২৭৪. ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতা সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর ঐতিহাসিক পুরষ্কার

Posted on Posted in 6

কম্পাইলারঃ আব্দুল্লাহ আল নোমান

<৬,২৭৪,৪৬৯-৪৭১>

শিরোনামঃ বাংলাদেশের স্বাধীনতা  সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীর ঐতিহাসিক পুরস্কার

সংবাদপত্রঃ অভিযান (১ম বর্ষঃ ৪র্থ সংখ্যা)

তারিখঃ ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭১

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা  সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীর দেশপ্রেমে উদীপ্ত দুর্জয় পৌরুষের ঐতিহাসিক পুরস্কার

এক নদী রক্ত, অশ্রু এবং হাহাকারের আওতলান্তে কবে পাকিস্তানী হানাদার জঙ্গী দস্যুদের সর্বশক্তি চিরকালের মত সমাধিস্থ হয়েছে। গতকাল বিকেল পাঁচটা এক মিনিটে শত্রুকবল মুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের সমস্ত অঞ্চল। ঢাকা শহরের আনন্দ হাজার হাজার নাগরিকের কণ্ঠে ধবনিত হয়েছে “জয় বাংলা” “বঙ্গবন্ধু জন্দাবাদ” ইন্দিরা গান্ধি জিন্দাবাদ” বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী জিন্দাবাদ”। এই বিশাল জনতার সামনে রেসকোর্স ময়দানে মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় মিত্রবাহিনীর কাছে নতশীরে সসৈন্যে আত্নসমর্পণ করেছে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর অধিনায়ক বর্তমান লেঃ জেনারেল নিয়াজী। সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী ঢাকা শহরে চালু হয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রশাসন।

.

তোমার আসন শূন্য আজি হে বীর পূর্ণ করো

রাজধানী ঢাকা শহরে আজ স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা যখন আপন গৌরবে উড্ডীন, তখন জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতি সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীর হৃদয়কে বিষাদে ভারাক্রান্ত করে তুলেছে।

যে মানুষটি মুখের একটি কথায় তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত উচ্ছাসের মত কেঁপে কেঁপে উঠতো, তিনি আজ বাংলার সবুজ, নরম, মায়ের মত স্নিগ্ধ মাটি থেকে হাজার মাইল দূরে, কক্ষ, উষর বান্ধভীন নির্জন নিঃসঙ্গ পরিবেশে বর্বর পাকিস্তানী ফ্যাসিষ্ট চক্রের কারাগারে বন্দী। তাই স্বাধীনতার কোন উৎসবই আজ আনন্দমুখর হয়ে উঠবে না যতক্ষণ বঙ্গবন্ধুকে আমাদের ভিতরে ফিরে না পাবো।

* *  *

“বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলনে এটাই প্রমাণ হ’ল বেয়নেট দিয়ে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাকে দাবিয়ে রাখা যায় না। আজকের দিনে আমাদের মন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্যে উদগ্রীব। আমি আশা করব ইয়াহিয়া খান পরাজয় মেনে নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করে দেবেন।”

-সৈয়দ নজরুল ইসলাম

 

“ভারত আমাদের মিত্র হিসাবে আমাদের অনুরোধে সেনাবাহিনী পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ মুক্ত করার জন্যে-দখল করবার জন্যে নয়”

তাজউদ্দিন আহমেদ

 

“সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামের অন্তে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা সমাজতন্ত্রের আর্দশে বলীয়ান হয়ে বিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনের জন্য এক নবসংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। নতুন সমাজ ব্যবস্থা, নতুন মূল্যবোধ হড়ে তোলার জন্যে দেশবাসীকে আত্ননিয়োগ করতে হবে। রচনা করতে হবে পরস্পরাগত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র এবং অসৎ বৃত্তিকেন্দ্রিক  উচ্চাভিলাষের সমাধি।

স্বাধীনতা কেবল নিশান বদলানো নয়। রক্তের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি তা সম্পূর্ণ ভিন্ন ও এর পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। আমাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে সমভেতভাবে সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে এক প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত নিরপেক্ষতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ভিত্তিতেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারীত হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘাতক ইয়াহিয়ার কারাগার থেকে মুক্ত করার জন্য বৃহৎ শক্তিগুলোকে চাপ সৃষ্টি করতে অনুরোধ জানাচ্ছি। ভারত সরকার ও ভারতীয় জনগণের কাছে আমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। ধন্যবাদ জানাচ্ছি স্বাধীন রাষ্ট্র ভুটানকে”।

–খোন্দকার মোশতাক

 

 

‘মুক্তিবাহিনীর বীর তরুণ এবং ভারতীয় মিত্র বাহিনীর জওয়ানদের বীরত্বে আমরা অভিভূত।

শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারত সরকার এবং ভারতীয় জনগণ আমাদের পাশে দাঁড়িয়েচ আমাদের কৃতজ্ঞতা অর্জন করেছেন। আমারা সোভিয়েট রাশিয়া, পোল্যান্ড এবং অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কাছেও কৃতজ্ঞ’।

-কামরুজ্জামান

 

“বিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনের কাজে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি গড়ে তুলতেই আমরা আত্ননিয়োগ করব।”

-মনসুর আলী

 

“ঢাকা এখন একটি স্বাধীন দেশের রাজধানী। বিজয়ের এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জনগণকে আমরা অভিনন্দন জানাই। জয়ধ্বনি দিই মুক্তিবাহিনীর তরুণ বীরদের শৌর্য ও নিবেদিত চিত্ততার জন্যে।

বাংলাদেশের জনগণ এবং মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা করা; সন্ত্রাসের রাজত্ব থেকে তাঁদের দেশকে রক্ষা করাই ছিল ভারতের উদ্দেশ্য। প্রয়োজনের বেশি সময় আমাদের বাহিনী বাংলাদেশে থাকবে  না।

আমরা আশা করি এবং প্রার্থনা করি, নতুন জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান জগগণের মধ্যে তাঁর যথাযোগ্য অভিনন্দন গ্রহণ করবেন এবং শান্তি, প্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

আমরা বাংলাদেশের জনগনকে শুভেচ্ছে জানাই, সোনার বাংলায় তাদের জন্য যেন সমৃদ্ধ  ভবিষ্যত গড়ে ওঠে।

এ-জয় তাঁদের একার নয়, যে সব জাতি মানবতার মূল্য দেয় তাঁদের সকলের জন্যে এ-জয় অশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

—শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী