২৩৫. ৪ নভেম্বর রাজনৈতিক সমঝোতা সোনার পাথর বাটি

Posted on Posted in 6

শফিকুল ইসলাম

<৬,২৩৫,৩৯৪-৩৯৫>

শিরোনামসংবাদপত্রতারিখ
রাজনৈতিক সমঝোতা সোনার পাথরটিদেশ বাংলা
১ম বর্ষঃ ২য় সংখ্যা
৪ নভেম্বর, ১৯৭১

 

রাজনৈতিক সমঝোতা সোনার পাথরটি

(রাজনৈতিক ভাষ্যকার)

পর পর কয়েকটা আলোচনা শেষে প্রকাশিত যুক্ত ইশতেহারে, বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদদের বিবৃতিতে এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে উদাসীন এমন অনেকগুলো দেশের রাষ্ট্র প্রধানদের বিবৃতি ও সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের কথা বার বার উচ্চারিত হয়েছে এবং হচ্ছে। এই রাজনৈতিক সমাধানের জন্য কারো কারো মতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আলোচনা হতে হবে। আবার কারো কারো মতে, ইদানিং সে মতটাই প্রাধান্য পাচ্ছে, ’৭০-এর নির্বাচনে নির্বাচিত গণ-প্রতিনিধিগণ আর বর্তমানের একনায়কত্ববাদী সামরিক জান্তার মধ্যে আলোচনার মাধ্যমেই সে রাজনৈতিক সমাধান পেতে হবে। এ ব্যাপারে ভারতের বক্তব্য স্পষ্ট। বাংলাদেশ সমস্যা ভারত পাকিস্তান থেকে উদ্ভুত নয়। কাজেই ভারতের এ ব্যাপারে আলোচনায় বসার প্রশ্নই ওঠে না।

তাহলে আলোচনা যদি হতেই হয় তা হতে পারে কেবল বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সাথে ইয়াহিয়া চক্রের। কিন্তু লক্ষ্য করার বিষয় এই যে, রাজনৈতিক ‘সমাধান’টা কি হতে পারে তা কেউই উল্লেখ করছেন না। অর্থাৎ প্রস্তাবকদের মতে কোন রকম পূর্বশর্ত ছাড়াই দু’পক্ষকে আলোচনায় বসতে হবে এবং সমাধানের সূত্র বের করতে হবে। অর্থাৎ ২৫শে মার্চের আগে ব্যর্থ দ্বি-পাক্ষিক আলোচনায় ফিরে যেতে হবে।

আমরা ধরে নিলাম রাজনৈতিক সমাধানের জন্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকেরা বসলেন। তখন তাঁদের সামনে আলোচ্যসূচী কি হতে পারে এবং দু’পক্ষের দেওয়া নেওয়ার সুযোগ কতটা বিদ্যমান রয়েছে তা ভেবে দেখা যাক।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরবর্তী পর্যায়ে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের যে সব জটিলতা দেখা দিয়েছিল এবং পরবর্তী ২৩ বৎসরে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে বারংবার যেভাবে বিপর্যয় এসেছে তার মূল কারণগুলি অনুসন্ধান করলে নিম্নলিখিত কয়েকটি সত্য পরিষ্কার হয়ে ধরা পড়বে।

ক) পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে পূর্বাঞ্চলের জনসংখ্যা ছিল শতকরা ৫৬ জন, পশ্চিমাঞ্চলের শতকরা ৪৪ জন। স্বভাবতই এ দেশে নিয়মতান্ত্রিক পার্লামেন্টারী রাজনীতি চালু থাকলে সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের প্রাধান্য অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়ে।

খ) সংখ্যালঘিষ্ঠ পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষতঃ পাঞ্জাব, ঐতিহাসিক কারণে প্রশাসন, অর্থনিতি এবং দেশরক্ষা বিভাগে একচেটিয়া কর্তৃত্বের অধিকারী। দেশে নিয়মতান্ত্রিক পার্লামেন্টারী ব্যবস্থা চালু হতে দিলে সংখ্যালঘিষ্টের একচেটিয়া কর্তৃত্ব বিলুপ্ত হতে বাধ্য। এমতবস্থায় পাঞ্জাবী নেতৃত্বের পক্ষে সম্মিলিত পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক শাসন চালু হতে দেওয়া আত্মহত্যার সামিল।

গ) দুই অঞ্চলের জন্য ছয়দফা ভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন কায়েমরেখে কেন্দ্রের জন্য সমতার ভিত্তিতে ফেডারেল শাসনতন্ত্র প্রণয়নের যে দাবী মুজিব ১৯৬৬ সালে পেশ করেছিলেন পশ্চিমা রাজনীতিকরা এখন পর্যন্ত তাকেই মেনে নিতে পারেন নি। এমতবস্থায় কনফেডারেশন গঠনের তাদের প্রস্তাব সম্মত হবার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীন। কারণ তাহলে তাঁদের স্বদেশে তাঁরা এতদিনের গোয়ার্তুমীর পরিণতির জন্য ধিকৃত হবেন এবং প্রত্যেকেরই সমাধি রচিত হবে।

ঘ) সম্মিলিত পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলে এক ইউনিট বাতিল হয়ে চারটি প্রদেশ হয়েছে। এখন বাংলাদেশ যে অধিকার ভোগ করবে, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রদেশগুলিও তাই ভাগ করবে। কিন্তু বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে তা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের বিপরীতে ‘পশ্চিম পাকিস্তান’ ধরনের একটি সম্মিলিত কাঠামো খাড়া না রাখলে কোন সমাধানই কার্যকর হবে না। কিন্তু তা হবে এক ইউনিট ব্যবস্থারই পুনঃপ্রবর্তন, যেটা পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষুদ্রতর প্রদেশগুলি মানবে না। আর এক ইউনিট পুনর্বহাল করার অর্থ হবে প্যারিটিতে ফিরে যাবার পায়তাঁরা, বাংলাদেশের মানুষ বহু পূর্বেই যা ডাষ্টবিনে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় যে কোনভাবেই হোক পাকিস্তানের প্রতি বাংলার মুসলমানদের পূর্ণ আনুগত্য আদায় করা সম্ভব হয়েছিল। সে আনুগত্য এমনই ছিল যে সেদিনের বাঙালী মুসলমান ফজলুল হক সোহরাওয়ার্দীর মত নিজ দেশের নেতাদের দূরে হটিয়ে দিয়ে জিন্না-লিয়াকত আলীর পায়রবি করেছে। কিন্তু সেই আনুগত্যকে বশ্যতা হিসাবে ধরে নিয়ে পাঞ্জাবী রাজনীতি যেভাবে ২৪টি বছর দেশটাকে ব্যক্তি মালিকাধীন সম্পত্তির মত ব্যবহার করেছে তাতে করে পরিস্থিতির এখন আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। ইতিমধ্যে পদ্মা-মেঘনা ও সিন্ধু নদীতে অনেক পানি গড়িয়ে গেছে। আর সম্ভবতঃ পাকিস্তান নামক দেশটির রাষ্ট্রীয় ভিত্তিও তাতেই ভেসে গেছে।

কিন্তু সে কথা বাদ দিলেও যেটা মৌল প্রশ্ন তা হচ্ছে এই-পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে বাঙালীদের অবস্থান সম্ভব করে তোলার জন্য যে নির্ভেজাল গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র প্রণয়ন এবং ‘বহাল রাখার নিশ্চয়তা’ প্রয়োজন, পাঞ্জাবী শাসকচক্র তাতে কোন অবস্থাতেই রাজী হতে পারে না। পাঞ্জাবীরা আপাততঃ যদি অবস্থার চাপে পড়ে, কোন প্রকার নমনীয় মনোভাব প্রদর্শন করেও তবে তা বাঙালীদের নিকট বিশ্বাসযোগ্য হবে না। কারন, পাঞ্জাবীচক্রের অতীত কার্যকলাপ এবং বর্তমানের মানসিকতা সন্ধেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, তারা কেব পরবর্তী সুযোগেরই অপেক্ষায় থাকবে। এবং নিজেদের সুবিধাজনক ষ্ট্রাটেজী কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের অভ্যান্তরে পা রাখার জায়গাটুকু নিতে পারলেই পুনরায় নগ্নরুপে ফিরে যেতে দ্বিধা করবে না।

কাজেই আন্তর্জাতিক চাপ যতই আসুক, পাকিস্তানের মধ্যে বাংলাদেশের প্রত্যাবর্তনে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান মিলবে না। দু’টি পরস্পরবিরোধী স্বার্থের এবং পরস্পর বিদ্বিষ্ট মনোভাবের ধারক অঞ্চলকে এক জোয়ালে বেধেঁ রাখার চেষ্টা করে লাভ নেই। এটা অবাস্তব এবং প্রকৃতির ধর্মের বিরোধী। বর্তমান যুগে রাষ্ট্রযন্ত্র হচ্ছে নির্দিষ্ট জনসমষ্টির সর্বাধিক কল্যাণের জন্য নির্মিত স্বেচ্ছামূলক সংগঠন। যে ক্ষেত্রে এক অঞ্চলের রাজনৈতিক ধ্যান-ধারনা, সামাজিক চেতনা ও সংস্কৃতিক উত্তরাধিকার অপর অঞ্চলের চাইতে সম্পূর্ণ পৃথক, যে ক্ষেত্রে এক অঞ্চলের অর্থনৈতিক শক্তির উন্মেষ অপর অঞ্চলের উপর বেনিয়া শোষনের পথ প্রশস্ত করে, যে ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের সহজ ও স্বাভাবিক বিকাশ অঞ্চল বিশেষের প্রাধান্য অনিবার্য করে তোলে, সে ক্ষেত্রে একই রাষ্ট্রীয়তা অবৈজ্ঞানিক। শ্যামদেশের সেই যমজ ভ্রাতৃদ্বয়ের মত একের পিঠের সাথে অপরের সংযুক্ত অবস্থা উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।

কাজেই অপারেশনের কাজ যত তাড়াতাড়ি শেষ হয় ততই মঙ্গল।