২৫৭. ২৫ নভেম্বর মুক্তাঞ্চলের জনগণের প্রতি পূর্বাঞ্চলীয় প্রসাশনের বক্তব্য

Posted on Posted in 6

সজীব বর্মণ

<৬,২৫৭,৪৩৫-৪৩৭>

 

মুক্তাঞ্চলের জনগণের প্রতি

 পূর্বাঞ্চলীয় প্রশাসনের বক্তব্য

   আমার দেশ

 বাংলাদেশঃ ১৩শ সংখ্যা

  ২৫ নভেম্বর, ১৯৭১

.    

মুক্তাঞ্চলের জনগণের প্রতি পূর্বাঞ্চলীয়

                       প্রশাসনের বক্তব্য

    বাংলাদেশের প্রায় এক তৃতীয়াংশ এলাকা বর্তমানে বীর বাংলার মুক্তিপাগল সেনারা দখল করে নিয়েছে এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসন ব্যবস্থাও চালু হয়েছে। বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী ও গেরিলাদের মাত্র খেতে খেতে পাক বর্বর সেনারা দিন দিন মনোবল হারিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে। সেদিনও হয়ত বেশী দূরে নয় যেদিন সমস্ত বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত এবং স্বাধীন সার্বভৌম ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রুপে বিশ্বের মানচিত্রে সোনালী অক্ষরে “সোনার বাংলা” স্থান পাবে।

    বাংলাদেশের যে সকল এলাকা পূর্বে মুক্ত হয়েছে, সদ্যমুক্ত এলাকার সম্মুখে শত্রু সেনাদের বিবর ঘাঁটি অবস্থিত, সে সকল এলাকার জনসাধারণ নানা অসুবিধার মধ্যে দিনযাপন করছেন। তাদের সুষ্ঠু জীবনধারণ, স্বাধীনতা যুদ্ধে লিপ্ত বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী ও গেরিলা বাহিনীর যুদ্ধ কার্যে অগ্রগতির জন্য বাংলাদেশের সরকার মুক্ত এলাকায় অসামরিক প্রশাসন ব্যাবস্থা চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রশাসন ব্যবস্থার সহিত মুক্তাঞ্চলের জনগণের সহযোগিতা একান্তভাবে কামনীয়। প্রশাসন ব্যাবস্থার যে অস্থায়ী কাঠামো এবং কার্যকরী হতে যাচ্ছে তাঁর বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরুপ।

    বিচার বিভাগঃ- জনগণ নানাবিধ সমস্যার মধ্যে জীবন যাপন করছেন। নিজেদের মধ্যে কোন বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে চেষ্টা করবেন না। আপনাদের নানাবিধ সমস্যা সম্পর্কে সরকার সম্পূর্ণরুপে সচেতন, আপনার নিকটস্থ গণপ্রজাতন্ত্রী বানহ্লাদেশ সরকারের প্রতিনিধির নিকট আপনার সমস্যাবলী পেশ করুন। মনে রাখসেন, এ সরকার আপনার দ্বারা গঠিত, আপনার জন্য।

    পুলিশ বাহিনীঃ- যুদ্ধকালীন অবস্থায় নিরীহ গ্রামবাসীদের দুষ্কৃতিকারী ও অশান্তি সৃষ্টিকারীদের সম্মুখীন হতে হয়। মুক্তিবাহিনী নামধারী কতিপয় দুষ্কৃতিকারী জনগণের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি করার চেষ্টা করতে পারে। আপনার নিকটেই পুলিশ বাহিনী রয়েছে- আপনারই শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য। সুতরাং যখনই কোন দুষ্কৃতিকারী ও অশান্তি সৃষ্টিকারী টাউটের সম্মুখীন হবেন তখনই পুলিশ বাহিনীর হাতে তাদেরকে সমর্পন করুন।

    স্বাস্থ্য বিভাগঃ- যুদ্ধকালীন অবস্থায় বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর নিয়মতি সেনা ও গেরিলা বাহিনী ছাড়াও মুক্তাঞ্চলের জনগণ অসাবধানতা বশতঃ যে কোন মুহুর্তে শত্রু দ্বারা আহত হতে পারে। যে যেখানেই যখনই কোনরুপ গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হয় তখনই তাকে নিকটস্থ বাংলাদেশ সরকারের হাস্পাতালে প্রেরণ অথবা নিকটবর্তী ডাক্তারকে সংবাদ দিতে সচেষ্ট থাকবেন। বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর নিয়মিত সেনা যেমনি একজন মুক্তিযোদ্ধা তেমনি আপনিও একজন মুক্তি সংগ্রামী। সুতরাং আপনার ক্ষতি দেশের ক্ষতি।

    উন্নয়ন, পুনর্গঠন, পুনর্বাসন ও সাহায্যঃ- দীর্ঘ আট মাস যাবৎ শত্রুসেনারা সোনার বাংলাকে মরণ কামড় দিয়ে শ্মশানে পরিণোত করে চলেছে। তদুপরি বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর যান-বাহন চলাচল এবং জনসাধারণের স্বল্প সময়ে  সহজতর উপায়ে সরকার ও মুক্তিবাহিনীর সহিত যোগাযোগ এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনসাধারণের পুনর্বাসন ও সাহায্য করার জন্য উক্ত উন্নয়ন বিভাগের সহিত সহযোগিতা রক্ষা করে চলুন।

    ক্ষতি নিরুপণঃ- পাক সামরিক বাহিনীর বর্বর সেনা, বাংলাদেশের মীরজাফর গোষ্ঠীর দালাল, শান্তি কমিটি ও শেষ পর্যায়ের বিশ্বাসঘাতক বাঙালী রাজাকারের মার্চ মাসের ২৫ তারিখ থেকে আজ পর্যন্ত সমগ্র বাংলাদেশ যে অকথ্য অত্যাচার, নির্যাতন ও সর্বশেষে ধ্বংসাত্মক কার্যে লিপ্ত তা আজ সর্বজনবিদিত। বাড়ীঘর লুট-পাট থেকে শুরু করে অগ্নিসংযোগ করতে তারা দ্বিধা করেনি। তদুপরি বর্বর বাহিনীর অসংখ্য গোলাগুলির আঘাতে আজ বাংলাদেশ মুক্তাঞ্চল কেন, অধিকৃত অঞ্চলের দিকে তাকালেও, তার পূর্বের স্বরুপ এর অংশও পাওয়া যায় না। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার আপনার ক্ষতি নিরুপণের দায়িত্ব উক্ত বিভাগের গোচরীভূত করুন।

    ব্যবসা বাণীজ্যঃ- যুদ্ধকালীন অবস্থায় সাধারণতঃ উৎপাদন, আমদানী রপ্তানী ইত্যাদি কাজ প্রায়ই বন্ধ। জনসাধারণ অন্যান্য জিনিসপত্র পাওয়া দূরে থাকুক দৈনন্দিন জীবন ধারণের জন্য নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উচ্চ মূল্য দিয়েও পাচ্ছে না। তাই সরকার জনসাধারণ যাতে ন্যায্য মূল্যে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পেতে পারেন তার একটা সুষ্ঠু ব্যবস্থা করেছেন। ন্যায্য মূল্যের চেয়ে অধিক দাম দিয়ে জিনিসপত্র কিনবেন  না- কালোবাজারী বন্ধ করুন। কালোবাজারীকে ধরিয়ে দিন। মনে রাখবেন কালোবাজারী সামাজিক অপরাধী। শত্রুদের কোন পণ্য ব্যবহার করবেন না।

    সংযোগ রক্ষাকারী (বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর সহিত)ঃঃবাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর নিয়মিত সেনা ও গেরিলা বাহিনীর সদস্যরা রাত দিন বাঙ্কারে, বনে-জঙ্গলে দিন কাটাচ্ছে। তাদের একমাত্র লক্ষ্য শত্রু সেনাকে খতম করে সামনে এগিয়ে যাওয়া। তাদের এই অগ্রগতির পিছনে আপনাদেরও সাহায্য প্রয়োজন আছে। শত্রু সেনাদের গোপন খবর আপনার নিকটবর্তী মুক্তিবাহিনীর সদর দফতরে অবিলম্বে পাঠীয়ে দিন। ভ্রান্তিমূলক খবর দিয়ে শত্রুদের বিপর্যস্ত করুন। গোলাবারুদ, খাদ্য সামগ্রী ইত্যাদি তাড়াতাড়ি সরবরাহ করে মুক্তিবাহিনীকে যুদ্ধ জয়ে এগিয়ে দিন। তারা আপনাদেরই ভাই-এ দেশ আপনাদেরই- শত্রুকে তাড়াতেই হবে, এই পণ নিয়ে যে যেভাবেই পারেন সাহায্য করুন, এর জন্য রয়েছে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর সহিত বেসামরিক সংযোগ রক্ষাকারী-অবিলম্বে তাদের সাথে যোগাযোগ করুন, এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করিবেন না। স্বাধীনতা সংগ্রামের আপনিও একজন সৈনিক।

    তথ্য ও প্রচারঃ- যুদ্ধকালীন অবস্থায় শত্রু সেনাদের গোপন খবর সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। আপনার নিকটে যদি কোন মুক্তিবাহিনীর সদর দফতর না থাকে তা হলে তথ্য ও প্রচার দফতরে সামরিক সামরিক বিষয়ের গোপন খবরাদি সরবরাহ করুন। গুজব ছড়াবেন না, গুজবে কান দেবেন না। মনে রাখবেন দেওয়ালেরও কান আছে। জনগণের মনোবল বাড়িয়ে তুলুন। স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীন নাগিরিক হিসেবে স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা করুন।

    কৃষি ও সেচঃ- দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোকে শক্ত করতে প্রয়োজন হলে প্রথমে প্রোয়োজন কৃষিজাত দ্রব্য প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন করা। বাংলাদেশের কিছু অংশও এখনও শত্রু কবলিত। অধিক পরিমাণে ধান, পাট, ইত্যাদি উৎপাদনে এগিয়ে আসুন।

    বেসামরিক প্রতিরক্ষাঃ- অসাবধানতাবশতঃ নিরীহ জনসাধারণ যে কোন সময়ে শত্রুর শিকার হতে পারেন। অবিলম্বে বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের শরণাপন্ন হউন-সাবধানের মার নেই।

    শিক্ষাঃ-অনভ্যাসে বিদ্যা হ্রাস। অবিলম্বে প্রাথমিক, মাধ্যমিক পর্যায় চালু করা হবে। মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ এখনও বিবেচনাধীন। ছোট ছোট শিশুরা যাতে বইপুস্তক নাড়াচাড়া করতে পারে তাতে এগিয়ে আসুন। শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড।

    ডাক বিভাগঃ-মধ্যাঞ্চলে দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য সরকার অনতিবিলম্বে ডাক বিভাগ চালু করেছেন। বাংলাদেশের নতুন আঙ্গিকের ডাক টিকিট, খাম, পোষ্ট কার্ড জনগণের ব্যবহারের জন্য প্রচার করা হবে।

শুল্ক- অতিরিক্ত উৎপাদন বিদেশে রপ্তানী করে সরকারকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সাহায্য করুন এবং সীমান্ত চৌকিতে শুল্ক দিয়ে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এগিয়ে নিন।

     উপরোক্ত বিভাগগুলি ছাড়াও কোষাগার ও রাজস্ব বিভাগও কাজ করতে থাকবে। সময়মত জনগণের নিকট ইহার বিস্তারিত কার্যবিবরণ প্রচার করা হবে।

 

    মুক্তাঞ্চলের জনগণের দায়িত্ব স্বাধীনতার জন্য অনেক। তাই-যে যে ভাবেই পারেন স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিন। দুর্নীতিমূলক কাজে লিপ্ত হবেন না। কাউকে করতেও দেবেন না। স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীন বাঙালী জাতি হিসেবে নিজেকে বিশ্বের বুকে তুলে ধরবার জন্য তৈরি হউন।