উপর হঠাৎ গোমতী বাঁধের উপর থেকে গোলাবর্ষণ করে। এতে শত্রুদের ১০ জন হতাহত হয়। ঐদিন সাড়ে ৬টার সময় আমাদের মর্টার প্লাটুন সিঙ্গারবিল শত্রু অবস্থানের উপর উপর গোলাবর্ষণ করে। এর ফলে শত্রুদের ৬ জন নিহত এবং ৭ জন আহত হয়। ২৯শে মে চৌদ্দগ্রাম বাবুর্চি রোডে হরিসর্দার বাজারের নিকট রাস্তার ব্রিজ সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দেয়া হয়।

 

২৯শে মে বিকাল ৪টায় ৪র্থ বেঙ্গল-এর পাইওনিয়ার পার্টিকে লাকসাম-চাঁদপুর রেলওয়ে লাইনে মাইন পুঁতে রেল গাড়ী লাইনচ্যুত করার জন্য পাঠানো হয়। এ দলটি মাইন পুঁতে লাকসাম এবং নোয়াখালীর মাঝে তিনটি রেলওয়ে বগী সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত করে দেয়। ফেরার পথে পাইওনিয়ার পার্টির ছোট দলটি চৌদ্দগ্রাম-চট্টগ্রাম সড়কের উপর একটি সদ্য মেরামত করা ব্রিজের উপর মাইন পুঁতে দেয়। রাত ৮টায় একটি জিপ ৫ জন পাকসেনাসহ ফেনীর দিক থেকে আসে। জিপটি যখন ব্রিজের উপর পৌঁছে তখন মাইন বিস্ফোরিত হওয়াতে ব্রিজটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে যায়। এর ফলে ১ জন অফিসারসহ তিনজন পাকসেনা নিহত এবং অন্য ২ জন গুরুতরভাবে আহত হয়। ঐ দিন সন্ধ্যায় তিনজন গেরিলাকে হ্যাণ্ড গ্রেনেডসহ চৌদ্দগ্রাম থানায় পাঠান হয়। থানার সন্নিকটে দিঘির নিকট শত্রুদের একটি ব্যাংকার ছিল। গেরিলা দলটি গ্রেনেড ছুড়ে ব্যাংকারটি ধ্বংস করে দেয়। ফলে ৩ জন শত্রুসেনা নিহত হয় এবং কিছু স্থানীয় লোকও আহত হয়। ৩০শে মে চৌদ্দগ্রামের আধ মাইল উত্তরে চৌদ্দগ্রাম মিয়ারবাজার রোডের উপর ৪র্থ বেঙ্গল-এর বি কোম্পানীর একটি প্লাটুন হঠাৎ শত্রুদের ২৭ জনের একটি দলকে দুরে থেকে আসতে দেখতে পেয়ে তাড়াতাড়ি এমবুশ পাতে। শত্রুরা যদিও এ অতর্কিত আক্রমণে হকচকিত হয়ে যায় কিন্তু তারা ত্বরিত গতিতে রাস্তার পশ্চিম পাশে সরে পড়ে। এমবুশের ফলে শুধু তিনজন শত্রুসেনা নিহত হয়। আমাদের গেরিলারা লাকসাম বাংগোড়া কাঁচা রাস্তার উপর ফেলনা গ্রামের নিকট মাইন পুতে রাখে। শত্রুদের একটি তিন টনের গাড়ী এ মাইনের সাথে সংঘর্ষে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে যায়। ২৯শে মে ৪র্থ বেঙ্গল-এর ব্রাভো কোম্পানীর একটা প্লাটুন ২টি ৩ ইঞ্চি মর্টারসহ সন্ধ্যায় চৌদ্দগ্রাম থানার উপর মর্টারের সাহায্যে অতর্কিত আক্রমণ চালায়। অতর্কিত মর্টারের গোলার আঘাতে এবং হালকা মেশিনগানের আঘাতে তাদের যথেষ্ট হতাহত হয়।

 

জুন মাসের ৪ তারিখে রাত দুটোর সময় ৪র্থ বেঙ্গল-এর ‘এ’ কোম্পানীর ২টা প্লাটুন মর্টার নিয়ে শত্রুদের অবস্থানে গোপন পথে প্রবেশ করে শালদা নদীর দক্ষিণে বাগড়া বাজার নামক স্থানে অবস্থান নেয়। ভোর বেলায় পাকসেনারা যখন তাদের ব্যাংকারের উপর অসতর্কভাবে ঘোরাফেরা করছিল ঠিক সে সময় আমাদের সৈনিকরা তাদের উপর অতর্কিত মর্টার এবং মেশিনগানের সাহায্যে আক্রমণ চালায়। পাকসেনারা এ অতর্কিত আক্রমণে সম্পূর্ণ হতচকিত হয়ে যায়। আধঘন্টা পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে কোন পাল্টা জবাব আসেনা। এ আক্রমণের ফলে শত্রুদের প্রায় ১৭ জন নিহত ও ৫ জন আহত হয়। আমাদের একজন সৈন্য বুকে গুলি লেগে গুরুতরভাবে আহত হয়। এ আক্রমণের তিন ঘন্টা পরে শত্রুরা যখন ভেবেছিল আমাদের সৈন্যরা অবস্থান পরিত্যাগ করেছে এবং তাদের আহতদের পিছনে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করছিল, ঠিক সে সময় আমাদের সৈন্যরা আবার তাদের উপর দ্বিতীয় দফা আক্রমণ চালায়। এতে শত্রুদের আবারও ৫ জন নিহত হয়। এরপর আমাদের পার্টি অবস্থান ত্যাগ করে চলে আসে। ঐ দিনই সকাল ৭টার সময় আমার আর একটা পার্টি শত্রুদের রাজাপুর অবস্থানের উপর অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে ৬ জন শত্রুকে নিহত করে এবং তিনজনকে আহত করে। আমাদের আরেকটি দল রাত ১টার সময় কুমিল্লার দক্ষিণে সুয়াগাজীতে চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কের ১টা সেতু উড়িয়ে দেয় এবং বাগমারার রেলওয়ে সেতু উড়িয়ে দেয়।

 

৬ই জুন একটি ডেমোলিশন পার্টিকে লাকসামের দক্ষিণে পাঠানো হয়। এই দলটি ‘খিলাতে’ লাকসাম নোয়াখালী মহাসড়কের উপর ট্যাংকবিধ্বংসী মাইন পুতে রাখে। সকাল ৫টায় কুমিল্লা থেকে শত্রুর ২টি জীপ ও একটি ট্রাক নোয়াখালী যাবার পথে মাইনের আঘাতে ধ্বংস হয়ে যায় এবং সে সঙ্গে ৪জন পাক অফিসার এবং ৭ জন সৈন্য নিহত হয়। পাক সেনাদের ২টি কোম্পানী কুমিল্লা থেকে শালদানদীর উত্তরে আসে এবং রেলওয়ে লাইনের সাথে সাথে নয়নপুর রেলওয়ে স্টেশনের দিকে অগ্রসর হবার চেষ্টা করে। ৪র্থ বেঙ্গল-এর ‘এ’ কোম্পানী শত্রুদের অগ্রগতিকে বাধা দেয় সকাল ৬টার সময় শালদানদীর পূর্ব দিক থেকে। শত্রুরা বাধা পাবার ফলে পিছু হটতে বাধ্য হয়। আমাদের গুলির মুখে পাক সেনাদের ২৫ জন লোক হতাহত হয়্ সকাল ৬টায় পাক সেনাদের আর একটি দল কুমিল্লা থেকে একটি ট্রেনে করে নয়নপুর এবং শালদানদীর দিকে আসছিল। এ ট্রেনটি নয়নপুরের দক্ষিণে আমাদের অবস্থানরত সৈন্যদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়। আমাদের গোলাগুলির সামনে শত্রুরা টিকতে না পেরে যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতির পর রাজাপুরে পশ্চাদপরণ করে। এর ৪/৫ ঘন্টা পরে শত্রুরা কামানের গোলার সহায়তায় আবার নয়নপুর পর্যন্ত অগ্রসর হতে সক্ষম হয়। কিন্তু নয়নপুর স্টেশনে যখন তারা ব্যাংকার তৈরীতে ব্যস্ত সে সময় আমাদের মর্টার তাদের উপর ভীষণ গোলাগুলি চালায় এবং শত্রুদের যথেষ্ট ক্ষতি করে। শত্রুরা কিছু পিছু হটে নয়নপুর গ্রামের ভিতর অবস্থান নিয়ে তাদের ব্যাংকার তৈরী করতে শুরু করে। ঐদিনই শত্রুদের একটি পেট্রোল পার্টি কসবার দিকে অগ্রসর হয়। আমাদের ৪র্থ বেঙ্গল-এর ডি কোম্পানীর একটা প্লাটুন তাদেরকে অতর্কিত এমবুশ করে। পাকসেনারা এ এমবুশ-এর ফলে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং তাদের অন্ততপক্ষে ২০ জন লোক হতাহত হয়। শত্রুদের দলটি আমাদের এমবুশ পার্টির তাড়া খেয়ে তাদের অবস্থান আড়াইবাড়ির দিকে পালিয়ে যায়। আমাদের একটি দল কুমিল্লার দক্ষিণে ধ্যানপুর বিওপির নিকট পাকসেনাদের জন্য এমবুশ পেতে থাকে। সকাল ৯টায় পাকসেনারা দালালদের মারফতে এ খবর পায়। কুমিল্লা থেকে পাকসেনাদের একজন অফিসারসহ ১টা প্লাটুন গ্রামের ভিতর দিয়ে এসে আমাদের এমবুশ পার্টিকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করে। এমবুশ পার্টি তৎক্ষনাৎ কিছু পিছু হটে গিয়ে শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এ যুদ্ধ ঘন্টাখানেক স্থায়ী হয়। ইতোমধ্যে আমাদের ধানপুরের কোম্পানী খবর পেয়ে লে. মাহবুব ও লে. কবিরের নেতৃত্বে তৎক্ষণাৎ এমবুশ পার্টিকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসে এবং তারা পাকসেনাদের দলটিকে ঘিরে ফেলে। পাকসেনারা দুই দিক থেকে আক্রান্ত হয়ে গ্রামের ভিতর লুকিয়ে পড়ে এবং দালালদের সাহায্যে এ ঘেরাও থেকে বেরিয়ে আসতে সমর্থ হয়। এ সংঘর্ষে পাকসেনাদের ৫ জন সৈন্য নিহত হয়।

 

ঐ দিনই বিকাল তিনটায় পচুয়াতে আমাদের আর একটা এমবুশ পার্টির ফাঁদে শত্রুদের একটি দলের ১০ জন হতাহত হয়। ৪ ও ৫ জুন রাতে লাকসাম চাঁদপুর রেললাইনের মাঝে মধু রোডস স্টেশনের নিকেট জমজমা রেলওয়ে সেতুটি সুবেদার পাটওয়ারীর একটি দল উড়িয়ে দেয়। ঐদিনই রাতে আর একটি দল চাঁদপুর কুমিল্লা সড়কের মহামায়া বাজারের নিকটে একটি পুল ধ্বংস করে দেয়। এর দুই দিন পরে চাঁদপুরের বৈদ্যুতিক ট্রান্সফর্মারটি ধ্বংস করে দেয়া হয়। এর ফলে সমস্ত চাঁদপুরের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। কলকারখানাগুলিও বন্ধ হয়ে যায়। পরে শত্রুরা এসে পাশের গ্রামগুলি জ্বালিয়ে দেয় এবং লুটতরাজ ও মেয়েদের উপর পাশবিক অত্যাচার করে।

 

আমাদের ৪র্থ বেঙ্গল ডি কোম্পানীর একটা প্লাটুন ১১ই জুন সকাল ৬টায় কসবার উত্তরে চার্নল নামক জায়গায় এমবুশ পেতে রাখে। শত্রুদের একটি কোম্পানী দুপুর ১২টার সময় এমবুশের মধ্যে পড়ে যায়। আমাদের গুলিতে তাদের ১২ জন সৈন্য নিহত হয়। এতে আমাদের একজন আহত হয় এবং পরে মারা যায়। পাকসেনারা পর্যুদস্ত হয়ে ঐ জায়গা থেকে ইয়াকুবপুরের দিকে পলায়ন করে। পলায়নের পর শত্রুদেরকে আমাদের আর একটি এমবুশ পার্টি দেখে ফেলে এবং তারাও ইয়াকুবপুরের নিকট শত্রুদের আক্রমণ করার জন্য এমবুশ পাতে। শত্রুরা এ এমবুশের ফাঁদে পড়ে যায় এবং সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত হয়। এ এমবুশে শত্রুদের ৮জন লোক নিহত এবং ১৩ জন আহত হয়। এ দুটি এমবুশে অনেক অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ আমাদের হস্তগত হয় এবং শত্রুরা এলাকা থেকে চলে যায়।

 

এ সময়ে শালদানদীর দক্ষিণে রেলওয়ে ব্রিজ, কুটির রাস্তায় বাসারা গ্রামের সেতু, মন্দভাগ গ্রামের সেতু সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দেয়া হয়।

 

আমাদের হেড কোয়ার্টারে এ খবর আসে যে পাক সেনারা তলুয়াপাড়া ফেরী ঘাট তাদের যাতায়াতের জন্য সাধারণত: ব্যবহার করে থাকে। এ সংবাদ পেয়ে আমাদের একটি প্লাটুনকে ৯ই জুন রাত্রে তলুয়াপাড়াতে পাঠানো হয়। এ প্লাটুনটি তলুয়াপাড়া ফেরী ঘাটের নিকট শত্রুদের জন্য এমবুশ পাতে। ১০ই জুন রাত ১১টার সময় শত্রুদের একটি দল সেই ফেরীঘাটে আসে এবং নৌকাযোগে পার হতে থাকে। শত্রুরা যখন নদীর মাঝখানে, এমবুশ দলটি সে সময় তাদের উপর গুলি চালাতে শুরু করে। এর ফলে নৌকাটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। পাকসেনাদের ২০ জন লোক হতাহত হয়।

 

আমাদের একটি প্লাটুন লে. মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে ১০ই জুন রাত্রে মিয়াবাজারের দক্ষিণে রাজারমার দিঘী ও জগমোহনপুর কাচারীর শত্রু অবস্থানের উপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। পাক সেনারা এই সাহসী আক্রমণে হকচকিয়ে যায়। আমাদের সৈন্যরা পাক সেনাদের ব্যাংকারে গ্রেনেড ছুড়ে ৮ জন পাকসেনাকে নিহত ও ৫ জনকে আহত করে। পাকসেনারা বাধ্য হয়ে তাদের অবস্থান ত্যাগ করে। এরপর আমাদের সৈন্যরা অবস্থানটি দখল করে ব্যাংকারগুলি ধ্বংস করে দেয় এবং শত্রুদের পরিত্যক্ত অস্ত্রশস্ত্র হস্তগত করে।

 

আমাদের ৩টি গেরিলা দল কুমিল্লা ও লাকসামে পাঠানো হয়। ১১ই জুন কুমিল্লাতে গেরিলা দলটি শত্রুদের বিভিন্ন অবস্থানের উপর দশটি গ্রেনেড ছোড়ে। এতে পাকসেনাদের যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং সমস্ত কুমিল্লা শহর ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। ঐ দিনই চারজন গেরিলার ডেমোলিশন পার্টি জাঙ্গালিয়ার নিকট মাইন পুঁতে একটি ডিজেল ইঞ্জিন লাইনচ্যুত করে।

 

লাকসামে যে গেরিলা দলটি পাঠানো হয়েছিল তার নেতৃত্বে ছিলেন আব্দুল মান্নান। পাকসেনাদের একটি গাড়ীর উপর গ্রেনেড ছোড়ে এবং এতে ৫ জন নিহত হয়। এ দলটি লালমাইয়ের নিকট পাকসেনারা যে ঘরে থাকতো তার ভিতর ২টি গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতেও পাকসেনাদের যথেষ্ট হতাহত হয়। এর ফলে পাকসেনারা লাকসামে ৭২ ঘন্টার জন্য সান্ধ্য আইন জারী করে করে এবং অনেক নির্দোষ লোকের উপর অত্যাচার চালায়। আর একটি দল লাকসামে পাকসেনাদের উপর গ্রেনেড ছোড়ে। এর ফলে কিছু লোক আহত হয়। আমাদের দুটি এমবুশ পার্টি ফুলতলি এবং মিয়ার বাজারের নিকট ঐ দিনই এমবুশ পেতে রাখে পাক সেনাদের দুটি গাড়ী রাত সাড়ে চারটার সময় ফুলতলিতে এমবুশের মধ্যে পড়ে যায়। এমবুশ পার্টি একটা গাড়ীকে ধ্বংস করে দেয় এবং একটা গাড়ীর ক্ষতিসাধন করে। শেষের গাড়ীটির ভিতর এমবুশ পার্টি ২টি গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে শত্রুদের ৬ জন লোক নিহত হয়। মিয়ার বাজারের এমবুশেও পাকসেনাদের ৫ জন লোক নিহত হয় এবং আমাদের এমবুশ পার্টি একটি মর্টার দখল করে নেয়।

 

আমাদের কাছে সংবাদ আসে যে, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক টিম জুন মাসে ঢাকাতে আসছে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্বন্ধে সরেজমিনে ঘটনাবলী অবগত হওয়ার জন্য। ইতোমধ্যে পাকিস্থানের প্রচারযন্ত্র সমস্ত আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বুঝাতে চেষ্টা করছিল যে, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক। এ খবর পাওয়া মাত্র আমি ওয়ার্ল্ড ব্যাংক টিমটির অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করি। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক যদি পাকিস্থানকে আর্থিক সাহায্য দেয়, তাহলে সেই আর্থিক সাহায্যে পাকিস্থানের সমরাস্ত্র কেনার ও যুদ্ধ পরিচালনার পক্ষে যথেষ্ট সুবিধা হবে। যে করেই হোক ওয়ার্ল্ড ব্যাংক টিমকে বুঝিয়ে দিতে হবে যে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি মোটেই স্বাভাবিক নয়। বরং বাংলাদেশের অধিকাংশ স্থানই পাকবাহিনীর আয়ত্তাধীনে নেই।

 

এ পরিপ্রেক্ষিতে আমি গেরিলার একটি দলকে ঢাকা শহরে বিভিন্ন জায়গায় বিস্ফোরণ ঘটানো এবং পাকিস্থানীদের নিহত করার জন্য পাঠিয়ে দেই্। এই দলটি ৪টা জুন ঢাকায় গোপন পথে রওনা হয়ে যায় এবং পরদিন সকালে পৌঁছে যায়। এই দলেরই ২ জন ছেলে ৮ জুন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার সময় জিন্নাহ এভিনিউর কলেজ সু স্টোরের সামনে গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায়। আর একটি গ্রেনেড ছুঁড়ে পুরাণা পল্টনে রাত আটটায়। ঐদিনই আরেকটি ছোট দল ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ভিতর একজন পাকিস্থানী অফিসারের বাড়ীর ভিতরে দুপুর দুটোর সময় গ্রেনেড ছোড়ে, এতে অফিসারের গাড়ীটির ক্ষতি সাধিত হয় এবং একজন লোক আহত হয। পরের দিন সন্ধ্যায় মর্নিং নিউজ অফিসের ভিতর গ্রেনেড ছোড়া হয়। এতে কয়েকজন পাকিস্থানী দালাল নিহত হয়। ইতোমধ্যে দলটি খবরাখবর নেয় যে, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক টিম হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থান করছে। এ খবর পাবার পর ২ জন গেরিলা ৯ জুন সন্ধ্যা ৮-১৫ মিনিটে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে প্রবেশ করে এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক টিম-এর হোটেলে ফেরার প্রতিক্ষায় থাকে। তারা যখন তাদের গাড়ীতে করে আসেন এবং গাড়ী নীচে রেখে হোটেলের ভেতর প্রবেশ করেন সেসময় গেরিলা গলটি গাড়ী লক্ষ্য করে ৩টি গ্রেনেড ছোড়ে। এর ফলে গাড়ীটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায় এবং নিকটবর্তী একজন পাঞ্জাবী সেনাও নিহত হয়।

 

এ সমস্ত ঘটনাবলীতে বিশ্বব্যাংক কর্মকর্তাগণ অতি সহজেই বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হন। ইন্টারকন্টিনেন্টালের বিস্ফোরণের সময় তারা ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী। তারা ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন পূর্ব পাকিস্থানের (বাংলাদেশের) অবস্থা স্বাভাবিক নয়। এই ঘটনার পর বিশ্বব্যাংক টিম ফিরে গিয়ে তাদের রিপোর্টে বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্বন্ধে সঠিক ঘটনাবলী তুলে ধরেন। তারা তাদের রিপোর্টে পাকিস্থানকে আর্থিক সাহায্য না দেওয়ার সুপারিশ করেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এটা ছিল পাকিস্থানের পক্ষে এক বিরাট পরাজয়।

 

রাজাপুর রেলওয়ে স্টেশনের নিকট পাচড়া গ্রামে শত্রুদের একটি অবস্থান ছিল। এই অবস্থানটি শত্রুদের নয়নপুর এবং রাজাপুর রেলওয়ে স্টেশনের পিছন থেকে সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত হত। মতিনগর থেকে একটি রেইডিং পার্টিকে পাঁচড়া গ্রামে শত্রু অবস্থানের উপর উপর অনুপ্রবেশ করে আক্রমণ করার নির্দেশ দেয়। ১৩ই জুন রাত নটার সময় এ দলটি গ্রামের গোপন পথে শত্রু অবস্থানের ভিতর অনুপ্রবেশ করে এবং অতর্কিত আক্রমণ চালায়। এ অতর্কিত আক্রমণে শত্রুদের মধ্যে সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। আমাদের দলটি বেশ কিছু পাকসেনাকে হতাহত করে শত্রু অবস্থান থেকে সরে পড়ে। কিন্তু এরপরেও শত্রুদের মধ্যে রাতের অন্ধকারে প্রায় ২ ঘন্টা গোলাগুলি চলতে থাকে। পাকসেনাদের অয়্যারলেস ম্যাসেজ আমাদের অয়্যারলেসে ধরা পড়ে। এতে শোনা যায় পাকিস্থান-জিন্দাবাদ, আজিজ ভাট্টি-জিন্দাবাদ, ১৭তম পাঞ্জাব-জিন্দাবাদ ইত্যাদি। গোলাগুলির প্রচণ্ড আওয়াজ তখনও চলতে থাকে। আমরা বুঝতে পারি যে, আমাদের দলটি সরে আসার পরও পাক বাহিনী নিজেদের মধ্যে কয়েক ঘন্টা গোলাগুলি করে বীরত্বের পরিচয় দিচ্ছে। এ সংঘর্ষে পাকসেনাদের ১১ জন নিহত ও ১২ জন আহত হয়। বেশ কিছুসংখ্যাক সৈন্য তাদের নিজেদের গুলিতেই হতাহত হয়।

 

পাকিস্থানীরা সীমান্তের নিকটবর্তী থানাগুলোতে পশ্চিম পাকিস্থানী পুলিশ এবং মিলিশিয়া নিয়োগ করতে শুরু করে। এসব থানাগুলিতে তারা ব্যাংকার তৈরী করে অবস্থানকে শক্তিশালী করতে থাকে। কুমিল্লার উত্তরে সবগুলো থানাতেই তারা এভাবে শক্তিশালী করে। আমি এসব থানাগুলোকে আক্রমণ করে পাকিস্থানীদের শাসনযন্ত্রকে অচল করে দেয়ার একটা পরিকল্পনা করি।

 

আমার অবস্থানের নিকটবর্তী বুড়িচং থানা আমার জন্য একটা বাধার কারণ হয়ে দাড়িয়ে ছিল। কেননা বুড়িচংয়ের ভিতর দিয়েই আমার গেরিলারা গোপন পথে ঢাকা, কুমিল্লা এবং ফরিদপুর যাতায়াত করতো। এই থানাটির অবস্থানের গোপন পথগুলো মোটেই নিরাপদ ছিলনা। পশ্চিম পাকিস্থানী পুলিশরা পাক সেনাদের খবরাখবর পাঠাত। আমি বুড়িচং থানা আক্রমণ করার জন্য ১৬ জনের একটি দলকে পাঠাই। ১৪ই জুন রাত ১টায় এই দলটি অতর্কিত বুড়িচং থানার উপর আক্রমণ চালায়। থানায় প্রহরারত ইপকাফ এবং পুলিশ যথেষ্ট বাধা দেয়। কিন্তু অবশেষে আমাদের রেইডিং পার্টির হাতে তারা পরাস্ত হয়। এই সংঘর্ষে শত্রুদের ৮ জন নিহত হয়। আমাদের ১ জন লোক গুরুতরভাবে আহত এবং ১ জন নিখোঁজ হয়। এর ফলে বুড়িচং থানা শত্রুমুক্ত হয় এবং ঢাকা, কুমিল্লা যাবার গোপন পথ নিরাপদ হয়।

 

ঢাকাতে ৪ঠা জুন যে দলটিকে পাঠানো হয়েছিল সেই দলটি তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যেতে থাকে যাতে স্বাভাবিক পরিবেশ পাকিস্থানীরা ফিরিয়ে আনতে না পারে। ঢাকার প্রশাসন ব্যবস্থা যাতে পাকিস্থানীদের সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে না আসে তার জন্য এই গেরিলা দল তৎপর ছিল। দলটি ১০ই জুন দুপুর ২টার সময় নিউ মার্কেটের প্রধান চত্বরে তিনটি গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায়। এর ফলে সমস্ত লোকজন নিউ মার্কেট থেকে পালিয়ে যায় এবং দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। এর পরদিন বিকাল ৪টায় যখন অফিস শেষ হচ্ছিলো ঠিক সে সময়য় ওয়াপদা বিল্ডিং-এর সামনে ২টি গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায়। এর ফলে ওয়াপদা ভবনের কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায়।

 

এদিকে নয়নপুর রেল স্টেশনের নিকট গোডাউনের ভিতর শত্রুদের কিছুসংখ্যক সৈন্য তাদের ঘাটি গড়ে তুলেছিল। এই সংবাদ ৪র্থ বেঙ্গলের এ কোম্পানী জানতে পারে। মেজর সালেক একটি প্লাটুনের সঙ্গে আর আর রাইফেল ও মর্টার দিয়ে এ ঘাটিটি আক্রমণের জন্য পাঠায়। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় এ দলটি শত্রুদের অবস্থানের দক্ষিণ দিক দিয়ে পিছনে অনুপ্রবেশ করে এবং অতর্কিতে ঐ গোডাউনটির উপর আক্রমণ চালায়। কয়েকটি আরআর এবং মর্টারের গোলা গোডাউনটির ভিতরে পড়ে বিস্ফোরণ ঘটায় এবং গোডাউনটির যথেষ্ট ক্ষতিসাধন করে। ঐ দিন রাতেই হাবিলদার সালামের নেতৃত্বে নয়নপুরের রেলওয়ে স্টেশনের দক্ষিণে আশাবাড়ি থেকে রাত দেড়টার সময় শত্রু অবস্থানের উপর আরআর রাইফেল ও মর্টারের সাহায্যে আবার আক্রমণ চালানো হয়্ শত্রুরা এ আক্রমণের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলনা। তারা দ্বিতীয়বার আক্রমণ আশা করেনি। এ আক্রমণের ফলেও শত্রুদের যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি হয়।

 

এ সময় শত্রুদের অবস্থান যেখানে ছিল সেসব অবস্থানের কাছাকাছি এবং পাকসেনাদের চলাচলের রাস্তার উপর মাইন পুতে রাখা হয়েছিল। ১৪ই জুন রাতে ফকিরহাট রেলওয়ে স্টেশন থেকে ৭০০/৮০০ গজ উত্তরে শত্রুর একটি দল দুপুরে বখশিমাইল গ্রামে পেট্রোলিং-এর জন্য গিয়েছিল। আর একটি দল গাজীপুরের নিকট আমরা যে কাঠের পুল জ্বালিয়ে দিয়েছিলাম সেটি মেরামত করছিল। বখসিমাইল গ্রাম থেকে সন্ধ্যার সময় পাকসেনাদের দলটি ফকিরহাটে নিজেদের অবস্থানে ফেরার পথে আমাদের পুঁতে রাখা মাইনের মধ্যে পড়ে যায় এবং মাইনগুলি তাদের পায়ের চাপে ফাটতে থাকে। এতে তাদের অনেক লোক হতাহত হয় এবং তাদের মধ্যে ভয়ংকর বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। এ মাইনগুলোর ফাটার শব্দ নিকটবর্তী অবস্থান থেকে পাকসেনারা শুনতে পায়। রাতের অন্ধকারে তারা ঠিক বুঝতে পারছিলো না এ বিস্ফোরণের সঠিক কারণ কি? মুক্তিবাহিনীর দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে ভেবে পাকসেনারা প্রচণ্ডভাবে গোলাগুলি ছুড়তে থাকে। এই গোলাগুলি রাত ৮টা থেকে ৩টা পর্যণ্ত চলতে থাকে। শত্রুরা নিজেদের লোকের উপর শত শত মর্টার এবং কামানের গোলা ছুড়তে থাকে। আমাদের দুরে অবস্থিত পেট্রোল “ইয়া আলী, ইয়া আলী, বাঁচাও বাঁচাও” প্রভৃতি শুনতে পায়। পরে আমরা পাশ্ববর্তী গ্রামের লোকমুখে শুনতে পাই যে আমাদের মাইনে এবং পাক সেনাদের নিজেদের গোলাগুলিতে অন্ততপক্ষে ৪০/৫০ জন পাক সেনা হতাহত হয়েছে। পরদিন সকালে পাকসেনাদের একজন ব্রিগেডিয়ার ঐ অবস্থানটি পরিদর্শন করতে কুমিল্লা থেকে আসেন।

 

পাকসেনারা এই দুর্ঘটনার পর রাজাপুর রেলওয়ে স্টেশনের চতুর্দিকে এবং ফকিরহাট পর্যন্ত তাদের পেট্রোলিং আরো জোরদার করে। মতিনগরে অবস্থিত আমাদের কোম্পানী শত্রুদের এই কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। ১৬ই জুন সকালে আমাদের একটি প্লাটুন পাকসেনাদের পেট্রোলিং পথের উপর এমবুশ পাতে। সকাল ৯টায় পাকসেনাদের একটি দল রাজাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে রওনা হয়। এই দলটি আমাদের এমবুশ-এর মধ্যে পড়ে যায়। অতর্কিতে আমাদের লোকেরা পাকসেনাদের উপর হালকা মেশিনগান ও অন্যান্য অস্ত্রের সাহায্যে গোলাগুলি চালায়। এই গোলাগুলিতে শত্রুদের ৮ জন নিহত ও একজন আহত হয়্ এছাড়া আমাদের লোকেরা প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র, টেলিফোন সেট, ড্রাইসেল ব্যাটারি ও আরও অনেক জিনিস হস্তগত করে।

 

জুন মাসের দ্বিতীয সপ্তাহে আমার কাছে খবর আসে যে, শত্রুদের গোলন্দাজ বাহিনীর একটি ব্যাটারি (দল) কুমিল্লা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিএণ্ডবি রোড তাদের কামানের অবস্থান হিসাবে ব্যবাহার করছে। পাক বাহিনীর নয়নপুর, শালদানদী, টি. আলীর বাড়ি (কসবায়) প্রভৃতি শত্রু অবস্থানের জন্য এই কামানগুলি থেকে সাহায্যকারী গোলা নিক্ষেপ হত। এই কামানগুলির জন্য পাক বাহিনীর উপরোক্ত অবস্থানগুলির উপর আক্রমণ অনেক সময় কার্যকরী করা যেত না। আমার কাছে আরও খবর আসে যে, প্রায় ১৫০ জন পাক সেনা এই কামানগুলিকে ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ করে। এই সংবাদ পাওয়ামাত্র আমি লে. হুমায়ুন কবিরকে এই কামানের অবস্থানটি আক্রমণ করে ধ্বংস করার জন্য নির্দেশ দিই। ৪০ জনের একটি দল (৪র্থ বেঙ্গলের ডি কোম্পানী) লে. হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বে ১৬ই জুন রতে সাড়ে ১০টায় শত্রু অবস্থানের দিকে অগ্রসর হয়। সমস্ত রাত চলার পর দলটি কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাস্তার পশ্চিমে সাইদাবাদের চার মাইল উত্তরে ভোরে পৌছে এবং তাদের একটি গোপন অবস্থান তৈরী করে। ১৭ই জুন সমস্ত দিন এবং রাত লে. ‍হুমায়ূন কবির তার সঙ্গে শুধু কয়েকজনকে নিয়ে পাকসেনাদের সাইদাবাদ অবস্থানটি সম্পূর্ণরূপে অনুসন্ধান করে। এই অবস্থানটিতে পৌছার জন্য পোপন পথ কি, কামানগুলি রাতে কোন স্থানে রাখে, কোন সময়ে পাকসেনারা বেশী সজাগ এবং তাদের ব্যাংকারগুলির অবস্থান কোথায় প্রভৃতি খবরাখবর সংগ্রহ করে। এরপর লে. হুমায়ুন কবির সকাল হবার আগেই তার গোপন ঘাটিতে ফেরত আসে। ১৮ই জুন সমস্ত দিন তার দলটিকে পাকসেনাদের সম্বন্ধে বিস্তারিত খবর বলে িএবং পাক ঘাটিতে আক্রমণের পরিকল্পনা এবং কার্যাবলী সম্বন্ধে প্রত্যেককে বুঝিয়ে দেয়। সমস্ত দিন দলটি আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নেয়।

 

১৮ই জুন ভোর চারটায় লে. হুমায়ুনের নেতৃত্বে আমাদের দলটি পাকসেনাদের কামান ঘাঁটির উপর পিছন দিক থেকে অনুপ্রবেশ করে অতর্কিতে আক্রমণ চালায়। পাকসেনারা তাবুর মধ্যে শুয়ে ছিল। তারা এ আক্রমণের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না। সেদিনই কুমিল্লা থেকে পাকসেনাদের দুটি কোম্পানী যেগুলি সামনে শত্রুদের ঘাটিকে শক্তিশালী করার জন্য যাচ্ছিলো তারাও রাতের বিশ্রামের জন্য অসতর্কভাবে এ অবস্থানটিতে শুয়ে ছিল। আমাদের দলের অতর্কিত আক্রমণে পাকসেনাদের ঘাটিতে ভীষণ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং অনেক শত্রুসেনা আমাদের গুলিতে প্রাণ হারাতে থাকে। আমাদের লোকেরা কয়েকটি জীপ ও ৩ টনের ট্রাকে গ্রেনেড ছুঁড়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। পাকসেনারা এত বেশী ভীত হয়ে পড়ে যে তারা তাদের হেড কোয়ার্টারে জঙ্গী বিমানের সাহায্যের প্রার্থনা জানায়। যুদ্ধ বেশ কিছুক্ষণ ভয়ংকরভাবে চলে এবং আমাদের সৈন্যরা কামান, গাড়ি ইত্যাদি ধ্বংস করে। কিন্তু ইতোমধ্যে সকাল হয়ে যায় এবং শত্রুদের প্রতিরোধ শক্তি বাড়তে থাকে ও তাদের আবেদনে তিনটি জঙ্গী বিমান ঘটনাস্থলে পৌছে আমাদের রেইডং পার্টির উপর আক্রমণ চালায়। লে. হুমায়ুনের দলটি তখন আটকা পড়ে যাবার ভয়ে আক্রমণ শেষ করে গ্রামের গোপন পথে মেঘনার দিকে পশ্চাদপরণ করে। এই পশ্চাদপরণের সময় তারা বারবার পাকিস্থানী জঙ্গী বিমান দ্বারা আক্রান্ত হয়। তবুও সমস্ত বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে সাফল্যের সাথে শত্রুদের আওতার বাইরে চলে আসে। একদিন পর তারা অন্য পথে আবার কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রধান সড়কের উপর আসে এবং মতুরা সড়কের সেতুটি উড়িয়ে দিয়ে নিজ ঘাটিতে নিরাপদে ফিরে আসে।

এ আক্রমণের ফলে যদিও লে. হুমায়ুনের দলটি পাকসেনাদের কামান দখল করে আনতে পারে নি কিন্তু তবুও এ আক্রমণের ফলাফল পাকসেনাদের জন্য ছিল ভয়াবহ। অন্ততপক্ষে ৫০/৬০ জন পাকসেনা এ আক্রমণে হতাহত হয়। মৃতদেহগুলি পাকসেনারা ২টি বেসামরিক বাসে লালা ঝান্ডা তুলে কুমিল্লার দিকে নিয়ে যায়। এ খবর স্থানীয় লোকেরা জানায়। তাছাড়া গাড়ি, যুদ্ধ সরঞ্জাম ও এই অবস্থানে রাখা কামানের গোলা যেগুলি ধ্বংস করা হয়েছিল তা ছিল তাদের পক্ষে অত্যন্ত মারাত্মক ক্ষতিকর। আসার পথে দলটি যে সেতু উড়িয়ে দিয়ে আসে এতেও তাদের গতিবিধির উপর যথেষ্ট বাধার সৃষ্টি করে। এ হামলার পর শত্রসেনারা প্রায় ২/৩ সপ্তাহ সমস্ত সেক্টরে তাদের কার্যকলাপ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয়। পাকসেনারা এরপর নিরীহ গ্রামবাসীদের উপর অত্যাচার চালায় এবং বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়।

 

১৬ই জুন আমাদের কসবা অবস্থান থেকে একটি ছোট দল বগাবাড়ি নামক জায়গায় এমবুশ পাতে। সকাল ৬টায় পাকসেনাদের একটি পেট্রোল পার্টি সবার দিকে তাদের টহলে আসে। পাকসেনাদের এই দলটি অসতর্কভাবে হঠাৎ আমাদের এমবুশ পার্টির ব্যাংকারের নিকট চলে আসে। আমাদের এমবুশ দলটি এ সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। অতি নিকট থেকে তাদের সমস্ত অস্ত্র-গুলি চালাতে থাকে। অতর্কিত গুলির আঘাতে প্রায় ১০জন পাকসেনা নিহত ও ৫ জন আহত হয়। শুধু ২ জন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

 

পাকসেনারা ১৮ই জুন আমাদের অবস্থান ‘কৈখোলার’ উপর গোলন্দাজ বাহিনীর সাহায্যে প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে আমাদের অবস্থানকারী প্লাটুনটি কৈখোলা ত্যাগ করে এবং সঙ্গে সঙ্গে পাকসেনাদের একটি দল কৈখোলা দখল করে নেয়। ঐদিন রাতে মেজর সালেক চৌধুরীর নেতৃত্বে আমাদের এ কোম্পানী ভোর রাতে কৈখোলায় অবস্থানরত শত্রুদের উপর প্রচণ্ড পাল্টা আক্রমণ চালায়। হাবিলদার সালামের প্লাটুন শিবপুরের দিক থেকে এবং সুবেদার আবদুল হক ভুইয়ার প্লাটুন দক্ষিণ দিক থেকে শত্রুসেনাদের অবস্থানের ভিতর অনুপ্রবেশ করে যায়। হাবিলদার সালমের সামনের অবস্থানটি পরিত্যাগ করে পিছনে পালিয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে পাকসেনাদের ভিতর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং শত্রুরা সমগ্র কৈখোলা এলাকা থেকে পালিয়ে যেতে শুরু করে। ২ ঘন্টার মধ্যে প্রচণ্ড আক্রমণের সামনে টিকতে না পেরে পাকসেনারা অবস্থানটি সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগকরে। এ যুদ্ধের ফলে পাকসেনাদের একজন জেসিওসহ ৩১জন সিপাই হতাহত হয় এবং অবস্থানটি থেকে অনেক অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধ সরঞ্জাম দখল করা হয়।

 

১৯শে জুন লে. ‍হুমায়ূন কবিরের হেডকোয়ার্টারে খবর আসে যে, পাকসেনাদের একটি প্লাটুন সাগরতলার ভিতর পেট্রোলিং করার জন্য যেতে দেখা গেছে। লে. হুমায়ুন তৎক্ষণাৎ একটি প্লাটুন নিয়ে মন্দভাগের নিকট দ্রুত এমবুশ পাতে। সন্ধ্যা ৭টায় পাকসেনারা ফেরার পথে তাদের দলটির শেষ অংশটিকে লে. হুমায়ুন এমবুশ করে। এমবুশে পাকসেনাদের ৯ জন সৈন্য নিহত হয় এবং বাকি পাকসেনারা মন্দভাগ গ্রামের দিকে পালিয়ে তাদের জীবন বাঁচায়।

 

জুন মাসের মাঝামাঝি লে. মাহবুব ৪র্থ বেঙ্গলের বি কোম্পানী থেকে একটি প্লাটুনকে পাকসেনাদের যাতায়াতের রাস্তা ধ্বংস করার জন্য কুমিল্লার দক্ষিণে প্রেরণ করে। এ দলটি ১৮ই জুন সন্ধ্যা ৬টায় কুমিল্লা-লাকসামের বিজয়পুর রেলওয়ে ব্রিজ, কুমিল্লা-বাগমারা রোডের সেতু উড়িয়ে দেয়। এই সেতুগুলোর ধ্বংসের ফলে কুমিল্লার দক্ষিণে সড়ক এবং রেলওয়ে যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়। ঐ দিনই দলটি বিজয়পুর এবং মিয়াবাজারের নিকট কয়েকটি ইলেকট্রিক লাইন উড়িয়ে কাপ্তাই থেকে ঢাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। পাকসেনাদের একটি প্লাটুন সন্ধ্যার সময় ‘চৌরা’র নিকট পেট্রোলিং-এ আসে। এই পাকসেনার দলটিকে এমবুশ করলে ২ জন সেনা নিহত হয়। পাকসেনারা পরে পাশ্ববর্তী গ্রামগুলি জ্বালিয়ে দেয় এবং অত্যাচার চালায়। আমাদের পেট্রোল পার্টি খবর আনে যে, পাকিস্থানীদের প্রায় এক কোম্পানী সৈন্য মিয়াবাজারের উত্তরে একটি গোডাউনের মধ্যে অবস্থান করছে। পেট্রোলটি এই গোডাউনটিতে পৌছবার গোপন রাস্তা, পাকসেনাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও অন্যান্য বিস্তারিত খবর নিয়ে আসে। এ সংবাদ পেয়ে লে. মাহবুব ৩৩ জনের একটি কমান্ডো প্লাটুন ব্লাকসাইড ও মর্টারসহ রাত ১২টার সময় শত্রু অবস্থানের নিকট পৌছে যায়। তারা একটি ছোট দল পাঠিয়ে অবস্থানটির সর্বশেষ খবর নেয় এবং জানতে পারে পাকসেনারা অবস্থানটিতে বেশী সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয় নি। রাত ১টায় আমাদের কমান্ডো প্লাটুনটি অতর্কিতে পাকসেনাদের প্রতিরক্ষা অবস্থানের ভিতর অনুপ্রবেশ করে এবং সঙ্গে সঙ্গে পাকসেনাদের উপর হালকা অস্ত্রের সাহায্যে গুলি চালাতে থাকে। পাকসেনারা অনেকেই গুলিতে হতাহত হয়। তারা আমাদের কমান্ডো প্লাটুনের উপর পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করে, কিন্তু তা ব্যর্থ হয়ে যায়।

 

১৮ জুন রাত ৯টায় মিয়াবাজরের দক্ষিণে আমাদের আরেকটি প্লাটুন পাকসেনাদের ২টি ব্যাংকারের উপর আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণে ৭ জন পাকসেনা নিহত হয়। পাকসেনারা এরপর সমস্ত রাত অবিরাম মর্টারের গোলা ছুড়তে থাকে। আমাদের এই দলটি খিলা রেলওয়ে স্টেশনের নিকট কয়েকটি ট্যাঙ্কবিধ্বংসী মাইন রাস্তায় পুতে রাখে। পাকসেনাদের একটি জীপ রাতে ঐ রাস্তায় যাওয়ার পথে মাইনের উপর পড়ে যায় এবং সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয় এবং ৫জন পাকসেনাও নিহত হয়।

 

জুন মাসেই পাকসেনারা কুমিল্লা শহরে শাসনকার্য পুনরায় স্বাভাবিক করার জন্য সমস্ত রকমের ব্যবস্থা নেয়। সরকারী অফিস ভালভাবে চলার জন্য তারা সরকারী কর্মচারীদের বাধ্য করে। শহরের দোকান ও যানবাহন চালু করার বন্দোবস্ত করে। পাকস্থানীদের এ প্রচেষ্টা ব্যার্থ করার জন্য ৪জন গেরিলার একটি দলকে ৬ই জুন কুমিল্লার উত্তর দিকে গোমতী পার করে কুমিল্লা শহরে পাঠানো হয়। এ দলটি গ্রেনেড ও স্টেনগান সঙ্গে নিয়ে যায়। তিনদিন পর্যন্ত শহরের ভিতর একটি গুপ্ত অবস্থানে গলটি নিজেদের ঘাটি গড়ে। কুমিল্লা শহরের বিভিন্ন জায়গায় পাকসেনাদের টহলদার দলগুলি সম্বন্ধে তারা বিস্তারিত খবরাখবর যোগাড় করে। ১০ই জুন সন্ধ্যায় কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, জজকোর্ট প্রভৃতি স্থানে পর পর পাকসেনাদের উপর গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এর ফলে একজন পাকসেনা নিহত ও পাঁচজন আহত হয়। ঐ দিনই ৭ জন রেঞ্জারের একটি দলকে তারা আক্রমণ করে। এতে ২ জন মিলিশিয়া নিহত হয় এবং তাদের একটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এর কয়েকদিন পর ২১শে জুন সকালে একটি আরআর রাইফেল আমাদের সৈন্যরা কুমিল্লা শহরের নিকটে বয়ে নিয়ে যায় এবং কুমিল্লা বিমানবন্দরের ও শহরের উপকণ্ঠের উপর গোলাগুলি করে এবং পাকিস্থানীরা এতে পাগলের মত ছোটাছুটি করতে থাকে। এসব কার্যকলাপের ফলে কুমিল্লা শহর ও তার নিকটবর্তী এলাকার লোকেরা আবার তাদের সাহস ফিরে পায়। অনেকেই শহর থেকে বাইরে চলে যায়। এসব আক্রমণের ফলে পাকিস্থানীদের শাসন ব্যবস্থা চালু করার প্রচেষ্টা বহুলাংশে ব্যর্থ হয়।

 

শালদা নদীতে পাকসেনারা জুন মাসে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করার চেষ্টা করছিল। পাকসেনাদের কার্যকলাপে বিঘ্ন সৃষ্টি করার জন্য এবং তাদেরকে ব্যস্ত রাখার জন্য মেজর সালেক ৪র্থ বেঙ্গলের এ কোম্পানীর ১ প্লাটুন মর্টারসহ শালদানদীর পশ্চিমদিকে পাঠিয়ে দেয়। এই প্লাটুনটি রাত ৩টায় পাকসেনাদের অবস্থানটি ঘুরে পিছনে যেতে সক্ষম হয়। সকাল সাড়ে ৫টার সময় পুর্বনির্ধারিত স্থানে তারা নিজেদের ঘাটি স্থাপন করে। এরপর প্রত্যুষের সঙ্গে সঙ্গেই পিছন থেকে মেশিনগান ও অন্যান্য হালকা অস্ত্রশস্ত্র এবং মর্টারের সাহায্যে শত্রু অবস্থানের উপর অতি নিকট থেকে হামলা চালায়। পাকসেনারা দিনের বেলায় তাদের অবস্থানের পিছনে এত নিকট থেকে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিলনা এবং এর ফলে তাদের অন্ততপক্ষে ১ জন জেসিওসহ ৩২ জন হতাহত হয়। পাকসেনাদের একটি শক্তিশালী দল রাতে শালদানদীর অবস্থান হতে কসবাতে টহলের জন্য গিয়েছিল। এই সংবাদটি আমাদের লোকের জানা ছিলনা। পাকসেনাদের সঙ্গে আমাদের প্লাটুনটি যখন ভয়ংকর সংঘর্ষ করছিল, সে সময় পাকসেনাদের টহলদার দলটি কসবা থেকে ফেরার পথে আমাদের প্লাটুনটির পিছনে অবস্থান নিয়ে আমাদেরকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করে। আমাদের প্লাটুনটি সঙ্গে সঙ্গে অতিকষ্টে পাকসেনাদের ঘেরাও থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়। আসার সময় আমাদের একজন লোক আহত হয়। পাকসেনারা এরপর শালদানদীর অবস্থান আরো শক্তিশালী করে তোলে।

 

আমরা খবর পাই যে, পাকবাহিনী প্রায়ই হোমনা থানার নিকট কাঠালিয়া নদী এবং গেমতী নদীতে লঞ্চের দ্বারা পেট্রোলিং করে। এ খবর শোনে আমি হেডকোয়ার্টার থেকে ১টি প্লাটুন হাবিলদার গিয়াসুদ্দিনের নেতৃত্বে হোমনা থানাতে প্রেরণ করি। এই দলটি অনেক বাধাবিঘ্ন অত্রিকম করে দাউদকান্দির ৮ মাইল উত্তরে ও গৌরীপুর হতে সাত মাইল উত্তর পশ্চিমে চড়কমারী গ্রামের নিকট তাদের গুপ্ত ঘাটি গড়ে তোলে। হাবিলদার গিয়াসুদ্দিন চরকমারী গ্রামের নিকট পাকসেনাদের লঞ্চকে এমবুশ করার জন্য তার দলটিকে নিয়ে নদীর পাড়ে একটি অবস্থান গড়ে তোলে। পাকসেনারা নিত্যনৈমিত্তিক টহলে সকালে পশ্চিম হতে কাঠালিয়া নদী দিয়ে লঞ্চে অগ্রসর হয়। লঞ্চটি যখন ৫০ গজের ভিতর চলে আসে, তখন হাবিলদার গিয়াসুদ্দিনের পার্টি মেশিনগান, হালকা মেশিনগান ও অন্যান্য অস্ত্র হতে অতর্কিতে গুলি চালাতে থাকে। পাকসেনারা অনেকেই হতাহত হয়। লঞ্চটির সারেং লঞ্চটিকে একটা চরের দিকে নিয়ে ভিড়াবার চেষ্টা করে কিন্তু ব্যার্থ হয়। এরপর অনেক পাকসেনা লঞ্চ থেকে পানিতে ঝাপ দিয়ে পড়ে কিন্তু তাতেও তারা পানিতে গুলির আঘাতে মারা যায়। শুধু কয়েকজন সাতরিয়ে অন্য পাড়ে ওঠে পালাতে সক্ষম হয়। িএই লঞ্চে পাকসেনাদের অন্তত ৭০/৮০ জন লোক ছিল এবং সঙ্গে তিনজন বেসামরিক লোকও ছিল। হাবিলদার গিয়াসুদ্দিনের লোকেরা লঞ্চ থেকে অনেক অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ উদ্ধার করে। সেদিনই বিকাল ৫টার সময় পাকবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার তাদের এই লঞ্চটি এবং লোকজনের খবরাখবর নেয়ার জন্য ঐ এলাকায় অনেক ঘোরাফিরা করে কিন্তু কোন খোঁজখবর না পেয়ে হেলিকপ্টারটি ফেরত চলে যায়। এ এ্যাকশন সকালে প্রায় এক থেকে দেড়ঘন্টা চলে, পার্শ্ববর্তী সমস্ত এলাকার স্থানীয় লোকেরা দুর থেকে তা প্রত্যক্ষ করে। পাকবাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পর্যুদস্ত হতে দেখে স্থানীয় লোকের মনোবল আরো বেড়ে যায়। তারা মুক্তিবাহিনীর উপর আরো আস্থাশীল হয়। হাবিলদার গিয়াসুদ্দিন এখনও এই এলাকার লোকের কাছে কিংবদন্তীর নায়ক হয়ে বিরাজ করছেন।

 

সুবেদার আলী আকবর পাটোয়ারীর অধীনে যে কোম্পানীটি লাকসামের দক্ষিণে নোয়াখালির উত্তর পশ্চিম অঞ্চলে পাঠানো হয়েছিল, সে কোম্পানীট ও এ অঞ্চলে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে তাদের কার্যকলাপ চালায়। চাঁদপুর থেকে পাকবাহিনী যে রাস্তা নোয়াখালী যাবার জন্য ব্যবহার করত, সে রাস্তায় লক্ষীপুরের নিকট ৯০ ফুটের একটি সড়কসেতু বিধ্বস্ত করে দেয়। এর কিছুদিন পর পাকবাহিনী পশ্চাদপরণ করলে সুবেদার আলী আকবরের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী রায়পুর থানা আক্রমণ করে। এ আক্রমণের ফলে দালাল পুলিশের সাহায্যে স্থানীয় লোকদের উপর যথেষ্ট অত্যাচার করত। এ থানা দখল করে নেয়ার ফলে সমস্ত এলাকা মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

 

১৬ই জুন আমাদের ২টি গেরিলা পার্টি হেডকোয়ার্টার থেকে পাঠানো হয়। ৬ জনকে কুমিল্লার দক্ষিণে ইলেকট্রিক লাইন উড়ানোর জন্য এবং অন্য ৬ জনের একটি পার্টিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উত্তরে তিতাস গ্যাসলাইন কাটার জন্য পাঠানো হয়। ২১শে জুন প্রথম পার্টিটি ২টি ইলেকট্রিক লাইন ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে নোয়াখালীর বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়। দ্বিতীয় দলটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উত্তরে তালশহরে ২৪শে জুন সন্ধ্যায় তিতাস গ্যাসের ৪ ফুট পাইপ উড়িয়ে দেয়। এর ফলে তিতাস গ্যাস ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, আশুগঞ্জ এবং সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ারস্টেশনগুলিতে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে এসব পাওয়ার স্টেশনগুলি হতে বিদ্যুৎ সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এতে শিল্প এলাকাগুলির যথেষ্ট ক্ষতি হয়।

 

মতিনগর থেকে একটি প্লাটুন রাজাপুরের পাক অবস্থানের উপর হামরা করার জন্য পাঠানো হয়। এই প্লাটুনটি ২২শে জুন আমাদের ঘাটি থেকে রাজাপুরের দিকে অগ্রসর হয়। সন্ধ্যায় রাজাপুর শত্রু অবস্থানটি তারা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে রেকি করে। তারা জানতে পারে যে, পাকসেনারা বেশ অসতর্কভাবে তাদের অবস্থানে আছে। ২২শে জুন ভোর ৪টায় আমাদের দলটি অতর্কিতে গোপনপথে শত্রু অবস্থানের ভিতর প্রবেশ করে আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণে পাকসেনারা সম্পূণ হকচকিত হয়ে যায়। এই আঘাতে আমাদের লোকদের হাতে তাদের প্রায় ১৫ জন হতাহত হয়। আমাদের একজন আহত হয়। আক্রমণের প্রায় ১ ঘন্টা পর আমাদের লোকেরা পিছু হটে আসে।

 

আমাদের রেকি পার্টি খবর আনে যে, পাকসেনারা কসবার উত্তরে চন্দ্রপুর এবং লাটমুরার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এ সংবাদ পাবার পর লে. হুমায়ুন কবির পাকসেনাদের চতুর্দিক থেকে এমবুশ করার জন্য ৪র্থ বেঙ্গলের ডি কোম্পানীর তিনটি প্লাটুন ইয়াকুবপুর, কুয়াপাইনা এবং খৈনলে পাঠিয়ে দেয়। এই তিনটি প্লাটুন নিজ নিজ জায়গায় ২৩শে জুন সকাল ৬টার মধ্যে অবস্থান নেয়। পাকসেনারা সমস্ত রাত অগ্রসর হওয়ার পর সকালে আমাদের অবস্থানের সামনে উপস্থিত হয়।

 

পাকসেনারা আমাদের উপরোল্লিখিত অবস্থানের ৫০ থেকে ১০০ গজের মধ্যে এসে পড়লে তিনদিক থেকে আমাদের সৈন্যরা পাকসেনাদের উপর আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণে পাকসেনাদের ৮ জন নিহত এবং তিনজন আহত হয়। পাকসেনারা একটু পিছু হটে যেয়ে আবার আক্রমণের চেষ্টা চালায় কিন্তু সে চেষ্টাও ব্যর্থ হয়ে যায়। এরপর সমস্তদিন উভয়পক্ষে গোলাগুলি চলতে থাকে এবং সন্ধ্যার সময় পাকসেনারা পিছু হটে যায়। পাকসেনাদের পশ্চাদপরণের সময়ও আমাদের ইয়াকুবপুরের প্লাটুন তাদেরকে দক্ষিণ দিক থেকে আক্রমণ করে বেশ ক্ষতিসাধন করে। পিছু হটে গিয়ে লাটুমুড়ার উত্তরে অবস্থান নেয় এবং প্রতিরক্ষাব্যুহ তৈরী করতে থাকে। ২৪শে জুন পাকসেনারা যখন লাটুমুড়াতে তাদের প্রতিরক্ষাব্যুহ তৈরীতে ব্যস্ত ছিল, সকাল পাঁচটায় আমাদের কুয়াপাইনা ও খৈনাল এলাকা থেকে শত্রুদের বামে এবং দক্ষিণে আমাদের ৩টি প্লাটুন আবার অতর্কিতে আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণের ফলে পাকসেনাদের ৯ জন লোক নিহত হয়। আমাদের ১ জন আহত হয়।

 

নোয়াখালীর উত্তরে পাকবাহিনী ফেনী থেকে নোয়াখালী পর্যন্ত ট্রাকে টহল দিত। এ খবর আমাদের নোয়াখালী গেরিলা হেডকোয়ার্টারে পৌছৈ। সেখানে থেকে আমাদের ২টি এমবুশ পার্টি বোগাদিয়া এবং বজরাতে পাঠানো হয়। ২১শে জুন এই দুই পার্টি সন্ধ্যায় উপরোক্ত দুটি স্থানে এমবুশ পাতে। তারা রাস্তাতে একটি এন্টি ট্যাংক ও এন্টি পার্সোনেল মাইন পুতে রাখে। সন্ধ্যায় পাকসেনাদের দুটি ট্রাক ফেনীমুখে যাচ্ছিল। এই ট্রাক দুটি এমবুশ স্থানে পৌছালে প্রথম ট্রাকটি এন্টি ট্যাংক মাইনে পড়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গেই ধ্বংস হয়ে যায়। পরের ট্রাকটি পিছু হটে যাওয়ার চেষ্টা করে কিন্ত এমবুশ পার্টি তাদের উপর গুলি চালাতে থাকে। পাকসেনারা উপায়ন্তর না দেখে ট্রাক থেকে বেরিয়ে পালাবার চেষ্টা করে। পলায়নপর শত্রুদের কিছুসংখ্যক গুলিতে মারা যায়, আর কিছু প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এ এমবুশে পাকসেনাদের ২টি ট্রাক সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায় এবং ১২ জন নিহত হয়। আমাদের পার্টি অনেক অস্ত্রশস্ত্র হস্তগত করে এবং বজরার এ্যামবুশ পার্টিও শত্রুদের একটি টহলদার দলকে আক্রমণ করে ২ জনকে নিহত এবং ২ জনকে আহত করে। আর একটি পার্টি ২৩শে জুন পাকসেনাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা নষ্ট করে দেয়ার জন্য নোয়াখালীর সাহেবজাদা ব্রিজ, চন্দ্রগঞ্জ এবং রামগঞ্জ জেলা কাউন্সিল ব্রিজ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়।

 

পাকসেনারা লাটুমুড়াতে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অব্যাহত রাখে কিন্তু ৪র্থ বেঙ্গলের ডি কোম্পানী লেঃ হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বে তাদেরকে সবসময় ব্যতিব্যস্ত রাখে।

 

পাকসেনারা তাদের শালদানদী অবস্থান থেকে সবসময় মন্দভাগ দখল করে নেয়ার চেষ্টা চালাত। আমাদের ৪র্থ বেঙ্গলের সি কোম্পানী মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশন এবং জেলা বোর্ডের কাঁচা রাস্তা পর্যন্ত নিজেদের রেখে শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যুহ গড়েছিল। এ অবস্থানটির জন্য পাকবাহিনী চট্টগ্রাম-ঢাকা রেলওয়ে লাইন চালু করতে পারছিল না।  সেজন্য সবসময়ই তাদের চেষ্টা ছিল মন্দভাগ থেকে আমাদের বিতাড়িত করা। এছাড়া এ অবস্থানটির জন্য তারা শালদানদী ছিটমহল যেখানের আমাদের মূল ঘাটি ছিল, তা তাদের দখলে আনতে পারছিল না। অনেকবার চেষ্টা করেও তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ২৪শে জুন বিকেল ৩টায় তাদের শালদানদী অবস্থান থেকে পাকসেনাদের একটা কোম্পানী, কসবায় টি. আলী বাড়ী থেকে একটা কোম্পানী, এই দুই কোম্পানী দুদিক থেকে এসে কায়েমপুরের নিকট মিলিত হয়। তারপর মর্টার মেশিনগান এবং কামানের সাহায্যে আমাদের মন্দভাগ অবস্থানে আক্রমণ চালায়। প্রচণ্ড গোলার সহায়তায় পাকসেনাদের এই শক্তিশালী দলটি মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশনে ৩০০ গজ পশ্চিমে জেলা বোর্ডে সড়কের নিকট পর্যন্ত পৌছতে সক্ষম হয়। আমাদের সৈনিকরাও তাদের ব্যঙ্কার থেকে মেশিনগান এবং হালকা মেশিনগানের গুলিতে পাকসেনাদের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি করতে থাকে। দুঘন্টা চেষ্টার পর পাকসেনারা যখন অগ্রসর হতে পারছিলনা তখন আক্রমণ বন্ধ করে দেয় এবং পিছু হটে চলে যায়। এ আক্রমণের সময় পাকসেনাদের ২৪ জন হতাহত হয়। পাকসেনারা তাদের কায়েমপুরের অবস্থানও তুলে নিয়ে শালদানদীর মূল ঘাটিতে চলে যায়।

 

ঢাকায় আমাদের গেরিলারা তাদের কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। বিদ্যুৎ সরবরাহ যাতে স্বাভাবিকভাবে না চলে সেজন্য তারা ২৯শে জুন বিকেল ৫টায় সিদ্ধিরগঞ্জ এবং খিলগাঁও পাওয়ার লাইনের এইটি পাইলন ধ্বংস করে দেয়। এই বিধ্বস্থ পাইলনটি অন্য দুটি পাইলনের তার নিয়ে ছিঁড়ে পড়ে যায়। এর ফলে কমলাপুর এবং তেঁজগাঁওয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ অনেকাংশে কমে যায়। বিস্ফোরণের ঠিক পরপরই পাকসেনাদের একটি হেলিকপ্টার তৎক্ষণাৎ উক্ত এলাকায় গেরিলাদের অনেক খোঁজাখুজি করে। আমাদের গেরিলারা নিরাপদে ফিরে আসে। আর একটি গেরিলা দল সিদ্ধিরগঞ্জের মাটির তলার পাওয়ার লাইন মাতুয়াইলে উড়িয়ে দেয়। পাকসেনারা নিকটবর্তী ঘাটি হতে জীপে করে এসে দলটিকে ধরার চেষ্টা করে এবং এদের উপর গোলাগুলি করে, কিন্তু গেরিলা দলটি নিরাপদে ফিরে আসে।

 

স্থানীয় লোকমুখে আমরা সংবাদ পাই যে, পাকসেনাদের একটি জীপ ও টহলদার দল প্রায়ই সাঈদাবাদ থেকে কর্ণালবাজার পর্যন্ত আসে। এ সংবাদ পেয়ে ক্যাপ্টেন আইনউদ্দিন খোলাপাড়ায় এবং তুলাইশমলে একটি করে প্লাটুনের সাহায্যে এমবুশ লাগায়। ২৭শে জুন সন্ধ্যার সময় পাকসেনাদের টহলদার দল খোলাপাড়ায় আমাদের এমবুশে পড়ে যায়। এতে পাকসেনাদের ৮ জন লোক নিহত হয় এবং তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায। এর পরদিন ২৮শে জুন সন্ধ্যা ৭টায় পাকসেনাদের একটি জীপ তুলাইশমলে আমাদের এমবুশে পড়ে। এমবুশ পার্টির গুলিতে জীপটি ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে রাস্তা থেকে পড়ে যায়। জীপে পাঁচজন পাকসেনা ছিল, তারাও সঙ্গে সঙ্গে নিহত হয়। আমাদের পার্টি অস্ত্রশস্ত্র দখল করে নেয়।

 

পাকসেনারা কুমিল্লা শহরের পূর্বে বিবিরবাজার এলাকায় যে ঘাটি গড়েছিল, আমরা প্রায়ই আক্রমণ করে তাদের ব্যতিব্যস্ত রাখতাম। লে. মাহবুব খবর পায় যে, পাকসেনারা সন্ধ্যার পর আর তাদের ব্যাংকার থেকে বাইরে আসেনা। রাতে যেসব পাহাড়াদার থাকে তারা ব্যাংকারের মধ্যে বসে থাকে। এ সংবাদ পেয়ে লে. মাহবুব দুটি প্লাটুনকে ২৪শে জুন রাতে শত্রুদের বিবিরবাজার ঘাটির কয়েকটি ব্যাংকার ধ্বংস করার নির্দেশ দিয়ে কুমিল্লার দক্ষিণ দিকে পাঠিয়ে দেয়। এ দলটি অরণ্যপুর হয়ে শত্রুদের বিবিরবাজার অবস্থানের পিছনে পৌছে এবং রাত তিনটায় অবস্থানের ভিতর অনুপ্রবেশ করে অতর্কিত আক্রমণ চালায়। প্রথমেই তারা তাদের সামনের একটি ব্যাংকারে গ্রেনেড ছোড়ে এবং সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়। এরপর আরও ২/১টি ব্যাংকার ধ্বংস করে তারা সকাল হবার আগেই শত্রুঅবস্থানে ত্যাগ করে। এই অতর্কিত আক্রমণে পাকসেনাদের ২১ জন নিহত ও ৭ জন আহত হয়।

 

পাকসেনারা বিজয়পুরের যে রাস্তার সেতুটি আমাদের কমান্ডো পার্টি উড়িয়ে দিয়েছিল সেটি সাময়িকভাবে মেরামত করে ফেলে এবং সে রাস্তায় আবার তাদের চলাফেরা শুরু করে। লে. মাহবুব আবার একটি কমান্ডো প্লাটুন পাঠায় এবং এই প্লাটুনটি ২১শে জুন বিজয়পুর ব্রিজের নিকট এমবুশ পেতে পাকসেনাদের অপেক্ষায় থাকে। রাত ২টার সময় পাকসেনাদের দুটি গাড়ী কুমিল্লা থেকে ঐ রাস্তায় আসে। গাড়ীগুলি যখন ব্রিজের উপর দিয়ে চলা শুরু করে ঠিক তখনই আমাদের পার্টি তাদের উপর গুলি চালায়। সঙ্গে সঙ্গেই গাড়িগুলি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ব্রিজ থেকে নদীতে পড়ে যায়। এতে দুটি গাড়িই বিনষ্ট হয়ে যায় এবং ৮ জন পাকসেনা নিহত হয়।

 

জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে আমার হেডকোয়ার্টার থেকে গেরিলাদের ৬০ জনের একটি দলকে আমি ফরিদপুরে পাঠাই। মাদারীপুর, পালং, রাজৈর, নড়িয়া প্রভৃতি থানায় গেরিলাদের বিভিন্নভাবে বিভক্ত করে দেয়া হয়েছিল। এই দলগুলি তাদের নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে ঘাটি গড়ে তোলে। এরপর তারা কিছুসংখ্যক পাকিস্থানী দালালকে হত্যা করে। এরপর তারা নিজ নিজ এলাকার থানাগুলি যেখনা থেকে দালালের পুলিশরা পাকিস্থানীদের খবরাখবর যোগাত, সেই থানাগুলি ভালভাবে রেকি করে। প্রথমে তারা শিবচর অয়ারলেস স্টেশনটি ধ্বংস করে দেয়। এরপর গেরিলা কমান্ডার খলিলের নেতৃত্বে পালং থানার উপর ২৭শে জুন রাত ১১টায় সময় আক্রমণ চালানো হয়। এ আক্রমণে একজন দালাল সাব-ইন্সপেক্টর ও দুজন পুলিশ নিহত হয়। গেরিলারা ৯টা রাইফেল দখল করে নেয়। তারা থানার অয়ারলেস স্টেশনটিও ধ্বস করে দেয়। নড়িয়ার গেরিলাদল খবর পায় যে, মাদারীপুরের ডিআইবি ইন্সপেক্টর ও দালাল সিআই পুলিশ একটি স্থানীয় দালালের বাড়িতে গুপ্ত আলোচনায় ব্যস্ত। এ সংবাদ পেয়ে তারা সেখানে উপস্থিত হয়ে তাদের উপর আক্রমণ চালায়। তারপরে নড়িয়ার অয়ারলেস স্টেশনটিও ধ্বংস করে দেয়।

 

শত্রুদের একটি ছোট দল রাজৈর থানার টাহেরহাটে এসে অবস্থান নেয়। রাজৈরের গেরিলা দলটি তাদের অবস্থানটি সম্বন্ধে পুঙ্কানুপুঙ্খরূপে খবর নেয়। ২৮শে জুন রাত ১১টার সময় ২০ জনের একটি গেরিলাদল টাহেরহাটে পাকসেনাদের অবস্থানের উপর অতর্কিত আক্রমণ করে। এ আক্রমণের ফলে পাকসেনাদের ১০ জন নিহত হয় এবং পাকসেনারা টাহেরহাট অবস্থান থেকে পালিয়ে যায়।

 

পাকিস্থান রেডিও থেকে ঘোষণা করা হয় যে, ২৮শে জুন সন্ধ্যায় জেনারেল মো: ইয়াহিয়া খান জাতির উদ্দেশ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেবেন। এ সংবাদ জানতে পেরে আমি ইয়াহিয়া খানের ভাষণকে উপস্থিত সম্বর্ধনা জানানোর জন্য একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করি। এসম্বন্ধে আমি আমার সাবসেক্টর কমান্ডারদের আমার হেডকোয়ার্টারে ডেকে পাঠাই এবং তাদের সঙ্গে আলোচনা করি। আলোচনার পর এ সিদ্ধান্তে পৌছি যে, ভাষণের সময় পাকিস্থানীরা সবক্ষেত্রেই রেডিও শোনার জন্য তাদের নিজ নিজ প্রতিরক্ষা অবস্থানে একত্রিত হবে এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা কিছুটা শিথিল হবে। এ সময় তাদের এ সতর্কতা আমাদের জন্য আনবে এক সুবর্ণ সুযোগ। তাছাড়া আমাদের একশনও হবে ইয়াহিয়া খাঁনের ভাষণের সমুচিত জবাব। এ জন্য আমি সব সাব-সেক্টর কমান্ডারকে নির্দেশ দিলাম, তারা সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর থেকে যখন ইয়াহিয়ার ভাষণ আরম্ভ হবে, ঠিক সে সময়ে আমার সেক্টরের সব এলাকায় একযোগে পাকসেনাদের উপর তীব্র আক্রমণ চালাবে। এ নির্দেশ অনুযায়ী ৪র্থ বেঙ্গলের ‘এ’ কোম্পানী নয়ানপুরে পাকসেনাদের অবস্থানের দিকে তিন দিক থেকে অগ্রসর হয় এবং ভাষণ আরম্ভ হবার কিছুক্ষণ পরেই পাকসেনাদের উপর আক্রমণ চালায়। পাকসেনারা এ অতর্কিত আক্রমণে হকচকিত হয়ে যায়। এর সাথে সাথে আমাদের মর্টারের গোলা তাদের উপর পড়তে থাকে। পাকসেনারা তাদের অবস্থানের চতুর্দিকে দৌড়াদৌড়ি এবং চিৎকার করে ব্যাংকারের দিকে যাবার চেষ্টা করে। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মেশিনগানের গুলিতে তাদের অনেকেই মারা যায়। আধঘন্টা এভাবে গলি চালানোর পর আমাদের সৈন্যরা অবস্থান পরিত্যাগ করে নিজেদের ঘাটিতে ফিরে আসে। এ যুদ্ধে ১৮ জন নিহত এবং বহু আহত হয়।

 

ঐ দিনই আমাদের একটি কোম্পানী মর্টারসহ লে. হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বে যখন তারা ইয়াহিয়ার ভাষণ শুনছিল, ঠিক ঐ সময় লাটুমুড়াতে শত্রু অবস্থানের উপর অতর্কিতে আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণের ফলে শত্রুদের মধ্যে বেশ বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। এ আক্রমণের ফলে পাকসেনাদের ৫ জন নিহত ও ১০ জন আহত হয়। আমাদের কোম্পানী শত্রুদের উপর আড়াই ঘন্টা আক্রমণ চালিয়ে নিরাপদে পিছু হটে আসে।

 

ঢাকাতে ঐ সময়টিকে উদযাপন করার জন্য আমি ৫০ জন গেরিলার একটি দলকে পাঠিয়ে দিই। এই দলটি ২৭শে জুন ঢাকায় পৌছে। তারপর ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ঢাকা শহরের প্রধান স্থানগুলিতে যেমন জিন্নাহ এভিনিউ, মতিঝিল, শাহবাগ, পুরানা পল্টন, সদরঘাট, চকবাজার প্রভৃতি স্থানে একযোগে সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া খানের ভাষণের সময় গ্রেনেড বিস্ফোরণ এবং মোটরগাড়িতে এক্সপ্লোসিভ লাগিয়ে বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে পাকসেনারা চতুর্দিকে ছোটাছুটি করে এবং সমস্ত ঢাকায় একটা আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। এ বিস্ফোরণগুলির ফলে ঢাকা আমাদের বাঙালিরা তাদের মনোবল আরো ফিরে পায় এবং তারা ইয়াহিয়ার ভাষণের সমুচিত জবাবে আনন্দিত হয়।

 

মতিনগর থেকে ২টি মর্টার দিয়ে একটি ছোট দলকে গোমতীর উত্তর পাড় দিয়ে কুমিল্লা শহরের দিকে পাঠানো হয়। এ দলটি কুমিল্লা শহরের নিকট গিয়ে ভাষণের ঠিক সময়ে কুমিল্লা সার্কিট হাউসের উপর মর্টার দ্বারা গোলাবর্ষণ করে। কুমিল্লা সার্কিট হাউসে পাকসেনাদের মার্শাল ল’র প্রধান অফিস ছিল। মর্টারের গোলা এসে অফিসে পড়ার পর, সেখানেও পাকসেনারা ছোটাছুটি করতে থাকে। কুমিল্লা শহরেও কয়েক মিনিটের মধ্যে নীরবতা নেমে আসে।

 

কুমিল্লা থেকে পাকিস্তানিদের একটি জীপ ও একটি ৩ টনের গাড়ি দক্ষিণে যাচ্ছিল। লে. মাহবুবের একটি এমবুশ পার্টি এই দলটিকে সন্ধ্যায় ফুলতলীর নিকটে আক্রমণ করে। এতে জীপটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। এ এমবুশে পাকিস্থানীদের ২৪ জন সৈন্য ৩ জন অফিসার নিহত হয় এবং ১ জন অফিসার সহ ৪ জন আহত হয়। অফিসারটি লে. কর্ণেল ছিল।

 

লে. মাহবুবের আর একটি প্লাটুন ঠিক ঐ সময় বিবিরবাজার শত্রু অবস্থানের ভিতর অতর্কিতে অনুপ্রবেশ করে ১টি মেশিনগানসহ কয়েকটি ব্যাংকার ধ্বংস করে দেয়। পাকসেনাদের ১১ জন এতে নিহত হয়।

 

এছাড়া মিয়াবাজরে, ফেনী, বিলোনিয়া, লাকসাম, শালদানদী, চাঁদপুর ইত্যাদি স্থানেও মর্টার ও গ্রেনেডের সাহায্যে পাক অবস্থানের উপর একযোগে এইরূপে আক্রমণ চালানো হয়।

 

ইয়াহিয়া খান মনে করেছিল যে, তার ভাষণ দিয়ে তিনি বাঙালিদের শান্ত করবেন এবং আবার তার মিথ্যা আশ্বাসে বাঙালিরা তাদের অত্যাচারকে ভুলে যাবে। কিন্তু আমাদের সমস্ত এলাকাজুড়ে সবগুলো এ্যাকশনে তিনি নিশ্চয়ই বুঝে গিয়েছিলেন যে, বাঙালিরা তার জবাব কি দিয়েছে।