২৩৬. ১১ নভেম্বর সম্পাদকীয়ঃ সাড়ে সাত কোটি হোসেন আলী

Posted on Posted in 6

শফিকুল ইসলাম

<৬,২৩৬,৩৯৬>

শিরোনামসংবাদপত্রতারিখ
সম্পাদকীয়

সাড়ে সাত কোটি হোসেন আলী

দেশ বাংলা
১ম বর্ষঃ ৩য় সংখ্যা
১১ নভেম্বর, ১৯৭১

 

সম্পাদকীয়

সাড়ে সাত কোটি হোসেন আলী

নয়া দিল্লীর পাকিস্তানী দূতাবাসটি এখন বাঙালীশূন্য। না, অন্ততঃ একজন বাঙালী এখনো সেখানে আছেন। তিনি জনাব হোসেন আলী, হাই কমিশনারের একান্ত সচিব।

রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত দেহে দিল্লীর পাকিস্তানী হাইকমিশন ভবনের কোন একটি চোরা কুঠুরীতে তিনি অসহ্য উৎপীড়নের শিকার হয়ে রয়েছেন। দিল্লীর ছাত্ররা বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। অবুঝ ছেলে দুটি পিতার মুক্তির জন্য ধরনা দিতে গিয়ে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে। অসহায় সহকর্মীরা চুটোছুটি করছেন। কিন্তু কুটনীতির কূট প্রভুরা নীরব নইথর। আইনের দৃষ্টিতে তিনি পাকিস্তানের ‘নাগরিক’,যে নাগরিকত্ব তিনি ঘৃনাভরে ছুড়ে ফেলেছেন তাঁর আর আর সহকর্মীদের সাথে। কিন্তু তথাকথিত সভ্য জগতের আন্ত্ররজাতিক আইনের কীটদষ্ট পুস্তকের ভাষ্য তাঁরনুকুলে নয়। সাড়ে সাত কোটি স্বজাতির সাথে একাত্ম হয়ে যে পৃথক জাতীয় সত্তার গৌরব মাথা তুলে দাড়াঁতে চেয়েছেন তিনি, তার স্বীকৃতি মেলেনি সভ্যতার মুরব্বীদের কাছে। অতএব পাকিস্তানী বন্দীশালায় নিষ্ঠুরতম মৃত্যুকেও যদি বরণ করতে হয় তাঁকে, কুটনীতির ঠান্ডা মস্তিস্কের কসাইদের কাছে তার বুঝি কোন প্রতিকারই পাওয়া যাবে না।

জনাব হোসেন আলীর অপরাধ তিনি তাঁর লক্ষ লক্ষ স্বদেশবাসীর দুঃখ যন্ত্রনার দিকে চোখ বুঁজে থাকতে পারেন নি। নয়াদিল্লীর পাকিস্তানী দূতাবাসটির অভ্যান্তরে দিনের পর দিন বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের বিরুদ্ধে জঘন্য ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হতে দেখে স্থির থাকতে পারেননি। চাকুরীর মায়া ত্যাগ করে অনির্দিষ্ট ভবিষ্যত্মাথায় করে সর্বস্বান্ত স্বদেশবাসীর পাশে এসে দাঁড়াতে চেয়েছেন।

নয়া দিল্লির দুতাবাসে তিনি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে সমাসীন। পাকিস্তানী জঙ্গি চক্রের ষড়যন্ত্রের গোপন তথ্যাবলী তাঁর জানা থাকার কথা। সম্ভাবতঃ সেই কারণেই ইয়াহিয়া চক্র ক্ষেপা কুকুরের মত তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

কিন্তু ইয়াহিয়া চক্রের জিন্দাখানায় হোসেন আলী একা নন, সাড়ে সাত কোটি বাঙালী আজ পাকিস্তান নামক বন্দীশালায় এমনিভাবে অত্যাচারের অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন। তাঁদের সবার পিঠেই আঘাতের চিহ্ন, সবার বুকেই বিক্ষোভের আগুন, সবার চোখেই ঘৃনার বিচ্ছুরণ। তাদেরও অপরাধ তারা ইয়াহিয়ার পাকিস্তানের নাগরিকত্বে পদাঘাত হেনে নয়া নাগরিকত্বের সদস্য ঘোষনায় কন্ঠ দিয়েছে।

দুনিয়ার মানুষ জেনে রাখুক, সাড়ে সাত কোটি হোসেন আলী প্রিয়তম স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য এই মৃত্যুযন্ত্রনাকে বরণ করেই নিয়েছে। এই যন্ত্রণার এই নিপীড়নের আগুনে পুড়েই সোনার বাংলা ‘সোনার চেয়েও খাটি’ হয়ে উঠেছে। অত্যাচারেই বাংলার উন্মেষ। অত্যাচারই বাঙালীর ঐক্যের ভিত। অতএব, মাভৈঃ হোসেন আলীর মুক্তির আর বিলম্ব নেই!