২৫৪. ২৫ নভেম্বর সম্পাদকীয়ঃ আঘাতের পর আঘাত হানুন

Posted on Posted in 6

কম্পাইলারঃ এফ এম খান

<৬,২৫৪,৪৩০-৪৩১>

সংবাদপত্রঃ আমার দেশ

তারিখঃ ২৫ নভেম্বর, ১৯৭১

সম্পাদকীয়

 

আঘাতের পর আঘাত হানুন

ক্ষুধিত বাংলায় রক্তের আবিরে রাঙ্গানো স্বাধীনতা সূর্য উদিতপ্রায়।পাক জঙ্গী চক্রের পাশবিক তাণ্ডবের প্রতিশোধ নেয়ার দুর্বার স্পৃহার আঘাত-জর্জর বীর মুক্তিবাহিনী রক্তাক্ত বাংলার সর্বত্র শত্রু হননের  মহোৎসব শুরু করিয়া দিয়াছেন।শত্রুদের হাত হইতে কাড়িয়া নেওয়া অস্ত্র দিয়া পাক জানোয়ারদের বিষদাঁত ভাঙ্গিয়া দিয়া বাংলার পবিত্র মাটিকে শত্রুমুক্ত করিতেছেন।পবিত্র ঈদুল ফিতরে বিক্ষুব্ধ বাঙ্গালীরা শোকার্ত জীবনের জমাট বাঁধা পাষাণকে ইস্পাত রুপান্তরিত করিয়া করিয়া পাষণ্ড ইয়াহিয়ার বর্বর বাহিনীর উপর সর্বাত্মক আক্রমণ ভালাইয়া তাহাদের যুদ্ধোন্মাদনার খায়েশ চিরতরে মিটাইয়া দিতেছে।ক্ষিপ্তগতিতে সুসংগঠিত হইয়া মুক্তিবাহিনী দুর্বার গতিতে শত্রুদের উপর ঝাঁপাইয়া পড়িয়া শত্রুদের শক্ত ঘাঁটিগুলি নাস্তানাবুদ করিয়া দিতেছে।ফাঁদে পড়া জন্তুর মতো স্থুলবুদ্ধি ইয়াহিয়া ও তাহার জঙ্গী জেনারেলরা বাংলাদেশে সন্মুখে ও গেরিলা যুদ্ধে আটকা পড়িয়া নতুন নতুন চালবাজী করিয়া পরাজয়ের গ্লানিকে চাপা দিবার অপপ্রয়াসে লিপ্ত হইয়াছে।তাই বাংলাদেশের কেদো মাটিতে আটকা পড়া পাক জঙ্গীশাহীকে টানিয়া তুলিবার জন্য ইয়াঙ্কি নিক্সন ও তাহার সাঙাতরা তলে তলে দিশেহারা ইয়াহিয়া ও তাহার সাগরেদদের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ও পশ্চিম পাকিস্তান-ভারত সীমান্তে সৈন্য মোতায়েন করিয়া ভারতের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ চালাইয়া যাইবার পরামর্শ  দিয়াছে।তাহাদের পরামর্শ অনুযায়ী ইয়াহিয়া সীমান্তে বিপুল সৈন্য সমাবেশ করিয়া ভারত ভূখণ্ডে অনবরত গোলাগুলি নিক্ষেপ  করিতেছে এবং সঙ্গে সঙ্গে কপাট ইয়াহিয়া জঘন্য মিথ্যর বোসাতি করিয়া ‘ ভারতীয় হামলা’ জিগির তুলিয়া বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা ও পাক বাহিনীর মধ্যকার যুদ্ধকে পাক-ভারত  অঘোষিত যুদ্ধ বলিয়াখেঁকি কুকুরের মতো তার স্বরে চীৎকার করিতেছে।সঙ্গে সঙ্গে গণহত্যা ও গণতন্ত্র হত্যার আন্তর্জাতিক নায়ক নিক্সন ও তাহার গেঁউরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে পাক-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষ  বলিয়া উত্তেজনা প্রশমনের জন্য উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের অযাচিত উপদেশ বর্ষণ করিতে শুরু করিয়াছেন।

.

ইহদের এইরূপ অযাচিত উপদেশের মধ্য যে হীন চক্রান্তের জড়াইয়া রহিয়াছে তাহা সহজেই অনুমেয়।বাংলাদেশে দীর্ঘ আট মাস ধরিয়া ইয়াহিয়ার জল্লাদ বাহিনীর নারকীয় হত্যাকাণ্ড যখন বিনা বাধায় সংগঠিত হইয়াছে তখন এই সব উপদেশ  বর্ষণ করা হয় নাই।বরং অর্থ অস্ত্র ও পরামর্শ দিয়া ইয়াঙ্কি নিক্সন বাংলাদেশকে চূর্ণবিচূর্ণ ও ধ্বংস করার প্রত্যক্ষ মদত দিয়াছে।মাও-নিক্সন এশিয়ার ভারসাম্য রক্ষার যূপকাষ্ঠে বাংলাদেশকে বলি দিয়া উপমহাদেশের পানি ঘোলা করিয়া তাহাদের হীন জাতীয় স্বার্থ লুটিবার তালে মত্ত হইয়াছে।ইহাদের কাছে মানবতা ও বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।

.

এদিকে মুক্তিবাহিনীর মৃত্যু-ভাবনাহীন যোদ্ধাদের অব্যর্থ ও শানিত অস্ত্রের আঘাতে বাংলাদেশে পাষণ্ড ইয়াহিয়ার জল্লাদ বাহিনী যখন কদলী বৃক্ষের মতো ঢলিয়া পড়িতেছে তাহাদের সমর বূহগুলো যখন ফুঁৎকারে উড়িয়া যাইতেছে তখন ইয়াহিয়ার প্রভুদের মধ্যে কেউ কেউ আন্তর্জাতিক আমলাদের বৈঠকখানা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরী অধিবেশন ডাকার তোড়জোড় করিতেছে।যদি নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ভারতকে জড়িত করিয়া মুক্তিযুদ্ধকে পাক-ভারত সংঘর্ষ  হিসাবে রূপ দিয়া বিরোধ মীমাংসার নামে কাল হরণ করিয়া দিশাহারা ও পতনোন্মুখ পাক বাহিনীকে দম ফেলিবার সুযোগ দেওয়া যায় তাহা হইলে বাংলার স্বাধীনতাকে ঠেকানো সম্ভব হইবে।

.

আন্তর্জাতিক চক্রান্তের এই সন্ধিক্ষণে সারা বাংলাদেশের মুক্তিকামী সাড়ে সাত কোটি জনতা ও মুক্তিযোদ্ধারা আজ এক বিরাট অগ্নিপরীক্ষার সন্মুখীন। অতীতে আমরা বহু আন্তর্জাতিক চাল ও চক্রান্ত ব্যর্থ করে দিয়েছি।এইবারকার সর্বশেষ আন্তর্জাতিক চক্রান্তকেও আমাদের যে কোন মূল্যে ব্যর্থ করিয়া দিতে হইবে।তাই বাংলার এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত ভিতরে ও বাহিরে সম্মুখ সমরে ও গেরিলা পদ্ধতিতে এবং প্রতিরোধ ও অসহযোগিতায় ক্লান্ত ও হীনবল শত্রুবাহিনীকে আঘাতে আঘাতে লণ্ডভণ্ড করিয়া লাখ লাখ বাঙালী হত্যার প্রতিশোধ নিতে হইবে এবং সমগ্র দেশে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসনিক কতৃত্ব  ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করিতে হইবে  যাতে করিয়া আন্তর্জাতিক কুচক্রীর  বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে কোন রকমেই ঠেকানোর সুযোগ না পায়।

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের চার পর্যায়ে এখনো যাহারা বাধ্য হইয়া শত্রুর সঙ্গে সহযোগীতা করিয়া চলিয়াছেন তাহাদের এখন মুখ ফিরাইয়া দাঁড়াইবার সময় আসিয়াছে।শত্রুরা আজ চারদিক দিয়া কোণঠাসা ও অবরুদ্ধ। এই মহেন্দ্রক্ষণে শত্রুদের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইয়া শত্রুদের নড়বড়ে ও ভঙ্গুর প্রশাসন ব্যবস্থাকে  বানচাল করিয়া দিন।অনুতাপহীন রাজাকার ও দালালদের প্রতি  আমাদের কো বক্তব্য নাই। তাহাদের বিদেশী প্রভুদের মতো তাহাদিগকেও একই পরিণতি বরণ করিতে হইবে এবং তাহাদের সেই পরিণতি হইলো গ্লানিকর মৃত্যু-একথা  আমাদের প্রধানমন্ত্রী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করিয়াছেন।সুতারাং আমাদের আবেদন-শত্রুদের উপর আঘাতের পর আঘাত হানুন, ওদের নিশ্চিহ্ন করিয়া দিন।