২৮০. ১৪ জুলাই বাংলাদেশ পাকিস্তান গণহত্যার অপরাধী

Posted on Posted in 6

অনুবাদঃ নোবেল

<৬,২৮০, ৪৮০-৪৮১>

সংবাদপত্রঃ বাংলাদেশ ভলিউম ১ নং ৩

তারিখঃ ১৪ জুলাই, ১৯৭১

.

পাকিস্তান গণহত্যার অপরাধী

পাকিস্তান আর্মির ‘ বাঙালীদের হত্যা করে পুড়িয়ে ফেলার মিশন’ মানুষের মর্যাদা এবং সভ্যতার মৌলিক নিয়ম এর প্রতি চরম অসম্মান প্রদর্শন করে এখনো চলমান আছে। এই পরিকল্পিত গণহত্যা হচ্ছে এক পৈশাচিক পরিকল্পনার অংশ যা হিন্দু অথবা মুসলিম অথবা খ্রিষ্টান অথবা বোদ্ধ নির্বিশেষে বাঙালী হত্যার জন্য করা হয়েছে। লক্ষ হচ্ছে একটা দেশকে ধ্বংস করে ফেলা যার জনগণ জাতিগত ও বর্ণগত ভাবে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলাদা।

.

বাঙালীদের ‘দোষ’ ছিল এই যে তারা বাঁচার অধিকার চেয়েছিল। নির্মম অর্থনৈতিক শোষণ পরিচালনা করা হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ও সম্পদের উপর। পাকিস্তান একটি রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার জন্য এটা বন্ধের প্রয়োজন ছিল। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ সংখ্যালঘু অংশের মানুষের হাতে অধ্যুষিত হয়ে থাকা আর মেনেনিতে পারছিল না। দীর্ঘদিন ধরে এই অসহ্য অনুভূতি জন্মন নিচ্ছিল এবং সহ্যের বাধ ভেঙে যাচ্ছিল কিন্তু প্রতিকারের কোন পথ দেখা যাচ্ছিল না কারণ ইচ্ছাকৃতভাবে বাঙালীদের ক্ষমতার মূল করিডরের বাইরে রাখা হচ্ছিল।

.

আইয়ুব খানের পতনের পর, জেনারেল ইয়াহিয়া নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা দিয়ে খমতায় আসেন। দেশ ব্যাপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করা হয় কিন্তু যখন ঐ উদ্দেশ্য প্রয়োগের সময় আসে, তা এক নিমিষেই ভেঙে পড়ে। ভুট্ট এবং মিলিটারি জান্তার কেঁউই গণতন্ত্রের সার কথা সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন মেনে নিতে রাজী ছিল না। যখন ইয়াহিয়া এবং ন্যাশনাল এসেম্বলির মেজরিটি পার্টির নেতা শেখ মুজিবের মধ্যে আলোচনা চলমান ছিল, হঠাৎ করে সংগঠিত সেনাবাহিনী আধুনিক সমরাস্ত্র সমেত নিরস্ত্র নিষ্পাপ সিভিলিয়ানদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা হত্যা করে এবং জ্বালিয়ে দেয়, ধর্ষণ এবং লুট করে একটি মাত্র উদ্দেশ্য নিয়ে আর তা সে মানুষ গুলোকে নিঃশেষ করে দেওয়া যারা আর কোন অপমান এবং শোষণ সহ্য করার মত অবস্থায় ছিলনা।

.

মার্চ ২৬ ইয়াহিয়া খানের ভাষণ পরিষ্কার ভাবে পরিকল্পনাটি ইঙ্গিত করে যার উপর ভিত্তি করে গণহত্যার সম্পূর্ণ অপারেশন লঞ্চ করা হয়েছিল। শেখ মুজিব এবং তার পার্টি ছিল পাকিস্তানের শত্রু এবং সে কারণে তাদের নির্মূল করতে হবে। ডিসেম্বরের নির্বাচনের দিকে তাকালে দেখা যায় পূর্বের ৭৫ মিলিয়ন মানুষের কাছথেকে আওয়ামীলীগ ১৬৯ টি আসনের মাঝে ১৬৭ টি আসন পেয়েছিল। এটা সুস্পষ্ট যে পুরো জাতী শেখ মুজিব সাংবিধানিক ভাবে যা অর্জন করতে চাচ্ছিলেন তাতে পুর্ন সমর্থন দিয়েছিল।

.

সুতরাং আর্মি পুরো জাতীকেই তাদের টার্গেট হিসেবে গ্রহণ করে এবং হত্যা করে এবং জ্বালিয়ে দেয় কোন বাছবিচার ছাড়া। কিছু নির্দিষ্ট মানুষের মাঝে তারা তাদের আক্রমণ সীমিত রাখার কোন কারণ খুঁজে পায় না সুতরাং একটি পূর্ণ মাপের আক্রমণ লঞ্চ করা হয় মানুষের মাঝ থেকে বাঙালী জাতীয়তাবাদ নিশ্চিহ্ন করার জন্য। এটা এখন পরিষ্কার যে পাকিস্তান আর্মি হিন্দু বা মুসলিম যেই হোকনা কেন কোন বাঙালিকে বাঁচতে দিবে না।

.

জার্মানিতে হিটলারের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক শাষন ৮ মিলিওনের অধিক মানুষকে নির্মূল করেছিল। পরবর্তীকালে দেশ সমূহ ১৯৪৮ সালে গণহত্যার অপরাধ প্রতিরোধ ও শাস্তির জন্য কনভেনশন গ্রহণ করে এবং এটাকে এ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয় যে ‘ কার্যকলাপ, যা করা হয়েছে ধ্বংসের অভিপ্রায়ে, সম্পূর্ণভাবে অথবা আংশিক ভাবে, একটি জাতের মতের বর্ণের অথবা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে হত্যা অথবা মারাত্মক ভাবে শারীরিক আঘাত করা বা এমন কোন গ্রুপের সদস্যকে মানসিক আঘাত করা।‘ কনভেনশন আরো ঘোষণা করে যে এই অপরাধ আন্তর্জাতিক আইন এর আওতায় শাস্তিযোগ্য এবং  শাসক ও সরকারী কর্মকর্তাদের উপর প্রয়োগ যোগ্য।

.

এর সাথে মৌলিক মানবাধিকার সমূহ যুক্ত আছে যা কনভেনশন এবং জাতিসংঘ উভয় দ্বারা স্বীকৃত। যদি মানবতা বিরোধী অপরাধ আন্তর্জাতিক আইনের মতে অপরাধ হয়, বাংলাদেশে পাকিস্তানী আর্মির কার্যক্রম কনভেনশনের আর্টিকেল ৪ এর আওতায় পেনাল ট্রাইবুনালে তোলা সম্ভব।

.

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গণহত্যার এমন পরিষ্কার কেস আর নেই যেটা আজ বাংলাদেশে পাকিস্তানী শাসক করছে। পাশবিক বল প্রয়োগের মাধ্যমে পাকিস্তানী আর্মি বাংলাদেশে ডাবল গণহত্যা করছে একটি হচ্ছে জাতী হিসেবে বাঙালী নিধন এবং অপরটি হচ্ছে ধর্মীয় গ্রুপ হিসেবে হিন্দুদের নিধন। নিযেকে বাঙালী দাবী করার দুঃসাহস হিন্দু বা মুসলমান যেই দেখাকনা কেন তাঁকে তৎক্ষণাৎ গুলি করা হচ্ছে এবং কেউ নিজেকে হিন্দু স্বীকার করলে তাঁকে বেয়নেট চার্জ করে মারা হচ্ছে। সহজ ভাষায় এটা গণহত্যা এবং ঠিক এটাই পাকিস্তানী আর্মি এখন করছে। যদি বিশ্ব বিবেক কিছু করতে চায় তবে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার থেকে বড় আর কিছু হতে পারে না। গণহত্যা এমন একটি অপরাধ যাতে শাস্তি অবধারিত।