২০. মুক্তিবাহিনীর প্রচন্ড আক্রমণ

Posted on Posted in 6

অনুবাদঃ ইফতেখার আহমেদ এবং চুয়েট ডিবেটিং সোসাইটি

<৬, ২০, ৬০০-৬০১>

শিরোনামঃ মুক্তিবাহিনীর প্রচন্ড আক্রমণ

সংবাদপত্রঃ বাংলাদেশ টুডে ভলিউম ১ নং ৫

তারিখঃ ১ নভেম্বর, ১৯৭১

 

মুক্তিবাহিনীর সংঘবদ্ধ আক্রমণে অবরুদ্ধ ঢাকা

.

সমগ্র বাংলাদেশ থেকে ঢাকা শহর প্রায় বিচ্ছিন্ন। এটি এখন তীব্র গেরিলা আক্রমনে অবরুদ্ধ শহর। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে গেরিলা বাহিনীর সমন্বিত ও ব্যাপক আক্রমনের ফলে শহরতলীর  ৩০ মাইল পর্যন্ত সকল সড়ক ও রেল যোগাযোগ সমগ্র বাংলাদেশ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন।

 

পূর্বে শীতলক্ষ্যা নদীর নিকটবর্তী ডেমরা শিল্প কমপ্লেক্স ; উত্তরে  ঝিনারদি , নাহারবাজার, মাতখোলা, চারমান্দালিয়া এবং কতিয়াদি ; দক্ষিনে নবাবগঞ্জ দাওর এবং পশ্চিমে কালিয়াপুর,মধুপুরগড় এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল সড়ক মুক্তিবাহিনীর প্রবল আক্রমনে রয়েছে। শহরকে সবকিছু থেকে অবরুদ্ধ করে রাখতে মুক্তিবাহিনী সকল কালভার্ট ও রেলসেতু ধ্বংস করে এবং হাঁটার রাস্তা ও রেলপথে মাইন স্থাপন করে।

 

তারা ক্ষুদ্র অস্ত্র ও গ্রেনেড দিয়ে প্রধান সড়কে সাতটি অতর্কিত আক্রমন করে ১০০ রাজাকার ও ৬০ সেনা মেরে ফেলে। এতে সামরিক কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করা হয় যেন তারা পার্শ্ববর্তী স্থানগুলোতে সরবরাহে হেলিকপ্টার ব্যাবহার করে। ঢাকা শহরে  মতিঝিল, ধানমন্ডি,বেইলি রোড ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় মুক্তিবাহিনীর গুরুতর আক্রমন হয়েছে। এমনকি সামরিক আইন প্রশাসনের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্তেও ঢাকা শহরের পোস্তগোলায় অবস্থিত পাওয়ার সাপ্লাই স্টেশন উড়িয়ে দেয়া হয়। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন থেকে শুরু করে বিদ্যুৎকেন্দ্র,  রাজ্যব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এবং রেডিও স্টেশনের চারপাশে সেনাবাহিনী আট মিটার উঁচু দেয়াল তৈরি করে।

 

১৯৭১ সালের ১৭ অক্টোবর, ঢাকা থেকে গার্ডিয়ান পত্রিকায় জনাব মার্টিন উলাকোট লেখেনঃ

 

“নতুন গেরিলা দল গত তিন সপ্তাহে ঢাকায় ঢুকে পড়ে একটি সবল আক্রমন শুরু করে পরিস্থিতি অশান্ত করে ফেলে। যার শুরু হয়েছিলো সেপ্টেম্বরে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বোমা মারার পর থেকে।

 

নতুন দলগুলো ঢাকা বিমানবন্দর গুড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে।  ঢাকা স্যাটেলাইট বন্দরে অসংখ্য গ্যাস পাইপ এবং চালানের জন্য অপেক্ষারত বিপুল পরিমাণ পাট পুড়িয়ে দেয়।শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার প্রচারাভিযান অংশ হিসেবে তারা ছাত্রছাত্রীদের সতর্কীকরণ করে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল স্কুলে বোমাবর্ষণ করে।এক মেয়ে সতর্কবার্তা না পাওয়ায় গুরুত্র আহত হয়েছিল ।

 

এছাড়াও চার দিন আগে জনাব এর,আবদুল মোনেম খানের হত্যাকাণ্ডের জন্য গেরিলা বাহিনীকে দায়ী বলে মনে করা হয় ,যিনি  প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের অধীনে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন।কিছু অ-বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয় দলের আশা ছিল তিনি রাজনীতিতে ফিরে আসবেন। কিন্তু কেউ কেউ মনে করেন এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে  ব্যক্তিগত প্রতিশোধমূলক উদ্দেশ্যও থাকতে পারে।

.

ঢাকার শহরতলীতে অবস্থিত জাতিসংঘের সদরদপ্তরে দুই রাত পূর্বে একটি গ্রেনেড ছোড়া হয়, কিন্তু বিস্ফোরিত হয় নি। ঘটনাটি জাতিসংঘের জন্য আশংকাজনক।

 

বিমানবন্দরে আক্রমণের প্রচেষ্টাছিল সামরিক কর্তৃপক্ষের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা। তিন ইঞ্চি বোমা, আসলে কলেরা পরীক্ষাগারের উপর পড়েছিলো। এই সম্পর্কে অনেক অজ্ঞানতায় ছিল যতক্ষণ পর্যন্ত না উপলব্ধি করা হয় যে পরীক্ষাগারটি বিমানঘাঁটি সঙ্গে সরাসরি সঙ্গতিপূর্ণ, এবং ওই কার্তুজ অগ্রসরমান পর্যবেক্ষক কর্তৃক লক্ষ্যস্থির না করেই ছোঁড়া হয়েছিল যা মাঠের মাত্র ৬০০ গজ আগে পতিত হয়েছিল।

 

এই ঘটনা এবং অন্যান্য ঘটনার ফলস্বরূপ ঢাকার পুলিশ এবং আর্মি চিন্তীত ছিল এবং পূর্ন সতর্ক ছিল। বসবাসকারীরা বলেন কয়েক সপ্তাহ পূর্বের তুলনায় শহরের সৈন্য সংখ্যা, চেকপয়েন্ট এবং গুরুত্র্বপূর্ন ভবনে পাহারা বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

এর কিছুদিন আগে থেকে ঢাকার ঠিক বাইরের এলাকা ময়মনসিংহে সড়ক ও রেল যোগাযোগে আক্রমন করা হয়েছিলো। ৪ দিন পূর্বে গেরিলারা ঢাকার উত্তরে টঙ্গী ও নরসিংধির মধ্যবর্তী একটি রেলওয়ে সেতু উড়িয়ে ফেলে। ইঞ্জিন এবং কিছু বগি নদীতে পড়ে যায়। একটি প্রতিবেদন অবলম্বনে, পাকিস্তানের পত্রিকা সেতুতে আক্রমনের কথা নিশ্চিত করেছে কিন্তু হতাহতের সংখ্যা খুব কম বলে উল্লেখ করেছে।

 

এখানকার সূত্র জানায় যে মূলত ছাত্রদের নিয়ে নতুন গ্রুপগুলো তৈরি হয় । তারা যেখানে বাস করতো এবং যেখানে তাদের পরিবার এখনো বাস করে, তাদেরকে সেই সকল আলাকায় নিয়োগ করা হয়। কেউ কেউ, প্রকৃতপক্ষে, ২ সপ্তাহের প্রশিক্ষণের সময়টুকু ছাড়া মার্চের পর কখনো ‘শহর ত্যাগ করে নি।

 

তাদের সমর্থনের জন্য, সামরিক কর্মে যে সকল রাজনৈতিক দল অংশগ্রহন করে নি, তারা নিজ পক্ষের সমর্থকদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে। এভাবে রাজনৈতিক দল গুলোর সুসংঘটিত উত্থান হয়েছিল। কিন্তু তারা কলকাতায় মুদ্রিত একটি গোপন খবরের কাগজ বের করা এবং বাংলাদেশে  বিতরণ করা শুরু করতে সক্ষম হয়েছে।

 

সীমান্ত শহরে গোলা বর্ষণে মেডিকেলের ছাত্র ও বেসামরিক জনগণের হতাহতের মত দুর্ঘটনা সত্ত্বেও সেনাবাহিনীর বর্বরতা সম্পর্কে রিপোর্ট মুক্তিবাহিনীর প্রতি জনসাধারণের সহানুভূতি বাড়িয়ে তোলে।

 

প্রকৃতপক্ষে, সেনাবাহিনীর প্রতি জনগণের মনোভাব এখন এমনই যে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীই এসব গোলাবর্ষণ করছে এ জাতীয় গুজব রটে যাচ্ছে। গুজবটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন; তবুও এ জাতীয় সংবাদই ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হচ্ছে।

 

প্রদেশের অন্যত্র, মুক্তিবাহিনীর অধ্যুষিত এলাকাগুলো থেকে তাদের বিতাড়িত করতে পাকিস্তান আর্মি তেমন অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি বলেই মনে হয়।