২৪৩. ৯ ডিসেম্বর সম্পাদকীয়ঃ কালরাত্রির অবসানে নতুন সূর্যের অভ্যুদয়

Posted on Posted in 6

আব্দুল্লাহ আল নোমান

<৬,২৪৩,৪১০-৪১১>

শিরোনামঃ সম্পাদকীয় কাল রাত্রির অবসান নতুন সূর্যের অভ্যুদয় 

সংবাদপত্রঃ দেশ বাংলা (১ম বর্ষঃ ৬ষ্ঠ-৭ম সংখ্যা)

তারিখঃ ৯ ডিসেম্বর, ১৯৭১

সম্পাদকীয়

 

কাল রাত্রির অবসানঃ নতুন সূর্যের অভ্যুদয় 

স্বাধীন গণপ্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন ভারত সরকার। সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীর অকৃত্রিম সুহৃত ভারত প্রতিবেশির প্রতি, মানবতার প্রতি, সর্বোপরি গণতন্ত্রের প্রতি তার দায়িতে পালন করেছে পরিপূর্ণভাবে। দেশ বিভাগের ডামাডোলে বাংলার শ্যামল মাটিতে সাম্রাজতবাদী প্রতিক্রিয়ায় যে বিষবৃক্ষটি শিকড় গেড়ে বসেছিল, দীর্ঘ চব্বিশটি বছর সকল ন্যায়নীতি,সকল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পদলদলিত করে উপ-মহাদেশের বুক হিংসার রাজনীতি, দস্যুতার রাস্ট্রনীতি এবং শোষণের অর্থনীতি কায়েক রাখার চক্রান্ত চালিয়ে এসেছে, বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনতা এবং সংগ্রামরত মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় এগিয়ে গিয়ে ভারতের বীর সেনাবাহিনী আজ তার গোড়া ধরে টান দিয়েছে। এই উপমহাদেশের শান্তি আর সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় তাই একটি অন্ধয়ার যুগের অবসান, আরেকটি আলোকজ্জ্বল নতুন যুগের উদ্বোধন।

পাকিস্তানী দস্যুবৃত্তির বিষদাঁত ভেঙ্গে ফেলার সাথে সাথে ভারত বাংলা উপমহাদেশের আগামি দিনেও শান্তি ও সমৃদ্ধির নতুন দুয়ার উন্মুক্ত হলো। গত চব্বিশ বছর এই দরিদ্র উপমহাদেশের সীমিত সম্পদের অংশ যুদ্ধ প্রস্তুতি এবং পরস্পারিক হানাহানির মাশুল জোগাতেই নিঃশেষ হয়ছে।

এখন থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের পারস্পারিক হৃত্যতা, সহযোগিতা ও পরস্পর নির্ভরশীলতার পটভুমিতে পটভুমিতে উওমহাদেশের সক সম্পদ শান্তিও সমৃদ্ধির কাজে লাগানো সম্ভব হবে। বহিঃশত্রুর আক্রমণের আশংকামুক্ত পরিবেশে দু’দেশেও নিজ নিজ জাতীয় সম্পদের পরপূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। ভিক্ষাপাত্র হাতে বিদেশী সাম্রাজ্যবাদেরর দ্বারে দ্বারে ঘুড়ে বেড়াতে হবে না।

বলা বাহুল্য কেবল ভারত-বাংলা উপমহাদেশের জন্যই নয়, বিশ্বরাজনীতির ক্ষেত্রেও উপমাহদেশের আভ্যন্তরীণ সংঘাতের অবসান এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা যুগান্তকারী তাৎপর্য রয়েছে। আগামী দিনের বিশ্বরাজনীতিতে এই উপমহাদেশ অন্যতম প্রধান “বৃহৎশক্তি” হসেবে গণ্য হবে, একথা আজ নিশ্চিত রূপেই বলা চলে।

.

আজকের দিনে আমরা স্বরণ করি তাদের যাঁদের প্রানের মূল্যে, ত্যাগ-তিতিক্ষায় অর্জিত হয়েছে স্বাদীনতার এই স্বর্ণফসল। স্মরণ করি তাঁদের যাঁরা আজো বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে স্বাধীনতাকে বাস্তব্ রুপে দেবার জন্য নিরলসভাবে সংগ্রাম করে চলেছেন। সর্বোপরি স্মরণ করি স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, বাংলার মানুষের প্রাণপ্রিয় নেতা, প্রেসিডেন্ট মুজিবকে, যিনি আজও স্বদেশ-স্বজন থেকে বহু দূরে দস্যুশিবিরে বন্দীদশায় রয়েছেন। তাঁর সোনার স্বদেশ মুক্ত হয়েছে। তিনিও মুক্ত হবেন। সেদিন আর দূরে নয়।

এই মহাল্গনে আমরা ভারত সরকার, ভারতের জনগণ, সোভিয়েট সরকার সোভিয়েট জনগ্ণ এবং বিশ্বের অন্যান্য গণতন্ত্রকামী মানুষ, যাঁরা আমাদের দুঃখদিনের সাথী হয়েছেন, সাহায্য সহানুভুতি দিয়ে আমাদের সংগ্রামকে সাফল্যের দিকে এগিয়ে নিয়েছেন তাঁদেরসবাইকে ‘দেশবাংলা’র পক্ষ থেকে এবং বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। বাংলাদেশের জনগণ স্বাদীনতার, সার্বভৌমত্ব এবং বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের চূড়ান্ত উন্মেষের জন্য হাজারে হাজারে, লাখে লাখে প্রান দিয়েছে। আগামী দিনেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য তারা এমনিভাবে চিরজাগ্রত প্রহরী হয়ে থাকবে। কিন্তু শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য, মানবতার জন্য এবং বিশ্বের শোষিত, বঞ্চিত, সংগ্রামরত জাতি সমূহের শৃংখল মুক্তির জন্য বাংলাদেশ সবার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েই সংগ্রাম করবে। আজকের দিনে এই হোক আমাদের ব্জ্র কঠিজ শপথ।